Home "ধারাবাহিক গল্প মন কেমনের মরশুম মন কেমনের মরশুম পর্ব-১০

মন কেমনের মরশুম পর্ব-১০

0
383

#মন_কেমনের_মরশুম

পর্ব: ১০

পরের দিন সাপ্তাহিক বন্ধ, সবাই বাড়িতেই। ইরা সকাল থেকে এ পর্যন্ত তিন মগ কফি বানিয়ে দিয়েছে আরশাদকে। আরশাদ ল্যাপটপ নিয়ে বসা। কফি খেতে খেতে আড়চোখে তাকায় ইরার দিকে। ইরা নির্লিপ্ত। আরশাদ তাকে রাগাতে চাচ্ছে। রাগলে মেয়েটা কি করে দেখার খুব ইচ্ছা আরশাদের। কিন্তু অবাক কান্ড, ইরা রাগছে না। যতবার আরশাদ কফি চাচ্ছে ততবার শান্ত মুখে এনে দিচ্ছে।

“ইরা।”
ইরা তাকায় আরশাদের দিকে, উত্তর দেয়না।
“তুমি কি কফিতে থুতু মিশিয়ে দিচ্ছো?”
“এসব কি বাজে কথা? এমন বিশ্রী কাজ করতে যাবো কেনো?”
ইরার কিছুটা উত্তাপ টের পায় আরশাদ। বেশ মজা লাগে তার। ইরা রাগছে! আরেকটু চেষ্টা করা যাক।

“এতোবার কফি এনে দিতে হচ্ছে, রাগ হতেই পারে। ফলস্বরূপ থুতু…”
“আমার রাগ এতো ঠুনকো না। আর রাগ হলেই এমন আজেবাজে কাজ আমি করিনা। এটুকুতে আমার কোনো কষ্ট হচ্ছে না। এর কয়েক গুণ কাজ করে আমার অভ্যাস আছে।”
আরশাদ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বললো,”ব্লাক কফি হঠাৎ মিষ্টি লাগছে, তাই বললাম।”
ইরা তীক্ষ্ণ চোখে আরশাদের দিকে তাকায়। লোকটা মহা ফাজিল। বলা যায় ফাজিলের চূড়ান্ত। খুব শান্ত মুখে অবলীলায় এমন সব কথা বলতে পারে যা শুনে ইরার রাগ উঠে যাওয়া খুব স্বাভাবিক। কারণ সে জানে আরশাদ মূলত এখন তাকে রাগাতে চাচ্ছে। তার উদ্দেশ্য সফল হতে দেওয়া যাবে না।

“আজ কি সারাদিনে শুধু কফি-ই খাবেন?”
“তুমি আর কিছু খাওয়াতে চাও?”
ইরা চমকে উঠে বললো,”কি বললেন?”
“কি অদ্ভুত! ছুটির দিনে বউরা কতো কিছু খাওয়ায় না স্বামীদের? পোলাও, বিরিয়ানি কিংবা রেজালা।”
“বলুন কি খেতে চান। আপনার মা অনুমতি দিলে অবশ্যই রান্না করে খাওয়াবো।”
আরশাদ ল্যাপটপ বন্ধ করে ইরার চোখে চোখ রাখে।

“সবকিছু খাওয়ানোর সময় কি মায়ের অনুমতি নিবে তুমি?”
বিরক্তিতে ইরা উঠে দাঁড়ায়। এই লোকটা সবসময় এমন উদ্ভট কথা বলে। এরচেয়ে বারান্দায় বসে থাকা ভালো একা একা। বের হওয়ার দরকার ছিলো তার। কিন্তু মনে হয় না পারবে। এই মহাশয় আজ সারাদিন বাড়ি থাকবে, আর তাকে জ্বালাবে। ঢের বুঝতে পারছে সে। কোথাও যেতে চাইলেও তার পিছু পিছু যাবে নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই।
কলেজটা শুরু হলেই বাঁচে। গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো ওদিক থেকেই সেরে আসতে পারবে।

ইরা বারান্দায় যেয়ে দাঁড়িয়ে বড় করে শ্বাস নেয় একটা। হঠাৎ চোখ পড়ে গ্রিলে। অবাক হয়ে যায় সে। এটা কখন এখানে এলো? কে এনেছে? আরশাদ?

ইরা খাঁচাটা হাতে নিতেই পাখি দু’টো কিচকিচ করে ওঠে। কি সুন্দর দু’টো পাখি৷ একটা নীল আরেকটা সবুজ। এতোক্ষণ ঝিম মেরে পড়েছিলো বলে ওদের ডাকটাও শোনেনি ইরা। ইরা হাতে নিতেই যেনো ঝটপটানি শুরু হয়ে গেছে ওদের।

“পছন্দ হয়েছে?”
ইরা হাসিমুখে তাকায় পিছনের দিকে। দরজায় দুই হাত গুঁজে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরশাদ। ফোলা ফোলা চোখ, গালে খোঁচা দাড়ি। নাহ মাঝে মাঝে বেশ ভালোই লাগে ভদ্রলোককে।

“এটা আপনি এনেছেন?”
“আরে না। পাখি দু’টো একাই সকালে উড়ে এসেছে বারান্দায়। ঠোঁটে করে খাঁচাটাও এনেছে। আমাকে এসে বললো, এই ঘরে নতুন একটা হুতুম পেঁচা দেখলাম। সারাদিন মুখ ফুলিয়ে বসে থাকে। হাসেও না, কথাও বলেনা। আমাদের রেখে দাও খাঁচার মধ্যে। অন্তত আমাদের সাথে তো কথা বলতে পারবে।”
ইরা কি মনে করে ফিক করে হেসে দেয়। আরশাদও হাসে তার সাথে।

ইরা ভীষণ খুশি ওদের পেয়ে। খাঁচায় আঙ্গুল দিয়ে চিকচিক শব্দ করছে। আরশাদ একটা লম্বা শ্বাস ফেলে তার দিকে তাকিয়ে। তার জানামতে এ বাড়িতে সে বাদে ইরার সাথে কথা বলার কেউ নেই। তার বাবাও বাড়িতে থাকে না সারাদিন। একটা মানুষ কীভাবে সারাদিন কথা না বলে থাকতে পারে? আজ খুব ভোরবেলা বেরিয়ে এনে দিয়েছে বাজরিগর দু’টো। ইরার ভালো লেগেছে দেখতে ভালো লাগছে।

আরশাদ ইরার পাশে দাঁড়িয়ে গ্রিলে হাত ঠেকায়। ইরার সেদিকে খেয়াল নেই। পাখি না যেনো দু’টো বন্ধু পেয়েছে সে।

“আরশাদ।”
আরশাদ আর ইরা চমকে উঠে তাকায় দরজার দিকে। নীলু দাঁড়িয়ে আছে। আজও তার পরনে শাড়ি। কালো পাতলা শিফনের ফিনফিনে শাড়ি, সাথে রূপার গহনা। ভ্রুযুগলের মাঝে ছোট্ট কালো টিপ, ফর্সা মুখে ফুটে আছে যেনো চাঁদের বুকে ছোট্ট গ্রহণ। বাতাসে লালচে বর্ণের চুলগুলো উড়ছে। ভীষণ মোহনীয় লাগছে তাকে দেখতে।
ইরা বাঁকা চোখে আরশাদের দিকে তাকায়। নীলুর এমন মোহনীয় সাজের কারণ কি আরশাদ? সে কি জানেনা আরশাদের বিয়ে হয়ে গেছে? তবে কেনো এই লাস্যময়ী রূপে ধরা দিতে হবে তাকে? ইরার অসহায় লাগে। অন্যায় কিনা জানেনা, কিন্তু তার এই মুহুর্তে নীলুকে সহ্য হচ্ছে না, একটুও না।

“নীলু তুমি?”
“কেনো আরশাদ? আসতে পারিনা?”
“অবশ্যই।”
নীলু কাউকে তোয়াক্কা না করে বারান্দার চেয়ারে বসে। আরশাদ অপ্রস্তুত বোধ করে। নীলু এমন আচরণ করছে যেনো সব আগের মতোই আছে। ইরাকে দেখতেই পায়নি যেনো সে। অদৃশ্য হয়ে আছে ইরা তার কাছে।

“বসো আরশাদ।”
আরশাদ ইরার দিকে তাকিয়ে বললো,”ইরা তুমি বসো। গল্প করো নীলুর সাথে। তোমার নতুন উপহার দেখাও ওকে। আমার একটু কাজ আছে। আমি বাইরে যাবো।”
নীলু আরশাদের দিকে তাকিয়ে বললো,”তোমার কোনো কাজ নেই আরশাদ। ছুটির দিনে তুমি বাইরের কোনো কাজ রাখোনা। নিশ্চয়ই আমার চেয়ে ভালো কেউ চিনে না তোমাকে।”
ইরা খাঁচাটা জায়গায় রেখে দিয়ে বললো,”আপনারা গল্প করুন আমি আপনাদের নাশতা এনে দিচ্ছি এখানে।”
আরশাদ ঝট করে ইরার দিকে তাকায়। তার রাগের পারদ তরতর করে উঠে যায়।

“তোমাকে কেউ বলেছে নাশতা দিতে?”
নীলু আহ্লাদী গলায় বললো,”তোমার হাতের কফিটা দারুণ হয়। খাওয়া যাবে?”
ইরা ম্লান হেসে বললো,”অবশ্যই। আর আপনি?”
ইরা তাকায় আরশাদের দিকে, তার ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি।

আরশাদ দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে। ঘন ঘন শ্বাস পড়ে তার।

“বসো না আরশাদ। নাকি রাগ করলে তোমার বউকে দিয়ে কাজ করাচ্ছি তাই? কষ্ট হলে প্রয়োজন নেই থাক, তুমিও আমাদের আড্ডায় বসতে পারো।”
“জি না, আপনাদের আড্ডায় না আমাকে প্রয়োজন আছে, না আমার নিজের প্রয়োজন আছে। আমি আসছি।”
ইরা আরশাদের দিকে আর তাকায়না। কিন্তু বুঝতে পারে আরশাদ রাগী লাল চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

“আরশাদ আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
আরশাদ বেশ অনেকটা দূরত্ব নিয়ে বসেছে নীলুর থেকে। তার দৃষ্টি বাইরের দিকে। এখনো পর্যন্ত একবারও নীলুকে ভালো করে দেখেনি সে। নীলু এটা খেয়াল করেছে। একটা বার আরশাদের মুগ্ধ দৃষ্টি কি তার দিকে পড়তে পারতো না?

“কি সিদ্ধান্ত নিলে?”
নীলু হাই তুলে বললো,”ভাবছি বিয়ে করবো।”
আরশাদ কিছুটা চমকে যায়, কিন্তু নিজেকে সামলে নেয়।

“তাই নাকি? খুব ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছো। কিন্তু হঠাৎ?”
হঠাৎ নীলুর মুখের হাসি উড়ে যায়। তার বদলে কাঠিন্য এসে ভর করে তার মুখে। মুখের রেখাগুলো কঠিন হয়ে আসে।

“কেনো? তোমার কোনো অসুবিধা আছে তাতে? তুমি বিয়ে করে দিব্বি সংসার করছো। আমি করতে পারিনা?”
“কেনো পারবে না? আমার কেনো এখানে অসুবিধা থাকবে নীলু?”
“ও তার মানে তুমি খুশি?”
“আমার খুশি অখুশির চেয়ে তোমার সুখী থাকাটাই কি জরুরি নয়?”
নীলু কিছুক্ষণ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে হঠাৎ আরশাদের হাত চেপে ধরে। আরশাদ হতভম্ব হয়ে যায় নীলুর এমন ব্যবহারে। নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।

“নীলু…”
“নীলু না আরশাদ, একটা বার আমাকে নীলিমা বলে ডাকো। সেই কলেজ জীবনের মতো৷ কেনো এমন পালটে গেলে আরশাদ? তুমি আমাকে ভালো না বাসলেও খুব কম সময়ের জন্য হলেও আমার এই পাগলামি গুলোর প্রেমে পড়েছিলে তুমি। তোমার সেই নীলিমা তোমার সামনে, সেই কিশোরী নীলিমা। একটাবার আমাকে দেখো, আমি এখনো তোমাকে আগের মতোই ভালোবাসি।”
“নীলু হাত ছাড়ো। ইরা চলে আসবে এক্ষুনি। অন্য কিছু ভাবতে পারে ও।”
নীলু ঝাঁঝিয়ে উঠে বললো,”যা ইচ্ছা ভাবুক ও। ওর ভাবনা নিয়ে আমার ভাবতে ইচ্ছা করছে না। আমি শেষ বারের মতো নিজেকে ভেঙেচুরে তোমার সামনে উপস্থাপন করছি। আমাকে ফিরিয়ে দিও না আরশাদ।”
“নীলু আমাকে কঠোর হতে বাধ্য করোনা। কি হচ্ছে এসব?”
নীলুকে হালকা ধাক্কা দিয়ে আরশাদ উঠে দাঁড়ায়। রাগে শরীর কাঁপছে তার। এই কি সেই নীলু? এ কি অবস্থা তার? এমন অধঃপতন কবে হলো তার? এমন ব্যবহারের মানে কি?

“নীলু আমি একটু একা থাকতে চাই। দয়া করে আমাকে একা থাকতে দাও। কেউ এসো না এখন আমার কাছে, কেউ না। আমার মস্তিষ্ক উত্তপ্ত হয়ে আছে।”
অপমানে, ক্ষোভে নীলু পাথরের মতো জমে যায়। কাঁদতেও ভুলে গেছে সে। শুধু থরথর করে কাঁপতে থাকে আরশাদের দিকে তাকিয়ে।

ইরা কফি এনে দেখে দু’জনই দাঁড়িয়ে আছে। আরশাদ যেনো রাগে ফুটছে। তার চোখমুখ লাল। পাশেই নীলু দাঁড়িয়ে কাঁপছে। বিধ্বস্ত অবস্থা তার। কি হলো এটুকু সময়ের মধ্যে ইরা বুঝতে পারেনা।

ইরাকে দেখে নীলু বেরিয়ে যায়। ঈষৎ ধাক্কা লাগে ইরার সাথে। কোনোরকমে টাল সামলায় ইরা। কিন্তু গরম কফি কিছুটা গায়ে এসে পড়ে। সাথে সাথে জ্বালা করে ওঠে তার। অস্ফুট আওয়াজ করে, যাতে কেউ টের না পায়। কিন্তু ভালোই জ্বলছে।

“এ কি নীলু তুই কোথায় যাচ্ছিস? মাত্রই তো এলি। আমি তোর পছন্দের সব রান্না করছি।”
নীলু ঘোলাটে চোখে রাবেয়ার দিকে তাকায়। রাবেয়ার আজকে নীলুর বাড়িতেই যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু সকাল সকাল সে নিজেই চলে আসায় খুশি হয়েছিলো রাবেয়া। রান্না মাত্রই বসিয়েছে সে।

রাবেয়াকে উত্তর না দিয়ে ঝড়ের বেগেই বেরিয়ে যায় নীলু। রাবেয়া পিছু পিছু ছোটে কিন্তু নাগাল পায়না নীলুর। মাত্রই তো হাসিখুশি দেখলো মেয়েটাকে, কি সুন্দর সেজে এসেছিলো। হঠাৎ কি হলো? ওই মেয়েটা কিছু বলেনি তো? তা আবার কি করে? সে তো রান্নাঘরেই কফি বানাচ্ছিলো। তাহলে কি আরশাদ? আরশাদ নীলুর সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে? রাবেয়া ভাবতে পারেনা কিছু।

“উনি না খেয়েই চলে গেলেন? আপনি খাবেন তো নাকি?”
আরশাদ দাঁতে দাঁত চেপে তাকায় ইরার দিকে। তার রাগ দেখে কিছুটা বিচলিত হলেও ইরা শান্তভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে।

“যেটা নিজের তা অন্যের হাতে তুলে দিতে খুব ভালো লাগে? মহৎ সাজছো? মহীয়সী নারী তুমি?”
“ভুল করছেন, যেটা আমার তা আমারই। তা আমি একান্ত আমার ভিতর আগলে রাখতে জানি। ঝিনুক যেমন আগলে রাখে মুক্তোকে। কিন্তু যা আমার হয়েও আমার না, তা আগলে রাখার ক্ষমতা বা ইচ্ছা কোনোটাই আমার নেই।”
আরশাদ আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে। চোখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে তার।

“কি হলো? এমন ভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো? মারবেন? মারলে মারতে পারেন। আমি রাগ করবো না।”
“নারীর শরীরে হাত ওঠানোর মতো কাপুরুষ হয়ে জন্ম নিইনি আমি। দয়া করে সামনে থেকে চলে যাও। আর এক মুহুর্তও আমার সামনে থাকবে না তুমি।”
আরশাদ অন্যদিকে ফিরে জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে থাকে।

ইরার মেজাজে কোনো পরিবর্তন আসেনা। কফি টেবিলে রেখে বারান্দার দিকে চলে যায় সে। হঠাৎ পিছনে মগ ভাঙার বিকট আওয়াজে কিছুটা চমকে ওঠে সে। কিন্তু সেদিকে না তাকিয়ে কিংবা পাত্তা না দিয়েই বারান্দায় যেয়ে বসে সে।
আকাশ কালো হয়ে আসছে। যে কোনো সময় বোধহয় বৃষ্টি নামবে। খুব ইচ্ছা করছে আয়োজন করে কাঁদতে। মায়ের জন্য খুব অস্থির লাগছে তার। কি এমন হতো, সেদিন যদি মা চলে যাওয়ার সাথে তাকেও সাথে করে নিয়ে যেতো? কি ক্ষতি হতো? এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় কেনো তাকে একা রেখে চলে গেলো? একা একা এই জীবন যুদ্ধ যে সে আর চালিয়ে নিতে পারছে না।

পাখি দু’টোর পাশে যেয়ে দাঁড়ায় ইরা। ছেলে পাখিটা আদর করছে মেয়ে পাখিটাকে। ছোট্ট মেয়ে পাখিটা চোখ বুঁজে আদর নিচ্ছে। ইরা নিজের হাতের দিকে তাকায়। গরম কফি পড়ে পুড়ে গেছে কিছুটা জায়গা, কালচে হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। ওষুধ না লাগালে ফোস্কা পড়ে যাবে। যা হয় হোক, ইরা ওষুধ লাগানোর তাগিদ অনুভব করেনা।
ক্লান্ত শরীরটা মেলে দেয় চেয়ারে। কার উপর যেনো ভীষণ অভিমান হচ্ছে তার। এতোদিনে এক বিন্দু কাঁদতে না পারলেও হঠাৎ আজ দু’ফোঁটা পানি গাল বেয়ে টুপ টুপ করে পড়ে মুক্তোদানার মতো।

কি মনে রেডিও ছেড়ে কানে হেডফোন নিতেই শান্ত হয়ে যায় আরশাদ। বুক চিড়ে ঠান্ডা হাওয়া বেরিয়ে আসে।

আজও ভ্রমরের লেখা। পরপর দুইদিন? এ যে মেঘ না চাইতেই জল।

“আমি বহ্নিশিখায় পুড়তে পুড়তে ভেবেছি সহস্রবার, নীহারিকার উজ্জ্বলতায় বিলিয়ে দিবো নিজেকে। বিলীন হয়ে যাবো কৃষ্ণগহ্বরের অন্তরালে। কিন্তু হঠাৎ এক আগুন ঝরা কণ্ঠ আমাকে ডাকে পিছু হতে। যে আমি বাঁধনহারা বন্য পাখি, সেই আমি চুপি চুপি সাড়া দিয়ে ফেলি সেই ডাকে। খরস্রোতা নদীর বাঁক থেকে সেই বলিষ্ঠ হাতজোড়া আমাকে মুঠোবন্দি করে নেয়। আমি ক্লান্ত গ্রহাণুর ন্যায় ধরা দিই তার বাহুডোরে। এ যদি আমার পাপ হয়, আমি বারংবার সেই পাপের শাস্তি নিতে রাজি…..”

আরশাদ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শোনে, একবার না বারবার বারবার।

(চলবে….)