Home "ধারাবাহিক গল্প মন কেমনের মরশুম মন কেমনের মরশুম পর্ব-৩১+৩২

মন কেমনের মরশুম পর্ব-৩১+৩২

0
295

#মন_কেমনের_মরশুম

পর্ব: ৩১

আরশাদের ঠোঁটের কোণা থেকে র ক্ত পড়ছে। কপালও কেটেছে অনেকটা, সেখান থেকেও ফিনকি দিয়ে র ক্ত ঝরছে। হাতের কোথাও হয়তো কেটেছে, জ্বালা করছে। কিন্তু তার মুখে হাসি।
তার সামনে পড়ে আছে ছেলেগুলো। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে একেকজন।

আরশাদ ঠোঁটের কোণা থেকে র ক্তটা মুছে ফেলে বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে। হালকা আলোয় কালচে র ক্তটুকু দেখে মুচকি হাসে সে।

“কি লাভ হলো বল তো? মারতে এসে উলটে মার খেয়ে শুয়ে আছিস। বিন্দুমাত্র লজ্জা হচ্ছে না তোদের? একে তো কাপুরুষের মতো অতর্কিত আক্রমণ চালাতে এসেছিস। তার উপর একটা মানুষকে মারতে, এতোগুলো চলে এসেছিস দলবেঁধে। কিন্তু তাও পারলি না। বুঝতে হবে রে ভাই, কোয়ালিটি আছে। বার্লি খেয়ে বড় হয়েছি, ভাতের মাড় খেয়ে না।”
এই বলে আরশাদ চুলগুলো ঠিক করে। ঘোঁৎঘোঁৎ শব্দ করছে সামনের ছেলেগুলো, একনাগাড়ে।

আরশাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে মোবাইল বের করে। কয়েকটা নাম্বার থেকে অনেক বার ফোন এসেছে। তার মধ্যে বাবা, মা আর আশার নাম্বার আছে। তবে সবচেয়ে বেশি যে নাম্বারটা থেকে এসেছে সেই নাম্বারটা ‘নূরবউ’ দিয়ে সেভ করা।
আরশাদ মৃদু হেসে মোটরসাইকেলের দিকে পা বাড়ায়। আপাতত ওদের কিছু জানাবে না। একবারে বাড়ি যেয়ে জানাবে। শুধু শুধু দুশ্চিন্তা করবে।

খানিকটা এগিয়েও গেছে। আচমকা মাথায় তীব্র যন্ত্রণা অনুভূত হতেই দাঁড়িয়ে পড়ে সে। দুই হাতে মাথা চেপে ধরে হালকা গোঙানি দিয়ে উঠে। বাম হাতটা সামনে এনে দেখে হাতভর্তি কালচে লাল র ক্ত। আরশাদ শান্ত হয়ে দাঁড়ায়।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আবার। এইবার আরশাদ মাটিতে বসে পড়ে। অন্ধকার হয়ে যায় তার চারপাশ। এমনিতেই৷ আঁধারে ঢাকা। ততক্ষণে বৃষ্টি কিছুটা কমেছে।
আরশাদ আস্তে আস্তে পিছনে ঘোরে। কখন যে ওদের মধ্য থেকে একজন উঠে দাঁড়িয়ে আরশাদের পিছনে চলে গেছে ও টের পায়নি।

আরশাদ স্মিত হাসে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে। তার হাতের হকিস্টিকে এখনো তাজা র ক্ত।
“এবারও কাপুরুষের মতো আচরণ করলি ভাই? সামনে আসতি, আক্রমণ সম্পর্কে জানতাম।”
পেটে লাথি পড়তেই আরশাদ এবার মাটিতে পড়ে যায়। প্রথম আ ঘাতের পরেই মোবাইল হাত থেকে ছুটে কোথায় যেয়ে পড়েছে ঠিক নেই। ক্রমাগত বাজছে ওটা, স্ক্রিনে ভাসছে একটা নাম ‘নূরবউ।’

আরশাদ মাটিতে পড়তেই ওরা সবাই উঠে দাঁড়ায় এক এক করে। প্রত্যেকে এগিয়ে আসে৷ একটা আহত সিংহের দিকে একদল নেকড়ে এগিয়ে আসছে, আশেপাশে কেউ নেই। আরশাদ ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে। পিচের রাস্তা ভেসে যাচ্ছে কালচে র ক্তে। আরশাদের শ্বাস ধীর হতে থাকে। বোধহয় জ্ঞান হারাচ্ছে সে। কিংবা মারা যাচ্ছে….

একেরপর এক আঘা ত পড়ছে পায়ে। আরশাদ কয়েকবার কেঁপে উঠে শান্ত হয়ে যায়।

“ভাই, মরে গেলো নাকি?”
“গেলে যাক আমাদের কি?”
“আমাদের কি মানে? যদি ফেঁসে যাই?”
“কে বলেছিলো এভাবে মারতে?”
“রাগের বশে কি করলাম….”
ফিসফিস শব্দ চলে ওদের মধ্যে। একটা নিথর দেহকে সামনে রেখে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওরা।

“পালাতে হবে, এক্ষুনি পালাতে হবে।”
“কিন্তু ভাই….”
“আর কোনো কিন্তু না। চল এখান থেকে। এক্ষুনি।”
ধুপধাপ শব্দ করে ছেলেগুলো পালায়।

আরশাদ শুয়ে থাকে, তার চারপাশ র ক্তে প্লাবিত। বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে চলে যাচ্ছে। কয়েক হাত দূরে থাকা মোবাইলটা এখনো বাজছে, কিন্তু আরশাদ আর ধরতে পারছে না। ধরে আর বলছে না,’হু নূরবউ, আদেশ করুন।’

ইরা সহজে কাঁদে না, তার শত কষ্ট হলেও কান্না আসে না। ছোট থেকেই এমন সে। সৎমা মাঝেমধ্যেই তার গায়ে হাত তুলতো। ইরা কাঁদতো না বলে আবার মারতো। তবুও ইরার চোখে পানি আসতো না। মায়ের কবর দেখতে যেতো মাঝে মাঝে। খুব ইচ্ছা করতো হাপুস নয়নে একটু কাঁদবে। কিন্তু পারতো না বেশিরভাগ সময়। ওর কান্নাগুলো জমাট বেঁধে বুকে আটকে থাকে।
এই অল্প দিনের সংসার তাকে ভালোবাসা শিখিয়েছে নতুন করে। নতুন করে প্রেম শিখেছে সে এক জোড়া গভীর চোখের মালিকের কাছ থেকে। এখন সেই ভালোবাসা, সেই প্রেম তার বরফের মতো অশ্রুকে গলিয়েছে৷ এখন তার কান্না আসে। কষ্ট পেলেই নোনাজল চোখ বেয়ে নামে।
ঘর অন্ধকার করে মেঝেতে বসে আছে ইরা। দুই হাঁটুতে মাথা গুঁজে। মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে। চোখমুখ লাল হয়ে আছে।

হঠাৎ ঘরে আলো জ্বলতেই মুখ তুলে তাকায় ইরা। তার মন বলছিলো আরশাদ এসেছে। এসেই হয়তো বলবে, ‘একদম ভিজে গেছি। গোসল করবো। খুব খিদে পেয়েছে নূরবউ।’

কিন্তু না, ঘরে ঢোকে রাবেয়া। তার চোখেমুখেও স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ।

“মা উনি এসেছেন? কোথায় উনি?”
রাবেয়া ক্ষীণ গলায় বললো,”আরশাদ আসেনি।”
ইরা উঠতে যেয়ে আবার বসে পড়ে। মাথাটা কেমন চক্কর দিয়ে উঠেছে তার। রাবেয়া ইরার হাত ধরে তাকে উঠায়।

“মা আমরা এভাবে বসে থাকবো?”
রাবেয়া আস্তে আস্তে বললো,”আরশাদের বাবা ওর অফিসে ফোন করেছিলো। ওরা জানিয়েছে আরশাদ অনেকক্ষণ আগেই বেরিয়েছে।”
ইরা মুখে হাত চেপে আর্তনাদ করে ওঠে। রাবেয়ার গলা কাঁপছে।

“ওর বাবা বেরোচ্ছে। আমি ঘরে বসে থাকতে পারবো না। আমিও যাবো। তোমাকে বলতে এলাম।”
ইরা আচমকাই রাবেয়ার পায়ের কাছে বসে পড়ে। দুই হাতে জাপটে ধরে রাবেয়ার পা জোড়া। রাবেয়া অপ্রস্তুত হয়ে যায়।

“মা আমাকে নিয়ে চলুন না। বিশ্বাস করুন আমি ঘরে থাকতে পারছি না। আমাকে নিয়ে চলুন না মা।”
রাবেয়ার গলার কাছে মনে হচ্ছে কিছু আটকে আছে। তার মা একটা কথা বলতো, সন্তানের কোনো বিপদে মায়ের চোখে পানি আনতে নেই। রাবেয়া অনেক কষ্টে কান্নাটুকু গিলে ফেলছে।

“ইরা ওঠো, পা ধরছো কেনো?”
ইরা ওঠে না, আরো জোরে পা চেপে ধরে চিৎকার করে ওঠে।
“মা আমাকে নিয়ে চলুন। আমি মরেই যাবো নাহলে।”
“আচ্ছা আগে ওঠো তো।”
ইরাকে জোর করে ওঠায় রাবেয়া। ইরার মুখ গাঢ় লাল। ফোঁপাচ্ছে সে একনাগাড়ে। এই মুহুর্তে তাকে ঝড়ে পড়া এক চড়ুই পাখির মতো লাগছে।

“বেশ চলো।”
ইরা একটা বড় ওড়না শরীরে পেঁচিয়ে নেয়। দূর্বল শরীর নুয়ে পড়ছে। তবুও তাকে ছুটতে হবে, অনেকটা ছুটতে হবে। রাবেয়া তার শক্ত করে চেপে ধরে।

সুনশান রাস্তা দিয়ে একটা পুলিশ জীপ মাঝারি গতিতে ছুটছে। জীপে চারজন রয়েছে। একজন ড্রাইভার, দুইজন কনস্টেবল আর একজন এএসপি। এএসপি উৎস শাহরিয়ার, বছর খানিক হয়েছে যোগদান করেছে। এরই মধ্যে তার সততা আর নির্ভীকতায় নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে অনেকবার।

“স্যার থানায় যাচ্ছি আমরা?”
উৎস ক্লান্ত শরীরটা সিটে এলিয়ে রেখেছিলো। কনস্টেবল রাফিদের কথায় মাথা তোলে।
“একদমই না, তিনদিন টানা দৌড়াদৌড়ির উপর ছিলাম। এখন আমি বিশ্রাম নিবো। বাসায় ফিরতে হবে আমাকে।”

উৎস কথা শেষ করার আগেই হঠাৎ জীপ ব্রেক কষে। উৎস বিরক্ত করে ড্রাইভার মোখলেসের দিকে তাকায়।

“মোখলেস চাচা আপনার কি নতুন করে গাড়ি চালানো শিখতে হবে? এক্ষুনি তো চান্দে পাঠিয়ে দিচ্ছিলেন আমাদের।”
“স্যার….”
উৎস ভ্রু কুঁচকে তাকায় মোখলেসের দিকে। মোখলেসের দৃষ্টি সামনের দিকে। জীপের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে কিছু একটা অসঙ্গতি।

“কি ব্যাপার বলো তো?”
“স্যার মনে হচ্ছে রাস্তায় পড়ে আছে কেউ। একটা মোটরসাইকেলও দেখা যাচ্ছে।”
উৎস সামনের দিকে তাকিয়েই বললো,”রাফিদ, যেয়ে দেখো তো কি ব্যাপার।”
“জি স্যার।”
রাফিদ নেমে যায় জীপ থেকে। ফিরে আসে মিনিট দুই পরেই।

“স্যার ঘটনা তো খারাপ।”
“কি হয়েছে?”
“কাউকে মেরে ফেলে রেখেছে। র ক্তে ভেসে যাচ্ছে।”
“মানে কি?”
উৎস নিজেই নেমে যায়। তাকে আটকায় অন্য কনস্টেবল নিহাদ।

“স্যার আপনার নামা ঠিক হবে না। আমি দেখছি।”
উৎস ততক্ষণে নেমে গেছে জীপ থেকে।
“পুঁটি মাছের প্রাণ নিয়ে উৎস এই পেশায় আসেনি। চলো দেখি কি ব্যাপার।”

তিনজনই নেমে এগিয়ে যায় আরশাদের দিকে।

উপুড় হয়ে শুয়ে আছে একজন যুবক। চারদিকে র ক্তের বন্যা। উৎস রাফিদকে ইশারা দিতেই রাফিদ আরশাদের নাকের কাছে দুই আঙ্গুল দেয়।

“স্যার বেঁচে আছে এখনো। কিন্তু শ্বাস খুব ধীরে পড়ছে।”
নিহাদ উৎসের দিকে তাকিয়ে বললো,”স্যার অ্যাম্বুলেন্স ডাকি?”
উৎস বিরক্ত হয়।

“তোমার মনে হয় অ্যাম্বুলেন্স ডেকে সময় নষ্ট করার মতো সময় আছে?”
“তাহলে?”
“তাহলে আর কি? আমার মুখের দিকে তাকিয়ে না থেকে জীপে তোলার ব্যবস্থা করো।”
“স্যার জীপে?”
উৎস খুব শান্ত ভাবে নিহাদের দিকে তাকাতেই নিহাদ মাথা নাড়ে জোরে জোরে।

“জি স্যার জি স্যার।”
“মোখলেস চাচাকে ডাকো, দুইজন উঠাও। আর রাফিদ আশেপাশে দেখো কিছু ক্লু পাওয়া যায় কিনা। বাইকটা নেওয়ার ব্যবস্থা করো।”
বলতে বলতে উৎস পকেট থেকে গ্লাভস বের করে নেয়।

এদিকে ওদিকে খুঁজতে থাকে তীক্ষ্ণ চোখে। নিহাদ আর মোখলেস ততক্ষণে আরশাদকে জীপে তুলেছে। একদমই নিথর শরীর, পুরোটাই এলিয়ে দিয়েছে।

“স্যার স্যার….”
“কি?”
রাফিদ একটা মোবাইল হাতে উৎসের দিকে এগিয়ে আসে।
“স্যার মোবাইল পেয়েছি। সম্ভবত ভিক্টিমের।”
উৎস মোবাইলটা খুলতেই একশ সতেরোবার কল দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। একটা নাম বেশি এসেছে ‘নূরবউ’ নামে।

“খোলার ব্যবস্থা করো। উনার বাড়ির লোক দুশ্চিন্তায় আছে। তাদের জানাতে হবে।”
“স্যার….”
“একটা কথা কতোবার বলতে হয় তোমাকে রাফিদ?”
উৎস দুই আঙ্গুল দিয়ে নিজের কপাল ঘঁষে। নিজের স্ত্রীর মুখটা মনে পড়ছে। কেমন অস্থির হয়ে যায় কিছুক্ষণ ফোনে না পেয়ে।

“স্যার উনার বাড়ির লোকের জন্য অপেক্ষা করবো?”
“তোমাকে যেটা বলেছি তাই করো। জীপ হাসপাতালে যাবে।”
রাফিদ মোটরসাইকেলটার দিকে এগিয়ে যায়। উৎস স্যার যা বলবেন তাই করতে হবে, কিচ্ছু করার নেই।

সিএনজির পিছনে বসে দুই হাত মুখে চেপে বারবার ফুঁপিয়ে উঠছে ইরা। রাবেয়া পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে তার হাত ধরে। ভিতরটা পুড়ে যাচ্ছে তার। কোথায় যাচ্ছে তারা জানেনা, শুধু জানে আরশাদকে ঘরে না নিয়ে ফেরা যাবে না।
সামনে বসে আছে রাশেদুল। তার বয়সটা মনে হচ্ছে একবারেই অনেকটা বেড়ে গেছে। শ্বাস নিতে ভুলে যাচ্ছে মাঝে মাঝে। ত্রিশ বছর আগের আজকের দিনটার কথা মনে পড়ছে। ছেলেটা দুনিয়ায় এলো, অথচ কিছুক্ষণ আগেই ডাক্তার বলেছিলো আপনার সন্তান দুনিয়ার আলো দেখবে না। সেই ছেলে দুনিয়ায় এলো, সুস্থভাবেই এলো। সুসন্তান হয়ে বেড়ে উঠলো।
রাশেদুল আকাশের দিকে তাকায়। মেঘ কেটে চাঁদ উঠেছে এক ফালি। রাশেদুলের মন বলছে সব মেঘ কেটে যাবে, যাবেই।

রাশেদুলের পকেটে ফোন বেজে উঠতেই সচকিত হয় সে। ইরা মাথা তোলে সাথে সাথে, রাবেয়ার বুকটা কেমন করে ওঠে।

“কে ফোন করেছে?”
“অপরিচিত নাম্বার।”
“তাড়াতাড়ি দেখো তো…”
ইরার ঠোঁট কাঁপতে থাকে তিরতির করে। খুব বাজে কিছু বেসামাল চিন্তা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অনেক চেষ্টা করেও বিশ্রী চিন্তাগুলো মাথা থেকে বের করতে পারেনা।

কানের সাথে চেপে ধরে রেখেছে রাশেদুল মোবাইলটা। সরাতেও পারছে না কিছু বলতেও পারছে না। এক জীবনে এতোটা অসহায় তার কখনো লাগেনি।
তার পিছনে দুই জোড়া উদগ্রীব চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। কি জবাব দিবে সে ওই মানুষ দু’টোকে?

(চলবে…..)

#মন_কেমনের_মরশুম

পর্ব: ৩২

হাসপাতালের করিডরে মূর্তির মতো বসে আছে ইরা, তার পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে রাবেয়া। রাশেদুল ওদের বসিয়ে রেখে রিসিপশনে গেছে। সম্ভবত বন্ডে সাক্ষর করতে হবে।

এসব কেসে উৎস সাধারণত দাঁড়ায় না। নিজের কাজটুকু করে চলে যায়। বাকিটা ইন্সপেক্টরের তদন্ত। কিন্তু কেনো যেনো আজ যেতে পারছে না। নিহাদ আর রাফিদও অগত্যা দাঁড়িয়ে আছে। রাবেয়ার দিকে তাকিয়ে নিজের মায়ের ছায়া দেখতে পাচ্ছে সে। কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। ডাক্তার আর পুলিশ এই দুই পেশায় আসার আগেই তাদের মনের দিক থেকে ভীষণ ভাবে শক্ত হতে হয়। অল্পে ভেঙে পড়া তাদের মানায় না। কিন্তু আজ উৎস যেতে পারছে না। চুম্বকের মতো টানছে তাকে পরিবারটা।

“স্যার যাবেন না?”
“হু।”
“অনেকটা রাত হলো তো। তাছাড়া আপনি ক্লান্ত। আপনার বিশ্রাম দরকার। টানা তিন রাত আপনি ঘুমাননি।”
উৎস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাফিদের দিকে তাকিয়ে বললো,”মোখলেস চাচাকে জীপ স্টার্ট দিতে বলো, আমি আসছি। তোমরা যাও।”
রাফিদ আর নিহাদ চলে যায়।

উৎস ধীর পায়ে ইরা আর রাবেয়ার কাছে এসে দাঁড়ায়। ইন্সপেক্টর পরশকে জানানো হয়েছে ইতোমধ্যে। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে। উৎসের কাজ এখানে শেষ।

ওদের সামনে দাঁড়িয়ে দুইবার গলা খাকারি দেয় উৎস। দুইজনের কারো মধ্যেই কোনো ভাবান্তর হয়না। যেমন ছিলো, তেমনই পড়ে থাকে।

“জানি এই পরিস্থিতিতে শক্ত থাকাটা সম্ভব না। সান্ত্বনা দিতেও চাইনা। শুধু বলবো উনার প্রয়োজনে নিজেদের সামলান। ইন্সপেক্টর আসছে, উনি যা যা জানতে চান জানাবেন।”
রাবেয়া ছলছল চোখে উৎসের দিকে তাকায়। উৎস চোখ সরিয়ে ফেলে। পৃথিবীতে এমন কোনো শক্তি নেই যা একজন মায়ের দূর্বল চাহনি বুকে ভেদ করতে দিবে না।

“বাবা তুমি তো আমার ছেলের মতোই তাইনা? তুমি একটু বলো না, আমার ছেলেটা বাঁচবে তো?”
ইরা কিছুটা কেঁপে আবার শান্ত হয়ে যায়।

উৎস শান্ত গলায় বললো,”ডাক্তাররা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। আরেকটু দেরি হলে কি হতো জানিনা। তবে এখনো সব আশা শেষ যায়নি। আল্লাহকে ডাকেন, উনিই পারেন শুধুমাত্র সাহায্য করতে। আমরা কিছুই না।”
“তুমি যদি আর কিছুক্ষণ পরে যেতে…”
মুখে আঁচল চাপা দিয়ে রাবেয়া ডুকরে কেঁদে ওঠে। তার মনে হচ্ছে জ্ঞান হারাবে। মাথাটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। তার মাথাতেও নেই সে একজন এএসপির সাথে কথা বলছে। অবলীলায় নিজের ছেলের মতো কথা বলে যাচ্ছে।

উৎস মিনিট দুই চুপ করে দাঁড়িয়ে বেরিয়ে যায়। ট্রেনিং এর সময় কতো কিছু শেখানো হলো কিন্তু একজন মায়ের আহাজারি সহ্য করা তো শেখানো হয়নি। এটা কীভাবে সহ্য করে সে জানেনা। তারচেয়ে প্রস্থানই ভালো।

রাত পৌনে তিনটা। আইসিউয়ের দরজার বাইরে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে ইরা। ভিতরে তার ভালোবাসার প্রিয় মানুষ, যাকে এই মুহুর্তে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে। নিথর হয়ে পড়ে আছে সেই মানুষটা। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। ডাক্তার বলেছে যদি সে বেঁচে যায় তা হবে কোনো মিরাকল। আর যদি সে বেঁচেও যায় হয়তো কোনোদিন আর হাঁটতে পারবে না। তার বাকি জীবনটা কেটে যাবে হুইল চেয়ারে।

ইরা দরজার বাইরেই মেঝেতে বসে পড়ে। ওষুধপত্র আর ফিনাইল মিশ্রিত অদ্ভুত একটা গন্ধ হাসপাতালে। এই গন্ধটা সে নিতে পারেনা। মায়ের মৃতদেহটা কারা যেনো হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলো, তারা ভেবেছিলো বোধহয় এখনো বেঁচে আছে। ভ্যানের পিছন পিছন দৌড়েছিলো ইরা সেদিন। ডাক্তার তার মা’কে দেখার সাথে সাথেই সাদা কাপড়ে ঢেকে দিয়েছিলো তার মুখটা।
সেই দৃশ্য, সেই গন্ধ ইরার মস্তিষ্কে গেঁথে আছে পুরোপুরি। ভুলতে পারেনা সে সেই দিনটার কথা।

দুই হাঁটু শক্ত করে চেপে ধরে মাথা ঠেকায় সেখানে। এখন পর্যন্ত কাঁদতে পারেনি সে। ভিতরের অনুভূতিগুলো ইস্পাতের মতো শক্ত হয়ে জমাট বেঁধে আছে। হুল ফোটাচ্ছে হৃদয়ের প্রকোষ্ঠে। ইচ্ছা করছে চিৎকার করে কেঁদে বাষ্পে উড়িয়ে দিতে। কিন্তু সে পারছে না, কেউ যেনো তার গলাটা চেপে ধরে আছে। তার মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। তার মন বলছে এটা একটা দুঃস্বপ্ন। তার জীবনে দেখা সবচেয়ে ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন। ঘুম ভাঙলেই দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে। ওই মানুষটা বাথরুম থেকে গোসল সেরে বেরিয়ে হাসতে হাসতে বলবে,’উঠেছেন নূরবউ? এক মগ কফি হবে? প্রচুর ক্যাফেইন দরকার, প্রচুর।’
কিন্তু কই? ঘুম তো ভাঙছে না৷ এই অসহ্যকর দুঃস্বপ্ন কখন শেষ হবে?

ইরা দরজার দিকে তাকায় আবার। একটা বার ওই মানুষটার মুখ দেখার জন্য বুকটা ছটফট করছে। কিন্তু ডাক্তার বলেছে এখন সম্ভব না কোনোভাবেই। ইরা ঠিক করেছে এখানেই বসে থাকবে সে। মা’কে হারিয়েছে, কিন্তু যে মানুষটাকে আঁকড়ে সে বেঁচে আছে, সেই মানুষটাকে সে হারাতে পারবে না। কোনোভাবেই না।

ইরা দরজার দিকে তাকিয়েই ফিসফিস করে বললো,”আমার জীবনের প্রথম ও একমাত্র প্রণয়ের পুরুষ, আপনাকে আমি একা যেতে দিবো না এভাবে। যদি যেতে চান, আমাকে নিয়েই যেতে হবে। এক পৃথিবী সমান ভালোবাসা দিয়ে এভাবে ভালোবাসা শূন্য করে চলে যাওয়ার অধিকার আপনার নেই। আপনি আমার জীবনের সেই সত্য যা আমি কখনো ভুলতে পারবো না। এই রাত যদি সত্য হয়, এই চাঁদ যদি সত্য হয় আমার প্রেমও সত্য। খোদার কসম আমি এক সেকেন্ডও আপনাকে ছাড়া এই দুনিয়ায় থাকতে পারবো না। যাবেন না আরশাদ। আমাকে এভাবে ফেলে চলে যাবেন না। আপনি ছাড়া আমি অসহায়।”

ইরার চারপাশটা কেমন অন্ধকার হয়ে ওঠে। বাইরে বৃষ্টি নেমেছে। মন মৃত্যুর মরশুম চলছে যেনো। বৃষ্টি অসহ্য লাগছে ইরার। আচ্ছা এমন অন্ধকার কেনো চারপাশ? হাসপাতালের সব লাইট একসাথে বন্ধ করে দিলো? মাথাটা এমন লাগছে কেনো? তবে কি সে জ্ঞান হারাচ্ছে?

নীলু যখন হাসপাতালে প্রবেশ করে তখন ভোরের আলো ফোটেনি ভালো করে। তার পিছন পিছন নিজাম হোসেন দৌড়াচ্ছে। নীলুর কোনোদিকে খেয়াল নেই। শুধু ছুটছে, হাওয়ায় ছুটছে।

“নীলু আস্তে, পড়ে যাবি তো।”
নীলুর কোনো কথা কানে আসছে না।
ভোরের আগেই ফোন পেয়ে হকচকিয়ে যায় নীলু। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখে আশা ফোন দিয়েছে। একটা শীতল স্রোত তখনই নীলুর মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যায়। তড়িঘড়ি করে ফোন তুলতেই আশার গগণবিদারী কান্না৷ নীলুর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়।

“আশা….”
“নীলু আপা, ভাইয়া…..”
এরপর নীলু যা শুনলো। ওর মাথায় আর কিছুই ছিলো না। রাত কয়টা বাজে, কি পোশাকে আছে কোনোদিকে খেয়াল ছিলো না। বাবাকে শুধুমাত্র ডাকতে পারে, এরপর আর কিছুই মনে নেই তার।

“খালাম্মা।”
রাশেদুলের কাঁধের উপর মাথা এলিয়ে জ্ঞানহীনের মতো পড়ে ছিলো। নীলুর ডাকে মাথা তোলে সাথে সাথে। ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে।
নীলু একছুটে যেয়ে রাবেয়ার বুকে মাথা দিয়ে চিৎকার করে ওঠে। আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে যায় তার চিৎকারে।

“খালাম্মা, ও খালাম্মা। আরশাদ…”
“মা রে আমার ছেলেটারে ওরা মারছে, খুব মারছে। এই মাথায় মারছে, পায়ে মারছে। ওর শরীর র ক্তে ভেসে গেছে। ও নীলু, আমার ছেলেটা অনেক ব্যথা পাইছে রে মা। যে ছেলের গায়ে আমি কোনোদিন হাত তুলিনি, আমার বড় শখের ছেলে। সেই ছেলেরে ওরা মেরে শেষ করে দিছে। আমি এখনো বেঁচে আছি কেনো রে নীলু? আমারেও কেউ মার না। আমার ছেলেটা যে কষ্ট সহ্য করছে, আমি মা হয়ে তার ভাগ নিতে পারিনি। কেমন মা আমি?”
নীলু এবার রাবেয়ার মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে। নিজের মুখে হাত চেপে সামলানোর চেষ্টা করে নিজেকে।

নিজাম হোসেন রাশেদুলের পাশে বসে তার হাত চেপে ধরে।

“ভাইজান আরশাদের কি অবস্থা? এসব কীভাবে হলো?”
রাশেদুলের নিস্তব্ধ দৃষ্টি নিজাম হোসেনের দিকে শুধু তাকিয়ে থাকে, পলকটাও যেনো পড়েনা। ঝাপসা আর ঘোলাটে সে দৃষ্টি।

আইসিউয়ের দরজার সামনে মুখোমুখি ইরা আর নীলু। ইরা সেই ঠাঁয় বসেছিলো চুপচাপ এক কোণায়। নীলু এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে ডাকে। আস্তে আস্তে ইরা চোখ তুলে তাকায়, চেহারার রেখায় কোনো পরিবর্তন আসে না। নীলু ইরার হাত ধরে তাকে দাঁড় করায়।

“ইরা ঠিক আছো?”
ইরা ফ্যালফ্যাল করে নীলুর দিকে তাকিয়ে থাকে। লাল চোখজোড়া সাক্ষ্য দিচ্ছে বুকের ভেতর এক পৃথিবী সমান কষ্ট জমিয়ে রাখা মেয়েটা কেমন চুপসে গেছে ঝড়ের মুখে পড়া এক অসহায় পাখির মতো।

“নীলু আপা, আপনি বরং জিজ্ঞেস করতে পারতেন ‘ইরা বেঁচে আছো?’ আমি বেঁচে আছি নীলু আপা। আমার প্রাণটাকে ওই ঠান্ডা ঘরে আটকে রেখে আমি বাইরে দিব্বি বেঁচে আছি।”
নীলুর দুই চোখ বেয়ে অবিরত পানি ঝরছে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা খুব সাধারণ কিন্তু অন্যরকম অসাধারণ একটা মেয়ের দিকে তাকিয়ে অজানা এক মায়া জন্ম নিচ্ছে। এ মায়ার কোনো উৎস নেই।

“নীলু আপা, যদি অন্যায় করে থাকি আমি করেছি। ওই মানুষটা বোধহয় আপনার ছিলো। আমি আপনাদের মধ্যে চলে এসেছি। আমি এই মুহুর্তে পৃথিবীর যে কোনো কিছুর মূল্যে উনাকে চাই। সবকিছু ধ্বংস করে হলেও। নীলু আপা, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।”
নীলু ইরার কাঁধে হাত রাখে আলতো করে।

“এগুলো বলার সময় এটা না ইরা। জানি তোমার মাথা এখন ঠিক নেই। তবে আর বলো না। আরশাদ আমার মনে ছিলো আর তোমার তো ভাগ্যে ছিলো। ভাগ্যের উপর আমাদের কারো হাত নেই। আমি আরশাদকে প্রচন্ড ভালোবেসেছিলাম। হয়তো এখনো তাই। কিন্তু সত্য এটাই যে ও তোমার, শুধুমাত্র তোমার। বিন্দুমাত্র আর কোনো ভাগ নেই তাতে। ক্ষমা চাওয়াচাওয়ির কোনো প্রশ্নই নেই এখানে।”
ইরার শরীরে হালকা কাঁপুনি দিচ্ছে। ইরা শক্ত করে তার দুই বাহু চেপে ধরে।

“ইরা তোমাকে তো স্বাভাবিক লাগছে না।”
“নীলু আপা, উনি বাঁচবেন তো?”
নীলু নির্লিপ্ত চোখে ইরার দিকে তাকায়। পরক্ষণেই আইসিউয়ের দরজার দিকে তাকায়। বুকটা জ্বলে যাচ্ছে তার অজানা কোনো কারণে। কাউকে বোঝাতে পারছে না। কারণ তার সে অধিকার নেই। স্বামীর উপর অধিকার থাকে কিন্তু না পাওয়া ভালোবাসার মানুষের উপর? থাকে কি আদৌ কোনো অধিকার? নাকি থাকা উচিত?

“ইরা আসো তোমাকে একটু আদর করে দিই।”
ইরা হতভম্ব দৃষ্টিতে নীলুর দিকে তাকায়। এই নীলুকে সে চেনেনা। যে নীলুকে সে চেনে এ সেই নীলু না। এ যে একদম তার মায়ের মতো মুখের আদল।

“নীলু আপা…”
নীলু দুই হাত প্রসারিত করে দেয়। ইরার ভিতরের বরফ যেনো গলতে শুরু করেছে। তার মন বলছে সে এখন চিৎকার করে কাঁদতে পারবে। যে কান্নাটা তার দরকার ছিলো, ভীষণ ভাবে দরকার ছিলো।

নীলুর বুকে মাথা রেখেই ফুঁপিয়ে ওঠে ইরা। নীলু নিজের কান্নাটুকু গিলে ফেলে খুব সাবধানে। কাঁপা কাঁপা হাতটা ইরার মাথায় রাখে।

“সব ঠিক হয়ে যাবে ইরা, সব। তোমার মতো মিষ্টি একটা মেয়েকে সৃষ্টিকর্তা এতোটা কষ্ট দিবেন না।”
ইরা কিছু বলতে পারেনা। একনাগাড়ে ফুঁপিয়ে যায়। নীলু ইরাকে আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরে। মেয়েটার একটা আশ্রয় দরকার, ভীষণভাবে।
শুধুমাত্র নিজেকে নিয়ে ভাবতে কেউ দুনিয়ায় আসেনা। মাঝে মাঝে অন্যের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যেও শান্তি থাকে। নীলু চোখ বন্ধ করে আরশাদের মুখটা মনে করে। দলাপাকা কষ্টটা ভাগাভাগি করে নেয় তার এক সময়ের ভালোবাসার মানুষটার প্রিয় মানুষটার সাথে।

আঠারো দিন পর….

সকালেই কেবিনে দেওয়া হয়েছে আরশাদকে। যদিও কোনো কথা বলতে পারছে না। শুধু চোখ মেলে সবাইকে দেখতে পারছে। পায়ের ব্যাপারে ডাক্তাররা এখনো কিছুই বলছে না। তবে ধারণা করা হচ্ছে আরশাদ বোধহয় আর কোনোদিন নিজের পায়ে হাঁটতে পারবে না।

আরশাদের বিছানার পাশে মেঝেতে বসে আছে ইরা। আরশাদের স্যালাইন চলা হাতের পাশেই মাথা ঠেকিয়ে। ফোঁটায় ফোঁটায় উষ্ণ অশ্রু পড়ছে তার চোখ বেয়ে। আরশাদ হয়তো বুঝতে পারছে তার নূরবউ তার পাশে শুয়ে ছোট্ট শিশুর মতো কাঁদছে। হয়তো অভিমান করে আছে, কেনো এতোটা যন্ত্রণা আরশাদ একা ভোগ করলো।
কিন্তু তার দিকে একবার ফিরে তাকানোর মতো অবস্থা নেই আরশাদের।

সবাই এতোক্ষণ কেবিনেই ছিলো। ডাক্তার এসে জানালো এবার সবাইকে বিদায় নিতে হবে। খুব বেশি হলে একজন থাকতে পারবে। ইরা আলুথালু চোখে বাকিদের দিকে তাকায়। রাবেয়াই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে আসে। শুধু ইরা বসে থাকে, চুপচাপ।

“আমি জানি আপনি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন। আপনার নূরবউ মন খারাপ করে চুপ করে থাকলে আপনার সহ্য হতো না। যে কোনো মূল্যে আপনি তার মুখের কথা শুনতে চাইতেন। আজ আপনি চুপ করে আছেন। আপনি কি বুঝতে পারছেন না আপনার নূরবউয়ের কলিজাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে? আর কতো কষ্ট দিবেন?”
আনমনেই এসব বলছিলো ইরা বিড়বিড় করে। সুনশান রুমের মধ্যে ইরার প্রতিটা বাক্য আরশাদের কর্ণকুহর ভেদ করছিলো। মস্তিষ্কে যেয়ে আ ঘাত হানছিলো।

“আপনি ছাড়া আমার দুনিয়াটা তো অন্ধকার। আপনি বোঝেন না? আপনি আমাকে বাঁচতে শিখিয়েছেন নতুন করে। শিখিয়েছেন অনুভূতি প্রকাশ করতে। হাসতে শিখেছি, কাঁদতে শিখেছি সবই আপনার কাছ থেকে। এই হাতজোড়া আমাকে নরম আদর দিয়েছে, ওই পা জোড়া আমাকে নিয়ে স্বপ্নের দেশে ছুটেছে। এই নিস্তেজ হওয়া শরীরটা যে আমাকে আবারও কোনো এক কৃষ্ণগহ্বরে ছুড়ে ফেলছে বারংবার।”

আচমকা ইরার পুরো শরীরে যেনো বিদ্যুৎ খেলে যায়। তড়িৎবেগে সচকিত হয়। তার চোখের কোণে সেই পরিচিত স্পর্শ। যে স্পর্শের জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছিলো সে।
আরশাদের একবিন্দু কোমল স্পর্শ তার শরীর ঠান্ডা করে দিয়েছে। আচ্ছা বেহেশতের সুখের কাছে দুনিয়ার সুখ নাকি কিছুই না। তাহলে এই সুখের কূলকিনারা কোথায়? ইরা তো চারপাশে কোনো ঠাঁই দেখছে না।

“আপনি উনাকে এখনো সেই আগের মতোই ভালোবাসেন তাইনা? এক মহাসমুদ্র সমান।”
নীলু কিছুটা চমকে রোশানের দিকে তাকায়।
এ কয়টা দিন নীলু হাসপাতাল থেকে বাড়ি আর বাড়ি থেকে হাসপাতাল এভাবেই ছুটেছে। রোশান দু’একবার এসেছে হাসপাতালে, ডাক্তারদের সাথে কথা বলেছে। কিন্তু নীলুর সাথে একান্তে কথা হয়নি এতোদিনে।
আজ নীলু হাসপাতাল থেকে ফেরার পথেই রোশান তাকে নিয়ে একটা নদীর পাড়ে এসেছে। বিধ্বস্ত নীলুর দিকে তাকিয়েই রোশান বুঝেছে তার একটু মানসিক প্রশান্তি দরকার।

“ব্যক্তিগত ব্যাপারে কথা বলে ফেললাম। ক্ষমা করবেন।”
নীলু মৃদু হেসে বললো,”ভালোবাসি কিনা জানিনা। তবে ওর এই অবস্থায় নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। তবে সবচেয়ে মজার বিষয় এটাই যে আমি নিজেকে অন্যরকম ভাবে আবিষ্কার করলাম এ কয়টা দিন।”
“তাই? কেমন?”
“আমি কষ্ট পাচ্ছিলাম, ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিলাম। কিন্ত নিজের চেয়ে বেশি ইরার জন্য। আমি তো তাকে পাইনি, না পেয়ে হারানোর কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু ইরা যে তাকে পেয়েছে। পেয়েও হারানোর কষ্টের কাছে আমার এ কষ্ট নগণ্য মনে হয়েছে। আমি চেষ্টা করেছি ইরাকে সময় দিতে, ওকে স্বাভাবিক করতে। কিন্তু এক সময় আমি ওকে সহ্যই করতে পারতাম না। অদ্ভুত না?”
রোশান মুচকি হেসে বললো,”মানুষের মন আসলেই অনেক অদ্ভুত নীলু ম্যাডাম। আপনি আসলেই খুব ভালো একজন মানুষ। মানতেই হবে, অসাধারণ চিন্তাভাবনা আপনার।”
নীলু উঠে দাঁড়ায়। শান্ত স্রোত কেমন বয়ে যাচ্ছে নদীর বুকে। এরকম শান্ত কেনো থাকে না তাদের হৃদয়? কেনো বার বার জলোচ্ছ্বাস ধেয়ে আসে জীবনে?

“প্রথম প্রেম কি সত্যিই ভোলা যায়না রোশান সাহেব?”
রোশান একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে নীলুর দিকে এগিয়ে আসে ধীর পায়ে। নদীর দিকে সে-ও তাকায় শান্ত চোখে।

“প্রথম প্রেমই যদি সবকিছু হতো তাহলে ‘দ্বিতীয়’ বলে কোনো শব্দ অভিধানে থাকতো না।”
নীলু অবাক হয়ে রোশানের দিকে তাকায়।
রোশান গম্ভীর গলায় বললো,”তোমার দু’হাত কারাগার হলে, মুক্তির উকিল করুক ফেল। আমার হোক যাবজ্জীবন জেল।”
নীলুর হতবাক দৃষ্টি দেখে রোশান হেসে দেয়।

“এভাবে তাকানোর প্রয়োজন নেই। আমরা ডাক্তার মানুষ, ছুড়িকাঁচি নিয়ে আমাদের জীবন। এতো ভালো কবিতা আমরা লিখতে পারিনা। এটা আমার খুব প্রিয় একজন কবির লেখা।”
নীলু মাথা নিচু করে বললো,”দ্বিতীয় প্রেম যদি প্রথমের চেয়েও খাঁটি হয় তবে তাই হোক।”
“তার মানে?”
“আমি বাড়ি যাবো রোশান সাহেব। আমার খুব ক্লান্ত লাগছে। আমার বিশ্রাম দরকার।”
“আমি এগিয়ে দিয়ে আসবো?”
নীলু যেতে যেতে পিছন ঘুরে তাকায় রোশানের দিকে।

“এগুলো জমিয়ে রাখুন, পরে কাজে দিবে।”
হতভম্ব রোশানকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নীলু চলে যায়। তার শরীরের মিষ্টি সুবাস শুধুমাত্র রয়ে যায় রোশানের চারপাশে। নীলু কি বলতে চাইলো? রোশান বাঁধনহারা প্রেমের আভাস পায় হঠাৎই।

(চলবে…..)