যদি আমার হতে🌹
পর্ব – ৫৪
লেখিকা : সৈয়দা প্রীতি নাহার
হোটেলের রেস্টুরেন্টে লান্চ করতে এসেছে মুগ্ধ তিথি। হাতে তাদের ফাইল আর ল্যাপটপ। মুগ্ধ ল্যাপটপের কি বোর্ডে হাত রেখে বললো, “তিথি! সব ঠিক আছে ফাইলে?”
তিথি মাথা নেড়ে বললো, “হ্যাঁ। বলছি, এখন অফ করো না এসব, খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
মুগ্ধ তিথির দিকে একপলক দেখে জ্যুসের গ্লাস তুলে নিলো। দু ঢোক খেয়ে আবারও কাজে মনোযোগ দিলো সে। তিথি মাথা ঝেড়ে চামচে নুডলস পেঁচালো। মুগ্ধ ল্যাপটপে চোখ রেখেই প্লেটে চামচ নাড়ছে। খানিক পর পরই ফাইলের দিকে তাকাচ্ছে সে। বাঙালি যুবক দিপু নামের ওয়েটার এগিয়ে এলো মুগ্ধর টেবিলের দিকে। সকালেই তার সাথে মুগ্ধদের আলাপ হয়েছে। একে তো বাঙালি তার উপর বয়সে মুগ্ধর ছোট। ভাই বলেই তাকে সম্মোধন করেছিলো মুগ্ধ । দিপু হাতের খালি ট্রেটা পেটের সাথে চেপে ধরে ঘাড় নুইয়ে বললো, “ডু ইউ নিড এনিথিং মোর স্যার?”
মুগ্ধ ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললো, “নো, উই আর ডান অলমোস্ট! থ্যাঙ্ক ইউ!”
ছেলেটা যেতে গিয়েও থেমে গেলো। আমতা আমতা করে বললো, “ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, একটা প্রশ্ন করি স্যার?”
মুগ্ধ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই ছেলেটা কৌতুহলী হয়ে বললো, “স্যার, সকালে যখন ব্রেক ফাস্ট করতে এলেন তখন ম্যাডাম আর আপনার হাতে ফাইল ছিলো। এখন যখন লান্চ করতে এলেন তখনও হাতে ফাইল, ল্যাপটপ! মানে যেটা জানতে চাইছি সেটা হলো, আপনারা হানিমুনে এসেছেন না কি কাজে?”
মুগ্ধ মৃদু হেসে তাকালো ছেলেটার দিকে। ল্যাপটপ বন্ধ করে বললো, “কাজ তো খুব জরুরী আমাদের জন্য। তাই যেখানেই যাই হাতে কাগজ পত্র থাকে। আর বলছো হানিমুনের কথা, সেটা কি যখন তখন যেখানে সেখানে করা যায়?”
তিথি গোল গোল চোখ করে মুগ্ধর হাতে বারি মারলো। ছেলেটাও বেশ লজ্জা পেলো। সে মাথা দুলিয়ে চলে যেতে নিয়েও ফিরে তাকালো। আগ্রহ নিয়ে বললো, “আপনারা তো আসার পর থেকে তেমন ঘুরাফেরাও করেন নি। আমার কাছে এই শহরের একটা ম্যাপ আছে। চাইলে নিতে পারেন। আমার এক বন্ধু এখানে আসা অতিথিদের গাইড করে। আপনারা বললে তাকে আপনাদের গাইড করতে বলি। খুব ভালো ফটোগ্রাফিও করে। হানিমুনের সুন্দর সুন্দর স্মৃতি তুলে রাখবে!”
তিথি মুখ ছোট করে তাকালো। মুগ্ধ হালকা হেসে বললো, “না তার দরকার নেই। আমরা এখানে ঘুরতে আসি নি দিপু! আমার প্রেয়শী খুব অভিমান করে আছে আমার উপর। তার মান ভাঙাতে হবে আমার। তাই তো এখানে আসা। একটা বার সব ভুলে যদি আমার হয়ে যায়, তারপর নাহয় তার সম্মতিতেই ঘুরাফেরা হবে! এখন আমার একমাত্র কাজ তার মুখে হাসি ফুটানো। এক চিলতে হাসি!”
দিপু মুখ কালো বললো, “ম্যাডাম, আপনি রাগ করেছেন?”
তিথি হেসে ফেললো । পানিতে চুমুক দিয়ে বললো, “তুমি বুঝবে না ওসব। মুগ্ধ! চলি?”
__________________
জনমানব হীন রাস্তায় হঠাৎই ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ে মুগ্ধদের টেক্সি। তিথির চোখ লেগে এসেছিলো মাত্র। ধাক্কা খেয়ে হকচকিয়ে জেগে যায় সে। মুগ্ধও খানিক বিচলিত হয়ে পড়ে এতে। টেক্সি থেকে নেমে দেখে এক চাকা পান্চার হয়ে গেছে। ড্রাইভার মুগ্ধর থেকে এতটুকু আসার ভাড়া নিয়ে গাড়ি ঠেলেই এগুতে লাগলো। মুগ্ধ প্যান্ট, কোর্টের পকেট খুঁজেও ফোন পেলো না নিজের। ক্লান্ত ভঙ্গীতে তিথির দিকে হাত বাড়িয়ে বললো,
“ফোনটা দাও তো তোমার। হোটেলে ফোন করে ক্যাব আনতে হবে। আমার টা মে বি হোটেলে রেখে এসেছি !”
তিথি পার্স থেকে ফোন বের করে দিলো মুগ্ধর দিকে। মুগ্ধ হোটেলের রিসেপশনে কল করলো।
“হ্যালো! দিছ ইজ মাহবুব শাহ। আই এম স্টেন্ডিং ইন হোটেল ফর লাস্ট থ্রি ডেইস। মাই রুম নাম্বার ইজ 357।এন্ড শারমিন তিথি ইজ ওলসো উইথ মি। উই আর নাও এট সেন্ট রোড। এন্ড আওয়ার ক্যাব যাস্ট গট ড্যামেজ। কেন ইউ হ্যাল্প আস সামহাও?”
অপর পাশ থেকে বললো,
“ইয়াহ স্যার। হাও ক্যান আই হ্যাল্প ইউ?”
মুগ্ধ রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক দেখে বললো, “একচুয়েলি উই আর নট ফাইন্ডিং এনি টেক্সি ওর ক্যাব টু গো ব্যাক টু দ্যা হোটেল। সো উই নিডেড এ টেক্সি!”
অপর পাশ থেকে রুঢ় আওয়াজে বললো,
“ডিড ইউ গাইজ টেইক টেক্সি ফ্রম আওয়ার হোটেল হোয়াইল গোয়িং আউট?”
মুগ্ধ চোখ বুজে জোড়ে শ্বাস টেনে বললো,
“নো!”
অপর পাশ থেকে শান্ত কন্ঠে আওয়াজ এলো,
“দ্যান উই আর এক্সট্রিমলি সরি স্যার। আই হোপ ইউ নো এবাউট আওয়ার অথোরিটি এন্ড রুলস! ইফ ইউ ওউন্ট টেইক আওয়ার টেক্সি ফর গোয়িং আউট দ্যান ইউ ক্যান্ট আস্ক ফর এনি। ইউ শুড হ্যাভ থিঙ্ক বিফোর ইউ টেইক এনি অ্যাকশন!”
কথাটা বলেই ফট করে কেটে দিলো কল। মুগ্ধ মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছাড়লো। তিথি উত্তেজিত কন্ঠে বললো,
“কি হলো? টেক্সি আসছে?”
মুগ্ধ মাথা নেড়ে বললো,
“নাহ! যে ভয় পাচ্ছিলাম সেটাই হলো!”
তিথি ভ্রু কুঁচকে বললো,
“কেনো? আর কি ভাবছিলে তুমি?”
মুগ্ধ দু আঙুল দিয়ে কপালে স্লাইড করতে করতে বললো,
“বলেছিলাম তোমায়! হোটেলের ক্যাব নিয়েই যাই! কিন্তু তুমিই না করলে। জেদ করে বাইরের টেক্সি হায়ার করলে। হোটেলের রুলস অনুযায়ি তাদের টেক্সি নিয়ে বেরুলেই কেবল টেক্সি করে ফেরা যাবে। হোটেলের টেক্সি ব্যতীত অন্য টেক্সিতে বেরুলে হোটেল কর্তৃপক্ষের কোনো দায়িত্ব নেই। আর না ওরা টেক্সি পাঠাবে!”
তিথি ঠোঁট উল্টে বললো,
“তখন হোটেলের টেক্সির ওয়েট করলে যে দেরি হয়ে যেতো!”
মুগ্ধ এদিক ওদিক হাটছে। একদম সুনসান সড়ক। গভীর রাত হলেও বিদেশে গাড়ি এবং মানুষ চলাচল থামে না। অথচ এই রাস্তায় কোনো জীব জন্তুও নেই। আশেপাশের জঙ্গল দেখে তিথির গায়ে কাটা দিচ্ছে। হঠাৎই একটা ক্যাব তিথির সামনে দাঁড়ালো। চমকে উঠে মুগ্ধর পেছনে লুকলো তিথি। গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো এক সুদর্শন যুবক। টিশার্ট, জ্যাকেট, জিন্স পরিহিত সে। গম্ভীর মুখ করে বললো,
“হোয়াট ননসেন্স! হোয়াই আর ইউ ইন দ্যা মিডিল অফ দ্যা রোড? ডোন্ট ইউ হ্যাভ এনি সেন্স?হোয়াট ইফ ইউ গট হার্ট বাই মি অর এনিওয়ান এল্স?”
মুগ্ধ এগিয়ে এসে বললো,
“প্লিজ ডোন্ট গেট হাইপার। আই এম সরি বিহাফ অন হার।”
ছেলেটি মাথা দুলিয়ে গাড়িতে উঠতে নিলে মুগ্ধ পেছন থেকে ডেকে বললো,
“উইল ইউ প্লিজ হ্যাল্প আস?”
ছেলেটা ঘাড় ঘুরিয়ে বললো,
“হোয়াট কাইন্ড অফ হ্যাল্প?”
মুগ্ধ আমতা আমতা করে বললো,
“উই আর স্টেয়িং ইন থমসন। টুডে উই ওয়েন্ট ফর সাম ওয়ার্ক এন্ড হোয়াইল রিটার্নিঙ আওয়ার ক্যাব হ্যাজ গট ডেমেজ্ড! আনফর্চুনেইটলি উই ডিড নট টেইক হোটেলস ক্যাব, সো উই ওউন্ট গেট এনি হ্যাল্প ফ্রম দ্যাম। দেয়ার আর নো ওয়ান উইদাউট ইউ হু কেন হ্যাল্প আস। প্লিজ গিভ আস লিফ্ট ইন ইন ইউর ক্যাব!”
ছেলেটা মাথা দুলিয়ে বললো,
“আই এম রিয়েলি সরি। আই ক্যান নট!”
তিথি তেতে উঠে বললো,
“ছাড়ো মুগ্ধ! এসব বিদেশীরা আমাদের সাহায্য করবে না।”
ছেলেটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
“আপনারা বাঙালি?”
মুগ্ধ অবাক হয়ে বললো,
“হ্যাঁ! আপনিও বাঙালি?”
ছেলেটা মাথা নেড়ে মুচকি হেসে বললো,
“অবশ্যই!”
তিথি মুখ ফুলিয়ে বললো,
“এরপরও সাহায্য করবেন না?”
ছেলেটা ফুঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললো,
“বাঙালি হলেই যে সাহায্য করবো আর না হলে করবো না এটা আপনাকে কে বললো?”
তিথি মুখ ঘুরিয়ে বললো,
“করবেন কি না সেটা বলুন?”
ছেলেটা গালের খোঁচা খোঁচা দাড়ি তে হাত বুলিয়ে বললো,
“থমসনের রাস্তায় আমাদের ক্যাব যাওয়ার নির্দেশ নেই, নাহলে ঠিক নিয়ে যেতাম আপনাদের!”
মুগ্ধ অসহায় মুখ করে বললো,
“কোনো কিছু করা যায় না?”
ছেলেটা মৃদু হেসে বললো,
“আজকের রাতটা আমার এপার্টম্যান্টে থাকবেন চলুন! ওখানে আমি ছাড়াও আমার এক ফ্রেন্ড থাকে। সেও বাঙালি। চার বাঙালি এক সাথে জমবে ভালো। গল্প আড্ডায় রাত কেটে যাবে কি বলেন?”
তিথি ঠোঁট উল্টে বললো,
“আপনার এপার্টম্যান্টে ঘুমানোর জায়গা হবে না? আমার ঘুম পাচ্ছে তো!”
____________________
কলিং বেল বাজতেই হলের লাইট জ্বালিয়ে গায়ে শাল জড়িয়ে দরজা খুলতে গেলো আদ্রিশা। দরজায় কান পেতে বললো,
“হু ইজ দেয়ার?”
বাইরে থেকে উত্তর এলো,
“দ্যাটস মি! সানি। দরজা খোল!”
আদ্রিশা দরজা খুলে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। বাইরে শুধু সানিই না। সাথে আছে মুগ্ধ আর তিথি। এতোক্ষন ঘুমের সাথে যুদ্ধ করে নিজেকে জাগিয়ে রাখার অতি মাত্রার চেষ্টা অসফল হলেও আদ্রিশাকে দেখে ঘুম কেটে গেলো তিথির। চোখে মুখে উচ্ছ্বাসিত হাসি ফুটিয়ে মুগ্ধর দিকে দেখলো সে। মুগ্ধ অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে আছে আদ্রিশার দিকে। সানি হঠাৎ বলে উঠলো,
“ভেতরে আসতে দাও আমাদের। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলো আমাদের জন্য?”
আদ্রিশা মৃদু হেসে মাথা নাড়িয়ে সরে দাঁড়ালো। মুগ্ধর চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। এই সেই ছেলে যার সাথে আদ্রিশা এই ফ্ল্যাটে থাকছে, ভাবতেই আকাশ চুম্বি রাগ লাগছে তার। ইচ্ছে হচ্ছে, ছেলেটাকে মেরে মাটিতে পুঁতে ফেলে।
চলবে,,,,,,,,,
যদি আমার হতে🌹
পর্ব – ৫৫
লেখিকা : সৈয়দা প্রীতি নাহার
সানি সোফায় গা এলিয়ে দিলো। দুহাতে চুল টেনে পেছন দিকে ঘাড় অব্দি ঘষে আনলো হাত। লম্বা শ্বাস টেনে বললো,
“প্লিজ, আপনারা বসুন না। আদু, কফি হবে?”
আদ্রিশা সম্মতি জানিয়ে বললো,
“সবার জন্য নিয়ে আসছি। তোমরাও বসো!”
মুগ্ধ ধীর পায়ে হেটে সানির মুখোমুখি হয়ে বসলো। তিথি আদ্রিশার উদ্দেশ্যে বললো,
“দেখলে তো, সেদিন তুমি নিয়ে না এলেও আমরা ঠিক এসে পরেছি।”
সানি ভ্রু কুঁচকে বললো,
“না নিয়ে এলে মানে? আপনারা একে অপরকে চেনেন?”
তিথি চোখ ঝাপটালো। মুগ্ধ বাঁকা হেসে বললো,
“হ্যাঁ! অনেক গভীর সম্পর্ক আমাদের।”
সানি ভড়কে গিয়ে বললো,
“আদু এনারা তোর পরিচিত হলে তুই এমন বিহেইভ করছিস কেনো? আই মিন ইউ শুড বি এক্সাইটেড!”
মুগ্ধ ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে জবাব দিলো,
“আই থিঙ্ক আমরা এভাবে হুট করে চলে আসবো এক্সপেক্ট করে নি। তাই আমাদের আসায় খুশিও নয় তেমন! ঠিক বললাম তো?”
আদ্রিশা তড়িঘড়ি করে বললো,
“মোটেও না। হ্যাঁ এটা ঠিক যে, হুট করে চলে আসাটা এক্সপেক্টেড ছিলো না, তাই কি রিয়েক্ট করবো বুঝে উঠতে পারছি না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি আপনাদের দেখে খুশি হই নি! এনিওয়ে তিথি আপু বসো। আমি এক্ষুনি কফি নিয়ে আসছি।”
মুগ্ধ মাথা ঝাঁকিয়ে বসে রইলো। তিথি হাতের কোর্ট সোফায় রেখে মুগ্ধর পাশাপাশি বসলো। হাত দিয়ে কপালের উপর উড়ে আসা চুল সরিয়ে দিয়ে সানির উদ্দেশ্যে বললো,
“আসার সময় কতো কথা বললেন। আপনি কবে এসেছেন এ দেশে, কেনো এসেছেন, পরিবারে কে কে আছে, অথচ আদ্রিশার সাথে থাকছেন সেটা কেনো বলেন নি?”
সানি হেসে ফেললো তিথির কথায়। হাসি থামানোর চেষ্টা করে বললো,
“সরি, আসলে আপনার প্রশ্নে না হেসে পারলাম না।”
তিথি ভ্রু কুঁচকালো। সানি গলা পরিষ্কার করে বললো,
“প্রথমত আমি জানতাম না আপনারা আদুর পরিচিত। আর সেকেন্ডলি আমি আমার কথা বলছিলাম আপনাদের, আদুর কথা উঠে নি তাই বলিনি। আচ্ছা আপনারা একে অপরকে কি করে চেনেন? আই মিন আপনাদের মধ্যকার সম্পর্ক কি?”
“আত্মীয়তার সম্পর্ক। মুগ্ধর ভাইয়ের সাথে আমার বেস্টু রুহির বিয়ে ফাইনাল হচ্ছে। সেই সূত্রেই আলাপ!”
কফির ট্রে হাতে এগিয়ে এসে কথাটা বললো আদ্রিশা। মুগ্ধ বুঝলো সানি আদ্রিশা আর মুগ্ধর ব্যাপারে কিছুই জানে না। ছোট্ট শ্বাস ফেলে কফির মগ উঠিয়ে নিলো মুগ্ধ। আদ্রিশা তিথির দিকে এক কাপ এগিয়ে দিয়ে সানি কে নিজেরটা নিতে ইশারা করে চলে যেতে নিলে সানি আদ্রিশার হাত ধরে টেনে পাশে বসিয়ে দেয়। মুগ্ধর রক্ত মাথায় উঠে গেছে ততোক্ষনে! একে তো ছেলেটা আদু আদু করছে, তারপর হাত ধরছে। এখন আবার গা ঘেষে বসাচ্ছে। আদ্রিশা কি উঠে যেতে পারছে না? না কি ওর কোনো আপত্তি নেই এভাবে এই ছেলেটার সাথে বসতে? আপত্তি কেনো হতে যাবে? একই ফ্ল্যাটে থাকছে দুজন! একসাথে বসলে কেনো সংকোচ হবে? অথচ মুগ্ধর হচ্ছে। বার বার এসব ভাবছে আর রাগে ফুলছে সে। তিথি একবার আড়চোখে তাকালো মুগ্ধর দিকে। মুগ্ধকে তীক্ষ্ণ নজরে সানির দিকে তাকাতে দেখে হালকা ঢোক গিলে কথা পারলো তিথি,
“আদ্রিশা তুমি এখানে কতোদিন আছো?”
আদ্রিশাকে কিছু বলতে না দিয়েই সানি বলে উঠলো
“এক মাস! তখন থেকেই আমার সাথে এখানে থাকছে। আসলে আদ্র আমার ফ্রেন্ড তাই ওর বোনকে কি করে ফেলে দি! আদ্রই ফোন করে বলেছিলো আদুর খেয়াল রাখতে। যদিও আদুও এখন আমার ফ্রেন্ড! তাই যতোদিন ও এখানে আছে আমি আছি ওর জন্য। আলহামদুলিল্লাহ কোনো অসুবিধা হবে না। ইজোন্ট ইট আদু?”
আদ্রিশা মৃদু হেসে মাথা নাড়লো। মুগ্ধর রাগ সীমানা ছাড়াচ্ছে। চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলাচ্ছে সে। মনে মনে বলছে, ‘বলেছে বলেই তোকে কেনো দায়িত্ব নিতে হবে? আর খেয়াল রাখতে বলেছে, ঘেষাঘেষি করতে বলে নি। অসভ্য ছেলে! আবার বলে যতোদিন আছে ততোদিন ওর জন্য আছে! তো থাক না কে মানা করেছে তোকে? বন্ধুর বোনকে বোনের নজরে দেখ। তাহলেই তো হয়। কি না কি নজরে তাকাচ্ছে আল্লাহ মালুম!’
তারপর কিছু টুকটাক কথা বললো সবাই। মুগ্ধ তিথির সানির সাথে আসার কারন, সিঙ্গাপুরের ওয়েদ্যার, জায়গা এসব নিয়েই বিষদ আলোচনা করলো। এর মাঝেই হলরুমের লেন্ডলাইন বেজে উঠলো। আদ্রিশা উঠে গিয়ে ফোনটা রিসিভ করলো। স্মিত আওয়াজে কিছু কথা বলে মিষ্টি হেসে সানির দিকে ফিরে বললো,
“ভাইয়া, মেরিনের ফোন। তোমায় ফোনে পাচ্ছে না, ফ্ল্যাটেও কল করেছিলো রিসিভ করো নি দেখে এখানে ফোন করছে। তুমি কি মোবাইল থেকে যোগাযোগ করবে না কি এখানেই কথা বলে নেবে।”
আদ্রিশার সানিকে ভাইয়া বলে ডাকায় মুগ্ধ টাস্কি খেয়ে গেলো। এই মেরিন আবার কে সেটাও ভেবে পাচ্ছে না সে। সানি জিব কেটে ফোন কানে ঠেকিয়ে বললো,
“সরি বেইব! ফর সাম রিজন আই সুইচ্ড মাই ফোন অফ! যাস্ট গিভ মি ফাইভ মিনিটস আই কল ইউ ব্যাক।লাভ ইউ!”
তারপর মুগ্ধদের দিকে ফিরে তাড়াহুড়ো করে ফোন অন করতে করতে বললো,
“আসলে, গার্লফ্রেন্ড ফোন দিচ্ছে। যেতে হবে আমায়। আমি পাশের ফ্ল্যাটেই আছি। আপনারা গল্প করুন। আদু, কোনো দরকার হলে কল মি । ওকে?”
আদ্রিশা মাথা নাড়তেই নাম্বার ডায়েল করে বেরিয়ে গেলো সানি। মুগ্ধ হতচকিত হয়ে বলে,
“পাশের ফ্ল্যাটে কেনো?”
আদ্রিশা মৃদু হেসে বললো,
“ভাইয়ার বাসা যেটা সেখানেই তো থাকবেন। পুরো এপার্টম্যান্টই ওনার, তবে দুটো ফ্ল্যাটে বিভক্ত। তাই একটা ওনার আরেকটা আমার জন্য বরাদ্য করেছেন!”
তিথি কৌতুহল নিয়ে বললো,
“একটাতে থাকলেই তো পারতে। দুজন দু ফ্ল্যাটে কেনো থাকতে গেলে?”
মুগ্ধ কটমট করে তাকালো তিথির দিকে। আদ্রিশা কাপগুলো ট্রে তে নিতে নিতে বললো,
“থাকা তো যেতো, কিন্তু আমি কম্ফোরটেবল হতাম না। তাই উনিই সিদ্ধান্ত নেন একটাতে আমি আর অন্যটাতে উনি থাকবেন। যতোই হোক ওনার বোনের মতো আমি!”
মুগ্ধ মাথা নত করলো সাথে সাথে। খুব লজ্জা লাগছে তার। সানিকে খুব খারাপ ভেবেছিলো সে, ছিঃ! ভাবতেও নিজের মানসিকতাকে ছোট মনে হচ্ছে। হীন মনে হচ্ছে চিন্তা চেতনাকে!
______________________
জানাল খুলে বসেছিলো আদ্রিশা। মুঠোফোনের কাপুনিতে পাশ ফিরে তাকালো সে। “ভাইয়া” লিখা শব্দটাতে চোখ আটকে গেলো তার। এই মানুষটাকে আজ খুব করে চাইছে সে। ইচ্ছে হচ্ছে ভাইয়ের বুকে হুমড়ি খেয়ে পরে আবদার করতে। এখান থেকে নিয়ে যাওয়ার আবদার। মুগ্ধ থেকে পালাতে এত দূর আসা আজ অসফল! এতো চেষ্টা বৃথা আজ! পাশের রুমেই নবদম্পতি মুগ্ধ আর তিথি আছে। দুজন ভালোবাসার মানুষ নতুন করে ভালোবাসছে একে অপরকে। ভাবতেই গা রি রি করে উঠলো আদ্রিশার। সত্যিই কি ওরা ভালোবেসে মিশে যাচ্ছে একে অন্যের সাথে? ছিঃ কি ভাবছে সে? ওরা বিবাহিত! স্বামী স্ত্রী কি করছে না করছে এসব নিয়ে কি করে ভাবছে সে? না! এটা হয় না। কখনোই না। অতীতকে ভুলার জন্য একটুখানি যন্ত্রণা মানতেই হবে। ওদের ব্যাপারে মাথা ঘামানো ঠিক হচ্ছে না তার। ভাবনার মাঝেই আবারও ভাইব্রেট করে উঠলো ফোন। চোখ মুছে ফোন কানে তুলে নিলো আদ্রিশা।
“কেমন আছিস আদু? আজ সারাদিনেও ফোন দিলি না যে?”
“ভালো আছি। একটু বিজি ছিলাম ভাইয়া!”
আদ্র ভ্রু কুঁচকে বললো,
“তোর গলা এমন শুনা যাচ্ছে কেনো? কাঁদছিস তুই?”
আদ্রিশা কান্না চেপে বললো,
“ঘুমিয়ে ছিলাম তো তাই এমন লাগছে হয়তো।”
আদ্র জেদ ধরে বললো,
“কি হয়েছে একবার আমায় বল। আমি জানি তুই ঘুমুচ্ছিলিস না। মিথ্যে বলছিস তো আমায়!”
আদ্রিশা ফুঁপিয়ে উঠলো। হেঁচকি তুলতে তুলতে বললো,
“ভাইয়া! আমি কি দোষ করেছি বলো তো? কেনো যন্ত্রণা পেতে হয় আমায়? কেনো অতীত তাড়া করছে বার বার? আমি তো সব ভুলতে চাই, তবুও কেনো আমার সামনে আসে? কেনো আমার চোখের সামনেই হয় সব?”
আদ্র উত্তেজিত হয়ে বললো,
“কি হয়েছে ক্লিয়ারলি বল না আদু। এভাবে কাঁদিস না প্লিজ!”
আদ্রিশা কেঁদে কেঁদে বললো,
“মুগ্ধ আর তিথি এখানে এসেছে।”
আদ্র শান্ত কন্ঠে বললো,
“সিঙ্গাপুর?”
আদ্রিশা ছোট্ট শ্বাস ফেলে বললো,
“হ্যাঁ তা তো কদিন থেকেই আছে। কিন্তু আজ, আজ আমারই ফ্ল্যাটে আমার পাশের রুমে আছে সে।”
আদ্র হতচকিত হয়ে বললো,
“কি? তোর ফ্ল্যাটে?”
আদ্রিশা বললো,
“হুম! ওদের গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সানি ভাইয়া ওদের এখানে নিয়ে আসেন। যদিও উনি এখনো জানেন না মুগ্ধর সাথে আমার কি পরিচয়!”
আদ্র মুখ ছোট করে বললো,
“কিন্তু ওরা দুজন ওখানে কেনো গেলো?”
আদ্রিশা তাচ্ছিল্য হেসে বললো,
“কেনো আবার হানিমুনে!”
আদ্র বিস্মিত হয়ে বললো,
“হানিমুন? এটা তোকে কে বললো?”
আদ্রিশা রুমময় পায়চারি করে বললো,
“ওরাই বললো। নতুন বিয়ে হয়েছে হানিমুনে তো যাবেই না!”
আদ্র আমতা আমতা করে বললো,
“আর ইউ শিওর? মানে ওরা হানিমুনেই গেছে?”
আদ্রিশা বিরক্তি নিয়ে বললো,
“উফফ! বললাম তো হানিমুনেই এসেছে! আমি মিথ্যে কেনো বলবো?”
আবারও কলিং বেল বেজে উঠে। আদ্রিশা আদ্রকে ফোন রাখতে বলে নিজেই কেটে দেয় কল। এগিয়ে যায় দরজার দিকে। সানি বাইরে থেকে আওয়াজ দেয়ায় দরজা খুলে দেয় আদ্রিশা। সানি পকেটে হাত গুজে ভেতরের দিকে চোখ রেখে বললো,
“ওরা কোথায়?”
আদ্রিশা চোখ নামিয়ে বললো, “ঘুমোচ্ছে!”
সানি গোল গোল চোখ করে বললো, “মানে? রুম তো দুটো! ওরা ঘুমালে তুই কই থাকবি? যা মুগ্ধকে ডেকে দে আমার ফ্ল্যাটে থাকবেন আজ রাত। ওনাকে নিতেই এসেছি।”
আদ্রিশা শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো, “আমি আমার রুমেই ঘুমাবো ভাইয়া। আর ওরা দুজন একটা ঘরেই আছে।”
সানি কপাল কুঁচকে বললো, “তুই কি পাগল? যুবক আর যুবতি দুজনকে এক ঘরে শুতে দিয়ে দিলি? বুদ্ধি শুদ্ধি কখন হবে তোর? মানছি, বিদেশে এসব ম্যাটার করে না, কিন্তু ওরা দুজন তো বাঙালি! ফ্রী মাইন্ডের হলেও তোর এটা কিন্তু উচিত হয় নি আদু!?
আদ্রিশা ঘন শ্বাস ফেলে বললো, ” ভাইয়া এখানে পাগলামোর কি দেখলে? স্বামী স্ত্রী দুজন এক ঘরে থাকবে তাতে সমস্যা কি?”
সানি এবার হাসিতে ফেটে পড়লো। আদ্রিশা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। হাসির কি বললো সেটাই খুঁজে পাচ্ছে না সে। সানি হাসতে হাসতেই বললো,
“তুই আসলেই পাগল। তোরই আত্মীয় আর তুই জানিস না? গাধা, ওরা তো বিজন্যাস পার্টনার! স্বামী স্ত্রী কেনো হতে যাবে?”
আদ্রিশা হকচকিয়ে গেলো সানির কথায়। থেমে থেমে বললো, “ওরা স্বামী স্ত্রী নয় এটা তোমায় কে বললো ভাইয়া?”
সানি উৎফুল্ল চিত্তে জবাব দিলো, “কে আবার, মুগ্ধ! গাড়িতে কথা বলার এক পর্যায়ে বললেন, তাদের বাবা বিজন্যাস পার্টনার। তিথি নাকি লন্ডন চলে যাবে কখন ফিরবে না ফিরবে তার ঠিক নেই।তাই লাস্ট ট্রিপ একসাথে। আর এ সুযোগে তার সাথে একটা বিজন্যাস ডিল নিয়ে কাজও হয়ে যাবে। কেননা , লন্ডন গিয়ে তিথি তার মতো করে বিজন্যাস শুরু করতে চায়। এখানে স্বামী স্ত্রী হওয়ার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?”
চলবে,,,,,,,,,,,