#শরতের_এক_সাঁঝবেলায়
#পর্বঃ০১
#লেখিকাঃঅনন্যা_অসমি
কাউকে না জানিয়ে অয়ন ভাই তার বান্ধবী দীপ্তি আপুকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে।যাকে বলে পালিয়ে বিয়ে করা।তার কাজে সবাই হতভম্ব,বাকরুদ্ধ।যেহেতু কিছুদিন পর বাড়ির মেয়ের বিয়ে তাই অনেক কাছের আত্নীয়রা বাসায় উপস্থিত ছিলো।কেউ কানাঘুষা করছে,কেউ হাসাহাসি করছে।পালকের চোখ দুটো পানিতে ভরে গেলো।তার প্রচুর রাগ হচ্ছে।অয়ন যদি তার বড় না হতো তাহলে এখুনি একটা থা’প্প’ড় মেরে দিতো।কি করে পারলো সে এটা করতে।সে কি জানে না কেউ তার জন্য আজো অপেক্ষা করছে।
” কি করে তুমি এটা করতে পারলে অয়ন ভাই।তোমার কি মনে একটুও দয়া নেই।তুমি কি জানতে না যে কেউ তোমাকে আজো ভালোবাসে।”
রা’গে পালকের নিজেকে পা’গ’ল পা’গ’ল লাগছে।সে ছলছল দৃষ্টিতে তার আপুর দিকে তাকালো।সে শান্তদৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে।মনে হচ্ছে সে একটা মানবমূর্তি,যার কোন অনুভূতি নেই।পালকের এখন চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছে করছে।
” আপুরে কেন তুই এই বে’ঈমা’নটাকে ভালোবাসতে গেলি।বেঈ’মান’টাতো তোকে ভালোবাসেনিরে আপু,বাসেনি সে।”
পালকের মেজমামা অন্তিম খন্দকার থমথম মুখ নিয়ে অয়ন আর দীপ্তির সামনে এসে দাঁড়ালেন।দীপ্তি উনাকে সামাল করতে গেলে তিনি দূরে সরে যান।এতে দীপ্তি বেশ অপমান বোধ করলো।
” এটা তুমি কি করলে অয়ন?আমাদের বংশে তুমি কি কখনো শুনেছো যে কেউ পালিয়ে বিয়ে করেছে?তোমার যদি বিয়ে করার ইচ্ছেই ছিলো তাহলে আমাদের বলতে আমরা তার পরিবারের সাথে কথা বলে,জেনেশুনে তারপর বিয়ে দিতাম।আমাদের কি তুমি নিজের অভিভাবক মনে করো না?এই শিক্ষা দিয়ে তোমাকে বড় করেছি আমি?এতো বড় বড় স্কুল,ভার্সিটিতে পড়িয়ে কি আমি তোমাকে এটাই শিখিয়েছি?এই কাজটা করার আগে একবার ভাবলে না আমাদের কথা?” শেষের কথাগুলো বেশ রে’গে চিৎকার করে বললেন অন্তিম সাহেব।স্বামীর রাগারাগি দেখে ওনার স্ত্রী রাদিয়া খন্দকার এগিয়ে এলেন।
” আ…..চিৎকার করছো কেন?অয়ন বিয়েই করেছে কোন খু’ন করেনি।আর ছেলের তো বিয়ের বয়স হয়েছে।এখন করার ছেলেমেয়েরা এভাবে বিয়ে করে থাকে।তুমি আর বাড়াবাড়ি করো না তো।”
” তোমার কারণেই সে এই ধরণের কাজ করার সাহস পেয়েছে।কোনদিন তো শা’স’ন করোনি।দেখো একদিন না তোমাকেই কান্না করতে হয়।”
পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে পালকের মা অনিলা শেখ এগিয়ে এলেন ভাইকে শান্ত করতে।
” ভাই শান্ত হ।দেখ অয়ন ছোট মানুষ না বুঝে ভু’ল করে ফেলেছে।যা হওয়ার তা তো হয়ে গিয়েছে।এখন রাগারাগি করে কি লাভ।মেনেনে,দেখছিস তো বিয়ে বাড়ি।এখন কিছু বললে আরো সম্মানহানী হবে।”
বড় বোনের কথায় অন্তিম সাহেব থমথম করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।রাদিয়া বেগম ছেলে আর নতুন বউকে নিয়ে সোফায় বসিয়ে দিলেন।দৌড়ে গিয়ে ফ্রীজ থেকে মেহমানদের জন্য আনা মিষ্টি এনে দু’জনকে খাইয়ে দিলেন।
” বাবা অন্তিম তোর যখন মেয়ে পছন্দই ছিলো তাহলে আমাদের আগে বলতি।ধুমধাম করে তোর বিয়ে দিতাম।”
” মা দীপ্তির বাবা হুট করেই ওর বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিলো।এটা জানতে পেরেই আমার মাথা খা’রা’প হয়ে যায়।তাই কিছু না ভেবেই বিয়ে করেনি আমরা।”
” যা করেছিস ভালো করেছিস।নে এবার মিষ্টি খা।”
সবাই নতুন বউকে নিয়ে ব্যস্ত,সবার মুখে খুশি খুশি ভাব।শুধু খুশি নেই পালক আর তার বোন প্রিসার।প্রিসা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।বোনের কষ্ট পালকের সহ্য হচ্ছে না কিন্তু তারও যে কিছু করার নেই।
” অয়নের বউটা সুন্দর আছে।তাই নারে পালক?”
মায়ের কথা শুনে পালকের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুঁটে উঠলো।
” মা তুমি যদি জানতে তোমার বড় মেয়ের মনের অবস্থা তাহলে কখনোই এই কথাটা বলতে পারতে না।” মনে মনে এটা বললেও মুখে বললো ” হুম সুন্দর।”
নিজের রুম থেকে বেরিয়ে বোনের জন্য বরাদ্দ রুমটা দিকে এগিয়ে গেলো পালক।দরজা টোকা দিলো কয়েকবার কিন্তু প্রিসা খুললো না।পালক জানে তার বোন কি করছে তাই আর বিরক্ত করলো না।
ফিরে আসার সময় পালক অয়নের সামনে পড়ে গেলো।ঘৃ’ণা’ভ’রা দৃষ্টি নি’ক্ষে’প করলো সে।
” আপনি ইচ্ছে করে এরকমটা করেছেন তাই না?” ঘৃ’ণা’মিশ্রিত কন্ঠে বললো পালক।অয়ন কিছু না বলে একটা হাসি দিয়ে চলে গেলো।
” অয়ন ভাই লো’ভ বড়ই খারাপ জিনিস।এই লোভই আপনাকে একদিন কাঁদাবে।”
মেয়ে পালিয়ে বিয়ে করেছে শুনে পরেরদিন সকালে দীপ্তির পরিবার এই বাড়িতে এসে হাজির।পালকের সেজো মামার মেয়ে ফারিয়ার বিয়ে উপলক্ষে সবাই তাদের বাড়িতে এসেছে।প্রথমে তারা রা’গা’রা’গি করলেও পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ফারিয়ার বিয়ে দিন অয়ন আর দীপ্তিরও অনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে সম্পন্ন হবে।বড় ছোট সবাই খুশি।একসাথে দু’টো বিয়ে,তাদের খুশি তো দিগুণ হয়ে গেলো।খুশি নেই শুধু প্রিসা আর পালকের।তারা দু’বোনই ঘরকুনো আর শান্তস্বভাবের।কারো সাথে তাদের অতিরিক্ত মেলামেশা নেয়।তাই এই বিষয়টা কেউ খেয়াল করলো,স্বাভাবিকভাবেই নিলো তারা।
দেখতে দেখতে বিয়ের দিন চলে এলো।অনেক অতিথি এসে দুটো বিয়ে দেখে কিছুটা অবাক হলো তবে তারা এতোটা মাথা ঘামানো না।হইহুলোর করে শেষ হলো বিয়ের অনুষ্ঠান।অন্তিম সাহেব ছাড়া সবাই বিয়েতে খুশি,তবে রাদিয়া বেগম একটু বেশিই খুশি।
বিয়ের দু’দিন পার হয়ে গেলো।যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।শুধু একজন মানুষ কষ্টটা নিজের মধ্যে চেপে রেখে প্রতিটা মূহুর্ত কষ্ট পাচ্ছে।আর তার এই কষ্ট দেখে কষ্ট পাচ্ছে তার ছোট বোন।
বিল্ডিং এর নিচে নামতেই বাড়িওয়ালার সামনে পড়ে গেলো পালক।
” কেমন আছো পালক?”
” জ্বি চাচা আমি ভালো আছি।আপনার শরীর কেমন আছে?”
” শরীর তো বেশ আছে কিন্তু আমার এই মাসের ভাড়াটা যে দিলেনা।”
” আমি এই সপ্তাহের মধ্যে দিয়ে দেবো চাচা।”
” দিলে তো ভালোই না হলে আমাকে নতুন কাউকে খুঁজতে হবে।”
” না না চাচা।আমি যে করেই হোক এই সপ্তাহের মধ্যে দিয়ে দেবো।”
” দিয়ে দিলে তোমাদের জন্যই ভালোই।মনে রেখো কথাটা।”
আজকের সন্ধ্যার পরিবেশ একদম স্নিগ্ধ,শীতল।নীল আকাশে ছেয়ে আছে টুকরো টুকরো মেঘ।আবাসিক এলাকা হওয়ার কারণে রাস্তাটা সন্ধ্যার পর থেকেই নীরব হতে শুরু করে।রাস্তার পাড় দিয়ে হাঁটছে পালক।তার মাথায় হাজারো চিন্তা।আজকের টিউশনটাতে সে অনেক ইতস্তত করে বেতনটা চেয়েছিলো।এই টিউশনটাতে সে সপ্তাহে চারদিন আসে।এটা যদিও বা তার বাসা থেকে একটু দূরে তবে বেতন অন্য টিউশন থেকে বেশি তাই ক’ষ্ট হলেও সে আসে।বর্তমানে ঠিকে থাকতে গেলে কষ্ট গায়ে মাখলে চলে না।ঘর ভাড়াটা তার বড় বোন প্রিসা দিতো কিন্তু তার এখন যা মনের অবস্থা এই সময় এসব বলে সে আরো তাকে ভে’ঙে দিতে চাই না।কিন্তু স্টুডেন্টের মা বলেছে এখন দিতে পারবে না,পরের সপ্তাহে চেষ্টা করবে।এটা শুনে পালক গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়েছিলো।তাদের কাছে রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাবার টাকা সবসময় থাকে শুধু তার মতো পরিশ্রম করে খাওয়া মানুষদের দেওয়া জন্য থাকে না।টাকা কিভাবে ম্যানেজ করা যায় পালক শুধু সেটায় ভাবছে।দেরি হলে বাড়িওয়ালা বে’র করে দিতে একবারো ভাববে না।এই শহরে এতো কম টায় ভালো বাসা পাওয়া সহজ না।
হালকা চিৎ’কা’র চেচা’মেচি’তে পালক নিজের ভাবনার ইতি টানলো।সামনের দৃশ্য দেখে তার চোখ বড় বড় হয়ে গেলো।তিন জন লোক একটা যুবক ছেলেকে মারছে।দু’জন তার হাত ধরে রেখেছে আর একজন তার পকেট থেকে জিনিস বের করছে।পালকের বুঝতে অসুবিধা হলো না এরা আসলে ছি’নতা’ইকা’রী।তবে ছেলেটার পা দুটো কেউ ধরেনি।সে চাইলেই পা দিয়ে মে’রে তাদের সরিয়ে দিতে পারতো।তিনটা ছিন’তাই’কা’রীই রোগাপাতলা।তাদের তুলনায় ছেলেটা অনেকটা স্বাস্থ্যবান।পালক আপাতত এসব নিয়ে ভাবলো না।শান্ত হয়ে চিন্তা করতে লাগলো কি করা যায়।এখন চিৎকার করলে উল্টো সেও বিপদে পড়ে যাবে।আশেপাশে তাকিয়ে পালক একটা লম্বা কাঠের টুকরো পেলো।নিঃশব্দে সেটা তুলে নিলো।পেছন থেকে পরপর তিন জনই সেই কাঠের টুকরো দিয়ে আ’ঘা’ত করলো পালক।আচমকা আ’ক্রম’ণে তিনজনই ছিটকে দূরে সরে গেলো।তারা উঠে দাঁড়ানোর আগেই পালক তাদের আরো দু-তিনটে মে’রে দু’র্ব’ল করে দিলো।
” একদম চা’লা’কি করার চেষ্টা করবি না।আর আমার ক্ষ’তি করার তো মোটেও না।কাঠের টুকরোটা দিয়ে মাথা ফা’টি’য়ে দেবো।আমার বাবা কিন্তু পুলিশের বড়কর্তা।আমি ফোন করলে এখুনি তোদের তুলে নিয়ে জে’লে ঢুকিয়ে দেবে।আর এমন মা’র দেবে যে জীবনে আর উঠে দাঁড়াতে পারবি না।”
পালকের এরকম হু’ম’কি শুনে ছেলেগুলো জিনিস ফেলে পালিয়ে গেলো।ছেলেগুলো চলে গেলো পালক কাঠের টুকরোটা কিছুক্ষণ হাতে রাখলো যদি আবারো ফিরে আসে সেই আশংকায়।অনেকক্ষণ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও যখন বুঝতে পারলো তারা আর ফিরে আসবে না তখন পালক স্থির নিশ্বাস নিলো।আজ পরপর একরকম দুটো ঘটনাতে পালক কিছুটা বিরক্ত।পেছন ফিরে দেখলো যুবকটি এখনো নিচেই বসে আছে।ভ্রু-কুচকে গেলো পালকের।যুবকটার প্রতি কিছুটা বিরক্ত হলো পালক।ছেলেগুলো যখন তাকে ছেড়েই দিয়েছিলো তখন যুবকটি উঠে কয়েকটা মা’র’তে পারতো কিন্তু সে তো একই ভাবেই রাস্তায় বসে আছে।কাঠের টুকরোটা ফেলে পালক একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে যুবকটির দিকে এগিয়ে গেলো।
” আপনি ঠিক আছে?” শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলো পালক।যুবকটি মাথা নাড়িয়ে বোঝালো সে ঠিক আছে।
” উঠুন এবার।আর কতক্ষণ রাস্তায় বসে থাকবেন?বাসায় যাবেন না নাকি?”
ছেলেটি উঠলো না।একইভাবেই বসে রইলো।
” পায়ে মেরেছে বুঝি?নিন আমার হাত ধরুন।” পালক হাতটা এগিয়ে দিলো।
” আমার উইলচেয়ার টা।”
যুবকটির কথায় পালকের বুক ধক করে উঠলো।সে প্রশ্নবোধক চাহনি নিক্ষেপ করলো যুবকটির দিকে।
” উইলচেয়ার মানে!উনি কি হাঁটতে পারেন না?”
চলবে…….