#মন_কেমনের_মরশুম
পর্ব: ২৯
কলেজ থেকে ফিরেই গোসল দিয়েছে ইরা। আজ মাত্রাতিরিক্ত গরম পড়েছে। বর্ষাকাল শেষ হয়ে শরৎ পড়েছে কিছুদিন। আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায় সারাদিন কিন্তু বৃষ্টির দেখা নেই। কদাচিত বৃষ্টি এলেও গরম যেনো আরো বাড়িয়ে দিয়ে যায়।
লম্বা চুলগুলো গামছা দিয়ে মুছতে মুছতে ইরা ভাবে যথেষ্ট হয়েছে, আর না। এই লম্বা চুল সামলে সে আর পারছে না। কেটে অর্ধেক করে ফেলবে। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে। চুল তার কিন্তু মালিক তার স্বামীজান। চুল কাটার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা আছে। ইরা নিজে নিজেই হাসে। একটা সময় কেমন পাথরের মতো শক্ত ছিলো সে। যে যা বলতো গায়ে মাখতো না। এখন আদরে আদরে বরফ গলছে। মাঝে মাঝে সত্যি সত্যিই বরফের মতো গলতে ইচ্ছা করে।
“ভিতরে আসি?”
ইরা চমকে উঠে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে রাবেয়া বেগম দাঁড়িয়ে। তার মুখে হাসি বা রাগ কিছুই নেই। কেমন থমথমে, ঠান্ডা একটা মুখ। ইরা হকচকিয়ে যায়।
“অনুমতি নিচ্ছেন কেনো? অবশ্যই আসুন।”
রাবেয়া বেগম শান্ত পায়ে ঘরে ঢুকে একবার চারপাশে চোখ বুলায়। কলেজ, পড়াশোনা, টুকটাক রান্নাবান্না সামলেও মেয়েটা ঘরটা পরিপাটি করে রাখে, একদম ছবির মতো গুছিয়ে। সহসাই মেয়েটাকে ভালো লেগে যাওয়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে হয়তো এটা একটা। সে নিজেকেও গুছিয়ে রাখে সবসময়। শাড়ি পরলে কখনো কুঁচিটাও এলোমেলো হয়না। চুলগুলো সবসময় সুন্দর করে আঁচড়ানো থাকে, চোখের কাজলটাও লেপটে যায়না।
রাবেয়া নিজের প্রতি নিজেই কিছুটা বিরক্ত হয়। আজ সে এতোটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মেয়েটার গুণগুলো দেখার চেষ্টা করছে কেনো? তার নিজের মেয়েকে বাঁচানোর মতো সাহস দেখিয়েছে তাই? তবে কি সে স্বার্থপর?
“রোজ অবেলায় গোসল করো, শরীর খারাপ করেনা?”
ইরা ভিতর ভিতর অবাক হলেও উপরে প্রকাশ করেনা। মুখে হাসি ধরে রাখে।
“জি না। ছোট থেকে অভ্যাস আছে। ছোট থেকে বলতে সৎমায়ের সংসার শুরু হওয়ার পর থেকে। স্কুল বা কলেজের জন্য আলাদা করে যে সময়টুকু উনি আমাকে দয়া করে দিতেন, বাড়ি ফিরে তা পুষিয়ে দেওয়া লাগতো। স্কুলের ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়েই ঘরের কাজ করতাম। শেষ করতে করতে বিকাল বা সন্ধ্যা হয়ে যেতো। তখনই গোসল দিতাম। এতোদিন যখন শরীর খারাপ করেনি, এখনও করবে না।”
রাবেয়া বেগম অপ্রস্তুত হয়। গোধূলির আলো ছড়িয়ে পড়েছে বাইরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সন্ধ্যা নামবে। সূর্য দিনের শেষে নিস্তেজ রোদ ছড়াচ্ছে। সেই আলোর কিছু অংশ জানালা গলে ঘরে ঢুকেছে। ইরা নামক মেয়েটিকে রহস্যময়ী লাগছে সে আলোয়। তার হাসির সাথে সে আলো মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।
“তোমার কিছু প্রয়োজন হলে আমাকে জানাও না কেনো? আমাকে না জানালেও আশাকে তো জানাতেই পারো।”
ইরা চোখ বড় বড় করে তাকায় রাবেয়া বেগমের দিকে। আঁচলের নিচে কিছু একটা লুকাচ্ছে সে। ইরা বুঝতে পারেনা কি বলবে।
“জানি আরশাদ দায়িত্ববান, সে শিক্ষা আমরা তাকে দিয়েছি। তোমার যা লাগে সে এনে দেয় নিশ্চয়ই। কিন্তু মেয়েলী অনেক ব্যাপার আছে, সব তো ও বুঝবে না।”
ইরা অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বললো,”আমার যা প্রয়োজন আমি নিজেই কিনে নিতে পারি। আগেও আমাকে কেউ কিনে দেওয়ার ছিলো না। আপনি যে বলেছেন তাতেই আমি কৃতজ্ঞ।”
রাবেয়া বেগম ম্লান হেসে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। ইরা থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শুধুমাত্র এই কথাগুলো বলার জন্য উনি এসেছিলেন? কি অদ্ভুত!
মিনিট দুয়েক পরই আবার ঘরে ঢোকে রাবেয়া। ইরার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললো,”তোমাকে একটা জিনিস দিতে চাই।”
“আমাকে?”
“হ্যা, উপহার বলতে পারো।”
ইরা ভেজা চুলগুলোই খোঁপার মতো মুড়িয়ে নেয়।
“আমাকে উপহার দিবেন? কিন্তু কেনো?”
“আগামীকাল আমার ছেলের জন্মদিন। যার জন্মদিন তাকে উপহার দিলে সে যতোটা খুশি হবে তোমাকে দিলে বোধহয় তারচেয়ে বেশি খুশি হবে। আমার ছেলে চায় আমি যেনো তার বউকে সাদরে গ্রহণ করি। তার জন্মদিনে মা হিসেবে এটুকু করতেই পারি।”
ইরা ভেবাচেকা খেয়ে যায়। আগামীকাল আরশাদের জন্মদিন? আর সে জানেনা? তারচেয়ে বড় কথা আরশাদের জন্মদিনে তার মা ইরাকে উপহার দিবে? কেমন গোলমেলে ব্যাপার!
“এটা ধরো।”
ইরা ভ্রু কুঁচকে তাকায় রাবেয়ার হাতের দিকে। একটা লাল বাক্স, গয়নার দোকানের বাক্স। রাবেয়া বেগম কি ইরাকে গহনা দিচ্ছে?
ইরা হতবাক চোখে রাবেয়ার মুখের দিকে তাকায়।
“কি হলো? ধরো। দেখো পছন্দ হয় কিনা!”
“এটা কি?”
“এই হলো তোমাদের জেনারেশনের একটা সমস্যা। তোমরা বড্ড বেশি প্রশ্ন করো। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি। নিজে হাতে নিয়েই দেখো এটা কি।”
ইরার হাত টেনে এনে তার হাতের উপর বাক্সটা দেয় রাবেয়া।
“নাও এবার খুলে দেখো। সেকেলে মানুষ আমরা, আজকালকার মেয়েদের পছন্দের সাথে ঠিক মেলেনা আমাদের পছন্দ। তবুও শখ হলো। শখ হওয়াটা তো দোষের না, তাইনা?”
ইরা কাঁপা হাতে বাক্সটা খুলতেই থমকে যায়। চোখজোড়া হঠাৎ জ্বলজ্বল করে ওঠে তার।
একটা সরু, পাতলা স্বর্ণের চেইন। সাথে লকেটও আছে, লাল পাথরের। ইরার পাথর সম্পর্কে ধারণা নেই। রুবি নামক একটা পাথর আছে, তার রঙ লাল। অনেক দামী শুনেছে, কখনো চোখে দেখেনি। এটা হয়তো রুবি নয় কিন্তু দামটা কম হবে না মোটেই। শেষ বিকেলের আলোয় চিকচিক করছে পাথরটা, একদম চোখে পড়ার মতো।
“এটা লাল প্রবাল। লকেটটা আরশাদের দাদীর। আরশাদের দাদা তার নূরবউয়ের জন্য কিনেছিলেন এটা গুজরাট থেকে। উনি ব্যবসায়ী মানুষ ছিলেন। ব্যবসার কাজেই গিয়েছিলেন সেখানে। আরশাদের দাদী এটা আমাকে দিয়েছিলেন। আমার স্বর্ণের জিনিসের উপর ঝোঁক কম বরাবরই। সেভাবে কখনো ব্যবহার করিনি। আজ চেইনটা তোমার জন্য আনার পর হঠাৎ এটার কথা মনে পড়ে। দেখো কেমন মানিয়েছে।”
ইরার চোখ সরে না। এতো সুন্দর কীভাবে হতে পারে একটা গহনা? স্বর্ণের জিনিস খুব পছন্দ ইরার। কখনো সেভাবে পরার সৌভাগ্য হয়নি। সত্যিই এই দারুণ গহনাটা আজ থেকে তার?
“পছন্দ হয়নি?”
ইরা গাঢ় গলায় বললো,”খুব পছন্দ হয়েছে খুব। আমার হৃদয় আর্দ্র হয়ে পড়ছে। আমার মুগ্ধতা বোঝানোর ভাষা নেই আমার।”
রাবেয়ার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। পরক্ষণেই আবার হাসি মুছে ফেলে।
“তাহলে গলায় পরো, দেখি কেমন লাগে।”
ইরা স্মিত হেসে আয়নার সামনে দাঁড়ায়।
জিনিসটা হাতে নিতেই একরাশ ভালো লাগা আবারও ছুঁয়ে যায় তাকে।
চেইনের হুকটা লাগাতে অসুবিধা হওয়ায় রাবেয়া সাহায্য করে। ইরা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ।
“বাহ কি ভীষণ সুন্দর লাগছে তোমাকে। তোমার গায়ের রঙ একদম সোনার মতো। সোনা রঙা গায়ে স্বর্ণের গহনাই তো মানায়।”
ইরা অবাক হয়ে বললো,”কিন্তু এই গায়ের রঙের জন্যই তো হীনমন্যতায় ভুগেছি সবসময়৷ আমি ফর্সা নই, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের। আপনার মতো ফর্সা গায়ের রঙেই স্বর্ণ বেশি মানায়।”
“একদমই নয়, শ্বাশত বাঙালি নারীর গায়ের রঙ তোমার। কখনো হীনমন্যতায় ভুগবে না। নিজের যত্ন নিবে, এতে দেখবে আরো সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে।”
ইরা স্তম্ভের মতো আয়নার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বারবার হাত বুলায় নিজের গলায়।
“আরশাদ এলে ওর উপহার ওকে দেখাবে, কেমন? তুমি তাহলে বিশ্রাম নাও, আমি আসছি।”
রাবেয়া পা বাড়িয়ে চলে যেতে গেলেই ইরা তাকে ডাকে, তার গলায় আর্দ্রতা মিশে।
“একটু দাঁড়ান।”
“বলো।”
ইরা ধীর পায়ে হেঁটে রাবেয়ার সামনে যেয়ে দাঁড়ায়।
আচমকা রাবেয়াকে দুই হাতে শক্ত করে চেপে জড়িয়ে ধরে। রাবেয়া অপ্রস্তুত হয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়ায়।
“আপনাকে কি আমি মা বলে ডাকতে পারি? আমার তো মা নেই। সৎমাকে ছোট মা বলে ডাকতাম। ভালোবেসে নয়, ডাকতে হয় তাই ডাকতাম। উনি কখনো ভালোবেসে সাড়াও দেননি। আমার মা বলে ডাকতে খুব ইচ্ছা হয়।”
রাবেয়া একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ইরার পিঠে হাত রাখে আলতো করে।
“তোমার কেনো মনে হলো আমি ভালোবেসে সাড়া দিবো?”
“সাড়া না দিলেও ডাকবো।”
“আমার ছেলেমেয়ে দু’টো আমার খুব শখের। আমার একটা সূক্ষ্ম অহংকার ছিলো ভিতরে ওদের নিয়ে। সেই ছেলে আমাকে না জানিয়ে বিয়ে করে নিয়ে চলে এলো। আমি নীলুকে যে স্থান দিতে চেয়েছিলাম সে স্থান আমার ছেলে তোমাকে দিয়েছে। আমি মেনে নিতে পারিনি। ব্যাপারটা এমনও না যে বাংলা সিনেমার মতো এখন সব মেনে নিয়ে তোমাকে পুরোপুরি কাছে টেনে নিতে পারবো। তবে এটা ঠিক আমাদের পরিকল্পনার চেয়েও আল্লাহর পরিকল্পনা অধিক শ্রেয়। তিনি যা করেছেন ভালো করেছেন। আমার দিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে। তুমি আমাকে মা বলে ডেকো। আমি সাড়া দিবো, ভালোবেসেই দিবো। সময়ের সাথে সেই ভালোবাসা সমানুপাতিক হারে বাড়বে আশা করি।”
ইরা মাথা তুলে বললো,”কি সুন্দর গুছিয়ে কথা বলেন আপনি।”
রাবেয়া মুচকি হেসে বললো,”ছেলেরা স্ত্রীর মাঝে মায়ের ছায়া খুঁজতে চায়। হতে পারে এই কথা বলার গুণের জন্যই তোমার প্রেমে পড়তে বাধ্য হয়েছে ছেলেটা।”
ইরা মাথা নিচু করে দাঁড়ায়। অদ্ভুত একটা সুখ সুখ অনুভূতি হচ্ছে তার। আজকের এই বিকেলটা এতো সুন্দর কেনো? কেনো হতে হবে এতো দারুণ? এমন বিকেল দু’একটা জীবনে এলে তো ভীষণ বাঁচতে ইচ্ছে করে, মৃত্যুকে ছুঁতে খুব ভয় লাগে।
★
সাইড ল্যাম্প জ্বালাচ্ছে আর নেভাচ্ছে নীলু। রাত বাজে আড়াইটা, চোখে ঘুম নেই। সারাদিনটাই কেমন গুমোট গেছে। বাবার সাথে মেয়েরা যতোই মিশুক হোক না কেনো, মায়ের অভাব অপূরণীয়। জীবনের এক পর্যায়ে এসে মেয়েদের মা’কে ভীষণ ভাবে প্রয়োজন হয়। এখন যেমন অনুভব করছে নীলু মায়ের অভাব।
“নীলু, ঘুমাস নি মা?”
নীলু তাড়াতাড়ি করে ল্যাম্প জ্বালিয়ে দেয়। বাবা অসুস্থ হওয়ার পর থেকে দরজা খোলাই রাখে।
নীলু বিছানা ছেড়ে উঠে আসে।
“বাবা তুমি এখন? শরীর ঠিক আছে?”
নিজাম হোসেন মৃদু হেসে ঘরে ঢোকে। নীলু উদ্বিগ্ন মুখে বাবার পিছু পিছু হাঁটে।
“বাবা….”
“বোস আমার সামনে।”
নীলু অস্থির মুখে বসে। নিজাম হোসেন চেয়ারে শরীর এলিয়ে দেয়।
“দুশ্চিন্তা করছিস কিছু নিয়ে?”
“কই না তো।”
নিজাম হোসেন আপন মনে হাসে। নীলু কাঠের মতো বসে থাকে।
“অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করে মন বা মস্তিষ্ককে কষ্ট দিস না। মন যা বলে শোন।”
নীলু আনমনে বললো,”হুট করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত কি জীবনের জন্য মঙ্গলজনক?”
“সবসময় না, আবার অনেক সময় তা হয়।”
“তাই বুঝি বাবা?”
“হ্যা তাই। তোর মায়ের সাথে আমার সাক্ষাৎ, প্রেম, বিয়ে সবটাই হুট করেই হয়েছিলো। একদিন মজা করে তোর মা’কে বলি চলো বিয়ে করে ফেলি। সে সাথে সাথে রাজি হয়ে যায়। আমি তখন মাত্র চাকরিতে ঢুকেছি, তোর মা ইডেনের ছাত্রী। ঝোঁকের মাথায় চলে গেলাম নিউ মার্কেটে। আড়াইশো টাকার লাল চুমকি বসানো শাড়ি আর একশ বিশ টাকার লাল ওড়না কেনা হলো। গহনা বলতে তেমন কিছু না। দুই বন্ধুকে ডাকলাম, কাজী অফিসে গেলাম, বিয়ে হয়ে গেলো।”
নীলু মুচকি হেসে বললো,”তোমরা কি কখনো আফসোস করেছো এই হুট করে নেওয়া সিদ্ধান্তের জন্য?”
নিজাম হোসেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো,”আফসোস করেছি এটা ভেবে যে কেনো আমাদের পরিচয় বা বিয়েটা আরো আগে হলো না। মানুষ হিসেবে তোর মা ছিলো অসাধারণ। আমাকে কখনো আফসোস করার সুযোগ দেয়নি। সে কখনো করেছে কিনা জানিনা। জানার আগেই সে চলে গেলো। বেঁচে থাকলে বোধহয় জিজ্ঞাসা করতাম।”
“তার স্মৃতি আঁকড়েই এতোগুলো বছর কাটিয়ে দিলে। কখনো মনে হয়নি জীবনে আর কাউকে আনার কথা?”
“না মনে হয়নি। তার সাথে কাটানো সীমিত সময়ের স্মৃতি গুলো নিয়ে একটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া কঠিন কিছু না।”
নীলু ওড়নায় আঙ্গুল পেঁচায়। অবচেতন মনে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে।
“হঠাৎ এমন প্রশ্ন করলি? কি ভাবছিস?”
“জানিনা কি ভাবছি। মাথাটা কেমন এলোমেলো লাগছে। তুমি কি আমার মাথায় কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে দিবে বাবা? সেই ছোটবেলার মতো। আমি একটু ঘুমাতে চাই। তোমার কি একটু সময় হবে?”
“অবশ্যই হবে। তোর জন্য আমার সময় আছে আর থাকবে।”
নিজাম হোসেন খাটে এসে বসে। নীলু গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ে বাবার কোলে মাথা দিয়ে। চুলে আঙ্গুলের স্পর্শ পড়তেই চোখ জড়িয়ে আসে তার ঘুমে। আচ্ছা বাবাদের গায়ে যে মিষ্টি গন্ধটা তাকে একই সুবাসের কোনো পারফিউম কিনতে পাওয়া যায়না কেনো?
★
ঘড়ি হাতে বসে আছে ইরা। আরশাদ ঘুমিয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। এখনো বারোটা বাজেনি। ইরা পোড়া লাল রঙা একটা জড়িপাড়ের শাড়ি পরেছে। শাড়িটা তার নয়, এটাও নূরবউয়ের। মানে আরশাদের দাদীর। উনি খুব পর্দাশীল ছিলেন। বয়স হয়ে যাওয়ার পর শাড়ি পরতেন না খুব বেশি। কিন্তু এই শাড়িটা তার স্বামী তাকে এনে দিয়েছিলেন। তা-ও আবার বৃদ্ধ বয়সে এসে। আরশাদের দাদী তো অবাক। সে এই বয়সে এসে লাল শাড়ি পরবে? বুড়োর কি মাথা খারাপ হয়ে গেলো?
কিন্তু সত্যিই তাকে শাড়িটা পরতে হয়। পরে তার স্বামীকে দেখাতে হয়। তার পরদিন আরশাদের দাদা মারা যান। হুট করেই, সুস্থ মানুষ। হঠাৎ ঘুম থেকে আর ওঠেনি। তখনও তার নূরবউয়ের পরনে এই লাল শাড়ি ছিলো।
নূরবউ খুব শান্তভাবেই লাল শাড়ি খুলে সাদা কাপড় জড়ায় শরীরে। সে বুঝতে পারে তার বুড়ো স্বামীটা শেষবার তার নূরবউকে লালে দেখতে চেয়েছিলো।
এই শাড়ি তারপর থেকেই ভাঁজ করা। রাবেয়া বেগমের কাছেই ছিলো। রাবেয়া কখনো পরেনি। আজ ইরাকে দিয়েছে সে শাড়িটা। বলেছে তার নতুন লকেটের সাথে একদম মিলে যাবে, আজ যেনো সে এই শাড়িটাই পরে।
শাড়ির ইতিহাস জানার পর ইরার মন সাঁয় দেয়নি শাড়িটা পরতে। কিন্তু রাবেয়া বেগমের জোরজারিতে পরতেই হলো।
ইরা আয়নার সামনে দাঁড়ায়। লকেটটা আরশাদকে দেখায়নি সে এতোক্ষণ। নিশ্চয়ই চমকে যাবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে চিনতে পারেনা ইরা। তাকে ইন্দ্রাণীর মতো লাগছে। আঁচল গড়িয়ে পড়ছে নিচে। চুলে আলুথালু খোঁপা, হালকা কাজল আর ভ্রুযুগলের মাঝে ছোট্ট একটা টিপ।
রাত বারোটা বাজার অপেক্ষায় ইরা। আচ্ছা আরশাদ কি তাকে দেখে ভড়কে যাবে? হতভম্ব দৃষ্টি কি প্রেমে রূপ নিবে? তাকে কি সত্যিই আজ নূরবউয়ের মতো লাগছে দেখতে?
“শুনছেন?”
“হু।” আরশাদের অস্ফুট কণ্ঠ।
ইরা কোমলভাবে হাত রাখে আরশাদের গায়ে। সোনারঙা কিছু কুন্দনের চুড়ি তার হাতে রুনঝুন শব্দ করে ওঠে।
আরশাদ কি মনে করে ঘুম ঘুম চোখ মেলে তাকায়। আজ পূর্ণ চন্দ্র চলছে। শুক্লপক্ষের বিশাল এক চাঁদ উঠেছে আকাশে। তরল জ্যোৎস্না ঘরে ঢুকেছে। কারণ ইরা জানালা খুলে রেখেছে।
সেই অবাক জ্যোৎস্নায় ইরার অসামান্য রূপের পসরা দেখে ঘুম উড়ে যায় আরশাদের। ঝট করে উঠে বসে শোয়া থেকে।
হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকায় ইরার দিকে। ইরা মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়াতে থাকে।
“নূরবউ….”
“কি? আজ সত্যি সত্যি নূরবউ লাগছে আমাকে?”
রূপা রঙের চাঁদের আলো লকেটটার উপর পড়তেই চিকচিক করছে। ইরা অবাধ্য চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দেয়। উন্মুক্ত হয় গলার অংশ। চেইনটাও চিকচিক করে। আরশাদ উঠে দাঁড়ায় সাথে সাথে।
“এসব কি?”
ইরা আরশাদের দিকে এগিয়ে আসে। তার চোখে চোখ রেখে হাত দু’টো নিজের মুঠোর মধ্যে আঁকড়ে ধরে। দুই পায়ের পাতায় ভর দিয়ে উঁচু হয়ে আরশাদের ঠোঁটে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায়। পরক্ষণেই তার ফিসফিস কণ্ঠ আরশাদের মস্তিষ্কে ভয়াবহভাবে একটা ঝড় তুলে দেয়৷ যে ঝড়ের সময়কাল ক্ষুদ্র কিন্তু বিস্তার দীর্ঘক্ষণের।
“শুভ জন্মদিন আমার প্রিয় পুরুষ, আমার বেঁচে থাকার কারণ, আমার হৃদয়ে প্রলয় বয়ে আনা সুপুরুষ, আমার প্রেমিক, আমার ভালোবাসা। নিঃস্ব ইরাবতীর কাছে অফুরন্ত ভালোবাসাটুকু ছাড়া আর কোনো উপহার নেই আপনাকে দেওয়ার মতো।”
আরশাদ অবাক হওয়ার মাত্রা পার করেছে। ইরা এখনো তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, তার ওষ্ঠের খুব কাছাকাছি।
“ইরা আমি কি স্বপ্ন দেখছি?”
“বাস্তব যদি স্বপ্নের চেয়ে সুন্দর হয় তাহলে ক্ষতি কি?”
“এটা বাস্তব?”
“পরীক্ষা করে দেখুন। আপনার নূরবউ আপনার সামনে।”
আরশাদ ইরার উন্মুক্ত পিঠ জড়িয়ে পেটে হাত রাখে। ইরা কিছুটা কেঁপে শান্ত হয়ে যায়।
“এই মাখনের মতো স্পর্শ স্বপ্ন হতে পারেনা, এটা বাস্তব।”
ইরা মুখ টিপে হেসে বললো,”আচ্ছা?”
“এখন বলো এই সাজসজ্জার কারণ কি? এটা কে দিয়েছে?”
আরশাদ ইরার গলায় হাত রাখে।
“মা দিয়েছে।”
“মা?”
“হ্যা আমাকে উপহার দিয়েছে আজ। সাথে আপনার দাদীর এই লাল প্রবালের লকেটটিও দিয়েছেন। আর শাড়িটিও আপনার দাদীর। আপনার দাদা তার নূরবউকে এটা উপহার দিয়েছিলেন।”
আরশাদ ইরার বুকে নাক ঘষে। ইরা তার চুলগুলো চেপে ধরে আলতো করে।
“মা আপনাকে উপহার না দিয়ে আমাকে দিয়েছেন। বলেছেন এতেই নাকি আপনি বেশি খুশি হবেন।”
আরশাদ মাথা তুলে হালকা হাসে। মা সন্তানকে ভালোই বোঝে।
★
ছাদের রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরশাদ। ইরা ছাদের ঠিক মাঝে, যেখানে তীর্যক ভাবে চাঁদের আলো কিরণ ছড়াচ্ছে। চুলের খোঁপা খুলে দিয়েছে। বিষন্ন মৃদু হাওয়ায় চুলগুলো মাঝে মাঝে উড়ে মুখের উপর জমা হচ্ছে। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে নাকের ডগায়, ঠোঁটের উপরে। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে তাকে আরশাদ। ইরা কি জানে তার প্রেমে কাতর হয়ে পড়া এক যুবক কতোটা তৃষ্ণা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে?
ইরা জানেনা, কারণ সে মস্ত বড় চাঁদটা দেখতে ব্যস্ত। আজকের মতো এতো সুন্দর এর কখনো চাঁদকে মনে হয়নি তার।
আরশাদ পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরায়। ইরা ভ্রু কুঁচকে সেদিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
“আপনি কি জানেন সিগারেট খুব অদ্ভুত একটা জিনিস।”
আরশাদ ধোঁয়া ছেড়ে বললো,”কেমন?”
“এটা এমনই একটা তামাকে মোড়া শলাকা, যার এক পাশে থাকে আগুন আরেকপাশে থাকে একটা বেকুব।”
আরশাদ অবাক হয়ে বললো,”তুমি কি আমাকে বেকুব বললে?”
“যারা টাকা দিয়ে ধোঁয়া কিনে উড়ায়, ক্যান্সারকে জোর করে ডেকে আনে তারা বেকুব নয়?”
আরশাদ নিঃশব্দে হেসে সিগারেট ফেলে দেয়।
“ফেলে কি হবে? আবার খাবেন পরে।”
আরশাদ গাঢ় গলায় বললো,”কি করবো? তোমাকে দেখলে মাথা ঠিক থাকেনা। প্রচুর ক্যাফেইন দরকার হয়।”
“আমি আসার আগে তাহলে কেনো খেতেন?”
“তোমার প্রতীক্ষা করতাম তাই….”
ইরা আরশাদের বুকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বললো,”সব উত্তর তৈরি থাকে তাইনা?”
আরশাদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
এরপর হঠাৎ ইরার দিকে তাকায় তীক্ষ্ণ চোখে।
“ইরা।”
“বলুন।”
“তুমি কি জানো এই শাড়িটার ইতিহাস? এই শাড়ি আমার দাদী যে রাতে পরেন তার পরদিন আমার দাদা মারা যান।”
ইরা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যায়।
“হ্যা মা বলেছে। আমি এটা পরতেও চাইনি। উনি জোর করে…”
“আচ্ছা আমিও যদি কাল মারা যাই?”
ভয়াবহ ভাবে চমকে উঠে কিছু দূরে ছিটকে যায় ইরা। বিস্ফারিত চোখে তাকায় আরশাদের দিকে। আরশাদ শান্ত হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
“কি বললেন আপনি? কি বললেন?”
“রিল্যাক্স ইরা, আই অ্যাম জাস্ট জোকিং!”
“চুপ করুন আপনি, চুপ করুন।”
“ইরা….”
আরশাদ ইরাকে স্পর্শ করতে গেলে ইরা আরো দূরে সরে যায়। ভয়ে কাঁপছে সে, ভীষণ ভাবে কাঁপছে।
“ইরা এতোটা ভয় পাওয়ার কিছু হয়নি। আমি তোমার সামনে, দেখো তাকিয়ে।”
“আপনি এটা কেনো বললেন?”
“বললাম তো মজা করে বলেছি।”
“এটা কেমন বাজে মজা?”
“আচ্ছা আমি দুঃখিত। আমি কান ধরছি। দয়া করে এবার একটু হাসো?”
ইরার কম্পন থামে না। বুকটা কেমন করছে হঠাৎ, শ্বাসকষ্টের মতো। চোখমুখ লাল হয়ে ওঠে মুহুর্তেই।
“ইরা শান্ত হও। আমি এমনিই বলেছি। এমন করছো কেনো?”
“আমি ঘরে যাবো। আমি এই শাড়ি খুলবো, এক্ষুনি খুলবো।”
“ইরা….”
ইরা আরশাদকে রেখেই ছুটতে থাকে। অগত্যা আরশাদও ইরার পিছে দৌড়ায়। ইরা যেনো পাখির মতো উড়ে যেতে থাকে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ঘরে চলে আসে। আরশাদও ঢোকে সাথে সাথে।
“ইরা এগুলো কি ছেলেমানুষী? তুমি যথেষ্ট বাস্তববাদী, সবকিছু বোঝো। আমি একটা কথা বলে ফেলেছি, তার জন্য তুমি….”
ইরা ভোঁতা মুখে শাড়ি খুলতে থাকে। আরশাদ দরজায় দুই হাত বুকে গুঁজে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
হঠাৎ ইরার হুঁশ আসে। আরশাদের নেশাক্ত দৃষ্টি দেখে নিজের দিকে তাকাতেই অপ্রস্তুত হয়ে যায়।
অন্য কিছু ভাবার সময় ইরা পায়না। আরশাদের শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু সে রাতে ইরা আরশাদের ভালোবাসায় সাড়া দিতে পারেনা। বারবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। তার মনটা কেমন করছে। দূরে মেঝেতে পড়ে থাকা শাড়িটার দিকে তাকিয়ে বারবার চমকে ওঠে। বিশ্রীরকম একটা ভয় ঢুকে যায় মনে। হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে এসে ধকধক করতে থাকে। আরশাদকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দুই হাতে। কোনোভাবেই এই মানুষটাকে সে হারাতে পারবে না, সে নিজেই হারিয়ে যাবে তাহলে……
(চলবে……)
#মন_কেমনের_মরশুম
পর্ব: ৩০
ইরা আজকে কলেজে যায়নি। আরশাদ বের হওয়ার পরেই সে রান্নাঘরে ঢুকেছে। কোমরে আঁচল পেঁচিয়ে মহাসমারোহে চলছে রান্নাবান্না। আজ সকাল থেকেই প্রকৃতি উত্তাল। আকাশ কালো জমাট মেঘে দিশাহারা। বৃষ্টি নেই যদিও, তবুও যেনো মেঘ পানিতে টইটম্বুর। যে কোনো সময় দুকূল ছাপিয়ে নামবে জলধারা। বেশ কিছুদিন বৃষ্টির দেখা নেই, গরমে জীবন অস্থির। যদিও পরিবেশ এখনো উত্তপ্ত, ঘরের মধ্যে ভ্যাপসা গরম৷
ইরা এ কয়দিনে যা যা জেনেছে আরশাদের পছন্দ সম্পর্কে, আজ সব রান্না করবে। রাবেয়া দুইবার রান্নাঘরের দরজায় উঁকি দিয়ে দেখে গেছে, কিছু বলেনি। ইরা একমনে রান্না করছে। কপাল থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঘাম ঝরছে। তাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে দেখতে। প্রসাধনীর ছিঁটেফোঁটা নেই মুখে, তবুও কি এক অপূর্ব মায়া। রাবেয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ইরাকে সে মেনে নিতে চায় কিন্তু পরক্ষণেই নীলুর মুখটা ভেসে ওঠে চোখের পর্দায়। মেয়েটা যে তার সর্বস্ব দিয়ে আরশাদকে ভালোবেসেছিলো, সে ভালোবাসায় কোনো ভান ছিলো না। না বুঝে, আবেগ তাড়িত হয়ে একটা ভুল করলো, আর আরশাদ তাতেই তাকে মন থেকে সরিয়ে দিলো।
রান্না করতে করতে চিন্তা গুলো বেসামাল হয়ে ওঠে ইরার। আকাশের এই অবস্থায় আরশাদ অফিসে যাক মোটেই চাচ্ছিলো না ইরা। গোমড়া মুখে কফির মগটা এগিয়ে দেয় ইরা।
আরশাদ তখন মনোযোগ দিয়ে টাই বাঁধছিলো। মুখের সামনে কফির মগ দেখে মুচকি হাসে আরশাদ, ইরার মুখটাও আকাশের মতোই কালো হয়ে ছিলো, মেঘে ঢাকা।
আরশাদ টেনে নেয়। কফির মগ না, ইরাকেই। তাল সামলাতে না পেরে ইরা হকচকিয়ে যায়, ফলস্বরূপ মগ থেকে কিছুটা কফি আরশাদের আকাশী শার্টের উপর পড়ে। সাথে সাথে দাগ হয়ে যায়।
“এটা কি করলেন?”
“কি করলাম?”
“এইযে এতো জোরে টান দিলেন আমাকে। শার্টের উপর যে কফি পড়লো। এক্ষুনি এটা খুলুন, আমি অন্য একটা শার্ট ইস্ত্রি করে দিচ্ছি।”
“দরকার নাই।”
“দরকার নাই মানে? আপনিই তো বললেন আজ নাকি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। কতো করে বললাম আজ অফিসে যাওয়ার দরকার নেই। মিটিং-এর অযুহাতে আমার কথা শুনলেন না। এখন মিটিং-এ যদি এই দাগ হয়ে যাওয়া শার্ট পরে যান, সেইটা ভালো হবে? মানুষ কি বলবে?”
আরশাদ ইরার গালে আলতো করে হাত ছুঁয়ে দিয়ে বললো,”মানুষ আবার কি বলবে?”
ইরা আরশাদের হাত সরিয়ে দেয়। মুখ ভোঁতা করে দাঁড়িয়ে থাকে।
“মানুষ বলবে আপনার বউ আপনার কোনো খেয়াল রাখেনা।”
আরশাদ মন খারাপ করে বললো,”এখন সত্য যেটা তাতো মানুষ জানবেই।”
ইরা ভ্রু কুঁচকে তাকায় আরশাদের দিকে।
“আমি আপনার খেয়াল রাখি না?”
“রাখো?”
“না তা রাখবো কেনো? সকাল, বিকাল, রাত যখন কফি খেতে চান বানিয়ে এনে দিই। পরদিন অফিসে কি পরে যাবেন রাতেই ইস্ত্রি করে রেখে দিই। রাতে ঘুম না এলে যখন মিষ্টি করে বলেন, নূরবউ মাথায় হাত বুলিয়ে দিন, নাহলে ঘুম আসবে না। নিজের ঘুম বাদ দিয়ে আপনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিই। তারপরেও আমি নাকি খেয়াল রাখিনা, ভালো….”
ইরা কফির মগটা টেবিলে রেখে চলে যেতে গেলেই আরশাদ তার হাত ধরে টেনে এনে আয়নার সামনে দাঁড় করায়। পিছন থেকেই ইরাকে জড়িয়ে তার কাঁধে থুঁতনি ঠেকায়।
“এতো রাগ কেনো নূরবউ?”
“ছাড়ুন আমাকে।”
“ছাড়ার জন্য তো ধরিনি। ছাড়লে তো সেদিনই ছাড়তে পারতাম যেদিন প্রথম তোমাকে দেখি। একটু পরেই তোমার বিয়ে, একটা বুড়োর সাথে। এক অপার্থিব মায়া দেখেছিলাম ওই চোখজোড়ায়। কি হয়েছিলো সেদিন জানিনা। জীবনের একটা কঠিন সিদ্ধান্ত মাত্র দশ মিনিটে নিয়ে নিলাম।”
ইরা গাঢ় গলায় বললো,”আফসোস করছেন তার জন্য? কিংবা অনুশোচনা?”
“আফসোস, অনুশোচনার অধ্যায় অনেক আগেই পার করে এসেছি।”
ইরা ফিসফিস করে বললো,”এখন তাহলে কোন অধ্যায় চলছে?”
আরশাদ ইরার উন্মুক্ত পিঠে ঠোঁট ছোঁয়ায়, ইরা বরাবরের মতো শিউরে ওঠে। আরশাদের হঠাৎ স্পর্শ গুলো সেই প্রথম স্পর্শের মতো শিহরণ জাগায় তার শরীরে।
“এখন যে অধ্যায় চলছে, তা বাড়ি ফিরে জানাবো।”
ইরা ঘুরে তাকায় তার দিকে।
“আজ না গেলে সত্যিই হয়না?”
আরশাদ ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ ভেবে বললো,”আচ্ছা যাও আজ তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো। মিটিংটা শেষ করেই সোজা তোমার কাছে। খুশি?”
ইরার বুকটা কেমন যেনো করে। খুশি হতে চায় কিন্তু পারেনা। তবুও জোর করে মুখে একটা হাসি টেনে ধরে রাখে। আরশাদ ইরার কপালে একটা চুমু এঁকে বেরিয়ে যায়। ইরা দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।
এতোবার বলার পরেও আরশাদ শার্ট বদলায় না। ওই শার্টের উপরই ব্লেজার পরে নেয়, যাতে দাগটা বোঝা না যায়। শুধু যাওয়ার সময় বলে যায়,’দাগ থেকে যদি ভালো কিছু হয়, তাহলে দাগই ভালো।’
ইরা আরশাদের কথার আগামাথা বুঝতে পারেনা। দাগ থেকে আবার কি ভালো হবে? নিজে যা বলবে আরশাদ সেইটাই করবে। আর কারো কোনো কথা শুনবে না।
★
রান্না করতে করতেই এসব ভাবে ইরা। মাঝে মাঝে বুকের বাম পাশের নিচটায় কেমন চিলিক দিয়ে যন্ত্রণা করে উঠছে, কেমন একটা ভোঁতা যন্ত্রণা। ইরা পাত্তা দেয়না, একটা গ্যাস্টিকের ওষুধ খেয়ে নেয় শুধু। মনে মনে ভাবে, আরশাদ তো তাকে কতো উপহার দেয়। কোনো কারণ ছাড়াই হুটহাট উপহার দিয়ে চমকে দেয়। আজ আরশাদের জন্মদিন, আর সে কিছুই দিবে না? কিন্তু কীভাবে দিবে? তার কাছে তো কোনো টাকাপয়সা নেই। আরশাদ যা হাতখরচ দেয়, তা-ও প্রায় শেষ। ইশ! কেনো যে একটু জমিয়ে রাখলো না। নিজের উপর নিজেরই সীমাহীন রাগ ওঠে ইরার।
হঠাৎ কিছু একটা ভেবেই মনটা শীতল হয়ে যায় তার। আচ্ছা, আরশাদের প্রিয় ভ্রমর যে আর কেউ নয়, বরং তার স্ত্রী এটা যদি আরশাদ জানতে পারে? যাকে এক নজর দেখার জন্য আরশাদ ছটফট করে, কীভাবে এতো সুন্দর কারো লেখা হতে পারে এই চিন্তাতেই যে মগ্ন। সে যদি কোনোভাবে জানতে পারে, যে নারীটিকে নিয়ে তার বসবাস সেই নারীটিই ভ্রমর। তবে কি সে চমকে যাবে না ভীষণ ভাবে? এর চেয়ে বড় উপহার কি আরশাদের জন্য আর কিছু হবে?
ইরা কড়াইতে খুন্তি চালাতে চালাতেই আনমনে ভাবতে থাকে। পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, সে যা ভাবছে তাই করবে। এরচেয়ে বড় উপহার আর হয়না আরশাদের জন্য। আজকেই মোক্ষম দিন। আজই সে জানাবে আরশাদের নূরবউ-ই সেই ভ্রমর। ইরা মনে মনে হাসে।
“বাহ রান্নার সুবাসে তো ঘরে থাকা দায়। কি রান্না চলছে মা?”
ইরা চমকে ওঠে, আরশাদ সত্যটা জানার পর কেমন শিউরে উঠবে এসবই ভাবছিলো সে মনে মনে। রাশেদুলের ডাকে ধাতস্থ হয়।
“বাবা….”
“ভীষণ সুন্দর গন্ধ বের হচ্ছে তো। বেশ ভালো আয়োজন মনে হচ্ছে আজ।”
ইরা কিছুটা লজ্জা পেয়ে হাসে মাথা নিচু করে।
রাশেদুল এগিয়ে এসে ইরার মাথায় হাত রাখে।
“এভাবেই থেকো তোমরা। একে অপরের অংশ হয়ে। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ভুল বোঝাবুঝি, ঝগড়া হওয়া খুব স্বাভাবিক। বরং না হলেই সেই সম্পর্কে প্রাণ থাকে না। কিন্তু সেই ঝগড়া যেনো দূরত্বের কারণ না হয় কখনো। মনে রাখবে, একে অপরের প্রতি রাগ বা ক্ষোভ নিয়ে কখনো রাত্রিযাপন করবে না। আমি সারাজীবনই এটা মেনে চলেছি।”
ইরা অবাক হয়ে রাশেদুলের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই মানুষটার কথা শুধু শুনতেই ইচ্ছা করে। এতো সুন্দর করে কথা বলে যেনো কলেজের ক্লাসে লেকচার দিচ্ছে। একজন অসাধারণ মানুষ।
“জানো মা, আরশাদ যেদিন পৃথিবীতে আসে সেদিনও এমন মেঘলা পরিবেশ ছিলো। বৃষ্টি হয়নি এক ফোঁটাও, কিন্তু আকাশ কালো মেঘে ছয়লাপ। হঠাৎ ওর মা অসুস্থ হয়ে যায়, তখনও সময় হয়নি। প্রথম সন্তান, কিছু বুঝতে পারছিলাম না কি করবো। হাসপাতালে নিতে নিতে ওর মায়ের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়। ডাক্তার জানায় স্ত্রীকে বাঁচাতে চাইলে সন্তানকে ত্যাগ করতে হবে। এ সন্তান পৃথিবীর আলো দেখবে না। আমি ভেঙে পড়ি। কিন্তু আমার মা ছিলেন আমার পাশে। সে আমাকে ভেঙে পড়তে দেয়নি। বললো বাবা নামাজে দাঁড়াও। আমি নামাজে দাঁড়িয়ে যাই সাথে সাথে। পৃথিবীর আলো দেখানোর ক্ষমতা একজনের, ওইযে উপরে যিনি বসে আছেন। আর কারো সে ক্ষমতা নেই। আমার মা এই দৃঢ় বিশ্বাসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি মোনাজাত ধরি। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক শিশুর আর্তচিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
সাদা তোয়ালেতে মোড়া এক অসম্ভব রূপবান শিশু বাচ্চা আমার হাতে তুলে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে অদ্ভুত ভাবে মেঘ কেটে যায়। আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায়। মেঘ কেটে রৌদ্রজ্বল আকাশ যেনো জানান দেয় আমার খুশি। আমার সেই আরশাদ, আমার ছেলে আরশাদ। আমার মা সাথে সাথে তার নাম দেয় আরশাদ জুবায়ের।”
ইরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে তাকে রাশেদুলের দিকে। জীবন সুন্দর, আসলেই ভীষণ সুন্দর। যদি মানুষটি সঠিক হয়।
★
পাশাপাশি হাঁটছে নীলু আর রোশান। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই মনটা ভার হয়ে ছিলো নীলুর। আজ আরশাদের জন্মদিন। প্রতিবার আজকের এই দিনে বিভিন্ন ভাবে আরশাদকে চমকে দিতো সে। উপহার দিতো, রান্না করে খাওয়াতো। কিন্তু সেসব আর কিছুই হবে না। দুইজনের জীবন যেনো সমান্তরাল, শুধু পাশাপাশি চলবে কিন্তু আর কখনোই এক হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
নীলু নিজেও কি চায় এক হতে? হয়তো বা না। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অদ্ভুত, সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছেন এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মাত্র শুন্য দশমিক তিন শতাংশ আমরা জানতে পারি। বাকিটা থেকে যায় অজানা। নীলু মনে করে তারচেয়ে অদ্ভুত মানুষের মন। কখন কি চায়, কখন অনুভূতিগুলো বদলে যায় মানুষ নিজেও বুঝতে পারেনা।
উল্টাপাল্টা চিন্তার মাঝেই ফোনে টুং করে একটা শব্দ হয়। ভ্রু কুঁচকে ফোনটা হাতে নিতেই ছোট্ট একটা ধাক্কা খায় সে। রোশান ছোট্ট একটা বার্তা পাঠিয়েছে। তড়িঘড়ি করে ফোন খুলেই দেখতে পায় রোশানের লেখাটুকু।
‘পর্দা সরিয়ে আকাশটা দেখুন। আকাশে কৃষ্ণ কালো মেঘ, বাতাসে সোঁদামাটির গন্ধ। এই আবহাওয়ায় হেঁটেছেন কখনো পিচ ঢালা রাস্তায়? হাঁটতে চান? চাইলে আপনাকে পনেরো মিনিট সময় দেওয়া হলো। আমি আপনাদের বাড়ির সামনে থাকবো। পনেরো মিনিট অতিক্রান্ত হলে ভাববো আপনি চাননি, ফিরে যাবো আমি।
আর হ্যা চাইলে একটা সাদা শাড়ি পরতে পারেন, সাদায় আপনাকে ভীষণ মানায়।’
নীলু হতভম্ব হয়ে বসে থাকে ফোনটা হাতে নিয়ে। এসব কি? কিশোর বয়সের প্রেম জেগেছে নাকি লোকটার মধ্যে? নীলু কি সাড়া দিয়েছে একবারও? এতোটা আত্মবিশ্বাস কোথায় পেলো এই লোক?
নীলু একবার ভেবেছে বেরোবে না। টেক্সটটা এসেছে তিন মিনিট হয়ে গেছে। আর আছে বারো মিনিট। বারো মিনিটে সাদা শাড়ি পরে বের হওয়া সম্ভব না। আর সম্ভব হলেও বা কি? উনি কে যে উনার কথা রাখতে হবে সবসময়?
কি মনে করে সত্যি সত্যি পর্দাটা সরায় নীলু জানালা থেকে। আকাশ দেখে মনের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে তার। মিলিসেকেন্ডের মধ্যে সিদ্ধান্ত পালটায় সে।
বিদ্যুৎ বেগে খাট থেকে নামে। তবে সাদা নয়, মায়ের একটা কালো জাপানি জর্জেটের শাড়ি পরে নেয় ঝটপট। তেমন কোনো গহনা বা সাজসজ্জা নয়, শুধু গতদিনের চুড়িগুলো থেকে দু’টো কালো কুন্দনের চুড়ি দুই হাতে। একটু খানি কাজল, আর ভ্রুযুগলের মাঝে ছোট্ট একটা কালো টিপ।
ঘড়ির দিকে তাকাতেই চমকে ওঠে। প্রায় বাইশ মিনিট হয়ে গেছে। রোশান কি চলে গেছে? শাড়ি পরতে একটু সময় লাগে তো নাকি?
নীলু ছুটে বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই ফিক করে হেসে দেয়। রোশান দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে আজ পাঞ্জাবি, ধূসর রঙের। তাকে পাঞ্জাবিতে প্রথম দেখলো নীলু। নাহ, দেখতে তো ভালোই আছে লোকটা!
নীলুর দিকে একবার তাকিয়ে ছোট্ট করে হাসে রোশান, কিছু বলেনা। সম্ভবত কালো শাড়ি দেখেই।
“হাসছেন কেনো?”
“এমনিতেই।”
“এমনিতে হাসে পাগলেরা। আপনি কি পাগল?”
“হয়ে যাচ্ছি মনে হয় আস্তে আস্তে।”
নীলু বাঁকা ঠোঁটে হেসে বললো,”আপনার কি মনে হয় এই বয়সেও এসব ছেলেমানুষী করা আপনাকে মানায়?”
“মেয়েমানুষী করতে বলছেন নাকি?”
নীলু অসহিষ্ণু হয়ে বললো,”মেয়েমানুষী আবার কি? ছেলেমানুষী বলতে বুঝিয়েছি…..”
রোশান দাঁড়িয়ে পড়ে হঠাৎ।
“কি হলো? দাঁড়ালেন যে?”
“আপনাকে ধন্যবাদ নীলু।”
নীলু কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললো,”ধন্যবাদ কিসের?”
“আমার কথা রাখার জন্য।”
নীলু কিছুটা ইতস্তত করে বললো,”মোটেই তা না। আবহাওয়াটা ভালো ছিলো তাই।”
“আচ্ছা।”
রোশান আবার হাঁটতে থাকে, নীলু কিছুটা দূরত্ব নিয়ে পাশাপাশি। ভালোই লাগছে নীলুর, অন্য রকম একটা অনুভূতি তৈরি হচ্ছে। চেষ্টা করেও নিজের উপর রাগ করতে পারছে না একবারে রোশানের কথা মেনে নেওয়ার জন্য।
“আপনার ডিউটি নেই আজ?”
“ছুটি নিয়েছি।”
“কেনো?”
“যদি বলি আপনার জন্য বিশ্বাস করবেন না। তারচেয়ে বাদ দিন।”
নীলু আলুথালু পায়ে হাঁটে। দুইটা অতৃপ্ত প্রাণ। দুইজনই ভালোবেসে কষ্ট পেয়েছে। এই দুই অতৃপ্ত প্রাণ এক হতে চাইছে। কিন্তু প্রকাশ করতে পারছে না।
“আচ্ছা একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি? যদি রাগ না করেন?”
নীলু কথায় রোশান শান্ত গলায় বললো,”করুন।”
“আপনি আর বিয়ে করেননি কেনো?”
রোশান নিঃশব্দে হেসে বললো,”মনের মতো কাউকে পাইনি তাই।”
“মনের মতো বলতে? রূপবতী কাউকে পাননি?”
রোশান আবারও হাসে, এবার কিছুটা শব্দ করে।
“কি হলো? হাসির মতো কিছু বললাম?”
“ময়ূরকে সবাই পছন্দ করে, তার রূপে মুগ্ধ হয়না এমন মানুষ খুব কম। কিন্তু সেই মানুষ ময়ূরকে পছন্দ করতে পারেনা, যে ময়ুরকে সাপ খেতে দেখেছে।”
নীলু অবাক হয়ে বললো,”তার মানে?”
“যখন সুন্দর মুখের পিছনের কুৎসিত আচরণ কেউ দেখে ফেলে তখন সেই মুখকে আর সুন্দর লাগে না নীলু ম্যাডাম। আমার সাবেক স্ত্রী ছিলেন পূর্নিমার চাঁদের মতো সুন্দর। কিন্তু তার ভয়াবহ প্রতারণা আমি নিজে চোখে দেখেছিলাম। এরপর আর কারো সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেনা। আমি এমন কাউকে চাই যাকে আমি চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে পারবো। সে তথাকথিত সুন্দর হোক বা না হোক তাতে আমার বিশেষ মাথাব্যথা নেই। শুধু আমি যেনো তার কাছ থেকে প্রতারিত না হই। বাদবাকি সৌন্দর্য আমি তাকে নিবেদন করবো।”
নীলু ঘোরলাগা চোখে রোশানের দিকে তাকায়। শেষের কথাটা কানে বাজছে তার। ‘বাদবাকি সৌন্দর্য আমি তাকে নিবেদন করবো।’ কি সুন্দর করে বললো!
বেশ কিছু রাস্তা চুপচাপ হাঁটার পর রোশান নীলুর দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বললো,”ধন্যবাদ কালো শাড়ি পরে আসার জন্য। কালো আমার প্রিয় রঙ।”
নীলু ভ্রু কুঁচকে বললো,”কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন সাদা….”
“সাদা শাড়ি পরতে তাই তো?”
নীলু মাথা নাড়ে।
রোশান অন্য দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসে। নীলু কিছু না বুঝেই তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
“এ কয়দিনে আপনাকে যা চিনেছি আপনি কারো কথা মানার মতো মানুষ নন। আমার কথা তো না-ই। যা বলবো তার বিপরীতটা করবেন। তাই সাদা পরতে বললাম, সাদার বিপরীত তো কালোই তাইনা?”
কথাটা শেষ করেই রোশান নীলুর দিকে তাকিয়ে হাসে সুন্দর করে। পকেট থেকে একটা কালো সানগ্লাস বের করে চোখে পরে।
‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো…”
গুণগুণ করে গান গাইতে গাইতে রোশান এগিয়ে যায়।
স্তম্ভিত হয়ে নীলু দাঁড়িয়ে থাকে মাঝরাস্তায়। তাকে এভাবে বোকা বানিয়ে দিলো এই লোকটা? ইচ্ছা করছে বাড়িতে ফিরে সত্যি সত্যিই সাদা শাড়ি পরে চলে আসতে। দেখে তো মনে হয় ভাজা মাছটা উলটে খেতে জানেনা। মানুষকে বোকা বানাতে তো ওস্তাদ। নীলু মুখ বাঁকায় রোশানের দিকে তাকিয়ে।
★
‘জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে তোমার সাথে হলো পরিচয়।
অকুতোভয় নারীটির হঠাৎ কেনো তবে হারানোর ভয়?
বিচরণ করি তোমার শরীরের প্রতিটা শিরায়, তোমার কায়ায়।
মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চাওয়া ভ্রমর এখন বহুদিন বাঁচতে চায়।’
মুগ্ধ হয়ে কথাগুলো শুনতে শুনতে অফিসের সিঁড়ি দিয়ে ব্যস্ত পায়ে নামে আরশাদ। হাতঘড়ির দিকে তাকাতেই শুকনো ঢোক চাপে। ভদ্রমহিলাকে কথা দিয়েছিলো তাড়াতাড়ি ফিরবে। তিনি যে অপেক্ষা করে আছেন। কিন্তু মিটিং থেকে বের হতেই তো এতোটা দেরি হয়ে গেলো। তখনই বেরিয়ে পড়ছিলো আরশাস। হঠাৎ বস ডেকে নিলেন। গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট, আরশাদকে দেখতেই হবে। আরশাদ কিছু বলার সুযোগটাই পেলো না।
মনে মনে হাজারটা গালি দিলো আরশাদ, কাকে দিলো সে নিজেই জানেনা।
কাজটা কোনোরকমে শেষ করে ঊর্ধ্বশ্বাসে অফিস থেকে বেরিয়ে যায় সে। যাতে আর কেউ কোনো কাজ ধরিয়ে দেওয়ার সময় না পায়।
কিন্তু এতোটা দেরি হয়ে যাবে আরশাদ ভাবতেই পারেনি। রাত প্রায় আটটা। ফোনটা পকেট থেকে বের করতেই দেখে অনেকবার ফোন এসেছে। কে করেছে না দেখেই বুঝে যায় আরশাদ।
অফিসের পাশেই একটা ফুলের দোকান। একটা গোলাপের তোড়া বানাতে দিয়েই সিগারেট ধরায় একটা। মাথাটা জ্যাম ধরে আছে।
তোড়াটা হাতে নিয়েই আরশাদ হাসে। ভদ্রমহিলা ফুল ভালোবাসে। ফুল পেলেই খুশি হয়ে যায়। মাঝে মাঝে তাকে খুশি করার তাগিদ অনুভব করে আরশাদ। অল্পেই মেয়েটা খুশি হয়। বেশি কিছু না হলেও তার চলে।
বাইক স্টার্ট দিয়েই গতি সর্বোচ্চ বাড়িয়ে দেয় আরশাদ। খুব তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। এমনিতেই কতোটা দেরি হয়ে গেলো। এর বেশি দেরি করলে ফুলে কাজ হবে না। বিশেষ আদরেও কাজ হবে না। মেয়ে মানুষ তার শখের পুরুষের প্রতি রাগ করে আনন্দ পায়। এটা তাদের একটা বৈশিষ্ট্য।
কিছুদূর যেতেই আচমকা বৃষ্টি নামে। সারাদিন আকাশটা গুমোট হয়ে থাকার পর যেনো বান ডেকেছে প্রকৃতিতে। বলা নেই, কওয়া নেই ঝড়ো হাওয়া, সাথে লাগামহীন বৃষ্টি। পথচারীরা অগত্যা ঠাঁই নিয়েছে দোকানগুলোর সামনে। আরশাদ একবার ভাবে সে-ও বাইক থামিয়ে দাঁড়িয়ে যায় কিছুক্ষণ। এমন মুষলধারে বৃষ্টি, এক হাত দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছে না।
পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত পাল্টায়। এ বৃষ্টি কখন থামে ঠিক নেই। কোনোরকমে বাড়ি পৌঁছে গরম পানি দিয়ে গোসল করে নিলেই কাহিনী শেষ। যতো দ্রুত পারা যায় বাড়ি পৌঁছাতে হবে তাকে।
বাড়ি ফেরার পথে একটা অন্ধকার রাস্তা। রাস্তার আলো কিছুদিন যাবৎ বন্ধ, কেনো তা কে জানে। আরশাদ এখানে এসে গতি কিছুটা কমিয়ে দেয়। বাইকের আলো যেনো নিশ্ছিদ্র আঁধার আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
হঠাৎ রাস্তার মাঝে কিছু পড়ে থাকতে দেখে সে স্বল্প আলোয়। আরশাদ খুব দ্রুত ব্রেক কষে ফেলে। মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে দেখে একটা গাছের ডাল ভেঙে পড়ে আছে।
আরশাদ কিছুটা অবাক হয়। এতোটাও বিশাল ঝড় হয়নি যে গাছের ডাল ভেঙে পড়বে। একদম রাস্তার মাঝ বরাবর। দেখে মনে হচ্ছে কেউ ইচ্ছা করেই ফেলে রেখেছে।
আরশাদ এদিক ওদিক তাকায়। কোনো জনমানব নেই, কেমন নিস্তব্ধ চারপাশে। শুধু একনাগাড়ে বৃষ্টির আওয়াজ আসছে।
বৃষ্টির বেগ বেড়েছে আরো।
আরশাদ কিছুক্ষণ ভেবে ঠিক করে সে বাইক থেকে নামবে না। আরেকটা রাস্তা আছে বাড়ি ফেরার, যদিও অনেকটা ঘুরতে হয়। তবুও এখন নামাটা ঠিক হবে না।
আরশাদ বাইকটা ঘুরাতেই থমকে যায়। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সাত থেকে আটটা ছেলে, সবার হাতে একটা করে হকিস্টিক। আরশাদ ভ্রু কুঁচকে তাকায় তাদের দিকে।
★
শেষ বেলায় গোসল করে নতুন তাঁতের শাড়ি পরেছে ইরা। ভেজা চুলেই আলুথালু খোঁপা করে নিয়েছে। একটু সেজেছে আজ সে। আরশাদের পছন্দের রান্নাবান্না সাজিয়েছে টেবিলে৷ ভালোবেসে কাজ করা হলে সেই কাজের সৌন্দর্য বেড়ে যায় কয়েকগুণে।
সব আনন্দের মাঝেও বুকটা কেমন করছে বারবার ইরার। বুঝতে পারছে না কেনো এমন হচ্ছে। আরশাদ বলেছিলো খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমে এলো প্রায়, আরশাদ এলো না এখনো। আবার হঠাৎ তুমুল বৃষ্টি। ইরা আঙ্গুলে আঁচলে পেঁচায় আর ঘরজুড়ে পায়চারি করে। ফোনটাও তুলছে না। ইরা ধপ করে বিছানায় বসে পড়ে। মাথাটা কেমন এলোমেলো লাগছে তার।
হঠাৎ সকালে রাশেদুলের বলা কথাগুলো মাথায় আসে তার। নূরবউ মানে আরশাদের দাদির কথা। তৎক্ষনাৎ জায়নামাজে দাঁড়িয়ে যায় ইরা। মনকে শান্ত করতে হবে। মন অস্থির করা যাবে না।
★
“তোরা কারা? আমার রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো?”
আরশাদ বাইকেই হেলান দিয়ে দুই হাত বুকে বেঁধে বসে। তার চোখমুখ অদ্ভুত রকম শান্ত।
“তোকে বলেছিলাম সাবধান হতে। আমাদের হাত কতো লম্বা ধারণাও করতে পারিসনি। আমাদের মেরে আমাদের নাচিয়েছিস তুই। এবার তোকে উপরে পাঠানোর দায়িত্ব আমাদের।”
ছেলেগুলো পৈশাচিক হাসি হাসে।
আরশাদ ভ্রু যুগল উঁচু করে বললো,”ও, তোরা সেই কাপুরুষের দল?”
ছেলেগুলোর হাসি মুছে যায় মুখ থেকে সাথে সাথে।
“কি বললি তুই?”
“কোনো সন্দেহ আছে? তোরা কাপুরুষ বলেই একজনকে মারতে আটজন চলে এসেছিস। তাও আবার রাস্তার মাঝে গাছের ডাল ফেলে আমাকে আটকিয়ে দিয়েছিস। অবশ্য রাস্তার নেড়ি কুত্তাগুলো সংখ্যায় একাধিক হয়। কিন্তু সিংহ হয়ে একজনই। কিন্তু সত্য এটাই সিংহ বনের রাজা, কুত্তা নয়।”
“আজকে দেখাই যাবে কে সিংহ। এই ধর ওকে।”
আরশাদ ব্লেজার খুলে ফেলে। শার্টের হাতা গুটিয়ে নেয়। একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বাইক থেকে নামে। ঠোঁটের কোণে চিরাচরিত সেই হাসি। বুকের এক কোণায় সাহস অনুভব করে। এই সাহসের উৎস কি? ইরা তখনও জায়নামাজে ঠাঁয় বসা…..
(চলবে……)

