Home "ধারাবাহিক গল্প "যেখানে মন ভেজে চুপচাপ যেখানে মন ভেজে চুপচাপ পর্ব-১১

যেখানে মন ভেজে চুপচাপ পর্ব-১১

0
1

#যেখানে_মন_ভেজে_চুপচাপ
#পর্ব_১১
#লেখনিতে_খুশবু_আকতার

কাউকে কোন আগামবার্তা না দিয়েই আজ হঠাৎ করে মনির সাহেব এলেন। ওনার আসার খবর মৃত্তিকা জানে না। উনি দেখা করতে এসেছেন সমীরণের বাবার সাথে। সমীরণের বাড়িতে মৃদুলের সাথে এলেন।

সাদ্দাম হোসেন তখন মনির সাহেবের সাথে গল্প গুজবে ব্যস্ত। সমীরণ নিজেই গেল সবার জন্য চা বানাতে। রান্নাবান্নার ব্যাপারে সমীরণ নিজেও বেশ অভিজ্ঞ। তাড়াহুড়ো করে চা বানিয়ে বসার ঘরে এল। খুব কৌতুহল হচ্ছে জানার জন্য যে মনির সাহেব কি এমন বলার জন্য এতদূর ছুটে এসেছেন তাও আবার সমীরণের বাবার কাছে। কি এমন কথা থাকতে পারে ওনার?

চায়ের কাপগুলো টেবিলের উপর রেখে সমীরণ মৃদুলের পাশে বসে পড়ল। খুব জলদি বুঝতে পারল মনির সাহেবের এখানে আগমনের কারণ।

“মাস্টার সাহেব, মেয়ের তো বিয়ের বয়স হয়ে এল। কিন্তু মেয়ে আবার বিয়ে করতে চায় না। এখন ওর কথা শুনলে তো চলবে না। একটা ভালো সম্বন্ধ এসেছে। ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। ওখানেই পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করছে এখন। ছেলের বাবা আপনার হাইস্কুলের হেডমাস্টার। তাই আপনার থেকে একটু খোঁজখবর নিতে এলাম। আসলে এসব ব্যাপারে নিজের মানুষ ছাড়া তো কাউকে বিশ্বাস করা যায় না। আপনি তো আর আমাদের মিথ্যে আশ্বাস দেবেন না, সেসব জেনেই এসেছি।”

ব্যাপারটা মৃদুল এর জন্যও একেবারে নতুন। মৃত্তিকার জন্য যে সম্বন্ধ দেখা শুরু করেছে এই ব্যাপারে মৃদুল কিছু জানেই না। অবশ্য ওকে না জানানোর কারণ আছে। কেননা জানে মৃদুল জানলে বাঁধা দেবে। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার সমীরণের দিকে তাকাল। মৃদুল আশা করেছিল ছেলেটার মুখ শুকনো দেখাবে, চোখে মুখে এক ঘোর অমানিশা নেমে আসবে কিংবা হয়ত অস্থির হয়ে উঠবে। তবে তেমন কিছুই হয়নি। বরং ভীষণ শান্ত দেখাল সমীরণ কে।

মৃদুল অনেকটা সময় নিয়ে সমীরণের দিকে তাকিয়ে রইল ওর অভিব্যক্তি বোঝার জন্য। তবে বিন্দুমাত্র কোন পরিবর্তন টের পেল না। যেমন শান্ত শুরুতে ছিল এখনো ঠিক তেমন শান্তই দেখাচ্ছে। মৃদুলের ধ্যান ভাঙল সাদ্দাম হোসেনের কন্ঠে,

“হ্যাঁ শুনেছিলাম যে স্যারের ছেলে নাকি অস্ট্রেলিয়া থেকে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করছে। কিছুদিন আগে তো ছেলের চাকরি হওয়ার মিষ্টিও খাওয়ালেন আমাদেরকে। উনি মানুষ ভীষণই ভালো। তবে ভাইজান, ওনার পরিবার সম্বন্ধে তো ঠিক বলতে পারছি না। না ওনার ছেলেকে কখনো দেখেছি, না তার সাথে মিশেছি। কিন্তু মেয়েকে এতদূর পাঠিয়ে দেবেন! একমাত্র আদরের মেয়ে আপনাদের থাকতে পারবেন তো?”

মনির সাহেব আলতো হাসলেন।

“নিজেদের কথা ভেবে তো আর মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছেলে খেলা করতে পারি না মাস্টার সাহেব। ছেলে ভালো, শিক্ষিত, ভালো চাকরিও করে, পরিবারও ভালো। এত ভালো সম্বন্ধ পাওয়াই তো কঠিন আজকাল।”

পাশ থেকে মৃদুল বলে উঠল,

“কি দরকার চাচা অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর? দেশে কি ভালো ছেলের অভাব পড়েছে নাকি! মৃত্তিকা কখনোই এই বিয়েতে রাজি হবে না। এত দূর ওকে পাঠানোর কোন প্রয়োজনও নেই। ও থাকতেই পারবে না আমাদের ছাড়া। কাছেই কোন সম্বন্ধ দেখো।”

“অনেকদিন থেকেই তো কাছেই সম্বন্ধ দেখছি। কিন্তু ভালো কোন পাত্র পাচ্ছি না। একটা অবশ্য পেয়েছি ছেলে। আমাদের পাশের গ্রামেই থাকে। সরকারি চাকরি করে। তবে সমস্যা হলো ছেলের পরিবারে কেউ নেই। মা সেই ছোটবেলায় মা রা গিয়েছিল। বাবা তিন বছর হলো মা রা গেছে। ভাই, বোন কেউ নেই। এমন বাড়িতে মেয়ের বিয়ে দেব না। আমার মেয়েটাকে একটা পরিবারের মাঝে ফেলতে চাই আমি। আর যে ছেলের মাথার ওপরে কোন অভিভাবক নেই, বিশেষত যে ছেলে মায়ের শিক্ষা পায়নি সে ছেলেকে নিয়ে একটু সন্দেহ রয়েই যায় মনে। একটা সন্তানের বড় হওয়ার পেছনে মায়ের শাসন আর আদর দুটোই যে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই ওই সম্বন্ধ ফিরিয়ে দিয়েছি।”

সাদ্দাম হোসেন আড়চোখে একবার তাকালেন নিজের ছেলের দিকে। ছেলের এমন স্বাভাবিক শান্ত রূপ দেখে তিনি নিজেও একটু চিন্তিত হলেন। অন্যদিকে মৃদুল নিজেই একেবারে অস্থির হয়ে উঠেছে। মনির সাহেবের শেষোক্ত কথাগুলো একদম পছন্দ হলো না। বিরক্তিকর গলায় বলল,

“আহ্ চাচা কি বলছো এসব? মা না থাকলে সেই ছেলে মানুষ হয় না কে বলল? আমাদের সমীরণ মানুষ হয়নি? ওর মতন ভদ্র ছেলে আর দুটো খুঁজে পাবে তুমি?”

“আহা এর মাঝে আমাদের সমীরণের কথা কোত্থেকে আসছে। সবাই তো এক হয় না। সমীরণকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য ওর বাবা ছিল। আমাদের সমীরণের তুলনা কারো সাথে হয়ই না। বাকিরা তো আর সমীরণের মতন হবে না।”

মৃদুল আবারো কিছু বলে উঠতে ধরলে সমীরণ ঝারি মেরে ওকে থামিয়ে দিয়ে মনির সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“চাচা, একদমই ঠিক বলেছেন আপনি। একটা সন্তানের বড় হয়ে ওঠার জন্য মায়ের প্রয়োজন অনেক। মা না থাকলে ঠিকঠাক শিক্ষা পায় না সন্তানেরা। আর আপনি একদমই ঠিক বলেছেন একটা ভালো পরিবার দেখে মৃত্তিকার বিয়ে দিতে হবে। যৌথ পরিবারে থেকে ওর অভ্যাস। একা একা থাকতে পারবে না। ছেলেটা অস্ট্রেলিয়ায় থাকে, সেখানে চাকরি করে, অনেক ভালো পরিবার। মৃত্তিকা যতই আপত্তি করুক না কেন, সব ঠিক থাকলে সম্বন্ধটা পাকা করে ফেলুন।”

এতক্ষণে মনির সাহেব একটু শান্তি পেলেন। যাক অন্তত কেউ একজন ওনার কথায় সহমত পোষণ করেছেন।

“তোমার মতন বুঝদার ছেলে এই যুগে খুঁজে পাওয়া সত্যিই বিরল। তোমার বন্ধুকে একটু তোমার মতন বুঝদার বানাও তো, সমীরণ। রিটায়ারমেন্টের পর ছেলের বাবা মাও অস্ট্রেলিয়া চলে যাবে। ছেলের বোন, দুলাভাই আগে থেকেই ওখানে থাকে। এত ভালো সম্বন্ধ হাতছাড়া করার কোন প্রশ্নই আসে না।”

সমীরণ মৃদু হেসে সম্মতি জানিয়ে বলল,

“একদমই ঠিক বলেছেন। এত ভালো সম্বন্ধ হাতছাড়া করা যায় না।”

____________

মনির সাহেব আর মৃদুল চলে গেছে অনেকক্ষণ আগে। সাদ্দাম হোসেন রাতের রান্নাবান্না শেষ করে টেবিলে খাবারগুলো গুছিয়ে সমীরণকে ডাকলেন। মিনিট দু-তিনেক ওর সমীরণ এল। চেয়ার টেনে বসে নিজের প্লেটে খাবার বেড়ে নিয়ে সাদ্দাম হোসেনের প্লেটেও খাবার বেড়ে দিল। তরকারিটাও নিজেই বেড়ে দিল। তরকারি বেড়ে নেওয়া শেষে খাওয়া শুরু করল।

চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে তো খেয়েই যাচ্ছে। এক ফাঁকে রান্নার প্রশংসাও করলো আবার। সাদ্দাম হোসেন আড়চোখে বেশ কয়েকবার ছেলেকে খেয়াল করলেন। এখনো ছেলের মাঝে কোন পরিবর্তন দেখা যায়নি। প্রতিদিন যেমন থাকে তেমনি দেখাচ্ছে। একপর্যায়ে গিয়ে তিনি নিজেই আর চুপ থাকতে পারলেন না। জিজ্ঞেস করেই বসলেন,

“ঠিক আছিস তুই?”

“কেন কি হয়েছে আমার? ঠিক না থাকার কথা ছিল নাকি?”

সমীরণ এমন ভাবে প্রশ্নটা করল যেন বুঝতেই পারছে না সাদ্দাম হোসেন কোন ইঙ্গিতে ওকে কথাটা জিজ্ঞেস করেছেন। বরং সমীরণের কাছে ওনার করা এই প্রশ্নটা ভীষণই অপ্রাসঙ্গিক লেগেছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য সাদ্দাম হোসেন নিজের খাওয়াটা থামিয়ে বললেন,

“আমি তোর বাবা। ছোটবেলা থেকে একা হাতে বড় করেছি তোকে। তোর হাসির মানে, তোর কান্নার মানে, তুই কোন কথায় কিংবা কোন কাজে ভালো থাকতে পারিস, আবার কোন কথায় কিংবা কোন কাজে খারাপ থাকতে পারিস সবকিছু সম্বন্ধে আমি খুব ভালো করে অবগত।”

সাদ্দাম হোসেন আরো কিছু বলে ওঠার আগেই সমীরণ চট করে বলে উঠল,

“মৃত্তিকাকে আমি পছন্দ করি না।”

সাদ্দাম হোসেন হো হো করে হেসে উঠে বললেন,

“আমি কি তোকে একবারও মৃত্তিকা কে পছন্দ অপছন্দ করার কথা জিজ্ঞেস করেছি? চোর নিজে নিজেই ধরা পড়ে গেল ব্যাপারটা এমন হয়ে গেল না?”

একটু বিব্রত হলো সমীরণ। সে বিব্রত ভাবটা বিরক্তির আড়ালে ঢাকার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে বলল,

“আহ্ আব্বু! কি যা তা কথা বলছো বলতো? খেতে দাও।”

“আমি তোর বাপ রে। আমার থেকে কিছু লুকোনোর চেষ্টা করা অত সহজ নয়। মানুষ কখন এত শান্ত হয়ে যায় জানিস? অতি আশ্চর্যজনক কোন বিষয়ের সাক্ষী হওয়ার পরও মানুষ কখন সেই ব্যাপারটাকে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে নেয় জানিস?”

এই প্রশ্নের উত্তরটা সমীরণের নিজেরও জানার খুব ইচ্ছে। ও নিজেও বুঝতে পারছে না কিভাবে এতটা স্বাভাবিক আছে ও। কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কখন?”

“কোন ব্যাপার যখন আমাদের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়, কোন দুঃখ যখন আমাদেরকে আঘাত করতে করতে আমাদের শরীরটাকে অবশ করে ফেলে তখন। একটা সময় গিয়ে সেই কষ্টের ভার আর আমরা অনুভব করতে পারিনা। সেই কষ্টগুলো একসময় আমাদের কাছে ডাল ভাতের মতন হয়ে যায়। শোন বাবা, এই পৃথিবীতে থাকার জন্য তোর হৃদয় ঠিক কতটা কঠিন এটা প্রমাণ করার কোন প্রয়োজন নেই। যদি তোর হৃদয় নরম হয় তবে হোক। ক্ষতি তো নেই। জোর করে কেন সেই বিষয়গুলো নিজের ওপরে চাপিয়ে দিচ্ছিস, যা না তোর হৃদয় চায়, না তোর মস্তিষ্ক।”

একেবারে নীরব হয়ে গেল সমীরণ। খাবারের থালায় এঁটো হাতটা অমনি পড়ে রইল। তবে খাবারগুলো আর মুখে দেওয়া হলো না। দীর্ঘ একটা সময় নিয়ে বিজ্ঞের ন্যয় সমীরণ কোন জটিল হিসেব কষলো। অতঃপর আনমনে হেসে ফেলল। দৃষ্টি তুলে সাদ্দাম হোসেনের দিকে তাকাল,

“আমি কখনো আমার মায়ের অভাব বোধ করিনি, আব্বু। আমার কখনো মনে হয়নি যে মা না থাকায় আমার জীবনের অমুক অংশটা অনেকটা জটিল হয়েছে কিংবা মায়ের অনুপস্থিতির কারণে আমার জীবনের তমুক গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় হারিয়ে গেছে। তবে আজ অপ্রত্যাশিতভাবে হঠাৎ করে অনুভব করলাম মায়ের অনুপস্থিতির কারণে খুব বড় একটা শূন্যতা রয়েছে আমার জীবনে। আমার দিকে আঙ্গুল তোলার খুব বড় একটা সুযোগ মা না থাকার জন্য তৈরি হয়েছে, তাই না?”

“আমি কথা বলি মনির ভাইয়ের সাথে!”

সমীরণ তড়িৎ গতিতে আপত্তি জানিয়ে বলল,

“কক্ষনো না। তুমি শুনলে না চাচা কি বলে গেলেন? এমন বাড়িতে উনি মেয়ের বিয়ে দেবেন না যে ছেলের পরিবার নেই। এমন ছেলেকে উনি বিশ্বাস করেন না যে ছেলের শিক্ষায় মায়ের কোন ভূমিকা নেই।”

“কিন্তু উনি তো এটাও বললেন যে তুই আলাদা, তোকে বিশ্বাস করে।”

সমীরণ ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“ভাতিজার বন্ধু হিসেবে। মেয়ের জামাই হিসেবে নয়। তুমি সম্বন্ধ পাঠানোর পর আজেবাজে কথা বলে যদি ওরা সম্বন্ধটা ফিরিয়ে দেয় কিংবা তোমায় অপমান করে সেই কষ্ট আমি সহ্য করতে পারব না আব্বু। তোমাকে আমি কোন কষ্ট পেতে দেখতে চাই না। আর আমি ঠিক আছি। এসব পাগলাটে অনুভূতি কয়েকদিন যন্ত্রণা দেয়। তোমার পাগল ছেলে আবার ঠিক হয়ে যাবে। আমি শুধু চিন্তায় আছি ওই পাগল মেয়েটার জন্য।”

কথাগুলো বলে সমীরণ খাবার শেষ না করেই উঠে চলে গেল। সাদ্দাম হোসেন ডাকলেন না ছেলেকে। নিজেই আনমনে হেসে বিড়বিড় করলেন,

“এই পাগলাটে অনুভুতি কয়েকদিন যন্ত্রণা দেয় না, বাবা। সারাজীবন যন্ত্রণা দেয়। বুঝবি। যখন এই যন্ত্রণার মাঝে পড়বি তখন বুঝবি।”

__________

আজ তিন দিন হতে চলল সমীরণের সাথে ঠিক মত দেখাও হয়না, কথায়ও হয় না মৃত্তিকার। শুরুতে দু দিন তো সমীরণ ভার্সিটিতেই আসেনি। আজ এসেছিল। মৃত্তিকা একবার দেখাও পেয়েছিল। সর্বোচ্চ এক মিনিট ওদের কথা হয়েছে তাও মৃত্তিকার জন্য। জোর করে করে যেন কথা বের করতে হচ্ছিল সমীরণের মুখ থেকে। টুকটাক দু একটা কথা হওয়ার পরে সমীরণ ব্যস্ততা দেখিয়ে বেরিয়ে গেছে ভার্সিটি থেকে।

মৃত্তিকা বুঝে উঠতে পারছে না হঠাৎ করে সমীরণ এমন করছে কেন। এর আগেও মৃত্তিকাকে নিজের থেকে দূরে থাকতে বলেছে সমীরণ। তবে কখনো এমন করেনি। নিজে কখনো দূরত্ব তৈরি করার চেষ্টা করেনি। তবে কি পাকাপোক্ত ভাবে মৃত্তিকাকে দূরে ঠেলে দেওয়ার ব্যবস্থা করে নিল!

পরেরদিন সকাল সকাল ভার্সিটি এল মৃত্তিকা। যেন সমীরণ এলেই ওর সাথে দেখা হয়। জোর করে হলেও কথা বলবে আজ। বকবে তো মৃত্তিকা কে, বেশ বকুক। সব সহ্য করে নেবে মৃত্তিকা। তবে কথা বলবেই। সেই সাথে ওকে এত অবহেলার কারণও জিজ্ঞেস করবে।

অপেক্ষা করতে করতে সমীরণ এল। আজ বাইক ছাড়া এসেছে। ভার্সিটির গেট দিয়ে হেঁটে হেঁটে ওকে ঢুকতে দেখে মৃত্তিকা দৌড়ে গেল ওর দিকে। হঠাৎ করে সামনে এসে দাঁড়ানোতে সমীরণ খানিকটা হকচাকাল।

“তুমি কথা বলছো না কেন আমার সাথে?”

সমীরণ নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে বলল,

“কথা বলবো না কেন? এইতো বলছি।”

“আমাকে ইগনোর করছো তুমি, তাই না?”

“যদি তেমনটা মনে হয় তাহলে ভেবে নে বিরক্ত করছিস তাই ইগনোর করছি।”

“কিছু হয়েছে? তুমি তো এমন করো না আমার সাথে।”

সমীরণ এবারে খানিকটা বিরক্তি মাখা গলায় বলল,

“সকাল সকাল কি শুরু করলি বলতো! সর সামনে থেকে। একটু পরে ক্লাস আছে। মাথাটা আমার ফ্রেশ থাকতে দে।”

কথাটা বলে সমীরণ পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে মৃত্তিকা আবারো ওর সামনে গিয়ে পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে বলল,

“দাঁড়াও। আমার কথা এখনো শেষ হয়নি।”

“কিন্তু আমার তোর কথা শোনার ধৈর্য শেষ হয়ে গেছে। আমি রাগারাগি করতে চাইছি না। তাই তুই অযথা আমার রাগ তুলিস না। ব্যাপারটা ভালো হবে না আমাদের কারো জন্য। তোকে আমি আগেও হাজার বার বলেছি আজ শেষবারের মতন বলছি, তুই যা চাইছিস সেটা সম্ভব না। আমার চোখে তুই কেবলমাত্র আমার বন্ধুর বোন। পছন্দ টছন্দ করি না তোকে আমি। যা, বাপ মা যার সাথে বিয়ে ঠিক করে তার সাথে বিয়ে করে না।”

“বিয়ে করলে তোমাকেই করব এর আগেও হাজারবার বলেছি আমি, আজ শেষবারের মতন বললাম।”

খুব অদ্ভুত ভাবে সমীরণ হাসল। সেই হাসির মাঝে ব্যঙ্গ প্রকাশ পেল নাকি সমীরণের মনে লুকিয়ে থাকা কোন কষ্ট বোকা মৃত্তিকা আজও ধরতে পারল না। শুধু এতোটুকু বুঝল হাসিটা ওর কাছে খুব অদ্ভুত।

“আমি ঠিকঠাক মানুষ হতে পারিনি, মৃত্তিকা। একবার আমাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভালো করে দেখে বলতো আমাকে তোর সভ্য মানুষ বলে মনে হয়? তুই এত ভালো একটা মেয়ে, এত নরম মনের একটা মেয়ে, আমার সাথে থাকলে রোজ তোর মন ভাঙবে। আমার কোন পরিবার নেই। তুই পরিবার ছাড়া থাকতে পারবি না। আমার শিক্ষায় দোষ আছে। কারণ আমার মা নেই, বুঝলি? বোকা মেয়ে, নিজের ভালো বোঝ।”

মৃত্তিকার দু চোখ ছলছল করে উঠল। অনেক কষ্টে কান্না গুলো গিলে নিয়ে বলল,

“তুমি তাহলে আমার হবেই না?”

“আমাদের এক হওয়ার কথাই না। বিশাল পার্থক্য আমাদের মাঝে। যদি এই পার্থক্য মাপতে পারতাম তবে আকাশ পাতালের থেকেও বেশি হত। এত পার্থক্য নিয়ে এক হওয়া যায় না। অনেক কষ্ট দিয়েছি তোকে। আর দিতে চাই না। তাই বলছি সবকিছুর সমাপ্তি আজ এখানেই হোক। তোর ভালোবাসার দাফন আজ এখানে এই মাঠে দাঁড়িয়েই হোক। ভেবে নিবি কোন পাথরকে ভালোবেসেছিলি। পাথরের হৃদয় তো গলে না রে মৃত্তিকা। আমার হৃদয়ও গলেনি।”

চলমান।