#মিহুর_সংসার
#পর্বঃ৬
আমি ভাবলাম, তুলিও বোধহয় নিতুর মতো দরজার ওপাশ থেকে আমার কাছে ছুটে আসবে কথাগুলো শুনে।এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে এরপর আমি হাত বাড়াবো সে আমাকে জড়িয়ে ধরবে।
কিন্তু দুই মিনিট অপেক্ষা করার পরও এমন কিছুই ঘটলো না।
আমি নিতুকে বললাম,
– তুলি কোথায়?
– সে তো লুডু খেলছে।কিছুক্ষণ পর আমরা কুতকুত খেলবো।
– তাহলে আমি এতক্ষন এই কথাগুলো কা কে শুনালাম?
আমার কথা শুনে রুমে থাকা সবাই একসাথে হাসতে শুরু করলো।
তাদের হাসির শব্দে আমার কিছুটা লজ্জা পেয়ে গেল।
হাসি থামিয়ে নিতু ফরহাদকে বলল,
– চলো, আমরা দুজন হোটেলের ছাদে যাই।সেখানে গিয়ে কিছুক্ষণ আড্ডা দেই।
ফরহাদ বলল,
– এতো রাতে ছাদে যাওয়া কি ঠিক হবে?
– এখন না গেলেও একটু পরে তো সবার-ই যেতে হবে।
আমি আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
– সবার যেতে হবে মানে?
– কিছুক্ষণ পর তো কুতকুত টুর্মামেন্ট শুরু হবে ছাদে।হোটেল ম্যানেজমেন্টকে আগে বলে দিয়েছিলাম আমরা।তারা প্রায় সবকিছু আয়োজন করে ফেলেছে।আপনারাও ইচ্ছা করলে খেলতে পারবেন আমাদের সাথে।এটা তো গার্লস স্কুল না যে শুধু আমরা মেয়েরাই খেলবো।এই হোটেলে নারী-পুরুষ সবারই সমান অধিকার।
আমি বললাম,
– সেই অধিকারের কোনো দরকার নেই যেটা দিয়ে আমরা কুতকাত খেলতে পারবো।আমরা এখন একটু শান্তিতে ঘুমাবো।
আমার কথা শুনে নিতু চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
নিতু যাওয়ার কিছুক্ষণ পর ফরহাদ বলল,
– চলেন ভাই, কুতকুত না খেললেও ছাদে গিয়ে তাদের খেলা উপভোগ করি।আগে তো কত কষ্ট করে নৃত্য দেখেছিলাম আর এখন তো তারা নিজেরাই দাওয়াত দিয়ে গেল খেলা দেখার জন্য।আমরা চাইলে কিন্তু নিজেরাও খেলতে পারি।অনেক মজা হবে ভাইয়েরা।
আমি বললাম,
– ভাই আপনার কি ব্যক্তিত্ব বলে কিছু নাই?
এত অপমানের পর ও আপনি ছাদে যাবেন কুতকুত খেলা দেখতে?
– দেখতে যাবো না মিহু ভাই, খেলতে যাবো।ছোটবেলা যেই দুই-চারটা বিষয়ে ট্যালেন্ট ছিল এরমধ্যে কুতকুত খেলা অন্যতম।এমনকি আমার সাথে কুতকুত খেলে কোনো ছেলে তো দূরের কথা, মেয়েরাও পারতো না।
– তাহলে আপনি খেলে আসুন ভাই।আমার এই রকম কোনো ট্যালেন্ট নেই দেখানোর মতো।
এরপর ফরহাদ বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
– কেউ গেলে আমার সাথে যেতে পারেন।না খেললেও আমাকে উৎসাহ দিতে পারেন।
রিমা নামের মেয়েটার বর ফরহাদের কথায় সাড়া দিয়ে ছাদে চলে গেল খেলা দেখতে।
আমরা বাকি চারজন বিছানায় শুয়ে রইলাম।
রাত বারোটার দিকে হঠাৎ ফরহাদ আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বললেন,
– মিহু ভাই, উঠেন তাড়াতাড়ি। আপনার জন্য সুখবর আছে একটা।
আমি আধ ঘুমে থাকা অবস্থায় জিজ্ঞেস করলাম,
– এত রাতে চেঁচামেচি করছেন কেন ভাই?
– ভাই, তুলি ভাবি তো কুতকুত খেলায় প্রথম হয়েছে।হোটেল ম্যানেজম্যান্ট এর পক্ষ থেকে আপনাকে ডাকা হচ্ছে।যারা বিজয়ী হয়েছে তাদের স্বামীরা তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দিবে।
আমি তার কথায় গুরুত্ব না নিয়ে বললাম,
– বিরক্ত করবেন না তো ভাই আমাকে একটু ঘুমাতে দিন।
এক প্রকার জোড়াজুড়ি করেই সবাই মিলে আমাকে ছাদে তুলে ফেললো।
উপস্থাপক আমাকে দেখে বলল,
– আপনিই কি মিহাদ সাহেব?
– জ্বি।
– আরে স্যার, আপনার স্ত্রী তো কুতকুত, লুডু দুই খেলাতেই প্রথম হয়েছে।কি ভাগ্য আপনার, খুব ভালো একটা বউ পেয়েছেন।
আমি মনে মনে বললাম,
“যে মেয়ে আমার জীবন নিয়ে এত সুন্দর করে ছিনিমিনি খেলতে পারে তার পক্ষে কুতকুত আর লুডু এইসব কোনো বিষয়ই না।”
এরপর তিনি বললেন,
” এবার মঞ্চে আসছে লুডু আর কুতকুত উভয় খেলার বিজয়ী তুলি।তার হাতে পুরস্কার তুলে দিবেন তার সবচেয়ে প্রিয়জন, কাছের মানুষ মিহাদ হোসেন।সম্পর্কে উনারা স্বামী-স্ত্রী।
আমি হাসি মুখে তুলির হাতে পুরস্কার দিয়ে বললাম,
– খুব ভালো খেলেছো।জীবনে কুতকুত খেলে বহুদূর যাও।
উপস্থাপক বলল,
– তুলি আপু, আপনি যদি নিজের কিছু অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে শেয়ার করতেন।এত ভালো কুতকুত খেলা কার কাছ থেকে শিখেছিলেন?
তুলি হাসিমুখে বলল,
– ধন্যবাদ আপনাকে।সত্যি বলতে আমি হাতে কলমে কারো কাছ থেকে কুতকুত খেলা শিখিনি। কুতকুত খেলার জন্য শৌখিন একটা মন দরকার।যার ভিতরে শৌখিন মন নেই তার দ্বারা কুতকুত খেলা সম্ভব না।
– আর লুডু খেলা নিয়ে যদি কিছু বললেন?
– আমাদের দেশে সবচেয়ে মজার খেলা হচ্ছে লুডু।কিন্তু এই খেলা তার ন্যায্য সম্মান কোনোভাবেই পাচ্ছে না।অনেকেই লুডু খেলাকে ছোট চোখে দেখেন।কিন্তু লুডু খেলা আমাদের জাতীয় জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।লুডু খেলা আমাদের ধৈর্য্যশীল হতে শিখায়, জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত যে আমাদের লড়াই করে যেতে হবে সেই শিক্ষাটাও আমরা এই লুডু খেলা থেকে পেয়ে থাকি।আবার মাঝেমধ্যে অনেক চেষ্টা করেও আমরা সফল হতে পারি না, ভাগ্যের উপর আমরা সবাই নির্ভরশীল। এই বিষয়টাও কিন্তু এই লুডু খেলার মাধ্যমেই বুঝতে পারি।
– খুব সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেছেন।আপনি আরও বহুদূর এগিয়ে যান, আমরা সেই প্রত্যাশা করি।
এরপর উপস্থাপন আমার কাছে এসে বললেন,
– আপনার স্ত্রীর যে এতো অর্জন ওগুলো কীভাবে দেখছেন?
– খুব ভালো ভাবেই দেখছি।আমি ভাবছি আমাদের বাসাতেও তার জন্য কুতকুত খেলার আয়োজন করবো মাঝেমধ্যে।আর কেউ তার সাথে লুডু না খেললেও আমি হেরে গিয়ে বারবার তাকে জিতিয়ে দিবো।স্বামী হিসেবে যতটা সাপোর্ট দেওয়া সরকার ঠিক ততটাই দিবো।
– বাংলার সব ঘরে ঘরে এমন স্বামীর খুব প্রয়োজন।আপনাদের দুজনের জন্য অনেক শুভেচ্ছা আর অভিনন্দন।
এরপর রুমে এসে ঘুমিয়ে পরলাম।এভাবেই যেতে লাগলো কক্সবাজারের ঘুরাঘুরি।কক্সবাজার তিনদিন থেকে পরের তিনদিন সাজেক কাটালাম।
যতটা আশা নিয়ে এখানে ঘুরতে এসেছিলাম ঠিক ততটাই হতাশ হয়ে ফিরে আসলাম বাসায়।
তবে এই সাতটা দিন আমরা ছয়জন স্বামীও খুব মজা করেছি।একসাথে অনেক ঘুরাঘুরি করেছি, রাতে বিরহের গান গেয়েছি, সকালে উঠে আবার স্ত্রীদের দিকে নজর রেখেছি।
আমদের দেখে মনে হয়েছিল,
” কয়েকটা স্কুল পড়ুয়া বাচ্চাদের শিক্ষাসফরে আনা হয়েছে।এখানে শিক্ষার্থী হচ্ছে স্ত্রীরা আর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আমাদের।ঠিকভাবে সবকিছু করছে কিনা এই সব খেয়াল রাখা-ই আমাদের দায়িত্ব।
শেষমেশ সবকিছুর ভালোভাবেই অবসান ঘটিয়ে সাতদিন পর বাসায় চলে আসলাম।
বাড়ি থেকে বাবা- মা ও তাদের কাজকর্ম শেষ করে ফিরে এসেছেন।
বাসা আগের মতোই জমজমাট। আগে যেভাবে দিনকাল চলতো এখনও ঠিক সেই ভাবেই দিনকাল চলছে।
এভাবে আরও ছয় মাসের মতো কেটে গেলো আমার সংসার জীবন।
এখনও তুলি বসে বসে বাচ্চাদের মতো কার্টুন দেখে,কখনও ইমোশনাল কিছু দেখে বাচ্চাদের মতো কান্না শুরু করে।
এখন আমারও অভ্যাস হয়ে গেছে এসব কিছু দেখতে দেখতে।আমি এখনবার তেমন কিছু বলি না এসব দেখে।শুধু পরিবর্তনের মধ্যে একটা বিষয়ই হয়েছে।সেটা হলো আগে মন খারাপ থাকলে তুলি একা একা কাঁদতো আর এখন মন খারাপ হলে আমার বুকে,কাঁধে মাথা রেখে কাঁদে।
আমিও বাচ্চাদের মতো ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিই।
একদিন সকালে অফিস যাবো কিন্তু উঠে দেখি বাসায় কোনো খাবার নেই।
অথচ আম্মা আর তুলি দুজনই বাসাতে রয়েছে।
আমি আর আব্বা দুইজনই টেবিলে বসে রয়েছি কিন্তু কেউ আমাদের খেয়াল করছে না।
তুলিকে হাঁটতে দেখে বললাম,
– নাস্তা আনো, অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে।
সে সোজাসাপ্টা বলে দিলো,
– আজকে নাস্তা নেই।না খেয়ে অফিসে চলে যাও।একদিন না খেয়ে থাকলে তেমন কিছুই হবে না।
– সকালে তো দেখলাম তুমি আর মা দুইজনে মিলে নাস্তা তৈরি করছিলে?
ঐসব নাস্তা গেলো কোথায়?
– সেগুলো সব শেষ।
– তোমরা দুজনেই সব শেষ করে দিলে।আমাদের জন্য তো কিছু রাখতেও পারতে।
– আমরা কিচ্ছু খাই নি।
– তাহলে কে খেয়েছে?
– সকালে একটা ফকির এসে বলল,
” আম্মা দুইদিন ধরে কিছু খাই না।বাসায় কিছু খাওয়ুন হইবো।ফকিরটা এতো মায়া দিয়ে আম্মা ডাকটা দিলো যে নিজেকে সামলাতে পারলাম না।এভাবে কেউ কোনোদিন ডাকে নি তো।এরপর আম্মাকে সবকিছু বুঝিয়ে বললাম ফকিরের বিষয়ে।
– তারপর?
– দুজনে মিলে নাস্তার সাথে পোলাও মাংস রান্না করে ফকিরটাকে সব দিয়ে দিয়েছি।তাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা পাঁচজন।এই জন্য সব কিছু বেশি বেশি করেই দিয়েছি যেন দুই তিনদিন ধরে খেতে পারে।
তুলির কথা শুনে পাশে বসে থাকা বাবা বলল,
– বাহ! খুব ভালো করেছো।নিজেদের জন্য কিছুই না রেখে সব কিছু ফকিরকে দিয়ে দিলে।তোমাদের বউ-শাশুড়িকে তো যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল দেওয়া দরকার।
বাবার কথা শুনে তুলি রুম থেকে চলে গেল।
আমি বললাম,
– তাহলে আর টেবিলে বসে থেকে কোনো লাভ নেই বাবা।চল, উঠে পরি।
বাবা আমাকে ধমক দিয়ে বলল,
– এই জন্যই বিয়ে করার আগে বলেছিলাম তোর মায়ের পছন্দে কখনও বিয়ে করিস না।নিজে দেখে শুনে বিয়ে কর।তোর মা নিজে যেমন জন দরদী সে দেখে শুনে নিজেও একটা তেমন মেয়েই বাসায় এনেছে।
– মাকে তো এরকম করতে কখনো দেখিনি।
– আরে তখন তো তোর জন্মই হয় নি।দেখবি কি করে?
– ও, তাহলে প্রথম প্রথম মা ও তুলির মতো এই রকম ইমোশনাল ছিল?
-হুম, হুবুহু কার্বন কপি।
– তাহলে তুলিও বোধহয় কিছুদিন পর ঠিক হয়ে যাবে।
– হলে তো ভালোই।তবে বাসায় কিন্তু আমি সেই পঁচিশ বছর আগের ফিল পাচ্ছি।খুব ভালোও লাগছে আবার না খেতে পেরে পেটটা কেমন যেন করছে।
– চলো, হোটেল থেকে খেয়ে আসি বাবা।
– চল।খেতে তো হবেই।
– আচ্ছা বাবা, মা ও কি তুলির মতো রাগ করে বাপের বাড়িতে চলে যেতো।
– মাসে দুই তিনবার তো যেতোই।তবে বেশিক্ষণ থাকতে পারতো না।কারণ তোর মায়ের হাতের রান্না ছাড়া আমি বাইরের কিছু খেতে পারতাম না।তাই আমার কষ্ট হবে ভেবে বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারতো না।
বাবার কথা শুনে বেশ ভালোই সান্ত্বনা পেলাম।তাহলে তুলিও আস্তে আস্তে পরিবর্তন হয়ে যাবে।
বিয়ের দুই বছর হয়ে গেছে।তুলির একটা মেয়ে হবে।আট মাসের মতো হয়ে গেছে।
কিন্তু এখনও তুলির মধ্যে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
ঠিক মতো খাচ্ছে না, সময় করে ঘুমাচ্ছে না।ডাক্তারের দেওয়া কোনো নিয়মই মানছে না।
আমি যখন বলি সময় মতো খাবার খেতে, ঘুমাতে,বিশ্রাম নিতে তখন তার একটাই জবাব,
” আমার শরীর নিয়ে কারো ভাবতে হবে না।আমি তো জানি কীভাবে চলতে হবে।”
মা’কে ফোন দিয়ে যখন জিজ্ঞেস করি তুলি খেয়েছে কিনা তখন তিনি বলেন,
“আমি তো বলে আসলাম খেতে।”
কখনও মা নিজেই মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন।
কখনও বাবা ধমক দিয়ে খেতে বলছেন।কিন্তু সে আগের মতোই জীবনযাপন করছে।
(চলবে…)
© খাদেমুল আলম মিঠুন