Home "ধারাবাহিক গল্প মন কেমনের মরশুম মন কেমনের মরশুম পর্ব-০৮

মন কেমনের মরশুম পর্ব-০৮

0
569

#মন_কেমনের_মরশুম

পর্ব: ৮

রান্নাঘরের দরজায় এসে উঁকি দেয় ইরা। রাবেয়া বেগম নাশতা বানাচ্ছে আর গজগজ করছে রাগে। কিসের রাগ ইরা বুঝতে পারেনা। হয়তো তার উপরেই হবে। আশার স্যার এসেছে, নাশতা তার জন্য হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

“আচ্ছা আমি আপনাকে কি বলে ডাকবো?”
রাবেয়া ভ্রু কুঁচকে তাকায়। বিরক্তিতে চোখ ফিরিয়ে নেয় ইরার দিক থেকে।
“আপনার ভাষ্যমতে আমি বিড়াল বা কুকুর। মিউ মিউ করে ডাকবো নাকি ভৌ ভৌ করে? ভালো কথা, আমি তো আবার ভিখারিও। ‘আম্মা কয়ডা খয়রায় দ্যান, মুখে পড়বেন আমার আল্লাহ রাসূলের নাম।’ এভাবে ডাকবো?”
রাবেয়া দাঁতে দাঁত চেপে বললো,”বেয়াদব মেয়ে। কোনো শিক্ষাদীক্ষা নেই।”
“তাহলে আপনি বলে দিন কি বলে ডাকবো? না বললে বুঝবো কীভাবে?”
“কিছু বলে ডাকতে হবে না আমাকে। দূর হয়ে যাও চোখের সামনে থেকে, তাহলেই হবে।”
ইরা রাবেয়ার কথায় মন খারাপ না করে এগিয়ে যায়। আচমকা চা-নাশতার ট্রে উঠিয়ে নেয় নিজের হাতে।

“এটা কি হলো?”
“স্যারকে নাশতা আমি দিয়ে আসছি। আপনি বিশ্রাম করুন।”
“তোমাকে কেউ বলেছে? তোমার কি মনে হচ্ছে না তুমি একটু বাড়াবাড়ি করছো?”
“যাহ বাবা! সাহায্য করতে চাচ্ছি তাতেও গালমন্দ করে। আপনি বসুন তো একটু। আমি যাচ্ছি।”

রাবেয়াকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ইরা ট্রে নিয়ে চলে যায়। রাবেয়া হতবিহ্বল হয়ে যায় রাগে। এই মেয়ে আসলে চাচ্ছেটা কি?

খট করে শব্দ হয় টেবিলের উপর। স্যার আর আশা দুইজনই চমকে উঠে তাকায়। ইরা হাসিমুখে স্যারের দিকে তাকিয়ে আছে।

“স্যার ভালো আছেন?”
“জি ভালো আছি। আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না।”
“কি হলো আশা? স্যারকে আমার পরিচয় দাও।”
আশা হতভম্ব হয়ে যায়, কি বলবে ভেবে পায়না।

ইরা আয়েশ করে টেবিলের পাশে খাটের উপর বসে। স্যার অবাক হয়ে তাকায় ইরার দিকে।

“এ কি আপনি এখানে বসলেন যে? আমি তো পড়াচ্ছি ওকে।”
“তো পড়ান, আমি কি বইয়ের উপর উঠে বসেছি?”
মহিবুল আশার দিকে তাকায়। আশার চোখেমুখে আকুতি।

“স্যার আপনি তো আশাকে ইংরেজি পড়ান তাইনা? বলুন তো ফিউচার টেন্স কয় প্রকার?”
“ফাজলামি করছেন আমার সাথে? এটা একটা প্রশ্ন হলো? এটুকু না জেনে ইংরেজির শিক্ষক হয়েছি আমি?”
“আরে বলেন না। দেখতে হবে না মেয়েকে আমরা কার কাছে পড়তে দিয়েছি। আদৌ সে সব পারে কিনা।”
মহিবুল আশার দিকে তাকায় অবাক হয়ে। আশা মাথা নিচু করে বসে আছে।

“বলুন বলুন। ফিউচার টেন্স কয় প্রকার ও কি কি? না পারলে আজ আপনাকে এখান থেকে যেতে দিবো না। বেঁধে রাখবো।”
“কি সাংঘাতিক কথা! এই আপনি কি পাগল?”
“বলবেন না?”
ইরার শক্ত চোখমুখের দিকে তাকিয়ে ঢোক চাপে মহিবুল। মেয়েটাকে সুবিধার লাগছে না। এ বাড়িতে আগে কখনো দেখা হয়নি তাকে।

“ফিউচার টেন্স চার প্রকার। ফিউচার ইনডিফিনাইট, ফিউচার কন্টিনিউয়াস, ফিউচার পারফেক্ট আর ফিউচার পারফেক্ট কন্টিনিউয়াস।”
ইরা টেবিলের উপর থেকে স্কেলটা নিয়ে নাড়াচাড়া করে। মহিবুল ঢোক চাপে ভয়ে। কি করবে এই মেয়ে?

“হয়নি। ফিউচার টেন্স পাঁচ প্রকার। যে চার প্রকার বললেন এরপর আরো এক প্রকার আছে। ফিউচার ইম্পসিবল টেন্স। যখন কোনো ব্যক্তির অভিপ্রায় ভবিষ্যতে সফল হওয়া অসম্ভব তখন সেই টেন্সকে ফিউচার ইম্পসিবল টেন্স বলে। বুঝেছেন মিস্টার ইংরেজির শিক্ষক?”
মহিবুল চোখ বড় বড় করে তাকায় ইরার দিকে। তার দৃষ্টিতে স্পষ্ট ভয়। কোনো কারণ ছাড়াই সে ভয় পাচ্ছে। ইরা যদিও আন্দাজে ঢিল ছুঁড়েছিলো। কিন্তু মনে হচ্ছে ঠিক জায়গায় লেগেছে। যাদের মনে পাপ আছে তাদের মনে ভয় বেশি। যাদের মনে পাপ নেই তারা এভাবে ভয় পায়না। ইরা তীক্ষ্ণ চোখে তাকায় মহিবুলের দিকে।

“আরে স্যারের চা দেখি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। এমন করলে হবে স্যার? গরম গরম না হলে মজা হয় নাকি? নিন চা খান।”
মহিবুল শান্ত ভাবে চায়ের কাপ হাতে নেয়, ছোট্ট করে চুমুক দেয়।

“এই আশা জানো, একটু আগেই খবরের কাগজ দেখে এলাম। যা একটা গরম খবর ছেপেছে আজ। তুমি পড়েছো?”
আশা নিচু গলায় বললো,”না পড়িনি।”
“শোনো কি কাণ্ড! ছাত্রীর সাথে অসভ্যতা করতে গিয়েছিলো গৃহশিক্ষক। বাড়ির বউ তা বুঝতে পেরে চায়ের সাথে বিষ মিশিয়ে খাইয়ে দিয়েছে। একদম ঠিক করেছে।”
মহিবুল মাত্রই চুমুক দিয়েছে, হঠাৎ বিষম লাগে তার। একেবারে বিশ্রী অবস্থা যাকে বলে। কাশতে থাকে জোরে জোরে।

ইরা ব্যস্ত হয়ে বললো,”এ বাবা স্যারের আবার কি হলো? আপনার চায়ে তো আর বিষ মেশানো নেই। আপনি কেনো এমন করছেন? এ কি অবস্থা দেখো তো আশা।”
মহিবুল ভয়াবহ রাগী চোখে আশার দিকে তাকাতেই আশা ভয়ে চুপসে যায়।

“তুমি এখান থেকে যাও না। চা দিতে এসেছিলে দিয়েছো, এবার চলে যাও। খবরের কাগজের সংবাদ পরে শুনবো।”
ইরা অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠে দাঁড়ায়, হাই তোলে।

“তা বেশ। আমি যাচ্ছি। স্যারকে একটু লবণ পড়া খাওয়াও। অনেক ভয় পেয়েছেন উনি। একটু মজাই নাহয় করেছি। তাতেই এমন ভয় পেতে হবে?”
মহিবুল গাঢ় গলায় বললো,”এসব কি ধরণের মজা? আপনার সাথে কি আমার মজার সম্পর্ক?”
“জি না।”
ইরা মুখ টিপে হেসে বেরিয়ে যায়, যাওয়ার সময় স্কেলটা নিয়ে যায়। আশা সেদিকে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে ফেলে। বুকটা ধকধক করছে তার। আর যা-ই হোক, মেয়েটার এলেম আছে বলতে হবে। খুব ধারালো।

“আমি ভ্রমর, আমি চিত্তসন্ধিতে রই অমর। আমি নক্ষত্র, আমি গর্জে ওঠা গ্রহ। আমি নিশ্ছিদ্র ছায়ায় আলোর অগ্নুৎপাত, আমি জ্বলে ওঠা ইউরেনাসের হঠাৎ জলপ্রপাত। আমি জয়ী, আমি ক্ষয়ী, আমি ধ্বংসস্তূপে বেঁধেছি আমার ঘর। আমি ভ্রমর, আমি চিত্তসন্ধিতে রই অমর।”

ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে হাঁটছে আরশাদ। কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ আর কানে হেডফোন। একমনে শুনছে ভ্রমরের লেখা আরেক অসাধারণ সৃষ্টি। প্রতিটা শব্দ মস্তিষ্কে যেয়ে আঘাত হানছে। টর্নেডোর মতো ঘুরছে নিউরনের মধ্য দিয়ে। কীভাবে কেউ এতো সুন্দর লিখতে পারে? আরশাদের ধারণা লেখিকা মধ্যবয়সী কোনো নারী, কিংবা আরো বেশি বয়সও হতে পারে। কমবয়সী কোনো মেয়ের লেখায় এতোটা পরিপক্কতা আসতে পারে বলে মনে হয়না। আরশাদের খুব ইচ্ছা ভদ্রমহিলার সাথে একদিন দেখা করার। কীভাবে তার মস্তিষ্ক থেকে এতো অসাধারণ শব্দাবলী নিঃসৃত হতে পারে সে জানতে চায়। কিন্তু পাবে কোথায় তাকে? এই অনুষ্ঠানের লেখাগুলো বেনামী চিঠিতে আসে। হতেও পারে ভ্রমর লেখিকার আসল নাম নয়, ছদ্মনামে লিখছে সে। তবে যাই হোক, লেখিকার লেখার হাত ক্ষুরধার। যেনো ধারালো ছুড়ি দিয়ে ফালাফালা করে দিচ্ছে মাথার প্রতিটা শিরা-উপশিরা।

ঘরে ঢুকতেই অবাক হয়ে যায় আরশাদ। বসার ঘরে বাবা, মা, আশা সবাই বসে আছে। মায়ের মুখ রাগে থমথম করছে। আশা মাথা নিচু করে বসে আছে। বাবা তুলনামূলক শান্ত কিন্তু তার চোখেমুখে কৌতুহলও আছে। ইরাকে কোথাও দেখতে পায়না সে। ইরার সাথে কি কিছু হয়েছে তাহলে? মা কিছু বলেছে?

“মা….”
“বাহ এসেছেন মহারাজ? আপনার অপেক্ষাতেই ছিলাম।”
রাশেদুল কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে বললো,”আচ্ছা ছেলেটা তো মাত্র এলো। ঘেমে কি অবস্থা। আগে একটু বসুক, বিশ্রাম নিক তারপর শুরু করো। এই আশা ভাইয়াকে ঠান্ডা পানি এনে দে তো।”
আশা ধীর পায়ে উঠে চলে যায়।

আরশাদ মায়ের পাশে এসে বসে। তপ্ত শ্বাস ফেলছে রাবেয়া জোরে জোরে। আরশাদ মায়ের পিঠে হাত রাখে আলতো করে।

“মা কি হয়েছে? আমাকে বলো। ইরা কোথায়?”
“তোমার গুণধর বউ, কেলেঙ্কারি বাঁধিয়ে পাড়া বেড়াতে বের হয়েছে। সেই বিকেলে বের হয়েছে, এখনো ফেরেনি।”
আরশাদের বুকে ধাক্কা লাগে।

“কি বলছো মা? ইরা বাড়িতে নেই? কোথায় গেছে?”
“আমাকে বলে গেছে? অসভ্য মেয়ে, আমার সাথে চরম বেয়াদবি করে।”
“ইরা তোমার সাথে বেয়াদবি করেছে? ইরা?”
“বিশ্বাস হবে কেনো? সবার সামনে তো ভালোমানুষির মুখোশ পরে থাকে। যেখান সেখান থেকে মেয়ে এনে ঘরে তুললে এমনই হয়।”
আরশাদের কানে কোনো কথা যায়না। ইরা কোথায় গেলো কাউকে কিছু না বলে? ও কি রাগ করে তবে ওর বাড়িতে চলে গেলো? আরশাদ এখন কি করবে? ফিরিয়ে আনতে যাবে, এক্ষুনি যেতে হবে।

“ভাইয়া তোমার শরবত। ভাবী বানিয়ে ফ্রিজে রেখে দিয়েছিলো।”
সবাই চমকে আশার দিকে তাকায়। আশা ইরাকে ভাবী বলে ডাকলো? সবচেয়ে বেশি অবাক হলো রাবেয়া। রাশেদুল হাসে আস্তে আস্তে।

আরশাদ গ্লাস হাতে নেয়না। ব্যাগটা রেখে উঠে দাঁড়ায়। ইরাকে আনতে হবে। ওই বাড়িতে ওকে থাকতে দেওয়া যাবে না। ইরা এখন তার স্ত্রী। তার দায়িত্ব ইরার ভালো থাকা, খারাপ থাকা।

“তুমি কোথায় যাচ্ছো?”
“জানিনা কোথায় যাচ্ছি। ইরাকে আনতে হবে। ও একা কোথায় গেছে আমাকে জানতে হবে না?”
রাবেয়াও উঠে দাঁড়ায় সাথে সাথে।

“আগে শুনে নাও সে কি করেছে।”
“মা এসব শোনার জন্য সময় আছে। আগে ইরা আসুক। ও বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত আমি মাথা ঠান্ডা করে কিছু শুনতে পারবো না।”
রাবেয়া হতবাক হয়ে তাকায় ছেলের দিকে। ইরার জন্য দেখি জান বেরিয়ে যাচ্ছে তার ছেলের। এসব কি?

রাশেদুল ছোট্ট করে হেসে আরশাদের কাঁধে হাত রাখে।
“আমি আসি তোমার সাথে?”
“না বাবা, আমি একাই যাবো।”

আরশাদ কেবলই পা বাড়াবে ঠিক তখনই দরজা ঠেলে গুটি গুটি পায়ে ইরা ঢোকে ঘরে। হালকা নীল একটা পুরোনো সালোয়ার কামিজ পরা তার শরীরে, লম্বা চুল খোলা। আজ আবার চোখের নিচে কাজল দিয়েছে। তাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে এটুকুতেই। আরশাদ থমকে যায়। তার স্থির দৃষ্টি ইরার উপর। মুগ্ধ হতে মস্তিষ্ক জোর করছে মনকে। ইরা যেনো এক পশলা বৃষ্টি হয়ে প্রবেশ করে। উত্তপ্ত মন শীতল হয় আরশাদের।
ইরাও বেশ অবাক। সবাই মিলে কি করছে এখানে? মনে হচ্ছে যেনো বিচার বসেছে।

“তুমি কোথায় গিয়েছিলে? কাউকে কিছু না জানিয়ে একা বেরিয়ে গেলে?”
ইরা শান্ত দৃষ্টিতে আরশাদের দিকে তাকিয়ে বললো,”আমি তো ছোট বাচ্চা নই যে একা বেরোতে পারবো না। তাছাড়া ওই সময় সবাই ঘুমিয়ে ছিলো, বলে যেতে পারিনি।”
“তা কি এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিলো যে একটু অপেক্ষা করা গেলো না? তোমার বোঝা উচিত কেউ দুশ্চিন্তা করতে পারে।”
ইরা আরশাদের চোখে চোখ রাখে। আরশাদের মনে হলো সে খেই হারাবে। ইরার দৃষ্টি গভীর। একদম যেনো ভিতর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

“কে দুশ্চিন্তা করবে? আপনি?”
“তা কি অস্বাভাবিক?”
“না। দায়িত্বের খাতিরে এটুকু দুশ্চিন্তা করাই যায়।”
আরশাদ ইরার বাঁকা কথা বুঝে যায়। মেয়েটা অন্য রকম। ও কোনো খোলা বই না যে চাইলেই পড়ে ফেলা যায়। ও দুর্বোধ্য, ও খোলসে আবৃত।

আরশাদ কিছু বলার আগেই হইহই করতে করতে ছুটে আসে রাবেয়া।
“এই মেয়ে, এই। এদিকে তাকাও। কি কাহিনী ঘটিয়েছো? বলো?”
“কাহিনী? আমি?”
“নয়তো কি আমি? আশার স্যারকে কি বলেছো তুমি?”

আরশাদ অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,”এক মিনিট এক মিনিট। আশার স্যার এলো কোথা থেকে এখানে? আশার স্যারকে ইরা কি বলবে?”
“ওর কাছেই জিজ্ঞেস কর সেইটা। ভদ্রলোক আমাকে জানালেন উনি আর পড়াতে আসবে না আশাকে। আমার মাথায় তো আকাশ ভেঙে পড়েছে শুনে। এতো ভালো স্যার, এতো ভালো পড়ায়। ইংরেজিতে তুখোড়। কোনোভাবেই স্বীকার করেনা। অনেক অনুরোধ করায় সে বললো এই মেয়ে নাকি তাকে কিসব আজেবাজে কথা বলেছে। উনি অপমানিত বোধ করেছে। উনি আর আশাকে পড়াবেন না।”
আরশাদ ইরার দিকে তাকায়। ইরা অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। ভীষণ হাসি পাচ্ছে তার। কোনোমতে হাসি আটকে রেখেছে।

“ইরা এদিকে তাকাও।”
“কি?”
“আশার স্যারের সাথে তোমার কথা হয়েছে?”
“হুম।”
“তাকে কি এমন বলেছো যে সে অপমানিত বোধ করেছে? আর পড়াতেই আসবে না বলছে? আর তারচেয়েও বড় কথা উনার সাথে কি এমন কথা থাকতে পারে তোমার? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”
ঝাঁঝিয়ে ওঠে রাবেয়া সাথে সাথে।

“ওকে কে এতো সাহস দিয়েছে আমার পরিবারের বিষয়ে নাক গলাতে? এমন অমায়িক একজন মানুষ, তাকে কিনা বলেছে সে ভুলভাল ইংরেজি জানে? ফিউচার টেন্স নাকি চার প্রকার না পাঁচ প্রকার। আরেকটা নাকি ফিউচার ইম্পসিবল টেন্স। এটা কোনো কথা?”
আচমকা ঘর কাঁপিয়ে হাসে রাশেদুল। ইরা মাথা নিচু করে কুটকুট করে হাসছে। আশার মুখ মলিন।

“এই তুমি হাসছো কেনো? হাসির কি হয়েছে এখানে?”
রাশেদুল হাসি থামাতে পারেনা, যেনো খুব মজার কিছু হয়েছে।

“বিষের ব্যাপারে কিছু বলেননি উনি আপনাকে?”
“কি বললে? বিষ? বিষ মানে?”
“বিষ মানে পয়জন, যা বেশি মাত্রায় খেলে মানুষ মারা যায়। কম খেলে মারা যায়না, পেট খারাপ হয়।”
রাশেদুল আবারও হাসে। আরশাদ কিছু বুঝতে না পেরে ইরার দিকে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটা এসব কি বলছে? আশার স্যারকে এসব বলার মানে কি?

রাবেয়া বিষদৃষ্টি ফেলে ইরার উপর। ইরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,”আমার ভুল হয়েছে। উনি আসলে আমি ক্ষমা চেয়ে নিবো। কি আশা ঠিক আছে?”
আশা আলুথালু চোখে তাকায় ইরার দিকে। ঠোঁট কাঁপছে তার তিরতির করে।

ইরা আরশাদের চোখের দিকে তাকায় আবার।

“ঘরে যাই? বিচার কার্য শেষ হয়েছে আজকের মতো?”
“ইরা…”
ইরা চলে যায় ঘরে। আরশাদ কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তার বিশ্বাস ছিলো একটু দেরি হলেও তার মা আস্তে আস্তে মানিয়ে নিবে, মেনে নিবে ইরাকে। কিন্তু এমনটা চললে কীভাবে কি? সবকিছু স্বাভাবিক হওয়ার বদলে আরো ঘোলাটে কেনো হয়ে যাচ্ছে? ইরার কেনো আশার স্যারের সাথে এসব কথা বলতে হবে? কি ব্যাপার আছে এরমধ্যে?

“ইরা।”
রাত প্রায় তিনটা। বারান্দার চেয়ারে বসে উবু হয়ে কিছু লিখছিলো ইরা। আলো জ্বালায়নি পাছে আরশাদের ঘুম ভেঙে যায়। দূরের স্ট্রিট লাইটের আলোতেই যতোটুকু যা দেখা যায়।

আরশাদের উপস্থিতি টের পেয়ে সাথে সাথে কাগজ গুটিয়ে ফেলে ইরা। লুকিয়ে ফেলে ওড়নার নিচে। আরশাদের কিছুটা খটকা লাগে কিন্তু কথা বাড়ায় না এটা নিয়ে। সবারই একটা ব্যক্তিগত গন্ডি থাকা উচিত। সে না চাইলে জোর করে সেই গন্ডিতে ঢুকে পড়া অসভ্যতা।

“এতো রাতে তুমি না ঘুমিয়ে এখানে বসে আছো যে।”
“ঘুম আসছে না তাই।”
আরশাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশের চেয়ারে বসে। মেয়েটা আজ খোঁপা করেনি। চুল ছেড়ে রেখেছে। আরশাদের পছন্দ বলে? নাকি এমনিতেই?

“গল্প করবে?”
“আপনি চাইলে করবো।”
“তুমি না চাইলে থাক।”
“আপনার ক্যাফেইন লাগবে? কফি এনে দিই?”
“দরকার নেই। তুমি থাকলেই হবে।”
ইরা ঝট করে তাকায় আরশাদের দিকে। আরশাদ ততক্ষণে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরাচ্ছে। ইরা নাক কুঁচকায়। সিগারেটের গন্ধ নিতে পারেনা সে।

“ধূমপান করা ভালো না।”
“করলে কি হবে?”
“আপনার সিগারেটের প্যাকেটের গায়েই লেখা আছে দেখুন। ধূমপান ক্যান্সার ঘটায়।”
“হলো নাহয় ক্যান্সার। এক জীবনে এতো সুখ দিয়ে কি হবে? কিছু অসুখ থাকুক।”
“খুব সুখ পেয়েছেন বুঝি?”
“কিছু পেয়েছি কিছু পাইনি। কিছু সুখের অপেক্ষায় আছি। পেয়ে গেলে আর কিছুর আফসোস থাকবে না।”
ইরা মুচকি হাসে, কিছু বলেনা।

দু’জনের মধ্যে নিস্তব্ধতা। ইরা গন্ধ সহ্য করতে পারছে না আবার উঠে চলেও যেতে পারছে না। ভালো বিপদ হলো তো!

আরশাদ আন্দাজ করতে পেরে আধখাওয়া সিগারেটটা ফেলে দেয়। ইরা এক ঝলক তাকায় তার দিকে।

“ফেলে দিলেন যে।”
“তোমার কষ্ট হচ্ছে, তাই।”
“আর ধরিয়েছিলেন কেনো? নিজের কষ্ট হচ্ছে তাই?”
আরশাদ ভ্রু কুঁচকে তাকায় ইরার দিকে। ইরা নির্বিকার ভাবে বসে থাকে।

“তার মানে?”
“কারো স্মৃতি ভুলতে হয়তো ধরিয়েছিলেন। আমাকে দেখতে বোকা মনে হলেও আমি আসলে বোকা নই। আমি অনেক কিছু বুঝতে পারি।”
আরশাদ কি মনে করে হেসে দেয়। ইরা চোখ সরিয়ে নিতে যেয়েও পারেনা। প্রতিবার এই হাসির মায়ায় জড়িয়ে যাচ্ছে সে। এই মায়া যখন অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাবে তখন কষ্ট বাড়বে। ইচ্ছা করে এই লোকটা তাকে কষ্ট দিচ্ছে। কিন্তু কেনো? কি লাভ তার এতে?

“তোমাকে বোকা মনে হয়না ইরা, তুমি বুদ্ধিমতী। আই অ্যাম ইমপ্রেসড! তবে কি জানো? বুদ্ধিমানরাও ভুল করে। সবসময় তারা যা ভাবে তা সঠিক হয়না।”
“তাহলে আপনি মানছেন আমি বুদ্ধিমতী। তাহলে তো আপনার কোনোদিন আমাকে পছন্দ হবে না।”
“তা কেনো?”
“কারণ পুরুষ প্রেমিকা হিসেবে বুদ্ধিমতী মেয়ে খুঁজলেও স্ত্রী হিসেবে চায় নিরেট মাথার, বোকা, অথর্ব নারী। এটি পুরুষের চিরাচরিত স্বভাব।”
আরশাদ ঠোঁট কামড়ে হেসে বললো,”তাহলে প্রেমিকা হিসেবে পছন্দ করবো?”
ইরার বুকটা ঈষৎ কেঁপে ওঠে। উঠে দাঁড়ায় সাথে সাথে। ওড়নার নিচে থাকা কাগজগুলো শক্ত করে চেপে ঘরে চলে আসে। আলমারিতে নিজের ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় সাথে সাথে।
আরশাদ কিছুক্ষণ পরেই ঘরে আসে। ইরা বিছানায় বসে পা নাড়াচ্ছে তখন।

“ঘুম আসছে এখন?”
“আসতেও পারে। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। কিছু চাইলে বলুন, এনে দিচ্ছি। সিগারেট ধরাতে চাইলে ধরাতে পারেন। আমি নাহয় বারান্দায় যেয়ে বসবো। আপনার হয়ে গেলে তারপর আসবো।”
“আমার কষ্ট ভোলাতে চাচ্ছো?”
“জি চাচ্ছি। নিশ্চয়ই তা অন্যায় নয়।”
“না তা নয়, তবে আরো অনেক উপায় আছে কষ্ট ভোলানোর।”
ইরা কোলবালিশটা মাঝে রাখে।

“সীমানার ওদিকে থাকবেন, এদিকে আসবেন না। অসুবিধা হলে বলুন আমি মেঝেতে ঘুমাবো।”
“সীমানা? যুদ্ধ করবে নাকি?”
“যুদ্ধের চেয়েও কম নয়। সীমানার কারণ যাতে আপনার অকারণ ছুঁয়ে দেওয়ার বাহানা আর না হয়। ভালোবাসা ছাড়া এ স্পর্শ পশুপাখির ন্যায়। সৃষ্টির সেরা জীব হয়ে পশুপাখিকে অনুকরণ করবেন?”
এই বলে ইরা পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে।

বিছানায় হেলান দিয়ে তার কথাগুলো মনে মনে পুনরাবৃত্তি করে আরশাদ। মেয়েটা জানে কখন কোন মোক্ষম অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়। আরশাদের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টু হাসি ফুটে ওঠে।

“বেশ দেখি এবার সৃষ্টির সেরা জীবের মতোই ভালোবাসা যায় কিনা…..”

আরশাদ ফিসফিস করে বলে, নাহলে ইরা শুনে নিতো। কারণ সে এখনো ঘুমায়নি। তার মধ্যকার বাঁধনহারা ভালোবাসার জোয়ার টের পাচ্ছে সে। কিন্তু আগে থেকে নয়। ওপাশ থেকে ধরা দিলে তবেই সে সাড়া দিবে, এর আগে নয়, একদমই নয়।

(চলবে….)