মন গহীনে পর্ব-২৯

0
548

#মন_গহীনে

#পর্বঃ২৯

#দোলন_আফরোজ

আজ হিয়ার গায়ে হলুদ। তিথী বাড়ির সবচেয়ে ছোট সদস্য হওয়াই ওর আনন্দ টাই বেশি। বাড়িতে অনেক অতিথি এসেছে যাদের অনেককে তিথী এবার ই প্রথম দেখেছে। তাছাড়া হিয়ার বাবার ভাই বোন রাও এসেছে তাদের ছেলে মেয়ে সহ। তিথী বেশ এনজয় করছে তাদের সাথে।

হলুদে সব মেয়েরা পরবে কাঁচা হলুদ রঙের শাড়ী আর ছেলেরা সেম রঙের পাঞ্জাবী। হলুদের আয়োজন করা হয়েছে বাড়ির ছাদে। সন্ধ্যায় হলুদ প্রোগ্রাম। কাব্য আজ খুব ব্যাস্ত। সারাদিন খোঁজ খবর নিতে পারেনি তিথীর। দুপুরে খাওয়াও হয়নি তার। সারাদিন কাজের মাঝেও তিথীকে দেখার জন্য চোখ দুটো পুড়াচ্ছে খুব। একবার গেছিলো ও বাড়ির ভিতর, দেখা পায়নি তিথীর। ফোনে ফোন করেছে কয়েকবার, ধরেনি। এই মেয়ে ফোন কোথায় রেখে ঘুরছে কে জানি।

বিকেলের দিকে খাবার প্লেট নিয়ে তিথী হাজির বাড়ির ছাদে। ওখানে গিয়ে দেখে লোকেরা হলুদের স্টেজের ফাইনাল ডেকোরেশন করছে আর কাব্য তার ডিরেকশন দিচ্ছে।ক্লান্ত ঘর্মাক্ত মুখটাতেও কি অমায়িক লাগছে কাব্যকে। দেখেই তিথী ক্রাশ খেয়ে যায়।
মনে মনে নিজেই হাসে, হুর নিজের বরকে দেখেই ক্রাশ খাচ্ছি? লোকে কি বলবে?
হুহ লোকের কি বলার আছে? আমার বর, আমি ক্রাশ খেতেই পারি। এসব পাগলামি চিন্তা করে সে একা একাই হাসে।

নিঃশব্দে গিয়ে কাব্যর পাশে দাঁড়ায়। কাব্য তখনো স্টেজের কর্ণারের ফুল ঠিক করায় ব্যাস্ত। খেয়াল ই করেনি তিথীকে। তিথীর হালকা করে গলা খাকানিতে কাব্য ওর দিকে তাকিয়ে ভুত দেখার মতো চমকে যায়।

কি হলো ভয় পেলে নাকি?

বুকে ফু দিয়ে, হালকা হেসে, কিছুটা।

কেনো? কি ভেবেছিলে? কে আসবে তোমার কাছে?

এক গাল টেনে ধরে, আমার অগ্নি মুর্তি বউ থাকতে ভুত প্রেত এর ও সাহস নেই আমার কাছে ঘেঁষার।
কই ছিলে এতোক্ষণ, খুঁজেছিলাম, ফোন ও তো দিলাম কয়েকবার।

মন খারাপ করে, আমার কথা কে মনে রেখেছে? চারপাশে কতো হুর-পরী ঘুরছে, তাই আমাকে তো ভুলেই গেছো, তাই ফোনের খোঁজ রাখিনি।

আমার সামনে জলজ্যান্ত আমার নিজস্ব হুর পরী রেখে আমি আর কোন পেতনীর দিকে তাকাতে যাবো হ্যাঁ, দু গাল আলতো চেপে।

হাসে তিথী, হয়েছে হয়েছে, আর তেল দিতে হবে না, খাবে চলো। বলে হাত ধরে টেনে একটা চেয়ারে নিয়ে বসিয়ে দেয়।

তুমি খেয়াল করেছো?

করবো না? আমার বর এর খেয়াল আমি করবো নাতো কোন পেতনী কে করতে দিবো হুম। বলে খাবার খেতে ইশারা করে।

দুহাত তিথীর সামনে মেলে ধরে, কি করে খাবো? হাতে তো ময়লা।খাইয়ে দাও তুমি।

যাহ লোকে কি বলবে?

যা খুশী বলুক, আমার বউ এর হাতে খাবো তাতে কার কি। দাও না খাইয়ে। ( আদুরে গলায়)

তিথী ও মুচকি হেসে খাওয়াতে থাকে। খেতে খেতেই জিজ্ঞেস করে তুমি খেয়েছো?

হুম হিয়া আপুর সব কাজিন রা খাচ্ছিলো, তখন জোর করলো খুব, খেয়ে নিয়েছি তখন। আরো অনেক গল্প করছে, সন্ধ্যায় কি পড়বে, কিভাবে সাজবে বকবক করেই যাচ্ছে। আর কাব্য মুগ্ধ নয়নে তিথীকে দেখছে।

******************
হলুদের সাজে সেজেছে সবাই। হলুদ পাঞ্জাবীতে যে কোনো ছেলেকে এতোটা অসাধারণ লাগতে পারে তা জানা ছিলো না তিথীর। দূর থেকে কাব্য কে দেখে তাই ইচ্ছে করছে ঘরে আটকে নিয়ে শুধু সে একাই দেখতে। আর মনে তো মেধা কে নিয়ে ভয় আছেই। যদিও মেধা আসেনি, আর আসবে না বলেছে ও। তবুও ভয় পাচ্ছে তিথী।

এদিকে কাব্য স্টেজে তিথী কে হিয়ার পাশে দেখে হা হয়ে আছে। এতোটা সুন্দর কেনো হওয়া লাগবে।
বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে কাব্য। আবির ও এসেছে। তবে তমা আসেনি, ৩ মাসের প্রেগন্যান্ট তমা। তাই এতো ভীড়ের মাঝে আসেনি ও।
আড্ডার মাঝেই কাব্য সুযোগ খুঁজছে তার বউ টাকে একটু কাছে পাওয়ার। কল করেছে কয়েকবার, ধরেনি। তাই টেক্সট করেছে গুটিকয়েক, তার ও রিপ্লাই নাই। মেজাজ খারাপ হচ্ছে কাব্যর। এতো সুন্দর করে সেজেছে বউ টা, সবাই দেখছে শুধু সে ই কাছ থেকে দেখতে পাচ্ছে না।

কিছুটা দূর থেকেই দেখে কাব্য তিথীকে। দুজনের চোখাচোখি হতেই কাব্য বুকের বাঁ পাশে হালকা ঘুষি দিয়ে বলে, “”হায় ম্যা তেরে কুরবান।””

লজ্জা পায় তিথী। তখন কাব্য ইশারা করে তিথীকে নিচে যেতে। তিথী ও চোখ দিয়ে বুঝায় যাবে তিথী। কাব্য নিচে তিথীর জন্য অপেক্ষা করছে, তখনই তিথী আসে। তিথী আসার সাথে সাথেই কোমড় চেপে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয় কাব্য। ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় বেশ অনেকক্ষণের জন্য। আচমকা এমনটা হওয়াতে ভড়কে যায় তিথী। বড় বড় চোখ করে জিজ্ঞাসু চোখে তাকায় কাব্যর দিকে।

মুচকি হেসে বলে, আমাকে পাগল করার শাস্তি এটা। তুমি চেয়েছো আমি পাগল হই, আর পাগলের পাগলামি সহ্য করবে না তা করে কখনো হয় বলো। দুষ্টু হেসে।

ধাক্কা দিয়ে সড়িয়ে দিয়ে, সত্যি সত্যিই পাগল হয়ে গেছো তুমি। আমার আসাটাই ভুল ছিলো। বলে রাগ দেখিয়ে চলে যায় তিথী। কাব্য হাসতে হাসতেই পিছন থেকে বলে, আমার কোনো দোষ নেই কিন্তু, তুমিই চেয়েছো এমন টা হোক।
তিথী হাত ঘুড়িয়ে পাগল এর সাইন দেখিয়ে চলে যায়।

স্টেজের নিচেই সবার সাথে গল্প করতে ব্যাস্ত তিথী। কাব্য আবির দের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। তিথীর ঘাড়ে কারো গরম নিশ্বাস পড়তেই দেখে হাস্যোজ্জ্বল মুখে, হাতে গাঁদা ফুলের মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছেলে। ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকায় তিথী। ও কিছু বলার আগেই ছেলেটা বলে উঠে, অনেকক্ষণ থেকে ফলো করছি আপনাকে, এতো সৌন্দর্যের মাঝেও যেনো কিছু একটার কমতি আছে। এতোক্ষণ যাবৎ ভাবছিলাম কিসের অভাব। যখন খুঁজে পেলাম তখনই চলে এলাম আপনার কাছে। এই কাঁচা গাঁদার মালাতে আপনাকে পরিপূর্ণ লাগবে।( মুখে হাসি লেগেই আছে)

তিথী কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছে, তার আগেই কাব্য এখানে এসে হাজির। ভরাট কন্ঠে তিথীকে বলে, এখানে কি করছো তুমি?

কাব্যর কথা শুনে কাব্যর দিকে তাকাতেই ভয়ে গলা শুকিয়ে যায় তার। কাব্যর চোখ দুটো দিয়ে যেনো আগুন বেরুচ্ছে। হাত মুষ্টি বদ্ধ। এর মানে তিথীর জানা। সে একবার কাব্যকে দেখছে, আরেকবার সামনে থাকা ছেলেটিকে। যার হাত এখনো তিথীর দিকেই বাড়ানো আর সেই হাতে আছে গাঁদা ফুলের মালা।

তিথী আমতা আমতা করে বলে, কি কিছু ন না, আ আড্ডা দিচ্ছিলাম আপুদের সাথে।

এটা আড্ডা দেয়ার নমুনা?

এবার তিথী ভয়ে যেনো কেঁদেই দিকে। কারণ কাব্য এই টিউন এ তার সাথে কথা বলে না কখনো। কেঁদে দিবে ঠিক তখনই ছেলেটি বলে, স্যরি ব্রো, উনি আড্ডা ই দিচ্ছিলেন, আমি ই উনাকে এই গাঁদা ফুলের মালাটা দিতে এসেছিলাম।

এই কে বে আপনি? আর ওকে গাঁদার মালা কে দিতে বলেছে আপনাকে।( উত্তেজিত হয়ে)

আপনি শুধু শুধু হাইপার হচ্ছেন, আমি তো শুধু কথা বলতে এসেছিলাম উনার সাথে। আসলে ভাই রা বোনদের ব্যাপারে একটু বেশি ই পজেসিভ হয়।

এবার কাব্য হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে, পরিবেশ পরিস্থিতির কথা চিন্তা না করেই কলার চেপে ধরে ছেলেটির। কি বললি তুই? আমার বোন হয়? বোন হয় তোর।

শী ইজ মাই ওয়াইফ। বউ হয় ও আমার। বুঝতে পেরেছিস নাকি, আরো ক্লিয়ারলি বুঝাতে হবে?

এর মাঝেই অনেকে সেখানে জড়ো হয়। হেনা বেগম এসে কাব্যর দুহাত চেপে ধরে। কি করছিস বাবা, ছাড় ওকে। হিয়ার চাচাতো ভাই হয় ও।

কলার টা ছেড়ে দিয়ে, যা খুশী হোক, তিথীর দিকে তাকাবে কেনো? চিৎকার করে।

তখন রায়হানের মা, মানে ঐ ছেলেটার মা বলে, খুব দুঃখিত বাবা, আসলে আমিও প্রথমে একি ভুল করেছিলাম, তারপর তোমার ফুফির কাছে জানতে পেলাম তিথী এ বাড়ির বউ। আসলে আমরা খুবি দুঃখিত।

রায়হান অবাক হয়ে বলে, সিরিয়াসলি শী ইজ ম্যারেড? কান্ট বিলিভ।

এবার রেগে তাকায় কাব্য।
কাব্যর তাকানো দেখে জোর পূর্বক হাসি দিয়ে রায়হান বলে, Such a lucky person u are.

Yes i am the luckiest person in the whole world to being her.বলেই তিথীর হাত ধরে নিচে চলে আসে।

বিয়ে বাড়িতে কাব্যর কড়া হুকুম তিথী বাইরে যেতে পারবে না। খুব মন খারাপ হয় তিথীর। বিয়ে বাড়িতে সবাই মজা করবে আর ও ঘরের কোণে বসে থাকবে। গাল ফুলিয়ে বসে আছে সে। কাব্য বুঝতে পারে তিথীর মন খারাপ এর কারণ। ওদের বিয়েটাও কেমন একটা পরিস্থিতিতে হয়েছে। আর বাড়ির এটাই শেষ বিয়ে, তিথী ই বেশি এক্সাইটেড ছিলো বিয়ে নিয়ে।

আমার মিষ্টি বউ টাকি রাগ করেছে।

😷😷

খুব রাগ হয়েছে বুঝি? সামনে বসে এক গালে হাত দিয়ে।

এবার ঘুরে বসে তিথী।

আচ্ছা যাও। কম সাজবে আর সারাক্ষণ আমার সাথে থাকবে। আমার সাথে থেকে যতো খুশী মজা করতে পারো।

এবার তিথী কাব্যর দিকে ঘুরে, খুশি হয়ে বলে সত্যিই?

দুগাল চেপে ধরে, খুব সত্যি।

সারা বিয়ে বাড়ি কাব্য তিথীর সাথে বডিগার্ডের মতো লেগে থাকে। এর মাঝে কাব্য খেয়াল করেছে রায়হান ছেলেটা তিথীকে দেখেছে বেশ কয়েকবার। ইচ্ছে করছিলো চোখ দুটো উপড়ে দিতে। নেহাৎ ই অতিথি, নয়তো সত্যিই কাব্য তাই করতো।
ভালোভাবেই বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয়। আর তিথী এনজয় ও করেছে খুব। কিন্তু হিয়ার বিদায়ের সময় তিথী খুব কষ্ট পায়। এ বাড়িতে আসার পর থেকেই হিয়ার সাথে তিথীর খুব বন্ধুত্ব হয়ে যায়, এখন হিয়ার বিয়ে হয়ে যাওয়াতে ও একা হয়ে যায় একদম।

**************

আজ কাব্যর বিজনেস এর গ্র‍্যান্ড ওপেনিং। একটা কার এক্সেসরিজ এর কোম্পানি করে কাব্য। সব প্রোডাক্ট যাবে বাইরের দেশ গুলোতে। পরিবারের সবার ই এজ ইনভাইটেশন ওখানে। আবির তমা সহ কাব্যর সব বন্ধুরাও আছে। তারেক রহমান ও তানিয়া বেগম ও আছে। কাব্য আগে থেকেই তিথীকে বলে দিয়েছে ফিতা কেটে উদ্ভোদন টা তিথী ই করবে। তিথী ই বলে উদ্ভোদন টা বাবাকে মানে সেলিম সাহেব কে দিয়ে করাতে। কিছুক্ষণ চিন্তা করে কাব্য৷ তারপর এটা ভেবে খুশী হয় যে তার পিচ্চি বউ টা আসলেই একটা অমায়িক মানুষ, তার ছোট্ট মাথাটায় কি সুন্দর একটা চিন্তা এসেছে।বাবার সাথে সম্পর্ক ভালো করার এর থেকে সুন্দর উপায় আর পাবে না কাব্য।

অনুষ্টানের দিন সবাই যখন এটেন্ড করে তখন মাইকে এনাউন্স করে সেলিম সাহেব কে উদ্ভোদন করার জন্য, তখন সেলিম সাহেব খুব অবাক হন, সাথে শাহানারা বেগম, কায়েস অর্না সহ বাড়ির সবাই।

ছেলের কোম্পানির উদ্ভোদন করতে গিয়ে সেলিম সাহেব আবেগে আপ্লূত হয়ে পরেন। যেই ছেলে আজ ১২/১৩ বছর যাবৎ কথা বলে না সেই ছেলে তার এতো বড় এচিভমেন্ট এ তাকে শামিল করছে। কাব্য এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে, সব কিছুর জন্য স্যরি বাবা। পারলে ক্ষমা করে দিও।

সেলিম সাহেব কান্না করে দেন। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, আমি তো তোর অপরাধী, আমাকে ক্ষমা করে দিস বাবা।

আমাকে আর ছোট করে দিও না। আমি খুব লজ্জিত।
এভাবেই এতো বছরের অভিমানের অবসান ঘটে।




চলবে….