Home "ধারাবাহিক গল্প লাল শাড়ি লাল শাড়ি পর্ব-১২

লাল শাড়ি পর্ব-১২

0
338

#লাল_শাড়ি
#১২
#ফারহানা_ইসলাম

____ হাজেরার মা হওয়ার খবর আমরা আগে থেকেই জানি। কিন্তু মামার মুখে এই খবর শোনার পর আমাদের দুই বোনের অনেক লজ্জা লাগল। সত্যি বাবা আমাদের মান সম্মানের কথা একবারও চিন্তা করলেন না কেনো?
আমরা কী মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়ে কোনো অপরাধ করেছি?
মেয়েরা কী বংশধর হতে পারে না?

… আমি ইভা আপুকে জিজ্ঞেস করলাম,,,

আপু মেয়েরা কী বংশধর হতে পারে না?

আপু বললেন,,,

অবশ্যই পারে।

তাহলে আব্বা যে বংশধরের আশায় দ্বিতীয় বিয়ে করছেন? আমি জানি মেয়েরা বংশের নাম ছড়াতে পারে না।

ধুর পাগলী! কী যে বলিস? শোন ইরা মেয়েরা হলো আল্লাহর দেওয়া শ্রেষ্ঠ নেয়ামত।
আর মেয়েরা বংশের নাম রাখতে পারে না কে বলেছে?
শোন আমাদের মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কন্যা সন্তান ছিল। কিন্তু আজ দেখ উনার বংশের কথা সারা পৃথিবতে শ্রেষ্ঠ। আজ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেয়েরা আমাদের আদর্শ।

সকালে আমি, ইভা আপু, মুন্নী আর নিশাকে নিয়ে হাঁটতে বের হয়েছি।
তখন পাশের বাড়ির জমিলা মামি আমাদের উদ্দেশ্য করে টিপ্পনী কেটে বলেন,,,

ওমা ওরা তো নাজিয়ার মাইয়া। কিরে তোরা কখন এসেছিস?

আমি বললাম,,,

এইতো কালকে।

ও! একা এসেছিস নাকি? তোদের মা আসে নি?

হে! আমরা একা এসেছি। আম্মা আসে নাই।

একা আসলি কেনো? তোর আব্বা তো নতুন বিয়া করছে! তোর নতুন মাকে নিয়া আসবি না।

জমিলা মামির কথা শুনে আমার খুব রাগ হইলো।

আমরা কিছু বলার আগে একজন বলে উঠলো,,,

___ আচ্ছা ভাবী, আপনি মেয়েদের কাটা গায়ে নুন দিয়ে কি মজা পান?

পেছনে তাকিয়ে দেখি অনিম ভাইয়ার আম্মা।

অনিম ভাইয়ার আম্মার কথা শুনে জমিলা চাচীর মুখটা বন্ধ হয়ে গেল

উনি আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন,,,

মেয়েরা তোমরা বাড়িতে যাও। অনেকে অনেক কথা বলবেন।

দুই দিন পর,,,,

আমরা বাড়িতে ফিরে এলাম।
বাড়ির উঠানে পা রাখতেই বুঝতে পারলাম,,, পরিবেশটা যেন বদলে গেছে।
হাজেরার ঘরের সামনে নতুন একটা কাঠের দোলনা রাখা হয়েছে।
পাশে ছোট ছোট কাপড়ের প্যাকেট।
কেউ যেন অনাগত শিশুর জন্য আগেই সবকিছু কিনে এনেছে।
নিশা দৌড়ে গিয়ে দোলনাটা দেখে আনন্দে চিৎকার করে উঠল।

___ আপু! এইটা কার?

ইভা আপু কিছু বলার আগেই হাজেরার মা বাইরে এসে বললেন,,,

___ কার আবার? আমার নাতির জন্য।

মুন্নী নিষ্পাপ চোখে জিজ্ঞেস করল,,,

___ ছেলে হবে?

হাজেরার মা গর্বিত গলায় বললেন,,,

___ ছেলে হইবো। আমার মেয়ের ঘরে ছেলে ছাড়া আর কী হইবো?

আমি দেখলাম, আম্মা বারান্দায় বসে চুপচাপ সব শুনছেন।

তাঁর মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
কিন্তু তাঁর আঙুলগুলো আঁচলের কোণ শক্ত করে চেপে ধরে আছে।

আমি আম্মার পাশে গিয়ে বসলাম।

___ আম্মা।
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

___ কীরে মা?

___ আপনি মন খারাপ করছেন?

আম্মা কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,,,

___ না রে মা।

আমি জানতাম, তিনি মিথ্যা বলছেন।
কারণ মায়েরা কখনও কখনও নিজের সন্তানদের কষ্ট না দেওয়ার জন্যও মিথ্যা বলে।

সন্ধ্যায় আব্বা বাড়ি ফিরলেন।
হাতে অনেকগুলো বাজারের ব্যাগ।
হাজেরার মা দৌড়ে এসে ব্যাগগুলো নিয়ে বললেন,,,

___ কী আনছ?

আব্বা মুচকি হেসে বললেন,,,
___ ডাক্তার বলছে হাজেরার ভালো খাবার খাওয়া দরকার। ফল আর কিছু পুষ্টিকর জিনিস আনছি।

হাজেরার মা গর্বিত হাসি দিয়ে বললেন,,,

___ এখন তো আপনার ঘরে নতুন মেহমান আসতেছে। তাই সবকিছুতেই খেয়াল রাখতে হবে।

আব্বা কিছু বললেন না।
কিন্তু তাঁর মুখে আনন্দ স্পষ্ট।

ইভা আপু আর আমি ছাদে উঠে বসে আছি। মুন্নী গান গাইতেছে। মুন্নীর গান শুনে আমরা দুই বোন হেসেই অস্থির।

ইভা আপু বললেন,,,

মুন্নী তোর গান শুনে আমার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে এখন

আমি বললাম,,,

মুন্নী তোর এই গান শুনে আমি হতাশ। কিন্তু আমি বলে রাখছি তুই একদিন বড় গায়িকা হইবি।

আমার কথা শুনে ইভা আপু হো হো করে হেসে উঠলেন।

রাতে খাবার টেবিলে হাজেরার মা হঠাৎ বললেন,,,

___ এই যে, এখন থেকে কিন্তু ঘরের খরচের হিসাব একটু বুঝে করতে হবে।

আম্মা চুপ করে খাচ্ছিলেন।
আব্বা তাকালেন।

___ কেন?

___ কেন আবার? সামনে তো বাচ্চা আসতেছে।

ডাক্তার, ওষুধ, কাপড়চোপড়, পরে পড়ালেখা সবকিছুর খরচ আছে।

আব্বা কিছু বললেন না।
হাজেরার মা আবার বললেন,,,
___ আর আপনার আগের সংসারের মাইয়াগুলোর জন্য এত খরচ করলেও তো চলবে না।

আমি অন্য রুমে বসে সুজি খাইতেছি। কিন্তু হাজেরার মায়ের কথাগুলা দেওয়াল ভেদ করে ঠিক ই আসছে।

ওই মহিলার কথা শুনে চামচটা আমার হাত থেকে পড়ে গেল।
ইভা আপু সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে তাকাল।
আম্মা স্থির হয়ে গেলেন।

আমি ওই খানে গিয়ে দেখলাম,,,

আব্বা ধীরে ধীরে হাজেরার মায়ের দিকে তাকালেন।

___ আপনি কী বলতে চাচ্ছেন?

___ আমি কিছুই বলতে চাইতেছি না। বাস্তব কথা কইতেছি। এখন তো আপনার নিজের একটা ছেলে হবে।

হাজেরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,,,,

___ আম্মা, এসব কথা বলবেন না।

হাজেরার মা রেগে বললেন,,,

___ তুই চুপ কর মাইয়া। আমি তোদের ভালোর জন্যই বলতেছি।

কয়েকদিন পরের ঘটনা,,,

আব্বা উঠানের পেয়ারা গাছ থেকে পেয়ারা নিতেছে। আমি আর আম্মা বসে আছি এক কোণে।

ঠিক তখনই ভেতর থেকে হাজেরার কণ্ঠ ভেসে এলো।
___ ওগো, আমার শরীরটা ভালো লাগছে না।

আব্বা সঙ্গে সঙ্গে উঠান দৌড়ে গেলেন। পেয়ারা গুলা ফেলে চলে গেলেন।

আমি আর আম্মা দুজনেই চুপচাপ বসে রইলাম।

কিছুক্ষণ পর আব্বার উৎকণ্ঠিত কণ্ঠ শুনতে পেলাম,,,

___ হাজেরা, কী হয়েছে?

আমি আম্মার দিকে তাকালাম।
আম্মা চোখ বন্ধ করে বসে রইলেন।
তাঁর মুখে কোনো অভিযোগ নেই।
শুধু বুকের ভেতর জমে থাকা এক গভীর ক্লান্তি।

আর সেই মুহূর্তে আমি বুঝলাম,
হাজেরার সন্তান পৃথিবীতে আসার আগেই আমাদের বাড়িতে নতুন এক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
আর এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন,,,

____ হাজেরার কণ্ঠ শুনে আব্বা দৌড়ে তার ঘরে চলে গেলেন।

আমি আর আম্মা বারান্দায় বসে রইলাম।

কিছুক্ষণ পর মাজেদা খালা দৌড়ে এসে বললেন,,,

___ আপা, হাজেরার শরীর খুব খারাপ লাগতেছে। মুন্নী, তুই একটু পানি গরম করে দে।

আম্মা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন।

___ কী হয়েছে ওর?

___ জানি না আপা। মাথা ঘুরতেছে, বমি করতেছে।

আম্মা এক মুহূর্তও দেরি না করে হাজেরার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।

আমি অবাক হয়ে আম্মার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

যে মানুষটার কারণে আম্মার সংসার ভেঙে গেছে, সেই মানুষটার অসুস্থতার খবর শুনে আম্মাই সবার আগে ছুটে গেলেন!

আমি আর ইভা আপুও পেছন পেছন গেলাম।

ঘরে ঢুকতেই দেখি হাজেরা বিছানায় শুয়ে আছে। আব্বা তার মাথার কাছে বসে আছেন।

হাজেরার মা উৎকণ্ঠিত গলায় বলছেন,,,

___ আমার মাইয়ার কিছু হইলে কিন্তু আমি কাউরে ছাড়মু না।

আম্মা শান্ত গলায় বললেন,,,

___ আগে ওরে হাসপাতালে নিয়ে যান। এত কথা পরে বলবেন।

আব্বা যেন কিছুটা স্বস্তি পেলেন।

___ নাজিয়া, তুমি একটু ওর পাশে থাকো। আমি গাড়ির ব্যবস্থা করছি।

আম্মা কোনো উত্তর দিলেন না।

শুধু হাজেরার পাশে গিয়ে বসলেন।

হাজেরা চোখ মেলে আম্মার দিকে তাকাল।

কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না।

তারপর হাজেরা খুব আস্তে বলল,

___ আপা…

আম্মা তার দিকে তাকালেন।

___ কী?

___ আমার খুব ভয় করতেছে।

আম্মার মুখটা কঠিন হয়ে গেল।

___ ভয় পাওয়ার কিছু নাই। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো।

হাজেরা চোখ বন্ধ করে ফেলল।

আমি দেখলাম, তার চোখের কোণ দিয়েও পানি গড়িয়ে পড়ছে।

___ আম্মা মাজেদা খালাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,,,

মাজেদা গর্ভাবস্থার পাঁচ মাসে তো এমন করার কথা না। আমার কিন্তু ব্যাপারটা সুবিধের ঠেকছে না।

চলবে