যদি আমার হতে পর্ব-৪৮+৪৯

0
732

যদি আমার হতে🌹
পর্ব – ৪৮
লেখিকা : সৈয়দা প্রীতি নাহার

আদ্রিশা লাগেজ ভর্তি করছে। ঘরের চার দিকে তাকাচ্ছে সে। প্রতিটা জিনিস‌ই যেনো তার হৃদয়ের খুব কাছের। খাট, সোফা, ব্যালকনি, এমনকি ঐ দেয়াল ঘড়িটা রেখে যেতেও কষ্ট হচ্ছে তার। কিন্তু মুগ্ধ! না, মুগ্ধকে ছেড়ে যেতে কষ্টের বালাও নেই! থাক না সে তিথির সাথে। এটাই নিয়তি! কথাগুলো ভেবে একে একে সব পুরনো স্মৃতি মনে করছে সে। হালকা হাসছেও। প্রথম দিনের মুগ্ধর সাথে ঝগড়া, খাবার টেবিলে মুগ্ধর বেঁফাস কথা বার্তা, রোজ রাতের খুনশুটি মাখা দুষ্টুমি, রেগে যাওয়া, মুগ্ধর তার রাগ ভাঙানো, পড়ানো, খেতে না চাইলে জোর করে খাইয়ে দেয়া সবকিছুই মনে পরছে তার।

“কোথায় যাচ্ছো?”

মুগ্ধর হঠাৎ কথা বলায় ভাবনার সুতোয় টান পড়ে আদ্রিশার। কাপড় গুছাতে গুছাতে বলে, “বাড়ি যাচ্ছি!”

মুগ্ধ আবার‌ও বললো, “না গেলে হয় না?”

আদ্রিশা মাথা নাড়লো শুধু। তারপর সব নিরব। কিছুক্ষন পর মুগ্ধ নিরবতা ভেঙে বললো, “যাওয়াটা কি খুব জরুরী আদ্রিশা?”

আদ্রিশা শান্ত কন্ঠে বললো, “অবশ্য‌ই জরুরী! আপনার আর তিথি আপুর বিয়েটা যতোটা জরুরী, আমাদের ডিভোর্স যতোটা জরুরী ঠিক ততোটাই জরুরী আমার এ বাড়ি থেকে চলে যাওয়া।”

মুগ্ধ আমতা আমতা করে বললো, “এখানে থাকতে কিসের আপত্তি? অন্তত ডিভোর্সের দিন পর্যন্ত। দুটো দিন‌ই তো!”

আদ্রিশা ঝাঁজ মেশানো কন্ঠে বললো, “আপত্তি না থাকার কি আছে? দু দিন পর যখন যেতেই হবে তখন আজ কেনো নয়? আমার তো মনে হয় যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে যাওয়া উচিত।”

মুগ্ধ কিছু বলবে তার আগেই সামান্তা ঘরে ঢুকে বললো, “আপু! চলো, ভাইয়া, মা সবাই অপেক্ষা করছে। চাচাও তাড়া দিচ্ছেন!”

আদ্রিশা মাথা নেড়ে বললো, “হ্যাঁ আসছি। তুই চল। সবার থেকে বিদায় নিয়েছিস?”

সামান্তা মাথা নুইয়ে বললো, “আসছি মুগ্ধ ভাইয়া! আপু চল না!”

আদ্রিশা মাথা নেড়ে স্যুটকেস উঠিয়ে নিলো। মুগ্ধ ধরতে এলে গম্ভীর কন্ঠে বললো, “আমি পারবো। আপনাকে কষ্ট করতে হবে না।”

মুগ্ধ দমে গেলো আদ্রিশার কথায়। কোথাও যেনো খুব পুরছে তার! খুব কষ্ট হচ্ছে।

আদ্রিশা হলে আসতেই মালিহা এগিয়ে গেলেন তার কাছে। আদ্রিশা মিষ্টি হেসে বললো, “আসছি মা! তোমরা ভালো থেকো, আর আমি রোজ ফোন করবো , মাঝে মাঝে দেখাও করবো। কোনো চিন্তা করবে না। ঠিক আছে? আর তো মাত্র দুটো সপ্তাহ! তারপর তোমার আর এ পরিবারের খেয়াল রাখতে নতুন কেউ আসবে! আমায় নিশ্চয় আর মনে পরবে না?”

মালিহা আদ্রিশার বাহুতে থাপ্পড় মেরে বললেন, “কে বলেছে তোকে ভুলে যাবো? তিথি এলেও তোর জায়গা কেউ নিতে পারবে না। ও হয়তো এ বাড়ির ব‌উ হবে কিন্তু আমার আদ্রিশা হবে না!”

আদ্রিশা চোখের কোণায় লাগা জল আঙুলে মুছে ঠোঁট প্রসারিত করে বললো, “যেতে হবে মা। সবাই অপেক্ষা করছে।”

মালিহা মুখ ভার করে বললেন, “যেতে হবে কেনো বলছিস? বল আসছি!”

আদ্রিশা নিঃশব্দে হেসে বললো, “আমি তো আর ফিরবো না, তাহলে আসছি বলাটা খাটে না। যাই হোক দেরি হয়ে যাচ্ছে!”

মালিহা আঁচলে চোখ মুছে আদ্রিশার স্যুটকেস দেখে বললেন, “কি রে, এই একটা ব্যাগ! তোর ওতো জামাকাপড় এটাতে হয়ে গেছে? না কি অরো ব্যাগ আছে?”

আদ্রিশা মৃদু হেসে বললো, “আমার যা ছিলো তা তো নিয়েছিই। বাকি গুলো রয়েগেছে।”

মালিহা চোখ বড় বড় করে বললেন, “ও কি কথা? তোর জিনিস মানে? ও ঘরে সব‌ই তো তোর! আমি দিয়েছি বলে কি নিবি না?”

আদ্রিশা মালিহার কাধে দুহাত রেখে বললো, “মা! তুমি ভুল ভাবছো। আমি ও বাড়ি থেকে যা যা এনেছি সেসব‌ই ফিরিয়ে নিচ্ছি। বাকি তো কিছু আমার নয়। আর তোমার দেয়া শাড়িগুলো! ওগুলো আমার না, তোমার ব‌উমার! তিথি আপুর! আমি তো তোমার মেয়ে, ব‌উমা ন‌ই।”

মালিহা প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন, “না আদ্রিশা! এমনটা করিস না। আমি ভালোবেসে তোকে দিয়েছি। ওসব তোর। তোর অধিকারের জিনিস ছেড়ে দিস না!”

সানা বেগম ফোড়ন কেটে বললেন, “স্বামীর উপর‌ই অধিকার নেই আবার জিনিসপত্র! বলতে হলে আগে বলতেন আপা! স্ত্রীর অধিকার ছাড়ার সময় আটকাতেন। তখন যখন পারেন নি এখন‌ও বলবেন না। আমাদের মেয়ের ভরন পোষন আমরা করে নেবো। ওর বাবা, ভাই এখনো জীবিত। দুই চাচাও আছেন। জিনিসপত্রের অভাব হবে না।”

আদ্রিশা কথা কাটিয়ে শ‌ওকত শাহকে বললো, “আপনার ফুল গাছ গুলোর যত্ন নিতে পারলাম না আর। গোলাপ গাছ টা কিন্তু মরে যাচ্ছে! খেয়াল করতে হবে বেশি বেশি!”

শ‌ওকত শাহ ঠোঁটে হাসি ফুটালেন। তাও সীমিত। স্নিগ্ধ পকেটে হাত গুজে বললো, “ভাবি? এ বাড়িতে খুব মিস করবো তুমায়!”

আদ্রিশা চুল ঘেটে দিয়ে বললো, “ভাবি ন‌ই আমি! এখন থেকে আদ্রিশা বলেই ডেকো। কেমন? তোমার সাথে আমার কিন্তু আরো একটা সম্পর্ক আছে! (আস্তে করে বললো) আমি তোমার শালী!”

স্নিগ্ধ মৃদু হাসলো। চোখের ইশারায় তার মায়ের দিকে দেখালো। আদ্রিশা মুখ কালো করে এগিয়ে গেলো তার দিকে। এক কোনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন মনোয়ারা বেগম।

আদ্রিশা মাথা নিচু করে বললো, “ফুপি, আমি ইচ্ছাকৃত ভাবে আপনাকে কষ্ট দিতে চাই নি। যা হয়েছে তার জন্য আবার‌ও দুঃখিত। আমি শুধু সব ঠিক করতে চেয়েছিলাম। কতোটা পেরেছি জানি না, তবু চেষ্টার ত্রুটি রাখি নি। আর ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ পাবো কি না জানি না। আমার কোনো কাজে কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা করে দেবেন।”

মনোয়ারা বেগম কোনো প্রতিউত্তর করলেন না। আদ্রিশা কোনো জবাব না পেয়ে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলো। ভেবেছিলো হয়তো হিন্দি সিরিয়ালের মতো তিনি পা সরিয়ে নিবেন। গম্ভীর মুখে কটু কথা শুনাবেন। কিন্তু কিছুই হলো না। কিছুটা স্বস্তি পেয়েই হালকা হাসলো আদ্রিশা। আদ্র এগিয়ে এসে আদ্রিশার ব্যাগ নিয়ে গেলো। সানা বেগম‌ও চলে গেলেন। আদ্রিশা ঘর থেকে বেরুচ্ছে। পেছন ঘুরে একবার পুরো বাড়িটা দেখে নিলো সে। এক পলক দেখেই উল্টো ঘুরে চোখের জল ছেড়ে দিলো। সোজা গাড়িতে উঠে পরলো সে। আর পেছন ঘুরে নি! আর পেছনে তাকালে হয়তো যাওয়াই হবে না। আটকে যেতে হবে এ বাড়ির মায়ায়!

__________________

রুমানা আহমেদ নাতনির সাথে গল্প করছিলেন। মূলত গল্পের বাহানায় তাকে বসিয়ে রাখা হয়েছে। আগে যেতে না চাইলেও সন্ধ্যে থেকেই তার বাবাইয়ের জন্য মন কেমন করছিলো। বাবার কাছে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছেটাকে আকড়ে দু ঘন্টা কেঁদে কেটে শান্ত হয়েছে কিছুক্ষন আগে। জেসমিন সোফায় বসে চকোলেট খাচ্ছে। প্রেগন্যান্সির প্রায় পাঁচ মাস চলছে তার। উদ্ভট সব কাছ গুলোই এখন হানা দেয় তার মনে। আরিয়া হ‌ওয়ার সময়‌ও হয়েছে তবে এরকম নয়। আরিয়ার সময় ঘুমটা প্রকট হয়েছিলো তার। সারাদিন ঘুম পেতো। তাছাড়াও অকারনে মন খারাপ হতো। মাঝে মাঝে কাঁদতেও শুরু করতো সে। তার মন বলে এই কাঁদার জন্য‌ই মেয়েটা ছিঁচকাদুনে হয়েছে। কিন্তু এবার তার রাগ হয়, খিদেও পায় প্রচুর! জেসমিন ভাবে তাদের বেবি কেমন হবে। দুষ্টু হবে নিশ্চিত! জেসমিন যা করছে তাতে তো এটাই মনে হচ্ছে তার। রাত বিরেতে খিদে পায় তার। তখন আবার ঘরের খাবার চলে না, ফুচকা, চকোলেট এসব খেতেই আবদার তার। খিটখিটে মেজাজ হ‌ওয়ায় কারন ছাড়াই রেগে যায়। তার‌উপর হাইপার হয়ে গেলে সমস্যা। অনাগত বাচ্চার মানসিক ক্ষতি হবে ভেবেই আদ্র মুখ বুজে সব সহ্য করছে। রান্না বান্নাও শিখে গেছে একারনে। জেসমিনের খিদে পেলেই রান্নাঘরে গিয়ে হাজির সে। হাতা খুন্তি নিয়ে কাজে লেগে পরে ঝটপট। কিন্তু আফসোস! সব রেডি করার পর জেসমিন হুট করেই বলে, “এটা খাবো না। পঁচা খাবার! আমি অন্য কিছু খাবো!” তখন আদ্রর মুখটা একদম ফ্যাকাশে হয়ে যায় তখন। মুখ ভার করে আবার‌ও কড়াই নিয়ে যুদ্ধে লেগে যায় সে। নিজের এহেন কাজে খুব বিরক্ত‌ও হয় জেসমিন। সেদিন তো বলেই দিলো, “বিরক্ত হচ্ছো না আমার জন্য? ‌আমি নিজেও খুব বিরক্ত। সরি গো। তোমায় কতো কিছু করতে হচ্ছে!” আদ্র মুচকি হেসে গাল টেনে দিয়ে বলে, “ধুর! তোমায় এখন ছোট বাচ্চাদের মতোন লাগে। ইচ্ছে হয় কোলে নিয়ে ঘুরি সারাদিন! বিরক্ত কেনো হবো?” স্বামীর উত্তর পছন্দ হয় নি জেসমিনের। শাস্তি স্বরুপ রাত দুটোয় রাস্তায় হাটার বায়না ধরে বসে। অগত্যা ব‌উয়ের কথা রাখতে তাকেও সেসব মানতে হয়। কথাগুলো ভেবেই হাসলো জেসমিন। তখন‌ই কলিং বেল বেজে উঠলো। আরিয়া মুখ ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকালো। রুমানা আহমেদ উঠতে চাইলেও জেসমিন হাতের ইশারায় তাকে বসতে বলে নিজেই দরজা খুলে। দরজা খুলতেই আদ্র বলে উঠে,

“আবার চকোলেট খাচ্ছো!”

জেসমিন জিব কেটে সরে দাঁড়ায়। আদ্রের পর একে একে সবাই ঘরে ঢোকে। আদ্র জেসমিনকে বসিয়ে রুমাল দিয়ে মুখ মুছিয়ে বলে,

“খেয়েছো ভালো কথা, পুরো মুখে লাগিয়েছো কেনো?”

জেসমিন তার কথায় পাত্তা না দিয়ে বললো, “ব্যাগটা কার গো? এতো দেরি হলো যে তোমাদের?”

আরিয়া ছোটে আদ্রর কোলে উঠে। আদ্র আরিয়ার কপালে চুমু খেয়ে পকেট থেকে চকোলেট বের করে ভেতরে যেতে বলে। আরিয়া ভেতরে যেতেই রুমানা আহমেদ বলেন, “কি রে বললি না তো, ব্যাগটা কার?”

আদ্র নিশ্চুপ হয়ে হামিদুর আহমেদের দিকে তাকালো। জেসমিন রুমানা একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছেন। হামিদুর আহমেদ গম্ভীর কন্ঠে বললেন, “সানা! ওকে ভেতরে আসতে বলো।”

সানা বেগম বাইরের দিকে তাকিয়ে আদ্রিশাকে ডাকলেন। আদ্রিশা ভেতরে আসতেই রুমানা আহমেদ ঝট করে দাঁড়িয়ে যান। অস্ফুট স্বরে বলেন, “এসময় তুই? জামাই ক‌ই? আর এতো বড় ব্যাগ নিয়ে কেউ শ্বশুড় বাড়ি থেকে আসে?”

আদ্র তাচ্ছি‌ল্য হেসে বললো, “তোমার মেয়ে সব শেষ করে এসেছে মা। আর ফিরবে না সে! ডিভোর্স হচ্ছে তোমার জামাইয়ের সাথে।”

রুমানা আহমেদ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। জেসমিন পেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বলে, “এসব কি বলছো তুমি?”

আদ্রিশা হাটু ভেঙে বসে পড়ে নিচে। কান্নাজড়িত কন্ঠে বলে, “মুগ্ধ তিথি আপুকে ভালোবাসেন! আমাকে নয়। আর তাই আমি তাদের এক করে দিয়েছি। ওদের মাঝখানে থাকা সাজে না আমার!চলে এসেছি আমি। মুগ্ধর থেকে দূরে থাকতে চলে এসেছি।”

চলবে,,,,,,,,,,,

যদি আমার হতে🌹
পর্ব – ৪৯
লেখিকা : সৈয়দা প্রীতি নাহার

খাটের এক কোণে হাটুতে মুখ গুজে বসে আছে আদ্রিশা। ঘরের ডিম লাইট টা জালানো শুধু। হালকা লাল আলোয় ভরে উঠেছে ঘর। দরজায় ছিটকিনি দেয়া। ফুল স্পীডে ফ্যান চলছে। বাইরে তুমুল বৃষ্টি তবুও আদ্রিশার ঠান্ডা লাগছে না‌। কোনো অনুভুতিই হচ্ছে না তার। রাতে ডিভোর্সের কথা বলার পর রুমানা আহমেদ তেরে আসেন তার দিকে। টেনে তুলে হাত ঝাকিয়ে বলতে থাকেন কেনো করলো এমন। আদ্রিশা শুধু কাঁদছিলো। কিছু বলতে পারছিলো না সে। একসময় হেঁচকি উঠা শুরু হয় তার। আদ্র বোন কে মায়ের থেকে ছাড়িয়ে ডিভোর্সের কারন বলে। ছেলের মুখে এতোকিছু শুনে হিতাহিত জ্ঞান ভুলে যান তিনি। মেয়েকে এলোপাথারি মারতে থাকেন। সানা বেগম দৌড়ে জা য়ের থেকে ভাতিজিকে ছিনিয়ে নেন। রুমানা আহমেদ কে টেনে সোফায় বসান তিনি। এ যেনো এক অন্য মহিলা। যিনি কখনো উঠতে বসতে কথা শুনাতেন তিনিই আজ আদ্রিশাকে আগলাচ্ছেন! জেসমিন‌ও কান্না শুরু করেছে ততোক্ষনে। আদ্র তাকে শান্ত হতে বলে ঐশি আর সামান্তাকে উপরের ঘরে যেতে বলে। জেসমিনের পেটে হালকা ব্যাথা অনুভব হ‌ওয়ায় সামান্তা আর তার কাজিনরা তাকে নিয়ে ঘরে চলে যায়। সানা বেগম আদ্রিশাকে ঘরে যেতে বললেও সে ঠায় সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে। রুমানা আহমেদ হাঁপাতে থাকেন। হামিদুর আহমেদ নিশ্চুপ হয়ে ফ্লোরের দিকে স্থির দৃষ্টিতে থাকিয়ে ছিলেন। আশেপাশের কোনো কিছুই যেনো তার কর্ণগোছর হচ্ছে না। মেয়ের কান্না, স্ত্রীর চিৎকার, কিছুই শুনছেন না তিনি। আদ্র আদ্রিশাকে টেনে ঘরে ঢুকিয়ে দেয়। আদ্রিশা দরজা আটকে লাইট নিভিয়ে ডিম লাইট জালায়। সেই তখন থেকেই খাটের পাশে চুপচাপ বসে আছে সে। বাইরে কি হয়েছে না হয়েছে কিছুই সে জানে না। বাইরে থেকে আরিয়ার কন্ঠ ভেসে এলো,

“ফুপ্পি? ফুপ্পি?”

আদ্রিশা চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো। দরজা খুলে দেখলো বুকের সাথে পুতুল জড়িয়ে আরিয়া। আদ্রিশা মৃদু হেসে বললো,

“কি হয়েছে আরু? ঘুমোও নি এখন‌ও?”

আরিয়া মাথা নেড়ে বললো,

“ক‌ই ঘুমাবো? দাদী তো কখন থেকে কাঁদছে! দাদাও আপসেট হয়ে সোফায় বসে আছে। বাবাই মাম্মামকে ঘুম পারাচ্ছে। তাই আমি তোমার কাছে এলাম। ঘুমু এনে দাও না!”

আদ্রিশা মিষ্টি হেসে কোলে তুলে নিলো তাকে। বিছানায় শুইয়ে দরজা ভেজিয়ে এলো। ফ্যানের স্পীড কমিয়ে আলমারি থেকে কম্বল বের করলো আরিয়ার জন্য। শীতের শুরু। এখন‌ই যা ঠান্ডা পরছে, আরিয়ার আবার ঠান্ডার ধাঁচ আছে! আরিয়ার শরীরে কম্বল জড়িয়ে দিয়ে তার পাশে কাত হয়ে শুলো আদ্রিশা। আরিয়া পুতুলকে জাপটে ধরে আদ্রিশার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে চেয়ে বললো,

“সবাই আপসেট কেনো ফুপ্পি? দাদী তোমায় বকছিলো কেনো?”

আদ্রিশা ছোট্ট শ্বাস টেনে বললো,

“তুমি যখন দুষ্টুমি করো তোমার মাম্মাম তোমায় বকে না? বকে তো?”

আরিয়া মাথা নাড়লো। আদ্রিশা বললো,

“আমিও তো দুষ্টুমি করেছি। তাই আমার মা রেগে গেছে আমার উপর। তুমি ওসব বুঝবে না। এসব বড়দের ব্যাপার। এখন ঘুমিয়ে পড়ো। রাত অনেক হয়েছে। স্কুল আছে তো সকালে!”

আদ্রিশা ডানে বায়ে মাথা হেলিয়ে বললো,

“ঘুম‌ই তো আসছে না। স্টোরি বলো না ফুপ্পি!”

আদ্রিশা ঠোঁট উল্টে বললো,

“আমি তো স্টোরি জানি না আরু। কি বলি বলতো!”

আরিয়া গালে হাত দিয়ে ভাবার চেষ্টা করে বললো,

“তোমার আর ফুপাইয়ের স্টোরি বলো।”

আদ্রিশা ভ্রু কুঁচকে বললো,

“আমাদের আবার কি স্টোরি?আমাদের কোনো স্টোরি নেই সোনা। তুমি এমনিই ঘুমাও আমি ঘুম পারিয়ে দিচ্ছি।”

আরু কম্বলটা গলা অব্দি টেনে নিয়ে বললো,

“মাম্মাম যে বলে, সবার একটা স্টোরি আছে। বাবাই আর মাম্মামের ও আছে। তোমাদের নেই কেনো? তুমি ফুপাইকে ফোন করো‌। আমি ফুপাইকে বলবো তোমাদের স্টোরি শুনাতে। তুমি তো কিছুই জানো না! দাও না ফোন! ফুপ্পি?”

আদ্রিশা আরিয়ার কথার কোনো জবাব না দিয়ে কথা ঘুরিয়ে বললো,

“আমার না একটা গল্প মনে পড়েছে। বলি!”

আরিয়া মাথা নাড়লো। আদ্রিশা সেই পুরনো ছোটবেলার রাজা রাণীর কাহিনিই বলতে লাগলো। যেখানে রাজকন্যার জন্য রাজারকুমার পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় চড়ে আসে। রাজকন্যাকে উদ্ধার করে প্রাসাদে নিয়ে যায়। ভুলভাল গল্প বানিয়ে বলতে বলতে আরিয়ার মাথায় হাত বুলাতে লাগলো সে। একপর্যায়ে খেয়াল করলো আরিয়া তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়েছে। আদ্রিশাও তাকে জড়িয়ে নেয় নিজের সাথে। ঘুম নামক শান্তিটা আজ ধরা দিচ্ছে না তাকে। তবুও বিছানায় গুটিশুটি মেরে পরে আছে সে। শুষ্ক চোখ জোড়া মেলে অতীতের দিনগুলো দেখছে সে। মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানান দিচ্ছে বড্ড হাঁপিয়ে উঠেছে। অতীত হাঁপিয়ে তুলেছে তাকে!

__________________

আদালতের বাইরে গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছেন মনোয়ারা বেগম। একটু আগেই মুগ্ধ আদ্রিশার ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। সব ফর্মালিটি পূরণ করতে মুগ্ধকে রেখেই গাড়িতে উঠতে উদ্যত হন তিনি।

“ফুপি!”

আদ্রিশার কথায় তার দিকে ফিরেন মনোয়ারা বেগম। কোর্টের ভেতরে ভালো করে খেয়াল না করলেও এখন আদ্রিশাকে পর্যবেক্ষন করছেন তিনি। দু দিনেই চোখ মুখ ফুলে একাকার তার। চোখের নিচ বেশ অনেকটা জুরেই কালো হয়ে আছে। দেখলে মনে হয় ঘুমোয় না সে। হাত খোপায় মুড়ানো চুলের অধিকাংশ লেপ্টে আছে গাল ও ঘাড়ের উপর। সাদামাটা সালোয়ার কামিজ পড়নে। ওড়নাটা গায়ে জড়ানো। হাত, গলা খালি তার। কানেও ছোট্ট এয়ারিং। আদ্রিশা একটা ছোট্ট ব্যাগ এগিয়ে দিলো মনোয়ারা বেগমের দিকে। মনোয়ারা বেগমের ভ্রু কুঁচকে গেলো সাথে সাথে। ব্যাগ হাতে না নিয়েই বললেন,

“এতে কি আছে?”

আদ্রিশা মাথা নিচু করে ব্যাগটা গাড়ির পেছনের সিটে রাখলো। এক হাত দিয়ে অন্য হাত মুচড়িয়ে বললো,

“বিয়ের পর ও বাড়ি থেকে দেয়া গয়না!”

মনোয়ারা বেগম রাগি স্বরে বললেন,

“সেসব আমায় কেনো দিচ্ছো?”

ওনার কথায় আদ্রিশা কেঁপে উঠলো। নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত করে বললো,

“আসলে সেদিন মনে ছিলো না তাই এসব আমার কাছেই রয়ে গেছে। পরে যখন খেয়াল হলো তখন ও বাড়িতে কিভাবে পাঠাবো বুঝে উঠতে পারি নি। ভেবেছিলাম আজ মুগ্ধর হাতে দিয়ে দেবো কিন্তু তিথি আপুও তো সাথে। যদি কিছু মনে করেন তাই আপনাকেই দিলাম। মা কে দিয়ে দেবেন!”

মনোয়ারা বেগম মুখ ফিরিয়ে নিলেন। ঘন ঘন শ্বাস ফেলে বললেন,

“জিনিসগুলো তো তোমাকেই দেয়া হয়েছে তা হলে রেখেই দাও নিজের কাছে। সব কিছু ফিরিয়ে দিতে হয় না‌। ভাবি ভালোবেসে দিয়েছেন, সেগুলো আগলে রাখো।”

আদ্রিশা জোরপূর্বক হেসে জবাব দিলো,

“ভালোবাসাটুকু তো আছেই। ওগুলো ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব না। কিন্তু ভালোবাসার নামে অহেতুক সামগ্রী দেয়ার কোনো মানে নেই। আমি এগুলো গ্রহণ করতে পারবো না।”

মনোয়ারা বেগম শীতল কন্ঠে বললেন,

“এতো তাড়া কিসের? কড়ায় গন্ডায় শোধ না করলে হচ্ছে না তোমার? একবার‌ও ভেবেছো এসব আমার হাতে পাঠালে তিনি কতোটা কষ্ট পাবেন?”

আদ্রিশা ওড়নার একপাশ কাধের উপর তুলে দিয়ে বললো,

“কিন্তু এগুলো নিজের কাছে রাখলে যে আমার কষ্ট হবে। প্রতিনিয়ত চোখের সামনে ভেসে বেড়াবে সব। কি করে,,,,,,,,,”

“একটা বার চেষ্টা করতে পারতে, ধরে রাখার! অধিকার কেড়ে নিতে শেখো নি তুমি?” আদ্রিশার কথার মাঝেই বললেন মনোয়ারা বেগম।

তখন‌ই মুগ্ধ আর তিথি চলে এলো। আদ্র‌ও নিজেদের গাড়ির দরজা খুলে আদ্রিশার দিকে তাকালো। আদ্রিশা মনোয়ারা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললো,

“কেড়ে নিতে চাইলে হয়তো পারতাম। কিন্তু আফসোস কেড়ে নিতে চাই নি। চলি।”

মনোয়ারা বেগম আদ্রিশার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন। মুগ্ধ‌ও অস্থির চোখে দেখছে তাকে। কিছুক্ষনের মধ্যেই আদ্রদের গাড়ি রাস্তার বাকে মিলিয়ে গেলো। মনোয়ারা বেগম ব্যস্ততা দেখিয়ে গাড়িতে চরে বসলেন। মুগ্ধ তিথির হাত ছাড়িয়ে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলো। মুখ ভার করে তিথি পেছনের সিটে বসে পরলো। কৌতুহল বসত আদ্রিশার রাখা ব্যাগটা হাতে নিলো তিথি। ব্যাগটা খুলতেই সামনে থেকে বলে উঠেন মনোয়ারা বেগম,

“ওগুলো তোমার নয় মা। ভাবি আদ্রিশাকে দিয়েছিলেন! মেয়েটা সব ফিরিয়ে দিলো। আসলে কি বলতো, বড্ড আত্মসম্মান বোধ ওর! যা নিজের নয় তা কখনোই নিজের করে রাখে না। ফিরিয়ে দেয়! অথচ কি বোকা! কোনটা নিজের আর কোনটা অন্যের সেটাই বাধ বিচার করতে পারে না বেচারি, তাই না মুগ্ধ?”

মুগ্ধ অবিশ্বাস্য চোখে তাকালো ফুপির দিকে। হঠাৎ আদ্রিশার গুণগান করছেন! তিথির বেশ গায়ে লাগলো কথাটা। ব্যাগটা ঝটকা মেরে সিটে রেখে ফোন ঘাটায় মন দিলো সে।

চলবে,,,,,,,,,,,