#মন_ভেজা_শ্রাবণে❤️
পর্ব – ৫
—————————–
“আ আপ নি এখানে?”
“কেনো খুব অসুবিধা হলো নাকি তোর?”
অন্তি জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়। গলা শুকিয়ে আসছে। ফোলা ফোলা চোখ জোড়া নত বদনে লুকানোর চেষ্টা করছে। আদ্র প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে কোনো দিরুক্তি করে নি। অন্তিকে এক পল যাচাই করে নিয়ে সোফায় মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়। অন্তি আড়চোখে একবার দেখে নেয় সে দৃশ্য। কিছুসময় কাটে নিরবতায়। দুজনের নিরবতার মধ্যে টেলিভিশনের মৃদু আওয়াজ টাও বেশ কড়া হয়ে পুরো রুমটায় প্রতিধ্বনি তুলছে। অন্তির ছোট্ট হৃদয়ে কেমন অজানা অনুভূতিতে ঢিপঢিপ করছে। অকস্মাৎ আদ্র রিমোট নিয়ে টেলিভিশন বন্ধ করে দিলো। অন্তির এবার আরও অবস্থা নাজেহাল। আদ্র নিশ্চয়ই এবার তাকে কোনো শা’স্তি দেবে। আদ্রের চোখে মুখে ক্রোধ স্পষ্ট। কিন্তু অন্তিকে অবাক করে দিয়ে আদ্র ফের চোখ বন্ধ করে আগের রুপে সোফায় মাথা ঠেকায়।
আরেকদফা ভড়কে ওঠে অন্তি প্রগাঢ় কন্ঠের সূচালো বাক্যের আঘাতে।
“পিচ্চি”
এই ছোট্ট ডাকে কী ছিল অন্তির জানা নেই। তবে এই একটি ডাকে যেন মনের মধ্যে কালবৈশাখী শুরু হলো তার। অকস্মাৎ সে অনুভব করল তার খুব কাছে কেউ আছে। অন্তি চমকে উঠে পাশ ফিরে তাকায়। হ্যাঁ তার অনুভূতি সত্যি! আদ্র তার একদম নিকটে। আদ্র’র দৃষ্টিও তখন অন্তির চোখে। চোখাচোখি হতেই অন্তি দ্রুত চোখ সরিয়ে ফেলতে চাইলো কিন্তু আদ্র তা হতে দিলো না। সে নিজের বা হাতের শাহাদাৎ আঙ্গুল দ্বারা অন্তির চিবুক তুলে ধরে ওর মুখটা একদম ওপরে তুলে ধরে। অন্তি চোখ খিঁচে বন্ধ করে থাকে। নাকের ডগা তিরতির করে কাঁপছে তার। চোখের বন্ধ পাপড়ি গুলোও কাঁপছে। ওষ্ঠজোড়া তো তুলনামূলক বেশিই কাঁপছে। আদ্র সেই মায়াবী চেহারায় নিজেকে হারিয়ে ফেলছে যেন। সে অন্তির চিবুক ছেড়ে কোমর আঁকড়ে ধরে। ভূমিকম্পের ন্যায় কেঁপে ওঠে অন্তি। পরপরই বন্ধ চোখ জোড়া ধপ করে খুলে ফেলে। দৃষ্টি তার শঙ্কিত। আদ্র এক দৃষ্টে অন্তির দিকে চেয়ে আছে। আদ্রের দৃষ্টি অস্বাভাবিক। অন্তি উসখুস করছে। একটা ছেলের এতটা গাঢ় স্পর্শ সে আগে কখনো পায় নি। অন্যরকম অস্থিরতা ভেতরটা পুড়িয়ে দিচ্ছে। আদ্রের স্পর্শ আরও একটু নিবিড় হয়। তার সিগারেটে পোড়া খয়েরী ওষ্ঠ জোড়া স্পর্শ করে অন্তির ললাট। অন্তি একটা ঝাঁকুনি দিয়ে আদ্রের শার্ট কলারের কাছ থেকে চেপে ধরে। আদ্র হঠাৎ কেমন নেশাগ্রস্ত হয়ে ওঠে। তার ঠোঁট আপনা হতেই অন্তির গাল, চোখ, নাকের ডগা স্পর্শ করে। তার এই অবাধ্য ছোঁয়া অন্তির অধর অব্দি পৌঁছে যায়। অন্তি যেন ক্রমশ অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়ছে। তার ছোট্ট কোমল হৃদয়, মন,
শরীর সবকিছুতে নতুনত্বের ছোঁয়া। আদ্র যখন পুরোপুরি অন্তিতে মত্ত ঠিক তখনই বেসামাল হয়ে অন্তি আদ্রকে সর্বশক্তি প্রয়োগ ধাক্কা মে’রে দূরে সরিয়ে দেয়। হাঁপাতে থাকে দুজনেই। অকস্মাৎ অন্তি ঠোঁট ভেঙে কান্না করে দেয়। আদ্র ভড়কে যায়। তাড়াতাড়ি অন্তিকে আগলে নিতে গেলে অন্তি তাকে হাতের ইশারায় সাবধান করে। মুখ দিয়ে ছোড়ে কিছু তিক্ত বাঁণ।
“খবর্দার কাছে আসবেন না আমার। আপনি একটা চরিত্রহীন পুরুষ মানুষ। ঘরে বাহিরে সবখানে আপনার নোংরামি চলে। গাছের টাও খাবেন আবার তলার টাও কুড়বেন তাই না। কলেজে সুন্দরীদের সঙ্গে ঢলাঢলি করে স্বাদ মেটে না আমাকেও অপবিত্র করতে চলে এসেছেন। সেই তো আবার অন্য নারীর সংস্পর্শে যাবেন তাহলে মিছে কেনো আমায় মায়ায় জড়ান। আপনার জন্য আমি প্রতি মুহূর্তে দগ্ধ হই। আবার সেই দহন জ্বালা নিজেকেই নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে মেটাতে হয়। কী চান আপনি আমি ম’রে যাই? আমাকে কলঙ্কিত করে শান্তি পাবেন? অসভ্য, দুশ্চরিত্র পুরুষ মানু…………..”
কথা শেষ করার পূর্বেই সপাটে চড় পড়ে অন্তির গালে। ততক্ষণাৎ তার মস্রিন গালে আঙ্গুলের ছাপ বসে যায়। ব্যথায় গালটা টন টন করে ওঠে। মাথাটা ঝন ঝন করে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। ঝাপসা চোখে সে দেখতে পায় আদ্র’র রক্তিম আভা ফুটানো প্রগাঢ় চোখের গভীরতা। ওই চোখে যেন আগুন ঝড়ছে। কপালের, কাঁধের কাছের রগ ফুলে স্পষ্ট দৃশ্যমান। শক্তি ভঙ্গিমায় থাকায় গলার মাঝ বরাবর কলারবন টা যেন খানিক বেশিই উঁচু দেখতে লাগছে। চোখে লাগছে ভীষণ। অন্তি ডোক গেলে। কয়েক কদম পিছিয়ে যেতেই আদ্র খপ করে তার দু বাহু চেপে ধরে নিকটে নিয়ে আসে। ব্যথায় কুকিয়ে ওঠে অন্তি। কিন্তু আদ্র’র সেদিকে কোনো হুঁশ নেই। সে অন্তির একদম কাছাকাছি মুখ নিয়ে, চোখে চোখ রেখে, দাঁত কিড়মিড়িয়ে চাপা কন্ঠে বলে,
“কী পারলি এতো বড় বড় কথা বলতে। আমি চরিত্রহীন? অন্য মেয়েদের সঙ্গে ঢলাঢলি করি? তোকে নষ্ট করতে চাই? বাহিরের মেয়ে দিয়ে হয় না আমার ঘরের টাও দরকার? কী হলো বললল।”
আদ্র চেঁচিয়ে ওঠে। অন্তি ভয়ে কেঁপে ওঠে। আদ্র ফের গলার স্বর নামিয়ে বলে,
“সত্যি যদি এমন হয় তবে তাই হোক। তোর কাছে হাজার বার দুশ্চরিত্র হতে আমি রাজি কিন্তু বাহিরের মেয়ে….. ছিহ্
এসব কী করে বললি তুই? মানছি আগের দিন একটা অপ্রীতিকর অবস্থায় তুই আমাকে দেখেছিলি কিন্তু ওটা ছিলো নিছকই বেখেয়ালি। আমি অন্যমনষ্ক ছিলাম নিহাত তার ফায়দা নেয়। ওর মেন্টালি সমস্যা আছে। ও নাবিলের বোন। নাবিলের পারসোনাল রিকুয়েষ্টে আমি ওকে টলারেট করতে বাধ্য হই। নয়তো কবেই…… ”
আদ্র কিছুসময় বিরতি নেয়। চোখ বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে ক্রোধ সংবরণের চেষ্টা চালায়। বেশ সময় নিয়ে চোখ খোলে। অন্তি ভয়ে সিটিয়ে আছে। এ কোন আদ্রকে দেখছে সে? আদ্র’র রাগ সম্পর্কে ধারণা থাকলেও এতটা ভয়ংকর রুপ আগে দেখা হয়নি। হঠাৎ আদ্র চোখ মেলে তাকায়। এক ঝটকায় অন্তিকে বুকে টেনে নেয়। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। অন্তি সেভাবেই শক্ত হয়ে থাকে। কী করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। আদ্র অন্তির ঘাড়ে মুখ গুজে দিয়ে বার কয়েক জোরে জোরে শ্বাস টেনে বিড়বিড়িয়ে বলে,
“আমি চরিত্রহীন নই পিচ্চি। আমি শুধু তোর জন্যে দিওয়ানা। আমার অপারগতা নিশ্চয়ই বুঝবি তুই। না জেনেই এভাবে বলা কী ঠিক হলো তোর? কতটা কষ্ট দিলি আমায় তা কী তুই বুঝবি? আমার নিশ্বাসে-প্রশ্বাসে শুধু তুই, তুই আর তুই। আমার পিচ্চি। প্লিজ এভাবে আমায় আর কষ্ট দিস না জান।”
অন্তি নিজের কানকে বিশাল করতে পারছে না। আদ্র এসব কী বলছে? এসব কী সত্যি? আদ্র কী ইন্ডাইরেক্টলি প্রপোজ করছে অন্তিকে? নাকি নাটক করছে? তবে এই মুহুর্তে কিছু বলার ভাষা অন্তির জানা নেই। আদ্র অবশ্য অন্তির উত্তরের অপেক্ষায় নেই ও। সে ক্ষনকাল পূর্বেই অন্তিকে ছেড়ে স্বাভাবিক হয়ে দাড়িয়ে গেছে। আঙ্গুলের সাহায্য অন্তির চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে খুব শান্ত কন্ঠে বলে,
“তৈরি হয়ে আয় আমি অপেক্ষা করছি।”
অন্তি ইতস্তত করে কিছুটা। সবটা মানতে তার এখনো কষ্ট হচ্ছে। অথচ আদ্র কী স্বাভাবিক। মনে হচ্ছে এতক্ষণ কিছুই যেন হয় নি। অন্তিকে সটান মে’রে দাড়িয়ে থাকতে দেখে আদ্র বিরক্ত হয়ে বলে,
“কী রে কথা কানে যায় না। রেডি হতে বললাম তো?”
অন্তি ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বলে,
“কো কোথায় যাবো?”
আদ্র’র সাবলীল উত্তর,
“জাহান্নামে।”
অন্তি ভ্রু কুঁচকে ফেলে। ছোট্ট করে বলে, “আম্মু?”
“খালামনি আগেই চলে গেছে। তোকে ফেলে গেছে আমার ঘাড়ে।”
অন্তির কিঞ্চিৎ রাগ ওঠে। তার ঘাড়ে ফেলে গেছে মানে? রাগটাকে মনের মধ্যে চেপে নিয়ে সে ধুপধাপ পা ফেলে তৈরি হতে চলে যায়। আপাততঃ কিছুক্ষণ আগের ঘটনা তার আউট অফ নলেজ। এদিকে আদ্র অন্তির রাগের মাত্রা বুঝতে পেরে মুচকি হেসে সোফায় বসে পড়ে।
—————–
চলবে,
®সাদিয়া আফরিন নিশি