#শুধু_তোমারই_জন্য
#অন্তিম_পর্ব
#Ornisha_Sathi
আরাধ্যা বসে একমনে আহিয়ান আর আনিতার কথা ভাবছিলো। ওদের দুজনের কথা শুনে আরাধ্যার চোখেও পানি। শুভ মুচকি হাসলো আরাধ্যাকে দেখে। মেয়েটা বড্ড আবেগী। এ দুমাসে শুভ এটা অন্তত বেশ ভালো ভাবেই বুঝতে পেরেছে। পারিবারিক ভাবেই দুজনের বিয়ে হয়েছে গত সপ্তাহে৷ তার মাস দেড়েক আগে আংটি বদল হয়েছিলো। শুভর বিয়েতে সব্বাই ছিলো শুধুমাত্র ওর প্রানপ্রিয় বন্ধু আনিতা ছাড়া। আনিতাকে ছাড়া সব্বাই কেমন মনমরা হয়েছিলো। বিয়েতে তেমন হই হুল্লোড় করতে পারেনি কেউ। আনিতার মৃত্যুর প্রায় বছর দেড়েক পড়ে রোদেলা আর তন্ময়ের বিয়েটা হয়। আনিতার চলে যাওয়া আর আহিয়ানের অবস্থার কথা ভেবেই ওরা বিয়ের ডেট পিছিয়ে দিয়েছিলো। ফাইয়াজ আর তাসকিয়ারও বিয়ে হয় বছর তিনেক আগে। জেরিন আর রাতুলের সম্পর্কটা বাসায় থেকে মেনে না নেওয়াতে মাস ছয়েক আগেই দুজন পালিয়ে বিয়ে করেছে। জেরিনদের বাসায় এখনো মানেনি। তবে রাতুলদের বাসায় মেনে নিয়েছে। চুটিয়ে আট নয় বছর প্রেম করে অবশেষে রাতুল আর জেরিন এক হতে পেরেছিলো।
আনিতা বেঁচে থাকলে আজ ওদের সম্পর্কেরও প্রায় নয় বছর হতো। বিবাহিত জীবনের সাতটা বছর পেরিয়ে যেতো আজ৷ কথাটা ভেবেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো শুভ। ঠোঁটের কোনে মুচকি হাসির রেখা ফুটিয়েই আরাধ্যার দিকে টিস্যু এগিয়ে দিলো। আরাধ্যা টিস্যু নিয়ে চোখের পানি মুছে শুভকে বলে,
–“আহিয়ান আর আনিতার কথা শুনে আমারই ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। কান্না পাচ্ছে প্রচুর। আর আপনার চোখের কোনে পানি আবার ঠোঁটেও মুচকি হাসি? কিভাবে পারছেন হাসতে?”
–“আনিতা যে যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিলো আমাদের মুখে সবসময় ও হাসি দেখতে চায়। যতটা সম্ভব ওর সেই শেষ কথাটাই রাখার চেষ্টা করছি।”
–“আচ্ছা আহিয়ান কোথায়? উনি কি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পেরেছিলো? নাকি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে? আনিতার কথা রাখতে কি উনি সত্যি অন্যকাউকে বিয়ে করেছিলো?”
–“থাকলে তো কথা রাখবে।”
–“মানে?”
–“চলো আমার সাথে।”
এইটুকু বলেই শুভ আরাধ্যার হাত টেনে ধরে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে যায়। প্রায় ঘন্টা দুয়েক ড্রাইভ করার পর শুভ ওদের গ্রামে এসে পৌঁছালো। আরো মিনিট দশেক ড্রাইভ করে শুভ একটা বড় কবরস্থানের সামনে এসে গাড়ি থামায়। শুভ নেমে আরাধ্যাকেও গাড়ি থেকে নামায়। শুভ সামনে ইশারা করে আরাধ্যাকে বলে,
–“ওই যে ডান পাশের কোনার যে কবরটা দেখছো ওটা আনিতার। আর ওর ঠিক পাশের কবরটাই আহিয়ান ভাইয়ার।”
–“মানে? আহিয়ান মারা___”
–“হ্যাঁ আহিয়ান ভাইয়া মারা গিয়েছে। আনিতার মৃত্যুর মাস ছয়েক বাদেই আহিয়ান ভাইয়ার মৃত্যু হয়।”
–“কি্ কিভাবে হলো?”
–
অতীত ____
আনিতার মৃত্যুর পর সেদিন হসপিটালে আহিয়ান একা একাই প্রায় ঘন্টা খানেক প্রলাপ করার পর একদম নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিলো। হাজার বার ডেকেও হাজার কিছু বলেও আর আহিয়ানের মুখ দিয়ে একটা কথাও কেউ বের করতে পারেনি কেউ। আনিতার মৃত্যুতে একদম পাথর হয়ে গিয়েছিলো ছেলেটা। হসপিটালের বিল চুকিয়ে আনিতাকে ওদের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই দাফন করা হয় আনিতাকে। আনিতাকে হসপিটাল থেকে বাড়িতে নেওয়া থেকে ওকে দাফন করা পর্যন্ত একটা কথাও বলেনি আহিয়ান। একদম চুপচাপ ছিলো। এমনকি আনিতাকে যখন খাটিয়াতে করে নিয়ে যাওয়া হয় কবরে রাখা হয় তখনও আহিয়ান পুরো নিশ্চুপ ছিলো। শুধু চোখ বেয়ে পানি পড়তো ছেলেটার। আনিতাকে দাফন করে সবাই যখন চলে আসছিলো তাদের সাথে আহিয়ানও ছিলো। কিন্তু হঠাৎই কিছু একটা ভেবে থেমে যায় আহিয়ান। ওর মনে হচ্ছে ও ওর লাইফের সবথেকে কাছের এবং মূল্যবান জিনিসটাকে পিছনে ফেলে আসছে। বুক ফেঁটে যাচ্ছিলো ওর। তাই ওখান থেকেই আবার “আনিতা” বলে দৌড়ে আনিতার কবরের সামনে গিয়ে হাটু ভেঙে বসে পড়ে। আহিয়ানের পিছন পিছন ফাইয়াজ তন্ময় রাতুল শুভ আরহান এবং নাহিয়ানও দৌড়ে আসে। আহিয়ানকে টেনে ওখান থেকে সরাতে চায় সবাই কিন্তু ও কিছুতেই ওখান থেকে উঠছে না। আনিতার কবর জাপটে ধরে আছে। আহিয়ান বার বার চিৎকার করে আনিতাকে ডেকে যাচ্ছে। কিন্তু আনিতা শুনতে পাচ্ছে না। ও তো চিরনিদ্রায় শায়িত আছে। আহিয়ান চিৎকার করে কাঁদছে আর বলছে,
–“আনিতা? এই আনিতা উঠো না প্লিজ। দেখো আমার না খুউব কষ্ট হচ্ছে। আমি পারছি না তোমাকে ছাড়া থাকতে। তুমি না আমার কষ্ট সহ্য করতে পারো না? তাহলে এখন কি করে আমাকে কাঁদতে দেখেও তুমি ওখানে একা একা ঘুমোচ্ছো? আনিতা উঠো না প্লিজ। আমি এত করে ডাকছি তোমায় তুমি তবুও উঠবে না? তুমিও চাও আমি কষ্ট পাই তাই না? আমাকে কষ্ট পেতে দেখে তোমারও খুব ভালো লাগছে তাই না? তুমি না বলতে আমার চোখের পানি তোমার একদম সহ্য হয় না? তাহলে আজ কিভাবে সহ্য করছো তুমি? আনিতা দেখো না আমি কাঁদছি। কাঁদছি #শুধু_তোমারই_জন্য আনিতা। প্লিজ উঠো না আনি। আমার চোখের পানি মুছে দিবে না আনিতা? আমার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলবে না “ভালোবাসি আহিয়ান” বলো বলবে না? এখন থেকে কে আমায় ভালোবাসি বলবে পিচ্চিপাখি? কে আমাকে শাসন করবে? কে রাগ দেখাবে আমার উপর? কে আমার কাছে ঝালমুড়ি ফুচকা খাওয়ার আর ঘুরতে যাওয়ার বায়না ধরবে পিচ্চি? কাকে আমি পিচ্চিপাখি বউ বলে ডাকবো? প্লিজ উঠো না? আর একটা বারের জন্য ফিরে আসো না আমার কাছে আনিতা প্লিজ।”
বার বার চিৎকার করে এসব বলছে আর কাঁদছে আহিয়ান। ওর চিৎকার করে কাঁদার ফলে রাস্তার আশেপাশের মানুষ ভীর জমাচ্ছে সেখানে। কেউ কেউ আনিতার কথা ভেবে বলছে,
–“বড্ড ভাগ্য করে এমন একটা বর পেয়েছিলো মেয়েটা।”
আবার কেউ কেউ আহিয়ানের জন্য আফসোস করছে। মনে মনে বেশ দুঃখ প্রকাশও করছে আশেপাশের লোকজন। আহিয়ানকে কোনোভাবেই সামলানো যাচ্ছিলো না। ওরা সকলে মিলে আহিয়ানকে ধরে খুব কষ্টে বাসায় নিয়ে আসে। বাড়ি ভরা লোকজন। প্রায় সকলেই কাঁদছে আনিতার জন্য। আনিতার আম্মু আর দাদু কাঁদতে জ্ঞান হারাচ্ছে। অনিমাও এককোনে বসে আনিতার আর ওর দুজনে ফটোফ্রেমটা বুকে আগলে কাঁদছে।
–
আনিতার মৃত্যুর আজ সাতদিন পূর্ন হলো। মসজিদে মসজিদে মিলাদের ব্যবস্থা করা হয়েছে আর অসহায় দরিদ্রদের একবেলা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে আনিতাদের বাসায়। জুম্মার নামায পড়ে ফাইয়াজ শুভ রাতুল ওরা আনিতার কবর জিয়ারত করে বাসায় ফিরে আসে। প্রায় ঘন্টা খানেক হতে চলল আহিয়ানকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সারাবাড়ি খুঁজেও কোত্থাও পেলো না ওকে। তখন তন্ময় ওদের মনে হলো বাসায় আসার আগে ওরা আনিতার কবর জিয়ারত করতে গিয়েছিলো। আহিয়ান আবার ওখানেই রয়ে যায়নি তো? তন্ময় নাহিয়ান আর শুভ সাথে সাথেই কবরস্থানের দিকে রওনা হয়।
সেখানে গিয়ে ওরা দেখে আহিয়ান আনিতার কবর আঁকড়ে ধরে কাঁদছে আর বারবার আনিতাকে ডেকে যাচ্ছে। বহু কষ্টে ওরা তিনজনে আহিয়ানকে ওখান থেকে বের করে বাসায় নিয়ে আসে। আনিতা মারা যাওয়ার পর থেকে প্রতিদিনই আহিয়ান ওর কবরের কাছে গিয়ে পড়ে থাকতো। আর প্রতিদিনই ওকে এভাবে ধরে বেঁধে বাসায় নিয়ে আসা হতো।
আনিতার মৃত্যুর নয়দিনের মাথায় আহিয়ানকে নিয়ে ঢাকায় ফিরে আসে নাহিয়ান ওরা। তন্ময় রাতুল আরহানও ঢাকায় ফিরে আসে। আহিয়ানের পাগলামো দিনকে দিন বেড়েই চলছিলো। এভাবে চলতে থাকলে আহিয়ানেরও যেকোনো কিছু হয়ে যেতে পারে। তাই ওকে নিয়ে ঢাকায় ফিরে সকলে। আজ বিকেলেই ওরা ঢাকায় এসে পৌঁছায়। রাত আটটার দিকে আহিয়ানকে নিয়ে ডক্টরের কাছে যাবে। কথা বলা আছে আগে থেকেই৷
সাড়ে সাতটা নাগাদ নাহিয়ান গিয়ে বারবার আহিয়ানের দরজায় কড়া নারে কিন্তু আহিয়ান একবারের জন্যও সারা দেয়নি। সেই যে গ্রামে থেকে ফিরে রুমে এসে রুম লক করেছে এরপর আর একবারের জন্যও রুম থেকে বের হয়নি ও। বাসার সকলে চিন্তায় পড়ে যায়। আহিয়ানের যদি কিছু হয়ে যায়? উল্টাপাল্টা কিছু করবে না তো আবার? একেক জনের মনে একেক রকম ভয় বাসা বাঁধছে। নাহিয়ান এক্সট্রা চাবি এনে আহিয়ানের রুমের দরজা খুলে দেখে পুরো রুম অন্ধকার করে হাটুতে মুখ গুজে মেঝেতে বসে আছে আহিয়ান। বিছানা জুড়ে ওর আর আনিতার নানান রকমের ছবি এলব্যাম আনিতার জিনিসপত্র এসব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ভাইয়ের এমন অবস্থা দেখে নাহিয়ানের চোখের কোনে পানি চিকচিক করে। নাহিয়ান গিয়ে আহিয়ানের কাঁধে হাত রাখতেই আহিয়ান পাগলামো শুরু করে৷ জিনিসপত্র ছুড়তে থাকে এদিক ওদিক। নাহিয়ান কিছু বলতে গেলে আহিয়ান একটা ফুলদানী নাহিয়ানের দিকে ছুড়ে মেরে বলে,
–“খবদ্দার কেউ আমার কাছে আসবে না। একদম আমাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করবে না। আমাকে টাচ করার অধিকার শুধুমাত্র আমার আনিতার। ও ছাড়া আমাকে আর কেউ টাচ করতে পারবে না। কেউ না।”
এই বলে আহিয়ান একের পর এক জিনিস নাহিয়ান ওদের দিকে ছুড়ে মারতে থাকে। আহিয়ানের আম্মু আহিয়ানের কিছুটা কাছে এসে বলে,
–“আমার কথাটা শোন বাবা। আমরা আজকে___”
–“বেড়িয়ে যাও তোমরা। বেড়িয়ে যাও আমার রুম থেকে। আমি একা থাকতে চাই। আমাকে একা থাকতে দাও প্লিজ। আমার কাছে কেউ আসবে না৷”
নাহিয়ান রুহি নাহিয়ানের আম্মু তিনজনে হাজার চেষ্টা করেও আহিয়ানকে কোনোকিছুই বুঝাতে পারলো না। একপ্রকার বাধ্য হয়েই আহিয়ানের রুম থেকে বের হয়ে যায় ওরা।
এভাবে চলতে থাকে সময়। কেটে যায় ছয় ছয়টা মাস। আহিয়ান এখনো নিজেকে রুম বন্দি করে রেখেছে। রুমে কেউ আসলেই পাগলের মতো আচরণ শুরু করে দেয় ও। তিনবেলা রুমে খাবার দিয়ে যেতো ইচ্ছে হলে খেতো নয়তো ওভাবেই প্লেটে খাবার পড়ে থাকতো। কোনো কোনো সময় টানা তিন/চারদিনও না খেয়ে থাকতো। ছেলের এমন করুন অবস্থা দেখে আঁচলে মুখ গুজে কাঁদেন আহিয়ানের আম্মু। এর মাঝে আনিতার আম্মু দাদু আর অনিমা এসেছিলো তিনবার আহিয়ানকে দেখতে। কিন্তু আহিয়ান কারো সাথেই কথা বলেনি। শুধু অনিমার সাথে কথা বলেছে। অনিমার কাছে আনিতার হাজারো গল্প করেছে। অনিমাকে বলতো আনিতা ফিরবে। ফিরতে ওকে হবেই। অনিমা কিছু বলতে পারতো না। শুধু কান্না করে যেতো।
আজ সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই তুমুল বেগে বৃষ্টি শুরু হয়। বিদ্যুৎ চমকানোর শব্দে আহিয়ান মেঝে থেকে উঠে গুটিগুটি পায়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়৷ আজ ছয় মাস পর আহিয়ান বারান্দায় গেলো। বাইরের আলো বাতাস দেখলো। আহিয়ান বারান্দার গ্রীল ভেদ করে বাইরের দিকে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির পানি ছুঁইয়ে দেয়।
–“আনিতার তো বৃষ্টি খুব পছন্দ ছিলো। বৃষ্টি হলেই বৃষ্টিতে ভেজার বায়না ধরতো পাগলীটা।”
একা একা এইটুকু বলেই আহিয়ান রুম থেকে বের হয়ে যায়। উদ্দেশ্য ছাদে যাবে। বৃষ্টিতে ভিজবে ও। ওর মনে হচ্ছে আনিতাও বৃষ্টিতে ভিজছে৷ ছাদে গেলেই আনিতার দেখা পাবে ও। তাই সরাসরি ছাদে চলে যায় বৃষ্টিতে ভেজার জন্য। আহিয়ানের আম্মু নিজের রুমে আর রুহি কিচেনে থাকায় দেখতে পেলো না আহিয়ান বাসা থেকে বের হয়েছে। আহিয়ান ছাদে গিয়ে ভিজতে শুরু করে। আর একা একাই কথা বলছে। ও নিজেই প্রশ্ন করছে আবার ও নিজেই সে প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে। ওর মনে হচ্ছে আনিতা ওর সামনে। আর ও আনিতার সাথেই কথা বলছে।
বৃষ্টি থামার বদলে আরো বেড়ে চলছে। বৃষ্টি দেখে সাথে সাথেই রুহি কিচেনে চলে আসে ভূনা খিচুড়ি আর ঝাল ঝাল করে গরুর মাংস কষাতে। আহিয়ানের পছন্দের খাবার এটা। বৃষ্টির দিনে ভূনা খিচুড়ি আর ঝাল ঝাল গরুর মাংস হলে তো আহিয়ান খুশিতে লাফিয়ে উঠে। আহিয়ানের জন্য রুহির রাধতে ইচ্ছে করলো। বৃষ্টির দিন আর নিজের পছন্দের খাবার ভেবেও যদি ছেলেটা একটু খাবার মুখে তুলে তাও ভালো।
প্রায় ঘন্টা দেড়েকের মাঝে রুহি রান্না শেষ করে একটা প্লেটে দু চামচ ভূনা খিচুড়ি আর একটা ছোট বাটিতে করে গরুর মাংস নিয়ে আহিয়ানের রুমের দিকে যায়। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে লাইট অন করে রুহি। কিন্তু আহিয়ানকে কোত্থাও দেখতে পেলো না। ওয়াশরুম বারান্দা সবকিছু দেখলো কিন্তু কোথাও নেই। রুহি চিন্তিত হয়ে নাহিয়ানের কাছে গিয়ে সবটা বলে। নাহিয়ানও চিন্তায় পড়ে যায়৷ ফোন বের করে দাড়োয়ানকে কল দেয়। দাড়োয়ান জানায় আহিয়ান নিচে নামেনি। প্রত্যেক ফ্ল্যাট খুঁজে কোথাও না পেয়ে অবশেষে ছাদে যায় ওরা। সেখানে গিয়ে দেখে আহিয়ান বৃষ্টিতে ভিজছে আর একা একা কথা বলছে৷ নাহিয়ান দৌড়ে ছাদে গিয়ে নাহিয়ানকে টেনে নিয়ে নিজেদের ফ্ল্যাটে আসে।
এমনিতেই অসুস্থ শরীর মানষিক যন্ত্রনার মাঝে আছে তারউপর আবার এতটা সময় বৃষ্টিতে ভিজেছে। ফলে রাতেই প্রচন্ড হারে খিঁচুনি দিয়ে জ্বর উঠে আহিয়ানের। ডক্টর এসে একটা ইঞ্জেকশন দিয়ে মেডিসিন লিখে যায়৷ সময় যত যাচ্ছে আহিয়ানের জ্বর তত বাড়ছে। রুহি হাত পায়ের তালুতে তেল মালিশ করছে। আহিয়ানের আম্মু জলপট্টি দিচ্ছে কিন্তু কিছুতেই আহিয়ানের জ্বর কমছে না। সারারাত প্রচন্ড জ্বর থেকে অবশেষে ভোরের দিকেই আহিয়ানের হৃদস্পন্দন থেমে যায়৷ আহিয়ান চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার আগে জ্বরের ঘোরে শুধু একটা কথাই বলেছিলো,
–“আমি আসছি পিচ্চিপাখি। আর তোমাকে ওই অন্ধকার ঘরে একা থাকতে হবে না।”
পরপর এভাবে সকলের আদরের দুজনকে হারিয়ে আনিতার পরিবার আহিয়ানের পরিবার সকলেই যেন শোকে পাথর হয়ে যায়৷ তাদর আদরের দুই ছেলে মেয়ে অকালেই তাদের আগে এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যায়।
–
বর্তমানে___
এইটুকু বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো শুভ। আরাধ্যার চোখ আবারো জলে ভরে উঠেছে। কতটা ভালোবাসলে মানুষ এমন পাগলামো করতে পারে সেটাই ভাবছে আরাধ্যা। সত্যি আনিতা খুব লাকি ছিলো। আনিতা সেই মেয়ে যে কিনা আহিয়ানকে কিছু সময়ের জন্য হলেও নিজের করে পেয়েছে। শুভ নিজের চোখের কোনে জমা পানিটুকু মুছে আরাধ্যার চোখের পানিটাও মুছে দিলো। তারপর আরাধ্যার হাত ধরে নিয়েই গাড়িতে বসালো। নিজেও গাড়িতে উঠে বসলো। গাড়ি ড্রাইভ করতে লাগলো শুভ। আরাধ্যা অসহায় চোখে শুভর দিকে তাকিয়ে বলে,
–“সরি।”
–“কেন?”
ড্রাইভিং করতে করতেই উত্তর দেয় শুভ। আরাধ্যা শুভর বাহু জড়িয়ে ধরে বলে,
–“আনিতাকে নিয়ে আপনায় ভুল ভাবার জন্য।”
–“তোমার জায়গায় অন্যকেউ থাকলেও একই কাজ করতো। কোনো মেয়েই মানতে পারতো না তার হাজবেন্ডের বেডরুমে অন্য একটা মেয়ের বড় করে ছবি ঝুলিয়ে রাখাটা। তোমার ক্ষেত্রে তুমি ঠিকই ছিলে।”
–“তবুও সরি। আমার উচিত ছিলো আপনাকে ভুল ভাবার আগে সত্যিটা আপনাকে জিজ্ঞেস করা।”
–“এবার আর কোনো ভুল বুঝাবুঝি নেই তো? সব ক্লিয়ার তো তোমার কাছে? জানলে তো এবার আমার রুমে বড় করে টাঙিয়ে রাখা ওই ছবির মেয়েটা আসলে আমার কি হয়?”
–“হ্যাঁ জানি তো। আপনার সবথেকে কাছের বন্ধু আপনার আত্তার একটা অংশ আপনার বেস্টফ্রেন্ড আনিতা।”
–“হুম গুড।”
প্রত্যুত্তরে আরাধ্যা আর কিছু না বলে ভালো করে শুভর বাহু জড়িয়ে ধরে বসলো। শুভ একমনে ড্রাইভ করছে। ভেতরে ভেতরে ওর যে ভীষণ রকমের কষ্ট হচ্ছে আনিতার কথা ভেবে। কিন্তু বাইরে থেকে সেটা প্রকাশ করতে পারছে না। আসলে ও প্রকাশ করতে চাচ্ছে না। যতটা সম্ভব নিজেকে হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করছে। কয আনিতার শেষ কথা ছিলো ওরা যেন সবসময় হাসিখুশি থাকে।
–
আনিতা ছাড়া আহিয়ান অসম্পূর্ণ। আহিয়ান ছাড়া আনিতা অসম্পূর্ণ। ওরা দুজন দুজনকে ছাড়া অচল। একজন হারিয়ে গেলে অপরজনের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই তো আনিতা চলে যাওয়ার মাস ছয়েক বাদেই আহিয়ানও চলে গেলো না ফেরার দেশে। সব ভালোবাসা পূর্নতা পায় না। কিছু কিছু ভালোবাসা অপূর্ণতার মাঝেই পূর্নতা পায়। আনিতা আর আহিয়ানের ভালোবাসাটাও ঠিক তেমন। অপূর্ণতার মাঝেই পূর্ণতা পেয়েছে। ওদের দুজনের ভালোবাসাটাও পূর্নতা পাবে। হয়তো এই পৃথিবীতে পায়নি। কিন্তু ওপারে গিয়ে দুজনে ঠিকই মিলিত হবে। পূর্ণাঙ্গ ভাবে পূর্ণতা পাবে দুজনের ভালোবাসা।
।
।
।
সমাপ্ত।