যদি আমার হতে🌹
পর্ব – ৫৬
লেখিকা : সৈয়দা প্রীতি নাহার
সানির কথাগুলো আদ্রিশার কানের পাশে বাজছে। দ্রুত পা চালিয়ে মুগ্ধদের ঘরের সামনে দাঁড়ালো সে। দরজায় কড়া নাড়তে গিয়েও হাত সরিয়ে নিলো দ্বীধাদ্বন্দে। সানি হাত বাড়িয়ে দরজায় বারি দিলো। আদ্রিশা আশংকা নিয়ে উশখুশ করছে। খানিক পরই দরজা খোলে বেরিয়ে এলো তিথি। গায়ে তার আগের পোশাকই। আদ্রিশা নিজের একটা পোশাক দিয়েছিলো তাকে কিন্তু এখনো কাপড় পাল্টে নি সে। আদ্রিশা উকি দিয়ে ঘরের ভেতরে দেখার চেষ্টা করলো। সানি আদ্রিশাকে সরিয়ে ঘরেই ঢুকে পরলো। তিথি হতভম্ব হয়ে গেলো। ভ্রু কুঁচকিয়ে বললো,
“কি ব্যাপার?”
আদ্রিশা কোনো কথা না বলে গুটি গুটি পায়ে ভেতরে ঢুকলো। খাট খালি দেখে অন্যপাশে মুখ ঘুরাতেই চোখে পরলো সোফায় একটা বালিশ আর কম্বল রাখা। মুগ্ধ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে হকচকিয়ে তাকিয়ে আছে। সানি কোমরে হাত রেখে বললো,
“দেখলি তোর বোকামির পরিণাম! বেচারাকে সোফায় ঘুমোতে হচ্ছে।”
আদ্রিশা টলমল পায়ে মুগ্ধর মুখোমুখি দাঁড়ালো। ভাঙা ভাঙা গলায় বললো,
“সানি ভাইয়া বলছে আপনারা বিজন্যাস পার্টনার। বিবাহিত নন। তা কি সত্যি?”
মুগ্ধ কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বললো,
“হ্যাঁ। সত্যি।”
আদ্রিশা পিছিয়ে গেলো। চোখের কোণে জ্বল ঘর বেধেছে অনেক আগেই। এখন শুধু বয়ে যাচ্ছে। নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,
“তাহলে আমার সাথে লুকোচুরি কেনো? সেদিন বললেন হানিমুনে এসেছেন।”
মুগ্ধ মাথা দুলিয়ে বললো,
“তোমায় ফিরিয়ে নিতে গেলে এতোটুকু লুকোচুরি যে প্রযোজ্য ছিলো।”
আদ্রিশা কপাল কুঁচকালো। সানি ফিসফিস করে বললো,
“এরা কি নিয়ে কথা বলছে?”
তিথি বিরক্তি নিয়ে বললো,
“চুপচাপ শুনুন না। সব জানতে পারবেন। ওদের কথা বলতে দিন।”
মুগ্ধ শান্ত কন্ঠে বললো,
“সেদিন যদি ওবাড়িতে তুমি যেতে আদ্রিশা, তাহলেই সব জানতে পারতে। এতোটা কষ্ট পেতে হতো না আমাদের। আর না বিচ্ছেদ হতো।”
আদ্রিশা কৌতুহলী হয়ে বললো,
“মানে?”
মুগ্ধ পকেটে হাত গুজে দাঁড়ালো। বললো,
“সেদিন তোমার অপেক্ষায় ছিলাম আমি। ভেবেছিলাম তুমি আসবে কিন্তু আসো নি। সবাই কাবিনের তাড়া দিচ্ছিলো। তিথিও সাইন করে কবুল বলে দিয়েছিলো কিন্তু আমি,,,,,,,,,,,,,,
ফ্ল্যাশব্যাক…………
তিথি কলম টা এগিয়ে দিলো মুগ্ধর দিকে। কাজি সাহেব কাবিন পড়ে কবুল বলতে বলেন মুগ্ধকে। মুগ্ধ হাসফাস করছে শুধু। আদ্রিশাকে খুঁজে হয়রান তার চোখ। গলা দিয়ে কোনো শব্দই বেরুচ্ছে না। হাতটাও কাঁপছে খুব। চোখ বন্ধ করে দম নিলো সে। অস্বস্তি হচ্ছে। আদ্রিশার সাথে কাটানো মুহুর্তগুলো ভেসে আসছে বার বার। আদ্রিশার কথা বলা, ঝগড়া, হাসি, কান্না, চলে যাওয়া সবকিছুই ভাবাচ্ছে তাকে। তিথির বান্ধবীরা জোর দিয়ে বললো কবুল বলতে। মুগ্ধ দাঁড়িয়ে গেলো সাথে সাথে। কঠোর গলায় বললো,
“আমি পারবো না। আমি এ বিয়ে করতে পারবো না।”
কথাটা শুনে তিথি শক্ড হয়ে পরে। মনোয়ারা বেগম আশার আলো দেখতে পান। উপস্থিত সবাইই হকচকিয়ে যান। মুগ্ধ করুনার সুর তুলে বললো,
“আমি,,,, আমি আদ্রিশাকে ভালোবাসি। তিথিকে বিয়ে করা অসম্ভব!”
মনোয়ারা বেগম শঙ্কা নিয়ে বলেন,
“এই কথাগুলোই আদ্রিশাকে বলেছিস তুই। তিথিকে ভালোবাসিস বলেই আদ্রিশাকে ডিভোর্স দিলি। এখন আবার আদ্রিশাকে ভালোবাসিস বলছিস?”
মুগ্ধ মাথা ঝেড়ে দৌড়ে মনোয়ারা বেগমের কাছে এসে দাঁড়ায়। কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,
“ফুপি! আমি সত্যি বলছি। আমি আদ্রিশাকে ছাড়া থাকতে পারবো না। আমার এখনই খুব অস্বস্তি হচ্ছে, দেখো। কষ্ট হচ্ছে আমার।”
তিথি কান্নায় ভেঙে পরে। ধমকের সুরে বলে,
“এসব কি বলছো মুগ্ধ? তুমি ওকে ভালোবাসো না বলেই ডিভোর্স দিয়েছো। এখন কেনো এমন করছো? ও তোমার রেসপন্সিবিলিটি আর আমি তোমার ভালোবাসা। আমার সাথে এমন করতে পারো না তুমি!”
মুগ্ধ অপরাধী কন্ঠে বলে,
“ক্ষমা করে দাও তিথি। আমি জানি আমার জন্য তোমরা সবাই কষ্ট পাচ্ছো। কিন্তু এই কষ্টকে বয়ে বেড়ানোর কোনো কারন নেই। আমি পারবো না এটা করতে। আবারও তিনটে জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো!”
তিথি হুংকার দিয়ে বললো,
“কি বুঝবো? কিছু বুঝার জন্য বাকি রেখেছো? কি করে করতে পারছো? আমার চোখের পানির কোনো দাম নেই তোমার কাছে? এতোটা পাষাণ কি করে হয়ে গেলে?”
মুগ্ধ মুখ চেপে ধরে বললো,
“আজ পাষাণ না হলে যে সারাজীবন বেঁচে থেকেও মৃত থাকবো আমি। তুমিও সুখি হবে না আমার সাথে। একবার ভেবে দেখো, আমি সত্যি ওকে ছাড়া বাঁচবো না।”
তিথি স্থির দৃষ্টি রেখে বললো,
“আমাকেও তো একই কথা বলেছিলে!”
মুগ্ধ মাথার পেছনের চুল টেনে ধরলো। গাঢ় গলায় বললো,
“হ্যাঁ বলেছিলাম। কিন্তু তোমার সামনেই বলছি আদ্রিশাকে ছাড়া বাঁচবো না আমি।”
“সেটা তোর আগে ভাবা উচিত ছিলো না মুগ্ধ?”–মালিহা সোফার কোণায় দাঁড়িয়ে বললেন।
মুগ্ধ ছোট্ট শ্বাস টেনে বললো,
“বুঝতে পারি নি আমি। কি থেকে কি হয়ে গেছে বুঝে উঠতেই পারি নি। ওর সাথে এতো গুলো দিন কাটানোর পরও ওকে শুধু রেসপন্সিবিলিটি ভেবে গেছি আমি। কখন আমার মনে জায়গা করে নিয়েছে খেয়ালই করি নি , জানো? হুট করে সে ডিভোর্সের তাড়া দিলো। হিতাহিত জ্ঞান ভুলে গেছিলাম হয়তো তাই ভাবিই নি কিছু। শুধু মনে ছিলো তিথিকে দেয়া কথা। তাকে বিয়ে করে আমার সহধর্মিণী করবো, এই ওয়াদাটাতেই আটকে গেছে আমার ভাবনা। তারপর হঠাৎই আদ্রিশা সব প্ল্যান করে সবাইকে সত্যিটা জানিয়ে দিলো আর নিজে এ বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার ডিসিশন নিলো। ওকে আটকাতে চাইছিলাম! কিন্তু, অধিকার নেই কি না! তাই আবারও হেরে গেলাম! সেদিন থেকে রোজ আদ্রিশাকে ভেবে গেছি আমি। ওর শূণ্যতা, প্রয়োজনীয়তার অভাব বোধ করে গেছি। তখনও ভাবি নি ওকে ভালোবাসি কি না! প্রতিটাদিন ওকে খুঁজে গেছি, ভেবে গেছি নিরবে। কিন্তু আর পারছি না। আমি ফিল করতে পারছি, ওর প্রতি আমার ফিলিংস, আমি ফিল করতে পারছি। এই অস্বস্তি কাটিয়ে ওঠার এক মাত্র পন্থা যে সে।”
তিথি শান্ত কন্ঠে বললো,
“হতেও তো পারে এটা তোমার আবেগ?”
মুগ্ধ মাথা নাড়লো। বললো,
“অবশ্যই পারে। কিন্তু এই আবেগটাই যে আমার চাই। আদ্রিশার প্রতি আমার অনুভুতি যেমনই হোক, আমার ওকেই চাই। ও না থাকায় আমার ঘরটা ফাঁকা লাগে তিথি। শুধু ঘর না, এই বুকটাও ফাঁকা লাগছে খুব! ব্যাথা হচ্ছে। নিশ্বাস নিতে পারছি না। কাঁপুনি দিচ্ছে পুরো শরীরে। ইউ নো হোয়াট, ওকে ভালোবাসি এই কথাটা রিয়েলাইজ করতেই খুশি লাগছে আমার। আমার অন্যরকম অনুভুতি হচ্ছে। তিথি, তুমি আমার সামনে, স্টিল আমি অন্য একটা মেয়েকে ভাবছি। তোমার কি মনে হয় না এটা ভালোবাসা? তোমায় দেয়া ওয়াদার জন্যই কিছু না ভেবেই ওকে ডিভোর্স দিয়েছি । তোমার কি মনে হয় না, তোমায় দেয়া ওয়াদাই আমার রেসপন্সিবিলিটি ছিলো? আজ তোমার আমার বিয়ে, অথচ আমি খুশি হতে পারি নি। আদ্রিশার নামটা নিতেই মন উৎফুল্ল হয়ে উঠছে। তোমায় ভালোবাসার পরও আদ্রিশাকে বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু আজ আদ্রিশাকে ভালোবেসে তোমায় ওর জায়গায় বসাতেই পারছি না। মেনে নিতে বাধছে আমার!”
তিথি লম্বা শ্বাস টানলো। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
“ওর ভালোবাসা আমার ভালোবাসা থেকে জিতে গেলো? আমার ভালোবাসা তোমার কাছে তুচ্ছ?”
মুগ্ধ মাথা নত করলো। তিথি তাচ্ছিল্য মাখা হাসি হাসলো। আসরাফ খানের দিকে তাকিয়ে বললো,
“বাবা, হিস্ট্রি রিপিট ইটসেল্ফ! বুঝতে পারছো? যা কখনো তুমি মনোয়ারা আন্টির সাথে করেছিলে আজ কিন্তু সেটাই আমি ফিরে পাচ্ছি।”
আসরাফ খান এতোক্ষন নির্বাক ছিলেন। এখন ছল ছল চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন। তানিয়া খানও মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। পুরো ঘটনায় শওকত শাহ দর্শকের কাতারে ছিলেন। তিথি চোখ মুছে মুগ্ধর উদ্দেশ্যে বললো,
“আমি আদ্রিশার মতো বড় মনের মানুষ নই মুগ্ধ। যে চাইলেই তোমায় ওর কাছে ফিরিয়ে দেবো। আমি পারবোনা। তুমি যেমন ওকে ছাড়া থাকতে পারবে না তেমনি আমিও তোমায় ওর কাছে ফিরিয়ে দিতে পারবো না। তবে আদ্রিশার হক, অধিকার তো ফিরিয়ে দিতেই হবে। সেটা তো জোর পূর্বক কেড়ে নিতে পারি না! আর তোমার স্ত্রী হওয়ার, তোমায় ভালোবাসার এবং তোমার ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার তার আছে। আমি তাকে বঞ্চিত করতে পারি না। তুমি ওকে ভালোবাসো, সে তোমায় ভালোবাসে মাঝখানে আমিই,,,,, থাক কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, নিয়ে এসো ওকে।”
আসরাফ খান অস্বাভাবিক গলায় বললেন,
“তিথি মা তুই,,,?”
তিথি জোরপূর্বক হেসে বললো,
“বাবা! ঐ মেয়েটা যা করেছে তা তো ফেরত দিতেই হবে বলো! আর তাছাড়া আজ যদি এই বিয়েটা হয় তবে না আমি সুখি হবো আর না মুগ্ধ। আদ্রিশাও সুখি হবে না। তিনটে জীবন শেষ হয়ে যাবে। হয়তো এই ভুল শোধরানো যাবে না আর। এখন যখন সুযোগটা আছে তখন সঠিক বিবেচনা করাই উচিত।”
সবাই চুপ করে গেলেন। মনোয়ারা বেগমের চোখে খুশির ঝিলিক। মালিহাও খুশির অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছেন। শওকত শাহ আসরাফ খানের দিকে দুহাত জড়ো করে দাঁড়ালেন। আসরাফ খান বন্ধুর হাতে হাত রেখে চোখের ইশারায় তাকে আশ্বস্ত করলেন। মুগ্ধ বার দুই আদ্রিশাকে ফোন করে। কিন্তু ফোন বন্ধ বলছে। বাধ্য হয়েই গাড়ি নিয়ে ছুটে যায় আদ্রিশার বাড়ি।
চলবে,,,,,,,,
যদি আমার হতে🌹
পর্ব – ৫৭
লেখিকা : সৈয়দা প্রীতি নাহার
মুগ্ধ হন্তদন্ত হয়ে আদ্রিশাদের বাড়ি পৌঁছলো। কলিং বেলে চাপতে লাগলো অনবরত। শ্বাস প্রশ্বাস বেড়ে দ্বিগুন। মনে হচ্ছে এক্ষুনি আদ্রিশাকে হারিয়ে ফেলবে। রুমানা আহমেদ দৌড়ে এসে দরজা খুলে মুগ্ধকে দেখে চমকপ্রদ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। মুগ্ধ ভয়ার্ত চেহারায় বললো,
“মা! আদ,,, আদ্রিশা কোথায়? ও,,, ওকে ডেকে দিন না!”
রুমানা আহমেদ ছোট্ট শ্বাস ফেলে বললেন,
“কেনো? ও না গেলে কি তুমি তিথিকে বিয়ে করবে না? আমার মেয়েটাকে কষ্ট দিয়ে কি সুখ পাও তোমরা? যা চেয়েছিলে সব তো দিয়েছেই, আর কি চাইছো? ও মরে যাক! ওকে ক্ষত বিক্ষত করে আনন্দ করবে তোমরা?”
মুগ্ধ অপরাধী কন্ঠে বললো,
“আপনি ভুল বুঝছেন মা! আমি,,,,”
মুগ্ধর কথার মাঝেই হামিদুর আহমেদ বলে উঠেন,
“ভুল বুঝেছিলাম! ভুল বুঝেই তোমার হাতে আমার একমাত্র মেয়েটাকে তুলে দিয়েছিলাম। তুমি তার প্রতিদান এ ভাবে দেবে ভাবি নি।”
মুগ্ধ রুমানা আহমেদকে অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করলো। কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,
“বাবা! আমি জানি আমি ভুল করেছি। আর তাই সে ভুল শোধরাতেই এখানে এসেছি। প্লিজ আপনারা আদ্রিশাকে ডেকে দিন একবার!”
রুমানা আহমেদ গম্ভীর গলায় বললেন,
“তোমার বিয়ে মুগ্ধ। বাড়ি যাও। হবু স্ত্রীকে ফেলে এভাবে অন্য মেয়েকে খোঁজা উচিত নয় তোমার। আদ্রিশাকে ডাকা সম্ভব নয়।”
মুগ্ধ কপালে ডান হাতে স্লাইড করে বললো,
“আমি এ বিয়ে করছি না!”
হামিদুর আহমেদ ভ্রু কুঁচকালেন। রুমানা আহমেদ গোল গোল চোখে দেখছেন মুগ্ধকে। মুগ্ধ কারো প্রতিক্রিয়ার পরোয়া না করে নিজ থেকে বলতে লাগলো,
“আমি এ বিয়ে করতে পারবো না। আমি আদ্রিশাকে ভালোবাসি।”
রুমানা আহমেদ মুখ হা করে আছেন। মুগ্ধ মাথা দুলিয়ে বললো,
“হ্যাঁ, আদ্রিশাকে! তিথিকে ভালোবাসতাম আমি। কিন্তু আদ্রিশার সাথে থাকতে থাকতে কখন সে আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে জানি না। অভ্যাস থেকে ধীরে ধীরে প্রয়োজন, তারপর প্রিয়জন! ওকে ছাড়া এক মুহুর্তও থাকা যাচ্ছে না। আপনাদের সামনে এসব বলা হয়তো ঠিক দেখাচ্ছে না তবে এটাই সত্যি। আমি ভেবেছিলাম আদ্রিশা আমার রেসপন্সিবিলিটি! কিন্তু বুঝে উঠতে পারি নি যে তিথিকে দেয়া কথাটাই আমার রেসপন্সিবিলিটি ছিলো। আমি ভেবে গেছি আমায় তিথিকে বিয়ে করতে হবে অথচ জানতাম না আমি কিভাবে আদ্রিশাকে ভালোবেসেছি। তিথির চিন্তায় এতোটাই বিভোর ছিলাম যে খেয়ালই করি নি আমার মনে অন্য কেউ ঘর বেঁধেছে। আজ যখন বুঝতে পারলাম আমি ওকে হারিয়ে ফেলছি তখন আর নিজেকে বুঝানোর সময় পাই নি। সামলানোও দুষ্কর! ওর শূণ্যতা আমায় স্থির থাকতে দিচ্ছে না।”
হামিদুর আহমেদ তিক্ত গলায় বললেন,
“সেটা আগে ভাবা উচিত ছিলো। ডিভোর্সের সময় মনে পড়ে নি আদ্রিশা হারাচ্ছে কি না?”
মুগ্ধ হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে বললো,
“তখন তিথির দায়িত্ব কাধে ছিলো! একজন কে পেতে গিয়ে আন্যজনকে ফেলে দিতে পারি নি আমি। গত কদিন থেকে এটাই বুঝার চেষ্টা করছিলাম কি করছি আমি! কেনো করছি? অজান্তেই নিজেকে বুঝিয়ে গেছি এ বিয়েটা করতে হবে। পিছু হাটলে হবে না আমার। কিন্তু শেষ অব্দি আর পারি নি। এ কদিনেই নিজেকে পাগল পাগল লাগছে। সারাজীবনের জন্য পাগল হতে রাজি নই আমি। আর তিথিও সব মেনে নিয়েছে। প্লিজ আপনারা একটু বুঝুন! আদ্রিশার সাথে একটু কথা বলতে দিন।”
রুমানা আহমেদ তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
“সেটা আর সম্ভব নয় মুগ্ধ।”
মুগ্ধ গাঢ় গলায় বললো,
“কেনো সম্ভব নয়? দেখুন আগে ওর সাথে কথা বলতে দিন। আমায় ওকে বুঝাতে দিন সবটা। ও বুঝবে।”
হামিদুর আহমেদ কড়া গলায় বললেন,
“না! আদু কিছুই বুঝবে না। আমরা আদুকে বলেছিলাম তোমাদের সম্পর্কটা যদি বাঁচানো যায়, আমরা চেষ্টা করবো। কিন্তু সে মানে নি। উত্তরে বলেছিলো, সে ফিরতে চায় না তোমার কাছে। আবারও যদি তুমি তার থেকে সরে আসতে চাও সে নিজেকে সামলাতে পারবে না।”
মুগ্ধ আত্মবিশ্বাস নিয়ে বললো,
“এমন কোনো পরিস্থিতি আসবে না। আমি কথা দিচ্ছি। আদ্রিশাকে আমার জীবন থেকে কেউ সরাতে পারবে না। সয়ং সে নিজেও না। অনেক তো বিশ্বাস করলেন আরো একবার করুন। বিশ্বাসঘাতকতা করবো না আমি।”
পেট হাত দিয়ে সোফার কোণায় এসে দাঁড়ালো জেসমিন। ঠোঁট কামড়ে বললো,
“আপনি যে দেরি করে ফেললেন মুগ্ধ ভাইয়া।”
মুগ্ধ হতবিহ্বল হয়ে বললো,
“দেরি মানে? আমি তো বিয়ে করি নি এখনো। আর তিথিও সরে এসেছে। তাহলে দেরি কেনো হবে?”
জেসমিন করুন গলায় বললো,
“আদু যে চলে গেছে। ও আর ফিরতে চায় না এখানে। অনেক দূরে চলে গেছে।”
মুগ্ধর বুক মোচড় দিয়ে উঠে। সরু চোখে তাকিয়ে বলে,
“কোথায় গেছে আদ্রিশা? ভাবি প্লিজ বলুন না!”
রুমানা আহমেদ ঝংকার দিয়ে বলেন,
“যেখানেই গেছে ফিরে আসার জন্য যায় নি মুগ্ধ। আমরা তোমাকে বলতে পারবো না সে কোথায়। শুধু জেনে রাখ আদু এদেশে নেই।”
মুগ্ধ হাটু গেড়ে বসে পড়লো মেঝেতে। হামিদুর আহমেদ পেছনে হাত বেধে বললেন,
“ওকে খুঁজে লাভ নেই। পাবে না। আর তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে শুধু মাত্র তুমি ওকে ভালোবাসো বলেই তাকে ফিরিয়ে আনার কোনো চেষ্টা আমরা করবো না।”
মুগ্ধ স্থির দৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে বললো,
“আদ্রিশাও তো আমায় ভালোবাসে!”
রুমানা আহমেদ শ্বাস টেনে বললেন,
“হয়তো! কিন্তু আমরা তাকে জোর করতে পারি না। আর না তোমার হাতে তুলে দিতে পারি। জীবনটা তার। একবার তার মতামত না জেনেই অনেক ক্ষতি করেছি মেয়েটার। আর না। এবার যা সিদ্ধান্ত নেয়ার আদু নিজেই নেবে।”
মুগ্ধ হালকা হেসে উঠে দাঁড়ালো।
“তাহলে, ওকে সে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ দিন। ওকে জানান সবটা। তারপর সে যা চায় তেমনটাই হবে। ও না চাইলে আমি ওর প্রতি কোনো দাবি নিয়ে আসবো না।”
হামিদুর আহমেদ চোখ বুজে শ্বাস টানলেন। স্থির চোখে তাকিয়ে বললেন,
“আমি তা চাই না।”
মুগ্ধ বিস্ফোরিত চোখে তাকালো। হামিদুর আহমেদ জিব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললেন,
“আমি চাই আমার মেয়েটা সুখে থাকুক। আর তাই যা করার সব তুমি করবে। আদ্রিশা কোথায়, কি করছে, ফোন নাম্বার, ঠিকানা কিছুই আমরা বলবো না তোমায়। আর না আদ্রিশাকে জানাবো তোমার বিয়ে ভাঙার কথা। দুজনেই অনেক দৌড়িয়েছো আমাদের। হাঁপিয়ে উঠেছি আমরা। এখন একটু বিশ্রামের প্রয়োজন। সুতরাং, আদ্রিশাকে খুঁজে বের করা, মানানো, ফিরিয়ে আনা সবটা তোমার উপর নির্ভর করছে। আর কিভাবে তাকে খুঁজবে সেটাও তোমার উপর নির্ভর করে। আমি তো আমার মেয়েকে চিনি। গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, অনায়াসে ফিরবে না সে! খুব খাটাবে সবাইকে। যেহেতু শেষটা সবার জানা তাই আমরা রিলেক্স করি! কি বলো? তোমরা দেখো কি করবে!”
মুগ্ধ রুদ্ধ গলায় বললো,
“এসব কি বলছেন আপনি? আদ্রিশা এদেশে নেই। কোথায় আছে জানি না। যোগাযোগ করার রাস্তা নেই। কবে তাকে পাবো, কিভাবে মানাবো কিছুই তো জানি না। আর আপনি বলছেন সব আমার উপর নির্ভর করছে?”
“অবশ্যই! এখন যদি তোমায় বলে দি আদু কোথায়, তাহলে তুমি সেখানে যাবে, তাকে মানাবে আর উল্টো দিকে আদু! সে চলে আসবে ভাবছো? নাহ! ফিরবে না সে। তোমার থেকে আরো দূরে চলে যাবে। ধরা ছুয়ার বাইরে! আমাদের কোনো কথাই তখন তার কাছে গ্রহণ যোগ্যতা পাবে না। তাই তোমায় বলছি, যা করার নিজ থেকে করো। কিছু সময় যাক। তাহলে হয়তো কষ্টটা বাড়বে রাগের থেকে। অভিমানের থেকে! কষ্ট বাড়লে ফট করে রাগ গলে জল। কিন্তু রাগ, অভিমান বাড়লে কষ্টটাকে চাপা দিয়ে অনেক কিছু সহ্য করা সম্ভব।”
মুগ্ধ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
“তাহলে আপনি বলছেন, আগে দূরে থাকার যন্ত্রণা উপলব্ধি করতে? হারিয়ে ফেলার ভয় পেয়ে তাকে খুঁজতে? আর,,,, ”
“আর ফিরিয়ে আনার জেদ ধরে রাখতে। যা সারাজীবনেও সমাপ্ত হবে না!”
হামিদুর আহমেদের কথায় মুগ্ধ লম্বা শ্বাস টেনে নিলো। ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে এগুতে নিলেই আরিয়া পেছন থেকে ডেকে উঠলো,
“ফুপাই?”
মুগ্ধ মুখ ঘুরিয়ে দেখলো তার দেয়া পুতুলটাকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। মুগ্ধ হাত বাড়িয়ে ডাকতেই ছুট্টে চলে এলো কাছে। গম্ভীর গলায় বললো,
“ফুপ্পি চলে গেছে, তুমিও চলে যাবে?”
মুগ্ধ মুচকি হেসে নিচু হয়ে বললো,
“না গেলে তোমার ফুপ্পিকে ফিরিয়ে আনবো কিভাবে?”
আরিয়া চোখ চিকচিক করে তাকালো। মুহুর্তেই মুখ কালো করে বললো,
“ফুপ্পি যে বললো, জিততে যাচ্ছে! তুমি ফিরিয়ে আনলে হেরে যাবে না?”
মুগ্ধ আরিয়ার গাল টেনে বললো,
“তাকে তো হারতে হবে সোনা। আর আমাকে জিততে হবে।”
আরিয়া মুগ্ধর কথার কিছু বুঝলো না। ভ্রু কুঁচকে বললো,
“তোমরা কি গেইম খেলছো? ফুপ্পিও জিততে চায় আর তুমিও? ফুপ্পি বললোও না কি জিতবে?আচ্ছা তুমি কি জিতবে ফুপাই? বলোনা! চকোলেট?”
মুগ্ধ নিঃশব্দে হাসলো, প্রাণহীন হাসি। তারপর বললো,
“না মামনি, আমি আমার জীবনের সব থেকে প্রেসিয়াচ গিফ্ট জিতবো। তোমার ফুপ্পিকে! আদ্রিশাকে জিতে তাকেই হারিয়ে দেবো আমি। আমার কাছে হার স্বীকার করতেই হবে তার। শাস্তি স্বরুপ মনের জেলখানায় যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হতে হবে।”
শেষের কথাগুলো খুব আস্তে করে বললো মুগ্ধ। চোখের কোনে জমা জল আঙুলে মুছে আরিয়ার কপালে উষ্ণ পরশ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। সবার উদ্দেশ্যে মৃদু হেসে প্রস্থান করলো সে। এখন যে অনেক কাজ বাকি তার। আদ্রিশাকে খুঁজতে হবে। নিজের করতে হবে।
বর্তমান…………
মুগ্ধর কথাগুলো শুনে তটস্থ হয়ে গেছে সানি। তিথি পায়ের আঙুল দিয়ে মেঝে খুড়ছে। আদ্রিশা নিঃশব্দে কাঁদছে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মুগ্ধর দিকে। এতো কিছু হয়ে গেছে ঐ এক রাতে আর সে কিছুই জানে না! সেদিন রাতে তো সে ভেবেছিলো সব শেষ, আসলে তো সেদিনই সব শুরু হয়েছে। নতুন জীবনের শুরুর পরিকল্পনা তো সেদিনই হয়েছে।
চলবে,,,,,,,,,,,,,,,