সম্পর্কের বন্ধন পর্ব-০৪

0
5848

গল্প–#সম্পর্কের_বন্ধন
লেখিকা– #সোনালী_আহমেদ

৪.
নুহার কথা শুনে রিপা তব্দা খেয়ে যায়। মাথায় যেনো বাজ ভেঙ্গে পড়েছে। মুখ বিশাল বড় হা করে তাকিয়ে রইলো তাদের দিকে। সবটুকু হজম করা তার জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। ধাক্কাগুলোর বেগের গতি খুবই ভারী পড়লো তার উপর। নিজেকে কেমন আউলা-ঝাউলা লাগছে। পলকহীন চোখে কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ রইলো। খুবই শান্তস্বরে সে বললো,

‘ বিয়ের সময় কাগজপত্রের নামগুলো আমি পড়েছি। এবং বর কে ছিলো সেটাও দেখেছি। ‘

নুহা অকপটে জবাব দেয়,

‘ ওসব কিছুই সাজানো ছিলো। সবাইকে দেখানোর জন্য। ‘

রিপা একদৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে রইলো। নুহা এবার গলার সুর খানিকটা মিইয়ে বললো,

—‘ দেখো, যা হয়েছে হয়ে গিয়েছে। তুমি সব মেনে নাও। ধরে নাও এসব তোমার কপালে ছিলো। তাছাড়া তোমার বাবাও খুব অসুস্থ, তুমি নিশ্চই জানো তোমার সাথে এমন কিছু ঘটেছে জানলে উনার কি হতে পারে?’

রিপা জড়বস্তুর ন্যায় ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। রিপার দৃষ্টিপাত দেখে, নুহা কন্ঠে আরো খানিকটা মধু মাখালো। রিপার বাহুতে আদরের সুরে হাত বুলিয়ে বললো,

‘ আমার তোমার জন্য খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু কি করবো বলো? আমিও নিরুপায় । ইমন ভাই তোমাকেই পছন্দ করেছিলেন। তোমাকেই বার্বিডল মানেন। তাছাড়া উনি তো সুস্থ হয়ে যাবেন। উনার ট্রিটমেন্ট চলছে। আর উনি সুস্থ হয়ে গেলো উনার চাকরী আবারো ফিরত পাবেন, তাহলে তো তোমার লাইফ পুরো স্যাটেল। এর জন্য শুধুই তোমার খানিকটা ধৈর্য্য দরকার। তুমি বুদ্ধিমতি, আমার থেকেও তোমার বেশি জ্ঞান। তাই সিদ্ধান্ত তোমার হাতে ছেড়ে দিলাম।’

রিপা এবারো কোনো পরিবর্তন দেখালো না, সে শুধু তাকিয়ে রয়েছে। নির্মলা বেগম খাবারের প্লেট নিয়ে এসে রিপার মুখের সামনে ধরে বললেন,

‘ ছেলেটা আমার প্রাণ রে মা। তার অসুস্থতা আমাকে স্বার্থপর বানিয়ে দিয়েছিলো তাই তোমার দিক টা দেখতে পাই নি। স্বার্থপর মা হয়ে গিয়েছিলাম। তোমার কাছে অনুরোধ, আমাকে ক্ষমা করে সব মেনে নাও। বিনিময়ে যা চাও তাই দিবো।’

রিপা খাবার টুকু মুখে নিলো। কোনোরকম নাড়াচাড়া না করে ধীরে ধীরে গিলে ফেললো। নির্মলা বেগম তাকে খাবার খাওয়াতে লাগলেন। ধীরে ধীরে তার অনুরোধ বাড়ছিলো বৈ কমছিলো না। রিপা চুপচাপ সব হজম করছে। রিপার নিরবতায় দুজনে পলকেই বদলে তার সামনে অনুরোধের হাত পেতে রইলেন। সে যা চাইবে তারা তা ই করবে এ কথাও বললেন। রিপা তাকিয়ে দেখলো, ইমন খেলতে খেলতে ওখানেই ঘুমিয়ে পড়েছে। সে এখন গোলক ধাঁধাঁয় আটকে আছে। নুহা আলমারি থেকে ভালো এক সেট সুতি জামা নিয়ে এসে তাকে ফ্রেশ হয়ে নিতে বললো। রিপা কোনোরকম রিয়েক্ট না করে ফ্রেশ হয়ে নিলো। সে বের হয়ে দেখলো দুজনেই বসে আঙ্গুল কচলাচ্ছেন। তারা টেনশনে রয়েছে তা বুঝতে বেগ পেতে হলো না রিপার। বেশ কিছুক্ষণ মৌনতা পালন করলো সে। ঘড়ির দিকে এক পলক তাকিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে তাদের উদ্দেশ্য বললো,

‘ আমি কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে চাই।’

নির্মলা বেগম এবং নুহা সম্মতি জানিয়ে উঠে পড়লো। দুজনের ভেতর কিছুটা হালকা হয়েছে। তারপর যে যার রুমে চলে গেলো ঘুমুতে। নুহা যাওয়ার পূর্বে শ্যামলের রুমে একবার উঁকি দিয়ে গেলো। ঘন্টাখানেক পেরোতেই ঘুম ভেঙ্গে যায় শ্যামলের। হকচকিয়ে উঠে দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো সাড়ে বারোটা। মাথায় হাত দিয়ে কিছুক্ষণ ঝিমুতেই মনে পড়ে গেলো রিপার কথা। তাকে তো সে খাবার না দিয়ে আটকে রেখেছে। দ্রুত নাকেমুখে উঠে রান্নাঘর থেকে একটা শুকনো রুটি নিলো, সাথে একটা ডিম ভেজে নিলো। প্লেট নিয়ে হড়বড়িয়ে দরজা খুলে প্রবেশ করলো সে। সাথে সাথে ঘুম ভেঙ্গে যায় রিপার। রিপার ঘুম খুবই পাতলা। হালকা আওয়াজ শুনলেও তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। রিপা চোখ বন্ধ করে দেখতে চাইলো শ্যামল কি কি করে? হাতেনাতে শ্যামলের কু-উদ্দেশ্য ধরার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়েছে রিপা। শ্যামল এসেই তাকে ডাকতে লাগলো। তবে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে। রিপা নড়লো না। মনে মনে ভেবে নিলো,তাকে ঘুমে বিভর দেখে কি করে সেটা দেখবে। কিন্তু শ্যামল আশানুরূপ কিছুই করলো না। তাকে ডেকে কোনো সাড়া না পেয়ে, চলে গেলো। রিপা চোখ খুলে অবাক হয়ে তাকালো। কয়েক সেকেন্ড বাদে আবারো তাকে ফিরে আসতে দেখে চোখদুটো পুনঃপুন বুজে নিলো সে। শ্যামল পানির গ্লাস নিয়ে এসেছে। বাম হাতে গ্লাস নিয়ে, ডান হাতের আঙ্গুলে পানি নিয়ে তার মুখের উপর ছিঁটা দিলো। রিপার মুখমন্ডল তার অজান্তেই কুচকে ফেললো। ঘুমের ভান বেশিক্ষণ করতে পারলো না। চোখ মুখ কুচকাতে দেখে শ্যামল আবারো পানি ছিঁটালো। রিপা এবার চোখ মেলে স্বাভাবিকভাবে তাকালো। তাকানো দেখে শ্যামল খাবার প্লেট এগিয়ে বললো,

‘ খেয়ে নাও। প্রথমবার বলে মাফ করে দিয়েছি। এরপর হলে আর কখনো মাফ হবে না।’

রিপা চুপচাপ তাকিয়ে রইলো। শ্যামল তাকে নেওয়ার জন্য আরেকবার বললো কিন্তু কোনোরুপ সাড়া পেলো না। তৃতীয়বার বেশ ঝাঁঝালো গলায় বলতেই সে প্লেট হাতে নিলো। ডিমের কুসুম কাঁচা দেখে বললো,

‘আমি কুসুম কাঁচা খাই না।’

শ্যামল চোখ বন্ধ করে কপালে ভাজ ফেললো। কন্ঠে দ্বিধাবোধ ফুটিয়ে বললো,

‘ আমি কুসুম কাঁচা খাই সেজন্য ভুলে ভুলে আপনার জন্যও নিয়ে এসেছি।’

‘আপনি’ সম্বোধন শুনে রিপা খানিক সময় স্তব্ধ রইলো। শ্যামল তাকে, ‘তুমি এবং তুই’ সম্বোধন করেছিলো। এখন স্বাভাবিক অবস্থায় আপনি বলেছে। অর্থাৎ নুহার বলা কথাগুলো সত্য। সে শ্যামলের ভাবী, নুহা তার ভাবী নয়। খাবার দিয়ে যাবার সময় শ্যামল তাকে বললো,

‘মেয়ে মানুষ, দরজা লাগিয়ে ঘুমাবেন। ‘

রিপা হুট করে কেঁদে ফেললো। হু হু করে কান্নার আওয়াজ শুনে শ্যামল দাড়িয়ে পড়লো। রিপার চোখের পানি স্রোতের মতো গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, একবারও থামছে না। কাঁদতে কাঁদতে সে বলে উঠলো,

‘ দরজা লাগিয়ে কি হবে? আমার সাথে যা হবার তা হয়েই গিয়েছে। ‘

কথাটা শেষ করে খানিকটা দম নিলো। কঠিন গলায় বললো,

‘ আমার জীবন কেনো এমন করলেন? আমার কি দোষ ছিলো? আমি ই কেনো? জানতে চাই আমি,কোন দোষে আমার সাথে এমন প্রতারণা করেছেন?’

শ্যামল নিশ্চুপ রইলো। রিপা তেজী কন্ঠে প্রশ্ন করলো,

‘জবাব দেন। কেনো প্রতারণা করেছেন? কেনো একটা প্রতিবন্ধীর সাথে আমাকে বিয়ে দিয়েছেন? ‘ খানিকটা দম নিয়ে নাক টেনে টেনে আবারো বললো, ‘ আমার বিয়ে তো আপনার ভাইয়ের সাথে ঠিক হয় নি,হয়েছিলো আপনার সাথে। নিজের বউকে ভাবী পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় একটুও লজ্জা করে নি? বিবাহিত হয়ে অবিবাহিত পরিচয় দিয়ে অন্য ছেলের সাথে আমাকে ঠকিয়ে বিয়ে দিতে লজ্জা লাগে নি? আমাকে অচেতন করে রেপ করে ভিডিও করতে হাত কাঁপে নি। আমার সাথে কি আপনার কোনো শত্রুতা ছিলো যে আপনি এমন করেছেন? আরে আমি তো আপনাকে চিনি ই না,তাহলে কেনো এমন করেছেন?বলুন, চুপ থাকবেন না।’

কথা বলতে বলতে নিচে হাটুগেড়ে বসে পড়লো সে। শ্যামল চোখেমুখে বিষ্ময় ফুটিয়ে বললো,

‘ এসব কে বলেছে?’

রিপা শক্ত গলায় বললো,

‘সব জেনে গেছি আমি। উনারা আমাকে সব বলে দিয়েছেন। ‘

শ্যামল নিরুত্তর রইলো। রিপা নিজেকে শক্ত করে উঠে পড়লো, বিছানার পাশ থেকে ছুরি বের করে শ্যামলের সামনে নিয়ে আসলো। এই ছুরিটা রুমেই পেয়েছিলো সে,তখনই লুকিয়ে রেখেছে। সাথে মাথায় ফন্দিও এটেছে।

‘আপনারা সবাই যে জাল বুনেছেন তার জন্য সমবেদনা। আমি কখনোই এসব মেনে নিবো না। তার থেকে বরং মৃত্যুকে গ্রহণ করে নিবো। মনে রাখবেন মরলে একা মরবো না, আপনার পুরো পরিবার কে সম্পূর্ণ ফাঁসিয়ে সারাজীবন জেলের ভাত খাওয়ানোর পূর্ণ ব্যবস্থা করে যাবো। আমার মতো দ্বিতীয় কারো সাথে কিছু করার ছিঁটেফোটাও সুযোগ রাখবো না। এমনিতেই আমার যে শরীর পর-পুরুষ ছুয়েছে সে শরীর আমি রাখবো না। শেষ করে দিবো সব সাথে আপনাদের।’

‘ পাগলামি করবেন না। ছুরি টা ফেলে দেন। আমার কথা শুনুন। আমি সব বলছি, আপনি এমন কিছু করবেন না। ‘

‘ এ শরীরে এখন শুধু রক্ত,পানি আছে, কোনো প্রাণ নেই। আমি তো মরেই গিয়েছি তখনই যখন জানলাম পর-পুরুষ ছুঁয়েছে। ‘

শ্যামল রিপা কে বুঝাচ্ছে উল্টাপাল্টা কিছু না করতে। সে যা চাইবে তাই করবে ও। কিন্তু রিপা শুনতে চাইছে না। কথা বলতে বলতে রিপার একদম কাছে এসে খপ করে ওর হাত থেকে ছুরি টা নিয়ে নিলো সে। অন্য হাত ওর গালের সামনে এনে থামিয়ে নিলো। হত নামিয়ে ফেলে
চোখ বন্ধ করে দাঁত চেঁপে বললো,

‘ প্রথমত আমি কোনো পর-পুরুষ নই তোমার স্বামী। দ্বিতীয়ত,তোমাকে কিছুই করি নি। এমনকি একবারও স্পর্শ করি নি। তোমাকে ওমন এলেমেলো নুহা করেছিলো শুধু মাত্র ভয় দেখাতে। দমিয়ে রাখার জন্যই ওই মিথ্যা বলা হয়েছিলো। কোনো কিছুই হয় নি তোমার সাথে। বুঝেছো তুমি?’

চলবে!
®সোনালী আহমেদ