Home "ধারাবাহিক গল্প মন কেমনের মরশুম মন কেমনের মরশুম পর্ব-১১+১২

মন কেমনের মরশুম পর্ব-১১+১২

0
367

#মন_কেমনের মরশুম

পর্ব: ১১

“কোথায় গিয়েছিলে নীলু মা?”
প্রবল বেগে ঘরে ঢোকার মুখে থমকে যায় নীলু। বসার ঘরের সোফায় বসে পত্রিকা পড়ছে তার বাবা। নীলু দাঁড়িয়ে যায় কিন্তু উত্তর দেয়না।

নিজাম হোসেন পত্রিকা রেখে উঠে আসে মেয়ের কাছে। নীলুর একদম মুখোমুখি দাঁড়ায় সে।
“কি হলো মা? কিছু জিজ্ঞেস করছি তো।”
নীলু তবুও চুপ। তাকে বিধ্বস্ত লাগছে, মনে হচ্ছে একটা ঝড় বয়ে গেছে তার উপর থেকে।

নিজাম হোসেন মেয়ের আপাদমস্তক দেখে।
“তুমি কি তোমার বড় খালার বাড়িতে গিয়েছিলে?”
নীলু আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে।
“এভাবে সেজে গিয়েছিলে? ও বাড়িতে কি কোনো অনুষ্ঠান ছিলো?”
“না।”
“তাহলে?”
“এমনিতেই গিয়েছিলাম, ইচ্ছা করছিলো তাই।”
“কি ইচ্ছা করছিলো? আরশাদের সাথে দেখা করতে?”
নীলু ঝট করে বাবার দিকে তাকায়। অসম্ভব শান্ত হয়ে আছে বাবার মুখটা কিন্তু স্পষ্ট চাপা রাগ।

“নীলু আরশাদের স্ত্রী কোথায় ছিলো?”
“বাড়িতেই ছিলো, আর কোথায় থাকবে?”
“তুমি কি বুঝতে পারছো তুমি কতোটা জঘন্য একটা কাজ করে ফেলেছো আজকে? বুঝতে পারছো?”
বাবার গলার উত্তাপ টের পায় নীলু, হালকা কেঁপে ওঠে সে।

“বিয়েটা যেভাবেই হোক, মেয়েটা এখন আরশাদের স্ত্রী। মেয়েরা আর সব কিছু পারলেও স্বামীর পাশে নিজের ছায়াকেও হিংসা করে। সেখানে তুমি এইভাবে…
ছিহ আমার লজ্জা করছে। তোমার কারণে আমার মাথা নিচু হয়ে গেলো আজকে। এই শিক্ষা দিয়েছি আমি তোমাকে?”
নিজাম হোসেন হালকা চিৎকার করে ওঠে। নীলু ঠোঁট কামড়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত বাবাও তাকে ভুল বুঝলো?

“তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেয়েছে নীলু। আমি হতবাক হয়ে যাচ্ছি তোমার এই আচরণে। কি বলবো ভেবে পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে আমি নিজেই আর কোনোদিন আরশাদের সামনে দাঁড়াতে পারবো না। তুমি নিজেকে ছোট করার পাশাপাশি আমাকেও আজ ছোট করে দিলে।”
“বাবা আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি ভুল করে ফেলেছি।”
নিজাম হোসেন অন্যদিকে তাকায়। কণ্ঠ কাঁপছে তার।

“বাবা আমি বুঝতে পারিনি এমন কিছু হয়ে যাবে। বিশ্বাস করো আমি শুধুমাত্র ওর সাথে দেখা করতেই গিয়েছিলাম ও বাড়িতে। হঠাৎ ওর সামনে আমার কি হলো আমি জানিনা। ওর স্ত্রীর প্রতি ওর ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, আমার প্রতি নির্লিপ্ততা দেখে আমি সহ্য করতে পারিনি। আমি অনেক বড় একটা ভুল করে ফেলেছি বাবা।”
“তুমি ভুল না, তুমি অন্যায় করে ফেলেছো। ভুলের ক্ষমা হয়, অন্যায়ের হয়না।”
নীলু মাথা নিচু করেই আঙ্গুলে শাড়ির আঁচল পেঁচাতে থাকে। মাথাটা ছিঁড়ে পড়ছে যন্ত্রণায়। অসহ্য লাগছে সবকিছু।

“ক্ষমা আমার কাছে নয়, তুমি আরশাদ আর তার স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাইবে। আর কথা দিতে হবে এই অন্যায় আর কোনোদিন করবে না তুমি। যদি করো সেদিন আমি ভুলে যাবো আমার একটা মেয়ে আছে।”
নিজাম হোসেন ভেবেছিলো এমন কথা শুনে নীলু রেগে যাবে, চিৎকার করে উঠবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে নীলু তার দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসে। নিজাম হোসেনের বুকের নিচটায় যন্ত্রণা করে ওঠে। এই মেয়ে ছাড়া তার আছেই বা কি? সেই মেয়েকে কিনা আজ এভাবে বলতে হলো তাকে?

“আর কি করতে হবে বাবা? পা ধরে ক্ষমা চাইবো?”
“সাধারণ ভাবে ক্ষমা চাইলেই হবে, পা ধরার প্রয়োজন দেখছি না।”
“এখনই যাবো? ক্ষমা চেয়ে আসি।”
নিজাম মেয়ের দুই কাঁধে আলতো করে হাত রাখে। নীলু ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়েই।

“না, এখন যেতে হবে না। সেদিন তুমি আরশাদের সামনে যাবে যেদিন ওর সামনে গেলে তোমার কোনো অনুভূতি জন্মাবে না ওর জন্য। ও ওর স্ত্রীকে ভালোবাসুক বা দায়িত্ববোধ যা-ই দেখাক, তোমার খারাপ লাগবে না। তোমার উপর নির্লিপ্ততা দেখালেও তোমার কিছু আসবে যাবে না। বরং তুমি নিজেই নির্লিপ্ত হয়ে যাবে ওর প্রতি। সেদিন তুমি ওর সামনে যাবে আর আজকের এই আচরণের জন্য ক্ষমা চাইবে। এর আগ পর্যন্ত তুমি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত কোনোভাবেই ওর সামনে যাবে না। মনে থাকবে?”
নীলু মাথা নেড়ে বললো,”থাকবে বাবা। খুব মনে থাকবে।”
নিজাম হোসেন মেয়ের মাথায় হাত রাখে। নীলু ভাবলেশহীন ভাবে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে।

“দেখো আকাশ কালো হয়ে এসেছে কেমন। অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামবে। ভিজবে নীলু? চলো আজ বাপ বেটি মিলে বৃষ্টি বিলাশ করি।”
“আমি এখন ঘুমাবো বাবা, আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। আমাকে দয়া করে ডাকবে না। আমার একটা লম্বা ঘুম দরকার। আমি বেশ কয়েক রাত ঘুমাইনা। আজ আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।”
নিজাম হোসেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,”বেশ তুমি ঘুমাও, আমি তোমাকে ডাকবো না।”
নীলু ছন্দহীন কবিতার মতো এগিয়ে যায় নিজের ঘরের দিকে। চোখে ঘুম টলমল করছে। আশ্চর্য হঠাৎ এতো ঘুম পাচ্ছে কেনো তার?

সন্ধ্যার পর পর ঘুম ভেঙে যায় আরশাদের। হুড়মুড় করে বিছানায় উঠে বসে। কানে হেডফোন নিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলো সে। নিজেই বুঝতে পারেনি কখন ঘুমিয়ে গেলো। উঠে দেখে প্রকৃতিতে আঁধার ঘনিয়ে এসেছে। সে এতোটা ঘুমিয়েছে? আশ্চর্য। কেউ তাকে ডাকেওনি একবার?
ইরা? ইরা কোথায়?
বিছানা ছেড়ে তড়িৎবেগে নেমে দাঁড়ায় সে। খুঁজতে হয়না, বারান্দাতেই পেয়ে যায় কাঙ্ক্ষিত রমনীকে। চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে বসে পা নাড়ছে মৃদু তালে।
হঠাৎ আরশাদের বুকটা কেমন করে এই স্বল্পপরিচিতাটির জন্য, কেমন একটা অন্যরকম অনুভূতি হয়। মনে একটা ছোট্ট জীবন এই মেয়েটার সান্নিধ্যে কাটিয়ে দিতে পারলে মন্দ হয়না। এই দূর দ্বীপের বাসিনীকে ভালোবাসলে কি খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে?
ভ্রমের একটা পঙক্তি মনে পড়ে তার, অনেক আগে শুনেছিলো।

‘ঘৃণা করিতে সময় লাগে, ভালোবাসিতে সময় লাগেনা। কিন্তু সেই ঘৃণা প্রমাণ করতে এক স্বল্প মুহুর্তই যথেষ্ট। আর ভালোবাসা প্রমাণ করিতে সারা জনম কেটে যায়, তবু শতভাগ প্রমাণ করা যায়না।”

কথাটার মর্মার্থ তখন না বুঝলেও আরশাদের মন বলে কথাটা যেনো এখন তারই উপলব্ধি। নীলুর প্রেমে সে সত্যিই পড়েছিলো এক সময়, কিন্তু কোনো এক কারণে তার উপর থেকে মন উঠে যেতে একটুও সময় লাগেনি তার। কিন্তু তার বিয়ে করা স্ত্রী, যে কিনা সম্পূর্ণ বৈধ তার কাছে তাকে ভালোবাসতে তার সময় লাগছে। নীলুর প্রতি ঘৃণাটা সে স্বল্প মুহুর্তেই প্রমাণ করে দিলো। যদি তা না হবে তাহলে আজ এতোটা রুক্ষ হয়ে যেতে পারতো না সে। কিন্তু ইরার প্রতি তার ভালোবাসা প্রমাণ করতে সত্যিই বুঝি জনম পেরিয়ে যাবে তার, তবু শতভাগ প্রমাণ করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। ভ্রমর এই কথাগুলো কীভাবে লেখে? এ যে মানবজীবনে মানবজীবনের ধ্রুব সত্য।

“ইরা।”
ইরা নড়েচড়ে বসে, একটা বার আরশাদের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয় সে।
“তুমি আমাকে ডাকোনি কেনো?”
“আপনি তো আমাকে ডাকতে বলেননি।”
আরশাদ কিছুটা নরম গলায় বললো,”কখন থেকে বসে আছো এখানে?”
“যখন থেকে আপনি বলেছেন আপনার সামনে থেকে দূর হয়ে যেতে, তখন থেকেই।”
আরশাদের হৃদয়টা অবসাদে ছেয়ে যায়। দুপুর থেকে মেয়েটা এখানে বসে আছে আর সে পড়ে পড়ে ঘুমিয়েছে? এতোটা কাপুরুষতা কবে থেকে ভর করলো তাকে?

আরশাদ চেয়ার টেনে ইরার পাশে বসে, ইরার মধ্যে কোনো ভাবান্তর হয়না তাতে।
“ইরা আমাকে ক্ষমা করে দাও।”
“আপনি কোনো অন্যায় করেননি যে ক্ষমা চাইবেন। তাছাড়া আমি বিড়াল-কুকুর শ্রেণীর একজন মানুষ। আমি ক্ষমা করার কে?”
“এসব কি বলছো? বিড়াল-কুকুর শ্রেণীর মানুষ মানে?”
“ও কিছু না। আপনার কিছু লাগবে? এনে দিতে হবে?”
“যদি বলি তোমাকে লাগবে?”
ইরা হকচকিয়ে আরশাদের দিকে তাকায়। সারাদিন মেঘলা হয়ে থাকলেও এক ফোঁটা বৃষ্টি নামেনি। এখনো আকাশ ঢেকে আছে ঘন মেঘে। চাঁদের আলো নেই। আলো বলতে দূর থেকে আসা স্ট্রিট লাইটের নিয়ন আলো। সেই আবছা আলো-আঁধারিতে আরশাদকে মাতাল মাতাল লাগে।

“শোনো ইরা, যেটা তোমার সেইটা তোমারই। ভিতরে যা হোক, বাইরের কারো সামনে নিজেকে এতোটা মহৎ প্রমাণ করার দায় তোমার নয়। আমি কি বলতে চাচ্ছি বুঝতে পারছো?”
ইরা স্মিত হেসে বললো,”আপনি কি আমার?”
হঠাৎ ইরার এমন প্রশ্নে বেশ অবাক হয়ে যায় আরশাদ। ভাবতেই পারেনি ইরা এমন কিছু অবলীলায় বলতে পারে।

“ইরা…”
“আপনার কাছে উত্তর নেই। কারণ আপনি দায়িত্বের চাপে পড়ে যতো যা-ই প্রমাণ করতে যান, আপনি নিজেই জানেন আপনি আমাকে ভালোবাসেননা। স্ত্রী হিসেবে মেনেও নিতে পারেননি পুরোপুরি। আমার সাথে এই ঠাট্টাগুলো করেন নিতান্তই আমাকে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। এবার বলুন কোনটা আমার? এই সংসার আমার? নাকি আপনি আমার?”
আরশাদ অনেক কিছু বলতে চায় কিন্তু বলতে ইচ্ছা করেনা। কেমন ক্লান্তি অনুভব করে।

“নীলু আপা আপনাকে না পেয়েও যতোটা অধিকার দেখাতে পারে, আমি আপনাকে পেয়েও তা দেখাতে পারিনা। কারণটা আমার চেয়ে আপনি ভালো জানেন। কারণ আপনি নিজেই আমাকে সে অধিকার দেননি।”
ইরা থামে। তার ভেজা কণ্ঠ কর্ণকুহর হতে সোজা মস্তিষ্কে আঘাত হানে আরশাদের।

“বেশ, সব অপারগতা আমার। তুমি বলো তো, তুমি আমাকে তোমার হতে অধিকার দিয়েছো?”
ইরা আবারও চমকায়। এই কথার মানে কি?

“প্রতি মুহুর্তে এটাই ভাবছো আমি নীলুকে না পেয়ে অসুখী। আচ্ছা তুমি একটা কথা বলো তো, আমি যদি সত্যিই ওকে ভালোবাসতাম আমি কি এই বিয়েটা করতে পারতাম? আমার ভালোবাসা এতোই ঠুনকো? আমি গল্পের নায়ক নই ইরা যার কাছে ভালোবাসার চেয়ে দায়িত্ব বড়। আমি যে গল্পের ভিলেন চরিত্র, যে ভালোবাসার জন্য দুনিয়া জ্বালিয়ে দিতে পারে।”
ইরা জবুথবু হয়ে বসে থাকে। কি বলবে ভেবে পায়না।

উত্তরে শীতল হাওয়া ছেড়েছে। সারাদিনের গুমোট ভাব কেটে বোধহয় এবার সত্যিই ধারা নামবে। ঠান্ডা পরশ বুলিয়ে যাবে প্রকৃতির বুকে। হয়তো কিছু অতৃপ্ত মানব-মানবীর হৃদয়েও।

“বৃষ্টিতে ভিজবে ইরা?”
“এখন?”
“হুম। খুব ইচ্ছা করছে।”
“ঠান্ডা লাগবে তো, জ্বর আসবে আপনার।”
“জ্বর আসলে ওষুধ আছে, ডাক্তার আছে। কিন্তু মনের পীড়া সারানোর কোনো ওষুধ নেই। যাবে?”
ইরা কিছুক্ষণ ভেবে আস্তে করে বললো,”চলুন।”
আরশাদ ছোট্ট করে হাসে। সময় এসে দূরত্বটুকু আস্তে আস্তে কমিয়ে দেওয়ার। দু’জনের সব অভিযোগ মিটিয়ে নেওয়ার। সময় লাগুক, তবুও প্রেম বাড়ুক। ক্ষতি আছে?

ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। ঝমঝম শব্দে কান পাতাই যেনো দায়। এই মরশুমে এখনো এমন পাগলপারা ধারা নামেনি। মেঘ নিংড়ে অজস্র প্লাবন বয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির বুকে। আশপাশের সবকিছু ঝাপসা লাগে এই ধারায়।

ছাদের এক কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইরা। ওড়নাটা ভিজে লেপ্টে আছে শরীরের সাথে। ইরা ভালো করে পেঁচিয়ে দেয় ওটা শরীরের সাথে যেনো লজ্জায় পড়তে না হয় আবার।

আরশাদ ছাদের মাঝে পা ছড়িয়ে বসেছে। তার চুল, কপাল বেয়ে পানি পড়ছে অবিরত। মনে হচ্ছে ভিতরের সব যন্ত্রণা পানিতে বেয়ে পড়ছে। চুল ঝাঁকিয়ে এলোমেলো করে দেয়। ভীষণ উপভোগ করছে সে আজকের রাতটা।

হঠাৎ দূরে অপ্রস্তুত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা ইরার দিকে চোখে যেতেই উঠে দাঁড়ায় সে। ইরা ওড়নাটা আরো ভালো করে পেঁচিয়ে নেয়।

“এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেনো এভাবে? ভালো লাগছে না?”
“লাগছে।”
“ওদিকটায় এসো। দেখো মেঘের ফাঁকা দিয়ে চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। মনে হচ্ছে চন্দ্রের শরীর বেয়ে তরল জ্যোৎস্না মাটিতে পড়ছে।”
ইরা নড়ে না, সুতির জামা শরীরে আটকে আছে যেনো ভিজে। এই অবস্থায় সে হাঁটতে চাচ্ছে না।

“ইরা অনুমতি দিলে তোমার হাতটা ধরি?”
ইরা কিছু বলেনা।
“নীরবতাই সম্মতির লক্ষণ ধরে নিবো?”
“আপনার ইচ্ছা।”
আরশাদ ইরার বাম হাতটা চেপে ধরতেই আচমকা আর্তনাদ করে ওঠে ইরা। আরশাদ দ্রুতই হাত ছেড়ে দেয়।

“কি হয়েছে?”
ইরার মনেই ছিলো না দুপুরের সেই পোড়ার ক্ষতের কথা। ওষুধ না লাগানোয় দগদগে হয়ে আছে এখন। কালচে হয়ে গোল দাগ বাম হাতে তার।

আরশাদ হতভম্ব হয়ে তাকায় সেদিকে।
“কি হয়েছে ইরা? এই দাগ কীভাবে হলো?”
“জানিনা।”
“জানিনা মানে? এটা তো পোড়ার দাগ কখন, কীভাবে পুড়েছে? আমাকে জানাওনি কেনো?”
আরশাদের অস্থিরতা ইরার হৃদয় কোমল করে দেয়। তার জন্য এভাবে কেউ কোনোদিন অস্থির হয়নি। এর আগে তো কতো পুড়েছে, কেটেছে। কেউ এমন করেনি তো তার জন্য।

“কি হলো কি? চুপ করে আছো কেনো? আগে কেনো বলোনি? ওষুধ লাগানোর কথা মাথায় আসেনি? মাথা নিরেট তোমার?”
“এটুকুতে কিছু হবে না আমার৷ ঠিক হয়ে যাবে নিজে থেকেই। আমার অভ্যাস আছে।”
আরশাদ চোখ বন্ধ করে নিজের রাগ সামলায়। এইটুকু বয়সে মেয়েটার এতো পাকামো একদম ভালো লাগে না তার।

হঠাৎ ইরার অন্য হাতের কবজি চেপে তার মুখোমুখি দাঁড়ায় আরশাদ।

“আগে যা অভ্যাস ছিলো আমি জানতে চাইনা। সব অভ্যাস পালটে ফেলো। তুমি এখন তোমার বাবার মেয়ে না, তুমি এখন তোমার স্বামীর স্ত্রী।”
ইরা হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বললো,”স্বামী আগে নিজেকে প্রমাণ করুক, এরপর ভেবে দেখবো।”
“কি প্রমাণ চাও?”
“নিজে থেকে উত্তর খুঁজে বের করুন। আমি বলতে যাবো কেনো?”
আরশাদ মুচকি হেসে বললো,”বেশ, তবে তাই হোক।”
ইরাকে টানতে টানতে ছাদের মাঝে নিয়ে আসে আরশাদ। ইরা আরো গুটিয়ে যায়। কোণার দিকে আলো একটু কম ছিলো। এখানে বেশ স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে সব।
নিজের দিকে তাকাতেই ভয়টা জোরালো হয়। জামাকাপড় ভিজে চুপসে আছে। লজ্জায় মাথা তোলেনা সে। কোন কুক্ষণে যে এই লোকের কথায় বৃষ্টিতে ভিজতে রাজি হলো সে। গতকালই তো প্রতিজ্ঞা করলো, দুষ্টু লোকের মিষ্টি কথায় আর ভুলবে না সে। আজই আবার ভুলে গেলো। এতোটা বেহায়া কবে হলো সে? নিজেকে ধিক্কার জানাতে জানাতে ভাষাও ফুরিয়েছে তার।

“আমি চন্দ্রপ্রভার ন্যায় উজ্জ্বল, আমি ভোরের নিস্তব্ধতায় প্রকৃতির গুঞ্জন। আমি সৃষ্টির উল্লাস, আমি মেঘনাদের দীর্ঘশ্বাস। সহস্র কণ্টক পথ আমার মনন জুড়ে করে হাসে, ভূমিকম্পে বাস ভ্রমরের প্রহর আলোর শেষে।”
আরশাদ থামতেই ভয়াবহ ভাবে চমকে উঠে ছিটকে পিছিয়ে যায় ইরা। কিছুক্ষণের জন্য শ্বাস নিতে ভুলে গেছে সে। ঠোঁট কাঁপতে থাকে তার ভীষণ ভাবে। সেদিক আরশাদের অবাধ্য নজর যেতেই সে ভাবে বোধহয় ঠান্ডা লাগছে ইরার।

“এটা….?”
ইরার ধারণা তার লুকিয়ে রাখা কাগজপত্রের সন্ধান পেয়েছে আরশাদ। রাগে বিষিয়ে ওঠে তার শরীর। তার একান্ত গোপন জিনিসে না বলে কীভাবে হাত দিলো উনি?

কিন্তু স্তম্ভিত ইরাকে অবাক করে দিয়ে আরশাদ বললো,”এতো সুন্দর লেখা আবার আমার ভেবো না। এটা ভ্রমর নামক এক ব্যক্তির লেখা। আমি তার লেখার একজন বড়সড় ভক্ত। বলতে পারো এই লেখাগুলো আমার তীব্র খরা হৃদয়ের মাঝে এক পশলা শীতল বৃষ্টি। আমি অনেক আগে থেকেই শুনি। তুমি শুনতে চাও? এ পর্যন্ত উনার লেখা সবগুলো পঙক্তি আমার মুখস্ত।”
ইরার ঘোর কাটে না। নিজের কানকেও যেনো বিশ্বাস করতে পারে না সে। এটা সত্যি? আরশাদের একরাশ মুগ্ধতা ভ্রমরকে ঘিরে?

“আমার খুব ইচ্ছা এই ভ্রমরকে এক নজর দেখার। কি এমন আছে তার কলমে? এতো শক্তিশালী কীভাবে হতে পারে?”
ইরা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। শরীর কাঁপছে তার ভয়াবহ। আরশাদ যদি জানতে পারে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই অতি সাধারণ রমনীটিই ভ্রমর, সে কীভাবে হজম করবে বিষয়টা? সে কি ইরাকে ইরার মতো করে ভালোবাসবে নাকি ইরার মধ্যে থাকা ভ্রমরকে ভালোবাসবে? ইরা ঠিক করে সে ধরা দিবে না নিজে থেকে, কোনোদিন না।

হঠাৎ কথা থামিয়ে আরশাদ ইরার দিকে তাকায়। ইরাকে অপ্রস্তুত লাগছে ভীষণ। জামা, ওড়না কীভাবে চেপে রেখেছে। তার শরীরের প্রতিটা খাঁজ উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছে যেনো কাপড়ের নিচ থেকেই। আরশাদ নিজের প্রবল আদিম বাসনাকে সামলায়। তার কাছে বৈধতা আছে, অধিকার আছে, কারণ আছে।
তবুও কিছু একটা নেই। আর তা না হওয়া পর্যন্ত সে কোনো সুযোগ নিতে চায়না।

“নিচে যাবে?”
“আর ভিজতে চাননা?”
“আরো কিছুক্ষণ এখানে থাকলে শুধু শরীরটা, হৃদয় ভিজে যাবে। শরীরের অসুখ সারলেও, হৃদয়ের অসুখ সারবে না। তাই আর থাকবো না।”
“চলুন তাহলে।”
“সিঁড়িঘরে অপেক্ষা করো, আমি আসছি।”

আরশাদ ইরাকে দাঁড় করিয়ে রেখে দ্রুত নিচে চলে যায়, ফিরে আসে দুই মিনিট পরেই। তার হাতে তার একটা শার্ট।

“এটা শরীরের উপর দাও। আর কতোক্ষণ এই ভেজা কাপড় এভাবে যখের ধনের মতো আঁকড়ে রাখবে?”
ইরা পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকায় আরশাদের দিকে। নিঃসন্দেহে এই মানুষটা একটা সুপুরুষ, সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই৷ ঠিক ওই সময় ইরা বুঝতে পারে নীলু আসলে আরশাদের সুদর্শন রূপের নয়, আরশাদের সুপুরুষ সত্ত্বাকে ভালোবেসেছে। এজন্যই তার পাগলামির সীমা আকাশ ছুঁয়েছে।

“কি হলো? ধরো।”
ইরা কিছুটা ইতস্তত করে শার্টটা হাতে নেয়। শরীরের উপর মেলে ধরে। শার্টে লেগে থাকা এক মাদকতায় ভরা ঘ্রাণ ইরার মস্তিষ্কে আটকে যায়। কোনোভাবেই বের করতে পারেনা মাথা থেকে।

“সাবধানে এসো।”
আরশাদ আগে নেমে যায়। পিছনে গুটি গুটি পায়ে ইরা। তার অবাধ্য চোখ বারবার আটকে যাচ্ছে তার সামনে পর্বতের ন্যায় মানুষটার সিক্ত শরীরের দিকে। সে কি নিজেকে ভাগ্যবতী বলবে নাকি দুর্ভাগা? আসল ভাগ্যবতী তো সে নয়, ভ্রমর। এই মানুষটা যে তাকে না দেখেই তার প্রতি মুগ্ধ হয়েছে….

(চলবে….)

#মন_কেমনের মরশুম

পর্ব: ১২

ভেজা কাপড় পালটে নিয়েছে ইরা। খাটে পা তুলে বসে আছে সে। আরশাদ খুব মনোযোগ দিয়ে তার হাতের পোড়া জায়গায় ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছে। ইরা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করছে। তবে তার ঘোর এখনো কাটছে না। বিশ্বাস করতে পারছে না, এই মানুষটা না জেনেই তার অন্য এক সত্ত্বাতে মুগ্ধ হয়েছে। এ যে নেহাৎ কাকতালীয় আর বিস্ময়কর ব্যাপার।

“একটা কথা বলবো?”
“হু।”
ইরা কিছুটা ইতস্তত করে বললো,”একটু আগে আপনি একজনের লেখার খুব প্রশংসা করছিলেন।”
আরশাদের মুখে রেখাগুলো কোমল হয়ে ওঠে। ইরা তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকে সেদিকে।

“তোমার পছন্দ হয়েছে তাইনা? আমি জানতাম হবে। আসলে উনার লেখার সৌন্দর্যটাই এখানে। কেউ একবার শুনলে উনার ভক্ত হয়ে যায়।”
ইরা জোর করে একটু হাসার চেষ্টা করে।

“তোমাকে আমি আরো অনেক লেখা শোনাবো উনার। দেখবে জীবনের কোথাও না কোথাও কোনো একটা লেখা ঠিক মিলে যাবে। সেদিন তুমি অবাক হয়ে ভাববে, লেখিকা কীভাবে জানতেন এটা? এটাই একজন শক্তিশালী লেখকের ক্ষমতা।”
“হ্যা তা বটে।”
দুইজনই চুপচাপ হয়ে যায়। আরশাদ ওষুধ লাগানো শেষ করে ইরার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে হাসে।

“চুলটা মুছে নাও, ঠান্ডা লেগে যাবে।”
ইরা ক্ষীণ গলায় বললো,”একটা কথা জিজ্ঞাসা করি?”
“করো।”
ইরা ভণিতা ছাড়াই বললো,”আপনি কি ওই লেখিকাকে পছন্দ করেন? মানে ঠিক লেখিকা হিসেবে নয়, একটু অন্যরকম পছন্দ?”
প্রশ্নটা করেই ইরা শ্বাস বন্ধ করে বসে থাকে। ধুর! এটা কি হলো। অধিক কৌতুহলী হয়ে এসব কি বলে ফেললো সে? এতো কৌতুহল দেখে আরশাদ যদি এবার সন্দেহ করে? তার মাথা বোধহয় মাঝে মাঝে বুদ্ধিশূন্য হয়ে যায়।

কিন্তু আরশাদ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে হুট করে হেসে দেয়, বেশ শব্দ করেই।

ইরা ভ্রু কুঁচকে বললো,”হাসছেন কেনো? হাসির মতো কি বললাম?”
“ইরা তুমি আমাকে কি ভাবো বলো তো? লেডিকিলার রোমিও? নাকি হাজারও লাইলীর একমাত্র মজনু?”
ইরা উত্তর দেয়না।

“নীলুর সাথের সম্পর্ক নিয়ে কি না কি ভেবে বসে আছো, এখনো সেই ভাবনা থেকে বের হতে পারোনি। এখন আবার…”
আরশাদ হাসতে হাসতে বিছানায় আধশোয়া হয়ে যায়। ইরার ভারী রাগ হয়। বলেছে নাহয় বলেছে, তাই বলে এতো হাসতে হবে কেনো?

“কেনো? প্রেমে পড়া কি অন্যায়? অপরাধ?”
আরশাদ বিছানায় শুয়ে পড়ে, মাথার নিচে দুই হাত দিয়ে ইরার দিকে তাকায়।

“না প্রেমে পড়া অন্যায় বা অপরাধ কিছুই না। কিন্তু তাই বলে আমার চরিত্রকে এতোটাও নিচে নামিয়ে দিও না যে তোমার মাথায় এমন ভাবনা আসে যে আমি যত্রতত্র আমার প্রেম বিলিয়ে বেড়াই।”
ইরা কপালের সামনে আসা কিছু অবাধ্য চুল কানের পিছনে গুঁজে দেয়। তা-ও ভালো, কথাটার মানে আরশাদ অন্যভাবে নিয়েছে, কিছু সন্দেহ করেনি।

হঠাৎ আরশাদ উঠে বসে। ইরার মুখোমুখি হয়ে বসে তার দিকে তাকায়।

“আচ্ছা ইরা তুমি গল্পের বই পড়তে পছন্দ করো?”
“আমার নিজের মা অনেক বই পড়তেন। উনার নিজস্ব পড়াশোনা বেশিদূর ছিলো না কিন্তু গল্পের বইয়ের পোকা ছিলেন। উনার সংগ্রহে অনেক বই ছিলো। মায়ের বই থেকেই মাঝে মাঝে পড়া হতো। মা মারা যাওয়ার পর সেভাবে পড়তে পারিনি। কারণ আমার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী মায়ের সব বই ফেলে দিয়েছিলো।”
আরশাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,”আচ্ছা যাই হোক, এখন বলো তোমার পছন্দের বই কোনটি ছিলো? সেখানে কোনো পুরুষ চরিত্র ছিলো যাকে তোমার খুব পছন্দ ছিলো?”
ইরার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

“হ্যা মনে আছে, সমরেশ মজুমদারের আট কুঠুরি নয় দরজা পড়েছিলাম আমি অষ্টম শ্রেণিতে থাকতে। টানা তিনদিন ধরে পড়েছিলাম উপন্যাসটা। একদম নেশা ধরানো। বইটা শেষ হওয়ার পরেও অনেকগুলো দিন আমি সেই নেশা হতে বের হতে পারিনি। এতো জীবন্ত ছিলো বর্ণনা গুলো। আর হ্যা, বইতে বেশ কিছু পুরুষ চরিত্র ছিলো। সবাইকেই কম বেশি ভালো লাগতো। তবে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছিলো ডেভিডকে। একটা খ্রীস্টান বিপ্লবী, কম বয়সী তরুণ। যে কিনা আকাশলালের একটি সিদ্ধান্তের জন্য শত্রুদের হাতে মারা যায়। আমি অনেক কেঁদেছিলাম তখন ডেভিডের জন্য।”
“আচ্ছা কখনো কি তোমার মনে হয়েছে ডেভিডকে তোমার বিয়ে করা উচিত? সে তোমার স্বপ্নের পুরুষ? তার বাহুডোরে জনম জনম ধরে বন্দি হতে চেয়েছো কখনো?”
ইরা বেশ অবাক হয়ে আরশাদের দিকে তাকায়, চমকে ওঠে ভিতর ভিতর।

“কি হলো বলো?”
“একদমই না, সে উপন্যাসের চরিত্র। সে কি বাস্তবে আছে? আর বাস্তবে থাকলেও কখনোই এমনটা ভাবতাম না। সব ভালো লাগায় কি প্রেম থাকে? কাছে যাওয়ার টান থাকে? কিছু ভালো লাগায় তো শ্রদ্ধাও থাকে।”
আরশাদ হঠাৎ ইরার ওড়না টেনে নিজের ভেজা চুল মুছতে মুছতে বললো,”এটাই তোমাকে বোঝাতে চেয়েছি ইরা। এবার নিজেই নিজের প্রশ্নগুলোর উত্তর পেয়ে যাবে। সব ভালো লাগায় প্রেম থাকে না। কিছু ভালো লাগা দূর থেকে সুন্দর, অস্পর্শ্যতেই। কিছু মুগ্ধতা শ্রদ্ধারও হয়। যেমনটা তুমি বললে। ভ্রমর আমার তেমনই শ্রদ্ধার একজন মানুষ। আশা করি বুঝতে পেরেছো।”
ইরা কিছুটা লজ্জা পেয়ে যায়। সবকিছুতে অতিরিক্ত কৌতুহল তার আসলেই ভালো না। কিন্তু বুকের কোথাও তবু একটা ঈর্ষার জ্বালা ধরে। আরশাদ ইরাতেও এতোটা মুগ্ধ না যতোটা ভ্রমরে মুগ্ধ। কি আশ্চর্য! সে নিজেই নিজেকে ঈর্ষা করছে। তাও আবার এমন একজনের জন্য যাকে স্বামী হিসেবে না হলেও প্রেমিক হিসেবে একটু একটু করে ভালো লাগা কিংবা ভালোবাসা শুরু করেছে।

“ক্যাফেইন লাগবে আজ রাতে অনেক।”
“কফি বানিয়ে দিবো?”
“না। আজ আমি বানাই, তুমি খাও। আমার রান্নার হাত খুবই খারাপ। তবুও চেষ্টা করি। কি বলো?”
আরশাদ ইরার উত্তরের অপেক্ষা না করেই শিষ বাজাতে বাজাতে বেরিয়ে যায়। পকেটে সিগারেটের প্যাকেটটা আছে কিনা নিশ্চিত হয়ে নেয় আগে। ইরার যে সিগারেটের গন্ধে অসুবিধা হয় এটা বোধহয় বুঝতে পেরেছে সে।

আরশাদ চলে যাওয়ার পর ইরার অবাধ্য বেহায়া হাতটা ওড়নার কাছে চলে যায়৷ একটু আগে ওড়নার যে প্রান্ত দিয়ে আরশাদ নিজের চুল মুছেছিলো, সেই কোণাটা আলতো চেপে ধরে গালের সাথে। হয়তো ক্লান্তি অথবা হয়তো একরাশ ভালো লাগায় সিক্ত হয়ে যায় সে। কি এক অদৃশ্য মায়ায় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে যাচ্ছে সে। খেই হারাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ভুল বা অন্যায় কিনা জানেনা, শুধু জানে সে আর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। আরশাদকে সে কীভাবে বোঝাবে তার বাস্তবের মানুষটা কল্পনার ডেভিডের চেয়েও অনেক বেশি সাহসী আর সুপুরুষ?

মাঝরাতে হঠাৎ পানি তেষ্টা পাওয়ায় ঘর ছেড়ে বাইরে এসেছে ইরা। বসার ঘরের সোফায় কাউকে বসে থাকতে দেখে একটু অবাক হয় সে। এতো রাতে কে বসে থাকবে এখানে?

ইরা উঁকি দিয়ে দেখে আশা। তারচেয়েও বড় কথা আশা কাঁদছে খুব মৃদুস্বরে। মাঝে মাঝে নাক টানার আওয়াজ আসছে।
ইরা নিঃশব্দে আশার পাশে এসে দাঁড়াতেই ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে আশা। দাঁড়িয়ে পড়ে সাথে সাথে।

“তুমি এখানে?”
ইরা শান্ত গলায় বললো,”পানি খেতে এসেছিলাম, তেষ্টা পেয়েছে।”
আশা তাড়াতাড়ি করে চোখের পানি মুছে ফেলে। ইরা একবার ভাবে জিজ্ঞেস করবে কেনো কাঁদছিলো সে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের সিদ্ধান্ত পালটায়। সে চায় আশা যদি তাকে কিছু বলে তাহলে নিজে থেকেই বলুক।

ইরা যেভাবে এসেছিলো সেভাবেই চলে যেতে চায়।
হঠাৎ পেছন থেকে আশার ডাক শুনে দাঁড়িয়ে যায় সে।

“কিছু বলবে?”
“তোমার কি একটু সময় হবে? এই ধরো দশ মিনিট। নাহলে থাক…”
ইরা একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে বললো,”হবে। তবে আমাকে যদি সত্যিই কিছু বলতে চাও, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবটা বলবে। কিছু লুকিয়ে রাখা যাবেনা নিজের মধ্যে। আর যদি লুকাতে চাও তবে আমাকে কিছু বলোনা।”
আশা মাথা নিচু করে বললো,”বেশ, কিচ্ছু লুকাবো না।”

বসার ঘরে টিমটিমে একটা নীল আলোর বাতি জ্বলছে। ইরা আর আশা বসে আছে মুখোমুখি। সেই আলোয় আশাকে ভীষণ রহস্যময়ী দেখায়। তার ফর্সা গালের উপর পানি চিকচিক করছে।

“আশা প্রথমে আমাকে এটা বলো যে তুমি এই গোপন কথাগুলো এতো মানুষ রেখে আমাকে কেনো বলছো? আমাকে কেনোই বা এতোটা বিশ্বাস করছো? ক’দিন চেনো আমাকে তুমি? এই কথাগুলো তো তোমার মা বা অন্তত তোমার নীলু আপাকেও বলতে পারতে।”
“আমি অনেকবার চেষ্টা করেছি ওদের বলতে, পারিনি। কেনো পারিনি তাও তোমাকে বলবো। আর তোমাকেও আমি বলতাম না। কিন্তু আমার মনে হয়েছে তুমি সাধারণ কেই নও, একটু অন্যরকম। তুমি শুধুমাত্র তোমার কথার আঘাতেই একজনকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারো। আমি সেদিন তোমার চোখে যে আগুন দেখেছিলাম, স্যারও বোধহয় দেখেছিলো। সে ভয় পেয়েছে। এ ক’দিন সে পড়াতে এলেও কোনো অসভ্যতা করেনি। কিন্তু আমি জানি ও এতো সহজে থামবে না। ও বড় কোনো সর্বনাশ ঘটানোর পরিকল্পনায় আছে। ওকে যদি কেউ শাস্তি দিতে পারে, তা সে কেবল তুমিই পারবে। আর এজন্যই….”
ইরা হতভম্ব হয়ে বললো,”অসভ্যতা? সর্বনাশ? কি করেছে ও আসলে?”
আশা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। ইরা স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।

“আমি কলেজে ওঠার পর ওকে ঠিক করা হয়। আমি ইংরেজিতে একটু দূর্বল। মা’কে একজন বলেছিলো এই স্যার ভালো হবে। মা-ও ওকে ঠিক করলো আমাকে পড়ানোর জন্য। প্রথম কিছুদিন ভালোই ছিলো। সে আসলেই দুর্দান্ত পড়ায়। আমার ইংরেজি ভীতি বা ঘাটতি দুইটাই কমে যায় অনেকটা। কিন্তু একদিন….”
আশা পানি খায় এক গ্লাস, এক নিঃশ্বাসেই।

“একদিন কি?”
“একদিন দুপুরে মা ঘুমিয়ে ছিলো। ওই সময় ও এসেছিলো আমাকে পড়াতে। হঠাৎ ও আমার শরীরে হাত দেয়। খুব বিশ্রীভাবে। আমার শরীর ঘৃণায় রি রি করে ওঠে। আমি চিৎকার করে উঠে দাঁড়াই। ও আমার মুখ চেপে ধরে। আরো বিশ্রীভাবে আমাকে স্পর্শ কর‍তে থাকে….”
আশা কথা থামিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে, ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে সে।
ইরা স্তম্ভিত হয়ে যায় আশার কথায়। কিছু একটা সন্দেহ তো করেছিলো সে এমনটাই। কিন্তু এই মুহুর্তে আশার কথা শুনে মাথাটা কেমন চক্কর দিয়ে ওঠে তার। কাঁপা হাতে আশার পিঠে হাত রাখে।

“আশা এই কথা তুমি বাসায় কাউকে জানাওনি? জানোয়ারটা ওই ঘটনার পর কীভাবে আবার এই বাড়িতে আসতে পারে?”
“আমি জানি, এই ঘটনা আমি বাড়িতে জানালে ওর এই বাড়িতে আসাই শুধু বন্ধ হবে তা না। আমার ভাইয়া ওকে মেরেই ফেলবে। ওর কলিজা কুকুরকে খাওয়াবে। আমার ভাইয়া ঠিক যতোটা শান্ত, তারচেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর।”
“তাহলে কেনো জানাওনি? তোমার কি মনে হয়না ওর কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি হওয়া দরকার?”
“সমস্যাটা তো ওখানেই। এরপর ও ওর মুঠোফোন বের করে। সেখানে আমার কিছু আপত্তিকর ছবি। কিন্তু আসল ছবিগুলো আমার না। কোনো একটা নোংরা ছবির উপর আমার চেহারা বসিয়েছে। আর এমনভাবে বসিয়েছে যেটা একদম আসল মনে হচ্ছে। আমাকে পড়ানোর সময়ই আমার অজান্তে ছবিগুলো তুলেছে ও। আমি বুঝতেও পারিনি কখন এই কাজ করেছে। ও বললো এই কথা যদি আমি বাড়িতে জানাই তাহলে ও এই ছবিগুলো সবাইকে দেখাবে। বলবে যে আমার নাকি গোপন প্রেম আছে। স্যার সেই কথা জেনে ফেলায় আমি মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছি তাকে।”
ইরা কি বলবে ভেবে পায়না। গলা শুকিয়ে আসে তার আরো। এটা শিক্ষক? কীভাবে এই নোংরা কাজ কর‍তে পারে সে?

“আশা।”
“বলো।”
“এই কথাগুলো শুরু করার আগে তুমি আমাকে প্রতিজ্ঞা করেছো। সব সত্য বলবে। কিছু লুকাবে না আমার থেকে।”
আশা চাপা গলায় বললো,”আমি কি কিছু লুকিয়েছি?”
“ওটাই জানতে চাচ্ছি। কিছু লুকিয়েছো তুমি? ওই ছবিগুলো সত্যিই তোমার না?”
আশা অবাক হয়ে বললো,”বিশ্বাস করো, আমি এমন মেয়ে নই। একটু বিশ্বাস করো আমাকে।”
ইরা উঠে দাঁড়ায়। আশাও উঠে দাঁড়ায় সাথে সাথে।

“তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করছো না?”
ইরা শান্ত গলায় বললো,”এখনো পর্যন্ত করছি। আর করছি বলেই তোমাকে সাহায্য করতে চাচ্ছি। কিন্তু যদি কখনো বুঝতে পারি তুমি আমাকে মিথ্যা বলেছো। ওই ছবিগুলো আসলেই তোমার আর তোমার সত্যিই গোপন কোনো সম্পর্ক আছে তাহলে সেদিন থেকে আমি তোমাকে কোনো সাহায্য করতে পারবো না। তুমি নিশ্চিত থাকো। ও তোমার শরীরে আর হাত দিতে পারবে না। আর যা করেছে তার জন্য শাস্তি ও পাবে।”
আশা ভীত গলায় বললো,”কি করবে তুমি?”
ইরা মুচকি হেসে বললো,”সে আমি বুঝবো। তুমি ঘুমাতে যাও। চোখের পানি ফেলে নিজেকে দূর্বল করে দিও না।”
ইরা আর না দাঁড়িয়ে ঘরের দিকে পা বাড়ায়। বসার ঘরের মাঝে আশা দাঁড়িয়ে থাকে ঘোলাটে চোখে। তার মন বলছে এই স্বল্প পরিচিতা মেয়েটা তাকে সাহায্য করবেই। ওর মধ্যে অন্যরকম কিছু আছে। অদ্ভুত একটা ক্ষমতা৷ ওর শান্ত দৃষ্টিই তা বুঝিয়ে দেয়।

আরশাদ যেদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে সেদিন বাবার সাথে হাঁটতে যায়। রাশেদুলের অভ্যাস প্রতিদিন ভোরে দৌড়াতে যাওয়া। এতে তার শরীর আর মন দুইটাই ভালো থাকে।

বাবা-ছেলে দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্ত হয়ে পার্কের একটা বেঞ্চে বসেছে। আরশাদের বুক শুকিয়ে আসছে। এখনই একটা সিগারেট ধরানো প্রয়োজন। কিন্তু বাবা সামনে থাকায় পারছে না। ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ।

“আরশাদ।”
“বলো বাবা।”
“দুইদিন যাবৎ তোমাকে একটা কথা বলবো ভাবছি। বলা হয়ে উঠছে না। তোমার মা চায়না এ বিষয়ে আমি তোমার সাথে কথা বলি। তাই বাড়িতে বলার সুযোগ পাচ্ছিলাম না। আজ যখন সুযোগ পাওয়া গেছে, আমার মনে হয় কথাগুলো তোমাকে বলা প্রয়োজন।”
“কি ব্যাপার বলো তো বাবা?”
রাশেদুল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। মনের মধ্যে নিজের কথাগুলো সাজায়।

“আরশাদ যেভাবেই হোক বিয়েটা তোমার হয়েছে। ইরা তোমার স্ত্রী। আমরা সবাই মেনে নিচ্ছি বা চেষ্টা করছি। তোমার মা একটা বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। তবে আশা করি খুব তাড়াতাড়ি সে-ও সবটা মেনে নিবে। ইরা তার নিজ গুণেই সবার ভালোবাসা আদায় করে নিবে।”
আরশাদ চুপ করে থাকে।

“কিন্তু বাবা সমাজ বলেও একটা ব্যাপার আছে। আত্মীয়-স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশি, বন্ধুবান্ধবদের নিয়েই আমাদের জীবন। আমরা একা বাঁচতে পারিনা। তাছাড়া আমার এবং তোমার মায়ের দুই বংশেরই প্রথম পুত্র সন্তান তুমি। মেধাবী আর অত্যন্ত উজ্জ্বল তুমি সবসময়ই। তাই সবার ভালোবাসা আর স্নেহ নিয়েই বড় হয়েছো তুমি। তুমি বিয়ে করেছো হুট করে। তোমার পরিস্থিতি আমরা বুঝতে পারলেও সবাই তো বুঝবে না। তাই আমি চাচ্ছি ইরাকে স্বীকৃতি দিতে, আমাদের বাড়ির বউ হিসেবে। অনুষ্ঠান করে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চাচ্ছি। তাছাড়া পুত্রবধূর প্রতি আমাদের একটা দায়িত্ব আছে। আমরা তা এড়িয়ে যেতে পারিনা। ওর যা যা প্রাপ্য, আমরা আমাদের ছেলের স্ত্রীর জন্য যা যা রেখেছি সব ওকে দেওয়া হবে। এখানেই শেষ না। যতো যা-ই হোক, ইরা অনাথ নয়। ইরার বংশপরিচয় আছে, বাবা, মা আছে। আমি চাই তারা আসুক, এসে দেখুক তাদের মেয়ে কেমন আছে। বিয়েটা তো ছেলেখেলা নয়।”
আরশাদ উঠে দাঁড়ায়। তার মুখ থমথম করছে। রাশেদুলও উঠে দাঁড়ায় ছেলের পাশে।

“কি হলো? উঠে দাঁড়ালে যে? আমি কিছু ভুল বলেছি?”
আরশাদ ঠোঁট কামড়ে সময় নেয় কিছু বলার। কীভাবে শুরু করবে বুঝতে পারেনা।

“বাবা।”
“বলো।”
“ইরার যা পাওয়ার ও তা পাবে, পেতেই হবে। কিন্তু যা না পাওয়ার তা ওকে আমি পেতে দিবো না।”
“তোমার কথা বুঝতে পারলাম না।”
“বাবা আমার আত্মীয় স্বজনরা আমাকে অনেক ভালোবাসে। কিন্তু ইরাকে নয়। যদি অনুষ্ঠানে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা ঘটে? সে দায় কে নিবে? যদি তাদের মধ্যে কেউ ইরাকে ছোট করে কোনো কথা বলে? ওকে কষ্ট দেয়? এই বিয়েতে ইরার কোনো দোষ নেই। আমি ওই জায়গায় না থাকলে বা ওকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত না নিলে ঠিকই ওই বুড়ো লোকটাকে বিয়ে করে নিতো ও কোনো প্রতিবাদ না করে। তাহলে নির্দোষ মেয়েটাকে শুধু শুধু অপমান করার কি দরকার? তুমি কি কথা দিতে পারবে যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাই ওকে ভালোবাসবে? কেউ ওকে অপমান করবে না?”
“তাই বলে আত্মীয় স্বজনের কাছে ইরাকে স্বীকৃতি দিতে চাওনা তুমি?”
“ইরা আমার স্ত্রী, আমার স্বীকৃতিই ওর জন্য যথেষ্ট। তবে হ্যা, সবার সাথেই ইরাকে আমি পরিচয় করিয়ে দিবো। ওর নিজের একটা পরিচয় যেদিন হবে। ও পড়াশোনা শেষ করুক, এরপর ওর যা করতে মন চায় করবে। চাকরি কিংবা অন্য যে কোনো কিছু। আমি জানি ও ভুল কিছু করবে না। যেদিন কেউ ওকে অপমান করে কথা বলতে গেলে ওর পরিচয় দেখে থেমে যাবে সেদিন আমি নিজে বড় করে অনুষ্ঠান করবো। সবাইকে দাওয়াত দিবো, কেউ বাদ যাবেনা।”
“এর আগ পর্যন্ত এভাবেই সব চলবে?”
“একদমই না। কেউ ওকে দেখতে চাইলে অবশ্যই আসবে। কিন্তু অপমান করতে নয়।”
রাশেদুল স্মিত হেসে ছেলের কাঁধে হাত রাখে।

“তুমি আসলেই একজন সুপুরুষ আরশাদ। মেয়েটা ভাগ্যবতী তাই সে তোমাকে পেয়েছে।”
“এটাও তো হতে পারে যে আমি ভাগ্যবান তাই আমি ওকে পেয়েছি।”
রাশেদুল ছেলের বুকে খোঁচা দিয়ে বললো,”বাহ বোঝাপড়া তো ভালোই হয়েছে মনে হচ্ছে।”
“এখনো না, হলে কিছুদিনের মধ্যে দাদা ডাক শুনতে পাবে। যাও কথা দিলাম।”
“আরশাদ, সাবধান। আমি তোমার বাবা।”
“একটা বয়স পর বাপ ছেলে বন্ধু হয়ে যায়।”
রাশেদুল কিছুক্ষণ কি যেনো ভেবে বললো,”বাসায় যেয়ে অফিসে জানাও তোমার তিন দিন ছুটি লাগবে।”
“একদমই সম্ভব না বাবা। কাজের অনেক চাপ এখন। ছুটির কথা মাথাতেও এনো না।”
“ওসব জানিনা। তোমার এই বন্ধুর তরফ থেকে তোমাদের বোঝাপড়াটা আরো দৃঢ় করার জন্য একটা উপহার আছে। তিনদিনের জন্য তোমরা যাচ্ছো সমুদ্রবিলাশ করতে কক্সবাজার। তোমাদের সব খরচ আমার।”
আরশাদ চোখ বড় বড় করে তাকায় বাবার দিকে।

“ওভাবে তাকিয়ে থেকো না। মা’কে আমি মানিয়ে নিবো। কিন্তু এই সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। দুইজনের মধ্যে বোঝাপড়ার খুঁটি এখনই পুঁতে ফেলতে হবে। যতো দেরি তত ক্ষতি।”
আচমকা আরশাদ বাবাকে জড়িয়ে ধরে৷ রাশেদুল ছেলের পিঠে হাত রাখে।

“আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি বাবা।”
“ঠিক আছে ঠিক আছে। এখন বাসায় চলো। গুছিয়ে নাও সবটা। আমি এদিকে আছি।”

সদ্য ঘুম ভাঙা চোখে ইরা তাকিয়ে আছে আরশাদের দিকে। মহাসমারোহে জামাকাপড় গোছাচ্ছে সে। মাঝে মাঝে গান করছে আবার ভুলভাল সুরে।

“আপনি কি কোথাও যাবেন?”
আরশাদ ইরার দিকে না তাকিয়েই বললো,”হুম।”
“কোথায়?”
“কেনো? থাকতে পারবেন না আমাকে ছাড়া?”
“কেনো পারবো না? এতোদিন থাকিনি?”
“হুম কথা সত্য।”
ইরার বুকটা কেমন জ্বলতে থাকে। সত্যিই এই লোকটা তাকে রেখে চলে যাবে? কোথায় যাবে? মুখে যা-ই বলুক, সে কি আসলেই থাকতে পারবে?

“আপনার জামাকাপড় কোথায় রেখেছেন? গুছিয়ে ফেলুন।”
ইরা অবাক হয়ে বললো,”আমার জামাকাপড় দিয়ে কি হবে?”
“আপনি পারবেন নাকি আমি গুছিয়ে দিবো?”
ইরা এবার বিছানা ছেড়ে নেমে আসে। আরশাদের মুখোমুখি দাঁড়ায়।

“হেঁয়ালি রেখে বলুন তো আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”
আরশাদ ইরার হাতটা ধরে পোড়া জায়গাটা দেখে। কিছুটা শুকিয়ে এসেছে। কমে যাবে তাড়াতাড়ি।

“কি হলো? বলুন।”
আরশাদ চাপা গলায় ফিসফিস করে বললো,”সমুদ্র আমার শয্যা, আমি ঢেউয়ের আঘাতে খুঁজি সুখ। আমি বালুর বুকে উত্তপ্ত, আমি ধরনীর আন্দোলিত মুখ। আমি দীর্ঘ রজনী পাড়ি জমাই, আমি সমুদ্রস্নানে কষ্ট হারাই। আমি সেই ভ্রমর, যাকে মনে রাখেনা এ ধরার বুক।”
ইরার বুকটা আবার ধক করে ওঠে। লোকটা কি তার সব লেখা মুখস্ত করে রেখেছে?

“ভ্রমরের আরেকটি অসাধারণ লেখা। আমরা সমুদ্রস্নান করতে যাচ্ছি ইরা। আমি আর তুমি।”
“সমুদ্র?”
“হ্যা সমুদ্র। কখনো গিয়েছো? নীল জলে দুঃখ ভাসিয়েছো?”
ইরা মাথা নাড়ে, সে যায়নি।

“এবার যাবে। যতোটা আনন্দ করতে ইচ্ছা করে করবে। খুব দ্রুত সব গুছিয়ে নাও। আগামী তিনদিনের জন্য আমরা নেটওয়ার্কের বাইরে।”
ইরা ক্ষীণ গলায় বললো,”শুধু আমরা দু’জনই? আর কেউ না?”
“অবশ্যই আরো মানুষ যাবে। কদুর মা’কে নিচ্ছি, সাথে কদু, মধু, যদু যতো আছে এলাকায় সবাইকে নিচ্ছি। চলবে? নাকি আরো লাগবে?”
“ধুর….”

ইরা বিছানায় যেয়ে বসে। আরশাদ সিগারেট হাতে বারান্দায় যেতে যেতে বললো,”খুব দ্রুত গুছিয়ে নাও সবকিছু। আর হ্যা চাইলে ওই ওভার সাইজ ব্লাউজটা নিতেই পারো। আমি কিছু মনে করবো না।”

ইরা ঝট করে তাকায় আরশাদের দিকে। তার চোখ বিস্ফারিত। সেদিকে বিশেষ খেয়াল নেই আরশাদের।
‘বধূ আঁখি তোলো, বান ডেকেছে প্রেমের….”
গান গাইতে গাইতে বারান্দায় চলে যায়। হতভম্ব ইরা বসেই থাকে বিছানায় চুপ করে। ওঠার মতো শক্তি পায়না একবিন্দু।

(চলবে…..)