#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা১৭ (প্রথমাংশ)
~হাজার কবিতা বেকার সবই তা~
তার কথা কেউ বলেনা
বন্ধুদের হাততালির জোর বাড়লো। গিটারের শব্দ চড়াও হলো। সঙ্গে ধ্বনিত হলো মিসিরের কন্ঠস্বর,
“সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা, সে প্রথম প্রেম আমার…”
“আহ!”
মিসির খেয়ালই করেননি কখন গাইতে গাইতে পা দুলিয়ে সে পিছনে এসে পড়েছে। পিঠের সঙ্গে কারো একটা ধাক্কা লাগতেই অবাক করা শব্দটিতে মিসিরের গান বন্ধ হয়ে গেল। চট করে ফিরে তাকাতেই ক্ষণিকের জন্য তার চোখের সামনে বুঝি দুনিয়া থমকে পড়ল।
দন্ডায়মান এক রমণী। দীঘল রেশমি চুলগুলো কপালের দুপাশে ছড়িয়ে আছে। পরনের ফ্রকজুড়ে ফুলের ছাপ তার নিষ্পাপতাকে বাড়িয়ে তুলেছে কয়েকগুণ। টানা টানা গভীর চোখদুটো মেলে অবাক নয়নে মিসিরের দিকে চেয়ে আছে। আহামরি চোখে লাগার মতন সুন্দরী কেউ নয়। অথচ মিসিরের দৃষ্টিতে তাকে মনে হলো যেন অপ্সরী।
“দেখেশুনে নড়াচড়া করতে পারেন না?”
মেয়েটি চোখ রাঙানি দিতেই মিসির বাস্তবতায় ফিরে এলো। পিছনে বন্ধুদের দলের গিটারের সুর ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে।
“দুঃখিত, আমি দেখতে পাইনি আপনি পিছন থেকে এগিয়ে আসছিলেন।”
মেয়েটি কিছু বললোনা। নিজের কাঁধের একপাশে ঝোলানো ব্যাগটি টেনে তুলে মিসিরের দিকে চেয়ে নিজের কাজে এগোলো। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় থমকে গিয়ে পিছনে ফিরে চাইলো। হতবাক মিসির এবার আবিষ্কার করলো, তার হাতঘড়ির সঙ্গে মেয়েটার পরনের জর্জেট ওড়নার অংশ আটকে গিয়েছে।
“ওওওওও!”
নেকড়ে দলের মতন বন্ধুর দল খেঁকিয়ে উঠতেই লজ্জায় মিসিরের গাল দুটো টকটকে হয়ে উঠল। বন্ধুদের উদ্দেশ্যে তীব্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দ্রুত সে এগিয়ে গেলো মেয়েটির দিকে। ঘড়ি থেকে টেনেটুনে ওড়না খুলতে খুলতে বলে উঠলো,
“আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি!”
“আপনার ঘড়িরও দেখছি গায়ে পড়া স্বভাব।”
মেয়েটির মন্তব্যে মিসির দ্বিতীয় দফায় লাল টুকটুকে হয়ে উঠলো। নিজের ওড়না ফিরিয়ে নিয়ে মেয়েটি ঠোঁটে মোলায়েম এক হাসি মেখে তাকালো তার দিকে, অতঃপর বললো,
“গানটা কিন্তু খারাপ গান না।”
হৃদস্পন্দন থমকে যাওয়া বুঝি একেই বলে? মিসির নিঃশ্বাস প্রশ্বাসকেই ভুলে গেলো ক্ষণিকের জন্য। উল্টো ঘুরে গেলো মেয়েটি। তার অবয়বটি ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে দেখে বুকের ভেতরটা নিদারুণ এক টানে হাহাকার করে উঠলো। মিসির অজান্তেই কয়েক পা এগিয়ে গেলো, ডেকে উঠলো,
“আপনার নামটা, মিস?”
মিসির ভেবেছিল সে আর ফিরে তাকাবেনা। অথচ সে তাকালো। মাথা হেলিয়ে চাইতেই বায়ুর ঝাঁপটায় তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে গেলো মুখে। আঙুলে সেসব সরিয়ে গভীর চোখে সে দেখলো মিসিরকে।
“আরওয়া। আপনি?”
বিস্তৃত হাসি ফুটলো মিসিরের চেহারায়।
“মিসির…”
“আলী?”
এবার শব্দ তুলে খিলখিল করে হাসলো মিসির, সঙ্গে হেসে উঠলো মেয়েটিও। পূবাকাশে উদিত হওয়া সূর্যের ন্যায় ওই হাসি রোশনাইয়ে সিক্ত করে তুললো মিসিরের অন্তর।
ঠিক গানের মতন করেই মিসিরের জীবনে সেদিন এসেছিল প্রথম প্রেম। তবে এই প্রথম প্রেমের নাম নীলাঞ্জনা নয়, আরওয়া।
নিজের অফিস কেবিনে বসে বহু বছর অতীতের স্মৃতিটুকু আজ মনে পড়ার বিশেষ কোনো কারণ নেই। কিংবা হয়ত রয়েছে? মিসির জানেনা। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ জানালার বাইরে দিগন্তের দিকে। শীতের গোধূলী বিকেল, কমলাভ রশ্মিতে মাতোয়ারা চারিপাশ। আরওয়ার সবচেয়ে প্রিয় সময়। সেও কি একই রকমভাবে এই শহরের কোনো প্রান্তে বসে আজ আকাশ দেখছে?
আরওয়ার প্রতিটা পছন্দ, প্রতিটা ইচ্ছা – আকাঙ্ক্ষার কথা মিসির জানে। তবে, আরওয়া কি জানে? উঁহু। মেয়েটি এটাও হয়ত জানেনা, বাদামে অ্যালার্জি আছে মিসিরের। যেমনটা সে জানেনা, আজও তার পুরাতন ওয়ালেটের পকেটে রমণীর ফটোগ্রাফ তোলা আছে। মিসির চায়না আরওয়া জানুক। জেনেও বা কি হবে?
প্রথম প্রেম সারাটা জীবনভর একপাক্ষিক অধরা প্রেম হয়েই থেকে যাবে মিসিরের জীবনে।
জোরপূর্বক দিগন্ত থেকে দৃষ্টি হটিয়ে নিজের টেবিলে ফিরে এলো মিসির। স্তূপ করে রাখা ডকুমেন্টে মনোযোগ দিলো। মলিন হেসে নিজেকে নিজে বলল,
“গেট আ গ্রিপ, মিসির। এমনিতেই হুমায়ূনের মিসির আলীর দৌরাত্ম্যে জীবন ঝালাপালা, এবার কি শরৎচন্দ্রের দেবদাস হতে চাস?”
“স্যার?”
নমনীয় ডাকটি এলো দরজার বাহির থেকে। মাথা তুলে তাকাতেই মিসির দেখলো অ্যাসিস্টেন্ট মেয়েটি মুখ বাড়িয়ে তার দিকে চেয়ে আছে।
“হুম?”
“আপনার সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছে।”
মিসির ভ্রু কোঁচকালো। এমন সময়ে তার সঙ্গে কে দেখা করতে আসবে? কারো তো আসার কথা ছিলনা। এমন হুটহাট না জানিয়ে আসে কেবল জায়দান। কিন্তু তাকে তো অ্যাসিস্টেন্ট চেনে। নাম বলতো সে এসে থাকলে। তবে?
“কে? নাম জিজ্ঞেস করে…”
“মিসির?”
অতি পরিচিত কন্ঠস্বরটি মিসিরকে জমিয়ে দিলো, বরফের ন্যায়। অ্যাসিস্টেন্ট মেয়েটি ইতস্তত করে সরে দাঁড়াতেই তার পিছন থেকে ভেতরে প্রবেশ করলো আরওয়া। খয়েরী সালোয়ার কামিজ পরনে, হাতে ঝুলছে হ্যান্ডব্যাগ। মুখজুড়ে নির্মল চাহুনি।
নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো মিসির। এর আগে কোনোদিনও তার অফিসে আরওয়ার আগমন ঘটেনি। চোখ পিটপিট করে তাই মিসির শুধালো,
“তুমি?”
মৃদু হাসলো আরওয়া। কয়েক পা এগিয়ে এসে মোলায়েম গলায় বলে উঠলো,
“বসতে পারি?”
নিজের অন্তরকে শান্ত করতে খানিকটা সময়ের প্রয়োজন হলো মিসিরের। অ্যাসিস্টেন্ট মেয়েটির দিকে আড়চোখে তাকাতেই ইশারা বুঝে সে দরজা আটকে চলে গেলো কেবিন থেকে। মিসির টেবিলের বিপরীত দিকের সোফার দিকে ইঙ্গিত করে বলল,
“বসো। চা কফি কিছু…”
“না না, ধন্যবাদ। আমি তোমার সঙ্গে কিছু ব্যাপারে কথা বলতে এসেছি।”
সোফায় বসে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে জানালো আরওয়া। মিসির অজান্তেই একটি ঢোক গিললো। অতঃপর বিপরীত দিকের সিঙ্গেল সোফায় বসে হাঁটুর উপর হাঁটু তুলে বসে জিজ্ঞেস করলো,
“কি ব্যাপারে কথা?”
আরওয়া খানিকটা সময় ইতস্তত করল। অতঃপর মাথা ঝেড়ে বলেই বসলো,
“তুমি প্রফেসর জায়দানের বন্ধু রাইট? তাকে একদম ছোটবেলা থেকে দেখছ।”
মিসিরের বুঝতে আর কিছুই বাকি রইলোনা। ঠোঁটজুড়ে এক সূক্ষ্ম মলিন পরিহাসের হাসি ফুটলো তার। সোফায় খানিকটা হেলান দিয়ে একটি নিঃশ্বাস ফেলে উদাসী ভঙ্গিতে সে বলল,
“আমার কাছে জায়দানের ব্যাপারে জানতে চাও তুমি।”
আরওয়া মুখ খুলতে যাচ্ছিলো, তবে মিসির একটি আঙুল তুলে তাকে থমকে দিয়ে চোখ ঘুরিয়ে তাকালো, বরাবর রমণীর নয়নমাঝে। মুচকি হেসে জানালো,
“তোমার প্রশ্ন পর্ব শুরু করতে পারো। তবে একটা বিষয় মাথায় রেখো, তোমার কিছু না হওয়ার আগে আমি জায়দানের বন্ধু।”
✧ ✧ ✧ ✧
নিজের প্রতি নিজে মুগ্ধ হওয়ার অনুভূতি কেমন আজ আমি তা জোরদারভাবে অনুভব করতে পারছি। আয়নায় নিজের প্রতিফলন আপন অন্তরকেই করে তুলেছে তৃপ্ত। সাদা শার্ট, কালো ফরমাল প্যান্ট এবং কালো স্যুট। চুলগুলো লো পনিটেইল বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছি কাঁধে। ছোট ছোট চুলগুলো ছড়িয়ে আছে আমার কপালে। হালকা ন্যাচারাল মেকআপ এবং সুচারু মুখভঙ্গিতে নিজেকে নিজের কাছে ভীষণ দূর্ধর্ষ লাগছে। পুরোদস্তুর প্রস্তুত আমি জীবনের এক নব অধ্যায় প্রবেশের জন্য।
আজ দ্যা ভাইরাল পিৎজা স্টেশন—ক্যাফের উদ্বোধন। ১ তারিখ করার ইচ্ছা থাকলেও নানা কারণে খানিকটা পিছিয়ে আনতে হয়েছে। ব্লগার এবং ইনফ্লুয়েনসারদের জ্বালা যন্ত্রণায় সবটাই গোপনভাবে আয়োজন করেছি। অন্যথায় অস্থিরতা আর ভীড়েই ক্যাফে চাঙ্গে উঠে যেত। সে অনলাইনের বাসিন্দাগুলো পরে ভীড় করুক, তাদের আপ্যায়নে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া আছে আমার।
গতকাল রাতেই একান্তে মিলাদ পড়ানোর ব্যবস্থা করেছিলাম। আজ সকাল থেকেই ক্যাফে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য। এই সময়টা শুধু যারা ইনভাইটেশন পেয়েছে, তাদের জন্যই। আমার কয়েকজন এবং মীরার ভার্সিটির বেশ কতক বন্ধু – চেনাজানা ব্যক্তি এসেছে। কাজে নিয়োগ দেয়া পার্ট টাইমের যুবক ছেলেমেয়েগুলো ব্যস্ত সময় পার করছে। কিচেনে ইতোমধ্যেই দুজন শেফ রান্নাবান্না শুরু করেছেন। প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে অতিথিদের হাসিমুখে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি আমি। তবে আমার মন পড়ে আছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জায়গায়। বারংবার চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে দেখছি। কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে এখনো কোথাও দেখতে পাচ্ছিনা। তবে কি সে আসবেনা?
মীরা আজ আসতে পারেনি। গতকাল মিলাদে থাকলেও আজ হুট করে একটা ক্লাস টেস্ট পরে যাওয়ার কারণে এত প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও সে উপস্থিত হতে পারেনি। উদ্বোধনের দিন আর পেছানো সম্ভবপর ছিলনা বিধায় আজ আমাকে একাই সবকিছু সামলাতে হচ্ছে।
“আসসালামু আলাইকুম স্যার, ভেতরে আসুন।”
অদূর থেকে কণ্ঠটি কানে আসতেই ফিরে তাকিয়ে দেখলাম ক্যাফের দরজা খুলে ভেতরে অতিথিকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে কাজে থাকা ইউনিফর্ম পরিহিত যুবতী। প্রবেশ করল ছ ফুটি দু দুজন ব্যক্তি। একজন আমার প্রাক্তন স্বামী, অপরজন প্রাক্তন দেবর।
নিজের চোখের সামনে ক্ষণিকের জন্য বুঝি পৃথিবীটা থমকে গেলো। নিষ্পলক চেয়ে থাকলাম। জায়দান সত্যিই এসেছে! আজকের পরিধান ফরমাল নয় বরং ক্যাজুয়াল। অফিস প্যান্টের উপর ফুলহাতা সোয়েটশার্ট, বুকের ডানপাশটায় শার্টের বোতামের মতন করে ফুটিয়ে তোলা ডিজাইন। চোখের চশমাটাও ফ্রেম বদলেছে, গোলাকৃতির, সোনালী। জায়দান সাধারণত এমন পোশাক পড়েনা। তাই তার পানে একনাগাড়ে তাকিয়ে রইলাম আমি। দৃষ্টিসুমুখে যে পুরুষটিকে দেখতে পাচ্ছি, সে যে আমার জীবনের প্রথম ও শেষ প্রেম, তাতে আমার আর কোনো সন্দেহ নেই।
আয়দানকে খুব বেশি নজরেই এলোনা। ছেলেটা কোনদিক গলে কোনদিকে চলে গেলো আমি খেয়াল করলাম না। প্রয়োজন নেই। আমার দৃষ্টি ওই একজনেই আবদ্ধ। জায়দান মাথা ঘুরিয়ে আশেপাশে চেয়ে শেষমেষ আমার দিকে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে স্থির হয়ে পড়ল সম্পূর্ণ। স্পষ্টত দেখলাম, তার গভীর বাদামী নয়নজোড়া আমায় আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকাটা সমীচীন মনে হলোনা। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম।
“ধন্যবাদ, এখানে আসার জন্য।”
না চাইতেও সূক্ষ্ম এক হাসি ফুটল আমার ঠোঁটজুড়ে। জায়দান সেদিকে নিষ্পলক চেয়ে পরক্ষণে দ্রুতই দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠল,
“তোমাকে আজ…অন্যরকম দেখাচ্ছে।”
থমকালাম। প্রসারিত দৃষ্টি মেলে আরেক দফা নিজের অবয়ব পর্যবেক্ষণ করলাম।
“কেমন দেখাচ্ছে?”
“পাওয়ারফুল।”
জমে গেলাম। উষ্ণতা ছেয়ে গেল আমার দুই গালজুড়ে। রমণী মাত্রই প্রশংসার কাঙাল। তবে বিউটিফুলের চাইতে পাওয়ারফুল শোনায় যে এতটা সুখ, কে জানতো? নারীরা দূর্বল হিসাবেই আখ্যায়িত সমাজে। সেক্ষেত্রে তাদের শুধুমাত্র সৌন্দর্যের দাঁড়িপাল্লায় না মেপে ক্ষমতাবান হিসাবে সংজ্ঞায়িত করলে অনুভূতিটা চমৎকার হয়। আমার হাসিটা তাই বিস্তৃত হলো। নিজের স্যুটের কলার খানিকটা টেনে বললাম,
“থ্যাঙ্কস।”
“তোমার ব্যবসার জন্য শুভকামনা।”
জায়দান একটি ছোট গিফট ব্যাগ আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো। ভীষণ কৌতূহলী হয়ে সেটা হাতে নিলাম। বুকটা ধুকপুক করতে লাগল। প্রচন্ড ইচ্ছা হলো এই মুহুর্তেই খুলে দেখি ভেতরে কি রয়েছে। অথচ সাহস করে উঠতে পারলাম না। তার আগেই জায়দান খানিকটা অস্থির এবং দ্রুতগলায় বলল,
“আমার একটা কাজ আছে, আব্বুর কিছু বিজনেস অ্যাসোসিয়েটদের সঙ্গে দেখা করতে হবে। আমি তবে আসলাম।”
জায়দান সত্যি সত্যিই উল্টো ঘুরতে নিলো। বুঝতে বাকি রইলনা আমার, বান্দা এখানে থাকার পরিকল্পনা করে আসেনি। যত দ্রুত সম্ভব সে চলে যেতে চায়। এটা কি আমার সেই ইনভাইটেশন কার্ডের জন্য? ইদানিং আমায় দেখলেই কেন পালাতে চায় জায়দান? একটা তীব্র ব্যথার অনুভব ছড়িয়ে পড়ল অন্তরজুড়ে। অজান্তেই হাত বাড়িয়ে পাকড়াও করে ফেললাম প্রাক্তনের হাতের কব্জি। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ফিরে তাকাল সে, অথচ তার চোখের মাঝে লোকায়িত বিস্ময়টুকু টের পেতে আমার সমস্যা হলোনা। স্থির তাকালাম ওই গভীর দৃষ্টির মাঝে, আরো শক্তভাবে তার হাতটি ধরে বললাম,
“এভাবে চলে যেতে দেয়ার জন্য তো তোমায় আসতে বলিনি।”
চোখ পিটপিট করল জায়দান। নিঃশব্দে তাকাল আমার হাতের মাঝে ধরে রাখা তার হাতটির দিকে, পরক্ষণে সামান্য ঝুঁকে চাইল আমার দৃষ্টিমাঝে।
“আর কিছুক্ষণ থেকে যাও।”
আমি নিশ্চিত, উচ্চারণ করতে চেয়েছি ভিন্ন কিছু, অথচ উচ্চারিত হয়েছে এমন এক বাক্য যা আমায় নিজেকেও বিস্মিত করে তুলল। একটি ঢোক গিললাম। অন্তরের চাহিদা আর উপেক্ষা করা সম্ভব কি? জায়দান যথারীতি নিজের নির্বিকার দৃষ্টিতে আমায় পর্যবেক্ষণ করল, অতঃপর মৃদু কন্ঠে বলতে গেল,
“সাবিন। আমি এসেছিলাম এটা নিশ্চিতে যে এটাই যেন আমাদের শেষবারের….”
জায়দান বাক্যটি সমাপ্ত করতে পারলোনা। আমিও ঠিকমত শুনতে পেলাম না, কি বলতে চেয়েছিল সে। এর আগেই ভিন্ন একটি কন্ঠস্বর অত্যন্ত বিশ্রীভাবে আমাদের মুহূর্তে বাগড়া দিল।
“হ্যালো হ্যালো হ্যালো, লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান…”
অবাক হয়ে ঝট করে পিছনে ঘুরে দাঁড়ালাম। ক্যাফের একদম মাঝখান বরাবর দাঁড়িয়ে আছে আয়দান। মুখজুড়ে চওড়া হাসি, হাতে ধরা একটি গিটার। চোখ কপালে উঠে গেল আমার। এই ব্যাটা এসব নিয়ে ক্যাফেতে ঢুকল কখন? আমার চোখে পড়লনা? নাকি জায়দানকে দেখতেই এত ব্যস্ত ছিলাম যে আয়দানকে বিশেষ খেয়াল করিনি? আমার গালজোড়া অজান্তেই খানিক লালচে হয়ে উঠল। তবে এই মুহূর্তে লজ্জাবোধের থেকে বেশি ক্রোধ কাজ করছে আমার মাঝে।
আয়দান বেশ আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপে ক্যাফের মেঝেতে হেঁটে সামনে এগোল। যেন সে কোনো সুপারস্টার আর তাকে এখানে শো করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এমন ভঙ্গিতে দুহাত ছড়িয়ে বান্দা বলল,
“আজ, আমার প্রাণপ্রিয় বান্ধবীর শ্রমিক থেকে মালিক পর্যায়ে উঠে আসার শুভ দিনে, তাকে আমার অন্তর থেকে জানাই প্রাণঢালা ভালোবাসা এবং অভিনন্দন।”
একে অপরের দিকে তাকাল অতিথিগণ। বোঝা দায়, আয়দান আসলে আমার প্রশংসা করল নাকি নিন্দা। আর প্রাণপ্রিয় বান্ধবী? দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেললাম আমি নিজের আক্রোশ নিয়ন্ত্রণে। আমার অবস্থা লক্ষ্য করে বাঁকা হাসলো আয়দান। কণ্ঠের জোর বাড়িয়ে বলতে থাকল,
“আপনারা তো জানেনই, কত চড়াই উৎরাই পার হয়ে মিসেস, উপস! মিস সাবিন আজ এই পর্যায়ে পৌঁছে স্যাভেজ সাবিন হয়েছেন! আপনাদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে আমার অতি প্রিয়, অতি সাধের মানুষটা আজ নিজের নামে ক্যাফে পর্যন্ত খুলে ফেলল। জীবনে এতটুকু নির্লজ্জ্ব…আই মিন সাকসেসফুল তো হওয়ারই দরকার বলুন?”
কতক মানুষ হেসে উঠল, বাকিরা ভীষণ অস্বস্তিতে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রইল। হুমকিস্বরুপ এক পা এগোলেও আশেপাশে চেয়ে নিজেকে জোরপূর্বক আটকালাম আমি। এই আয়দানের বাচ্চাটা চায় কি? আমার দিকে ভ্রু উঁচু করে ভাব নিয়ে তাকাল সে। তারপর নিজের গিটারে হাত রেখে অপর হাত তুলে নির্দেশ করে বলল,
“তাই আজকের এই পরিবেশনাটা আমার তোমার জন্য একটা উপহার…”
আমি ধরেই নিতাম আয়দান আমার দিকেই নির্দেশ করছে, যদিনা তার ওই অতি শয়তানি দৃষ্টি আমায় ছাপিয়ে ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা জায়দানের উপর পড়ত।
প্রফেসর নির্লিপ্ত, তার মাঝে অনুভূতির ছিটেফোঁটা অবধি নেই। বুকের উপর দুবাহু বেঁধে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে দেখছে সে আয়দানকে। আমার দিকে চেয়ে অস্বাভাবিক এক ভঙ্গি করে আয়দান গিটারে সুর তুলতে শুরু করল। তারপরই গেয়ে উঠলো,
“আমার বন্ধু জানে সবই, কার সাথে খাও কফি, বলে দাও সত্যি এত কি ভয়~”
বুকটা ধ্বক করে উঠলো যেন আমার। চড়া গলায় গাইলো আয়দান,
“আমার মা বলেছিল খোঁকা তুই প্রেম করিস না, ভালো ছেলেদের কপালে ভালো মেয়ে জোটে না~”
_________চলবে_________
#সমাপ্তির_ওপাড়ে (বোনাস পর্ব🎊)
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা১৭ (শেষাংশ)
গোঁজামিল, গোঁজামিল, গোঁজামিল
সারাটা জীবন যে পাইলা গোঁজামিল
তোমারে সত্যিকার প্রেমের নামে
দিয়া দিসে বড় গোঁজামিল~
আয়দানের গাওয়া গানের কথাগুলো একনাগাড়ে বেজে চলেছে আমার মাথায়। রিরি করে কাঁপছে সমস্ত শরীর। যেকোনো মুহূর্তে ব্লাস্ট হতে পারি। সন্দেহ নেই আর কোনো। ইচ্ছাকৃতভাবে আমাকে অপদস্থ করতেই আয়দান এখানে এসেছে।
কি ভেবেছ চান্দু? আমি তোমাকে এমনি এমনি ছেড়ে দেব নাকি? তোকে চব্বিশ বাটি ঘোল না খাওয়ালে আমার নাম সাবিন হুসেইন না!
আয়দানের কান্ডকারখানা সমাপ্ত হয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। জায়দান তাকে একপাশে টেনে নিয়ে গিয়ে কি যেন বলছে। দূর থেকে আমি শুধু আয়দানের ঠোঁটের শয়তানি হাসি দেখতে পাচ্ছি। ওই ঠোঁটে ঝামা না ঘষলে আমার শান্তি হচ্ছেনা আজ আর।
হনহন করে হেঁটে কাউন্টারের কাছে পৌঁছালাম আমি। নিচ থেকে বের করে নিলাম বিশেষভাবে প্রস্তুত করে রাখা ছোট্ট ট্রেখানি। মিষ্টির সমাহার, ছোট ছোট লাড্ডু। নীলচে বর্ণের, উপরে সুগার পাউডার ছিটিয়ে রাখা। নিজের নাকের কাছে তুলে সুঘ্রাণ গ্রহণ করলাম প্রাণভরে। মোক্ষম অস্ত্র আমার।
চান্দু, তুমি যদি চলো পাতায় পাতায়, আমি চলি তোমার শিরায় শিরায়।
বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেলেদুলে এগিয়ে গেলাম অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা জায়দান এবং আয়দানের দিকে। জায়দানের শান্ত অথচ খানিকটা বিচলিত কন্ঠস্বর কানে এলো,
“সিন ক্রিয়েট হওয়ার আগে আমার সাথে চলো। তোমায় আমি বলেছিলাম, ভদ্র হয়ে থাকতে না পারলে আসার প্রয়োজন নেই। এমন বেহায়াগিরি করে কাকে কি বোঝাতে চাইছ তুমি?”
আয়দান মাথা হেলিয়ে বুকে হাত বেঁধে পরোয়াহীন উদাস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। যেন জায়দানের কথাবার্তা তার এক কান দিয়ে ঢুকছে এবং অন্য কান দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।
“আমার কথা কানে যাচ্ছেনা বোধ হয়। বেশ, বাসায় চলো এক্ষুণি।”
জায়দান ছোট ভাইকে একপ্রকার আদেশ করে উল্টো ঘুরছিল ঠিক তখনি আমি সামনে উপস্থিত হলাম। একটুর জন্য আমাদের মাঝে ধাক্কা লাগলোনা। বিস্তর এক হাসি ফোটালাম আমি ঠোঁটে।
“এত যাই যাই করছ, এখানে ভালো লাগছেনা বুঝি? কাউকে মিস করছ? আমি আরওয়াকে ইনভাইট করেছিলাম, উনি এলেন না, ব্যস্ত বোধ হয়।”
আমার কথা শুনে জায়দান থ হয়ে গেল। মুখভঙ্গিতে পরিবর্তন না এলেও ওই দৃষ্টির মাঝে একপ্রকার ক্লান্তিবোধ ফুটে উঠল। নিজের কপালে আঙুল ঘষে প্রাক্তন আমার একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠল,
“দেখো সাবিন। আমি এই মুহূর্তে ঠিক ঝগড়ার মুডে নেই।”
“মিলাদের মিষ্টি।”
তার কথাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ট্রেটি তুলে ধরলাম আমি। সামান্য একটু ভ্রু তুলে ট্রের দিকে চেয়ে রইল জায়দান। তবে সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি সাঁই করে ঘুরে দাঁড়ালাম, তাকালাম আয়দানের দিকে। আমার হাসি বিস্তৃত হলো তিনগুণ।
“কিন্তু তুমি তো মিষ্টি খাওনা, আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধুই নাহয় একটু মিষ্টিমুখ করুক?”
প্রাণপ্রিয় বন্ধু—শব্দটায় অস্বাভাবিক জোর দিলাম। স্পষ্টত দেখলাম, আয়দানের চেহারায় এক অদ্ভুতুড়ে ঝিলিক খেলে গিয়েছে। লম্বা পায়ে মাত্র এক কদমেই বরাবর আমার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে পড়ল বান্দা।
“অবশ্যই প্রাণপ্রিয় বান্ধবী আমার!”
তীক্ষ্ণ চোখজোড়া আয়দানের আমাকে আপাদমস্তক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে শেষমেষ আমার চোখে এসে থামল। অতঃপর গিয়ে পড়ল আমার হাতে ধরে রাখা ট্রের উপর।
“নীল লাড্ডু জীবনে এই প্রথমবার দেখলাম! থ্যাঙ্কস!”
অত্যন্ত আয়েশ করে প্লেট থেকে একটি ছোট লাড্ডু তুলে সম্পূর্ণটাই মুখে পুরে দিলো আয়দান। ঠোঁটের চওড়া হাসি লেপ্টে মাড়ির দাঁতের মাঝে মোক্ষম কামড় বসালো। আমি বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে চেয়ে রইলাম।
“উম, মানতেই হচ্ছে, মিলাদের মিষ্টি খেয়ে দোয়া করলাম, তোমার সুন্দর ব্যবসা যদি কয়েক দিনে লাটে না ওঠে, জ্বলে পুড়ে খাক না হয়, তাহলে আমাকেই….!!”
হঠাৎ করেই আয়দানের মুখ জমে গেল। চিবানো বন্ধ করে আমার দিকে প্রসারিত দৃষ্টি মেলে তাকাল। যেন আচমকা বজ্রপাত হয়েছে তার মাথায়। চোয়াল স্থির হয়ে গেল, ঠোঁটের চওড়া হাসি এক নিমিষে উধাও হল।
এক সেকেন্ড…দুই সেকেন্ড…তিন সেকেন্ড।
চার সেকেন্ডের মাথায় আয়দানের ছ ফুটি দানবিক শরীরটা ফ্লোরে আছড়ে পড়ল ধপাস করে। ঝটকা দিতে লাগলো মৃগী রোগীর মতন। কাদার গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা কেঁচোর মতন কিলবিল করতে লাগলো। হাত পা বাঁকা হয়ে এলো হলিউড মুভিতে দেখানো জম্বিদের আদলে।
জায়দান একনজর আয়দান আর একনজর আমার হাতের প্লেটের নীল লাড্ডুর দিকে তাকাল।
“দ্যা হেল?”
মেঝেতে কিলবিল করে হড়বড় করে বমি করতে উদ্যোগী হওয়া আয়দানকে দেখতে দেখতে মহা উদ্দীপনায় হেসে আমি প্লেটটা জায়দানকে দেখিয়ে জানালাম,
“ব্ল্যাক ডেথ, পৃথিবীর সবথেকে টক ক্যান্ডি। আমার ৮ টা হাজার টাকা গচ্চা দেয়া আজ স্বার্থক!”
“ইয়াক…ইয়াক…আহহহহহক্ক….!”
দুহাতে গলা চেপে ধরে চিৎকার করতে লাগল আয়দান। যেন বৈদ্যুতিক শক দেয়া হচ্ছে তাকে, এমন ভঙ্গিতে ঝটকার উপর ঝটকা দিচ্ছে তার শরীরটা। থু করে ক্যান্ডিটুকু বাইরে ফেলে দিল আয়দান। অবস্থা বেগতিক লক্ষ্য করে জায়দান হাঁটু গেড়ে বসতে যেতেই তার হাত ধরে ফেললাম আমি।
“কুলাঙ্গার ভাইয়ের জন্য এত দরদ না দেখালে সূর্য একদিন পশ্চিম দিকে উঠবেনা।”
ক্যাফের ভেতরে থাকা কয়েকজন থমকে গিয়েছে দৃশ্য লক্ষ্য করে। অনেকে আবার মুখ টিপে হাসছে। আমি ইশারা করতেই দুজন স্টাফ দৌঁড়ে এলো দ্রুত, আয়দানকে ধরল।
“মিরগী ব্যারামের রোগী। ধরে নিয়ে গিয়ে জুতা-মোজা শোঁকাও সবাই ধরে ধরে। যাও।”
যদিও আয়দানের অবস্থা দেখতে ভীষণ রকমের আনন্দ হচ্ছিল, তবে এটি ঠিক উল্লাসে গা ভাসানোর সময় নয়। তাই জায়দানকে টেনে নিয়ে গেলাম, ক্যাফের ভেতরের প্রাইভেট রুমে।
***
১০ মিনিট পর।
প্রাইভেট রুমটা মূলত তৈরি করেছিলাম ক্যাফেতে যদি মাঝে মধ্যে খুব বেশি সময় লাগে, তাহলে যেন থেকে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। তাছাড়া, বিশ্রামেরও একটা ব্যাপার আছে। কফি মেশিনে রোস্টেড কোকোবিন দিয়ে কফি তৈরী করতে করতে অত্যন্ত ফুরফুরে মেজাজে আছি আমি। অপরদিকে জায়দান কিছুটা অস্থির। চেয়ার টেনে বসতে বললেও সে বুকে দুবাহু বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে এবং চারপাশ চোখ ঘুরিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে।
“আয়দানের সঙ্গে তুমি ঠিক করনি।”
জায়দানের হঠাৎ মন্তব্যে আমি ক্ষণিকের জন্য থামলাম। ভ্রু কুঁচকে চোখ ঘুরিয়ে তাকালাম পাশে,
“মানে? তোমার ভাই আমার সঙ্গে যা করছিল, সেসব ঠিক করছিল?”
“কুকুর কামড়ালে কি তুমিও কুকুরকে কামড়াবে?”
“হ্যাঁ।”
জায়দান এতক্ষণ যাবৎ একপাশের শেলফের দিকে তাকিয়ে থাকলেও আমার উত্তর শুনে দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকাল। চশমার অন্তরালে বাদামী নয়নজোড়াকে জ্বলজ্বল করে উঠতে দেখলাম আমি।
“কুকুর যখন খুব বেশি বাড় বেড়ে যায়, তখন সেটাকে শিক্ষা দেয়ার দরকার আছে। নাহলে কুকুর মনে করে, একমাত্র তার দাঁতই ধারালো!”
শব্দ করে কফি মেশিন বন্ধ করলাম। মগ রাখতেই তরল ব্ল্যাক কফি ক্রমশ জমা হতে আরম্ভ করল মগের ভেতর। সেদিকে তাকিয়ে রইলাম আমরা দুজনই। জায়দান নিঃশব্দ, অপরদিকে আমিও।
দীর্ঘ নীরবতা। আমার নিঃশ্বাস প্রশ্বাস দ্রুততর হয়ে উঠেছে। বুঝলাম না কেমন অনুভব করছি। রাগ? ক্রোধ? ভয়? আতঙ্ক? সংকোচ? বিশ্লেষণ করা কষ্টসাধ্য। জায়দান আমার প্রতি আর তেমন কোনো বিশেষ আগ্রহ না দেখিয়ে নীরবে কফির মগ তুলে নিলো। দীর্ঘ এক চুমুক দিল। চশমায় গরম কফির বাষ্প ঠেকতেই সেটি এক হাতে খুলে নিয়ে কাউন্টারের উপর রাখল।
“তুমি কি ইনভাইটেশন কার্ডটা খুলে পড়েছিলে?”
প্রশ্নটা অবশেষে উচ্চারণ করেই ফেললাম। জায়দান কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালনা। কাউন্টারের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কফির মগে মনোযোগ দিল। ভ্রু কুঁচকে ফেললাম আমি। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললাম,
“আমি তোমায় কিছু জিজ্ঞেস করেছি, জায়দান।”
“এমন প্রশ্নের কেমন উত্তর দেয়া উচিত, আমার জানা নেই।”
হালকা হাসি ফুটলো আমার ঠোঁটে। জায়দান সরাসরি আমার চোখের দিকে আর তাকাচ্ছেনা। যা বোঝার, আমি বুঝতে পেরে গিয়েছি।
“আমি কিন্তু ওটা মজা করে লিখিনি।”
বলে উঠলাম, তাৎক্ষণিক জবাব এলো প্রাক্তনের পক্ষ থেকে,
“আমি কখন বললাম তুমি মজা করেছ?”
“তাহলে তুমি ধরতে পেরেছ নিশ্চয়ই, আমার উদ্দেশ্য?”
“তোমার উদ্দেশ্য খুঁজে বের করার মতন সময় এবং ইচ্ছা কোনোটাই আর নেই আমার।”
জমে গেলাম আমি। চোয়াল ফাঁক হলো বিস্ময়ে। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম জায়দানের দিকে। নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকালো সে, যেন ইচ্ছাপূর্বক আমাকে শোনানোর উদ্দেশ্যেই সে মৃদু আঁচে বললো,
“দেরী হয়ে যাচ্ছে। আমার এবার সত্যিই যেতে হবে। শুভকামনা তোমার ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য। এখন থেকে তুমি তোমার পথে এবং আমি আমার পথে। আশা রাখছি, আর কখনো আমাদের পথ এক হওয়ার প্রয়োজন পড়বেনা।”
কফি শেষ করার দিকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিলো সে। আমি জানি এরপর কি আসতে চলেছে। ছোট্ট একটা ধন্যবাদ এবং প্রস্থান। জায়দান যে নিজের কথার উপর অটল, সেটা আমার চেয়ে ভালো আর কেউ জানেনা। সে যখন বলেছে, তখন আমার সামনে অপেক্ষমাণ ভবিষ্যত এটাই।
এটাই হওয়া উচিত। আমাদের দুজনের পথ আলাদা হওয়াটা শ্রেয়। সবকিছুর সহজ সমাধান, নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন জীবনে মনোযোগ দেয়া। জায়দান নিজের মতন এবং আমি আমার মতন। গল্পটা এমন হলেই ঘটবে স্বাভাবিক সমাপ্তি।
কিন্তু এই গল্পটা আমার। আর এই গল্পের সমাপ্তি লেখার দায়িত্বও আমার। লেখকের নয়। আমি গল্পের সেই চরিত্র, যে নিজেকে নিজে লিখে যায়, আমার গল্পে লেখক ক্ষমতাহীন।
সমাপ্তির ওপাড়ে আফসোসের অস্তিত্ব মুছে ফেলা বাঞ্ছনীয়। আমি দুঃসাহসী, আমি নিজের অনুভূতি গোপনে না রেখে প্রকাশ করতে জানি। যদি হয় তবে হোক না হৃদয়ে ভাঙন? এই ভাঙনে ভয় কিসের?
“জায়দান….”
নিজের কন্ঠস্বর নিজেই চিনতে পারলাম না আমি। এতটাই গভীর এবং অনুভূতিসম্পন্ন শোনালো। একপাশে দাঁড়ানো সুউচ্চ টাওয়ার সদৃশ প্রাক্তনকে স্পষ্টত স্থির হতে দেখলাম। ঘুরে দাঁড়ালাম আমি, তার মুখোমুখি।
“মানুষ স্মৃতির প্রেমে পড়ে, ভালো লাগার প্রেমে পড়ে, পুরুষের প্রেমে পড়ে, নারীর প্রেমে পড়ে, প্রাণীর প্রেমে পড়ে। এই প্রেমে পড়ার কোনো শেষ নেই।”
এক পা অগ্রসর হয়ে ঘাড় টানটান করে ওই বাদামী সমুদ্রমাঝে নিক্ষিপ্ত করলাম নিজের প্রজ্জ্বলিত দৃষ্টি।
“আমি প্রেমে পড়েছি আমার প্রাক্তনের, আমার অবহেলায় ফেলে দেয়া দাম্পত্য জীবনের।”
এক সেকেন্ডের বিরতি, অপরপক্ষ কিছু বুঝে ওঠার সময়টুকুও পেলনা। এর আগেই আত্মবিশ্বাসী গলায় বললাম,
“চলো প্রেম করি।”
আমার মুখ থেকে বাক্যটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে জায়দানের মুখ থেকে ছিটকে সকল কফি বেরিয়ে গেলো। সেসব ছিটে এসে পড়লো আমার পরনের টপের উপর। বেচারা কাশতে কাশতে চোখে আঁধার দেখছে বোধ হয়। চেহারা টকটকে লাল হয়ে উঠেছে খেয়াল করে রুমাল বের করে মুছিয়ে দিতে লাগলাম। কিন্তু জায়দান আমার কব্জি পাকড়াও করে ফেললো। এত জোরে চেপে ধরলো যে হাড়ে গেঁথে গেলো তার নখর।
জীবনে এই দ্বিতীয়বার জায়দানের সদা নির্লিপ্ত চেহারায় তীব্র আক্রোশ এবং বিস্ময়ের সংমিশ্রণ দেখতে পেলাম আমি।
“তোমার মাথা ঠিক আছে, সাবিন? এসব কি উল্টোপাল্টা কথা বকে বেড়াচ্ছ তুমি?”
কেন যেন ভীষণ রাগ হলো আমারও। একটা ঝটকা দিয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রুমাল জায়দানের মুখ বরাবর ছুঁড়ে দিয়ে বলে উঠলাম,
“তুমি মনের সাথে লুকোচুরি খেলতে পারলেও আমি পারিনা। ঠিক আছে? আমাদের মাঝে এতকিছু হয়ে গেলো, এরপরও যদি তোমার টনক না নড়ে থাকে তাহলে বলব তুমি চোখ থাকিতে অন্ধ! উপস, তোমার তো আগে থেকেই চশমা আছে! আরেকটা লাগাও!”
“তুমি আমার সঙ্গে ঝগড়া করতে চাইছ?”
“না। প্রেম করতে চাইছি। যেটা বিয়ের আগে আমার ভন্ড মাথা আর বিয়ের পর তোমার বাবু ইস্যুয থাকা আম্মাজানের জন্য করতে পারিনি।”
“ইউ আর ইনসেইন উইম্যান! আই অ্যাম ইওর ড্যাম এক্স হাসব্যান্ড!”
ক্ষীপ্র গতিতে এগোলো আমার হাত। জায়দানের কলার ধরে পাকড়াও করে এক টানে নিজের মুখ বরাবর নুইয়ে আসতে বাধ্য করলাম বান্দাকে। ছিটকে যাওয়া কফির ক্ষীণ ধারা তখনো গড়াচ্ছে তার ঠোঁটের কোণ বেয়ে। সেই পানে চেয়ে সুগভীর গলায় জানালাম,
“আর আমি সেই মেয়ে যার ঠোঁটের রং তোমার ঠোঁটে আষ্টেপৃষ্টে লেপ্টে আছে। কোনো ওলোলে আলেওয়ালা ডিটারজেন্ট দিয়ে ঘষেও এই রং ওঠাতে পারবেনা।”
জায়দানের মতন মানুষকে বিস্ময়ে হতভম্ব করে দিতে পেরেছি। এর চাইতে বড় বিজয় কি আর হতে পারে? বাঁকা হাসলাম, ওই বাদামী অশান্ত দৃষ্টিতে গেঁথে গেলো আমার নিগূঢ় দৃষ্টি,
“সকলে বিয়ের আগে প্রেম করে, নয়ত বিয়ের পর। আমরা নাহয়, ডিভোর্সের পর প্রেম করব? নতুন ইতিহাস নয় কি তা, মাই ডিয়ারেস্ট হার্ট অ্যাটাক?”
স্তব্ধ জায়দান। সত্যিই আজ স্তব্ধ সে। চোখেমুখে উপচে পড়া অনুভূতির জোয়ার। বিস্ময়, শঙ্কা, ক্রোধ সবকিছুর সংমিশ্রণ। এত ধরনের মাঝে আমি নজর হাতড়ে একটুখানি ভালোবাসা খুঁজলাম।
“আমি তোমার মায়ায় জড়িয়ে গিয়েছি, ভালোবাসা কাটলেও মায়া কাটানো যায়না, জায়দান। ”
জবাব এলোনা এই ঘোষণার। এলো শুধু বাদামী সমুদ্রে ভীষণ জলোচ্ছ্বাস।
_________চলবে________
#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা১৮
অনুভূতি।
অত্যন্ত সহজ একটি শব্দ। হাসি, কান্না, সুখ, দুঃখ, রাগ, অভিমান নানান ধরণের অনুভূতি রয়েছে মানুষের। মানুষ অনুভূতি অনুভব করতে বাধ্য, এটাই মানুষের স্বকীয়তা। অথচ, জায়দানের মতন কিছু মানুষ পৃথিবীতে রয়েছে যাদের কাছে এই সহজ ব্যাপারটাই অত্যন্ত জটিল। অনুভূতিহীনতার মাঝে অনুভূতির জাগরণে মানুষগুলো যেন বড়ই অপারগ।
জায়দানের চোখের মাঝে যে জলোচ্ছ্বাস আমি দেখতে পেলাম, তা ঠিক অশ্রু, যন্ত্রণা, হাহাকার নাকি অন্যকিছু বোঝার আগেই শীতল আবরণে ঢেকে গেল ক্ষীণ ওই অনুভূতিটুকু। আমার পানে একরাশ স্তব্ধতা নিয়ে শুধু চেয়েই রইল সে। নিজেকে কেমন যেন তুচ্ছ মনে হয় ওই দৃষ্টির সামনে। যেন আমি কাঠগড়ার আসামী।
দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করলাম। জানি, আমি যা প্রকাশ করতে চাইছি তাতে উত্তেজিত হলে চলবেনা। হৃদয়ের কথা হতে হয় ভাবগম্ভীর।
“আমি জানি, আমার কথাগুলো হয়ত তোমার কাছে বোকার মতন লাগছে।”
অবশেষে শুরু করলাম,
“আমি এটাও জানি অতীতে আমি তোমার কোনো বিশেষ সুখের কারণ হতে পারিনি। আমাদের মাঝে যা ছিল এবং যেভাবে সবকিছু শেষ হয়েছে সবটাই অপ্রত্যাশিত।”
জায়দানের মাঝে অনুভূতি পাওয়া যাবেনা জানা সত্ত্বেও অত্যন্ত আশা নিয়ে তাকালাম আমি। প্রাক্তনের মাঝে একটুখানি টান দেখার ইচ্ছা আমার। সেই টান যেন হয় আমার প্রতি, অন্য কারো প্রতি নয়।
“জায়দান…”
গলা কাঁপলো আমার। স্বীকার করে নিলাম,
“আমার সঙ্গে এরকম আর কখনো হয়নি। আহান ভাইয়ার সাথেও নয়। দেখো না, আজ আমি ওই লোকটাকে কতটা ঘৃণা করি! তার কথা স্বপ্নেও কল্পনা করতে আমার রাগ হয়! অথচ তুমি! এতকিছুর পরেও আমি তোমায় ভুলতে পারলাম না। তুমি আমায় কম কষ্ট দাওনি, অথচ সেই কষ্টগুলো আমার কাছে তুচ্ছ মনে হচ্ছে আজ। যেমন করে মাছ ডাঙায় ছটফট করে নদীতে ফিরতে চায়, তেমন করেই আমার অন্তর ছটফট করছে। আমি হয়ত তেমনি একটা বোকা মাছ, যে নদীর মূল্য টের পাইনি।”
জায়দান ওই একই রকম, নির্বাক। তার চেহারায় স্থিরতা, যেন কোনো পাথরের ভাস্কর্যের সঙ্গে কথা বলছি আমি। এগিয়ে গিয়ে কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে জায়দানের বুকের উপর রাখলাম, ঠিক যেখানে তার হৃদযন্ত্র স্পন্দিত হচ্ছে, সেখানটায়। আমার নয়নজোড়া সিক্ত হয়ে উঠল আবেগের স্রোতে।
“আজকাল তোমার বুকে কান পেতে তোমার হৃদস্পন্দন শুনতে ভীষণ ইচ্ছা হয় আমার।”
জায়দান আমাকে বাঁধা দিলোনা। স্পর্শ করতে দিল। একটি শক্ত ঢোক গলাধঃকরণ করলাম। আঙুলে বুলিয়ে গেলাম টি শার্টের অন্তরালে থাকা ত্বক, জোরালোভাবে বারকয়েক স্পন্দিত হয়ে যেন আমার ছোঁয়াকে উৎসাহ জানাল ওই হৃদয়। মুচকি হাসলাম।
“তোমার হার্টবিটও জানে তুমি কি চাও।”
“কি চাই আমি?”
জায়দানের শীতল কন্ঠস্বর আমার শিরদাঁড়া বেয়ে শিহরণ খেলিয়ে দিল। মুখ তুলে ওই বাদামী প্রান্তরে নিজের দৃষ্টি মেলালাম। হন্যে হয়ে খুঁজলাম আবারো, এক টুকরো আবেগ। কিন্তু পেলাম না কিছু, বরফশীতলতা ছাড়া।
“তোমার কি মনে হয়? আমাদের এত সময় বাদে দেখা হওয়াটা কাকতালীয়? সমাপ্তির পরেও আমার ভাগ্যের সঙ্গে তোমার জড়িয়ে যাওয়াটা শুধুই কোনো দৈবিক ঘটনা? ভাগ্যের ইশারা নয়? নতুন সূচনার ইঙ্গিত নয়?”
“তিলকে তাল রূপে না দেখাই শ্রেয়।”
ভ্রুজোড়া কুঁচকে উঠল আমার। ভীষণ হতাশা টের পেলাম। এক ঝটকায় জায়দানকে কাছে টেনে তার শরীরজুড়ে নিজের বাহু জড়িয়ে ফেললাম। বেশ লম্বা হওয়ার দরুণ আমায় ঘাড় টানটান করে তার সঙ্গে কথা বলতে হচ্ছে বিধায় কোনো পরোয়া ছাড়াই তার চেলসি বুট পরিহিত প্রশস্ত-দীর্ঘ দুই পায়ের উপর নিজের পায়ের পাতা রেখে উঁচু হয়ে দাঁড়ালাম। জায়দান আমাকে দূরে ঠেললো না, বরং দুখানা হাত আলতো করে রাখলো আমার কোমরে, যেন ভারসাম্য হারিয়ে উল্টে না পড়ি।
“তিলকে তাল? তাই মনে হয় তোমার জায়দান? তবে জবাব দাও তো, তুমি কেন আয়দানকে আমার কাছে ক্ষমা চাইতে নিয়ে এসেছিলে? কেন আমাকে সাহায্য করেছিলে? মেনে নিলাম, তোমার ন্যায়ের অন্তর তোমাকে এমন করতে বাধ্য করেছে। তবে অন্য একটি প্রশ্নের উত্তর দাও। সেদিন রাতে তুমি ঢাকা মেডিকেলে আমায় দেখতে গিয়েছিলে কেন?”
জায়দানের দৃষ্টি খানিকটা প্রসারিত হলো। ওইটুকুই তার বিস্ময়, আমি জানি। মৃদু হাসির রেখা ছড়িয়ে পড়লো আমার ঠোঁটে। নিজেকে আরো খানিকটা কাছে নিয়ে ভরাট আবেগী গলায় বললাম,
“ক্রিড আভেন্টাস, একদম স্নিগ্ধ, আপেল আর লেবুর মিশ্রিত একটা সুবাস আসে গায়ে মাখলে। তুমি কি ভেবেছিলে? আমি তোমার পারফিউম চিনতে পারবোনা?”
অনুভব করলাম আমার কোমরজুড়ে জায়দানের উভয় হাত শক্তভাবে চেপে বসেছে। যদিও মুখভঙ্গি স্বাভাবিক আছে, তাতে বিচলনের লেশমাত্র নেই। আমার চেহারায় করুণ এক ভাব ফুটে উঠল,
“আর সেদিন মিসিরের অ্যাপার্টমেন্টে যা হয়েছে তা দেরিতে হলেও মনে পড়েছে আমার। এই সবকিছু কি শুধুই তোমার দয়া? করুণা? আমার জন্য কি তোমার অন্তরে কিছুই নেই?”
উত্তরহীন জায়দান। চশমার আড়ালে চোখজোড়া এখন সামান্য কাঁপছে। ব্যাকুল কন্ঠে তার পিঠ আঁকড়ে বলে উঠলাম,
“কিসের ভয় পাচ্ছ তুমি জায়দান? কে তোমাকে ঠেকিয়ে রাখছে? সমাজের নিয়ম কানুন? পুঁথিগত নিষ্ঠার বাঁধন? পারিবারিক পিছুটান?”
জবাবেরা যেন নির্বাসিত আজ। চোখ দুটো টলটল করে উঠল আমার,
“নাকি সবকিছু আমার ভুল, বলো? যদি তাই হয়ে থাকে, তবে ভুল ভুলে ভালো থাকা যায়?”
অবশেষে জবাব এলো, এক শীতলতায় মোড়া উপাখ্যান হয়ে।
“মানুষের মস্তিষ্ক ২৫০০ টেরাবাইট তথ্য ধরে রাখতে সক্ষম। কিন্তু আফসোস! আমার মস্তিষ্কে তোমার ভুলেদের জায়গা থাকলেও, তোমার জায়গা নেই।”
বুকের ভেতর ধারালো এক তীর আঘাত হানল যেন। ক্ষত বিক্ষত করে দিল অভ্যন্তর, এক ঝটকায়। মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল আমার। ভুল, আমার সকল ভুল, আমার সকল অভিযোগ, অনুযোগ, ক্রুরতা আমি যেন আমার প্রাক্তনের ওই বাদামী নয়নপটজুড়ে ভাসতে দেখলাম। বহুদিন বাদে, আমি তাকে স্মৃতিচারণ করতে দেখলাম।
***
কালবৈশাখীর ঝড় বইছে বাইরে। ঝোড়ো হাওয়ায় উন্মাতাল শহরতলী। এর মাঝেই গাড়ি ছুটিয়ে জেসমিনকে দেখতে এসেছেন পারিবারিক ডাক্তার। ব্যক্তিগত বেডরুমে চিকিৎসা চলছে তার, সঙ্গে আছেন জাফর।
সমস্ত আরেফিন বাড়ি নিস্তব্ধ। যেন আজ এই বাড়িতে শ্বাস ফেলাও দায়। জায়দান টের পাচ্ছে হাত পা কাঁপছে তার। হলের সোফায় বসে থাকা সত্ত্বেও মনে হচ্ছে যেন তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গিয়েছে। কিছুতেই শান্ত থাকা সম্ভবপর হচ্ছেনা, দুরুদুরু কম্পমান বুক। পা দুলিয়ে যাচ্ছে জায়দান, আঙুলের কর গুণে গুণে আরবী উচ্চারণে একটি বিপদমুক্তির দোয়া পাঠ করে যাচ্ছে সে। বহু বছর আগে শিখেছিল, খুব বেশি অস্থির হলে এমনটা করে সে। এই অস্থিরতা জীবনে ঠিক কত বছর আগে হয়েছিল সেটা মনে করার ক্ষমতা জায়দানের ক্ষুরধার মস্তিষ্কের নেই।
বাইরে প্রচন্ড জোরে বিদ্যুৎ চমকে উঠলো। মনে হলো, যেন বজ্রপাতটি বাইরে নয় বরং ঘরের ভেতরে হয়েছে কোথাও। জায়দান চশমা খুলে নিয়ে দুই তলার সিঁড়ির দিকে তাকালো। সেখানে দন্ডায়মান অগোছালো একটা অবয়ব দেখা গেল। বারকয়েক টানা বজ্রপাতের ঝলকানিতে সেই অবয়বকে দেখালো ভূতুড়ে।
“আমার ডিভোর্স চাই।”
ধ্বনিত হলো শীতল কন্ঠস্বরটি। যেন মানুষ নয়, কোনো অশরীরী কথা বলছে। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল জায়দান। খানিকটা কাঁপতে থাকা হাতেই চশমা চোখে দিল। আলো আঁধারি ছেড়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো সাবিন। পরনে একটা কুর্তি, যার বোতামগুলো খোলা। বুকের উপরের দিকটা উন্মুক্ত, অগোছালোভাবে সেথায় ছড়িয়ে আছে মাথার চুল। সাক্ষাৎ কোনো প্রেতাত্মার ন্যায় দেখাচ্ছে সাবিনকে এই মুহূর্তে। জায়দান মুষ্টি পাকিয়ে ফেলল নিজের দুহাত। সাবিন আবারো বললো,
“আমার ডিভোর্স চাই, এক্ষুণি!”
নিজের ৩০ বছরের জীবনে প্রথমবার নিয়ন্ত্রণ হারালো জায়দান। তার গলা চড়াও হয়ে উঠলো,
“ইউ হিট মাই মাদার! অ্যান্ড নাউ, ইউ আর ডিমান্ডিং আ ডিভোর্স! হাউ ডেয়ার ইউ!”
“আই ডেয়ার মাচ!”
জায়দানের বুক বরাবর সজোরে ধাক্কা দিয়ে পাল্টা চিৎকার করে উঠল সাবিনও। দাঁতে দাঁত পিষে উচ্চারণ করল,
“ইওর মাদার ইয আ বিচ্! বেশ করেছি ওনাকে চড় মেরেছি! সুযোগ পেলে আবার মারব!”
“সাবিন!”
ভীষণ ক্রোধ দমনে দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ধরল জায়দান। ঘড়ঘড়ে গলায় বলে উঠলো,
“তুমি আমার স্ত্রী, এই চরম সত্যটা ভুলে যেতে আমায় বাধ্য করোনা!”
এগিয়ে এলো সাবিন, ধ্বংসমূর্তির ভঙ্গিতে। জায়দানের বুকে হাত ঠেকিয়ে ঠেলে দিলো পিছনে, একবার, দুবার, অসংখ্যবার।
“ভুলে যাও, তুমি তোমার বউকে ভুলে মায়ের সাথে সংসার পাতো কেমন? রেহাই দাও আমাকে। তোমার স্ত্রী হওয়ার চাইতে অপমানের আর কিছু আমার জীবনে কোনোদিন হয়নি এবং হবেও না!”
একটি ধাক্কা,
“মেরুদন্ডহীন!”
আরো একটি ধাক্কা,
“অনুভূতিহীন!”
তৃতীয় ধাক্কা,
“কাপুরুষ!”
চতুর্থ ধাক্কাটা সাবিন দিতে পারলনা, তার দুইহাত শক্তভাবে চেপে ধরে ফেলল জায়দান। খানিক যাতনায় হিসিয়ে উঠল সাবিন, সেটি লক্ষ্য করে বাঁধন নমনীয় করলেও তার হাত ছেড়ে দিলোনা স্বামী। ঝুঁকে এলো নিচে, দৃষ্টিতে মেলালো দৃষ্টি। এক পার্শ্বে যখন আগুন, পৃথিবীর অন্য পার্শ্বে তখন বরফ।
“ডিভোর্স চাও তুমি?”
“মুক্তি চাই। তোমার নামের বাঁধন থেকে মুক্তি চাই!”
জায়দানের ঠোঁটজুড়ে অত্যন্ত সূক্ষ্মতর এক পরিতাপের হাসি ফুটল, সাবিনকে কাছে টেনে নিল সে। ভীষণ এক বজ্রপাত হলো ঠিক কাছে কোথাও, অথচ এক চুলও টললোনা কেউ। একে অপরের দৃষ্টিমাঝে আবদ্ধ দুজন।
“বেশ তবে। আজ আমি তোমায় মুক্তি দিলাম, সাবিন। আমার অভিশাপ থেকে মুক্তি।”
বাঁকা হাসলো সাবিন। ওই হাসি যেন অন্তর্জ্বালা ধরিয়ে দেয় সমস্ত অস্তিত্বে।
“শেষমেষ তুমি তাহলে নিজের মাকেই বেছে নিলে, ব্যক্তিত্বহীন পুরুষ! আমি ঠিকই ধরেছিলাম, তুমি আহান ভাইয়ার নখের যোগ্যও নও। স্বামী নামের কলঙ্ক তুমি, আর তোমার এই গোটা পরিবার একটা জানোয়ারের জঙ্গল! এই পরিবার নিয়েই থাকো তুমি, এদের অবহেলায়ই তোমার মরণ হোক! সেদিন আমার নাম নিয়ে যতই আফসোস করো না কেন, আমি দূর থেকে তোমার দুর্গতি দেখব আর মনের সুখে হাসবো!”
সাবিন থামল না, যেন সকল অভিযোগ, অভিমানের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে আজ,
“তোমার মতন একটা মানুষ ভালো কিছুর যোগ্যই না! যে হাসতে জানেনা, লড়তে জানেনা, অনুভূতি দেখাতে জানেনা তার আবার কিসের সুখ – শান্তি? তোমার জন্য এই অভিশাপের জীবনটাই শ্রেয়। তুমি ডিজার্ভ করো স্রেফ অবহেলা, উপেক্ষা আর জগতের সবথেকে নিকৃষ্ট যাতনা। তাতেও বা কি? অনুভূতি বলতে তো কিছুই নেই তোমার মধ্যে। তুমি শুধু মানুষ নামের একটা খোলস, জায়দান!”
সহসাই সাবিনকে ছেড়ে এক পা পিছনে সরে দাঁড়াল জায়দান। হিমশীতল কাঠিন্য নিয়ে ঘোষণা করল,
“গেট লস্ট অ্যান্ড নেভার কাম ব্যাক ইন মাই লাইফ!”
সাবিনের খিলখিলে হাসি ছাড়িয়ে গেল বাইরের ভীষণ ঝড়ের শব্দকেও। সকল বাড়িতে প্রতিধ্বনিত হলো ওই অশরীরী ধ্বনি।
“অ্যায ইফ আই উইল এভার কেয়ার ফর ইউ অ্যান্ড ইওর ড্যাম লাইফ!”
***
বর্তমান।
জায়দান অবলীলায় আমায় নিজের পায়ের উপর থেকে তুলে মেঝেতে নামিয়ে রাখল। সরে দাঁড়াল খানিকটা দূরে, সৃষ্টি করল এক দূরত্ব আমাদের মাঝে। এই দূরত্বের সেতু পার করা আমার পক্ষে আর কোনোদিন সম্ভব হবে কি? আমার জানা নেই।
এক দীর্ঘ নীরবতা ভর করল আমাদের মাঝে। অতঃপর জায়দানের অতি শান্ত কন্ঠস্বর ধ্বনিত হলো,
“প্রেম এবং সুখ পরস্পরের ব্যস্তানুপাতিক। একটি বাড়লে অপরটি কমে।”
নিঃশ্বাস আটকে গেল আমার। ধরা গলায় বললাম,
“অনুভূতি গণিতের সূত্র নয়।”
“আফসোস, আমি গণিত বুঝলেও অনুভূতি বুঝলাম না।”
স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলাম। প্রত্যাখ্যান অনেক রকমের হয়। অথচ এই ধরণেরও হতে পারে, নিজে অনুভব না করলে কি কোনোদিন টের পেতাম। জায়দান নিজের চশমা ঠিকঠাক করে ব্যক্ত করল,
“আমার হিসাব এবং বিশ্লেষণ বলছে, তোমার স্বীকারোক্তি হাস্যকর। সামাজিক নিয়মের পরিপন্থী উপরন্তু আমার অহংবোধের অপমানজনক। এতে কোনো ভবিষ্যত নেই। বত্রিশ বছর বয়সে আমার ভবিষ্যত ছাড়া কোনো গতি নেই। সঠিক হবে এটাই, তুমি তোমার মতন করে ভালো থাকো, আর আমি আমার মতন করে। সেটাই তো তুমি চেয়েছিলে, আমার নামের বাঁধন থেকে মুক্তি।”
হয়ত ইদানিং আমি খুবই বেহায়া হয়ে গিয়েছি। তাইতো অতি আকাঙ্ক্ষায় হাত বাড়িয়ে জায়দানের একটি হাত আঁকড়ে ধরলাম,
“তুমি কি আমায় সেদিনের জন্য শাস্তি দিচ্ছ? আমার কথায় তোমার সত্যিই কষ্ট হয়েছিল?”
জায়দান হাসলো। সত্যিই হাসলো! নিঃশব্দে ঘেরা এক হাসি। ঠোঁটের কোণ দুটো উদ্ভাসিত হলো তার। অস্বাভাবিক সেই হাসির সহিত সে জানালো,
“আমি তো মানুষ নামের খোলসমাত্র। আমার কষ্ট বলে কোনো অনুভূতি নেই।”
নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল জায়দান। পিছিয়ে দাঁড়াল, এবার অনেকখানি। অসহায় চোখে শুধু তাকিয়ে দেখলাম আমি।
“আর শাস্তি? যদি এই ভেবে শান্তি পাও, তবে ভেবে নাও আমাদের মাঝে যা কিছু হয়েছে সবটাই আমার পূর্ব পরিকল্পনা, যেন আমি তোমার নাজুক অন্তরকে ভয়ানকভাবে ভেঙেচুরে প্রতিশোধ নিতে পারি। কে বলতে পারে? হয়ত এটাই তোমার জীবনে নতুন করে আমার আগমনের কারণ?”
পায়ের তলায় আর জোর পেলাম না আমি। মনে হলো, যেন গোটা পৃথিবী বনবন করে ঘুরতে আরম্ভ করেছে আমার চোখের সামনে। জায়দান অপেক্ষা করলনা, বিনা দৃষ্টি ব্যয়ে উল্টো ঘুরে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল প্রাইভেট রুমের বাইরে।
ধপাস করে মেঝেতে বসে পড়লাম আমি। অশ্রু গড়ালো না এক ফোঁটা। যেন বিদ্রোহ জুড়েছে তারা। অশ্রু বইতে পারলে হয়ত কষ্ট কিছুটা লাঘব হতো। অথচ, সবটাই এখন বুকের ভেতর চাপা পড়ে গিয়েছে। বিরহ এবং উপলব্ধি। নিজের বুক নিজের খামচে ধরলাম, ব্যথা হচ্ছে ভীষণ, নাকি আমার কল্পনা? কে জানে? এই সবকিছু কি আমার পাপের শাস্তি? এতটাই ক্রুর ছিলাম আমি? হয়ত হ্যাঁ। জীবন আমায় আরো এক ঘায়ে আজ দেখিয়ে দিল, অহংবোধের পরিণাম এবং নিয়ন্ত্রণহীন কথার প্রভাব। আজ আরো এক শিক্ষার অধ্যায় যুক্ত হলো আমার এই ভাঙাচোরা ভুলে ভরা জীবনটায়।
দুই নয়ন তুলে তাকালাম আমি, জায়দানের ফেলে যাওয়া পথের পানে। তার শারীরিক সুবাস এখনো রুমের বাতাসজুড়ে খেলে বেড়াচ্ছে। নাকি শুধু আমিই এই সুঘ্রাণ টের পাচ্ছি? কান্না এলো আমার খুব, অথচ কাঁদতে পারলাম না। অস্ফুট স্বরে শুধু বেরোলো,
“আমায় ভাঙতে তোমার এত সাধের আয়োজন?”
যে ফাঁদে পড়েছি, সেই ফাঁদ থেকে এই ভুলভাল সাবিনটার আর কোনো মুক্তি নেই।
☆ ☆ ☆ ☆
নিজের বাড়িতে জায়দান পৌঁছাল গভীর রাতে। প্রায় আড়াইটা বাজে তখন। অনেক গল্পে পড়া, মানুষের মুখে শোনা, ছেলে মেয়ে দেরী করে বাড়িতে ফিরলে নাকি মায়েরা পাত পেড়ে অপেক্ষায় থাকেন সন্তানের। অথচ, এই বাড়ি ধূ ধূ ফাঁকা মরুভূমি। কোথাও কেউ নেই শুধুমাত্র অস্তিত্বহীন ছায়া বাদে। সে ফিরেছে কি ফেরেনি, সেই নিয়ে বাড়ির মানুষের বিশেষ মাথাব্যথা নেই। রান্নাঘরে নিশ্চয়ই খাবার রেখে দেয়া আছে, রোজিনা মেয়েটা এমন করে, হটপটে রেখে দেয়। তবে জায়দানের আজ সেসবের প্রতি বিশেষ আগ্রহ নেই।
পায়ে পায়ে দুই তলায় উঠে গেল জায়দান। সে ভার্সিটিতে যায়নি, দেখা করেনি বাবার বলে দেয়া ক্লায়েন্টদের সঙ্গেও। অথচ আসেনি একটাও ফোন। কেউ জিজ্ঞেস করেনি সে কোথায় ছিল। ভালোই হয়েছে।
নিজের রুমে এসে দরজা আটকে ধপাস করে কফি টেবিলের সামনে বসে পড়ল জায়দান। বসেই রইল, দীর্ঘক্ষণ, একেবারে কোনো কারণ ছাড়া। অতঃপর আজ আবারও খুলল নিজের ডায়েরীর পাতা। হাতে তুলে নিল কলম। বাহির থেকে তাকে দেখালো অত্যন্ত শান্ত, কোথাও কোনো অস্থিরতার চিহ্নটুকু নেই। অথচ ডায়েরীর পাতাজুড়ে কাঁপা কাঁপা অক্ষরে লিখিত হলো,
“অতঃপর আমি বুঝলাম কষ্টের অনুভূতি কেমন হয়।”
_________চলবে_________

