যদি আমার হতে পর্ব-৩৮+৩৯

0
759

যদি আমার হতে🌹
পর্ব – ৩৮
লেখিকা : সৈয়দা প্রীতি নাহার

অফিস থেকে ফেরার পথে আরিয়ার জন্য একবক্স চকোলেট, লাল রঙের ফ্রক আর বড় একটা টেডি বেয়ার কিনে আনলো মুগ্ধ। আরিয়ার ৫ম বর্ষের জন্মদিনের উপহার হিসেবে এর থেকে ভালো কিছু তার চোখে পড়েনি। গাড়িতে সব রেখেই ঘরে এসে সবাইকে তৈরি হ‌তে তাড়া দিয়ে সেও অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে গেলো।

“আপনার কাপড় রাখা আছে বিছানায়। পড়ে নিবেন।”

“শুনো। আরিয়ার জন্য চকোলেট, ফ্রক আর টেডি আনলাম। পছন্দ হবে তো ওর?”

“এতোকিছু আনার কি দরকার ছিলো? আপনি শুধু ফ্রক বা টেডি আনতেন। আমিও তো কিছু দিবো!”

“হ্যাঁ তো, এই উপহারগুলো আমাদের দুজনের তরফ থেকে।”

“মুগ্ধ আপনি বুঝছেন না। কিনেই যখন ফেলেছেন তখন এগুলো আপনিই দিন তাকে। যাওয়ার সময় আমি নাহয় কিছু কিনে ফেলবো।?”

“আদ্রিশা! ইউ আর মাই ওয়াইফ! স্বামী স্ত্রী একসাথে কোনো অনুষ্ঠানে গেলে উপহার‌ও একসাথেই দিতে হয়। আলাদা আলাদা নয়! আমাদের মধ্যে মনোমালিন্য থাকলেও সেটা সমাজে বা পরিবারের কাছে প্রদর্শন করা ঠিক নয়। যদিও আমাদের সম্পর্ক আর পাঁচটা সম্পর্কের মতো নয় তবুও সমাজের চোখে আমরাও আর সবার মতো হাজবেন্ড ওয়াইফ। সো আই হোপ তুমিও আর আপত্তি করবে না?”

“আচ্ছা। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিন। আরু ফোন করছে বার বার। আমরা না গেলে সে কেক কাটবে না।”

মুগ্ধ মুচকি হেসে মাথা নাড়লো। সেদিন ভার্সিটিতে তুমি বলার পর থেকে মুগ্ধ আদ্রিশাকে তুমি বলেই সম্মোধন করে। আদ্রিশা এর কারন জানতে চাইলে মুগ্ধ বলেছিলো, এতোদিনের স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে আপনি আজ্ঞা করলে সবার মনে সন্দেহ সৃষ্টি করবে। তাই তুমি বলাই শ্রেয়।আর শাহিনের সামনে ঐ ভাবে কথা বলার প্রশ্নের উত্তরে মুগ্ধ বলেছিলো, তুহিনের মতে ছেলেটা আদ্রিশাকে বিরক্ত করে। একটা মেয়েকে বাঁচাতে এটুকু করা যেতেই পারে। আবার সেই মেয়েটি যখন সবার চোখে তার স্ত্রী তখন তাকে বাঁচানোটাও তার দায়িত্ব। আদ্রিশা আর কথা বাড়ায় নি এরপর। আদ্রিশার সব প্রশ্নের উত্তর‌ই যেনো মুগ্ধর কাছে থাকে। প্রশ্ন যত‌ই কঠিন হোক সহজ ভাবেই তার উত্তর দিতে সক্ষম মুগ্ধ।

গাড়ি থেকে নেমে উপহার নিতেই আরিয়া জাপটে ধরলো মুগ্ধকে। আদ্রিশা অভিমানি কন্ঠে বললো, “বাহ! ফুপি এসেছে সেদিকে খেয়াল নেই? আরু কি শুধু মুগ্ধ আঙ্কেলকেই ভালোবাসে?”

আরিয়া জিবে কামড় দিয়ে আদ্রিশাকে জড়িয়ে ধরলো। মিস্টি হেসে বললো, “স্যরি ফুপি। আমি তোমায় সব থেকে বেশি ভালোবাসি। দিনে তো কতোবার তোমার সাথে কথা বললাম! ফুপাই কে তো পাইই নি। তাই এখন একটু বেশি আদর ফুপাইয়ের জন্য।”

আদ্রিশা কোমরে হাত দিয়ে বললো, “ফুপাই? তুই না মুগ্ধকে আঙ্কেল বলে ডাকতি?”

“ডাকতাম তো। কিন্তু আদর করে ফুপাই ডাকি! সুন্দর না বলো?”

মুগ্ধ আরিয়াকে কোলে তুলে নিলো। গালে ছোট্ট চুমু দিয়ে দুষ্টুমি মাখা হাসি দিয়ে বললো, “অফ কোর্স প্রিন্সেস! ফুপাই শব্দটাতে যতোটা আদর ততোটা আর কোনো শব্দে নেই। এমনকি ফুপি শব্দটাতেও না!”

আদ্রিশা কিছু বলবে তার আগেই মুগ্ধ আরিয়ার হাতে গিফ্ট র‌্যাপ করা চকোলেট বক্স দিলো।

“হ্যাপি বার্থডে বাবু! অনেক ভালো থেকো। মাম, বাবাইয়ের কথা শুনে চলবে ওলোয়েজ। সবাইকে ভালোবাসবে‌। দাদু দাদির সেবা করবে। সবাইকে প্রাউড ফিল করাতে হবে তো?(আরিয়া সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লো) তাই খুব খুব পড়াশুনা করতে হবে। আর হ্যাঁ (আদ্রিশার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বললো) ফুপির থেকে ফুপাইকে বেশি আদর দিতে হবে।”

আদ্রিশা মুখ ফুলিয়ে ঘরে চলে গেলো‌। মুগ্ধ মুচকি হেসে আরিয়ার দিকে ভ্রু উচিয়ে তাকালো। আরিয়া খিলখিল করে হেসে উঠলো।

_____________

মালিহা ইয়াসমিন মুখ ভার করে বসে আছেন। পাশে স্বামী শ‌ওকত শাহ ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। স্ত্রীর দিকে একপলক দেখে কর্কশ ধ্বনিতে বললেন, “কি হলো? ঘুমাবে না?”

মালিহা একমনে জানালার দিকে তাকিয়ে আছেন। উত্তর না পেয়ে শ‌ওকত শাহ বিরক্ত প্রকাশ করে বললেন, “ঘুম পাচ্ছে আমার। আলো নিভিয়ে দাও।”

মালিহার তৎক্ষনাৎ উত্তর, “পারবোনা!”

শ‌ওকত শাহ কাঁথা জড়িয়ে নিলেন শরীরে। হাই তুলতে তুলতে বললেন, “থাক তবে!”

মালিহার যেনো স্বামীর এমন আচরণ সহ্য হলো না। ঝটকা মেরে কাঁথা সরিয়ে বললেন, “খবরদার ঘুমাবে তো!”

শ‌ওকত শাহ হকচকিয়ে বললেন, “তোমার ঘুম পায় নি বলে কি আমিও জেগে থাকবো না কি? বুড়ো বয়সের ভীমরতি সব!”

মালিহা বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পরলেন।চোখে মুখে কষ্টের রেখা ফুটিয়ে বললেন, “তাই তো। আমার ইচ্ছে অনিচ্ছা এখন ভীমরতি! ঘুমাও তুমি। কিচ্ছুটি বলবো না আর!”

স্ত্রীর মান ভাঙাতে শান্ত গলায় বললেন, “কেনো এতো জেদ করছো? সবকিছুর পারফেক্ট সময় থাকে। সময়ের আগে কিছুই হয় না।”

মালিহা কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, “আমি কি এমন আবদার করেছি শুনি! এমন তো কিছু চাই নি যা অসম্ভব। স্বাভাবিক ভেবেই নাতি,নাতনির মুখ দেখতে চেয়েছি। এটাওকি চাইতে পারি না?”

শ‌ওকত শাহ দুষ্টু হেসে বললেন, “আহা। তুমি কি চাইছো বলোতো? বাচ্চা কি এখন‌ই হবে না কি? সন্তান জন্মের তো একটা প্রসেস আছে না কি? তোমার নাতি নাতনি তো আর গাছের ফল নয়। যে ওরা টুপ করে পেড়ে আনবে!”

কিন্তু এতে মালিহা আরো চটে গেলেন। রাগি স্বরে বললেন, “ফাজলামো রাখো তোমার। কেউ বুঝে না আমাকে। না ছেলে বুঝে আর না তার বাপ বুঝে!”

শ‌ওকত শাহ তরীঘরি করে বিছানা থেকে নেমে মালিহার সামনে দাঁড়ালেন। স্ত্রীকে বিছানায় বসিয়ে শান্ত করতে করতে বললেন, “কে বললো বুঝি না তোমায়? আমি মুগ্ধ সবাইই তোমায় বুঝে। বুঝোনা তো তুমি! আমার কথা শুনো, তোমার চাওয়ায় কোনো ভুল নেই।অবশ্য‌ই চাইতে পারো। এটা তোমার অধিকার। কিন্তু নিজের শখ, ইচ্ছা, সপ্ন ওদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারো না। কেনো বুঝতে পারছো না, ওরা এখন এসবের জন্য তৈরি নয়। বিয়ের ক’মাসেই যে বাচ্চা নিতে হবে এমন তো নয়। আর মুগ্ধ কি বলেছে তুমি শুনো নি? বলেছে তো এখন এসব ভাববার সময় নয়। আদ্রিশার ফাইনাল এক্সাম হয়ে যাক। পড়াশুনা কম্প্লিট করুক আগে। মুগ্ধকেও নিজের কাজে স্যাটেল হতে দাও। তারপর নাহয় যা হ‌ওয়ার হবে। আর সব থেকে বড় কথা বাচ্চা কখন নিবে সেটা স্বামী স্ত্রী ডিসাইড করবে। তুমি , আমি , আমরা কেউই এর মাঝে কিছু বলতে পারি না। সন্তান জন্মদান ছাড়াও অনেক কিছুই করতে হয় বাবা মাকে। সন্তানের ভরণ পোষন, বেড়ে ওঠা সবকিছু তো আর তুমি করবে না। বাবা মা করবে। তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে দাও। অপেক্ষা করো আর শান্ত হ‌ও তুমি। ঘুমাও। শরীর খারাপ করবে নাহয়!”

মালিহা স্বামীর কথাটা বুঝলেন হয়তো। নিঃশব্দে মাথা নেড়ে চোখ মুছে শুতে গেলেন।

আরিয়ার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে সবাই জানতে পারে জেসমিন ২য় বারের মতো প্রেগন্যান্ট। ও বাড়িতে খুশির রোল পরার সাথে এবাড়ির‌ও প্রতিটা মানুষ খুশি। রুমানা আহমেদের আবার‌ও দাদি হ‌ওয়ার খুশি দেখে মালিহা ইয়াসমিন নিজেকে আটকাতে পারলেন না। ঝোঁকের বসে ছেলে ব‌উমাকে নাতি নাতনির আবদার করে বসেন‌। আদ্রিশা কিছু না বলে মাথা নিচু করেই ছিলো। সবাই ভাবছিলো হয়তো সে লজ্জা পাচ্ছে। কিন্তু সত্যিটা হলো এই সুখ যে তার কপালে নেই। মুগ্ধর স্ত্রী হলেও মুগ্ধর সন্তানের মা সে হতে পারবে না। কিছুদিনের ব্যবধানে তিথি থাকবে তার জায়গায়। অথচ মুখ ফুটে কাওকে কিছু বলার ক্ষমতা তার নেই। অন্যদিকে মুগ্ধ আদ্রিশার মনের অবস্থা আন্দাজ করে নিয়েছে ঠিক। তাই ওখানে কোনো প্রতিউত্তর না করে নিজ বাড়িতে এসেই মাকে বলে দিলো এখন বাচ্চা নিবে না তারা। কারন হিসেবে সবে বিয়ে হয়েছে এবং আদ্রিশার পড়াশুনাকে মূখ্য করে দেখিয়েছে সে। তারপর‌ও মন মানে নি মালিহার। ভেবেছিলেন ছেলে তার মায়ের কথা অবজ্ঞা করছে। কিন্তু এখন স্বামীর কথায় মনে হচ্ছে মুগ্ধর কথা বুঝতে ভুল করেছিলেন তিনি। সত্যিই তো, স্বামী স্ত্রী কখন বেবি প্ল্যানিং করবে সেটা নিতান্ত‌ই তাদের ব্যাপার। মাঝখানে পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের কথা বলা সাজে না। পারিবারিক সিদ্ধান্ত পরিবারের সবাই আলোচনা করে নিলেও নিজ পরিবার তৈরির বিষয়টা স্বামী এবং স্ত্রীর আলোচনার বিষয়। কেননা সেটা ব্যাক্তিগত। তৃতীয়পক্ষের কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ গ্রহণ যোগ্য হ‌ওয়ার কথা নয়।

চলবে,,,,,,,,

যদি আমার হতে🌹
পর্ব – ৩৯
লেখিকা : সৈয়দা প্রীতি নাহার

—স্যার! মে আই কাম ইন?
— নো। ইউ আর নট এলাউড!
—স্যরি স্যার! দেরি হয়ে গেছে আমার।
—সেটা আমার দেখার বিষয় নয়। ১৫ মিনিট দেরিতে আসলে ক্লাসে ঢুকার পারমিশন নেই, আর তুমি তো আধঘন্টা লেইট। বাকি সময়ে পরীক্ষাও কম্প্লিট করতে পারবে কি না সন্দেহ।
—স্যার প্লিজ স্যার। আমাকে একটা সুযোগ দিন। আমার একটা বছর নষ্ট হয়ে যাবে তা না হলে! বিশ্বাস করুন আমি এক মিনিট‌ও বেশি সময় চাইবো না। পর্যাপ্ত সময়ের মধ্যেই পেপার জমা দিবো। আমায় এক্সামটা দিতে দিন প্লিজ।
— তা বললে তো হয় না। রুল ইজ রুল। সবাই এক্সামের আগেই উপস্থিত হলো আর তুমি পারলে না!? আমি তোমার জন্য অন্যদের সাথে অবিচার করতে পারবো না।
— আপনি আমার সাথে অবিচার করছেন। দেখুন, আমি অনেক পরিশ্রম করেছি এই দিনটার জন্য। আমায় ফিরিয়ে দেবেন না।
— যাস্ট গো। তোমার জন্য অন্যদের ডিস্টার্বেন্স হচ্ছে! আদ্রিশা লিভ।
আদ্রিশা মাটিতে বসে কাঁদতে লাগলো। চিৎকার করে কাঁদছে সে। তবুও তার কথা কেউ শুনছে না। সবাই নিজেদের পেপার লেখায় ব্যাস্ত‌। তখন‌ই কেউ আদ্রিশাকে ঝাঁকাতে লাগলো। তার নাম ধরে ডাকতে লাগলো। আদ্রিশা আধো আধো চোখ খোলে মুগ্ধকে দেখে জড়িয়ে ধরলো। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললো, “মুগ্ধ! মুগ্ধ,,,,,ওরা আমায় পরীক্ষা দিতে দিচ্ছে না। প্লিজ কিছু করুন। আমি এই সময়ের মধ্যেই পরীক্ষা দিতে পারবো। প্লিজ মুগ্ধ প্লিজ। স্যারকে বুঝান না।”

মুগ্ধ আদ্রিশার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, “হুশ! শান্ত হ‌ও। তোমায় পরীক্ষা দিতে কেউ আটকাবে না। ট্রাস্ট মি! তুমি পরীক্ষা দিবে।”

আদ্রিশা মুগ্ধর বুক থেকে নিজের মাথা সরিয়ে মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে বললো, “স্যার যে বললেন দিতে দিবেন না। আমি আধঘন্টা লেইট বলে আমার পরীক্ষা বাতিল! আমি তো হলে ঢুকতেও পারবো না।”

মুগ্ধ একহাতে আদ্রিশাকে জড়িয়ে রেখে অন্যহাতে আদ্রিশার চোখ মুছে দিলো। আদ্রিশার চুল কানের পাশে গুজে দিয়ে বললো, “বললেই হলো না কি? একবার আশপাশ দেখো। তারপর বুঝবে কি করে পরীক্ষার হলে ঢুকতে পারবে।”

মুগ্ধর কথায় আদ্রিশা এদিক ওদিক তাকালো। খেয়াল করলো ও বিছানায় মুগ্ধর বুকের উপর। আর এটা তাদের‌ই ঘর। কিন্তু ও তো এক্সাম হলে ছিলো। দরজার বাইরে মেঝেতেই বসে কাঁদছিলো! অবাক হয়ে মুগ্ধর দিকে তাকাতেই মুগ্ধ হেসে ফেললো। বললো, “আদ্রিশা! এসব সত্যি ছিলো না। তোমার সপ্ন ছিলো!”

এতোক্ষনের কথা বার্তা সব সপ্নের রেশ ধরেই হয়েছে ভেবেই লজ্জায় লাল হয়ে গেলো আদ্রিশা। মুগ্ধর বুকে বারি দিয়ে ছাড়িয়ে নিলো নিজেকে। খাটে বসে চোখ মুছে নিলো ভালো করে। মুগ্ধ এখনো হাসছে। আদ্রিশা কপাল কুঁচকে মুগ্ধকে বললো, “এতো হাসছেন কেনো? সপ্ন ছিলো বলেই হাসতে হবে? হুহ! কোথায় ভয়ঙ্কর সপ্ন দেখলাম আমার ভয় তাড়াবেন তা না করে আমায় নিয়ে মজা করছেন! ‌অদ্ভুত!”

মুগ্ধ হাসি থামিয়ে বললো, “আমাকে কিছু বলার সুযোগ দিলে তো! হঠাৎ করেই ঘুমের মধ্যে কাঁদতে শুরু করলেন। কতো ডাকলাম আমি শুনলে না। পড়ে যখন ঘুম ভাঙলো তখন‌ও তোমার মনে হলো তুমি পরীক্ষার হলেই রয়েছো! কান্নার গতিও বেড়ে গেলো।আর তারপর তো আমায় জড়িয়েই ধরলে!”

আদ্রিশা কথা ঘুরিয়ে বললো, “সে ঠিক আছে! কিন্তু এটা বলুন আপনি আমার এতো কাছে কি করে এলেন? মাঝখানের বর্ডার ক‌ই?” ভ্রু উচিয়ে বললো, “আমাকে তিথি ভেবেছিলেন না কি? বদ মতলব ছিলো না তো?”

মুগ্ধ মাথা নেড়ে বললো, “উহুম। আমি কিছু করি নি‌। যা করার সব তুমিই করেছো। বালিশ টেনে নিজের অপর পাশে রেখে শুয়েছিলে রাতে। আমি আনতে পারতাম কিন্তু তুমি তো ওদের উপর হাত পা তুলে দিলে! তাই আর চেষ্টা করি নি। পরে না আমাকেই দোষারুপ করো। এন্ড ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন, আমি তোমার কাছে নয় তুমি আমার কাছে এসেছো। কখন কিভাবে আমার বুকের উপর শুয়েছো বলতে পারবো না তবে ঘুমটা হালকা হতেই বুকের উপর ভারি কিছু অনুভব হ‌ওয়ায় চোখ খুলে দেখি তুমি সয়ং আমাকে খাট বানিয়ে আমার উপর ঘুমোচ্ছো। তোমাকে তুলবো কি না ভাবতে ভাবতেই তোমার চোখের জল আমার বুকের উপর পরছিলো‌। ঘুমের মধ্যে কান্নার কারন না বুঝেই তো ডাকতে লাগলাম। তখন তো হাউমাউ করে কান্না করতে লাগলে। আর উঠার পর তো আমাকেই,,,,,! আর বলতে হবে?”

আদ্রিশা মুগ্ধর দিকে অপরাধী চোখে তাকতেই মুগ্ধ ঘাড় কাত করে আদ্রিশার দিকে এগুলো। আদ্রিশা মাথা পিছিয়ে নিলো। ভয় মিশ্রিত কন্ঠে বললো, “কি হলো?”

মুগ্ধ আদ্রিশার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, “তোমার মতলব টা কি, আদ্রিশা? আমাকে দূরে থাকতে বলে নিজেই কাছে আসছো!”

আদ্রিশা ঢোক গিলে বললো, “আপনি ভুল ভাবছেন!”

মুগ্ধ চট করে আদ্রিশা থেকে ছিটকে দূরে সরে গেলো। কাঁথা দিয়ে নিজেকে ঢেকে ঠোঁট উল্টে বললো, “আমার ভার্জিনিটি নষ্ট করো না আদ্রিশা! আমি কাওকে মুখ দেখাতে পারবো না। ছি ছি,,, তোমায় ভালো ভেবেছিলাম। কিন্তু তুমি! অসহায় ,অবলা, কিউট, হ্যান্ডস্যাম, ইনোসেন্ট ছেলেকে পেয়ে এভাবে নিজের ক্ষমতা জাহির করছো? নাআআআ! এমন করো না!”

আদ্রিশা মুখ ভেঙিয়ে বালিশ ছুঁড়ে মারলো মুগ্ধর উপর। মুগ্ধ কপালে হাত রেখে বললো, “আহ!! ‌আমি তোমার বিরুদ্ধে পুরুষ নির্যাতনের কেইস করবো।তোমাকে তোমার অপকর্মের জন্য সাজা পেতেই হবে।”

আদ্রিশা কোনোরকম হাসি আটকে ওয়াশরুমে চলে গেলো। এদিকে মুগ্ধ বিছানায় বসেই আদ্রিশার যাওয়ার দিকে লক্ষ করে বললো, “ন্যায় আমি পাবোই!” বলেই হেসে ফেললো। আদ্রিশাও ওয়াশরুমের দরজা লাগিয়ে হাসিতে ফেটে পরলো।

______________

অফিস থেকে ফিরে বিছানায় ব‌ই খাতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা দেখলো মুগ্ধ। আদ্রিশা পা ভাজ করে গালে হাত দিয়ে ব‌ইয়ের দিকে ঝুঁকে বসে আছে। মুগ্ধ হাতের কোট আলনায় রেখে বুকের উপরের বোতাম খুলতে খুলতে আদ্রিশাকে বললো, “কি ব্যাপার?‌ আজ এতো পড়াশুনা!”

আদ্রিশা মুগ্ধর দিকে একপলক দেখে আবার‌ও চোখ ঘুরিয়ে ব‌ইগুলোর দিকে তাকালো। মুগ্ধ কিছুক্ষন আদ্রিশার দিকে তাকিয়ে র‌ইলো। তারপর কাপড় নিয়ে ফ্রেশ হতে গেলো। ফ্রেশ হয়ে এসে আদ্রিশাকে আগের মতোই দেখে মেজাজ বিগড়ে গেলো মুগ্ধর। ধমকে উঠে বললো, “কি সমস্যা? না পড়লে সব গোছাও! আর পড়তে হলে টেবিলে গিয়ে বসে পড়। এভাবে ছড়িয়ে কেনো রেখেছো সব।”

আদ্রিশার এবার‌ও কোনো ভাবোদয় হলো না। লম্বা শ্বাস টেনে মুগ্ধ আদ্রিশার পাশে বসলো। একটা একটা করে সব গুলো ব‌ই গুছিয়ে টেবিলে রাখলো। ভ্রু কুঁচকে বললো, “কিছু কি হয়েছে?”

আদ্রিশা মাথা নেড়ে বললো, “হবে!”

মুগ্ধ কথার তাৎপর্য বুঝলো না। ভ্রু যুগল স্বাভাবিক করে বললো, “কি হবে?”

আদ্রিশা বালিশে ঠেস দিয়ে বললো, “পরীক্ষা! খুব শিগ্গিরি পরীক্ষা হবে, আর আমি গোল্লা পাবো!”

মুগ্ধ মুচকি হেসে বললো, “গোল্লা পাবে কেনো মনে হলো?”

আদ্রিশা জ্ঞানী ভাব নিয়ে বললো, “আজ সকালে সপ্নে দেখলাম না যে, পরীক্ষার হলে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। তার মানে পরীক্ষা দিতে পারছি না। আর পরীক্ষা না দিলে তো গোল্লা‌ই।”

মুগ্ধ চোখ গোল গোল করে বললো, “ওটা সপ্ন ছিলো।”

আদ্রিলা মাথা নেড়ে বললো, “সব সপ্ন সপ্ন হয় না। কিছু সপ্ন সত্যিও হয়। এমন আমার সাথে অনেক হয়েছে। প্রত্যেক পরীক্ষার আগেই এমন সপ্ন আসে।”

মুগ্ধ উত্তেজিত কন্ঠে বললো, “তার মানে তুমি এর আগে অনেক পরীক্ষায় গোল্লা পেয়েছো?”

আদ্রিশা চমকে উঠে বললো, “আরে না। পরীক্ষার টেনশনে এরকম সপ্ন অহরহ আসে। প্রতিবার দেখি আমি ভালোই পেপার লিখছি। কিন্তু এবার তো সপ্নে পেপার লিখতেই পারলাম না! আর এ ইয়ার পড়াশুনাও ঠিকঠাক হয় নি। না করেছি ক্লাস আর না প্রস্তুতি! তাই মনে হলো আরকি!”

মুগ্ধ ভ্রু নাচিয়ে বললো, “নোটস পেলে প্রস্তুতি নিতে অসুবিধা হবে না তো?”

আদ্রিশা ছোট্ট শ্বাস ফেলে বললো, “নোটস পেলে এবার ফার্স্ট ক্লাস সুনিশ্চিত!” মুগ্ধ বাকা হেসে মনে মনে বললো, “গিভ মি সাম টাইম। মাহবুব শাহের ওয়াইফ ফেইল করবে!? নো ওয়ে!”

সকালে ঘুম থেকে উঠে আদ্রিশা দেখলো মুগ্ধ মাথায় আদ্রিশার একটা ওড়না বেধে কিসব করছে। এলার্ম ক্লকের দিকে তাকিয়ে বুঝলো ৮টা বাজতে চললো। অথচ সে ৬টার এলার্ম সেট করেছিলো। এলার্ম বেজেছে কি না সেটাই বুঝছে না আদ্রিশা। তার‌উপর অফিসের জন্য তৈরি নাহয়ে মুগ্ধ এখন টেবিলে বসে কি কাজ করছে? বিছানা থেকে নেমে ধীর পায়ে মুগ্ধর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো আদ্রিশা। ঘাড় উচু করে দেখার চেষ্টা করেও কিছু দেখতে পারলো না। মুগ্ধ দুহাত দিয়ে ঘুরে খাতায় কিছু করছে। আদ্রিশা গলা খাকরি দিতেই মুগ্ধ খাতাটা লুকিয়ে ফেললো। পেছন ঘুরে আদ্রিশাকে বললো, “কারো সিক্রেট এভাবে দেখতে আছে? কখন উঠলে?”

আদ্রিশার উত্তরের অপেক্ষা না করেই তাকে ঠেলে ওয়াশরুমে ঢুকিয়ে দিলো মুগ্ধ। আদ্রিশা বেরিয়ে দেখলো মুগ্ধ দুহাত পেছনে রেখে কিছু লুকোনোর চেষ্টায় আছে। আদ্রিশা কিছু বলতে নিলে মুগ্ধ তাকে ঘর থেকে বের করে দিলো জোর করে। আদ্রিশা মুখ ফুলিয়ে নিচে গিয়ে দেখে মালিহা ব্রেকফাস্ট টেবিলে খাবার সাজাচ্ছেন। আদ্রিশাকে দেখে বললেন, “উঠে পরেছিস! আয় খেয়ে নে।”
আদ্রিশা মাথা নেড়ে বললো, “উনাকে ডেকে আনি!”

মালিহা হেসে বললেন, “কাকে ডাকবি? ওর খাওয়া হয়ে গেছে!”

আদ্রিশা চোখ বড় বড় করে বললো, “কখন খেলেন উনি?”

মালিহা স্বামীকে চা এগিয়ে দিয়ে বললেন, “মুগ্ধ কোন ভোরে উঠে চা করে খেয়েছে নিজে নিজে। আমি ৭টায় উঠে দেখলাম ল্যাপটপে কিসব করছে। তোর ওড়না মাথায় বেধে রেখেছে। জিজ্ঞেস করলাম এতো সকাল কেনো উঠেছে কি করছে কিছুই বলে নি‌। খালি বললো, ‘মা খিদে পেয়েছে! কিছু করে দাও!’ তাড়াহুড়ো করে ব্রেকফাস্ট করে দিলাম পুরো খাবার‌ও খায়‌ নি। ঘরে ছুটলো আবার। কি যে করে না।”

আদ্রিশা কিছু একটা ভেবে উল্টো ঘুরে ঘরে গেলো‌। মালিহা আদ্রিশার খাবার নিতে নিতে তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এ আবার কোথায় চললো? আদু! খেয়ে যা না। ঠান্ডা হয়ে যাবে!”

চলবে,,,,,,,