শহরজুড়ে বিষন্নতা পর্ব-০৩

0
338

#শহরজুড়ে_বিষন্নতা
সাদিয়া মেহরুজ

৩.

-” ফ্রী তে অন্যের বাসায় বোঝা হয়ে থাকছেন। আপনার কি কমনসেন্স নেই? ”

মেহতিশা সটান হয়ে দাঁড়ালো। অ প মা নে তার শ্যাম মুখোশ্রী তখন থমথমে হয়ে উঠেছে। কান দু’টো কি ভীষণ জ্বলছে তার! যেন কেও এই মাত্র মরিচের গুঁড়ো লাগিয়ে দিয়েছে।মেহতিশার আত্মসম্মানবোধ প্রবল। কেও তাকে অ প মা ন করে কথা বললে তাকে কড়া জবাব দিয়ে বসে।কোনো কিছুর পরোয়া করে না!

-” অন্যের বাসায় ফ্রী তে বোঝা হয়ে থাকছি মানে? প্রথমত আপনার মা আমায় অনুরোধ করেছেন তার বাসায় থাকতে এবং দ্বিতীয়ত আমার কমনসেন্স আছে কি নেই তা আমি ভালো বুঝব। আপনি প্রশ্ন তোলার কে? ”

আশপাশ আজ কিছুটা নীরব। মানুষের পদচারণ তেমন নেই। যা আছে তাও ক্ষীণ! সারতাজ কয়েক কদম এগোল। মেহতিশা ভ্রু কুঁচকে নেয়। সারতাজ এগিয়ে এসে কন্ঠের খাদ নামিয়ে বলল,

-” জানেন তো, আমার মা ভীষণ দয়াশীল মানুষ। অসহায় আপনাকে দেখেছে তাই সাহায্য করেছে। তাই বলে আপনি এভাবে এতদিন পরে থাকবেন? ”

-” আমি আপনার বাসায় ফ্রী থাকি না। আপনার আম্মুর হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে রয়েছি। ”

সারতাজ ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,

-” অহ আচ্ছা! মা বলেছিলেন আমাকে। বাসায় মেইড দরকার। আপনিই বুঝি সে? আচ্ছা আ’ম সরি।আগে বলবেন না আপনি আমার বাসার মেইড হিসেবে আছেন? ”

মেহতিশা স্থির চোখে তাকিয়ে। সে স্পষ্টত বুঝতে পারছে সারতাজ তাকে কটাক্ষ করছে। নিচু করতে চাচ্ছে। এটা কি সেই পিছে ফেলে আসা তার অপরাধের প্র তি শো ধ হিসেবে করছে? হয়ত তাই! মেহতিশা শীতল কণ্ঠে শুধালো,

-” পিছে ফেলা আসা ভুলের শা স্তি আপনি আমাকে এখন দিচ্ছেন কথার মাধ্যমে তাই না? ”

-” আমার সাথে আপনার কোনো শত্রুতা নেই মেহতিশা। আমি শুধু এটাই রিয়েলাইজ করাতে চাচ্ছি আপনাকে মানুষকে কথার মাধ্যমে আ ঘা ত করলে কতোটা গায়ে লাগে। আই হোপ, নেক্সট আমার সাথে যেই বিহেভটা করলেন তা অন্য কারো সাথে করার আগে দু’বার বিবেচনা করে নিবেন। ”

-” আপনি যদি আমায় কথার মাধ্যমে ছোট করতে চান তো বলা, পৃথিবীর কোনো কাজই তুচ্ছ নয়। সেটা হোক এক সার্ভেন্ট এর কাজ। আমি কিন্তু একজন বাংলাদেশের, একজন বাঙালী হিসেবে আপনার পেশাকেও তুচ্ছ করতে পারি। আপনি তো ফটোগ্রাফার তাইনা? বাংলাদেশের ৫০% মানুষ এই পেশাটাকে তুচ্ছ – তাচ্ছিল্য করে জানেন? তাদের কাছে এই পেশায় থাকা ব্যাক্তিদের অযথা সময় অপচয় করা মনে করেন। তবে আমি আপনার নিকট ক্ষমাপ্রার্থী। আপনাকে একটা চিঠিও দিয়েছিলাম। ক্ষমা চেয়ে! কিন্তু আপনি লাপাত্তা হয়ে গেলেন। যাইহোক, পুরোনো কথা না তুলি। আল্লাহ হাফেজ। ”

সারতাজকে নিশ্চুপ দেখে মেহতিশা আর দাঁড়ালো না। সোজা হাঁটা ধরলো। কুয়াশার জাল ভেদ করে আশেপাশে তখন রৌদ্দুরের আনাগোনা। মিহি, তপ্ত হীন রৌদ্দুরের মাঝে সারতাজ দেখল অন্যরকম এক মেয়ের অবিরত পায়ে হেঁটে চলা। পরক্ষণেই ক্ষীণ রাগে সে কপাল কুঁচকাল! মেয়েটা আর দশটা মানুষের মতো তার প্রিয় পেশাটাকে কটাক্ষ করলো। বহুদিন পর দেশে ফিরে মেহতিশার সাথে তার দর্শন মেলা পুরোটাই কাকতালীয়। সারতাজ ভেবেছিল তাহলে চেপে রাখা ক্ষোভ কিছুটা উগলে দেবে! কিন্তু কিসের কি? উল্টো মেয়েটা তাকে আরো কথা শুনিয়ে গেল। যদিও বা ভুল কিছু বলেনি। তার পেশার কোনো মূল্য সে বাংলাদেশে তেমন একটা পায়নি বাহিরের দেশ ছাড়া।

_

মেহতিশা মেহজাকে পড়াচ্ছে। পড়াচ্ছে বললে ভুল হবে সে একমনে ডুবে আছে ভাবনার সাগরে। মেহজা বোনকে বারংবার আঁড়চোখে দেখছে তো ফের খাতায় অঙ্ক কষছে। মেহতিশা ভাবছে অনিকের কথা। এই প্র তা রক কে সে একদিন কঠিন শা স্তি দেবে! জবাবদিহি চাইবে। উপযুক্ত প্রমাণ জোগাড় করে অনিককে সে জে লে ঢোকাবে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র। ফুপির কাছেও জবাবদিহিতা চাইবে মেহতিশা। তার বিন্যস্ত জীবনটাকে অবিন্যস্ত করার কারণ জানার দরকার।

ভাবনার অতলে ডুবে থাকাকালীন মেহতিশার ফোন কেঁপে উঠল। ম্যাসেজ এসেছে! মেহজার পানে দৃষ্টি দিয়ে সে মুঠোফোন হাতে তুললো। কয়েক প্রহরের মৌনতা। আচমকা উচ্ছ্বাসে হতবিহ্বল হয়ে সে তার ছোট বোনকে আগলে ধরল। মেহজা হকচকিয়ে প্রশ্ন করলো,

-” কি হয়েছে আপা? ”

মেহতিশা কাঁদছে। তার নেত্রদ্বয় দিয়ে পড়ছে তখন আনন্দের অশ্রুকণা। সে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,

-” আমার চাকরি হয়ে গেছে মেহজা। আমার এখন থেকে মুক্ত! নিজেদের বাসায় থাকবো। তোর যা খেতে ইচ্ছে তাই কিনে দিব। তুই সেদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় একটা জামা দেখিয়েছিলি না? ঐটা কিনে দিব তোকে। ”

-” সত্যি আপা? ”

-” সত্যি সোনা। তিন সত্যি। ”

মেহজাকে এই মূর্হতে ভীষণ আনন্দিত দেখালো। নিজের নতুন জামা কিংবা আকাঙ্খা পূরণ হওয়ার লো ভে নয় বরঞ্চ মেহতিশার মুখোশ্রীতে উপচে পড়া খুশির লেশ দেখে!

মেহতিশার চাকরিটা হয়েছে মূলত সালমার সাহায্য এর মাধ্যমে। সালমার মেঝ ভাই এর সেলাই এর কাজে পারদর্শী একজন মেয়ের দরকার ছিলো তার নতুন ব্যাবসার জন্য। মেহতিশা সেলাই এর কাজে বেশ পারদর্শী তা সালমা জানতেন। তিনি ভাইয়ের নিকট মেহতিশার নাম ব্যাক্ত করাতে তিনি ভেবে দেখবেন বলেন। পরবর্তীতে মেহতিশার হাতের কাজ দেখে বিমুগ্ধ হয়ে তিনি মেহতিশাকে আশ্বাস দেন। আজ এক সপ্তাহ বাদে মেহতিশাকে তার নতুন খোলা বিশাল দোকানে কাজের জন্য একটা পদ দেন। মেহতিশাকে সেখানে নতুন আসা কর্মচারীদের সেলাইয়ের কাজ শেখাবে। সে নিযুক্ত হচ্ছে একজন ট্রেইনার হিসেবে।

মেহতিশা রুম থেকে বের হলো। সালমা ওয়াজিদকে তথ্যটা দেয়া প্রয়োজন। সে থাকবেনা আর এখানে। অস্বস্তি, চক্ষুলজ্জায় দম আঁটকে আসে তার।সালমা ওয়াজিদ ছিলেন ড্রইংরুমেই। একাকী বসে আপন মনে কিছু ভাবছিলেন। মেহতিশা তার সম্মুখে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

-” আন্টি? ”

সালমা ওয়াজিদ চেতন ফিরে মেহতিশার প্রতি দৃষ্টি ছুঁড়লেন। নম্র কন্ঠে বললেন,

-” আরে মেহতিশা, বস বস! কিছু বলবি? ”

মেহতিশা বসলো। তার অধর কোণে মিষ্টি হাসির লেশ। সালমার তা দেখে ভালো লাগল। মেয়েটা কত দিন পর হাসছে!

-” আন্টি আমার চাকরিটা হয়ে গেছে। সব আপনার জন্য সম্ভব হয়েছে আন্টি। আমি যে আপনার প্রতি কতোটা কৃতজ্ঞ, ঋণী তা বলে বোঝাতে পারবো না হয়তো। যদি ভবিষ্যতে কখনো সক্ষমতা আসে তবে আমি আপনার ঋণ পরিশোধ করার চেষ্টা করবো। ”

-” বাজে বকবিনা মেহতিশা। এখানে আমার কোনো হাত নেই। আমি তো শুধু তোকে পথ দেখিয়ে দিলাম বাকিটা নিজের যোগ্যতায় তুই অর্জন করেছিস। ”

-” তবুও আপনি আমায় পথ তো দেখিয়েছেন এটার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আন্টি আমি এবার চলে যেতে যাচ্ছি। যেহেতু চাকরিটা হয়ে গেল এবার। মেহজাকে নিয়ে আমি ছোট্ট একটা বাসা ভাড়া করে থাকবো। ”

-” যাবি যা! আমার কোনো বাধা নেই। তুই এখানে থাকতে অস্বস্তি বোধ করছিস বুঝতে পারছি। কিন্তু মা, মাত্রই তো চাকরি পেলে। অনন্তপক্ষে প্রথম মাসের বেতনটা পেয়ে নে। তারপর যা। আমি তোকে জোর করে আঁটকে রাখছি না। তোর ভালোর জন্যই বলছি। ”

মেহতিশা মৌন! বাসা ছাড়ার অস্থিরতার কারণে তার মাথা থেকে বেড়িয়েই গিয়েছে যে তার হাত এখন খালি। টাকা পয়সা কিচ্ছুটি নেই! ঢাকায় বাসা ভাড়া নিতে গেলে অগ্রিম টাকা ছাড়া বাসা ভাড়া দেবে না কেওই। কিয়ৎ লজ্জিত বোধ করলো মেহতিশা। সালমা ওয়াজিদ তার মুখোভঙ্গী দেখে কিছুটা আচঁ করতে পারলেন বোধহয়। তিনি কোমল গলায় বললেন,

-” লজ্জা পাস না। বুঝতে পেরেছি তুই কথাটা ভেবে দেখিসনি প্রথমে। ”

-” আন্টি আমি তবে রুমে যাই। মেহজাকে পড়াচ্ছি তো। ”

-” হ্যা যা। ”

নত মস্তকে উঠে দাঁড়ালো মেহতিশা। নিজের জন্য বরাদ্দকৃত কক্ষে যেতে নিবে তৎক্ষনাৎ প্রখর শব্দ হলো। মেহতিশা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করছে তার বিরক্তি। সারতাজ এসেছে। কাঁধে তার ব্যাগ। গলায় ঝুলানো রয়েছে তার ভীষণ প্রিয় ক্যামেরাটি। সালমা দাঁড়ালেন ছেলেকে দেখে। সারতাজ মেহতিশাকে পাশ কাটিয়ে মায়ের পাশের সোফায় গা এলিয়ে বসল। ক্লান্তিমাখা কন্ঠে শুধাল,

-” বাসায় থাকবো কয়েকমাস। মেইডকে আমার রুম ক্লিন করতে বলো। ”

সালমা ভ্রু কুঁচকালেন! সারতাজের কথা ঠিক হজম হলো না তার। যে ছেলেকে একসময় কেঁদেকেটে শত বুঝিয়েও নিজের কাছে রাখতে পারলেন না আর আজ এত বছর পর নিজ থেকে থাকতে এসেছে? সালমা ব্যাপারটা আর তেমন ঘাঁটালেন না। লম্বা কদম ফেলে চললেন ওপরে! মেহতিশা চলে গিয়েছিল বেশ আগেই। শূন্য ঘরটায় দৃষ্টিপাত নিক্ষেপ করে সারতাজ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।

_

সায়াহ্নকাল। অন্তরীক্ষে ক্ষীণ আলোর পরশ এখনো রয়েছে। নাম না জানা এক ঝাঁক পাখির দল শব্দ সৃষ্টি করতে করতে উড়ে যাচ্ছে আপন নীড়ালয়ে। নামাজ শেষে কিচেনে এসেছে মেহতিশা। এসময় বাড়ির সবাই চা খায়। এই চা বানানোর দায়িত্বটা আরোপ হয়েছে তার ওপর। সালমা তাকে কোনো কাজ করতে না দিলেও রান্না করার কাজটায় বিশেষ বাধা প্রদান করেন না। মেহতিশা দুই কাপ চা করলো। এতদিন এক কাপ করতো। বাড়িতে তেমন মানুষ নেই। সারতাজের বাবাকে এ বাসায় আসার পর একবারও দেখেনি মেহতিশা। বাকি রইল সালমা ওয়াজিদের ছোট দুই ছেলে, ওনারা নিজেদের স্ত্রী নিয়ে লন্ডনে সেটেল।

সালমা ওয়াজিদকে চা দেয়ার পর মেহতিশা যাচ্ছে সারতাজের রুমে। মুখোশ্রীতে তার লহমায় উপচে পড়া বিরক্তির রেশ দেখা দিলো। সারতাজের সামনে যেতে তার ইচ্ছে করেনা। বিরক্ত লাগে! সারতাজ নামক ব্যাক্তিটাই এখন তার নিকট বিরক্তিকর। দরজার কাছাকাছি যেতেই কড়া নাড়ল মেহতিশা। ভেতর থেকে ভারী কন্ঠে সারতাজ সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলো,

-” ভেতরে আসো। ”

বুভুক্ষের ন্যায় ফোনে ডুবে রয়েছে সারতাজ। হাতে থাকা চায়ের কাপ টেবিলে রেখে মেহতিশা চলে যেতে উদ্যক্ত হতেই পেছন থেকে সারতাজ বলল,

-” চায়ে চিনি কম হয়েছে। চিনি দেওয়া লাগবে আরো। ”

মেহতিশা ঘুরে দাঁড়াল। এতটুকু সময়ের মধ্যে এই ছেলেটা কখন চা খেল তা তার বোধগম্য হলো না। সে মৌন থেকেই চায়ের কাপ নিয়ে বেড়িয়ে এলো! তবে কয়েক প্রহর পাড় হওয়ার পর সে বুঝল সারতাজ শুধুমাত্র তাকে বিরক্ত করতে চাইছে। চায়ে চিনি হয়নি, চিনি বেশি হয়েছে, আবার বানিয়ে আনো! বলে কয়ে মেহতিশাকে বিরক্ত করে ফেলেছে সে। চুপচাপ মুখ বুঁজে তাই সয়ে নিয়ে মেহতিশা কেবল সারতাজের আদেশ পালন করলো। সে এখন নতুন করে বানানো চা নিয়ে পুনরায় হাজির হয়েছে। দাঁতে দাঁত চেপে রাগ দমন করে হাতের কাপ টেবিলে রাখলো সে। আঁড়চোখে মেহতিশার মুখোশ্রী দেখে সারতাজ মনে মনে হাসল। মেয়েটাকে রাগলে মন্দ লাগে না। পরক্ষণেই নিজের ভাবনা হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে বলে উঠলো,

-” খেতে ইচ্ছে করছেনা। নিয়ে যান! সামান্য চা বানানো শিখতে পারেননি আপনি? ”

মেহতিশার রাগে, দুঃখে কাঁদতে ইচ্ছে করলো। তিক্ত কন্ঠে সে শুধালো,

-” আপনি আমাকে অযথা বিরক্ত করছেন। ”

সারতাজ অবাক হওয়ার ভান করে বলল,

-” আশ্চর্য তো! বিরক্ত কথায় করলাম? যা সত্যি তা বলবো না নাকি? ”

মেহতিশা প্রতিত্তোর করতে নিলে সারতাজ তাকে থামিয়ে বলল, ” যান এখান থেকে। আমার গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। আপনার সাথে কথা বলে সময় নষ্ট করতে চাচ্ছিনা। ”

মেহতিশা বেড়িয়ে এলো। লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো। সুযোগ পেলে ছেলেটাকে শায়েস্তা করতে হবে। ছেলেটা অযথা তার পিছু লেগেছে না?

চলবে~