শুভ্র নীলাভ আকাশে মেঘের আনাগোনা পর্ব-৩৩+৩৪

0
553

#শুভ্র_নীলাভ_আকাশে_মেঘের_আনাগোনা(৩৩)
#Israt_Bintey_Ishaque(লেখিকা)
(কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ)

বিকাল বেলা থেকে আবারো গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মানুষজনের রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে ভিশন হিমশিম খেতে হচ্ছে।
রামিসা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আশেপাশে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করা মানুষজন দের আসাযাওয়া দেখছে।

গ্রিল গলিয়ে বাহিরে হাত বাড়িয়ে দিতে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির ফোঁটা ছুঁয়ে দিচ্ছে রামিসার হাত।
বৃষ্টির সময় দোয়া কবুল হয় । বৃষ্টির পানি স্পর্শও করা (সুন্নত)।
বৃষ্টির সময়ের দোয়া ফেরত দেয়া হয় না।[১]

আয়েশা [রা.] বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃষ্টি হতে দেখলে বলতেন,
বৃষ্টি দেখলে দোয়াঃ উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা সায়্যিবান নাফিয়া
অর্থঃ হে আল্লাহ! মুষলধারায় উপকারী বৃষ্টি বর্ষণ করুন।[২]

আনাস [রা.] বলেন, ‘আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে থাকাকালে একবার বৃষ্টি নামল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাঁর পরিধেয় প্রসারিত করলেন, যাতে পানি তাকে স্পর্শ করতে পারে। আমরা বললাম, আপনি কেন এমন করলেন? তিনি বললেন, কারণ তা তার রবের কাছ থেকে মাত্রই এসেছে।[৩]

রামিসা বৃষ্টির পানি ছুঁড়ে সমগ্র বিশ্বের জ্বীন জাতি থেকে শুরু করে মানুষের জন্য দো’আ করলো। নিজের জন্য চাইতে গিয়ে অনাগত সন্তানের জন্য চাইলো, সে যেন সুস্থ সবল ভাবে পৃথিবীতে আসতে পারে এবং তাকে যেন নেক হায়াত দান করেন।তার বাবা যেন এ নিয়ে কোন ঝামেলা না করে আমীন,সুম্মা আমীন!
মাঝে মাঝে নবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দূরুদ শরীর পাট করতে ভুললো না রামিসা। কেননা দোয়া কবুল হয় (কোনো দোয়ার মধ্যে দুরূদ অন্তর্ভূত না থাকলে সেই দোয়া আল্লাহ্‌র কাছে পৌঁছায় না।)
.
.
মাগরিব নামায পড়ে ফাইজা, আলো,নূর আর রামিসা মিলে পপকন খাচ্ছে আর আড্ডা দিচ্ছে।

আপরদিকে,
দুই বেয়াইন মিলে, আয়েশা আর ফাহমিদা খাতুন এর আনন্দের সীমা নেই। কেননা দুই ফ্যামিলি’তেই নতুন অতিথি আসতে চলেছে। আয়েশা বিকেলে আসার পথে সুখবর নিয়ে আসার সাথে সাথে মিষ্টি কিনে নিয়ে আসেন, সাথে নূর’কে ও নিয়ে আসেন তাহলে। প্রথমে আয়েশার মুখেই শুনতে পান মেয়ের প্রেগনেন্সির কথা ফাহমিদা।”লেখিকা ইসরাত বিনতে ইসহাক”এক খুশির মধ্যে আরেকটি খুশীর সংবাদ শুনে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে প্রায় কেঁদেই দেয়।

রামিসা তার মা’কে জরিয়ে ধরে।
ফাহমিদা খাতুন বলে,
-” “মা শা আল্লাহ” আমার মেয়েটা কবে যে বড় হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না।

তারপর আলোর দিকে তাকিয়ে চোখের পানি মুছেন। সেদিনের পর থেকে তিনি অনুতাপে নিপীড়িত হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। এতো আনন্দের মাঝেও মেয়েটাকে একটু আদর করতে পারছেন না। এতেও এক ধরনের শাস্তি ভোগ করছেন ফাহমিদা খাতুন।
.
কথায় কথায় রামিসা নূর কে বললো,
-” আপু সম্পর্কে আমি আপনার বড় হলেও বয়সে ছোট তাই তুমি সম্বোধন করলে খুশি হব আমি।

নূর খুশি হয়ে বললো,
-” আমারো আপনি করে বলতে ভালো লাগছিল না,কিন্তু তুমি বা অন্যরা কি মনে করবে তাই বলা হয়নি।
-“আচ্ছা ঠিক আছে এখন থেকে বলবেন তাহলেই হবে।

ফাইজা বললো,
-” ইশ আমার ভাবতেই আনন্দে কেমন যে লাগছে বলে বোঝাতে পারবো না তোমাদের। বেবিদের কোলে নিয়ে আদর করতে আমার ভিশন ভালো লাগে।
আচ্ছা নূর তোমাদের খুশীর সংবাদ কবে শুনবো বলো তো?

নূর লজ্জা পেয়ে বললো,
-” আসলে আপু পড়াশোনা শেষ না করে ভাবতে পারছি না। মাষ্টার্স কমপ্লিট করে ইনশা আল্লাহ।

তারপর নিজেদের মধ্যে এটা ওটা নিয়ে কথা বলে আড্ডা দেয় তারা।এর মধ্যে ফয়জান আসলে আলো’র মুখের কথা এবং হাসি দুটোই মিলিয়ে যায়। বোঝা গেল আলো এখানো ফয়জান এর উপর অভিমান করে আছে।

অপরদিকে,
কায়েস অফিস থেকে ফিরে দেখলো রামিসা এখনো বাসায় আসেনি।রিনু জানালো আয়েশা আর নূর ও ঐ বাসায় গিয়েছে।তাই বসে অপেক্ষা করছে নিশ্চয়ই তার মায়ের সাথে ফিরবে রামিসা এই ভেবে।

তারপর,
আয়েশা আর নূর ফিরে আসলে কায়েস এদিক ওদিক তাকিয়ে রামিসা কে কোথায় দেখতে পেল না।তাই আর অপেক্ষা না করে বললো,
-” মা রামিসা কোথায়?

আয়েশা আড়ালে মুচকি হেসে বললেন,
-” রামিসা এ বাসায় আর আসবে না বলেছে!ঐ বাসায় থাকবে।

নিমিষেই কায়েসের মুখশ্রী জুরে আঁধার নেমে এলো। কিছু না বলে নিজের রুমে চলে গেল।
.
এদিকে ফাইজা রামিসা কে অনেক বুঝিয়েও ঐ বাসায় পাঠাতে পারলো না।ফাইজা বললো,
-” কায়েস রাগের মাথায় অমন কথা বলেছে তাছাড়া রামিসা’কে ভালোবাসা বলেই দুশ্চিন্তা থেকে এসব বলেছে।যখন রাগ পরে যাবে তখন ঠিক মানিয়ে নিবে নিজেকে।

কিন্তু রামিসা এতো সহজে ভুলার পাত্রী নয়। সে ঠিক করেছে ঐ বাসায় যাবেই না।
.
রাতের খাবার খাওয়ার জন্য ফাইজা আলো কে নিয়ে যেতে এলে আলো জানালো সে খাবে না খিদে নেই সে জন্য।পরে ফাইজা তাকে বোঝাতে বললো,
-” রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“রাতের আহার ত্যাগ করো না
যদিও তা এক মুঠো খেজুরও হয়। কারণ রাতের আহার ত্যাগ মানুষকে বৃদ্ধ করে দেয়”[৪]

এ কথা শুনে আলো আর দ্বিমত পোষণ না করে খেতে আসলো ফাইজার সাথে। তবে খাবার নিরবে শেষ করে রুমে চলে এলো।যা দেখে সবাই হতাশ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
.
তিন দিন পর,
কলিং বেল শুনে দরজা খুলে দিল রামিসা। দরজা খুলে যাকে দেখলো তাকে মোটেও প্রত্যাশা করেনি রামিসা।
হাতে ফলের ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কায়েস। ভিতরে ঢুকে মনি কে ইশারা করলো যে কিনা এ বাসার হেল্পিং হ্যান্ড। তিনি ব্যাগ গুলো কায়েসের হাত থেকে নিয়ে কিচেনে চলে গেলেন।
রামিসা ও চলে যেতে নিলে কায়েস দ্রত হাত চেপে ধরে রামিসার।রামিসা নিজের জায়গায় স্থির থেকে গাড় গুড়িয়ে বললো,
-” ছাড়ুন আমাকে! কেন এসেছেন এখানে?যার কাছে আমার বেবির মূল্য নেই তার সাথে কথা পর্যন্ত বলতে চাই না আমি!

কায়েস সাথে সাথে রামিসা কে হেঁচকা টানে নিজের খুব কাছে নিয়ে এলো।বাম হাতে রামিসার কোমর জড়িয়ে ধরে,ডান হাতে রামিসার গাল আঁকড়ে ধরে বললো,
-” আমার উপর খুব অভিমান হয়েছে বুঝলাম সে জন্য একদম বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে হবে? আমি কি তোমাকে জোর করে নিয়ে এবো’রশন করিয়ে নিতাম? অবশ্যই তোমার মতামতের বিরুদ্ধে যেতাম না আমি। তাহলে না বুঝে আমাকে শাস্তি দিচ্ছ কেন?

রামিসা নত মুখে দাঁড়িয়ে থাকে, কিছু বলার ভাষা নেই তার।সে ভেবেছিল কায়েস হয়ত জোর করবে তাকে এবো’রশন করানোর জন্য। কিন্তু সে যে ভুল ছিল এখন বুঝতে পেরে লজ্জিত হলো।

কায়েস আবারো বললো,
-” কি হলো জবাব দাও?

রামিসা মিনমিনে গলায় বললো,
-” সরি।

কায়েস ঠোঁট কামড়ে হেসে বললো,
-” এখন সরি বললে তো হবে না, শা’স্তি পেতে হবে!

চমকে তাকায় রামিসা। কাঁদো কাঁদো মুখশ্রী করে বললো,
-” কি শা’স্তি দিবেন আপনি?
-” ভালোবাসাময় শা’স্তি!

লজ্জায় লাল রঙা হয়ে মাথা নত করে রামিসা।
আড়ালে থেকে সবটা লক্ষ্য করলো ফাইজা!তার চোখের কোণে জমে আছে পানি!অথচ ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি ফুটে আছে। তারপর নিঃশব্দে নিজের রুমে চলে গেল।
.
তায়েস আর নূর ছাদে বসে আছে। তখন তায়েস বললো,
-” মামা,চাচা সব হয়ে যাচ্ছি।বাবা কবে হবো মিসেস নূর‌আইন?

নূর‌আইন মন খারাপ করে বললো,
-” এক বছর সময় দাও প্লিজ?
-” আচ্ছা মন খারাপ করে না। এমনি বললাম আর কি। আল্লাহ তা’আলা যেদিন চাইবেন সেদিন হবে ইনশা আল্লাহ।
.
.
আলো পিছন ফিরে শুয়ে আছে। তিন দিন যাবত এমনি চলছে। ফয়জান মনমরা হয়ে তাকিয়ে থাকে পিছন থেকে। তবে আজকে আর ভালো লাগছে না এভাবে দুরত্ব বজায় রেখে থাকতে। ইচ্ছে করছে জোর করে হলেও আলো কে কথা বলাতে তার সাথে।আর তাই আকস্মিক টানে নিজের খুব কাছে নিয়ে আসলো আলো’কে!আলো বেচারি খুব ভয় পেয়ে ইয়া আল্লাহ বলে চিৎকার করে উঠল..!
____
রেফারেন্স:
[১][আবু দাউদঃ ২৫৪০]
[২][বুখারীঃ১০৩২]
[৩][মুসলিমঃ ৮৯৮]
[৪](ইবনে মাজাহ,হাদিস:৩৩৫৫,তিরমিজি, হাদিস:১৮৫৬)
______

#চলবে ইনশা আল্লাহ।

#শুভ্র_নীলাভ_আকাশে_মেঘের_আনাগোনা(৩৪)
#Israt_Bintey_Ishaque(লেখিকা)
(কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ)

অভিমান পাহাড় সম হয়ে গেছে আলো’র তাই ফয়জান পণ করেছে আজকে আলো’র রাগ ভাঙ্গিয়েই ছাড়বে।

ফয়জান যখন আলোর উপর ঝুঁকে তখন আলো আঁখিপল্লব দুটো বন্ধ করে নেয়। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে নোনা পানি।
ফয়জান এর ভিতরটা মুচড়ে উঠে।

আলো সত্যকে লুকিয়ে রেখেছিল কিন্তু সবকিছু না জেনে কাউকে কটুক্তি করে কথা বলা মুমিন ব্যক্তির কাম্য নয়। লেখিকা ইসরাত বিনতে ইসহাক।ফাহমিদা প্রথমে আলোর থেকে সবটা জেনে তবেই যা করার প্রয়োজন ছিল।যাই হোক
আল্লাহর ক্ষমা পেতে হলে তাঁর বান্দাকে ক্ষমা করতে হবে। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও, যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও জমিন, যা তৈরি করা হয়েছে পরহেজগার দের জন্য। যারা সচ্ছলতায় ও অভাবের সময় ব্যয় করে, যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে আর মানুষকে ক্ষমা করে, বস্তুত আল্লাহ সৎকর্মশীল দিগকেই ভালোবাসেন।[১]

ফয়জান শেষার্ধ কথাটুকু বলে ক্ষমা চেয়ে সরে যেতে নিলে আলো বাধা দেয় ফয়জান কে। তারপর নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে হুরহুর করে কেঁদে ওঠে।
তারপর হেঁচকি দিতে দিতে বলে,
-” আমাকেও মাফ করুন আপনাদের থেকে সত্য লুকিয়ে রেখেছিলাম যার ফলে আমাকে শা’স্তি পেতে হয়েছে। আসলে আমি ভয় পেতাম আমার অতিতের কারণে যদি আপনাদের কে হারিয়ে ফেলতে হয়, তাহলে আমার এ দুনিয়ার বেঁচে থাকা দায় হয়ে উঠতো।

ফয়জান আলোর চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললো,
-” এতো ভালোবাসো আমাদের?
-” হুম নিজের থেকেও বেশি। আপনি বাসেন না বুঝি?
-” আমিও আমার প্রিয়তমা স্ত্রীকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি ভালোবাসি এবং ভালোবাসি।

অতঃপর,
দুটো পবিত্র বন্ধনের মিল বন্ধন আরও গভীর ভাবে জোড়ালো হয়ে উঠলো।যে জোড়া মৃত্যু ব্যাতিত আলাদা হবে না ইনশা আল্লাহ।
.
.
ফাইজা এগারোটা বেজে তেরো মিনিটে অফিস থেকে বাসায় ফিরে এসেছে। আজকে তেমন কাজ ছিল না তাই এই সময়ে আসা। কলিং বেল চাপতে মনি দরজা খুলে দিল।ফাইজা নিজের রুমে যাওয়া ধরলে ফাহমিদা খাতুন ডেকে বললেন,
-” ফাইজা মা এদিকে শুন তো?

ফাইজা ঘুরে দাঁড়াতে দেখতে পায় তিনজন অপরিচিত মানুষজন! দুজন মহিলা একজন পুরুষ লোক!ফাইজা নিজ স্থানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল। অচেনা মানুষদের সামনে যেতে ইতস্তত বোধ করছে। তখন ফাহমিদা খাতুন আবারো চোখে ইশারা করে বললেন,
-” এদিকে আয়?

ফাইজা ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সালাম দিল। একজন মহিলা আগ বাড়িয়ে বললেন,
-” আমি দু- তলায় এপার্টমেন্ট এ থাকি। দেখনি হয়তো কোন দিন তাই না?

ফাইজা বললো,
-” জ্বি আন্টি।

ভদ্রমহিলা হেঁসে বললেন,
-” কিন্তু আমি তোমাকে দেখেছি বেশ কয়েকবার, তাইতো চলে এসেছি তোমাদের বাসায়!

ফাইজা সৌজন্য মূলক হাঁসি দিয়ে বললো -“আচ্ছা আন্টি খুব ভালো করেছেন এসে।

যদি নেকাবের আড়ালে বলে কেউ দেখতে পায়নি সেই হাসি। তবে হাসলে চোখেও তা ফুটে ওঠে।যাই হোক ভদ্রমহিলা বললেন,
-” বাহির থেকে এসেছো তুমি বরং ফ্রেশ হয়ে এসো।আমরা অপেক্ষা করছি তোমার জন্য!

ফাইজা একটু ঘাবড়ে গেল!তার জন্য অপেক্ষা করার কারণ বুঝতে পারলো না। মায়ের দিকে তাকালে, ফাহমিদা খাতুন ও বললেন দ্রুত ফ্রেশ হয়ে আসার জন্য।
ফাইজা নিজের রুমে ফিরে ধীরে ধীরে বোরকা খুলছে আর ভাবছে বাসায় মেহমান কেন এসেছেন? তখন ফাহমিদা খাতুন এসে বললেন,
-” এখনো দাঁড়িয়ে আছিস কেন?দেখলি তো মেহমান এসেছে,কি ভাববেন তারা? এমন পাত্র লাখে একটা পাওয়া যায়!আমাদের ভাগ্য ভালো যে তারা নিজ থেকেই প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন!

ফাইজা চমকে উঠে বললো,
-” কি বলছো এসব! তোমাদের আমি বলেছিলাম না যে আমি বিয়ে করবো না? এরপরেও মানুষজন আসে কিভাবে বিয়ের কথা বলতে?

ফাহমিদা খাতুন রেগে বললেন,
-” সারাজীবন কি এভাবেই থাকবি নাকি? এভাবে একা বাঁচা যায় না কখনো। আল্লাহ তা’আলা সৃষ্টির শুরু থেকেই জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন একা থাকার জন্য নয়।
-” আমি কি তোমাদের কাছে বোঝা হয়ে যাচ্ছি মা? তাহলে কেন এরকম করছ? আমাকে আমার মত থাকতে দাও প্লিজ?

ফাহমিদা খাতুন চোখের পানি মুছে বললেন,
-” তুই কি চাস মানুষজনের সামনে আমরা অপমানিত হই? আজকে যদি তুই তাদের সামনে না যাস তাহলে কতটা অসম্মানিত হতে হবে ভেবে দেখেছিস একবার? লেখিকা ইসরাত বিনতে ইসহাক। আশেপাশে মানুষদের কাছ থেকে তোর বাবার নামে সুনাম শুনেই তারা আমার বাসায় এসেছেন। সেই সুনাম কি তুই ধোলাই মিশিয়ে দিতে চাচ্ছিস? যদি তুই তোর বাবার মেয়ে হয়ে থাকিস তাহলে তুই তাদের সামনে আসবি।

এই বলে ফাহমিদা খাতুন এখান থেকে প্রস্তান করলেন। ফাইজা ধপ করে বিছানায় বসে পড়লো। উপরে চলন্ত ফ্যানের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল এই কোন ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছো আল্লাহ? আমি সত্যি আর পারছি না আর পারছিনা ধৈর্য ধারণ করে থাকতে। কেন এত কষ্ট আমার আল্লাহ? আমি যে শান্তি ছিলাম, সেই শান্তি কেন আমার রইল না? আজ অন্য আর দশটা স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনের মতো আমিও তো সুখি হতে পারতাম তবে কেন সেই সুখ আমার কপালে লিখে রাখলে না? আমি সত্যিই আর পারছি না আল্লাহ আমাকে এসব থেকে মুক্তি দাও। দয়া কর আমাকে আল্লাহ।
.
নিজেকে শক্ত করে ফ্রেশ হয়ে এসে মেরুন রঙের একটা সুতি থ্রি পিস পড়ে নেয় ফাইজা। হাত দিয়ে চুল গুলোকে কোনরকম ঠিক করে, সাজগোজহীন রুম থেকে বের হয়।
ড্রয়িং রুমে গিয়ে দাঁড়ালে ভদ্রমহিলা তার পাশে বসান ফাইজা কে। তারপর সাথে আসা আরেকজন মহিলাকে বললেন আপা দেখে নে ভালো করে, পরে যেন আবার কিছু বলতে না পারিস। যে তোর পছন্দে বউ নিয়ে আসলাম এখন আমার পছন্দ হয়নি!
এই বলে হাসলেন ভদ্রমহিলা সাথে পাশের ভদ্রমহিলা ও হাসলেন।
পাশের ভদ্র মহিলা তার ছেলেকে বললেন মিরাজ দেখ বাবা, তোর পছন্দের ওপরেই তো ডিপেন্ড করবে সবকিছু! মায়ের কথায় মাথা তুলে তাকায় ছেলেটি, মুচকি হেসে ফাইজার দিকে তাকায়।
ফাইজা সেই প্রথম থেকেই মাথা নিচু করে বসে আছে আজকে বোধ হয় মাথা আর উপরে উঠবে না।

তারপর,
ফাইজাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়।যেমন ফাইজা কি করে?পড়াশোনা চলছে, নাকি শেষ? এরকম কিছু।
ফাইজা বললো,পড়াশোনা,গ্রেজুয়েশন কমপ্লিট।এখন মাস্টার্স প্রায় শেষের দিকে।
এনজিওর কথাটা আর বললো না। তারপর কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে মিরাজ ছেলেটি কে তার খালামণি জিজ্ঞাসা করল ফাইজার সাথে আলাদাভাবে কথা বলবে কিনা? মিরাজ না করলো বলবে না। তারপর ফাইজার হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে তারা বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।

এর দুই দিন পর,
ভদ্রমহিলা জানালেন ফাইজা কে তার বোন এবং বোনের ছেলের পছন্দ হয়েছে!এ কথা শুনে ফাইজা বিয়ে করবে না বলে রমের দরজা লাগিয়ে বসে রইলো।
.
.
সাত মাস পর,
আজকে রামিসা’র সিজারিয়ানের ডেইট দিয়েছেন ডাক্তার। সবাই ভিশন চিন্তিত মুখে বসে আছে হসপিটালের রিসিভশনে।ডাক্তার বলেছেন রক্ত লাগতে পারে,তাই রক্ত যেন আগে থেকে ব্যাবস্থা করে রাখা হয়।
কায়েস তার অফিস কলিগ দুজন কে ঠিক করে নিয়ে এসেছে।
এই কয়টা মাস কায়েস নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করছে রামিসার কেয়ার নেওয়ার। এবং কি পরিবারের প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সাহায্য সহযোগিতা করেছে যেভাবে থাকলে রামিসা ভালো থাকবে, আনন্দে থাকবে।
কায়েস যেন ধৈর্য হারা হয়ে পড়ছে এখনি। মিনিট খানেক আগে রামিসা কে অটিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এর মধ্যেই এ মাথা থেকে ও মাথা পায়চারি শুরু হয়ে গেছে কায়েস এর। পরিবারের প্রত্যেকটি লোক হসপিটালে চলে এসেছে।”লেখিকা ইসরাত বিনতে ইসহাক”। বাসায় থাকা তাদের জন্য দুস্কর হয়ে গেছে। সবাই মনে মনে আল্লাহ তা’আলা কে স্মরন করছে, সবকিছু যেন ঠিক ঠাক হয়।ফাইজা মাঝে মাঝে কায়েক কে লক্ষ্য করছে।আর ভাবছে একজন স্বামী বুঝি এরকম ই হয়! কতোটা মায়া, মহব্বত ভালোবাসা হলে এরকম ছটপট করতে পারে স্বামী তার স্ত্রীর জন্য।

আলো বেচারি বাসায় থেকে চিন্তায় অস্থির হয়ে আছে,একটু পর পর ফয়জান কে কল করে জিজ্ঞাসা করছে এখন কি খবর?রামিসা কে অটি থেকে বের করা হয়েছে কিনা?বেবি কেমন আছে ? ইত্যাদি ইত্যাদি।
ফয়জান মাঝে মধ্যে রেগে গেলেও প্রকাশ করছে না। আলোর ও তো শরীর ভালো না এই ভেবে।

রামিসা’কে টেষ্ট করানোর পর জানা যায় রামিসা সাড়ে নয় সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা।এর থেকে বোঝা যায় আলোর আগে রামিসা প্রেগন্যান্ট হয়েছিল, কিন্তু সময় মতো জানা যায়নি।
যাই হোক,
অবশেষে ঘন্টা খানেক পর বেবির চিৎকার শুনা গেল! সবাই উৎসুক হয়ে তাকালো সেদিকে। কায়েস দৌড়ে গেল দরজার সামনে।…
_____
রেফারেন্স:
[১]সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪
______

#চলবে.. ইনশা আল্লাহ।