#যেখানে_মন_ভেজে_চুপচাপ
#পর্ব_১৪
#লেখনিতে_খুশবু_আকতার
ছোটখাটো আয়োজনের মাধ্যমে মৃত্তিকা আর সমীরণের এনগেজমেন্ট এর অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলো। এনগেজমেন্টে আত্মীয়-স্বজন কাউকেই ডাকা হয়নি। সমীরণের আত্মীয়-স্বজন নেই বললেই চলে। যেই দু একজন আছে তাদেরকে সমীরণ কখনোই ডাকবে না। সারা বছর যাদের কোনো খোঁজ খবর থাকে না, যাদের সাথে ভালো-মন্দ দু একটা কথা বলা যায় না, হঠাৎ করে বিয়ের সময় তাদেরকে নেমন্তন্ন করে আত্মীয়তা দেখিয়ে লোক দেখানো ভদ্রতা পালন করা সম্ভব না সমীরণের পক্ষে। যারা দূরে আছে তাদেরকে দূরেই থাকতে দিয়েছে। ওদের নিকট আত্মীয় হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই।
বিয়ের তারিখও ঠিক করা হলো। সামনের মাস থেকে সমীরণের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু। তাই সবাই ভেবেছিল সমীরণের ফাইনাল পরীক্ষাটা শেষ হলে তারপরে বিয়ের কথা ভাববে। তবে সমীরণ তাতে আপত্তি জানিয়েছে। পরীক্ষার আগেই এসব বিয়ে-শাদির ঝামেলা শেষ করতে চেয়েছে। নয়ত বিয়ের অর্ধেক কাজ শেষ করে মৃত্তিকাকে এত দূরে রেখে ওর পরীক্ষা ভালো যাবে না। তার থেকে বরং সম্পূর্ণ বিয়ের কাজটা শেষ করে মৃত্তিকা কে নিয়ে গিয়ে নিজের ঘরে বসিয়ে রাখবে। তবে গিয়ে সমীরণের পড়ায় মন বসবে।
সমীরণদের আসতেই অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছিল। তারপর অনুষ্ঠানাদি পালন করে, খাওয়া দাওয়া শেষ করে, গল্প গুজব করতে করতে রাত হয়ে গেল। মৃত্তিকার বাড়ির লোকজন আজ রাতে আর কোনোমতেই যেতে দিতে চাইলেন না ওনাদের। আর তাছাড়া আগামীকাল মৃত্তিকারাও যাবে। শশী এসেছিল মৃত্তিকার এনগেজমেন্ট উপলক্ষে। শশী তো বেশিদিন থাকবে না। আগামীকালই চলে যাবে। মৃদুলও ব্যস্ত মানুষ। ও চলে যাবে। সেই জন্য ঠিক করল আগামীকাল সবাই একসঙ্গেই যাবে।
রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে যে যার ঘরে গেল ঘুমোতে। সমীরণ মৃদুল এর সাথে ঘুমোবে। ঘুম না ধরায় একটু হাঁটাহাঁটি করতে বেরোলো। হাঁটতে হাঁটতে এলো মৃত্তিকার ঘরের সামনে। মৃত্তিকার ঘরে শশীও রয়েছে। দরজা খোলা। ঘরের লাইট এখনো জ্বলছে।
সমীরণ জানেনা ওর ছুকছুক করার স্বভাব আছে কিনা। হঠাৎ করেই কেমন যেন নিজেকে বাদ বাকি সেই প্রেমিকদের মতন মনে হচ্ছে যারা একটু সুযোগ খুঁজে বেড়ায় প্রেমিকার সাথে কথা বলার জন্য, একা সময় কাটানোর জন্য। এটাকে ছুকছুক করা বলে কিনা সমীরণ জানে না। জানলেও বুঝতে চাইলো না। কেননা ও কখনোই নিজেকে ছুকছুকানি স্বভাবের আখ্যাটা দেবে না।
দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে গলা খাঁকারি দিল ভেতরে অবস্থানরত মৃত্তিকার মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য। কাজও হলো। মৃত্তিকা তখন কানের দুল খুলছিল। অনুষ্টানের জন্য যে সাজগোজ করেছিল সে সাজগোজ এখনো রয়ে গিয়েছে। এর দুটো কারণ আছে। প্রথমত, শুরুর দিকে এত সুন্দর সাজগোজ নষ্ট করতে ইচ্ছে করছিল না। কতগুলো যে ছবি তুলেছে তার ঠিক নেই। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজেকে দেখছিল আর ভাবছিল ওকে দেখতে সমীরণের বউয়ের মতন লাগছে। আর এখন ঘরে আসার পর ভীষণই অলসতা কাজ করছিল। সেই জন্য এত দেরি হলো।
সমীরণের গলার আওয়াজটা কানে যেতেই পিছন ফিরে তাকাল। ট্রাউজারের পকেটে দুই হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে সমীরণ। চোখে মুখে তার স্বভাবসুলভ গম্ভীর ভাব। সব সময় এমন করেই থাকে। দেখে মনে হয় যেন গুরুতর পরিস্থিতি। কি না কি ভয়ানক কিছু ঘটে গেছে যার জন্য হাসা যাবে না। হাসলে নির্ঘাত পাপ হবে।
“কিছু বলবে? ঘুমোওনি কেন এখনো?”
মৃত্তিকার এই প্রশ্নটা একদমই পছন্দ হলো না সমীরণের। এভাবে সরাসরি জিজ্ঞেস করার কি আছে কিছু বলবে কিনা। সমীরণ কি ঠিক করে এসেছে নাকি যে কি বলবে না বলবে। আর ঘুমোয়নি কারণ ঘুম ধরছিল না। সহজ ব্যাপার। এখন আবার আলাদা করে জিজ্ঞেস করে অযথা বিব্রত করার কি আছে সমীরণ কে। মেয়েটা এত কিছু বোঝে আর এই সামান্য ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না যে সমীরণ কিছু বলার উদ্দেশ্যেই এসেছে।
অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেও সমীরণ কোন উত্তর দিল না। বিছানার উপরে বসা শশী ঠোঁট টিপে হেসে মৃত্তিকাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তোর মাথায় আসলেও গোবর আছে মৃত্তিকা। তোর হবু বর এই অসময়ে ঘুম কামাই করে কি এমনি এমনি এসেছে নাকি। তোকে দেখতে ইচ্ছে করছিল, তোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল বলেই নিশ্চয়ই এসেছে।”
সমীরণের অস্বস্তি বাড়ল। লজ্জা পেল কিনা সেটা বলা গেল না। তবে মৃত্তিকার মাঝে কোন ধরণের অস্বস্তি দেখা গেল না। লজ্জাও দেখা গেল না। বরং ভীষণ খুশি হলো। মৃত্তিকার চোখ দুটো আনন্দে ভরে উঠল। একটা কান থেকে দুল খুলেছে। আরেক কান থেকে দুল খোলার কথা খেয়াল রইল না। অমনি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা সমীরণের দিকে এগিয়ে এসে বলল,
“সত্যি তুমি আমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছো? আমাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল? এতো ভালোবাসো আমায়!”
মৃত্তিকার একটা প্রশ্নের জবাবও দিল না সমীরণ। ওকে পাশ কাটিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে বিছানার এক প্রান্তে বসে পিছনে বসা শশীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“অন্যের ব্যাপারে নিজের এই বোঁচা নাকটা না গলিয়ে ছাদে যাও। মৃদুল অপেক্ষা করছে।”
সমীরণ কথাটা বলতেই শশী বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকাল ওর দিকে। সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি ঘুরিয়ে আবার তাকাল মৃত্তিকার দিকে। মৃত্তিকার দিকে তাকাতেই চোখে মুখে আতঙ্ক ফুটে উঠল। ব্যাপারটা মৃত্তিকার ঠিক হজম হলো না। শশীর অপেক্ষায় মৃদুল ছাদে থাকবে কেন? তাও আবার এই রাতে।
“ভাইয়া শশীর অপেক্ষা করছে মানে কি? কেন অপেক্ষা করছে?”
সমীরণ বিছানায় পিঠ এলিয়ে দিয়ে গা ছাড়া ভঙ্গিতে একটা হাই তুলে বলল,
“সেটা তোর বান্ধবীকে জিজ্ঞেস কর। অন্যের বেলায় তো মুখ দিয়ে খই ফেটে। নিজের কুকীর্তি গুলো আবার ঢাকার চেষ্টা কেন? এখন এই বোঁচা নাকটা গলাচ্ছে না কেন জিজ্ঞেস কর?”
শশী ধমকে উঠে সমীরণ কে বলল,
“চুপ করবে তুমি। সব সময় এত বেশি কথা বলো কেন? তুমি আসলেই অতিরিক্ত কথা বলো সমীরণ ভাইয়া।”
সমীরণ বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকাল শশীর দিকে। এই মেয়েটা সমীরণকে ধমক দিল! মৃত্তিকার ধমক সহ্য করে বলে এখন যে কেউ এসে সমীরণ কে ধমকাবে নাকি।
“এই মেয়ে, তোমার সাহস তো কম না। তুমি আমাকে ধমক দাও কোন সাহসে? আমাকে কি মৃদুল পেয়েছ যে ভয়ে তোমার সামনে কান ধরে উঠ বস করব? বউয়ের ধমক সহ্য করতে পারব কিনা সন্দেহ আর তুমি অন্যের বউ হয়ে আমাকে ধমকাতে এসেছো। এসব ধমকা ধমকি গিয়ে নিজের প্রেমিকের সাথে করো। যত্তসব।”
মৃত্তিকার মাথাটা এবারে আরো ঘুরে উঠলো। মৃদুল শশীর সামনে কান ধরে উঠবস করেছে মানেটা কি? আর প্রেমিক। প্রেমিক কে? শশীর প্রেমিক কে? কই মৃত্তিকা তো কিছু জানে না।
“তোমরা আমাকে পরিষ্কার করে বলবে কি নিয়ে কথা বলছ। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কে কার প্রেমিক? শশী তুই প্রেম করিস আমাকে তো জানাস নি?”
শশী মৃত্তিকাকে বোঝানোর উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চাইল। তবে সমীরণ ওকে সেই সুযোগ দিল না। তার আগেই বিরক্তিকর গলায় বলল,
“বান্ধবীর ভাইয়ের সাথে প্রেম করার সময় আত্মা কাঁপেনি আর এখন সম্পর্কের কথাটা জানাতে কলিজা ফুসফুস সব কেঁপে উঠছে? হায়রে মেয়ে মানুষ! এত ন্যাকামি যে এরা করে কি করে বুঝে উঠতে পারিনা। এই মেয়ে, বের হও তো তুমি ঘর থেকে। তুমি গিয়ে নিজের কাজ করো। আমাকেও আমার কাজ করতে দাও।”
শশী চেয়েও আর কিছু বলতে পারল না। সমীরণের জন্য বেরিয়ে যেতে বাধ্য হলো। মৃত্তিকা এবারে ঠেসে ধরল সমীরণ কে,
“সমীরণ, সত্যি করে বল কি চলছে? তুমি শশীকে ছাদে পাঠালে কেন? ভাইয়ার সাথে কি করবে ও?”
“তোর সাথে আমি যা করার জন্য এখানে এসেছি সেই একই কাজের জন্য শশীকে উপরে পাঠালাম। এখন থাম। আগে মৃদুল কে কল করে ছাদে যেতে বলি।”
“মানেটা কি? তুমি যে বললে ভাইয়া নাকি ছাদে আছে, শশীকে ডাকছে।”
“এই কথা না বললে মেয়েটাকে বের করতে পারতাম না। এখন মুখটা একটু বন্ধ রাখ। মেয়ে মানুষ এত কথা বলে কেন রে?”
আপাতত মৃত্তিকা থেমে গেল। সমীরণ কল লাগালো মৃদুলের নাম্বারে। একবার রিং হতেই মৃদুল ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে বিরক্ত মাখা গলায় বলল,
“এক বাড়িতে থেকেও ফোনে কথা বলতে হবে?”
“ছাদে যা। শশীকে পাঠিয়েছি।”
বিছানায় শুয়ে ছিল মৃদুল। সমীরণের কথাটা শুনে এক লাফে উঠে বসে বলল,
“ওকে কেন ছাদে পাঠিয়েছিস? এত রাত হয়ে গেছে মেয়েটা ভয় পাবে একা একা।”
“তো তোকে কি আমি বা ল কামে ছাদে যেতে বলছি। ভয় যাতে না পায় সেজন্যই তো যেতে বলছি। যা গিয়ে জড়িয়ে ধরে বসে থাক।”
মৃদুল জানালা দিয়ে বাইরে একবার উঁকি দিয়ে বলল,
“চোখ নেই তোর? দেখছিস না বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। এখন ছাদে যাব কোন বা ল কামে।”
“বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে?”
“হ্যাঁ। চোখে না হয় দেখিসই না। কানেও কি বৃষ্টির আওয়াজ শুনতে পাস না?”
সমীরণ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“না রে। তোর বোন এত বেশি কথা বলে যে কানে কম শুনছি আজকাল। যাইহোক ছাদে যেতে পারবি না তো ওকে ঘরে নিয়ে যা। আর একটা কথা, ঘরে যেতে বলেছি শুধুমাত্র কথা বলার জন্য। বাড়তি কিছু করার জন্য না। নিজের সীমা মাথায় রাখবি। আমি কিন্তু যেকোনো সময় চলে আসব। পারমিশন না নিয়েই ঘরে ঢুকে যাব। উল্টাপাল্টা কোন সিন দেখলে বাড়ির লোকজন জড়ো করে ফেলব।”
সমীরণ কেটে দিল কলটা। মৃদুলের থেকে আর কোন কিছু শোনার প্রয়োজন মনে করল না। সমীরণের যতটুকু বলার ছিল বলে দিয়েছে। দারুন একটা সুযোগও তৈরি করে দিয়েছে। এখন এই সুযোগটা মৃদুল কিভাবে কাজে লাগাবে সেটা ওর ব্যাপার।
মৃত্তিকা চুপটি করে পাশে বসে আছে। সমীরণ কম কথা বলতে বলেছে। তাই ঠিক করেছে কমই কথা বলবে।
সমীরণ বালিশের উপর থেকে মাথাটা তুলে এনে মৃত্তিকার হাঁটুর উপরে রাখল। চোখ বন্ধ করে শুয়ে আদেশের সুরে বলল,
“চুলগুলো একটু টেনে দাও তো।”
“হঠাৎ ভাষার এত উন্নতি হলো কি করে? তুই থেকে তুমি তে চলে এলে যে?”
“সমস্যা হলে বল আবার তুই তে চলে যাচ্ছি। মেয়ে মানুষকে নিয়ে ঝামেলার তো শেষ নেই। তোদের কখন আবার কিসে সমস্যা হয়। তাই সতর্ক থাকার চেষ্টা করছি। সাংসারিক ঝামেলা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। তোকেও বলছি অযথা কোনো বিষয় নিয়ে ঝগড়া করবি না।”
“আচ্ছা এসব কথা এখন থাক। কি বলতে এসেছিলে?”
সমীরণ ভাবুক ভঙ্গিতে বলল,
“কিছু বলতে এসেছিলাম নাকি?”
মৃত্তিকা বিরক্তি মাখা গলায় বলল,
“সেটাই তো জিজ্ঞেস করছি আমি।”
“মনে নেই।”
মৃত্তিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এবারে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“এত রাতে আমার ঘরে আসার উদ্দেশ্য কি?
এবারে আর কোন ভনিতা করল না সমীরণ। উদ্দেশ্যটা বলেই ফেলল।
“দেখতে এসেছি।”
“শুধুই দেখতে?”
সমীরণ চোখ খুলে জানালা দিয়ে একবার বাইরে উঁকি দিয়ে দেখল। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। একটু আগেও চাঁদটা দেখা যাচ্ছিল। এখন কালো মেঘের আঁধারে ঢেকে গেছে। সমীরণের চুলের মাঝে বিলি কাটতে থাকা মৃত্তিকার হাতটা টেনে নিজের বুকের উপরে চেপে ধরে বলল,
“এমন বৃষ্টির দিনে তো মনে অনেক ইচ্ছেই উঁকি দিচ্ছে। এখন সব উদ্দেশ্য যদি পূরণ করতে চাই তাহলে তো বদনাম হয়ে যাবে। এমনিতেই সমীরণের বদনামের শেষ নেই।”
“বদনাম হলে হোক। তবুও চোখাচোখি বাদে প্রেমালাপ হোক। চুপিচুপি দুটো মন তো অনেক ভিজল। এবারে হাতে হাত রেখে, চোখে চোখ রেখে ভিজে একাকার হোক।”
সমীরণ মাথাটা তুলে তাকাল মৃত্তিকার দিকে। চোখাচোখি হলো দুজনের। চোখে চোখে কিছু কথা হলো। হয়ত গোপন কোন কথা। একে অন্যের হৃদয়ের খবর একে অপরকে জানাল। সমীরণ কি বুঝল কে জানে! চটজলদি উঠে দাঁড়ালো।
“কি হলো?”
সমীরণ তাড়াহুড়ো দেখিয়ে বলল,
“আমি এখন আসছি।”
“সে কি কিছু তো বললেই না?”
মৃত্তিকার কন্ঠটা বেশ উদাস শোনাল। সমীরণ এক নজর মৃত্তিকাকে দেখে নিয়ে নিজের দৃষ্টি আবার অন্যদিকে ঘোরালো। জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস ছেড়ে বলল,
“মেয়ে মানুষ মানেই ঝড়। ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক কোন না কোন দিক দিয়ে এরা ধ্বংস করেই ছাড়ে পুরুষ মানুষকে। তোরা এত নিষ্ঠুর কেন বলতো? পুরুষ মানুষের সরল ভালোবাসা নিয়ে এভাবে খেলিস কেন? দুর্বলতা খুঁজে পেয়েছিস বলে রোজ রোজ এভাবে খু ন করবি? এমন নিষ্পাপ দৃষ্টিতে তাকাবি না, এমন মায়াবী কন্ঠে ডাকবি না আমায়। ভেতরটা এলোমেলো হয়ে যায়।”
_________
মৃত্তিকা কে নিয়ে বিয়ের কেনাকাটা করার জন্য এসেছে সমীরণ। সমীরণের আসার ইচ্ছে ছিল না। মৃত্তিকাকে বলেছিল যেন শশী কে নিয়ে কেনাকাটা যা করার করে নেয়। মেয়ে মানুষের সাথে কেনাকাটা করতে আসার মতন বোকামি আর কিছু নেই। এরা দেখবে হাজারটা জিনিস। অথচ কিনবে একটা। আবার শুরু করবে দরদাম। মাঝে মাঝে তো দোকানীর সাথে ঝামেলাও লেগে যায়। সব থেকে বড় কথা অনেক সময় নষ্ট করে এরা।
সমীরণ আবার এর বিপরীত। কিছু কেনাকাটা করতে গেলে প্রথম দেখায় যেটা পছন্দ হয় সেটাই কিনে নিয়ে চলে আসে। দরদামও তেমন একটা করেনা। যা দাম চায় তাই দিয়ে আসে।
প্রায় এক ঘন্টা যাবত সারা মার্কেট ঘুরেছে মৃত্তিকা। এখন অবধি একটা কিছুও কেনেনি। সমীরণ এতক্ষণে একটু হলেও আন্দাজ করতে পারছে যে মৃত্তিকা কেন কিছু কিনছে না। দোকানে গিয়ে ব্রাইডাল কালেকশন বললেই অনেক দামী দামী শাড়ি দেখাচ্ছে। মৃত্তিকা আবার কম দামি শাড়ি বের করতে বললে সমীরণ ধমকাচ্ছে। সমীরণ আবার যে শাড়িগুলো পছন্দ করছে সেগুলোর এক একটার দাম বিশ হাজার, পঁচিশ হাজার, ত্রিশ হাজারের উপরে। যা মৃত্তিকা পছন্দ হয়নি বলে এড়িয়ে এসেছে।
এবারে দোকানে ঢোকার আগে সমীরণ মৃত্তিকাকে সাবধান করে বলল,
“শোন মৃত্তিকা, এটাই তোর শেষ সুযোগ। হয় এই দোকান থেকে কিছু পছন্দ করে কিনবি নয়ত আমার শার্ট-প্যান্ট পরিয়ে বিয়ে করে আনবো। প্রাইজ ট্যাগের দিকে তাকাবি না। যেটা পছন্দ হয় সেটাই কিনবি। আমার টাকা নেই তো কি হয়েছে আমার আব্বু দিয়েছে। চিন্তা করিস না দুদিন পর যখন ইনকাম করব তখন নিজের টাকায় কিনে দেব। এখন এত সংকোচ করার প্রয়োজন নেই। আব্বু সারা জীবন যা জমিয়েছে সব আমার জন্যই।”
মৃত্তিকা কোন উত্তর দিল না। চুপচাপ ভেতরে চলে গেল। লাল শাড়ি নেয়ার ইচ্ছে নেই মৃত্তিকার। কাতান, বেনারসি, জামদানি এইসব কেনার ইচ্ছেও নেই। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর একটা অফহোয়াইট কালারের ভারী কাজ করা জর্জেট শাড়ি পছন্দ হলো।
“এটা পছন্দ হয়েছে।”
সমীরণ শাড়িটা একবার হাতে নিয়ে ভালোমতো দেখে নিয়ে নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“এই শাড়ি পরার কি দরকার। এটা তো পরা না পরা সমান। আর আমি তোকে বিয়েতে পরার জন্য শাড়ি কিনতে বলেছি। কোন ম রা বাড়িতে পরে যাওয়ার জন্য না। বিয়েতে কেউ এসব রঙের শাড়ি পরে! তুই ফর্সা, সুন্দর মানুষ লাল টকটকে রংয়ের শাড়ি পরবি। বেনারসি পড়বি। দেখলেই যেন আমার চোখ আটকে যায়।”
সমীরণ মৃত্তিকাকে আর পাত্তা দিল না। দোকানী কে উদ্দেশ্য করে কিছু লাল বেনারসি বের করতে বলল। মৃত্তিকা বাধা দিল না। হুট করে ওর নিজেরও লাল শাড়ি পরার ইচ্ছে হলো। ওই যে সমীরণ বলেছে তাই। একটু আগেও যে শাড়িটা প্রচন্ড পছন্দ হয়েছিল সেটাও দেখতে আর এখন ভালো লাগছে না।
সমীরণ নিজেই বেছে বেছে একটা শাড়ি পছন্দ করল। ইশারায় সেটা মৃত্তিকা কে দেখিয়ে বলল,
“এটা ভালো লাগছে?”
মৃত্তিকা পাল্টা জিজ্ঞেস করল,
“তোমার ভালো লাগছে?”
“আমার তো ভালোই লাগছে।”
“তাহলে আমারও ভালো লাগছে।”
সমীরণ সন্দেহী গলায় বলল,
“সত্যি ভালো লাগছে তো? ভালো না লাগলে বল আরো দেখি। আমার তো মনে হচ্ছে এই রংটা তোকে খুব মানাবে।”
সামনে থেকে দোকানী বলে উঠল,
“ভাই, গায়ের উপর বিছিয়ে দেখুন। তাহলে তো বুঝতে পারবেন। দাঁড়ান আমি দেখাচ্ছি।”
দোকানী শাড়িটা মৃত্তিকার গায়ের উপর বিছিয়ে দিতে ধরলে সমীরণ ওনাকে আটকালো। ওনার হাত থেকে শাড়িটা কেড়ে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“পাশে ওর হবু বর বসে আছে তো। আপনাকে এত উপকার করতে হবে না। আমি দেখছি।”
থেমে গেলেন দোকানী। আর একটা শব্দও উচ্চারণ করলেন না। সমীরণ নিজেই শাড়িটা মৃত্তিকার কাঁধের উপর বিছিয়ে দিয়ে দেখল। লাল রংটা গায়ে পড়তেই ফুটে উঠল। সমীরণের চোখ যেন এখনই আটকে গেল মৃত্তিকার ওপর। কল্পনা করতে লাগল বউ সাজলে কতই না সুন্দর দেখাবে মৃত্তিকা কে!
মৃত্তিকা আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নিয়ে সমীরণ কে জিজ্ঞেস করল,
“কেমন লাগছে আমায়? ভালো লাগছে তো?”
“হুম। আমার মনের মানুষের মতন লাগছে।”
চলমান।

