Home "ধারাবাহিক গল্প "যেখানে মন ভেজে চুপচাপ যেখানে মন ভেজে চুপচাপ পর্ব-১৫

যেখানে মন ভেজে চুপচাপ পর্ব-১৫

0
4

#যেখানে_মন_ভেজে_চুপচাপ
#পর্ব_১৫
#লেখনিতে_খুশবু_আকতার

ফুল দ্বারা সজ্জিত বিছানার উপর ঘোমটা দিয়ে আড়ালে বসে আছে মৃত্তিকা। বুকটা ঢিপঢিপ করছে। হৃদস্পন্দনের গতি বেড়েছে বহু গুণ। ধীরে ধীরে তা কমার বদলে যেন আরো বাড়ছে। বাড়ছে তো বাড়ছেই কমার নামই নিচ্ছে না। ঘড়িতে সময় তখন রাত সাড়ে এগারোটা। সমীরণদের বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতেই রাত নয়টা বেজে গিয়েছিল।

সমীরণের বাড়িতে কোন মেয়ের অস্তিত্ব নেই। থাকেই তো দুই বাবা ছেলে। মৃত্তিকার সঙ্গে শশী আর মৃত্তিকার এক মামাতো বোন এসেছে। সমীরণের ঘরটা ফুল দিয়ে সাজানোর মতনও কোন মানুষ ছিল না। শশী আর মৃত্তিকার মামাতো বোনই আসার পর তাড়াহুড়ো করে যতটা পেরেছে সাজিয়েছে। মৃত্তিকার সাজগোজটাও এত দূর জার্নি করে আসায় একটু নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সেগুলোও আবার ঠিকঠাক করে দিয়ে গেছে। তবে যার জন্য এত কিছু সেই এখনো আসছে না ঘরে। কে জানে কোথায় কি করছে!

অবশ্য মৃত্তিকা এখন ভাবছে সমীরণ যত দেরি করে আসবে ওর জন্য ততই ভালো। এতদিন তো একটু সমীরণের সঙ্গ পাওয়ার জন্য মনটা আকুপাকু করত। ছটফট করত। কতই না বাহানা খুঁজেছে একটু সমীরণের সঙ্গে সঙ্গে থাকার জন্য। আর আজ সমীরণের ওর কাছে আসার কথা মনে হলেই ঘাবড়ে যাচ্ছে, অস্বস্তি হচ্ছে, ভয়ও হচ্ছে।

এতদিন তো সমীরণ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে রেখেছিল। আজ তো আর কোন বাধা নেই। আজ মৃত্তিকা সমীরণের জন্য সম্পূর্ণ হালাল। তারমানে নিশ্চয়ই সমীরণ নিজের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে। তবে এখানেও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। মানুষটার যা স্বভাব, তেঁতো মুখ দিয়ে কি আজ শুধুমাত্র ওদের বাসর রাত বলে মিষ্টি কথা বের হবে? নরম কি আদৌ হবে? আচ্ছা অতটা ভালোবাসে তো যে মৃত্তিকাকে নিজের বধু রূপে সামনে দেখে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে!

মৃত্তিকার এসব ভাবনার মাঝেই দরজা খোলার আওয়াজ হলো। ঘোমটার আড়াল থেকেই উঁকি দিয়ে দেখল সমীরণ এসেছে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মৃত্তিকার নিঃশ্বাস আটকে এসেছিল। সেটা আবার স্বাভাবিক হলো সমীরণের গলা খাঁকারির আওয়াজে।

গম্ভীর গলায় এগিয়ে আসতে আসতে বলল,

“গরমের দিনে এমন লম্বা ঘোমটা টেনে বসে থাকার কি আছে? তোকে কি আমি কখনো দেখিনি নাকি যে আজ ঘোমটা টেনে তুলে দেখতে হবে? না মানে বলছিলাম তোমাকে কি আজ নতুন দেখছি নাকি আমি।”

মৃত্তিকা সত্যিই ঘোমটার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। বিস্মিত দৃষ্টিতে সমীরণের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আজ আবার এত সম্মান!”

খানিকটা বোধহয় অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল সমীরণ। আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। ভিতর থেকে একটা টি শার্ট বের করতে করতে বলল,

“আগে ছিলি মানে ছিলে বন্ধুর বোন। তখন তুই তুকারি চলত। দু চারটে চড় থাপ্পড়ও মারা যেত। কিন্তু এখন হয়েছিস আমার বউ। সমীরণের বউ হয়েছিস। মানে বুঝতে পারছিস তোর সম্মান কতখানি! মানে তোমার সম্মান কতটা বেড়েছে। এখন থেকে আর কোন তুই তুকারি চলবে না। বুঝতে পেরেছিস মানে বুঝতে পেরেছো?”

“আগে তুই বলে পরে তুমি বললে এ আবার কেমন সম্মান দেওয়া হলো?”

“আরে এতদিনের অভ্যাস বদলাতে একটু সময় তো লাগবে।”

মৃত্তিকা আর কিছু বলল না। আজ ভ্যাপসা গরম পড়েছে। শেরওয়ানি পরে থাকা আর সমীরণের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। জামাটা বদলানোর জন্য ওয়াশরুমেও গেল না ছেলেটা। ঘরেই শেরওয়ানিটা খুলল। মৃত্তিকা সঙ্গে সঙ্গে অন্যদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে নাক মুখ কুঁচকে বলল,

“এই ছেলে, তোমার মিনিমাম কোন ভদ্রতা নেই? দেখছো ঘরে একটা মেয়ে বসে আছে ওয়াশরুমে গিয়ে তো জামা কাপড় বদলাবে। তোমার লজ্জা না থাকলেও আমার আছে।”

সমীরণ ব্যাঙ্গত্মক গলায় বলল,

“তোর মানে তোমার লজ্জা পাওয়া কে কি বলে জানো? আজাইরা ন্যাকামি। ঘরে যে মেয়ে বসে আছে সেই মেয়ে আমার বিয়ে করা বউ। লজ্জা শরম ভেঙে তবেই বিয়ে করতে নেমেছিলাম। বিয়ের পরে যদি বউয়ের সামনে লজ্জা পাই তাহলে নিজের পুরুষ সত্তা কে কলঙ্কিত করা হবে। চিন্তা করো না তোমার লজ্জা শরমও কেটে যাবে। একটু অপেক্ষা কর।”

লজ্জায় মৃত্তিকার কান গরম হয়ে উঠল। চুপচাপ বসেই রইল বিছানার উপর। এই ফাঁকে সমীরণ গিয়ে হাত মুখ ধুঁয়ে এল। মৃত্তিকা ততক্ষণে মাথার ওড়নাটা খুলে পাশে রেখে দিয়েছে। শরীরে হাওয়া লাগানোর চেষ্টা করছে। সমীরণ হাতের তোয়ালেটা চেয়ারের সাথে ঝুলিয়ে রেখে ধপ করে গিয়ে মৃত্তিকার পাশে শুয়ে পড়ল। মৃত্তিকা হালকা একটু কেঁপে উঠে কিছুটা সরে গেল। তা দেখে সমীরণ আবার হালকা হেসে ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“বিয়ের পর কি আমি অপরিচিত হয়ে যাচ্ছি নাকি তোমার জন্য! আমি কাছে এলে দূরে যাওয়ার এত তাড়া দেখা দিচ্ছে কেন? আমি তো এতক্ষণে তোমায় আমার বুকে আশা করেছিলাম।”

মৃত্তিকা হাঁটু মুড়ে বসে হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে সমীরণের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমিও এমনটাই ভেবেছিলাম। ইচ্ছে তো এমনটাই ছিল। কিন্তু……।”

“কিন্তু হঠাৎ করে ‘লজ্জা নারীর ভূষণ’ এই কথাটা মনে পড়ে গেল। নিজেকে নারী প্রমাণের চেষ্টা করছিস মানে করছো?”

“তাই?”

মৃত্তিকা নিশ্চিত না এই বিষয়ে। তাই নিশ্চিত হওয়ার জন্য সমীরণ কে জিজ্ঞেস করল। সমীরণ হাত বাড়াল মৃত্তিকার দিকে। মৃত্তিকা ওর হাতে হাত রাখতেই সমীরণ একটা হ্যাচকা টান দিল। মৃত্তিকা হুমড়ি খেয়ে গিয়ে পড়লো সমীরণের প্রশস্ত বুকের উপর। দুজনের মাঝে আর সামান্য ব্যবধানই আছে। মৃত্তিকার তপ্ত শ্বাস সমীরণের মুখের উপরে আছড়ে পড়ছে। ঠিক তেমনি সমীরণের নিঃশ্বাস মৃত্তিকা নিজের গলার ভাঁজে অনুভব করতে পারছে।

সমীরণের চোখে চোখ পড়তেই মৃত্তিকা তাড়াহুড়ো করে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিল। মৃত্তিকা ওঠার চেষ্টা করল তবে সফল হতে পারল না। সমীরণ কোমর পেঁচিয়ে ধরল। শাড়ি ভেদ করে সমীরণের হাত খুঁজে নিল মৃত্তিকার উন্মুক্ত কোমর। শিউরে উঠল মৃত্তিকা। আবারো ছাড়া পাওয়ার জন্য মোচড়া মুচড়ি করল। তবে কাজ হচ্ছে না। মৃত্তিকা যত ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করছে সমীরণের হাতের বাঁধন যেন তত শক্ত হয়ে উঠছে।

“এভাবে চেপে ধরছো কেন বলতো? ছাড়ো না।”

সমীরণ মৃত্তিকাকে নিজের পাশে শুইয়ে ওর উপরে আধ শোয়া হয়ে বলল,

“আমি না তোমার কত সাধনার ফল। আমাকে অর্জন করতে তো কম কষ্ট করোনি। এত কষ্ট করে যে আমাকে জয় করলে, সে প্রাপ্তির আনন্দ দেখতে পাচ্ছি না কেন? পেতে না পেতেই কি আমাকে জয়ের আনন্দ ম্লান হতে শুরু করলো?”

মৃত্তিকা কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সমীরণের মুখের দিকে। সমীরণের গালে দাড়িগুলো বেড়েছে। আজ বিয়ে ছিল তারপরেও নিজের দাড়িগুলো একটু কেটেকুটে ছোট করেনি। উদ্দেশ্য কি নিজেকে জংলি দেখাতে চায় নাকি? অবশ্য চাইলেই তো আর জংলি লাগে না দেখতে। মৃত্তিকার দৃষ্টিতে বরাবর সমীরণ যতটা সুন্দর অতটাই সুন্দর লাগছে। বরং সৌন্দর্য হয়ত অনেকটা বেড়েছে। এখন সমীরণ যে মৃত্তিকার স্বামী। তাই সমীরণ কে দেখার অধিকার বেড়েছে। একদম কাছ থেকে দেখতে পাচ্ছে। যতটা সময় ইচ্ছে ততটা সময় নিয়ে দেখতে পাচ্ছে। তাই হয়ত সমীরণের নিঁখুত চেহারাটাও মৃত্তিকার কাছে আগের তুলনায় আরো প্রবল ভাবে ধরা দিচ্ছে।

সমীরণের সেই ঘন দাঁড়ির মাঝে মৃত্তিকা হাত বোলালো।

“তোমাকে জয়ের আনন্দ আমার অন্তরে লুকিয়ে রেখেছি। বেশি সুখ যে দেখাতে নেই। নজর লেগে যায়। আমার খুব শখ ছিল তোমাকে নিজের বলার, তোমার এই ঘরটাকে নিজের বলার, তোমার প্রতিটা জিনিস কে নিজের বলার। এতগুলো স্বপ্ন যখন একসাথে পূরণ হয়ে যায় সেই আনন্দের পরিমাণটাই হয়ত এতটা বেশি হয় যে সঠিকভাবে প্রকাশ করা যায় না। আমার ভালোবাসা নিয়ে এত সন্দেহ কেন তোমার? তোমার রাগের মাঝেও তো আমি আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা ধরে ফেলতে পারি। সেখানে আমি সারাক্ষণ তোমাকে বোঝাতে চাই যে আমি তোমাকে ভালোবাসি। তারপরেও তুমি বোঝো না কেন?”

সমীরণ আলতো করে মৃত্তিকার কপালে চুমু খেয়ে বলল,

“বুঝি তো। তবে এতোটুকু ভালোবাসা যথেষ্ট না। আরো ভালোবাসবে আমায়। তোমার ভালোবাসায় যেন আমি বিরক্ত হয়ে যাই ততটা ভালোবাসবে। আমার থেকে বেশি আর কাউকে ভালোবাসবে না। আমার জীবনে ভালোবাসার থলিটা শূন্য। তোমার ভালোবাসা দিয়ে সেটাকে পূর্ণ করতে চাই।”

মৃত্তিকা আলতো হাসল। সমীরণের চোখের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারল সমীরণের পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টি নিবদ্ধ মৃত্তিকার ঠোঁটে। সমীরণ ওর ঠোঁটের দিকেই অগ্রসর হচ্ছে। সমীরণ যত কাছে আসছে মৃত্তিকার হৃৎস্পন্দনের গতি যেন ততই তীব্র হচ্ছে। সমীরণ অনেকটা নিকটে আসতেই মৃত্তিকা হালকা করে ওর বুকে একটা কিল বসিয়ে বলল,

‎”বাসর রাত হলেও মানুষ তো একটু ধৈর্য ধরে। এখনই এমন পাগলামি করছো কেন?”

সমীরণ মৃত্তিকার ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে বলল,

‎”হুঁশশ। ধৈর্য শব্দের অর্থই ভুলে গেছি আজ। তোর খুব শখ ছিল না আমার নামের সঙ্গে নিজের নাম জড়ানোর? আজ থেকে তোর শরীরের প্রতিটা ভাঁজে, তোর প্রতিটা নিঃশ্বাসে, তোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে শুধুই সমীরণের নাম থাকবে।”

_________

বিয়ের এক সপ্তাহ হতে চলল। এই পুরো সপ্তাহে একবারের জন্যও মৃত্তিকা রান্না ঘরে পা রাখেনি। আজ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। সাদ্দাম হোসেন স্কুলে যাবেন। সমীরণ আর ও যাবে ভার্সিটিতে। তাই ভেবেছে সবার সকালের নাস্তা মৃত্তিকাই তৈরি করবে।

রান্নাঘরে গিয়ে এদিক ওদিক ঘুরতে লাগলো। কি রান্না করবে জানেনা। কোথায় কি রাখা আছে সেসবও জানে না। কি দিয়ে কি রান্না করতে হয় তাও জানা নেই। কোন উপাদানের নাম যে কি সেসবও জানে না। মৃত্তিকার এখন নিজেকে অসহায় লাগছে। একবার ভাবল সমীরণ কে ডেকে নিয়ে আসবে। আবার ভাবল যদি সমীরণকে এখন ডাকতে যায় তাহলে ওকে আর রান্নাই করতে দেবে না। বসিয়ে রাখবে। একটাই কথা বলবে মৃত্তিকা রান্না করতে গেলে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে যাবে।

মৃত্তিকার এসব ভাবনার মাঝে সাদ্দাম হোসেন এলেন সেখানে। তিন বেলা রান্নাবান্না উনিই করেন। ছেলের বউকে রান্নাঘরে দেখতে তিনিও পছন্দ করেন না। উনি তো জানেন মৃত্তিকা কাজকর্মে ঠিক কতটা অপটু। যেহেতু সংসারের প্যাঁচে পড়েছে ধীরে ধীরে সব শিখে যাবে। তবে তিনি তাড়াহুড়োয় ফেলতে চান না।

“মৃত্তিকা, তুমি রান্না ঘরে কি করছো মা? ক্ষুধা লেগেছে নাকি? ফ্রিজে গিয়ে দেখো খাবার আছে। আর এত সকালে উঠেছো কেন? খেয়েদেয়ে আবার ঘুমোও।”

মৃত্তিকা মুখ ভার করে বলল,

“না বাবা ক্ষুধা লাগেনি। আমি তো এসেছিলাম রান্না করতে। কি রান্না করব বুঝতে পারছি না। আমি তো কিছু চিনিও না।”

“তোমাকে রান্না করতে হবে না। ধীরে ধীরে শিখে নিও। আমি নাস্তা বানিয়ে দিচ্ছি। তুমি ঘরে যাও।”

মৃত্তিকা আপত্তি জানিয়ে বলল,

“না। আমি রান্না করবো আজ। আপনি আমাকে শিখিয়ে দিন। কিন্তু রান্না আজ আমিই করব। আপনি রান্না করেন আর আমি বসে বসে খাই এটা আমার দেখতে একটুও ভালো লাগেনা। এখন তো আপনার ছেলের বউ এসে গেছে। আপনি বিশ্রাম করবেন এখন। সংসার সামলানোর দায়িত্ব তো আমার। জানি আমি কিছু পারি না তবে শিখে নেব।”

সাদ্দাম হোসেন আলতো হেসে মৃত্তিকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদূরে গলায় বললেন,

“তুমি যে নিজের দায়িত্ব সম্বন্ধে সচেতন হয়েছো এত তাড়াতাড়ি এই আমার জন্য যথেষ্ট। তোমার বয়স তো এখনো অনেক কম মা। এতো দায়িত্ব সামলাতে পারবে না। আমি বলছি তো তুমি একটু একটু করে কাজ শেখো। আজ আমাকে রান্না করতে দাও। তুমি পারবে না। হাতটাত যদি পুড়িয়ে ফেল!”

মৃত্তিকা জেদি গলায় বলল,

“সে পুড়লে পুড়বে। হাত না পুড়লে রান্না শেখা যায় না আমার মা বলত। আমি আজ হাত পুড়েই ছাড়বো।”

মৃত্তিকার জোড়াজুড়িতে সাদ্দাম হোসেন শেষে হার মানলেন। একটা সহজ পদ বলে দিলেন। বললেন পরোটা বানাতে আর ডিম ভাজতে। মৃত্তিকার পছন্দ হলো। পরোটা বানানো কি এমন ব্যাপার। আটা মেখে রুটি বেলে একটু তেলে ভাজা। ডিম ভাজাও তো সহজ।

নিজের কাজকর্ম সব বুঝে নিয়ে সাদ্দাম হোসেনকে রান্নাঘর থেকে জোর করে ঠেলে বের করে দিল মৃত্তিকা। শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে এবারে লেগে পরলো কাজে।

ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুঁয়ে বউকে খুঁজতে খুঁজতে সমীরণ রান্না ঘরের দিকে এল। এই সময়ে মৃত্তিকাকে রান্নাঘরে আশা করেনি সমীরণ। মৃত্তিকা তখন ময়দা মাখছে। সমীরণ একটু কাছে গিয়ে উঁকি দিতেই চোখ কপালে উঠে গেল। এত ময়দা নিয়েছে কেন? এত পানিই বা দিয়েছে কেন? এ তো ময়দার ঝোল হয়ে গেছে।

“কি বানাচ্ছো তুমি?”

হঠাৎ করে কন্ঠটা কানে যেতেই মৃত্তিকা কেঁপে উঠল। সমীরণকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাড়াহুড়ো করে ময়দার বাটিটা লুকোনোর চেষ্টা করে বলল,

“কিছু না। মানে কিছু একটা বানাচ্ছি। তুমি যাও। একটু পর নাস্তা বানিয়ে ডাকবো তখন আসবে। বউয়ের হাতে বানানো নাস্তা খাবে আজ।”

“আরে কিন্তু এই ময়দার ঝোল দিয়ে কি নাস্তা হবে সেটা বলো?”

“বাবা পরোটা বানাতে বলেছে। সেটাই বানাচ্ছি।”

সমীরণ কপাল চাপড়ে বলল,

“এটা দিয়ে পরোটা বানাবে! এভাবে কেউ পরোটা বানায়? বাপের জন্মে পরোটা বানানো দেখেছো কখনো?”

নিজের কষ্ট আর লুকোতে পারল না মৃত্তিকা। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

“কি করবো বুঝতে পারছি না। বারবার শুধু পানি বেশি হয়ে যাচ্ছে। এর আগেও দুবার এমন হয়েছে। ওই যে দেখো, ওখানে রেখে দিয়েছি। এবারও এমনই হয়ে গেল। বাবাকে কত বড় মুখ করে বললাম আজ আমি নাস্তা বানাব। এখন তো ভয়ে ডাকতেও পারছি না। যদি রেগে যায়!”

সমীরণ দেখল তাকের উপর আরো দুটো বাটিতে ময়দা গুলে রাখা। ময়দার ঝোল যাকে বলে। যেগুলো দিয়ে পরোটা কিংবা রুটি কোন কিছুই বানানো সম্ভব না।

“রান্না করতে এসেছো নাকি আমার বাবার টাকা ধ্বংস করতে। একদিনেই তো সংসারে দুর্ভিক্ষ লেগে যাবে। এইজন্য আমি বলি যা করতে যাবে আগে আমাকে ডাকবে। হাতটাত পুড়েছো নাকি আবার? কিছু কাটাকুটি করতে যাওনি তো মাতব্বরি করে?”

মৃত্তিকা তড়িৎ গতিতে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না। এখনো তো ময়দাই মাখতে পারিনি। এক ঘন্টা ধরে ময়দা মাখার চেষ্টা করছি।”

আর বলার মতন কিছু খুঁজে পেল না সমীরণ। বকাবকিও তো করতে পারবে না। একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলল,

“সরো। আমি করে দিচ্ছি।”

সমীরণ নিজেই ময়দা মেখে পরোটা বানিয়ে ভাজল। ফ্রিজ থেকে মৃত্তিকাকে ডিম বের করে আনতে বলল। পেঁয়াজ মরিচ কেটে নিজেই ডিম গুলোও ভাজলো। মৃত্তিকা এর মাঝে অনেকবারই সাহায্য করতে চাইল তবে সমীরণ ওকে কিছুই করতে দিল না। রান্না শেষে খাবারগুলো টেবিলে নিয়ে গিয়ে সাজিয়ে বসে পড়ল। সাদ্দাম হোসেন এসে গেলেন ততক্ষণে। মৃত্তিকা শুধু খাবারগুলো সবার প্লেটে দিয়ে দিল।

একটু পরোটা ছিড়ে সমীরণ নিজের মুখে দিল। বলল না যে কাজগুলো নিজেই করেছে। বরং মৃত্তিকার প্রশংসা করল।

“পরোটা ভাজা কিন্তু সুন্দর হয়েছে মৃত্তিকা। এর পরের দিন ডিম ভাজার সাথে অন্য কিছু করো। আজ তো তাড়াহুোড়ো ছিল সেজন্য করতে পারলে না। দেখেছো আব্বু, তোমার ছেলের বউয়ের কিন্তু গুন আছে। বেছে বেছে গুণবতী মেয়েকে বিয়ে করেছি আমি।”

সাদ্দাম হোসেন জানেন একটা কাজও মৃত্তিকা করেনি। একবার এসে তো উনি উঁকি দিয়ে দেখেও গেছেন যে তার ছেলে রান্নাবান্না করছে। তবে তিনি যে সেসব দেখেছেন সেগুলো আর এখন বললেন না। তিনিও মেনে নিলেন মৃত্তিকাই রান্না করেছে। তিনিও ছেলের বউয়ের ভীষণ প্রশংসা করলেন।

না চাইতেও মৃত্তিকার মনটা ভালো হয়ে গেল। শুরুতে একটু মনটা খারাপ ছিল। কত বড় মুখ করে সাদ্দাম হোসেন কে বলেছিল যে নিজে রান্না করবে। অথচ কিছুই করতে পারল না। তবে সমীরণ সবটা সামলে নিল। মৃত্তিকার পাশে থাকল। মৃত্তিকার ঠোঁটে হাসি ফোটানোর যে প্রতিজ্ঞা করেছিল সেই প্রতিজ্ঞা রাখল সমীরণ।

চলমান।