শুধু তোমারই জন্য-(শেষ)
আবির কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, ওদের জানিয়ে দাও, আমি কাল রাতে যাবো।
-কাল রাতে যাবি, মানে পরশু একটা কিছু ফাইনাল হবে, তাই তো!
-হুম, আবির আর কথা বলল না।
এমন কিছু হতে পারে সেটা সে ভাবেনি। নীলিকে এমন ভাবে জড়াতে চেয়েছে, যে নীলি আবিরকে ছাড়তে পারবে না। কিন্তু নীলি এটা কি করলো! আবিরের উপর এত অভিমান করে ফেললো! একটু অপেক্ষা করতে পারলো না!
নীলি তো জানে, আবির কতটা ব্যস্ত, এই কাজটা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। আবির এই দেড় মাসে অনেক বদলে গেছে, শুধু নীলির জন্য, আবিরের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ নীলি। নীলি ছাড়া সে কিছুই ভাবতে পারে না এখন। কিন্তু কাজটা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এত দিনের একটা প্রজেক্ট।
আবির এক মুহূর্তের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে গেলো।
পরশু যদি সত্যি নীলি আর আবির আলাদা হয়ে যায়, নীলির তো আবার বিয়ে হবে! অন্য কোন মানুষের হাতে মাথা রেখে এক হাতে তাকে জড়িয়ে ঘুমুবে নীলি! নীলির চুলে অন্য কেউ মুখ গুজবে! অসম্ভব, কল্পনায়ও আনা যাচ্ছে না!!
আবির যথেষ্ট ম্যাচিউরড। মা ঠিকই বলেছে,নীলির মতো একটা মেয়ের ইমোশনের উপর ভরসা করা ঠিক হয়নি, সে যখন নীলিকে ভালোবাসে, তখন নীলিকে বলা উচিত ছিল। নীলি পরিবারের কথা শুনে না দেখে বিয়ে করে ফেলা মেয়ে, ওর উপর পরিবারের প্রভাব বুঝতে পারা প্রয়োজন ছিলো। নিজের উপর রাগ হচ্ছে, এত বড় ভুল আবির কি করে করলো!
নীলিকে কত অসংখ্যবার বলেছে, নীলি আমাকে ছেড়ে যেও না, এই কথার গভীরতা কি বোঝেনি নীলি?
নীলির উপর রাগ হচ্ছে। আচ্ছা এরপর কি নীলিকে অন্য কেউ রাগিয়ে দিবে, নীলি গাল লাল করে বসে থাকবে!
নীলি অন্য কারো কাছে এগিয়ে আঙুলে ভর করে মুখ উঁচু করে চুমু খেতে চাইবে! অন্য কারো মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে? পারবে নীলি? কিভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব!
আবিরের মনে ঝড় শুরু হলো, বারবার ফোন করেও ফোনটা সুইচ অফ বলছে! আবির মাথা ঠান্ডা করে ফেললো! কালকের কাজটাও গুরুত্বপূর্ণ। কাল রাতে যাবে বাদামহাটি। পরশু সকালে নীলির বাড়িতে যাবে। নীলির সাথে কথা বলে, তারপর সিদ্ধান্ত হবে। মানুষ যেমন ভাবে তেমন তো হয়না সবসময় , তাহলে তো সব কিছুই ঠিকঠাক চলতো, ভবিতব্য বলে কিছু থাকতো না।
আবির পরদিন মাথা ঠান্ডা রাখলো, কোন ভাবেই উত্তেজিত হওয়া যাবে না। অফিসের কাজ শেষ করে নানাভাইকে ফোন করে জানিয়ে দিলো, ও রওনা দিয়েছে।।
নীলির সময়টা কিভাবে কেটে যাচ্ছে ও বুঝতে পারছে না।
একটা অনুভূতিশূন্য অবস্থা। প্রচন্ড আঘাতে যেন সাড় শূন্য হয়ে যায় তেমন কাটলো কিছুক্ষণ।রাতে শুনলো সকালে আবির আসবে!
আবির আসবে শুনে একটা অন্য রকম অনুভূতি হতে শুরু করলো। একটু কোথাও অপেক্ষা, একটু অনিশ্চয়তার মাঝামাঝি অবস্থা! খাওয়া দাওয়া করেনি একদম। দরজাও খোলেনি খুব একটা। আবির সত্যিই ডিভোর্স করে দিবে নীলিকে! কিভাবে পারবে!!
শেষ রাতে ঘুম ভেঙে গেলো নীলির। হঠাৎ আবিরের একটা কথা মনে হলো! আবিরকে যখন জিজ্ঞেস করেছিলো প্রোগ্রামের বিষয়ে, আন্টি আসবে নাকি বাদামহাটি, আবির বলেছিলো, আমি গিয়ে তোমাকে নিয়ে আসবো!
সত্যিই কি তাই হবে! নাকি আবির সই করে ডিভোর্সের প্রাথমিক কাজ শেষ করে চলে যাবে। কাল থেকে একবারো কথা হয়নি আবিরের সাথে, আবিরকে একটা ফোন করবে? ফোন তো ভাঙা, গতকাল ভেঙে ফেলেছে।
আবির কি ভাবছে, তা তো নীলি জানে না, বুঝতেও পারছে না। একটা অদ্ভুত অপেক্ষা শুরু হলো নীলির, কোন কিছু শেষ বা শুরুর!
সকাল সকাল আবির পৌছালো বাদামহাঁটি। ক্লান্ত ছিলো, পুরো রাত ঘুম হয়নি, নীলিকে ফোনও করেনি। নানাবাড়ি পৌছাতেই মোফাজ্জল সাহেব বললেন, নানু, গোসল করে ফ্রেশ হও, নাস্তা খাও! তারপর যাই?
আবির নানুকে কে বলল, চলো, আগে তোমার নাত বৌ নিয়ে আসি?
–কি মনে হয়, আসবে?
–আসার তো কথা! দেখা যাক কি করে।
-আমি তোমার মাইনুল মামাকে সাথে নিতে চাই,
-কাউকে লাগবে না, চলো তুমি।
-নানু এইটা তো তোমার ঢাকা শহর না, মাইনুলের কথার একটা দাম আছে, এইখানে সবাইরে সবাই মানে।
এটা শুনে আবির রাজী হলো। নানাভাই আর মাইনুল মামাকে নিয়ে চলে এলো নীলিদের বাড়িতে।
৩৫
সকাল দশটা।
নীলিদের বৈঠকখানা। নীলির মামা, বাবা, চাচা সবাই বসে আছেন। আবির আর আবিরের নানা, সাথে মাইনুুল মামা ঢুকলেন। সকাল থেকে নীলির মা খুব টেনশনে আছেন, কয়েকবার নীলিকে দেখে এসেছেন। কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে, নাস্তা করতে ডাকার সাহস পাননি!
নীলির বাবা মুখ নিচু করে বসে আছেন। এসব কাহিনী যেন বাবার কানে না যায়, নীলির মাকে সাবধান করেছেন কয়েকবার।
আবির কিছু বলল না।
নীলির মামা বললেন, নীলির মা নীলিকে নিয়া আসো, ঝামেলা তো নাই, সই দিয়ে যাক!
-নীলি দরজা খোল, আবির আসছে- নীলির মা ডাকলেন নীলিকে। নীলি ধড়ফড় করে উঠে বসল। আবির এসেছে, মনে হচ্ছে দৌড়ে ছুটে চলে যায়।
নীলি বিছানা থেকে নেমে সোজা হেঁটে চলে এলো, পেছন থেকে মা বললেন, সামনে মুরুব্বিরা আছে, মাথা কাপড় দিয়ে যাও।
কে কার কথা শোনে! নীলি থামলো না।
নীলিকে দেখে আবিরের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো কিন্তু কিছু প্রকাশ করলো না! মনে হয় খাওয়া ঘুম বাদ দিয়ে বসে ছিল!
নীলির মনে হলো, এমন দেখাচ্ছে কেন আবিরকে, মনে হয় খাওয়া দাওয়া করেনি, সারারাত জার্নি করে এসেছে!
আবির খুবই দ্বিধান্বিত , নীলিকে কী বলবে, যদি নীলি না করে দেয়! আবির একটু সাহস করে বলেই ফেলল, “নীলি, আমি তোমাকে নিতে এসেছি, তুমি কি যাবে আমার সাথে?”
নীলির মুখে হাসি ফুটে উঠলো, সে চমকালো না। নীলি জানতো তার আবির এটাই বলবে!
নীলি বলল , একটু দাঁড়াও , দাদুভাইকে বলে আসি!
-আমি আসব ?
-আসো।
সভার মাঝখান থেকে আবির উঠে চলে গেলো নীলির সাথে।
নীলির মামা নড়েচড়ে বসলেন। আবিরের নানুর মুখে স্মিতহাসি। নীলির বাবা কিছু না বললেও মনে মনে খুশি। নীলির মা এবারে বুঝতে পারবে, মেয়েটা বড় হয়েছে।
নীলির মা কিছুই বুঝতে পারছেন না, এসব কি হচ্ছে!
নীলি আবিরকে পছন্দ করেছে!! কই তাকে তো বলল না! মেয়েটা বড় হয়ে গেলো, তার কোলছাড়া হয়ে গেলো!
নীলির মাকে নীলির ফুপু আম্মা ভিতরে নিয়ে গেলেন।
-বড় বৌ, এইটাই উচিত কাজ হইছে, তোমার নীলি তোমার আদরের। কিন্তু একটা বয়সের পরে আদর পাল্টায়। নীলি নীলির স্বামীর সাথে সুখে থাকবে বৌ, এইটা মাইনা নাও।
নীলির মা কোন কথা বললেন না। চুপ করে বসে রইলেন।
৩৬
দাদুভাই নীলির হাতটা আবিরের হাতে দিয়ে বললেন, কখনো ছাইড়ো না দাদা।
আবির দাদুভাইয়ের হাত ধরে বলল, ছাড়বো না দাদু। আপনার দোয়া নিতে আসছি।
নীলির দাদুভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার পরে আবির নীলিকে নিয়ে বের হলো। বাড়ির বাইরে এসে নীলিকে বলল, একটু ভরসা রাখতে আমার উপর!
নীলি আবিরের বাহু জড়িয়ে বলল, খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো জানো!
আবির নীলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, জানি।
তারপর হেসে বলল, এই ধাক্কায় “আপনি” টা উড়ে গেছে, ভালো হয়েছে তাই না!!
নীলি সলজ্জ হাসিতে আবিরের বাহুতে মুখ লুকালো।
আবির ফিসফিস করে বলল, নীলি, খুব ভালোবাসি তোমাকে।
নীলি উত্তর দিলো না উত্তর দেওয়ার দরকারও নেই, আবির জানে নীলি কি উত্তর দিবে, নীরবতাই বড় উত্তর মাঝে মাঝে। সকালে গাঢ় কুয়াশা ছিল, কুয়াশা ভেঙে রোদ উঠছে এখন।
শানজানা আলম