#লাল_শাড়ি
#ফারহানা_ইসলাম
৪র্থ পর্ব
___বিকেলের আকাশটা আরও কালো হয়ে এসেছে। দূরে কোথাও মেঘ গর্জে উঠছে। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ।
ঘরের ভেতর অদ্ভুত এক চাপা উত্তেজনা।
আমি আর ইভা আপু নিশাকে নিয়া নিজেদের ঘরে বসে আছি। কিন্তু কারও মন ঘরে নেই। বারবার দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরের দিকে তাকাচ্ছি।
উঠানে চেয়ার পাতা হয়েছে।
নানা ভাই চুপচাপ বসে আছেন। বড় মামা আর ছোট মামার মুখ গম্ভীর। আব্বা বারান্দার এক কোণায় আপন মনে দাঁড়িয়ে আছেন।
আর হাজেরা!!
তিনি একদম চুপ।
মনে হচ্ছে যেন তিনি এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না যে এই বাড়ির অর্ধেকেরও বেশি সম্পত্তি আম্মার নামে।
___হঠাৎ বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
আমার বুক ধক করে উঠলো।
বড় চাচা এসেছেন!
সবাই একসাথে উঠানের দিকে তাকালো।
একটা সাদা গাড়ি এসে থামল গেটের সামনে।
গাড়ি থেকে প্রথমে নামলেন বড় চাচা।
তারপর বড় চাচি।
তাদের পেছনে দুই ছেলে-মেয়ে।
বড় চাচাকে দেখেই আব্বার মুখটা কেমন যেন মলিন হয়ে গেল।
___বড় চাচা ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর ঢুকলেন।
চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন,
___এত জরুরি ডাকা হলো কেন?
আম্মা সামনে এগিয়ে এলেন।
তার মুখে কোনো রাগ নেই।
নেই কোনো কান্না ।
শুধু আছে একরাশ ক্লান্তি।
___ভাইজান, আজকে আপনাকে একটা সত্য কথা জানানোর জন্যে জরুরী তলব করেছি।
বড় চাচা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
___কী সত্য নাজিয়া।
___আপনার ভাই বংশধরের আশায় দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন।এখন আমি চাই সবার সম্পত্তি সবাই বুঝে নিয়ে যাক।
বড় চাচা একটা হুংকার দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।চাচাতো ভাই নীল ভাইয়া আর আপু নোভা আপু ভয়ে বড় চাচীর পেছনে লুকোলেন।
চাচী চাচাকে শান্ত করার বৃথা চেষ্টা করছেন।
বড় চাচা কঠোর গলায় বললেন,,
___সোহেল!
উনার কণ্ঠে এমন কঠোরতা ছিল যে সবাই চমকে উঠল।
___তুই কি সত্যি দ্বিতীয় বিয়ে করছিস?
আব্বা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
কিছুক্ষণ পরে আস্তে করে বললেন,
___হ!!
শব্দটা শেষ হওয়ার আগেই বড় চাচা প্রচণ্ড রেগে উঠলেন।
___তোর লজ্জা করে না?
ঘরের বাতাস যেন জমে গেল।
___আমি আর নিশা ইভা আপুর হাত শক্ত করে ধরে রাখলাম।
আমি অনুভব করলাম ইভা আপুর আঙুল কাঁপছে।
নিশা ফিসফিস করে বলল,
___আপু, আব্বাকে সবাই বকতেছে কেন?
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
ইভা আপু কোনো উত্তর দিলো না।
___নিশার ছোট্ট প্রশ্নটা যেন পুরো ঘরের নীরবতাকে আরও ভারী করে তুলল।
—আপু, আব্বাকে সবাই বকতেছে কেন?
নিশার কণ্ঠে ছিল সরলতা। সে এখনও বুঝতে শেখেনি বড়দের পৃথিবীর জটিল হিসাব-নিকাশ। তার কাছে আব্বা মানেই গল্প শোনানো একজন মানুষ।বাজার থেকে চকলেট কিনে আনা একজন বাবা।
কিন্তু আজ সেই মানুষটাকেই সবাই কঠিন চোখে দেখছে।
ইভা আপু নিশাকে বুকের কাছে টেনে নিল।
তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে।
আমি দেখলাম, আপু বারবার ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকে রাখার চেষ্টা করছে।
বড় চাচার চোখে আগুন।
নানা ভাইয়ের চোখে কষ্ট আর অবিশ্বাস।
আর আম্মার চোখে এক অদ্ভুত ক্লান্তি।
যেন দীর্ঘ বছর ধরে বয়ে বেড়ানো একটা ভার আজ তাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।
___বড় চাচা ধীরে ধীরে আব্বার দিকে এগিয়ে গেলেন।
তার প্রতিটি পদক্ষেপে উঠানের মাটি যেন কেঁপে উঠছে।
___সোহেল, তুই আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বল।
আব্বা মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে রইলেন।
___তুই কি সত্যি দ্বিতীয় বিয়ে করছিস?
কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এলো না।
উঠানের পেয়ারা গাছে একটা পাখি এসে মিষ্টি সুরে গান ধরল।
কিন্তু এই মুহূর্তে পাখি মিষ্টি গানের সুর বিস্বাদ লাগছে। ভারী বিস্বাদ।
এই জন্যেই হয়তো মানুষ বলে যখন মন খারাপ থাকে তখন কোনো সুর-ই মধুর লাগে না।
তারপর আব্বা খুব আস্তে বললেন,
__হ!!
শব্দটা শেষ হওয়ার আগেই বড় চাচার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
___লজ্জা করে না তোর?
___ঘরের ভেতর কেউ নড়ল না।
কেউ কোনো কথা বলল না।
সবাই যেন অপেক্ষা করছে এরপর কী হবে।
___ঠিক তখন হাজেরা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন।
তার মুখের রঙ উধাও।
হাত দুটো কাঁপছে।
অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর তিনি বললেন,
___আমি একটা কথা কইতে চাই,,
সবাই তার দিকে তাকাল।
হাজেরা একবার আম্মার দিকে তাকালেন।
সেই অদ্ভুত দৃষ্টিতে বড় চাচার দিকে তাকিয়ে বললেন,,
___শুনেন ভাইজান।যা হওয়ার হইয়া গেছে।এখন আপনি কিছু একটা মীমাংসা করে দিন। আপারে একটু বুঝান।তিনি যেন আমার সাথে ভালো ব্যবহার করেন।
কথাটা শুনেই উঠানে চাপা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।
___হাজেরা নামক মহিলাটির কথা শুনে বড় চাচা সহ সবাই উনার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন।
মহিলাটি আবার বললেন,,
___উনি তো ভুল কিছু করেন নি।উনি শুধু একটা ছেলে সন্তান চেয়েছেন।এতে আপনারা উনারে আসামী কেনো বানিয়ে দিতেছেন।উনি যা করছেন নিজের বংশকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে করেছেন।
___আমার মনে হলো পুরো পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেছে।
আমি আব্বার দিকে তাকালাম।
খুব বলতে ইচ্ছে হইলো আব্বা আমরা তিনজন কী আপনার মেয়ে না।আমরা কী আপনার শেষ সময় পর্যন্ত আপনার পাশে থাকতাম না।কেনো আপনি এমন করলেন?
___আম্মা এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন।
হঠাৎ তিনি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন।
তারপর খুব শান্ত স্বরে বললেন,
__কেউ চিৎকার করবেন না।
কণ্ঠস্বরটা উঁচু ছিল না।
কিন্তু এমন দৃঢ় ছিল যে সবাই থেমে গেল।
__আজকে আমি কাউরে অপমান করার জন্য ডাকি নাই।
নানা ভাই ব্যথিত গলায় বললেন,
__তাহলে ক্যান ডাকছস মা?
আম্মা কিছুক্ষণ চুপ রইলেন।
তারপর তিনি বললেন,,
___এই পরিবারের চার ভাগের দুই ভাগ সম্পত্তি আমার।সেই হিসেবে বাজারের পাঁচটা দোকানের মধ্যে তিনটে দোকান আমার।বাকি দুইটা আপনাদের দুই ভাইয়ের।আমার দোকানগুলোর সব হিসাব নিকাশ আজ থেকে আমার।
আর বাকি রইলো এই বাড়ি!!এই বাড়িটা আমার নামে তাই উনি যদি এই বাড়িতে উনার নতুন বউ নিয়ে থাকতে চান তাহলে মাসে দুই হাজার টাকা করে ভাড়া দিয়েই থাকবেন।
___আম্মার কথা শেষ হতে না হতে আব্বা সজোরে চিৎকার করে বললেন,,
__নাজিয়া তুমি এইটা করতে পারো না আমার সাথে।আমি জানি তুমি এমন কঠোর মেয়ে নও।
আব্বার কথা শুনে আম্মা জোরে জোরে হা হা হা করে হাসতে লাগলেন।
কিন্তু পরক্ষণে সেই হাসিটা মিলিয়ে গেল।সবাই অবাক নয়নে আম্মার দিকে চেয়ে আছেন।আমরা তিন বোন আর আম্মা যেন আসামী।
__
বিচার শেষ হইলো।আব্বা আম্মার সব অভিযোগ বড় চাচা মীমাংসা করে দিয়েছেন।বড় চাচী নিজেদের ভাগের দোকানটা আব্বারে দেখা শুনা করার জন্যে বললেন।যদিও বড় চাচা চান নি।কিন্তু চাচিকেও কিছু বলতে পারেন নি।
বড় চাচীকে দেখে মনে হচ্ছে আমাদের এই অবস্থা দেখে তিনি অনেক খুশি হয়েছেন।সেই ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি বড় চাচী নাকি আম্মাকে সহ্য করতে পারেন না।আম্মারে এর কারণ অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি।কিন্তু তিনি কিছুই বলেন না।
—
___সেদিনের সেই ঘটনার পর পুরো গ্রামে আগুনের মতো খবর ছড়িয়ে পড়ল।
লোকজনের আর কোনো কাজ নেই যেন।
সকালের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সন্ধ্যার আড্ডা পর্যন্ত, সবার মুখে একটাই আলোচনা।
সোহেল দ্বিতীয় বিয়া করছে।
নাজিয়া নাকি স্বামীর বিরুদ্ধে দাঁড়াইছে।
মাইয়া তিনটা জন্ম দিয়া স্বামী ধরে রাখতে পারে নাই।
ছেলে থাকলে এই দিন দেখতে হইতো না।
___মানুষের মুখ বন্ধ করা যায় না।
___মাজেদা খালা একদিন বাজার থেকে ফিরে এসে বললেন,
___আপা, মানুষ খুব খারাপ কথা কইতেছে।
আম্মা তখন উঠানে বসে শাক কুটছিলেন।
মাথাও তুললেন না।
শুধু বললেন,
__মানুষের মুখে তালা দেওনের চাবি আমার কাছে নাই রে মাজেদা।
___কিন্তু আম্মা যতই শক্ত থাকার চেষ্টা করুক, আমরা দুই বোন ঠিকই বুঝতাম।
___আম্মার ভেতরে লুকিয়ে আছে কষ্টের পাহাড়।জমে আছে অভিমানের বোঝা।মাথার উপর আছে পেয়েও হারানোর বেদনা।
___কষ্ট,, অভিমান,, অপ্রাপ্তির এই বোঝা যদি পাল্লা দিয়ে মাপা যেত, ওজন কত হতো। আর তার দাম ই বা কত হতো। কারো কী সাধ্য আছে এই বোঝা গ্রহণ করার।
চলবে

