যদি আমার হতে🌹
পর্ব – ৫০
লেখিকা : সৈয়দা প্রীতি নাহার
মনোয়ারা বেগম মালিহা ইয়াসমিনের হাতে তুলে দেন আদ্রিশার দেয়া ব্যাগটা। মালিহা ভ্রু কুঁচকে তাকালে মনোয়ারা বেগম হালকা হেসে বলেন,
“ভাগ্য করে বউ পেয়েছিলে ভাবি, ডিভোর্সের সময় স্বামীর থেকে কোনো দাবি দাওয়া তো নিলোই না আবার তোমার আর এ বাড়ি থেকে দেয়া সব ফিরিয়েও দিলো।”
মালিহা ঝটপট ব্যাগ খুলে দেখেন সেদিনের দেয়া সেই বালা জুড়ো। বিয়ের দিন সবার মুখ বন্ধ করে এই বালা নিজ হাতে ছেলের বউয়ের হাতে পড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এই বালা দিয়ে তো তিনি শুধু আদ্রিশাকে বউ বলে বরণ করেন নি, বরং নিজের মেয়ের জায়গায় আসীন করেছিলেন। তাহলে আদ্রিশা এসব কেনো ফিরিয়ে দিলো? টলমল চোখে ব্যাগ উল্টো করে সোফার উপর ঝাকালেন। কানের গলার সোনা ছাড়াও বিয়ে ঠিক করার দিন পড়ানো আঙটিটাও আছে এতে। বুঝা যাচ্ছে, বিয়ের সব চিহ্নই মুছে দিয়েছে সে। মালিহা চোখ মুছে জিনিসগুলো বুকে আগলে ঘরের দিকে যেতে লাগলেন। তিথি আর মুগ্ধকে হল রুমে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জোড় গলায় বলেন,
“পুরনো সম্পর্কের ইতি টেনেছো, এবার নতুন সম্পর্কের সূচনার শুরু হোক! তিথি, তুমি বাড়ি যাও। হবু শ্বশুড় বাড়িতে সময় অসময়ে আসা অনুচিত। কদিন পর তো এখানেই আসছো! মুগ্ধ, শেড়ওয়ানি কি নতুন কিনবি? তাহলে, কালই যা শপিংএ। আমি সবাইকে যোগ দিতে বলি?”
তিথি কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে মুগ্ধর দিকে দেখলো। মুগ্ধ স্পষ্ট গলায় বললো,
“না মা। এসব কিছুর দরকার নেই। সিম্পল ভাবেই হবে সব।”
তিথি কপাল কুঁচকে তাকালো তার দিকে। মালিহা বাকা হেসে বললেন,
“সেই! অবশ্য তুই যা ভালো বুঝিস সেটাই কর। কিন্তু মনে রাখিস বিয়েটা কোনো ছেলেখেলা নয়। বিয়ের পর যেনো আবার শুনতে নাহয়, তুমি অন্য কাওকে ভালোবাসো। আদ্রিশা নাহয় মেনে নিয়েছে। সবাই যে মানবে এমনটা ভাবার কোনো কারন নেই। ”
মুগ্ধ অভিমানী কন্ঠে বললো,
“এমন কথা কেনো বলছো মা?”
মালিহা যেতে যেতে উচু স্বরে বললেন,
“ভালোবাসা তো যখন তখন যে কারো প্রতিই হয়। তাই বললাম। ভেবে চিন্তে করো, যা করবে। পরে আবার আফসোস নাহয়। হারানো জিনিস ফিরে পাওয়া খুব মুশকিল!”
_____________
‘আদ্রিশা ওয়েড’স মুগ্ধ’– বিয়ের কার্ডে ছাপানো এই লিখাগুলোতেই বার বার চোখ বুলাচ্ছে আদ্রিশা। কাল মুগ্ধর বিয়ে! সব কিছু যেনো সপ্নের মতো লাগছে তার কাছে। সপ্ন নয় ঠিক, দুঃস্বপ্ন ! নিজের বিয়ের সময় এই কার্ডটাই দুমড়ে মুছড়ে ফেলেছিলো আদ্রিশা। সবার চোখের আড়াল করতে আলমারির কোনো এক কোনায় লুকিয়ে রেখেছিলো তারপর। নিজেকে ব্যস্ত রাখার তাগিদে আলমারি ঠিক করতে গিয়ে কার্ড চোখে পড়ে তার। সেদিন এই কার্ডে মুগ্ধর পাশে নিজের নাম দেখে যতোটা রেগেছিলো আজ সেই কার্ড দেখেই প্রচুর কাঁদছে সে। মনে হচ্ছে বুকটা ছিড়ে যাচ্ছে তার। খুব জরুরী ছিলো কি আলাদা হয়ে যাওয়া? কোনো চমৎকার হতে পারে না তার জীবনে? মুগ্ধর কি একবারের জন্যও তার কথা মনে পরছে না? ভাবনার মাঝেই দরজায় টোকা পরলো। রুমানা আহমেদ খাবারের ট্রে নিয়ে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে। ডিভোর্সের পর থেকেই ঘর বন্দী হয়ে আছে আদ্রিশা। কারো ডাকে সারা দেয় না সে, আর না এ ঘর থেকে বেরোয়। খাবার দাবারও ঘরেই পৌঁছে দিতে হয়। রোজ জেসমিন দিয়ে গেলেও আজ রুমানা নিয়ে এসেছেন মেয়ের জন্য। এ কদিন কথাও বলেন নি আদ্রিশার সাথে। অবশ্য আদ্রিশাই কাওকে সে সূযোগ দেয় নি। রুমানা আহমেদ কে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিরস চাহনি নিক্ষেপ করে তাকালো আদ্রিশা। রুমানা এতে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে ছোট টেবিলটায় খাবার রেখে উল্টো ঘুরেন। পেছন থেকে আদ্রিশা মায়াময় কন্ঠে বলে উঠে,
“একটু বসো না মা!”
রুমানা দাঁড়িয়ে পড়েন। আদ্রিশা আবারও বলে,
“মা! আমার কাছে একটু খানি বসো না। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে মা! খুব! আমি আর পারছি না, বিশ্বাস করো। আর পারছি না। বুকটা ছিড়ে যাচ্ছে আমার। আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি, দেখো। আমার জ্বর হলে তুমি কতো আদর করতে বলো, আজ একটু করবে? আমার কষ্ট মুছে দাও না মা!”
আদ্রিশার কান্নারত কথা শুনে রুমানা নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। পেছন ঘুরে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। অঝোর ধারায় বইছে চোখের স্রোত! আদ্রিশাকে পাশে বসিয়ে বললেন,
“কেনো করলি এমন মা? কেনো করলি? সব শেষ হয়ে যাওয়ার আগে আটকালি না কেনো?”
আদ্রিশা কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে বললো,
“আমি কি করতাম বলতো? আমার কাছে আর কোনো রাস্তা খুলা ছিলো না যে! আমি মুগ্ধকে ছাড়া কি করে থাকবো? খুব ভালোবাসি ওনাকে! পারবো না আমি, অন্য কারো সাথে ওনাকে দেখতে পারবো না!”
রুমানা কড়া গলায় বললেন,
“সেটা ওকে জানিয়েছিলিস? তুই যে তাকে ছাড়া থাকতে পারবি না, সেটা ও জানে?”
আদ্রিশা মাথা নাড়লো। জোড়ে জোড়ে শ্বাস টেনে গলায় দলা পাকিয়ে যাওয়া কথা বলতে লাগলো,
“কি করে বলতাম? যতোদিনে বুঝেছি আমি ওনাকে ভালোবাসি ততোদিনে সম্পর্কের শেষ পর্যায়ে ছিলাম। আমি বার বার ভেবেছি সব বলবো ওনাকে। কিন্তু পারি নি। যখনই বলতে গেছি কিছু না কিছুতে থেমে যেতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তো তিথি আপু ই আটকে দিলেন আমায়।”
রুমানা আহমেদ শান্ত কন্ঠে প্রশ্ন করলেন,
“তিথি আটকালেই থেমে যেতে হলো তোকে?”
আদ্রিশা আবারও মাথা নাড়লো। দুহাতে চোখ মুছে বললো,
“তিথি আপু ফোন করেছিলেন আমায়। নাম্বার কি করে পেয়েছেন সেটা জানি না, তবে আমার সাথে কথা বলার ঘটনা মুগ্ধর অজানা। তিথি আপু আমার কাছে মুগ্ধকে ভিক্ষে চেয়েছিলেন। ওনার কথানুযায়ি, মুগ্ধ তার ভালোবাসা থেকে রেসপন্সিবিলিটিকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। সমাজ স্বীকৃত স্ত্রী হলেও আমি যে ওনার কাধে বোঝার মতো ছিলাম। তিথি আপুকে সময় দিতে পারছিলেন না তিনি। সারাক্ষন আমায় নিয়ে চিন্তায় বিভোর মুগ্ধ ভুলে গেছিলেন আমি তাদের মাঝখানে ঢুকে পরেছি। ওই মেয়েটার সপ্ন, আকাঙ্খা কি করে নষ্ট করি আমি? ওনার কথা ফেলতে পারি নি। আর তাই,,,, তাই ডিভোর্স পেপার আনিয়েছিলাম আমি নিজে। ভেবেছিলাম, এতো দিনের সম্পর্কে ওনার মনে একটু খানি জায়গা করে নিতে পেরেছি। কিন্তু না। আমি শুধু ওনার জীবনে অযাচিত ঝামেলা হয়েই ছিলাম। কোনোদিন ভালোবাসা হতে পারবো না আমি। দায়িত্ব হয়েই থাকবো। এতো কিছু জেনেশুনে আমি কি করে থাকতাম তার সাথে? বেঁচে থেকেও যে মরে যেতাম!”
“এখন বেঁচে গেছিস কি?” হামিদুর আহমেদের কথায় দরজার দিকে চোখ দিলেন রুমানা আর আদ্রিশা। ধীর পায়ে ঘরে ঢুকে শীতল কন্ঠে বললেন,
“আমরা এতোটা পর হয়ে গেছিলাম? কিচ্ছুটি জানানোর প্রয়োজন মনে পরলো না তোর? মানছি, আমাদের ভুলের জন্যই মুগ্ধর সাথে বিয়ের বন্ধনে আটকে ছিলিস, কিন্তু তা বলে, আমাদের ক্ষমা করা যায় না?”
আদ্রিশা বিস্ময় নিয়ে বললো,
“বাবা? তোমাদের কেনো ভুল হবে? তোমরা তো আমার ভালো চেয়েই সবটা করেছিলে? নিয়তি তে যা ছিলো তাই হয়েছে। এখানে না তোমাদের কোনো দোষ আর না মুগ্ধর। সবাই যার যার জায়গায় সঠিক। ভুল তো পরিস্থিতি ছিলো। সময়, আর কিছু বোঝার ভুল ছিলো।”
হামিদুর আহমেদ মেয়ের কাছে দাঁড়িয়ে অনুনয়ের সুরে বললেন,
“আমাদের উচিত ছিলো তোর ইচ্ছে জানা। তোর মতামত জেনেই যদি এগুতাম হয়তো আজ এদিন দেখতে হতো না।”
আদ্রিশা মাথা নেড়ে বললো,
“না বাবা, আমি তখন কিছু বলার বা কিছু ভাবার অবস্থায় ছিলাম না। শূণ্য হাতে জনসম্মুখে মাথা নুইয়ে দাঁড়ানো ছাড়া কিছুই করতে পারতাম না। যা হয়েছে হয়ে গেছে। আমি আর ওসব নিয়ে ভাবতে চাই না। তোমরা আছো তো আমার সাথে, আর কিছু চাই না আমি। আগের মতোই আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিও, তবেও হবে। আমার কান্নাটুকু মুছে দিও। তোমরা সাথে থাকলে আমিও দূর্বল হবো না। ঠিক সামলে নেবো নিজেকে।”
রুমানা আহমেদ আবদারের সুর টেনে বলেন,
“আরো একটাবার চেষ্টা করা যায় না? তুই না কর, আমরা করে দেখি না। তোকে তোর প্রাপ্য ফিরিয়ে দিতে পারি কি না?”
আদ্রিশা হাত দিয়ে রুমানা আহমেদ আর হামিদুর আহমেদের হাত জাপটে ধরলো। চোখের জল ফেলে থেমে থেমে বললো,
“না। আর কোনো চেষ্টা করবে না। কাল ওদের বিয়ে।নতুন জীবনের শুরুটা করতে দাও। আমি চাই না আমার জন্য আবারও ওরা কষ্ট পাক! আলাদা হোক!”
হামিদুর আহমেদ জোড় দিয়ে বললেন,
“আর যদি এবার আমরা সফল হই?”
আদ্রিশা খানিক হেসে বললো,
“হতেই পারো। কিন্তু তারপর যদি এর চেয়েও খারাপ কিছু হয়। আবারও যদি এমন ভাবেই সরে আসতে হয় আমায়, ছেড়ে দিতে হয় ওনাকে, আমি যে সইতে পারবো না বাবা! শেষ হয়ে যাবো একদম! দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকু পাবো না আর। আমি চাই না ফিরতে। প্লিজ এমন করো না তুমরা! আমায় এভাবেই তোমাদের কাছে রাখো না! আমি বেশ থাকবো। ভুলে যাবো সব। আমি ভুলে যেতে চাই ওকে। আর কষ্ট পেতে পারবো না। আমি কি তোমাদের কাছেও বোঝা মা? আমি থাকতে পারবো না তোমাদের কাছে?”
রুমানা মেয়েকে টেনে নেন বুকে। মাথায় হাত রেখে বলেন,
“কিসের বোঝা তুই? তুই তো আমাদের মেয়ে! মেয়েরা বোঝা হয় না। সারাজীবন আমাদের মেয়ে হয়েই থাকবি। আমার কাছেই রাখবো তোকে। একদম এভাবে আগলে রাখবো।”
হামিদুর আহমেদ ভেজা চোখে মৃদু হাসলেন। মেয়ের মাথায় হাত রেখে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। দরজার বাইরে হলে আরো দু জোড়া চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে এদের পর্যবেক্ষন করছিলো। একে অপরের দিকে ভরসার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চোখ মুছলো তারা। ঘুমে জড়ানো চোখ নিয়ে পেছন থেকে জেসমিনের আঁচল টেনে বলে উঠলো আরিয়া, “ঘুমু পাচ্ছে!” আদ্র মেয়েকে কোলে তুলে স্ত্রীর হাত ধরে সাবধানে নিজেদের ঘরে প্রবেশ করলো।
চলবে,,,,,,,,,,,
যদি আমার হতে🌹
পর্ব – ৫১
লেখিকা : সৈয়দা প্রীতি নাহার
রোদের তেজ চোখে পড়ায় ঘুম ছুটে যায় আদ্রর। চোখ কচলে এদিক ওদিক দেখে সে। আড়মোড়া ভেঙে পাশ ফিরে দেখলো জেসমিন বালিশে ঠেস দিয়ে বসে আছে চুপচাপ। দেয়াল ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে সময় পর্যবেক্ষন করে উঠে বসলো আদ্র। চিন্তিত কন্ঠে বললো,
“এতো সকাল উঠে পরলে যে?”
জেসমিন তিক্ততার সাথে জবাব দিলো,
“ঘুম পাচ্ছে না আর।”
আদ্র মেয়ের মুখে উড়ে আসা চুল সরিয়ে দিলো এক হাতে। কাঁথাটা জড়িয়ে দিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললো,
“প্রেগন্যান্সির এই প্রথম তোমার ঘুম পাচ্ছে না। অস্বস্তি হচ্ছে?”
জেসমিন কিছু বললো না। ঘাড়ে পরে থাকা চুল মুরিয়ে খোপায় বেধে পেটে হাত দিয়ে বসে রইলো। আদ্র উত্তেজিত হয়ে বললো,
“খিদে পেয়েছে? কখন উঠেছো তুমি? ডাকলেই তো পারতে? এই পেট ব্যাথা করছে না কি? আরে কিছু তো বলো!”
জেসমিন হতভম্ব হয়ে বসে রইলো কিছুক্ষন। ফুস করে শ্বাস ছেড়ে বললো,
“একটা একটা করে উত্তর দি?(আদ্র মাথা নাড়লো) অনেক আগেই ঘুম ছেড়ে গিয়েছে, খিদে পায় নি একটুও, পেট ব্যাথা হচ্ছে না আমার, এমনি হাত রেখেছি! আর কিছু?”
আদ্র মাথা চুলকে বললো,
“এমন দেখাচ্ছে কেনো তাহলে?”
জেসমিন জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো,
“ভাবছিলাম! আদু আর মুগ্ধ ভাইয়ের কথা। আচ্ছা, কিছু কি করা যায় না? আজ যে ওদের বিয়ে!”
আদ্র ছোট্ট একটা শ্বাস টেনে বললো,
“করা গেলে কি হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতাম? বোনটা যদি একবার বলতো, ‘ভাইয়া আমি ওকে ডিভোর্স দিতে চাই না। ওর সাথে থাকতে চাই। এই বিয়ে আটকাও!’ বিশ্বাস করো জেসমিন, আমি কোনোকিছুর পরোয়া করতাম না। আসমান জমিন এক করে ফেলতাম ওর জন্য। তবু মুগ্ধর এই বিয়েটা হতে দিতাম না। কিন্তু আমার বোন যে আমার কাছে অন্য আবদার করলো। ও চায় এই বিয়েটা হোক। ও চায় এই বিয়েতে যেনো কোনো বাধা না আসে। ভাবতে পারছো জেসু! আমার আদু, যে কি না আমার জিনিসেও ভাগ বসাতো, সে আজ নিজের অধিকার, ভালোবাসা ছেড়ে দিচ্ছে! জানোতো, ছোটবেলায় আমার কাছে যা যা থাকতো সব ওকে দিতে হতো। আমার ব্যাট, আমার গাড়ি, আমার স্পোর্টস শু, এমনকি আমার শার্টও পড়তো সে। তুমি আসার পরও তো দেখেছো বলো, মাঝে মাঝেই রাতের বেলা আমার আলমারি খুলে খুঁজে খুঁজে কেমন ওর পছন্দের শার্ট পড়ে নিতো! কোনো দিনও ওর চকোলেটের এক টুকরো আমায় দেয় নি। অথচ আমার পুরো চকোলেট টাই একা খেয়েছে। আর আজ সেই কিনা, মুগ্ধকে, নিজের স্বামীকে ছেড়ে দিচ্ছে! কতো বড় হয়ে গেছে না! বুঝতে অব্দি দেয় নি তার বুকের ভেতরের ঝড়টা। হাহাকার করে গেছে শুধু আমাদের আড়ালে।”
জেসমিন চোখের জল ধরে রাখতে পারলো না। ফুঁপিয়ে উঠে বললো,
“আমার খুব কষ্ট হচ্ছে আদুর জন্য। ও কি করে সব মেনে নেবে? যতোই বলুক, স্বামীর সাথে অন্য মেয়েকে কি করে মানবে? আমি তো জানি কতোটা পুরবে তার!ওদের বিয়েতেও যাবে বলছিলো! কি করে এতোটা পাষাণ হচ্ছে নিজের সাথে? নিজেকে এই শাস্তি থেকে ছাড় দিচ্ছে না কেনো?”
আদ্র উঠে এসে জেসমিনের সামনে হাটু গেড়ে বসলো। জেসমিনের দু গালে হাত রেখে শীতল কন্ঠে বললো,
“কেঁদো না জেসু! এভাবে কান্নাকাটি করা উচিত নয় তোমার। বাচ্চার ক্ষতি হবে! শান্ত হও। যা হওয়ার সেটাকে আটকানো যাবে না। অবশ্য অনেক কিছুই এগিয়ে গিয়েছে এখন চাইলেও কিছু করার নেই। আদু যা করেছে ভেবে চিন্তেই করেছে। কিন্তু আর না। ওকে কিছুতেই ও বাড়িতে যেতে দেবো না আমরা। আমার বোন আর কষ্ট পাবে না। কিছুতেই না। মুগ্ধর ছায়াও পড়তে দেবো না আদুর উপর!”
___________________
বিয়ে বাড়ির সাজ নেই। ঘরে মেহমানের আনাগোনাও কম। পরিবারের মানুষ ছাড়া তেমন কেউ নেই বললেও চলে। শুধু তিথিদের দিক থেকে কিছু আত্মীয় এসেছেন। ঘরেই কাবিন হবে ছোটখাটো ভাবে। মুগ্ধর দ্বিতীয় বিয়ে বলে অনেকেই কানাঘুষা করছে তিথি আর মুগ্ধকে নিয়ে। তবে তিথির এতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। লাল বেনারসি পড়ে কনের সাজে স্টেজে বসে আছে সে। বন্ধু বান্ধবদের সাথে কথাও বলছে হেসে। আসরাফ খান আর শওকত শাহ পাশাপাশি সোফায় বসে আছেন। মালিহা হল রুমের এক কোণে মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে আছেন। তানিয়া খান মেয়ের শাড়ির কুচি ঠিক করে তার কাছাকাছি থাকছেন। মনোয়ারা বেগম সিড়ির কাছটায় দাঁড়িয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন। হয়তো আদ্রিশার অপেক্ষায় আছেন তিনি। স্নিগ্ধ আসে নি আজ। স্পষ্ট বলে দিয়েছে সে, আদ্রিশার যায়গায় অন্য কাওকে দেখতে পারবে না। মুগ্ধ গোল্ডেন আর ব্লু মিশ্রিত শেড়ওয়ানি তে নিচে নামলো। চোখে মুখে ভীষন অস্বস্তি তার। একে একে সবার দিকে তাকিয়ে স্টেজে উঠলো সে। তিথির পাশেই বসেছে। বয়স্ক এক বৃদ্ধ এগিয়ে এসে শওকত শাহকে জিজ্ঞেস করলেন,
“বিয়ের কাজ শুরু করা যাক!”
মুগ্ধ ইতস্তত করে বললো,
“না! একটু অপেক্ষা করুন!”
তিথি ভ্রু কুঁচকে স্লো ভয়েজে বললো,
“মুগ্ধ! তুমি আদ্রিশার ওয়েট করছো? ও আসার হলে ঠিক আসবে। বিয়েতে দেরি হয়ে যাচ্ছে না! আত্মীয় স্বজন সবাই অপেক্ষা করছে। আর তাছাড়া আদ্রিশার এখানে উপস্থিত হওয়া না হওয়া কোনো ম্যাটার করে না আমার কাছে!”
আসরাফ খান শওকত শাহের এক হাত ধরে চোখের ইশারায় অনুষ্ঠান শুরু করতে বলেন। শওকত শাহ বৃদ্ধ লোকটিকে আজ্ঞা দিলেন। লোকটি স্টেজের উপরে চেয়ারে বসে খাতায় কলম ছুঁয়ালো। মালিহা আঁচলে মুখ ঢেকে ভেতরে চলে গেলেন। মনোয়ারা বেগম তীব্র রাগ নিয়ে মুগ্ধকে দেখলেন। বিয়েটা শেষমেষ হয়েই গেলো! কিছু করতে না পারার তীব্র কষ্ট তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে যেনো। বার বার মনে হচ্ছে এটা ঠিক হচ্ছে না। আদ্রিশার সাথে অন্যায় হচ্ছে। মুগ্ধর উচিত আদ্রিশাকে ভালোবাসা। কিন্তু বলা হলো না সেটাও!
এদিকে আদ্রিশা বেরুনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। মুগ্ধর বিয়েতে নয়, এদেশ ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি। সকালের দিকে খাবারের টেবিলে প্রতিবাদী কন্ঠে বলেছিলো আদ্র, বোনকে ওবাড়িতে যেতে দেবে না সে। আদ্রিশা প্রথমে কোনো রিয়েক্ট না করলেও পরবর্তীতে করেছিলো। খুব কেঁদেছিলো মেয়েটা। মা ভাবিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদেছে সে। এখানে থাকা তার জন্য দুষ্কর। মুগ্ধর বিয়ে হচ্ছে, কথাটা ভেবেই মরে যেতে ইচ্ছে করছে তার। নিজেকে শেষ করে দেয়ার অদম্য সিদ্ধান্ত থেকে মুখ ফিরিয়ে এদেশ ছাড়ার ফয়সালা করেছে সে। মুগ্ধর সাথে জড়ানো স্মৃতি মুছার জন্য তার থেকে দূরে যেতে হবে আদ্রিশাকে। এতোটাই দূরে যেতে হবে যতোটা দূরে গেলে মুগ্ধর নামটাও শুনতে না হয় তাকে। বন্ধু বান্ধব থেকে বিদায় নিয়ে দুপুরেই ফ্লাইটের টিকেট বুক করিয়েছে আদ্রর দ্বারা। রুহি, নীলার কান্নারত মুখটা দেখেও নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলো সে। তুহিন আদ্রিশাকে সাপোর্ট করছে এক্ষেত্রে। তবে আদ্রিশা তাদের প্রমিজ করিয়েছে সে কোথায় যাচ্ছে তা যেনো কোনোভাবেই কেউ না জানে। কোনো এক কারনে তার মনে হচ্ছে, কেউ তাকে খুঁজবে। কিন্তু সে তো হারাতে চায়। সবার থেকে হারাতে চায়, অতীত থেকে হারাতে চায়। খুঁজে নিলে যে আবারও অতীত ঘাটতে হবে। যে অতীত শুধুই কষ্টের। অন্ধকার সে অতীতে ফেরার কোনো ইচ্ছে তার নেই। লাগেজ গুছিয়ে হ্যান্ড ব্যাগে টিকেট পাসপোর্ট নিতেই আরিয়া ছুট্টে এসে কোমর জড়িয়ে ধরে তার। আকস্মিক ধাক্কায় পড়ে যেতে নিয়েও সামলে নেয় নিজেকে। মৃদু হেসে আরিয়া থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে হাটু গেরে নিচে বসে আদ্রিশা। আরিয়ার দু চোখ মুছিয়ে বলে,
“কি হয়েছে আমার আম্মুনিটার? কাঁদে কেনো সোনা?”
আরিয়া হেঁচকি তুলে বললো,
“কেনো যাচ্ছো ফুপ্পি? আমি কি খুব পঁচা? আমার নতুন বার্বিডল টা তোমায় দিয়ে দেবো! তোমায় আর ডিস্টার্ব করবো না, পিংকি প্রমিজ(কনিষ্ঠ আঙুল দেখিয়ে)!চলে যেও না। আমার খুব কষ্ট হবে তোমায় ছেড়ে থাকতে! বাবাই ও কাঁদছে জানো।”
আদ্রিশা হালকা হেসে বললো,
“আরু! কাঁদে না বাবু! শুনো ফুপ্পির কথাটা। আমায় তো যেতেই হবে আরু। না গেলে তো আমি হেরো হয়ে যাবো! তুমি কি চাও তোমার ফুপ্পি হেরো হোক? (আরিয়া মাথা নাড়লো, আদ্রিশা আরিয়ার চুল কানের পাশে গুজে দিয়ে গাল টেনে বললো) জিততে হলো যেতে হবে বলো। আমি তো একেবারে চলে যাচ্ছিনা। খুব তাড়াতাড়ি ফিরবো। রোজ রোজ কথাও হবে তোমাদের সাথে! তাই না?”
আরিয়া নাক টেনে বললো,
“তোমায় কে হেরো বলবে ফুপ্পি? কি জিততে যাবে তুমি?”
আদ্রিশা দাঁতে ঠোঁট চেপে শান্ত কন্ঠে বললো,
“তুমি বুঝবে না সোনা। আগে বড় হও তারপর সব বুঝবে। আমি কি হারিয়ে কি জিততে যাচ্ছি সেটাও জানবে তুমি। এখন আর কাঁদবে না। ওকে? ফুপ্পিকে হ্যাপি হ্যাপি হয়ে টাটা না করলে ফুপ্পির কান্না পাবে তো!”
আরিয়া চোখ মুছে বললো,
“আর কাঁদবো না।”
আদ্রিশা আরিয়ার দুগালে চুমু খেয়ে বললো,
“সোনা বাচ্চাটা!”
আদ্র লাগেজগুলো গাড়িতে তুলে আদ্রিশাকে নিতে এলো। আদ্রিশা সবাইকে বিদায় জানিয়ে গাড়িতে উঠতে গিয়েও পেছন ফিরে তাকালো। মনে করার চেষ্টা করলো ঠিক সারে ছয় মাস আগের কথা। তখন বিয়ের সাজে এ বাড়ি ছেড়েছিলো। আর এখন বিয়েটা শেষ করে এ বাড়ি ছাড়ছে। সেদিন পালিয়েছিলো বিয়ে করবে না বলে, আর আজ পালাচ্ছে সেই বিয়েটা টিকে নি বলে। জীবন বড় অদ্ভুত! কখন যে কি করিয়ে দেয় বুঝা কঠিন! আদ্র গাড়ি ড্রাইভ করে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত নিয়ে গেলো তাকে। এয়ারপোর্টের ভেতরে শুধু আদ্রিশাই ঢুকতে পারবে। তাই আদ্র বাইরেই দাঁড়িয়ে রইলো। যতোক্ষন না আদ্রিশার ফ্লাইট হচ্ছে সে এখানেই থাকবে বলে জানিয়েছে। যাওয়ার আগে ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে অনেক্ষন কাঁদলো আদ্রিশা। আদ্র শুধু তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। আদ্রিশা চলে গেলো ভেতরে।
ইমিগ্রেশন পেরিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে আদ্রিশা ভাবলো, এতোক্ষনে নিশ্চয় বিয়েটা হয়ে গিয়েছে। কিছুক্ষন পরই হয়তো বাসর! মুগ্ধ, তিথি ওরা খুব খুশি নিশ্চয়! হওয়ারই কথা। কতো বাধা পেরিয়ে এক হয়েছে দুজনে! আদ্রিশাকি আর ফিরবে দেশে? ফিরবে হয়তো কোনো একদিন। তখন হয়তো মুগ্ধ আদ্রিশাকে ভুলে যাবে। ভুলে যাবে মিথ্যে সম্পর্ক! আদ্রিশাও কি ভুলবে? হয়তো! হয়তো না! সময় পেরোয় নিজ গতিতে। একসময় ফ্লাইট হয়ে যায়! আদ্রিশাও দু চোখের পাতা ভাসিয়ে দেয় জ্বলে। পরিবার ছেড়ে যাওয়ার থেকেও বেশি কষ্ট হচ্ছে মুগ্ধকে ছেড়ে যেতে। ছেড়ে তো সে দিয়েইছিলো অনেক আগে, এখন শুধু ধরা ছোয়ার বাইরে যাচ্ছে! তিলে তিলে শেষ হচ্ছে এটা ভেবেই যে, আজ ওদের ঘরে অন্য মেয়ে আছে! তিথি আর মুগ্ধ স্বামী স্ত্রী! মুগ্ধর জীবনে আর কোনো স্থান নেই তার। নেই কোনো আশ্বাস! মুগ্ধতো তার ছিলো না! তিথির ছিলো তাই, তিথিরই আছে! আদ্রিশার আক্ষেপ হচ্ছে খুব। তিথি না হওয়ার আক্ষেপ। আদ্রিশা মনে মনে আওড়ালো,”ইশশ, #যদি আমার হতে, তাহলে আর কারো হতে দিতাম না তোমায়! কেনো আমার হলে না মুগ্ধ? কেনো?” আকাশযানে চড়তে চড়তেই ঘুমিয়ে পড়লো আদ্রিশা। গাল বেয়ে পড়া জ্বল শুকিয়ে গেছে গালেই! হাত দিয়ে মুছেও নি সে। শুধু ঝরতে দিয়েছে আক্ষেপগুলো। ভাসিয়ে দিয়েছে অভিযোগ, অভিমান, সপ্ন!
চলবে,,,,,,,,,,