Home "ধারাবাহিক গল্প সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব-১৯+২০

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব-১৯+২০

0
383

#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা১৯

“আর কতদিন এই সম্পর্কটা গোপন রাখতে হবে, জায়দান?”

মীরার মোলায়েম কণ্ঠের প্রশ্নে হাতের বাদাম ভাঁজার উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পাশ ফিরে তাকাল আয়দান। সালোয়ার কামিজ পরিহিতা সুদর্শনা নিজের টানা টানা মায়াবী চোখ দুখানা মেলে চেয়ে আছে তার উদ্দেশ্যে।

কতদিন হয়েছে আয়দান মীরার সঙ্গে প্রেম করা শুরু করেছে? এক – দেড় মাস পেরিয়েছে কি? হিসাব করে উঠতে পারলনা সে। সেদিনের প্রস্তাবের জবাবে মীরার উত্তর হ্যাঁ এসেছিল। এরপর থেকেই সূত্রপাত তাদের প্রেমের সম্পর্কের।

দুজনে আজ এসেছে রমনা পার্কে। একধারের বেঞ্চিতে বসে বাদাম ভাঁজা কিনে খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চলছিল জব্বর গল্প। তার মাঝেই মীরার হঠাৎ এমন প্রশ্ন আয়দানকে ভীষণ বিরক্ত করল। তবে চোখেমুখে সেই অনুভূতি প্রকাশ করতে দিলনা সে। মীরা তার খানিকটা কাছে সরে কাঁধে মাথা রেখে দূর দিগন্তের দিকে তাকাল। দ্বিতীয় দফায় বলল,

“আমার সবচেয়ে ভালো বান্ধবী সাবিন। ওকে আমি আমার পরিবারের সদস্য মনে করি। ওর থেকে লুকিয়ে রাখার বিষয়টা আমাকে ভেতর থেকে কষ্ট দিচ্ছে। তোমাকে নিয়ে আমি খুব খুশি জায়দান। যদি ওর সঙ্গে তোমার পরিচয় না করাতে পারি তাহলে…”

“কিটেন!”

আলতো করে ডাকল আয়দান। পাশ ফিরে বসে দুহাতে ধরল রমণীর মুখ, নিজের দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে অত্যন্ত আবেগঘন চোখে তাকাল। মোলায়েম হেসে জানাল,

“আই জাস্ট নিড সাম মোর টাইম, ওকে? তুমিই তো বললে, ও নাকি তোমার পরিবারের মতন। তাহলে তার মুখোমুখি যাওয়ার আগে আমাদের সম্পর্কটা আরেকটু গভীর হওয়া দরকার, তাইনা?”

“কিন্তু…”

ঝুঁকে এলো আয়দান। মীরার কপালে নিজের ঠোঁটজোড়া ছুঁইয়ে দিয়ে মৃদু আঁচে বলল,

“আর কোনো কিন্তু নয়, কিটেন। আমি একটু স্থির হই তোমার সঙ্গে, তারপর সব হবে। ততদিন পর্যন্ত একটু সহ্য করো? নাকি আমায় বিশ্বাস করো না?”

মীরা মাথা ঝাঁকাল জোরে জোরে।

“কি বলছ তুমি? আমি তোমায় কেন বিশ্বাস করব না? আমি শুধু তোমাকে সাবিনের সাথে পরিচয় করাতে চাইছিলাম কারণ তুমি সত্যিই একজন বিশেষ মানুষ, জায়দান।”

“উই উইল ডু দ্যাট সুন, ভেরি সুন, কিটেন।”

মীরাকে নিজের বুকে টেনে তার কানে ফিসফিস করল আয়দান। বুকে মাথা গুঁজে রাখায় আয়দানের চেহারায় প্রকাশ পাওয়া সুচারু অভিব্যক্তিটুকু চোখে পড়লনা মীরার।

কিছুক্ষণ বাদে মীরাকে রিকশায় তুলে বাড়িতে পাঠিয়ে দিল আয়দান। একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিজের ভদ্র খোলস থেকে মুহূর্তেই বেরিয়ে এলো সে। এতক্ষণ যাবৎ, পার্কের একপাশে গাড়ি থামিয়ে অপেক্ষা করছিল তার বন্ধুদের দল। দামী গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটে চড়ে বসতেই একযোগে শীষ বাজিয়ে উঠল সকলে।

“ভালোই মুরগী ধরেছিস, দেখছি!”

আয়দানের সবথেকে কাছের বন্ধু সামির বলে উঠল। বান্দার হাতে ঝুলছে ইলেকট্রনিক সিগার। ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা পাবলিক মত্ত ভদকার বোতলে। দীর্ঘ এক চুমুক দিয়ে সে শুধালো,

“পাখিকে ক্লাবে আনবিনা? যাহ দোস্ত, একটু শেয়ার না করলে হয়?”

আয়দান প্রাণভরে হাসল। সামিরের হাত থেকে সিগার নিয়ে নিজের ঠোঁটে চেপে কয়েকটি সুখটান দিয়ে উত্তর করল,

“আজকাল দেখছি সবাই খুব অধৈর্য্য হয়ে উঠছে। এত সহজে পাখি ধরে মজা আছে? তাকে তো একটু একটু করে সময় নিয়ে ভক্ষণ করতে হয়।”

আয়দানের কথার বিপরীতে গাড়িজুড়ে আরেক দফায় হাততালি, হাসাহাসি এবং শীষ বাজিয়ে ওঠার রোল পড়ে গেল। সামির পিছনে ঘুরে ঠোঁটে বাঁকা হাসি মেখে বলল,

“যত যাই বলিস, তোকে আমি এর আগে কোনোদিনও এতটা ধৈর্য্য নিয়ে ঠান্ডা মাথায় কিছু করতে দেখিনি।”

আয়দান সিগারে আরো কতক টান দিল। গাড়ি ততক্ষণে চলতে শুরু করেছে। তবে বন্ধু সামিরের বক্তব্যের বিপরীতে সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালনা। ঠান্ডা মাথায়? ঠিকই ধরেছে সামির। সাবিনের ক্ষেত্রে সে ঠান্ডা মাথার খেলোয়াড়।

ওই মেয়েটাকে নিঃস্ব করে দেবে আয়দান, এটাই তার মহৎ পরিকল্পনা। যেই মেয়ে তার মায়ের গায়ে হাত তোলার মতন দুঃসাহস দেখিয়েছে, সেই মেয়েকে তার কাপুরুষ বড় ভাই দয়া করে ছেড়ে দিলেও সে ছাড়বে না, ছাড়তে পারবেনা।

জায়দানের বিয়ের এক বছর আগেই পড়াশোনার খাতিরে বিদেশে চলে গিয়েছিল আয়দান। ডিগ্রী নেয়ার চার বছরে একবারের জন্যও সে দেশে ফেরেনি। এর মাঝেই বড় ভাইয়ের জীবনে বহু চড়াই উৎরাই গিয়েছে। সেসবের বিশেষ পরোয়া তার নেই। তার শুধু মনে আছে দেশ থেকে যাওয়া একটি ফোনকলের, যেটি তার বাবা জাফর করেছিলেন। বলেছিলেন, জেসমিন হঠাৎ করে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তখন কাহিনী না জানলেও পরবর্তীতে নানা মাধ্যমে সে জেনেছিল, তাদের সংসারে আগুন লাগানো ডাইনীটার কাহিনী। সেদিন যদি খারাপ আবহাওয়ার কারণে এয়ারপোর্টের ফ্লাইট বাতিল না হত, তবে তক্ষুণি দেশে এসে একটা হেস্তনেস্ত করত আয়দান।

সাবিনের প্রতি সে চরম ঘৃণা পুষে দিন পার করেছে, কারণ জীবনে সে সবথেকে বেশি যাকে ভালোবাসে, সেই মাকেই আঘাত করেছে ওই মেয়ে! দেশে ফেরার পর স্কুটি – গাড়ি সংঘর্ষের ঘটনাটা স্রেফ আয়দানের বুকে ধিকিধিকি ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিকে জ্বালিয়ে দিয়েছে। মেয়েটার কত্ত বড় সাহস! সে শুধু তাদের সংসার ধ্বংস করেও শান্ত হয়নি, তাকে অপমান অবধি করতে পিছপা হয়নি! জায়দান যদি ভেবে থাকে শুধুমাত্র একটা সরি বলিয়ে সে সবকিছুর সমাধান করে ফেলেছে, তবে তার বড় ভাই বোকার স্বর্গে বাস করছে। অবশ্য, ওটা এমনিতেই জাত বোকা!

এখন, আয়দান নিজের সূক্ষ্ম পরিকল্পনা ধরে এগোচ্ছে। সাবিনকে সে এমনভাবে ভাঙবে, যে পৃথিবীর সবথেকে শক্তিশালী আঠাও তার ভাঙা অংশগুলোকে জুড়তে পারবেনা। সাবিনকে ভাঙার এই খেলায় বাকি সকল গুঁটি হলো তার অঘোষিত যুদ্ধের কোলাট্যারাল ড্যামেজ।

ভাবনায় ডুবে থাকতে থাকতেই কখন যে গন্তব্যে পৌঁছে গেল আয়দান টের পেলনা। বন্ধু বান্ধব সকলে মিলে গাড়ি থেকে বের হতেই সেও বেরিয়ে এলো। আন্ডারগ্রাউন্ড ক্লাব, সিঁড়ির ধাপ নেমে গিয়েছে একেবারে নিচে। সকলে এগোল ভীষণ ফুরফুরে মেজাজে। আয়দান পকেট থেকে নিজের মিনি পারফিউম বের করে কলারে মাখতেই সামির ভ্রু দুলিয়ে শুধালো,

“এত আয়োজন?”

বিস্তৃত হাসল আয়দান,

“গার্লস্ লাইক দ্যা ওয়ে ইউ স্মেল।”

“উম, বাট আই অলরেডি লাইক ইউ!”

একটি আবেশিত মেয়েলী কন্ঠস্বর ভেসে এলো। সিঁড়ির গোঁড়ায় নিচের দিকে দাঁড়িয়ে এক বডিকোণ মিনি ড্রেস পরনে রমণী। উরুর নিচ থেকে সবকিছুই উন্মুক্ত, মোলায়েম ধবধবে ত্বক তাতে স্পষ্টত দৃশ্যমান। আয়দান একেকবার তিনটি করে ধাপ পেরিয়ে নিচে নামল। অতঃপর কোনো বাক্য ব্যয় না করেই রমণীকে একপাশের পাথুরে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরল। খিলখিল করে হেসে উঠল রমণী,

“আরে, আস্তে আস্তে টাইগার। বহুদিন যাবৎ ক্ষুধার্ত আছো মনে হচ্ছে।”

“হ্যাঁ, ক্ষুধার্ত, তোমার জন্য।”

রমণীর গলায় মুখ ডুবিয়ে দিল আয়দান, তাকে পাল্টা আঁকড়ে ধরল সে। সামির দৃশ্যটি লক্ষ্য করতে করতে ধীরপায়ে নিচে নেমে এলো। বন্ধুর পিঠে হাত ঠেকিয়ে কয়েকটি চাপড় দিয়ে বলল,

“চিল, ব্রো। তোর খাবার কেউ কেড়ে নেবে না।”

অতঃপর অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই ক্লাবের ভেতরে চলে গেল সামির। তার দিকে বিশেষ নজর আয়দানের নেই, সে ব্যস্ত রমণীতে। পাথরের দেয়াল থেকে হাত সরিয়ে রমণীর কোমর চেপে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে প্রশ্বাস টানলো আয়দান, অপর হাতে ধীরে ধীরে নিজের বেল্টের বাকল খুলতে আরম্ভ করল। ফিসফিস করে বলল,

“গেট ইন্টু রুম, রাইট নাউ।”

“অধৈর্য্য।”

মাদকীয় আওয়াজে হেসে উঠল রমণী।

☆ ☆ ☆ ☆

॥ ৮৫০ কোটি টাকা ॥

হোয়াটস অ্যাপে জায়দানের শেষ মেসেজটির দিকে গত এক ঘন্টা যাবৎ একনাগাড়ে চেয়ে আছি আমি। মেসেজটি এসেছে বেশ কিছুদিন আগেই। অথচ এই কয়েকদিনে আমি চোখ তুলে প্রাক্তনের নাম্বারের দিকেও তাকানোর সাহস পাইনি।

আমার ড্যাড, তাকদীর হুসেইনের মোট সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা। বিষয়টা আমি ঠিক কেমনভাবে নেব বুঝতে পারছিনা। ভোঁতা একটা অনুভুতি কাজ করছে অভ্যন্তরে। জায়দান শুধু হিসাবই বের করেনি, বরং প্রত্যেকটি অনলাইন ডকুমেন্টস, দলিল দস্তাবেজ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর রিপোর্টসহ আমায় পাঠিয়েছে। সারাটা রাত আমি সেসব ঘেঁটেই দেখেছি। একটা প্রশ্নই আমার মাথায় ঘুরঘুর করছে।

ড্যাড ঠিক কত বড় ঋণ নিয়েছিল যে ৮৫০ কোটি টাকার সম্পত্তি নিমিষে ফুরিয়ে গেল? এটা কি আদও সম্ভব? আমার ড্যাড কি এতই বোকা? নাকি কোথাও গিয়ে আমিই বোকা বনে গিয়েছি?

সেদিন বড় চাচার বাসায় নিজের বাবার রেঞ্জ রোভার আহানের আওতায় দেখেও আমি কিছু বলিনি। কিন্তু তাকবীর চাচা কি ভেবেছিল, আমি এখনো সেই আহাম্মক সাবিন রয়ে গিয়েছি যে বিজনেসের বি বোঝে না?

যদি নিজের স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতাম, তবে এক্ষুণি হাতের ফোনটা আছাড় দিয়ে ভাঙতাম। অথচ আমি আর আগের মতন নেই। ক্রোধে টগবগ করে ফুটতে থাকার মতন সত্যটা আজ আমায় বিশেষ কিছু অনুভব করাতে ব্যর্থ রইল।

হাজার চাওয়া সত্ত্বেও আমি জায়দানকে ভুলতে পারছিনা। সেদিন তার বলা কথাগুলো আমার কানে বাজছে আজ অবধি। আমি কাঁদতে পারছিনা। যে মানুষটাকে আমি অবহেলা করে এসেছি চিরটাক্যাল, সে সত্যিই নিজের মনে আমার প্রতি এক আকাশ সমান অভিমান পুষে রেখেছিল? আদও কি জায়দানের অনুভূতি নেই? যদি নাই থেকে থাকে, তবে সেদিনের চাপা ক্ষোভটুকু কি ছিল?

আমি আজকাল নিজেই নিজেকে চিনতে পারিনা। কে আমি? কি পরিচয় আমার? কি উদ্দেশ্য আমার? কিভাবে আমি এমন একটা মানুষের প্রেমে পড়লাম, যাকে কখনো আমি গুরুত্ব দিয়ে দেখিনি? নাকি দেখেছিলাম? যদি তাকে গুরুত্ব না দিতাম, তবে ওই বাড়িতে কি তার অবহেলার খোঁজ রাখতাম? আমার শ্বাশুড়ির উপর রাগ ছিল, শুধুমাত্র নিজের প্রতি অবিচারের জন্য নয়, বরং জায়দানের জন্য। যখন দেখতাম ওই বাড়িতে আদতে মানুষটার কোনো দামই নেই, তখন কেন যেন সহ্য হতনা আমার। ইটের জবাবে পাটকেল ছুঁড়তে মন চাইতো। তবে কি সেটাই ছিল আজকের এই প্রেমের দাবানলের জন্ম দেয়া ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ? শুধু আমিই টের পেয়েছি দেরীতে? আমি কি নিজের দোষেই জায়দানকে দূরে ঠেলে দিয়েছি? নাকি এসব আমার প্রাপ্য ছিল, অতীত কর্মের জন্য? সবকিছুই কি তবে আমার কর্মফল? ভাগ্যের নির্মম পরিহাস।

এখন আমার কি করা উচিত? কোন পথে চলা উচিত? মাথায় সবকিছু জট পাকিয়ে গিয়েছে ভয়ানকভাবে। আমাকে তো কেউ শিখিয়ে দেয়নি কখনো, জীবনে চলার পথে এসব কিভাবে সামাল দিতে হয়। তবে আমি কোন পদ্ধতি অনুসরণ করব? কি করলে একটু শান্তি মিলবে? নিজেকে জায়দানের কদমে নামিয়ে আনব? তবে কি সে আমায় গ্রহণ করে নেবে? যদি গ্রহণ করেও, আমাদের সম্পর্কের ভবিষ্যত কি হবে? আরো একবার ওই বাড়িতে থিতু হওয়া যে আমার পক্ষে অসম্ভব!

আর জায়দান? তাকে আমি কি কারণে ভালোবাসলাম? কোন কারণে তার প্রেমে পড়লাম? আমি তো শুরু থেকেই জানতাম, আমার প্রতি আগ্রহগুলো শুধুই তার করুণা এবং কর্তব্যবোধ। সবকিছু জানা সত্ত্বেও কিভাবে সেসবকে অনুভূতি ধরে নিলাম? আমি নিশ্চয়ই পাগল হয়ে গিয়েছে। কোনো কারণ ছাড়া কি কাউকে কখনো ভালোবাসা যায়?

“ভাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, খেতে আয়।”

অতি পরিচিত কণ্ঠটি আমাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনলো। সামান্য মাথা তুলে তাকিয়ে দেখলাম মীরা ভাত বাড়ছে। কিছুক্ষণ আগেই দুজন নিজেদের ক্যাফে থেকে ফিরেছি। এসে আমি বিছানায় সিঁধিয়ে গেলেও মীরা রান্নায় ব্যস্ত ছিল। চিংড়ি মাছের ঘ্রাণ আসছে, বোধ হয় বড়া বানিয়েছে। এই মুহূর্তে মেয়েটাকে আলুভর্তা চটকাতে দেখছি।

বিছানায় কম্বল টেনে গায়ে দিয়ে মৃদু আঁচে বললাম,

“আমার ক্ষুধা নেই মীরা, তুই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়।”

“গত কয়েকদিন ধরে তোর নাটক দেখছি আর সহ্য করে যাচ্ছি। আজকে আবার নাটক শুরু করলে সোজা ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাসার বাইরে পাঠিয়ে দেব।”

“ভালোই হবে। রাস্তার কুত্তাদের সাথে রাত কাটাবো।”

“সাবিন!”

কড়া চোখে তাকাল মীরা। আলুরভর্তায় খানিকটা সরিষার তেল ছিটিয়ে নিল। আমি বেশিক্ষণ দেখলাম না। বালিশে মুখ গুঁজলাম। তবে মিনিটখানেক বাদেই টের পেলাম মীরা বিছানায় এসে বসেছে। গুঙিয়ে উঠলাম, সঙ্গে সঙ্গে গা থেকে কম্বল সরে গেল।

“মীরার বাচ্চা!”

খেঁকিয়ে উঠে বসতেই আমার কোলে পানির বোতল ছুঁড়ে থিতু হয়ে বসল মীরা। হাতে প্লেট, তাতে গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, ফুলকপির তরকারি, আলুর ভর্তা এবং চিংড়ি বড়া। ফু দিয়ে ভাত মাখাতে মাখাতে সে বলল,

“নে আ কর। দ্রুত।”

মেয়েটার দিকে আমি দীর্ঘক্ষণ নিষ্পলক চেয়ে রইলাম। জীবনে আমি বহু পাপ করেছি। তার মধ্যে একদিন এক ভিক্ষুককে পাঁচশো টাকার নোট দিয়েছিলাম, ঈদের আগে চাঁদরাতের দিন। মনে আছে কারণ সেই ভিক্ষুক ওইদিন আমার মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করেছিল, যে আমি নাকি জীবনে অনেক সুখী হব। সেই একটিবারই বোধ হয় আমি বদ দোয়ার বদলে কারো দোয়া পেয়েছিলাম। সেই জন্যই হয়ত সবকিছু হারিয়ে ফেলা এই জীবনটায় এসেছে মীরা।

মীরা মুখে গ্রাস তুলে দিতেই এবার বাধ্য শিশুর মতন খেয়ে নিলাম। চিবুতে চিবুতে বললাম,

“তুই অনেক ভালো মা হবি, মীরা।”

আমার কথা শুনে মীরা মৃদু হাসল। চিংড়ি মাছের বড়া ভেঙে গ্রাস মাখিয়ে আমার মুখে তুলে দিয়ে বলল,

“অবশ্যই। তুই যা ট্রেনিং দিচ্ছিস! আমি একেবারে এক্সপার্ট হব।”

মেয়েটার দিকে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে রইলাম আমি। সুন্দর মানুষের নাকি অহংকার বেশি থাকে। ঠিক আমার মতন। যদিও আমি সুন্দর কিনা জানিনা। তবে সাজগোজ করলে নিজেকে খুব একটা খারাপ লাগেনা। তবে মীরা এত সুন্দর হয়েও নিরীহ কেন? নাকি আমার চোখেই প্রাণের বান্ধবীকে জগতের সবথেকে সুন্দর রমণী মনে হয়?

আমি নিষ্পলক চেয়ে আছি লক্ষ্য করে মোলায়েম হাসলো মীরা।

“তোর মাথার ভেতর কোন নতুন আগ্নেয়গিরি জ্বলে উঠছে শুনি?”

এক মলিন হাসি ছুঁয়ে গেল আমার অধরে। খানিকটা পানি পান করলাম। মীরাকে অতি যত্নে গ্রাস মাখাতে দেখতে দেখতে আনমনে বললাম,

“কাউকে কি কখনো কোনো কারণ ছাড়া ভালোবাসা যায়?”

মীরা থামলে পারতো। অথচ সে থামলো না, স্বাভাবিক থাকলো। ঠিক আমি যেমনটা চাইছি। সে জানে, আমি কতটুকু অনুভূতি বিনিময় করতে পারি। আমি নিজে থেকে আগ্রহ করে কিছু না বললে বেশিরভাগ সময় মীরা আমায় খুঁচিয়ে জিজ্ঞেস করেনা। আমায় বুঝে উঠতে সময় দেয়, সাহায্য করে। কারণ সে জানে, সব সামলে ওঠার পর আমি তাকে ঠিকই জানাব। তাই মীরা পাল্টা প্রশ্ন এড়িয়ে আমার প্রশ্নের জবাব দিল।

“এজন্য তোকে ভালোবাসার সংজ্ঞাটা বুঝতে হবে।”

আরেক গ্রাস মুখে নিয়ে চিবুতে চিবুতে শুধালাম,

“মায়া আর ভালোবাসা এক, সেটা?”

“তুই লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইটে বিশ্বাস করিস?”

থমকে গেলাম। প্রশ্নটা অপ্রাসঙ্গিক মনে হল।

“জানিনা। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে হয়ত হয়।”

“কেন হয় বল তো? প্রথম দেখায় তো কারো অন্তর পড়া যায়না।”

“রূপ দেখে? মানুষটা সুন্দর, সেই কারণে?”

“এক্সাটলি!”

ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। আমার অগোছালো জবাব সত্যি হবে ভাবিনি। মীরা সোজা হয়ে বসল। আমার চোখের দিকে চেয়ে বলল,

“ভালোবাসার অনেক নাম আছে। যখন তুই কাউকে তার রূপ দেখে ভালোবাসবি, তখন সেটা আসক্তি। এই আসক্তিই ভালোবাসা নামে পরিচিত হয়।”

ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকলাম। মীরা বলে গেল,

“যখন কাউকে তার দয়ালু স্বভাব দেখে ভালোবাসবি, তখন সেটা মুগ্ধতা। যখন সে তোকে ভালোবাসে তাই তুই তাকে ভালোবাসিস, তখন সেটা সহানুভূতি।”

আমার মুখে শেষ গ্রাস তুলে দিল মীরা। তাকালো চোখের মাঝে, গভীরভাবে। তার কন্ঠস্বর যেন প্রতিধ্বনিত হলো শুধু দেয়ালে নয়, বরং অন্তরজুড়ে।

“কিন্তু যখন তুই মানুষটাকে ভালোলাগার কোন কারণ খুঁজে পাবিনা, তখন সেটি ভালোবাসা।”

মস্তিষ্ক থেকে হৃদপিন্ডে অনুভূতির তরঙ্গ খেলে গেল। অপলক চেয়ে থাকলাম আমি। মীরা বসে নেই, সে প্লেট নিয়ে উঠে গেল। একই প্লেটে এবার নিজের জন্য ভাত বাড়ছে সে। দৃশ্যটির পানে বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়েই রইলাম। বুঝলাম না, কখন একটি প্রার্থনাবাক্য আমার অন্তর থেকে নির্গত হল।

“মীরা যেন সবসময় ভালো থাকে আল্লাহ, আর আমার কাছেই থাকে…..”

_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_চলবে_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_

#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা২০

নিঃশব্দপ্রায় আরেফিন বাড়ি। শুধু কাঁচের প্লেটের উপর কাটলারির টুংটাং আওয়াজ বাজছে। রোজিনা টেবিলে বসা সবাইকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। আজকের দৃশ্যটি ভীষণ দূর্লভ। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যই দুপুরের খাবারের জন্য উপস্থিত। টেবিলের প্রধান চেয়ারে বসে আছেন জাফর। হাত কয়েক দূরে জেসমিন, তার পাশাপাশি আয়দান। শুধুমাত্র জায়দান সবার থেকে আলাদা, নিজের পিতার ঠিক বিপরীত প্রান্তে, টেবিলের একদম অপর কোণায় বসে আছে।

এক হাতে কাঁটাচামচ দিয়ে খাবার মুখে দিতে দিতে অপর হাতে ল্যাপটপে টেস্টের প্রশ্নপত্র রিচেক দিচ্ছে জায়দান। চশমার লেন্সে প্রতিফলিত হচ্ছে ল্যাপটপের স্ক্রীনের আলো। গুরুতর নৈঃশব্দ্য ভাঙলো হঠাৎ, জেসমিনের কন্ঠে।

“রুশমির সঙ্গে কথা হয়েছে আমার। ওরা এই মাসের শেষ সপ্তাহে আংটি পড়াতে চাইছে।”

জেসমিন কারো মতামত জানতে চাননি। যেন স্রেফ জানিয়ে দিয়েছেন সিদ্ধান্ত নিজের। জাফর স্ত্রীর কথা শুনে নির্বিকারই রইলেন। বললেন,

“তুমি যা ভালো মনে করো।”

“এই মাসের শেষে ডি ইউ আর সি ইউতে দুটো সেমিনার আছে। ব্যস্ত থাকব।”

একেবারে নির্লিপ্ত কন্ঠে জানাল জায়দান। মনোযোগ তার ল্যাপটপের পানে, হাতে ঝুলছে কাঁটাচামচ। জেসমিন ঠান্ডা দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকালেন। একটি শীতল ছায়া নেমে এলো যেন টেবিলজুড়ে। নিজের চেয়ারে আয়েশী হেলান দিয়ে কমলার জুসের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে আয়দান বলে উঠল,

“চিল, আম্মু। ভাইয়ার এক্সের ক্যাফেতে যাওয়ার সময় আছে, তবে নিজের হবু বউকে আংটি পড়ানোর জন্য সময় নেই।”

পিনপতন নীরবতা। প্রত্যেকে যেন নিজের জায়গায় জমে গিয়েছে সম্পূর্ণ।

জায়দান বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখালনা। শুধু আস্তে করে হাতের চামচটা অর্ধেক খালি প্লেটের উপর রেখে দিল। জেসমিনকে নীরব ক্রোধে ফুঁসতে দেখে দ্রুত হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নিলেন জাফর। সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,

“তুমি কথা দিয়েছিলে ওই মেয়ের কাছে আর যাবেনা!”

জায়দান প্রথমবারের মতন ল্যাপটপ থেকে দৃষ্টি হটিয়ে পিতার দিকে তাকাল।

“কথা দেইনি।”

“আমাকে মিথ্যাবাদী বলছ? বেয়াদবি করছ?”

“সেই দুঃসাহস আমার নেই।”

“তাহলে ওর কাছে গিয়েছ কেন? বারবার মানা করা সত্ত্বেও?”

“শেষবারের মতন গিয়েছি। আর যাবনা।”

পিতা পুত্রের কথোপকথনের মাঝেই হঠাৎ নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন জেসমিন। চেয়ারের পায়া মেঝেতে ঘর্ষণের ফলে কর্কশ এক শব্দ উৎপন্ন হলো। কেমন যেন অশরীরী শোনালো তা। কেউ টু শব্দ করলনা, নিজেদের চেয়ার থেকে নড়লনা অবধি। জেসমিন ধীরে ধীরে সময় নিয়ে নিজের বড় ছেলের চেয়ারের পাশে এসে থামলেন। গভীর নয়নে দেখলেন। জায়দান হাজার না চাওয়া সত্ত্বেও মুখ তুলে মায়ের দিকে তাকাতে বাধ্য হল এক প্রকার।

হাত বাড়িয়ে আলতো করে জায়দানের চিবুক ছুঁয়ে দিলেন জেসমিন। অতঃপর অদ্ভুতুড়ে মোলায়েম কন্ঠে বললেন,

“তুই কি জানিস, তুই ছোট থাকতে একবার তোকে বিছানা থেকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে মে*রে ফেলতে চেয়েছিলাম?”

নিষ্পলক চেয়ে রইল জায়দান। জননীর দৃষ্টিমাঝে দেখতে পেল এক অশনি সংকেত। নিজের চেয়ারে সতর্ক হয়ে বসলেন জাফর।

“জেসমিন, প্লীজ তুমি চেয়ারে এসে বসো। আমি দেখছি বিষয়টা।”

জেসমিন স্বামীর আহ্বানে কোনো প্রকার সাড়া দিলেন না। বরং স্থির চেয়ে রইলেন জায়দানের নির্বিকার মুখপানে। যেন প্রথমবারের মতন অত্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন নিজের সন্তানকে। দীর্ঘ কতক সেকেন্ডের রুদ্ধশ্বাস নীরবতা। তারপর হঠাৎ বিদ্যুৎ গতিতে জায়দানের প্লেটে রাখা কাঁটাচামচটা তুলে তার ঘাড় বরাবর বসিয়ে দিলেন জেসমিন!

চেয়ার সরার ঘড়ঘড় শব্দ, সঙ্গে রোজিনার ভয়ার্ত চিৎকারের মিশ্রণ।

একচুল নড়লনা জায়দান। অনুভব করল কাঁটাচামচের ধারালো ফলাগুলো তার ত্বকের গভীরে ঢুকে যাচ্ছে। চুঁইয়ে নামছে একফোঁটা তরল। খুব সম্ভবত র*ক্ত।

“মাম্মি!”

সবার প্রথমে জেসমিনের কাছে পৌঁছাল আয়দান। ঝটকা দিয়ে মায়ের হাত থেকে কাঁটাচামচ কেড়ে নিয়ে দূরে কোথাও ছুঁড়ে ফেলল। নিজের কনিষ্ঠ সন্তানের মুখ দেখে বুঝি ঘোর থেকে বেরিয়ে এলেন জেসমিন। সামান্য টলে উঠল তার শরীর। আয়দান নিজের বুকে জড়িয়ে নিল জননীকে।

“সব ঠিক আছে, মাম্মি, এইযে আমি এখানে আছি তোমার সাথে।”

“জেসমিন চলো, ঘরে চলো। বিশ্রাম নেবে আসো।”

জাফর কাছে এলেন দ্রুত, জেসমিনকে ধরে নিয়ে যেতে লাগলেন ডাইন ইন রুম পেরিয়ে নিজেদের বেডরুমের দিকে। আয়দানও দ্রুত অনুসরণ করতে গেল, তবে মাঝপথে থমকে গেল। একটি হাত মুষ্টিবদ্ধ করে উল্টো ঘুরে আবার ফিরে এলো আগের জায়গায়। চেয়ারে তখনো ওই একই ভঙ্গিতে বসে আছে জায়দান।

“ভাইয়া, ঠিক আছো?”

খানিক ইতস্ততা ঝেড়ে শেষমেষ প্রশ্ন করেই ফেলল আয়দান। জায়দান কোনো জবাব দিলনা। নিঃশব্দে টেবিলের মাঝখানে লম্বাটে হাত বাড়িয়ে বেশ কতক টিস্যু তুলে নিজের ঘাড় এবং কাঁধের সংযোগস্থল বরাবর চেপে ধরল। রোজিনা একপাশ থেকে ক্রন্দন মিশ্রিত গলায় বলে উঠলো,

“ভাইজান, ওষুধ দিয়া দেই? বরফ নিয়া আসতেসি আমি, আপনি একটু বসেন…”

এক হাত তুলে রোজিনাকে থামিয়ে দিল জায়দান। মাথা নাড়ল। ল্যাপটপ বন্ধ করে চেয়ার থেকে উঠে পড়ল। দন্ডায়মান আয়দানের মুখপানে তাকাল।

“আম্মুর কাছে যাও। তোমাকে দেখলে আম্মু শান্তি পায়।”

আয়দান কয়েক সেকেন্ড দ্বিধায় ভুগল যেন। অতঃপর উল্টো ঘুরে হনহন করে এগিয়ে আড়াল হয়ে গেল নিচতলার অন্দরমহলে। জায়দান সিঁড়ি বেয়ে উঠে নিঃশব্দে নিজের ঘরের দিকে এগোলো।

জায়দানের রুম সর্বদাই পরিপাটি। কোথাও কোনো অগোছালো জিনিস নেই। একটা নিয়মমাফিক রুটিনে চলে তার জীবন। প্রত্যেকটি দিন প্রায় একই নিয়ম অনুসরণ করে। রুম গোছানোর কাজগুলোও কাজের লোক নয় বরং সে নিজেই করে অভ্যস্থ। সিল্কের কভার বিছানো বিছানায় আস্তে করে বসল জায়দান। লম্বা পা দুখানা থেকে স্লিপার খুলে সোজা করে রাখল স্ট্যান্ডের পাশে। এক হাত তখনো ঘাড়ে চেপে রেখেছে সে। যখন সেটি নামিয়ে আনল, তখন টিস্যুতে জমা ছোপ ছোপ র*ক্তবিন্দু জ্বলজ্বল করে উঠল বেডরুমের মৃদু হলদেটে আভায়।

***
সাল ২০০৩।
বান্দরবান, চট্টগ্রাম।

পাহাড়টি অন্যান্য পাহাড়ের তুলনায় অনেক খাড়া। তাতে উত্তেজনা বাড়ছে ক্রমশ। পাথরের উপর পা তুলে অত্যন্ত সাবধানী ভঙ্গিতে উপরে উঠছে শিশু জায়দান। সে একা নয়, সঙ্গী ছোট ভাই আয়দান। ভাইয়ের ছোট্ট শরীরটা তাকে অনুসরণ করে তরতর করে পাহাড়ে উঠে যাচ্ছে লক্ষ্য করে খানিকটা গর্বিত বোধ করল জায়দান, ভাইকে ভালোই ট্রেনিং দেয়া গিয়েছে তাহলে।

ডিস্কভারি চ্যানেলে সারভাইভর নামে একটা রিয়ালিটি গেম শো দেখানো হয়, বেশ ভালো বোধে এসেছে সেটা দেখে। এমন অ্যাডভেঞ্চারের মজাই আলাদা। আর যদি সেটা হয় পরিবারের থেকে লুকিয়ে, তাহলে তো কথাই নেই!

বান্দরবানে ছুটিতে ঘুরতে আসার পর থেকেই জায়দান বায়না জুড়েছিল, পাহাড়ে উঠবে। অথচ ব্যস্ত বাবা ছুটির সময়েও নিজের বিদেশী ক্লায়েন্টদের সঙ্গে মজে আছেন। মা, জেসমিন অবশ্য কিছুটা সহনশীল। তবে পাহাড় পর্বতের ঘোর বিরোধী। ছেলেরা যদি পা ফস্কে পরে যায়, তখন? তাইতো যখন বাবা মা দুজন আজ হোটেলে নিজেদের মতন একটু সময় কাটাচ্ছে, তখন জায়দান ভুল করেনি সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে। আয়দানকে নিয়ে আসার পরিকল্পনা অবশ্য ছিলোনা। নেহায়েত বের হওয়ার সময় দেখে ফেলেছে বান্দা।

পাহাড়ের প্রায় উপরে পৌঁছে গেল দুজন। জায়দান সর্বপ্রথম চূড়ায় পা রাখল। আশেপাশে ভালোমত লক্ষ্য করে খানিকটা চড়া গলায় বলল,

“গতকাল বৃষ্টি হয়েছে। মাটি ভিজে কেমন পিচ্ছিল হয়ে আছে। সাবধানে আয়, আয়দান। একদম আমার হাত ছাড়বি না!”

ছোট্ট আয়দান চূড়ায় পা রেখেই বড় ভাইয়ের হাত চেপে লাফিয়ে উঠল।

“ওয়াও! ভাইয়া, দেখো! কত্ত সুন্দর রংধনু!”

আয়দানের নির্দেশিত দিকে তাকাতেই উঁচু পাহাড়ের ওপাশে স্বর্গীয় নৈসর্গের মাঝে আকাশে সাতরঙা রংধনু দেখতে পেল জায়দান। মুগ্ধতায় ছেয়ে গেল তার সমস্ত চেহারা। দুই ভাই উজ্জ্বল দৃষ্টিতে দেখল সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট অসীম সৌন্দর্যকে।

“মাম্মিকে বলব আমি যে আমরা দুজন পাহাড়ে উঠে রংধনু দেখেছি।”

খুশিতে হাততালি দিতে দিতে লাফাতে লাগল আয়দান। জায়দান নির্লিপ্ত চেয়ে বলল,

“একদম না। এরপর আম্মু আমাদের দুজনকেই দুটো কানমলা দিয়ে বাড়িতে মাসখানেক গ্রাউন্ডেড করে রাখবে।”

“গ্রাউন্ডেড মানে কি, ভাইয়া?”

জায়দান থ্রী কোয়ার্টার প্যান্টের ভেতর থেকে রাবার গ্লাভস এবং একটি পলিব্যাগ বের করে নিতে নিতে জানাল,

“গ্রাউন্ডেড মানে হল খেলাধুলা, ঘুরে বেড়ানো থেকে নিষিদ্ধ করে রাখা। তুই রুমে বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারবিনা।”

“ভালো হবে তো! বসে বসে সারাদিন কার্টুন দেখব!”

“গ্রাউন্ডেড হলে তোকে রুমে টিভি রাখতে দেবে নাকি আম্মু?”

মাথা দুলিয়ে খাদের একপাশে এগিয়ে গেল জায়দান। অত্যন্ত সাবধানে। যেটা খুঁজছিল, পেয়ে গিয়েছে। ছোট্ট ছোট্ট লালচে বর্ণের মাশরুমগুলো। বিষাক্ত। ঢাকায় ফিরলে চলমান এক্সপেরিমেন্টে কাজে লাগবে। উবু হয়ে বসে ঝোঁপের ভেতর থেকে অতি সাবধানে একটি চিমটা দিয়ে মাশরুমগুলো তুলে পলিব্যাগে ভরতে শুরু করল জায়দান। কাজের সময় তার সমস্ত মনোযোগ শুধুমাত্র কাজের উপরেই থাকে বিধায় আশেপাশে নজর পড়লনা। আয়দান ঠিক তার পিছনেই এসে দাঁড়িয়েছে। কৌতূহলী ডাগর ডাগর আঁখি মেলে দেখছে ভাইয়ের কাজকর্ম।

“মাশরুম! মাশরুম খাব ভাইয়া!”

খানিক হতচকিত হয়ে গেল জায়দান।

“এই, একদম না! এসব বিষাক্ত। আর তুই এখানে কেন? তোকে না বললাম ওদিকটায় দাঁড়াতে? যা, গিয়ে রংধনু দেখ। খাদের কাছে এসেছিস কেন?”

“তুমিও তো এসেছ।”

“আমি বড়।”

“আমিও একদিন বড় হব, হুম!”

ছোট পা ফেলে জায়দানকে টপকে অপর দিকে গেল আয়দান। চোখে মুখে হঠাৎ করেই উপচে পড়ল উত্তেজনা।

“ভাইয়া, ওই দেখো! মাছরাঙা পাখি!”

“আয়দান দাঁড়া।”

জায়দান হাত বাড়াল ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে আয়দান নাগালের বাইরে চলে গিয়েছে।

“ওই মাছরাঙা…মাছরাঙা…ঠোঁটে একটা মাছ.. আহহহহহ!”

একটি তীক্ষ্ণ চিৎকার কানে গেল জায়দানের। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে সে প্রতিক্রিয়া করার অবধি সময় পেলনা। আয়দানের পা দুখানা পাহাড়ের ঘাস সরে কাদার উপর পিছলে গেল, তারপরই ভারসাম্য হারিয়ে ফেললো সে।

“আয়দান!”

একটা আর্তচিৎকার করতে পারল শুধু জায়দান। ক্ষীপ্র গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল সামনে। গ্লাভস পড়া হাতের মাঝে শুধু আয়দানের পরনের ফতুয়ার খানিকটা অংশ ছিঁড়ে এলো। ছোট্ট শরীরটা যেন বায়ুর ঝাঁপটায় ওড়া ঘুড়ির মতন ছিটকে পড়ল একেবারে খাদের মাঝে। কানে শুধু ভয়ানক এক চিৎকার গুঞ্জরিত হতে শুনল জায়দান, কয়েক সেকেন্ড পরেই ‘থপ’ করে একটি থেতলে যাওয়ার মতন শব্দ। বাকরুদ্ধ, বরফ জায়দান শুধু তাকিয়ে রইল নিজের হাতে ছিঁড়ে আসা ভাইয়ের ফতুয়ার অংশের দিকে।

***
বর্তমান।

সেদিন আয়দানের শরীর থেকে যতটুকু র*ক্ত ঝরেছিল তার সামনে এই টিস্যুতে লেপ্টে থাকা কয়েক বিন্দু র*ক্ত পৃথিবীর সুমুখে ধূলিকণা ব্যতীত কিছু নয়।

হাতের তালু ভাঁজ করে টিস্যু সম্পূর্ণ মুচড়ে ফেলল জায়দান। মোচড়ের জোরে তার লম্বাটে আঙুলগুলো ফ্যাকাশে হয়ে উঠল। তবুও বিশেষ অনুভূতি প্রকাশ পেলনা পাথুরে চেহারায়। শুধু স্মৃতিরা তাড়া করে বেড়ালো। কানে বাজতে লাগল নিজের শিশুকালের অধীর আবেদন, ক্রন্দনরত শিশু জায়দানের কন্ঠ,

—আম্মু! আমার সঙ্গে একটু কথা বলো না, আম্মু!

—আম্মু, আয়দান কেমন আছে? আব্বু, দেখো না, আম্মু আমার সাথে কথা বলছে না!

—আমি কি খু*নী, আম্মু? তোমার ছোট ছেলের খু*নী?

হঠাৎ করে নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠল জায়দানের। টিস্যুটা ডাস্টবিনে ফেলে দ্রুত উঠল। বুকের ভেতর ব্যথা করছে। এক হাতে চেপে ধরে অপর হাতে কাঁপা স্পর্শে টেনে খুলল ড্রয়ার। মেডিসিনের ছোট্ট কৌটোটা বের করে একটা ক্যাপসুল তালুতে নিল। হাঁটতে গেলে টলে উঠল শরীর, ক্লোজেটের দরজা ধরে নিজেকে সামলালো। কোনোমতে হাত বাড়িয়ে নাইটস্ট্যান্ড থেকে পানির বোতল তুলে নিয়ে ক্যাপসুল এবং পানি একসাথে মুখে দিল।

সম্পূর্ণ বোতলটা গলাধঃকরণ শেষে বোতলটা অবহেলায় মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে বিছানায় আছড়ে পড়ল জায়দান। বাদামী চোখজোড়া বুঁজে এলো তার। কখন যেন আনমনে প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করল। দূর্বল চোখে চেয়ে লক খুলে ঢুকল হোয়াটসঅ্যাপে। পিন করা নাম্বারটায় তাকাল,

॥ কুইন কোবরা ॥

প্রোফাইলে সাবিনের হাস্যোজ্জ্বল চেহারার ছবি। ক্যাফের উদ্বোধনের দিনে তোলা। কালো স্যুট পরিধানে, একদম লেডিবস লাগছে। দীর্ঘক্ষণ চেয়ে রইল জায়দান। কাঁপতে থাকা বৃদ্ধাঙ্গুল ছুঁয়ে গেল অপশনটি,

সেন্ট মেসেজ।

অথচ জায়দান আর পারলনা। চোখ ভারী হয়ে এলো তার। নয়নপল্লবজোড়া বুঁজে এলো মুহূর্তেই। মোবাইলটা হাত গলে বুকের উপর পড়ল। সরানোর চেষ্টা করল না জায়দান, থাক রমণী, তার বুকে।

✧ ✧ ⁠✧ ✧

আজ ভীষণ তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে বাসায় ফিরলাম আমি। ক্যাফের হুলুস্থুল ব্যস্ততায় ঠিকমতো বসার সময় পাওয়া দায়। ইনফ্লুয়েনসারদের ভীড়ে সমস্ত ক্যাফে রমরম করে। এত ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, ইন্টার্ভিউ দিতে দিতে আমি যারপরনাই বিরক্ত। ব্যবসা করতে নেমেছি। সেখানে ঘণ্টায় ঘণ্টায় মুখের উপর ক্যামেরা আর গলায় মাইক্রোফোন বেঁধে দেয়ার মানে কি?

আমার মেজাজের দফারফা দেখে মীরা অবধি চুপসে গিয়েছে। বিশেষ কোনো কথা বলছে না। এই ভয়ানক শীতের মাঝে রাত্রিবেলা আধ ঘণ্টা যাবৎ শীতল পানি শরীরে ঢেলে বাথরুম থেকে বেরোলাম। ভেজা চুলগুলো মুছতে মুছতে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসতেই মীরা বলল,

“খাবার গরম করে রেখেছি। ক্ষুধা লাগলে খেয়ে নে। আমি গোসলে যাচ্ছি। শ্যাম্পু করব তাই দেরী হবে।”

মীরা পোশাক আর তোয়ালে নিয়ে বাথরুমে চলে গেল। আমি অতি ক্রোধে মেঝেতে নিজের তোয়ালে ছুঁড়ে থম মেরে বসে রইলাম। শুধুমাত্র ক্যাফের চিন্তাই নয়, মাথায় ঘুরছে অন্য চিন্তা।

আজ এক ফাঁকে ব্যাংকে গিয়েছিলাম। যে ব্যাংক থেকে ড্যাড ঋণ নিয়েছিল, সেখানে খানিকটা খোঁজ খবর নিয়ে এলাম। অথচ খবরের খও পেলাম না। ম্যানেজারের কাছে নথিপত্র দেখতে চাইতেই কেমন টালবাহানা শুরু করল! হম্বিতম্বি করায় শেষমেষ সিকিউরিটি বেরই করে দিল! বুঝেছি। এখন আমি ক্ষমতাহীন। আর ক্ষমতাহীন সাধারণ মানুষদের তো ব্যাংক চোখ তুলেও দেখেনা। আমাকে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে হবে।

বসে বসে কতক্ষন নিজের মাথায় স্তরে স্তরে বাস্তব অবাস্তব সব পরিকল্পনা সাজাচ্ছি জানিনা। হঠাৎ মৃদু রিংটোনের আওয়াজে সমস্ত মনোযোগ ভাঙল আমার। ক্রোধে ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাতেই দেখলাম সকেটে চার্জে দেয়া মীরার ফোন বাজছে।

“মীরা, তোর ফোন!”

ডাকলেও বাথরুম থেকে শুধু পানির আওয়াজ ভেসে এলো। শুনতে পায়নি হয়ত। ভেবে উঠে গেলাম। পায়ে পায়ে এগিয়ে ফোনের দিকে হাত বাড়ালাম। এই রিংটোন আমার মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। যেই না কল কাটার লাল বোতাম ছুঁয়ে দেব, তখনি আমার সমস্ত অস্তিত্ব জমে গেল কলার আইডি লক্ষ্য করে।

জায়দান।

চোখ পিটপিট করলাম। বিশ্বাস করতে পারলাম না কয়েক সেকেন্ড।

জায়দান নামটার পাশে জ্বলজ্বল করছে একটি লাল টকটকে লাভ ইমোজি!

ফোনে চেপে বসল আমার হাত। আছাড় দেয়ার দুই সেকেন্ড দূরে দাঁড়িয়ে নিজের অন্তরকে বোঝালাম, জায়দান নামে কি বাংলাদেশে একজন মানুষই আছে নাকি? শান্ত হ সাবিন, মীরার ভার্সিটির কোনো বন্ধু হতে পারে। ফোনটা রেখে দে, চুপচাপ নিজের কাজে যা।

অথচ নিজের অন্তরের আতঙ্কের কাছে হার মানতে বাধ্য হলাম। ফোনটা কেটে যাওয়ার আগেই রিসিভ বোতাম ছুঁয়ে দিলাম। নিঃশ্বাস রুখে ফোন কানে চাপলাম।

ওপাশ থেকে গভীর নিঃশ্বাসের শব্দ। তারপরই পুরুষালী একটি কন্ঠস্বর ভেসে এলো, ঘুম জড়ানো, ভারিক্কি, ভাঙা, এবং যেন অতি পরিচিত!

“কিটেন….”

“সাবিন!”

রীতিমত লাফিয়ে উঠলাম আমি। মীরার ফোনটা একটুর জন্য হাত ফস্কে পড়লনা। ক্যাঁচ ধরে ফেললাম। ফোনটা চাপ লেগে কেটে গেলো। সটান ঘুরে দাঁড়ালাম। মীরা দাঁড়িয়ে আছে সামনে। শুধু পোশাক বদলেছে।

“গোসল করলিনা?”

হাহাকার করে উঠলাম রীতিমত। মীরা বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“যে ঠান্ডা পানি! শ্যাম্পু কালকে দুপুরে করব, আজ আর সম্ভব না।”

আমার বুকে চেপে রাখা ফোনটা লক্ষ্য করে মুহূর্তের মাঝে মীরার চেহারায় একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। খপাৎ করে ফোনটা রীতিমত কেড়ে নিল সে। দ্রুত বাহানা দিলাম,

“জায়দান নামে কে যেন ফোন করেছিল!”

নিজের গালে নিজেরই চটাশ করে দুটো চড় বসাতে ইচ্ছা করল আমার। মীরা একটি শক্ত ঢোক গিলল। অতঃপর দ্রুত জবাব দিল,

“আমার ভার্সিটির সিনিয়র। নোটস চেয়েছিলাম, সেজন্য ফোন দিয়েছে বোধ হয়। বারান্দা থেকে কথা বলে আসছি আমি, এক্ষুণি।”

কৃত্রিম এক হাসি দিয়ে মীরা দ্রুত আমার সামনে থেকে আড়াল হয়ে গেল। বারান্দার দরজা আটকে ওপাশে চলে গেল। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে পায়ে পায়ে এগোলাম, এপাশ থেকে দরজা টেনে দেখলাম, মীরা অপর প্রান্ত থেকে দরজা লক করে দিয়েছে।

বিছানায় এসে বসে পড়লাম। ভার্সিটির সিনিয়র। অথচ পরিচিত কন্ঠস্বর? ঘুম থেকে জাগলে কর্কশ পুরুষালী এই স্বর আমি আগেও বহু শুনেছি। নাম এক হতে পারে, তাই বলে কন্ঠস্বর অবধি? নাকি আমার অবচেতন মন আতঙ্কে এমন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছে? হয়ত কন্ঠস্বর আদতে চেনা নয়, কিন্তু আমি ধরে নিয়েছি চেনা যেন ব্যাপারটা সমাধান সহজ হয়?

মিনিট পনেরো বাদে বারান্দা থেকে বেরিয়ে এলো মীরা। ফোনটা চার্জে দিল। স্পষ্ট খেয়াল করলাম, সে এবার ফোনটা সুইচড অফ করে নিয়েছে। কোনো মন্তব্য করলাম না।

“ভাত বাড়ছি আমি। করলা ভাজি তো তোর পছন্দ না, একটা ডিম ভাজি করে দেই?”

রান্নাঘরে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করল মীরা। নিষ্পলক চেয়ে দেখলাম আমি। অতঃপর গভীর গলায় শুধালাম,

“আমার থেকে কিছু লুকাচ্ছিস, মীরা?”

জমে গেল মীরা। তার শারীরিক কম্পন স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হলো আমার।

“ন…না তো সাবিন! তোর থেকে আমি কোনোদিন কিছু লুকিয়েছি নাকি? তবে আজ কেন করব? ওই ফোনকলের কথা বলছিস? সিনিয়রের কথাটা তোকে আগে বলা হয়নি, এইতো মাত্র সেদিন পরিচয় হলো। ভেবেছিলাম বলব, কিন্তু ক্যাফের কাজের ব্যস্ততায় বেমালুম ভুলে গিয়েছি, হাহা।”

“ডিম ভাজি আমি করে নিচ্ছি, তুই খেতে বস।”

অতি শান্ত গলায় উচ্চারণ করলাম আমি। মীরাকে পাশ কাটিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে গেলাম।

_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_চলবে_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_