শুধু তোমারই জন্য- ৫
জানালা আর পর্দার ফাঁকা দিয়ে আলো এসে রুমটা আলোকিত হয়ে গেছে। কয়টা বাজে, আবিরের ঘুম ভাঙলো আগে, কিন্তু ফোন বের করে দেখতে ইচ্ছে করেছে না। এক হাতের মধ্যে নীলি ঘুমাচ্ছে, ডাকতে ইচ্ছে করছে না। আবির কম্বলটা দিয়ে নীলিকে সুন্দর করে ঢেকে দিলো। নীলির দিকে তাকিয়ে আবির হাসলো, নাহ, সত্যিই এমন কিছু ভাবিনি নীলিবুড়ি, তুমিই কাছে চলে এলে।
এভাবে কাছে এলে তোমাকে ফেরানো দেবতার পক্ষেও অসম্ভব। আবির অন্য হাত দিয়ে নীলির চুল সরাতে সরাতে ডাকলো, নীলি, উঠবে না!
নীলি চোখ মেললো, আবির নীলিকে টেনে বুকের উপর উঠিয়ে দিলো। নীলির খুব নিশ্চিন্ত লাগছিলো, কাল রাতের আবির ছিল অনেক অচেনা, কিন্তু এই আবিরটা পুরোপুরি তার। খুব চেনা। সে কোন অন্যায় করেনি, ভুলও করেনি!
আবিরও তাকে কোন জোর করেনি।
-নীলি, উঠি চলো!
-আরেকটু ঘুমাই?
-তারপর তো এখানেই দিনের অর্ধেক শেষ, ফ্রেশ হয়ে জায়গাটা ঘুরে দেখবে না!
-হু, পরে একটু!
কোথাও ফোন ভাইব্রেট করছে, নীলির ফোন বোধহয়।
নীলি ফোনটা নিলো, দশটা বাজে, মা ফোন করছেন।
নীলি উঠে বসে ফোন রিসিভ করলো।
-হ্যালো, কোথায় তুমি, সকাল থেকে তিনবার ফোন করলাম! দেখোনি?
–না মা, ঘুমাচ্ছিলাম!
–এত বেলা পর্যন্ত?
–রাতে দেরী হইছে ঘুমাতে!
-আচ্ছা শোনো, ওই ছেলে মানে আবির তোমাকে আর ফোন করেছিলো?
নীলি আবিরের দিকে তাকালো একবার।তারপর বলল, -করেছিল!
–কই বললা না তো!
–বলার কি আছে মা, তেমন কিছু না তো!
ফোন করতে পারে না?
-বেশি বুঝবা না, এরপর ফোন করলে আর বলার দরকার নেই, বলবে পরীক্ষা আছে, ব্যস্ত। দেখা করারও দরকার নেই।
নীলি বলল, কি হইছে আবার?
-কিছু হয় নাই, তোমার মামা আসছিলো, সবার সাথে কথা হইছে, তোমার মত নিয়ে তো বিয়ে হয় নাই,তাই ওদের সাথে কথা বলে কোন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নীলি বুঝলো না বিষয়টা।
শুধু বলল, আচ্ছা। ফোন করলে কি সমস্যা?
-সমস্যা আছে, তোমার কথা বলতে হবে না।
-ঠিক আছে! রাখি এখন।
-আচ্ছা, পড়াশোনা কইরো।
নীলি ফোনটা রাখলো। তারপর আবার আগের মতো আবিরের বুকে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো!
-কি হয়েছে নীলি, মা কী বলছে?
-কিছু না! পড়তে বলছে।
মা যা বলেছে এটা শুনলে আবির রেগে যাবে, এখনকার এই মিষ্টি সময়টা নীলি নষ্ট করতে চায় না। আবিরকে নিয়ে তার আর কোন সমস্যা নেই। আবিরকে সে বুঝতে পারছে, আবিরও তাকে বুঝেছে।
–নীলি, আমার কাছে পুরোপুরি ভাবে কবে চলে আসবে?
-চলে আসলাম তো!
–আমাদের বাসায় কবে থেকে থাকবে?
নীলি উত্তর দিলো না।
আবির বলল, তুমি যেখানে থাকো, মান্থলি পে কেমন করতে হয়?
-সাড়ে আট হাজার, আমরা আট দশ জন থাকি, মেসের মিল সহ!
-আচ্ছা, উত্তরা থেকে আসা যাওয়া করতে কষ্ট হবে?
-না, ভার্সিটির ট্রান্সপোর্ট আছে!
-আচ্ছা, যে কদিন ওখানে আছো, তোমার আর বাড়ি থেকে কোন টাকা আনার প্রয়োজন নেই, যখন যেভাবে লাগবে, আমাকে জানাবে।
–কিন্তু আব্বু তো বলল, সব আগের মতোই থাকবে।
আপনাকে কিছু দিতে হবে না।
-সে বলুক, আমার বউ না তুমি, তোমার সব দায়িত্বই তো আমার। বলতে ইচ্ছে না করলে টেক্সট করে রেখো।
কিন্তু প্লিজ না করো না।
নীলি কথা বললো না। এখন এসব কথা ভালো লাগছে না। অন্যকিছু শুনতে মন চাইছে, উনি কি বুঝতে পারছেন না, নীলির আরো আদর পেতে ইচ্ছে করছে!
তাহলে কী হবে, নীলি মরে গেলেও বলতে পারবে না!
আবির আর কথা না বলে নীলিকে আরো একবার কাছে টেনে আনলো! নীলির মাথা ভরা চুল দুপাশে পরে একটা দেয়াল তৈরি হয়ে গেলো। আবির নীলির ঠোঁটে চুমু খেলো চোখ বন্ধ করে। নীলি আবিরকে জড়িয়ে ধরে ফেললো নিজের অজান্তেই।
১৩
পুরো জায়গাটা সুন্দর করে গোছানো।নীলি দৌড়ে দৌড়ে ঘুরে দেখছিলো। কেউ নেই এখানে, দুটো হরিণ ছেড়ে রেখেছে। চকচকে গা, নীলি এত কাছ থেকে হরিণ দেখেনি আগে। একটা খরগোশ দেখা যাচ্ছে। অভয়ারণ্য করার চেষ্টা করেছে। আবির খরগোশটা হাতে তুলে নিলো, নীলি কাছে গিয়ে খরগোশটা কোলে নিয়ে হাঁটতে লাগলো।
পুকুর ঘাটটা বাঁধানো, তবে শীতকাল বলে তেমন পানি নেই। রোদ উঠে গিয়েছে।
নীলি বলল, আমরা কখন যাচ্ছি?
আবির বললো, সেটা আপ টু ইউ, তুমি যখন বলবে, তখনি বের হওয়া যাবে।
-আচ্ছা, আমরা রাতে যাই? আমার দশটার মধ্যে বাসায় ঢুকলেই হবে!
-তুমি চাইলে আমার রাতটাও এখানে থেকে কাল ভোর ভোর বের হতে পারি!
নীলি ঘাড় নেড়ে হ্যা বললো।
-তবে কাল আমার কাজ আছে, অনেক ভোরে বের হতে হবে। তোমাকে পৌছে আমার নটার মধ্যে অফিসে ঢুকতে হবে।
-আপনার নিজের অফিস না, টাইমলি ঢুকতে হবে কেন?
— নিজের অফিস বলেই টাইমলি ঢুকতে হবে, এখনো এত বড় কিছু হয়ে যাইনি, আমি ঠিক না থাকলে, আমার অফিস স্টাফরা কেন ঠিক থাকবে বলো!
নীলি মাথা নাড়লো, ঠিক।
– যাই হোক, তুমি কি আমাকে আপনি করেই বলবে?
নীলি সামনে এগিয়ে গিয়েছিলো, আবিরের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, বলি এখন!
-অবশ্য শুনতে খারাপ লাগছে না, বেশ একটা রাজকীয় ভাব আছে! জাহাপনাও বলতে পারো! তুমি আমার ছোট্ট রাজত্বের বেগম!
নীলি হি হি করে হেসে ফেললো।একটা জায়গায় লোহার দোলনা বসানো আছে, নীলি খরগোশরা ছেড়ে দিয়ে নিজে বসে দোল খেতে লাগলো। পাশেই গাছের নিচটা বাঁধানো লাল সিমেন্টে। আবির সেখানে বসলো। নীলিকে দোল খেতে দেখতে ভালো লাগছে। আচ্ছা আবিরের কী নীলির সব কিছুই ভালো লাগছে, চুলের ঘ্রাণ থেকে চোখ মুখ, সহজ উচ্ছ্বলতা!
এসব কী এত সহজে পাওয়া হয়ে গেলো আবিরের!
জীবন কী এত সহজ সুন্দর!
নীলি দোল খেতে খেতে বললো, এটা ব্যক্তিগত রিসোর্ট তাই না?
-হু, ওদের নিজেদেরই লাগে। গেস্ট আসে, ক্লায়েন্ট, বায়ার মিটিং করতে। সিজনে হয়ত ভাড়াও দেয়। এসকর্ট সার্ভিসও আছে।
বলেই আবিরের মনে হলো এটা বলা ঠিক হয়নি, নীলি কি ভাববে এখন!
নীলি এসকর্ট সার্ভিস বিষয়টা বুঝলো না তাই কোন পাল্টা প্রশ্ন করলো না।
-জায়গাটা কিন্তু অদ্ভুত সুন্দর, এরকম একটা জায়গা থাকলে কিন্তু খারাপ হয় না নিজের!
-তুমি এরকম কিছু চাও?
নীলি দোল খেতে খেতে বলল,
চাইলেই তো।চেরাগের দৈত্য আমাকে দিয়ে দিবে না!
-তোমার তো একটা দৈত্যের মতো বর আছে, বছর দশেক সময় দাও, আমি তোমাকে এরকম কিছু একটা করে দিবো!
-সত্যিই?
-হ্যা, সত্যিই ইনশাআল্লাহ, আবির হাসছে।
নীলি হাঁটতে হাঁটতে শুরু করলো। একটু থেমে আবিরকে জিজ্ঞেস করলো, কি যেন বললেন, এসকর্ট সার্ভিস?
ওহ নো, মেয়েটা ঠিক মনে রেখেছে, আবির মনে মনে বলল, মুখে বলল, নীলি ছাদটা সুন্দর, চলো দেখে আসি! বাইরে থেকে সিড়ি।
নীলি ভুলে গিয়ে হাঁটতে লাগলো সিড়ির দিকে। আবির ভাবলো, আপাতত ভুলে গেছে মনে হয়, মনে মনে হাসি পেলো। যথেষ্টই ছেলেমানুষ আবার কখনও অনেকটা ম্যাচিউরড। সবমিলিয়ে বউটা একদম আমার মনের মতো হয়েছে। ভীষণ মিষ্টি। নানাভাইকে একটা “থ্যাঙ্কস” দিয়ে আসতে হবে একসময়।
১৪
মোফাজ্জল সাহেবের বয়স বাহাত্তর হবে, তবে তিনি সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ। এখনো রোজ সকালে মর্নিং ওয়াক সেরে তারপরে চা খান। খুব নিয়ম মেনে চলেন। ঝাল, তেল মশলা দেওয়া খাবার খান না এবং খাওয়ার প্রতি তেমন আগ্রহীও নন। নিয়মানুবর্তিতা তাকে অনেকটাই সুস্থ রেখেছে। কর্মজীবনে ভূমি অফিসে চাকরি করেছেন।
তারপর ব্যবসা করেছেন। নীতি আদর্শের জন্য তিনি সর্বদা পরিচিত ছিলেন। তাই তার পরিবারের সাথে আত্মীয়তা করার ইচ্ছে ছিলো নীলির দাদাভাইয়ের।
যাই হোক, মুমূর্ষু বন্ধুকে দেখতে আসলেন যখন, তখন নুরুজ্জামান সাহেব সেই কথা তুললেন, মোফাজ্জল সাহেবের আবীরের কথা মনে হলো। আবিরকে তিনি পছন্দ করেন। সবাই বলে, আবির অনেকটা তার মতো হয়েছে।
মেয়েটা অল্পবয়সে বিধবা হওয়ার পরে তিনিই দেখেছেন ওদের। তবে আবির ছাত্রজীবন থেকে নিজেই কিছু করার চেষ্টা করে চলেছে। দাঁড়িয়েও গিয়েছে ছেলেটা।
নীলি একটু বেশিই ছোট হয়ে যায়, এটা ছাড়া আর কোন সমস্যা মনে হয়নি। আবিরের মাও না করলো না। এখন নতুন করে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। নীলি নাকি আবিরকে পছন্দ করছে না। সারাজীবনের ব্যাপার, এমন হুড়োহুড়ি করে বিয়ে দিলে কি হবে, এখনো সই ছাড়া কিছু হয়নি, তাই সময় থাকতে নীলির সাথে বিয়েটা ভেঙে দিতে চায় নীলির মা। বাবার কথা কিছু শোনেননি, বন্ধু নুরুজ্জামান তো অসুস্থ, তার কথা আর কেউ ভাবছে না। যে কোন সময় চলে যাবেন। নীলি আবিরের পুরো জীবনটা সামনে পড়ে আছে। এই কথা বলতে এসেছে নীলির মামা।
তিনি বললেন, নীলি তো আবিরের সাথে মেশেইনি, একটু মেলামেশা করে দেখুক, তাতে তারা রাজী নয়।
একবার নিজের মেয়েকে বলেছেন বিয়ের কথা, মেয়ে রাজী হয়েছে। আবিরও না করেনি, না দেখেই বিয়ে করেছে। সেখানে কিভাবে তিনি আবার ছাড়াছাড়ির কথা বলবেন।তবে মেয়ে রাজী না থাকলে এই বিয়ে টানার কোন মানে হয় না। তাই তিনি আবিরের আম্মাকে ফোন করলেন।
নীলির মামার সাথে কথা বলিয়ে দিলেন।
আবিরের মা সব শুনলেন, নীলির মায়ের আচরণ তার প্রথম থেকেই স্বাভাবিক লাগেনি, মেয়েটাও অনেক কাঁদছিল, কে জানে প্রেম ট্রেম আছে হয়তো। যাই হোক, সমস্যা টানার চাইতে শেষ হওয়া ভালো। কি দরকার যে সম্পর্ক তারা চায়না সেটা টেনে আনার। তিনি নীলির মাকে ফোন করলেন। কুশলাদির পরে জানতে চাইলেন, আপনারা যে সিদ্ধান্ত নিতে চান, নীলি কি সেটা জানে? নীলির মত আছে? আর আপা আপনি তো মেয়েটাকে আপন করতেই দিলেন না! দূরে দূরে রাখলেন।
নীলির মা কাঁদো কাঁদো স্বরে , আপা আমার মেয়ে, আমি তো জানি সে কী রকম হইতে পারে।
আপনার পরিবার, ছেলের বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নাই, কিন্তু পরে যদি এডজাস্ট না হয়, তখন কি হবে বলেন। আমার তো মেয়ে, এখনো সই ছাড়া বিয়ের কিছুই হয়নি।
আবিরের মাও বুঝলেন সমস্যাটা। কিন্তু আবিরকে কথাটা বলবেন কিভাবে! আবিরকে অনেক বুঝিয়ে রাজী করিয়েছিলেন বাবা তার তিনি। রাতারাতি ফোন করে নিয়ে বলেছেন, বিয়ে করতে হবে, ছেলেটা মেয়ে না দেখেই বিয়ে করে এসেছে। কিন্তু এটাও সত্যি, এই ঘটনায় আবিরের চাইতে মেয়েটার দাগ লাগবে বেশি।
মেয়ের পরিবার যদি না চায় তাহলে তিনি কী করবেন!
নীলির মা বললেন , আপা সামনের মাসের মাঝামাঝিতে আমরা কাগজ পাঠিয়ে দিবো।কিচ্ছু করা লাগবে না আপনাদের। শুধু ছেলের সইটা দিলেই হবে।
আবিরের মা মুখ কালো করে চিন্তিত হয়ে ফোন রাখলেন।
১৪
আবির আর নীলির পুরো দুটোদিন স্বপ্নের মতো কেটে গেলো। আবির এতো কাজের প্রেশার থাকে, বিজনেস মানেই চিন্তা, ওর কাছে এই দুটো দিন মনে হলো অনেক দিনের চাহিদা ছিল। পুরোপুরি নিশ্চিন্ত, কাজের কোন প্রেশার নেই, কোন ফোন কল নেই, শুধু দুদিন নীলির সাথে খুনসুটি করে কাটানো হলো। আর রাত গুলো ছিলো স্বপ্নের চাইতেও অনেক বেশি কিছু। নীলিকে অন্যভাবে কাছে পাওয়া। নীলিকে এত পরিণত আশা করেনি আবির। অথচ আবিরের সমস্তটা জুড়ে নীলি জায়গা নিয়েছে।
রাতের কোন একসময় আবিরের মনে হয়েছে, আজকের পরের রাতগুলো নীলির শূন্যতায় ভুগবে আবির। নীলির আলতো ছোঁয়া, চুলের সুবাস অথবা মিষ্টি একটা অচেনা সুগন্ধ আবিরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো। নীলি অবশ্য এত কিছু বিস্তারিত ভাবতে পারেনা।
তবে আবিরের শক্ত হাতে নীলির অনেক নির্ভরতা।
দুটো দিন মনে হয়নি অচেনা কোথাও অপরিচিত কারো সাথে নীলি থাকছে। প্রতি মুহূর্তে আবির খেয়াল রেখেছে।
বিয়ে বিষয়টা আসলেই হয়ত ঐশ্বরিক কিছু হতে পারে।
এ দুবছরে অনেক বন্ধু হলেও প্রেম করা হয়নি নীলির।
তাই আবিরের প্রতি মুগ্ধতার আবেশ হয়তো ওকে প্রেমের অনুভূতিটাই এনে দেয়। যেটা সম্পূর্ণ অপরিচিত নীলির কাছে। শুধু মনে হয়, আবিরটা পুরোপুরি তার।
অনেক অধিকারবোধ আর ভালোবাসা মাখা আবির, শুধুই নীলির। নীলিকে নিয়ে সকাল সকাল বের হয়ে পড়েছিলো আবির। ব্রেকফাস্ট করা হয়নি।
নীলি বলল, মেসে খেয়ে নিবে,আবির যেন অফিসে ব্রেকফাস্ট করে। সময় ছিলো না।তাই আবির না করেনি।
ঢাকায় ঢুকে নীলি একবার জিজ্ঞেস করলো, আমি ফোন করবো আপনাকে?
আবির হেসে বলল, কেন করবে না, যখন মন চায় করবে! যা খুশি বলবে! তোমার ইচ্ছে।
নীলি আর কিছু বললো না। নীলির বাসার কাছে ঢোকার আগে একটা নিরিবিলি রাস্তায় গাড়ি থামালো আবির।
নীলি জানতে চাইলো, এখানে নেমে যাবো? আবির একটু হেয়ালি করে বললো, নীলি, আমাদের সম্পর্কটা এখন স্বাভাবিক? কি মনে হয় তোমার?
নীলি বোকা নয়, এই কথার মানে সে বুঝতে পারলো।
লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো।
আবির সিটবেল্ট খুলে দুষ্টুমি মাখা হাসিমুখে নীলির কাছে এগিয়ে গেল। দুহাতে নীলির গাল ধরে চুমু খেলো।
নীলি এতো লজ্জা পাচ্ছিল , তাকাতেই পারলো না, আবিরকে নিষেধ করতেও ইচ্ছে করছে না।
একটু পরে আবির সরে গেল। নীলির অসহ্যরকম ভালোলাগা ছুঁয়ে গেল সমস্ত শিরা উপশিরায়।
নীলিকে পৌছে দিয়ে আবির নিজের অফিসে চলে গেল।
১৫
রাতের দিকে আবির দুদিন পরে বাসায় ফিরেছে। সারাদিনে নীলির সাথে কথা বলার ফুসরত পায়নি। ফ্রেশ হয়ে নীলিকে ফোন করলো। নীলি শুয়ে পড়েছিলো। দুদিনে অভ্যাস খারাপ হয়? হয় মাঝে মাঝে, আজকে নীলির খুব একা লাগছে, ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। আবিরের ফোনটা তুললো নীলি।
-হ্যালো!
নীলির ভয়েস শুনে আবিরের মনে হলো নীলির মন খারাপ লাগছে।
-কি হয়েছে নীলি? মা কিছু বলেছে তোমাকে?
-না তো, এমনিই একটু খারাপ লাগছিলো!
– শরীর ঠিক আছে তো?
-হু!
-নীলি একজন ডাক্তারের সাথে আমাদের কথা বলা প্রয়োজন, to discuss about our conjugal life! তোমাকে নিয়ে যাবো আমি। দেখি এই সপ্তাহে যেদিন সময় পাই, সেদিনই যাবো।
নীলির খুব অস্বস্তি লাগছিলো, লজ্জা লাগছিলো, তবে আবিরের কথাটা সত্যি খুব জরুরি। মায়ের সাথে তো কিছু বলাই যাবে না
-আচ্ছা তুমি ঘুমাও।
– রাতে খেয়েছেন?
-না যাচ্ছি এখন। একটু দেরী হয়েছে ফিরতে। ভালো কথা, তোমার বাসায় একসময় বলো যে আমার সাথে দেখা করেছো আলাদাভাবে।
-আচ্ছা।
-আচ্ছা রাখছি তাহলে, বাই।
– বাইই।
খেতে বসেছে আবির। আবিরের মা খাবার দিতে দিতে বললেন, একটা কথা ছিলো, মাথা গরম করবি না কিন্তু!
-মাথা গরম তোমার সাথে তো করি না মা।
-মানে নীলির বিষয়ে….
–কি বিষয়ে? শপিং শুরু করেছো?
আবিরের মা প্রমাদ গুনলেন। ছেলেটা কি ভাবছে, আর তিনি কি বলতে যাচ্ছেন!
-আবির আব্বু সোনা, নীলির মায়েরা চাইছে না বিয়েটা থাক। নীলির নাকি এডজাস্ট করতে সমস্যা হবে!
আবির খেতে খেত হেসে বলল, নীলির সমস্যা হবে এটা নীলি বলেছে?
-না নীলি বলেনি, ওর মতামত নেওয়া হয়নি, তাই ও বিয়েটা মেনে নিতে পারছে না।
আবির আবারও হাসলো। মেনে নিতে না পেরেই আমাকে এভাবে জড়িয়ে ছিলো! আমার শীত করছে দেখে নিজেই কাছে চলে এলো একটা কম্ফোর্টার নিয়ে, তাহলে মেনে নিলে কি করতো!
-তো এখন কি করতে হবে?
-ওরা চায়, যেভাবে সই করে বিয়েটা হইছে, ওরা পেপার পাঠাবে, তুই সই করে দিবি!৷ বিষয়টা কাগজে মিটে যাবে, কোন ঝামেলা হবে না!
আবির হাসলো।
আবিরের মা বললেন, তুই বিষয়টা এত হালকা ভাবে নিস না বাবা।ওর হয়তো অন্য পছন্দ টছন্দ আছে। আমি বলি কি, এমন সই তো কত করিস, একটা সই দিয়ে দিস। আমি আরো ভালো মেয়ে আনবো তোর জন্য।
আবির কথা না বলে খাওয়া শেষ করলো।
তারপর বলল, এগুলো একটাও নীলির কথা না।কথাগুলো তাদের পছন্দ মতো তারা বানিয়েছে।নীলির সাথে আমার কোন সমস্যাই হবে না।এই দুইদিন নীলি আমার সাথে ছিলো!
আবিরের মা চমকে উঠলেন, এবার তো অন্যদিকে যাচ্ছে!
-তোর সাথে ছিল মানে? আমাকে তো বলিসনি? নীলির মা বাবা জানে?কোথায় ছিলি তোরা? হুট করে এমন কিছু করার আগে আমাকে জানাবি না?
-একে একে বলছি, আমার একটা কাজে ঢাকার বাইরে ক্লায়েন্টের রিসোর্টে যাওয়ার কথা ছিলো, আমি নীলিকে বলেছিলাম আমার সাথে যেতে, ও গিয়েছে। তোমাকে জানাইনি কারন এটা আনুষ্ঠানিক কিছু না। নীলির বাসায় জানে না, কারন নীলি ভয়ে বলতে পারেনি। তারা নীলিকে খুব প্রেশার দেয়, যেটা বুঝলাম, এটা অবশ্য খারাপ না, সন্তানের মঙ্গলের জন্য দিতেই পারে কিন্তু আমার জন্য বিষয়টা ভালো হয়নি। নীলি ভয় পায় তার প্রমান ও প্রথমে বিয়েটা করতে চায়নি কিন্তু নাও করতে পারেনি। আর আমি আমার কোন বান্ধবী বা প্রেমিকা নিয়ে যাইনি, আমার বউ নিয়ে গেছি। নীলিও যার তার সাথে যায়নি, নিজের হাজবেন্ডের সাথে গিয়েছে। আমাদের কালচারে যতোই স্বামী যতোই অপরিচিত হোক, স্বামীর সাথে মেয়েরা যে কোন জায়গায় যেতে পারে।
আবিরের মা কি বলবেন বুঝতে পারছেন না। কিভাবে জিজ্ঞেস করবেন, ওদের মধ্যে কোন সম্পর্ক হয়েছে কিনা! ঢাকার বাইরে দুদিন ছিলো, তো সম্পর্ক হওয়াটাই স্বাভাবিক । এখন তো ঝামেলা বেড়ে গেলো!
তিনি বললেন, নীলি যদি ভয়ে সই করে দেয়, তখন কি করবি!
আবির খুব দৃঢ়ভাবে বললো, নীলির বয়স বিশ+, এখন তারা যদি গোপনে সই করায় তাহলে আমি মানবো না।নীলিকে আমার সামনে বসে সই করতে হবে। তুমি ওদের এটাই বলবে। আমার একটাই দাবি, তারা যে কাগজটা পাঠাবে, সেই কাগজে সই আমরা কাবিননামায় যেভাবে একসাথে করেছি, ওভাবেই একসাথে সামনাসামনি সই করবো! নীলি যদি তখন সই করে দেয়, দেন ওকে ফাইন৷ আমার কোন সমস্যা নাই।–বলে আবির চলে গেলো।
আবিরের মা এবার সত্যিই চিন্তায় পড়লেন। কতদূর কনফিডেন্স থাকলে আবির এমন একটা কথা বলতে পারে, সেটা তিনি জানেন। আরো একটা বিষয় বুঝতে পারছেন, আবিরের নীলিকে মনে ধরেছে, খুব ভালো ভাবেই।
-আল্লাহ, আমার ছেলেটা যেন কষ্ট না পায়, যা ভালো হয়, তাই করো তুমি!–মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করলেন আবিরের মা।
–চলবে
শানজানা আলম