সংসার পর্ব-০৮

0
400

#সংসার
#লেখা_Bobita_Ray
পর্ব- ০৮

-‘কী হয়েছে মায়ের?
পিসি অস্থির হয়ে বলল,
-‘দেখ না রুপ, বৌদি যেন কেমন করছে?
রূপায়ন মাকে একহাতে জড়িয়ে ধরে, মাথায় হাত রেখে বলল,
-‘কেমন লাগছে মা তোমার?
নন্দিতাদেবীর ঘেমে-নেয়ে একাকার অবস্থা। বুকের মাঝে চাপ ধরে ব্যথা করছে। ধীরে ধীরে বুকের ব্যথা পিঠ, বাহু, পেটে ছড়িয়ে পড়েছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। দ্রুত শ্বাস- প্রশ্বাস ওঠানামা করছে। সম্ভবত স্ট্রোকের ভাব হয়েছে। নন্দিতাদেবী আস্তে করে বলল,
-‘সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময়, শরীর অসম্ভব কেঁপে, মাথায় ঝিম লেগে পরতে নিছিলাম। তোর পিসি ধরে ফেলেছে।
রূপায়ন অস্থির হয়ে বলল,
-‘ডাক্তার কত করে তোমাকে মানসিক চাপ নিতে মানা করেছে। তুমি তো আমার একটা কথাও শুনো না মা..?
পিসি জলের বালতি আনো..প্লিজ? মায়ের মাথায় জল ঢালতে হবে। অরুপ কোথায়? ওকে ডাকো? মাকে হাসপাতালে নিতে হবে।
রূপায়ন মায়ের মাথায় জল ঢালছে। পিসি হাতে পায়ে তেল মালিশ করে দিল। অরুপ ফোনে বোনদের খবর দিয়ে, সিএনজি ডাকতে গেছে।
রুপা, দিপা এসেই চিৎকার, চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। রুপা, রূপায়নের হাত থেকে জলের মগ কেঁড়ে নিয়ে বলল,
-‘এখান থেকে সর বড়দাভাই! তুই তো এটাই চেয়েছিলি। শুধুমাত্র তোর জন্য মায়ের আজ এই অবস্থা। তুই এখন এখানে কী করছিস? যা বউ নিয়ে শুয়ে থাক গা? নির্লজ্জ কোথাকার।
রূপায়ন এমনিতেই ঘাবড়ে গেছে। বোনদের সাথে অযথা তর্ক করতে ইচ্ছে করল না। দৌঁড়ে নিজের ঘরে গিয়ে আলমারি থেকে টাকার বাণ্ডিলটা কোমড়ে গুঁজে। অনুপমাকে বলল,
-‘তুমি একটু এইদিকটা দেখো প্লিজ?
-‘আপনি কোন চিন্তা করবেন না। দ্রুত মাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। আর যে কোন পরিস্থিতিতে মাথা ঠাণ্ডা রাখবেন।
রূপায়ন ব্যস্ত পায়ে মাকে পাজকোলা করে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ছুঁটল। অরুপ ততক্ষণে বাড়ির গেইটে সিএনজি থামিয়েছে। পিসি, অরূপ, সাথে গেল। দিপা, রুপা মায়ের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র একটা ব্যাগে গুছিয়ে নিল। হাসপাতালে যাওয়ার আগে রুপা, অনুপমাকে দেখে বলল,
-‘বাড়িতে অলক্ষ্মী ঢুকেছে। আসতে না আসতেই এত বড় অঘটন ঘটে গেল।
দিপা, অনুপমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
-‘আমার মায়ের যদি কিছু হয় না মেয়ে! তাহলে তোমাকে ‘সংসার’ করার স্বাদ চিরদিনের মতো মিটিয়ে দেব। কাউকে শান্তিতে থাকতে দেব না। এ্যাঁই তোমার লজ্জা করে না? বরের সাথে সারারাত ফূর্তি করে, সেই চিহ্ন নিয়ে সারাবাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছো? সারা কপালে সিঁদুর লেপ্টে আছে। ছিঃ
অনুপমা, অপমান গুলো নিশ্বাসের সাথে হজম করে নিল। এদের মা অসুস্থ। কোথায় সাথে যাবে। তা নয়। উল্টো অনুপমার সাথে ঝগড়া করার চেষ্টা করছে। এদের সাথে কথা বলতেও রুচিতে বাঁধছে অনুপমার।
রুপা, দিপা চলে যেতেই অনুপমা স্নান সেরে সীমাকে বলল,
-‘কিছু রান্না করা দরকার। সবাই না খেয়ে গেল।
সীমা, অনুপমাকে সবকিছু দেখিয়ে দিল। নিজেও হাতে সঙ্গে সবজি কেটে বেছে দিল।

মাকে হার্টকন্ডিশন প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। ডাক্তার কতগুলো টেস্ট দিয়েছে। এখনো রিপোর্ট বের হয়নি। নন্দিতাদেবীর হাতে স্যালাইন চলছে। রূপায়ন এতক্ষণ ব্যস্ত পায়ে ছুটাছুটি করেছে। ডাক্তার একটু পর পরই টুকুন লিখে দেয়, এই ঔষধ, ওই জিনিস আনার জন্য।
নাজুক মন, ক্লান্ত শরীরে চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিতেই বোনগুলো আবারও শুরু করে দিল অশান্তি, তীব্র বাক্যবাণ। রূপায়ন বিরক্ত হয়ে বলল,
-‘আসলে কী চাইছিস তোরা বলতো? এটা হাসপাতাল। এখানে অন্তত মুখটা বন্ধ রাখ। ভাল লাগছে না।
দিপা বলল,
-‘এখন মুখ বন্ধ রাখব কেন? সত্যি কথা বললেই বুঝি তোর গায়ে ফোস্কা পরে বড়দাভাই? আজ যদি মায়ের কিছু হয়ে যায়। তারজন্য তুই দায়ী থাকবি।
রুপা তাচ্ছিল্য করে বলল,
-‘দেখ নির্লজ্জটা কীভাবে হাসপাতালে এসেছে। শার্টে এখনো সিঁদুরের ছাপ স্পষ্ট। বুড়ো বয়সে বিয়ে করে, তোর লজ্জা টজ্জা কী একদম ফুরিয়ে গেছে বড়দাভাই?
পিসি ধমক দিয়ে বলল,
-‘থামবি তোরা? ও কোন পরিস্থিতিতে বৌদিকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে এসেছে। তোরা দেখিসনি?
রুপা বলল,
-‘তুমি একদম বড়দাভাইয়ের হয়ে সাফাই গাইবে না পিসি। ওর জন্যই আজ মায়ের এই অবস্থা হয়েছে।
-‘ওর জন্য না কাদের জন্য আজ বৌদির এই অবস্থা হয়েছে। আমার বেশ ভাল করেই জানা আছে রুপা। তোরা রূপকে যতই দোষারোপ করিস। সত্যিটা কখনো মিথ্যা হয়ে যাবে না।
-‘তুমি কেন আমাদের বাড়ি এসেছ পিসি? সেবার না বলে গেলে, আর কখনোই আমাদের বাড়ি আসবে না?
রূপায়ন শীতল কণ্ঠে বলল,
-‘দিপা মুখ সামলে কথা বল! এখনো তোর বাবার বাড়িতে তোর যতটা অধিকার। পিসিরও তার বাপ-ভাইয়ের বাড়িতে ঠিক ততটাই অধিকার। তোদের লজ্জা করছে না? মা অসুস্থ। তারপরও তোরা মুখে মুখে তর্ক করে যাচ্ছিস?
দিপা তাচ্ছিল্য করে বলল,
-‘লজ্জা আমাদের করবে কেন? লজ্জা তো তোর হওয়া উচিত। কী বেশে হাসপাতালে এসেছিস। নিজের দিকে একবার তাকিয়ে দ্যাখ?
রূপায়ন হতাশ বোধ করল। এরা সব সময় তীব্র বাক্যবাণ দিয়েই রূপায়নকে থামিয়ে দেয়। সব সময় বলা ভুল হলো। রূপায়নের বিয়ের আগেও এরা কেউ এমন ছিল না। রূপায়নকে দেখলেই সবার মুখে তেলতেলে হাসি ঝরে পরত। রুপায়ন বিয়ে করার পর থেকেই আসল সমস্যা শুরু।
নার্স এসে বলল,
-‘নন্দিতাদেবীর বাড়ির লোক কে?
রূপায়ন চট করে উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে গিয়ে বলল,
-‘কী হয়েছে সিস্টার?
-‘পেশেন্টের স্যালাইন শেষ হয়েছে। পেশেন্টকে অতিরিক্ত তেল, মশলা ছাড়া হালকা কিছু খাবার দিন।
-‘অবশ্যই। ডাক্তার কখন আসবে?
-‘ডাক্তার বিকালের রাউন্ডে এসে রিপোর্টগুলো দেখবে।
নার্স বলল,
-‘রোগীর কেবিনে গিয়ে কেউ চিৎকার করে কথা বলবেন না। নীচু কণ্ঠে কথা বলবেন। রোগী যেন কোন কথায় উত্তেজিত নাহয়। এই দিকটা খেয়াল রাখবেন সবাই।
অরুপ বলল,
-‘বড়দাভাই আমি তাহলে বাড়ি গিয়ে খাবার নিয়ে আসি?
-‘না। মায়ের সাথে দেখা করে আমিই যাব।
দিপা বলল,
-‘তোর যেতে হবে কেন? বউকে না দেখে মরে যাচ্ছিস বুঝি?
-‘মুখ সামলে কথা বল দিপা। যতটুকু টাকা এনেছিলাম। খরচ হয়ে গেছে। এখনো কত কেমনে কী লাগবে, জানা নেই। আমি বাড়ি না গেলে এত টাকা ম্যানেজ করে কে দিবে, তুই দিবি না অরুপ দিবে?
দিপা দমে গেল। আমতা আমতা করে বলল,
-‘আমি এতটাকা কোথায় পাব?
-‘তাহলে এত বকবক করছিস কেন? হয় চুপ করে থাক। আর নাহয় বাড়ি যা। এমনিই টেনশনে মাথা কাজ করছে না।
-‘আমরা কেন বাড়ি যাব? মাকে ফেলে কোথাও যাব না আমরা। তোর যাওয়ার হলে তুই যা!
পিসি বিরক্ত হয়ে বলল,
-‘মেয়েগুলোর সাথে আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। তুই বাড়ি যা রুপ। এরা বৌদির আহ্লাদে একেকটা বেয়াদব তৈরী হয়েছে।
-‘আমাদের ব্যপারে খবরদার তুমি কোন কথা বলবে না পিসি। তোমাকে এখানে আসতে কে বলেছে?
রূপায়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-‘পিসি তুমি আমার সাথে চলো। এখানে থাকার দরকার নেই। আমি তো একটুপর আসবোই।
পিসি, নন্দিতাদেবীর সাথে দেখা করে, রূপায়নের সাথে চলে গেল। যাওয়ার সময় অরুপের হাতে রুটি, কলা, ফল কিনে দিয়ে গেল রূপায়ন।
দিপা, রুপা মায়ের পাশে বসল। রুপা বলল,
-‘এই সুযোগ মা। ওই অপয়া মেয়েটাকে বাড়ি থেকে বের করার। তুমি এখন বড়দাভাইকে কিছু বললে ফেলতে পারবে না।
নন্দিতাদেবী বড় করে দম ছাড়ল। ধীর কণ্ঠে বলল,
-‘আমি যদি এখন হঠাৎ করে মরে যাই। আমার রূপায়নকে কে দেখবে? তোরা দেখবি?
-‘অবশ্যই দেখব মা।
-‘ওর সব চাওয়া পাওয়া পূরণ করতে পারবি তোরা?
-‘কী এমন চায় তোমার ছেলে? যে অপূর্ণ থাকবে? বড়দাভাইয়ের বউ মারাত্মক সুন্দরী মা। এতটাই সুন্দরী যে.. এই বউ যা বলবে, তোমার ছেলে তাই শুনবে ও বেদবাক্য মনে করে মানবে। এই বউ বাড়িতে থাকা মানেই বিপদজনক।
-‘আমার রূপায়নের কপাল গুনে এত সুন্দরী বউ পেয়েছে। এতে হিংসে করার কিছু নেই।
-‘তারমানে মেয়েটা আমাদের বাড়িতেই থাকবে?
-‘উহুম…ভুল বললি। সে তার স্বামীর ঘরে থাকবে।
-‘তুমি এখন বুঝতেছো না মা। পরে বুঝবা!
-‘আমার খুব ক্লান্ত লাগছে রুপা, দিপা। কথা বলতে ভাল লাগছে না।

রূপায়ন বাড়িতে গিয়ে স্নান সারল। অনুপমা গামছা, শার্ট, এগিয়ে দিয়ে বলল,
-‘মায়ের কী অবস্থা?
-‘বিপদ কেটে গেছে। এখন অনেকটা সুস্থ।
-‘আজ রাতে বাড়ি আসবেন না?
-‘না বোধহয়।
-‘ভাত বেড়েছি। চলুন খেয়ে নিবেন?
-‘খেতে ইচ্ছে করছে না অনুপমা। তুমি সবার জন্য ভাত বেড়ে দাও?
অনুপমা, রূপায়নের শার্টের কোণা টেনে ধরল। চোখে চোখ রেখে বলল,
-‘সারাটাদিন কিচ্ছু খাননি আপনি। না খেয়ে অসুস্থ হয়ে যাবেন। নিজের শরীর ঠিক না থাকলে, মাকে সেবা করবেন কীভাবে? আমি ভাত নিয়ে আসছি! আপনি বসুন!
রূপায়ন কয়েক লোকমা ভাত খেয়ে উঠে পরতে চাইল। অনুপমা জোর করে, নিজে হাতে রূপায়নকে ভরপেট খাইয়ে দিল। রূপায়ন বলল,
-‘তুমি খাও?
-‘পরে খাব।
-‘পরে না। এখুনি খেয়ে নাও অনুপমা?
-‘খাব তো।
রূপায়ন খাবারের টিফিনবাক্স হাতে নিয়ে বলল,
-‘পিসি বোধহয় চলে যাবে এখন। রাতে সাবধানে থেকো। আর কিছু দরকার হলে আমাকে ফোন করো।
-‘আচ্ছা।
-‘আসি!

রূপায়ন হাসপাতালে আসতেই অরুপ বাড়ি চলে গেল। দিপা মাকে খাইয়ে দিয়ে তারপর দুইবোন খেতে বসল। খাওয়ার সময় রান্না ভাল হয়নি। লবন কম হয়েছে, ঝাল বেশি হয়েছে। কে এমন অখাদ্য রেঁধেছে! আর কতকিছু বলে, খাওয়া শেষ করল। রূপায়ন মায়ের পাশে বসল। মায়ের একহাত ধরে বলল,
-‘এখন কেমন লাগছে মা?
-‘আগের থেকে ভাল৷
-‘অযথা টেনশন করবা না মা। আমি থাকতে কিসের চিন্তা তোমার?
নন্দিতাদেবী উত্তর দিল না। তার খুব কান্না পাচ্ছে। সারাজীবন বড়ছেলেটাকে সবকিছু থেকে বঞ্চিত করেছে তিনি। সঠিক সময়ে বিয়ে দিলে, আজ রূপায়নের ঘরেও নয়-দশ বছরের বাচ্চা থাকতো। তবুও ভাল, দেরি হলেও ছেলেটা নিজের কথা ভেবেছে। মেয়েগুলো অযথা কেন যে, অশান্তি করতে চায়৷ তিনি বুঝে পান না।

ডাক্তার টেস্টের রিপোর্টগুলো দেখে বলল,
-‘ওনি হার্টঅ্যাটাক করেছিলেন। আছাড় খেলে বা সঠিক সময়ে হাসপাতালে না আনলে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হতো না। ওনাকে সবসময় হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করবেন আর ভারী কাজ করা টোটালি বন্ধ। নিয়ম করে দুবেলা ইনসুলিন দেওয়া লাগবে৷ আগের ঔষধ বাদ দিয়ে দিয়েছি। যে ঔষধ গুলো লিখে দিচ্ছি। নিয়ম করে খাওয়াবেন। অতিরিক্ত তেল, মশলাযুক্ত তরকারি খাওয়াবেন না। একমাস পর আবার চেকআপ করিয়ে যাবেন।
-‘আমরা কী আজকেই মাকে নিয়ে যেতে পারব ডাক্তার?
-‘অবশ্যই। তবে সন্ধ্যার ইনসুলিন দুটো দিয়ে যাবেন।
-‘ধন্যবাদ ডাক্তার।

সীমা, অরুপকে বলল,
-‘পাশের বাড়ির মেয়েটার জন্মদিন আজ। আমাকে বার বার যেতে বলেছে। কী করব?
-‘অবশ্যই যাবে। এক হাজার টাকার একটা নোট হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
-‘এই নাও টাকা। কিছু গিফট দিয়ে খেয়ে আসো।
-‘তুমি যাবে না?
-‘না গো। সারাদিন অনেক ধকল গেছে। আমি এখন ঘুমাব।
-‘একা যাব? কেউ যদি কিছু বলে? শাশুড়ী অসুস্থ। তারপরও গিয়েছি।
অরুপ বিরক্ত হয়ে বলল,
-‘আজব। কে কী বলবে? গেলে যাও। না গেলে থাকো! কানের কাছে প্যানপ্যান করো না তো।
-‘শুনো না.. আমার যদি আসতে একটু রাত হয়। কিছু বলবে না তো?
-‘আজ রাতে তুমি না এলেও সমস্যা নেই।
সীমা খুশি মনে সেজেগুজে জন্মদিন খেতে চলে গেল।

অরুপ চোরা হেসে, গা ঝাড়া দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠল। সময় নিয়ে স্নান করে, বেছে বেছে দামী শার্টটা পরল। গায়ে সুগন্ধি যুক্ত পারফিউম লাগালো। তারপর বাড়ির মেইন দরজা বন্ধ করে দিয়ে, নীচতলার লাইটগুলো বন্ধ করে দিল। আয়নায় আর একবার নিজেকে দেখে নিল। অনুপমা পছন্দ করবে তো অরুপকে? কেন করবে না। বড়দাভাইয়ের থেকে অরুপও কোন অংশকে কম না। বড়দাভাইয়ের থেকে হাজারগুন বেশি সুখ দিবে অরুপ, অনুপমাকে। মেয়েটার বাড়াবাড়ি সৌন্দর্য দেখার পর থেকে, অরুপ জাস্ট উন্মাদ হয়ে গেছে। ভগবান যে, অনুপমার কাছাকাছি যাওয়ার, এত তাড়াতাড়ি সুযোগ করে দিবে, অরুপ স্বপ্নেও ভাবেনি। অরুপ চঞ্চল পায়ে দাদাভাইয়ের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজায় টোকা দিয়ে ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
-‘বৌদি খিদে লেগেছে। খেতে দাও?
অনুপমা শুয়ে শুয়ে ফোনে বিয়ের ছবিগুলো দেখছিল। অরুপের কণ্ঠস্বর পেয়ে, ফোনটা বিছানায় ফেলে, দরজার কাছে এগিয়ে গেল। আস্তে করে বলল,
-‘সীমাকে বলুন?
মেয়েটার কোকিল কণ্ঠ, একদম অরুপের বুকের ভেতরে গিয়ে লাগল। মস্তিষ্কে আলোড়ন সৃষ্টি করল। একপলক দেখার জন্য অবুঝ মনটা ছটফটিয়ে উঠল। মিথ্যে করে বলল,
-‘সীমা পুজো দিচ্ছে। ওই তো বলল। বৌদিকে বলো, খেতে দিতে!
অনুপমা দ্বিধাগ্রস্ত হলো। দরজা খুলে দিতেই অরুপ চট করে ঘরের ভেতর ঢুকে দরজা আগলে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। অনুপমা শুকনো ঢোক চিপল। বলল,
-‘খেতে চলুন?
অরুপ জ্বলজ্বলে চোখে অনুপমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে নিল। জিহবা দিয়ে শুকনো ঠোঁটদুটো ভিজিয়ে নিয়ে বলল,
-‘খাবোই তো। আজ সারারাত খাব।
অরুপের বিদঘুটে চাউনী, কথার ধরণ দেখে, অনুপমা ভয় পেল। ভীতু কণ্ঠে বলল,
-‘সরে দাঁড়ান। দেখি, সীমা কী করে?
অরুপ একপা একপা এগিয়ে এলো। ঘোর লাগা কণ্ঠে বলল,
-‘তুমি এত সুন্দর কেন বৌদি? তোমাকে দেখলেই একদম খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে!
অনুপমা রেগে বলল,
-‘এগুলো আবার কোন ধরনের কথা? অসভ্য।
অরুপ হেসে দিল। অনুপমার শাড়ির আঁচলের কোণা টেনে ধরে বলল,
-‘আজ সারারাত তোমার সাথে অসভ্যতামি করব বৌদি। দাদার থেকেও অনেক বেশি ভালোবাসব তোমাকে।
অতিরিক্ত রাগ, দুঃখ, ভয়, লজ্জায় অনুপমা কিছু বলতেই ভুলে গেল। চোখের কোণে বিন্দু বিন্দু জল জমেছে। ‘এই অমানুষটার কথা বিশ্বাস করে দরজা খোলা বড্ড ভুল হয়েছে। এখন কী করবে অনুপমা? মাথা কাজ করছে না। বিছানায় ফোনের দিকে একবার তাকাল। একবার অরুপের ধরে রাখা শাড়ির আঁচলের দিকে!
-‘ওই তো সীমা এসেছে?
অরুপ বেখেয়ালে শাড়ির আঁচলটা ছেড়ে দিতেই অনুপমা চট করে ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে বেলকনিতে গিয়ে, বাইরে থেকে দরজা লক করে দিল। সম্মতি ফিরে পেয়ে অরুপ ছুটে গেল। দরজা জোরে জোরে থাবা মেরে বলল,
-‘বৌদি ভাল হবে না কিন্তু। দরজা খুলো বলছি?
অনুপমা দরদর করে ঘামছে। কাঁপা হাতে রূপায়নকে ফোন দিন। ফোনটা বেজে বেজে বার বার কেটে যাচ্ছে। কেউ ফোন ধরছে না। এদিকে বেলকনির দরজা নড়বড়ে, ভেঙে ফেলার জোগার হয়েছে। অনুপমা অতিরিক্ত ভয়ে কেঁদে দিল। বিড়বিড় করে বলল,
-‘প্লিজ রূপায়ন ফোনটা ধরো?

(চলবে)