সূর্য ডোবার আগে পর্ব-৩৪

0
1134

#সূর্য_ডোবার_আগে
পর্ব-৩৪
লেখিকা ~ #সুমন্দ্রামিত্র
কঠোরভাবে প্রাপ্তমনষ্কদের জন্য।
.
.

নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহের বৃহস্পতিবার। সকাল এগারোটা।
দুইদিন কেটে গেছে তিন্নি রাজারহাটের বেসরকারি নার্সিংহোমে ভর্তি, আজও জ্ঞান ফেরে নি। সেই মঙ্গলবার রাতে তিন্নির অফিসের সহকর্মীদের থেকে খবর পেয়ে পড়িমরি করে সপরিবারে রাজারহাটের এই বেসরকারি নার্সিংহোমে ছুটে এসেছেন ভাস্বতীদেবী, জলের মতো টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে অথচ একটাও আশার খবর নেই মেয়েটার আদৌ কি হয়েছে, কেমন আছে, কেন জ্ঞান ফিরছে না ওর।
আজ সকাল থেকে তিন্নির MRI চলছে, অনেকক্ষণ যাবত রুমের বাইরে দুরের চেয়ারে অপেক্ষারত ভাস্বতীদেবী আর শুভ৷ ডাক্তার এখনও বাইরে আসেননি, রুমের সামনে জ্বলে থাকা লাল বাতিটা যতবারই ভাস্বতীদেবী দেখছেন ততোবারই যেন ওঁনার বুকের ভিতর থেকে হাহাকার উঠে আসছে৷ অবিরত মনে মনে দোষারোপ করছেন নিজেকে, খালি মনে হচ্ছে যা কিছু হলো তারজন্য একমাত্র উনিই দায়ী! মা হয়ে মেয়েকে এটুকু বুঝলেন না?
আজ যদি মেয়েকে একটু কাছে টেনে, মাথায় হাত বুলিয়ে মনের কথাটা বার করতেন তাহলে কি ফুলের মতো নরম মেয়েটা তলে তলে এভাবে নিজেকে শেষ করে দিতে চাইতো? রঞ্জনবাবুর দিকে তাকানো যাচ্ছে না। পাথরের মতো স্থির হয়ে হুইলচেয়ারে আটকে, খবরটা শোনার পর থেকে মুখ থেকে একটাও কথা বার হয় নি ওঁনার! কালিঢালা শূন্য চোখে তাকিয়ে আছেন নার্সিংহোমের সাদা দেওয়ালের দিকে।
অনেকসময় পর ভেতর থেকে একজন নার্স বেরিয়ে এলো, পিছু পিছু সাদা আ্যপ্রোন পড়া সৌম্যকান্তি ডাক্তার। দুর থেকে দেখতে পেয়েই শুভ ছুটে গেল ওঁনার কাছে
— ডাক্তারবাবু, দিদি কেমন আছে এখন ?

বয়স্ক ডাক্তার, বোধয় শুভর বয়স আন্দাজ করেই এদিক ওদিকে চেয়ে বললেন
— তোমার বাড়ির আর কোনো লোক আসে নি? বাবা, মা বা কোনো অভিবাবক?
সবার অলক্ষ্যে এককোনে বসে থাকা রঞ্জনবাবু হুইলচেয়ার ঠেলে এতক্ষনে এগিয়ে এলেন
— আমি সীমন্তিনীর বাবা, বলুন।

একটু সময় নিলেন ডাক্তার তারপর মেডিক্যাল রিপোর্টের প্রাথমিক ড্রাফ্টে চোখ বুলিয়ে বললেন
–যা দেখছি, মঙ্গলবার আ্যডমিট হওয়ার পরপরই পেশেন্টের যে অপারেশনটা হয়েছিল, সেটা সাকসেসফুল। আমরা MRI আর CT Scan করে দেখলাম। সেভাবে বলতে গেলে পেশেন্ট এখন আশঙ্কামুক্ত, ওর ব্রেনে ছোট্ট একটা হ্যাম্যারেজ হয়েছিল সেটাও বন্ধ করা গেছে, নতুন কোনো ব্লাড ক্লট নেই। তবে পেশেন্টের এখনো জ্ঞান ফেরে নি, কারণ ….

এগুলো তো ভালো খবর!
তবুও ডাক্তারবাবুর মুখে ফুটে ওঠা চিন্তার ভ্রুকুটিগুলো দেখে রঞ্জনবাবুর বুকের ভেতর কেঁপে উঠলো।
একটু থেমে ডাক্তারবাবু বললেন
— ডাক্তারি পরিভাষায় একে বলা হয় brain Ischemia। ব্রেনে হঠাৎ করে ব্লাড ফ্লো কমে যায় ডিউ টু লো অক্সিজেন লেভেল। এটিকে আমরা মাইল্ড স্ট্রোকও বলে থাকি! সাধারণত ৮০% ক্ষেত্রে রুগী ১ ঘন্টা, একদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে যান, বাকিরা হয়তো ১৫ দিন বা একমাসের মধ্যে ! কিন্তু এইক্ষেত্রে কেসটি হলো রেয়ার ৫%।

পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল যেন।
ভাস্বতীদেবী মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন, ভাঙা ভাঙা গলায় রঞ্জনবাবু হাহাকার করে উঠলেন
— তিন্নির সাথেই কেন এমন হলো ডাক্তারবাবু? সুস্থ স্বাভাবিক মেয়েটা অফিস গেল আর এমন ! কেন?

সব “কেন”র জবাব হয় না।অভিজ্ঞ ডাক্তারদের কাছে রুগীর পরিবারের চিন্তা স্পর্শ করে না, ওঁনাদের কাছে এসব নিত্যদিন্র ব্যপার। গলায় সহানুভূতি এনেই কঠোর সত্যিটা বললেন
— দেখুন সব পেশেন্ট আলাদা, তাদের ইমিউনিটি পাওয়ার, রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা, শারীরিক কন্ডিশন আলাদা। যেটুকু বুঝছি, পেশেন্টের হয়তো দিন’কয়েক ধরেই প্রচুর মানসিক স্ট্রেস গেছে, তাছাড়া আই সাসপেক্ট ….. এটাই প্রথম নয়! এর আগেও পেশেন্টের এমনই কোনো আ্যটাক হয়েছিল যা আপনারা জানেন না। শি ওয়াজ ভেরি উইক ! মেন্টালি.. আই মিন। আর এখন..এখন কেমন জানি ওঁনার বোধহয় বাঁচার ইচ্ছেটাই নেই। মেডিক্যালি স্পিকিং, উনি এখন টেম্পোরারি কোমায়, বলতে পারেন একটা গাঢ় ঘুমের মধ্যে ডুবে আছেন। ওঁনার ব্রেন সবার কথা শুনতে পাচ্ছে, বুঝতে পারছে বাট ইট শাট হার বডি।

কোমা?
ডাক্তারবাবুর কথাগুলো কানে যেতে বেশকিছুক্ষন কোনো কথা খুঁজে পেলেন না কেউই, ফ্যালফ্যালে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন। ভাস্বতীদেবী কেঁদেই চলেছেন। শেষে রঞ্জনবাবু সব হারানোর গলায় ডুকরে উঠলেন — তাহলে? আমার মেয়েটা কি আর কোনদিনও উঠে বসে আমার সাথে কথা বলবে না?

— দেখুন…..গত ৬০ ঘন্টা ওঁনাকে ভেন্টিলেশন সাপোর্ট দেওয়ার পর আজ কিছুটা হলেও শারীরিক উন্নতি লক্ষ্য করেছি, এখন আমরা পেশেন্টকে ভেন্টিলেশন থেকে বের করে আই.সি.ইউতে দিয়ে দিয়েছি। ওঁনার জ্ঞান ফিরে এলেই আই.সি.ইউ থেকে এইচ.ডি.ও’তেও ট্রান্সফার করে দেব। আপনারাও আপনাদের চেষ্টা চালিয়ে যান – পেশেন্টের পাশে গিয়ে বসুন, ওঁনার পছন্দের ফুল বা পারফিউম নিয়ে আসুন্,পছন্দের গানও চেষ্টা করা যেতে পারে বা টাচ খেরাপি- এইসব আর কি। ছোট ছোট সাধারন কিছু জিনিষ যেটা পেশেন্টেকে , মানে ওঁনার ব্রেনকে আবার আপনাদের সাথে, রিয়্যাল ওয়ার্ল্ডের সাথে কানেক্ট করতে বাধ্য করবে। ওর হ্যাপি মেমোরিজগুলো নিয়ে কথা বলুন, স্বাভাবিকভাবে গল্প করুন এমনভাবে, যেন উনি জেগেই আছেন। এভাবেই হয়তো ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে আসবে। যেভাবেই হোক ওঁনার ব্রেনকে এই ডিপ স্লিপ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

— তাও…. কতোদিন? তিন্নির জ্ঞান ফিরে আসতে কতদিন লাগবে ডাক্তারবাবু??

— সরি। সত্যি বলতে এতে আমাদের কোনো হাত নেই। আরো ৭২ ঘন্টা পর আবার আমাদের অন্যকিছু ট্রাই করতে হবে…. সেরকম হলে Medical induced coma বা থার্মাল ট্রিটমেন্ট। কিন্তু সেগুলো তো অনেক টাকার ব্যাপার। যদিও …..
একটু থামলেন ডাক্তার, তারপর হাতের ফাইলে চোখ আটকে বললেন
— সবটাই কিন্তু নির্ভর করছে ওঁনার বেঁচে থাকার ইচ্ছা আর একটা মিরাকলের ওপর। আপনারা ঈশ্বরকে ডাকুন আর প্রার্থনা করুন যেন পেশেন্ট সুস্থ হয়ে যায়। এছাড়া আর আমাদের হাতে কিছু নেই!

**************************__****************************

বিকেল ৪টে। বৃহস্পতিবার।
অনেকক্ষন ধরে রিং হয়ে যাচ্ছে, সীমন্তিনী তো কখনও এমন করে না? অভিমন্যুর ফোন এলেই পাগল মেয়েটা ফোনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রায়! তিন চারবার ট্রাই করার পর অভিমন্যু ছেড়ে দিলো ফোনটা।

হয়তো ফোন সাইলেন্ট আছে, হয়তো অফিসের কাজে ব্যস্ত। কিন্তু তাও খবরটা জানানো যে খুব দরকার! পরশু দুপুরে টিভিতে যে খবরটা দেখিয়েছে সেটা মিডিয়ার ভুল ছাড়া আর কিছুই নয়! তিন্নি কোনোভাবে নিউজ দেখেছে কিনা অভিমন্যুর জানা নেই, যদি দেখে থাকে অভিমন্যুর চিন্তায় তিন্নি কি করে বসে কে জানে!

গত দুইসপ্তাহ ধরে চলা মিশন আজ সকালেই শেষ হয়েছে তারপর অফিসিয়াল রিপোর্ট ওয়ার্ক হতে হতে আরো ঘন্টা কয়েক। প্রত্যাশার থেকেও বেশি সফল হয়েছে এই মিশন, কিন্তু প্রতিরক্ষা দপ্তর এবং সেনাবাহিনীর জনাকয়েক ছাড়া আর কারো কাছে এই নিঃশব্দ লড়াইয়ের বিন্দুমাত্র খবর থাকবে না, লালফিতের বন্ধন আর RTIএর চাপে হয়তো প্রকাশ পাবে আজ থেকে দশ- বারো বছর পর। উত্তর সিকিমের বন্যার সাথে ওদের মিশনের কোনো সংযোগ ছিল না কিন্তু ভাগ্যক্রমে বন্যার খবরটা ওদের কাছে শাপে বর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কভার আপ বলা যায়। নাহলে শত্রুপক্ষের কাছে আগে থেকেই অভিমন্যু এবং ওর ছোট্ট গেরিলা টিমের আইডেন্টিফিকেশন কোনোভাবে লিক হয়ে যাওয়ায় ধরা পড়ার পর ওদের আর ফেরত আসার সম্ভাবনা ছিল না। আর্মির তরফ থেকে সুচারুভাবে তখন ওদের মৃত্যুর খবর রটিয়ে দেওয়া হয়! যদিও দুর্ঘটনার জায়গাটা ছিল অভিমন্যুদের মিশন যেখানে তার ৫০০ মাইল দক্ষিণে। সেনার তরফে দায়িত্ব নিয়ে বারে বারে জওয়ানদের মৃত্যুর সংবাদ টিভিতে দেখানো হচ্ছিলো যাতে খবরটা বিশ্বাসজনক মনে হয়, শত্রুপক্ষের কাছেও। আর সেই সুবাদে নির্বিবাদে অভিমন্যুর মিশন আজ সাকসেসফুল। এবার আর নর্থ সিকিমে ওর প্রয়োজন নেই।

সন্ধ্যে সাড়ে ছয়টা পেরিয়ে গেলো, ব্যস্ত হাতে পাকিং সারতে সারতে আরেকবার ফোন ট্রাই করলো অভিমন্যু, চারবারের বার রিসিভ হলো। সীমন্তিনী নয়, অচেনা একটা ছেলের সরু গলা
— হ্যালো ? কে বলছেন?
নিজের অজান্তেই মুখের পেশী শক্ত হয়ে উঠলো, হিমশীতল স্বরে প্রতিপ্রশ্ন করলো
— হোয়ার ইজ সীমন্তিনী ?
— দিদিকে তো এখন ফোনে পাবেন না! আপনি কে? নাম কি আপনার?

পলকে মুখের ভাব নরম হয়ে এলো অভিমন্যুর কিন্তু সাথে সাথেই একটা ভ্রুকুটিও জেগে উঠলো কপালে। এ তবে শুভদীপ? তিন্নির ছোট ভাই? কিন্তু উইকডে’তেও তিন্নি কেন ফোন ধরলো না? কি হয়েছে তিন্নির? ঘুমিয়ে পড়েছে? শরীর খারাপ? গুরুতর কিছু?
অনুচ্চারিত প্রশ্নগুলো বর্ষার কালো মেঘের মতো ভিড় করে এলো মাথায়, জবাব দিতে ভুলে গেলো অভিমন্যু। ওপ্রান্ত থেকে বিরক্তিভরা গলা ভেসে এলো
— হ্যালো? কে আপনি? কথা বলছেন না কেন? দিদিকে কি দরকার আপনার?
— আমার নামটা ফোনে সেভ নেই!?
— নাহ! শুধু একটা হার্ট ইমোজি!
বলতে বলতে থমকে গেলো শুভ, তারপর উত্তেজনায় প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে আর কি!
— ওহ মাই গড! আপনিই কি ……..
কথা হারিয়ে গেলো শুভর !
— ইয়েস দিস ইজ মেজর অভিমন্যু সেন। কি হয়েছে সীমন্তিনীর?

সায়কদা তবে ঠিক’ই বলেছিলো? পিয়াসাদি’ও ঠারেঠারে এর ব্যাপারেই ভাসা ভাসা কিছু বলে চুপ করে গিয়েছিলো? সত্যিই দিদির সাথে এর কিছু একটা চলছে? কতটা বলা উচিত হবে ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না শুভ, আমতা আমতা করে জবাব দিলো
— দিদি…. মানে পরশু বিকেলে অফিসে অজ্ঞান হয়ে মাথায় একটা আঘাত লাগে, ওর কলীগরা রাজারহাটের একটা বেসরকারি হসপিটালে ভর্তি করে আমাদের খবর দেয়। দিদির এখনও জ্ঞান ফেরে নি। আসলে আমি ঠিক জানি না, কি সব Medical induced coma করতে হবে, অনেক টাকার ব্যাপার। ডাক্তার বলেছে ৭২ ঘন্টা না কাটলে কিছু বলতে পারবে না।

শুনতে শুনতে হঠাৎ করে মাথাটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিলো অভিমন্যুর। পরের দুই সেকেন্ডে মনোস্থির করে নিলো কি করবে ও। ঠান্ডা হয়ে আসা গলায় শুধু জিজ্ঞেস করে নিলো
— কোন নার্সিংহোমে ?

জলদি করে নার্সিংহোমের নামটা জানালো শুভ, তারপর একটু ইতস্তত করেই বললো
— ইয়ে মানে…. অভিমন্যুদা! তুমি কি….

কোনো জড়তা ছাড়াই ফোনের ওপ্রান্তের অবিচল স্বরটি ভরাট গলায় বললো
— হ্যাঁ, আমি আসছি!

শুভর সাথে কথা শেষ করে পরপর অনেকগুলো ফোন করলো অভিমন্যু। মন দিয়ে অপরপ্রান্তে কথা শুনলো, উত্তেজনায় আর নিস্ফল ক্রোধে কখনো কখনো হাতের মুঠি শক্ত হয়ে উঠলো। মুখের প্রতিটি পেশী কঠিন হয়ে ফুটে রয়েছে ওর, চোখের দিকে তাকালে অতিবড়ো সাহসীরও বুক কেঁপে উঠবে এমনই স্থির জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। তারপর পাথরকঠিনমুখে নিজের প্যাকিং শেষ করে থম হয়ে বসে রইলো, সারারাত অবিচল।
.
.
.
শহর কলকাতা। সকাল সাড়ে সাতটা।
নভেম্বরের মাঝামাঝি। আলসেমির শীতঘুম মাখা কুয়াশার চাদর ছেড়ে তীরবেগে একটা গাড়ি এগিয়ে চলেছে বিশ্ববাংলা সরণি দিয়ে। পাঁচমাস পর নিজের শহরে পা রেখেও আলাদা কোনো অনুভূতিই হচ্ছেনা অভিমন্যুর। কেবল মনে হচ্ছে কতক্ষনে নার্সিংহোমে পৌঁছবে! ভাবনার জালে চিড় ধরালো ড্রাইভারের গলা- স্যার এসে গেছি।

ভাড়া মিটিয়ে জলদি পায়ে নার্সিংহোমে ঢুকলো অভিমন্যু, এত সকালে ভিসিটর্স আ্যলাও হয় না। তবে নিজের সোর্সের সাথে কন্টাক্ট করিয়ে আগে থেকেই অভিমন্যুর আসার কথা বলা ছিল। রিসেপশনে গিয়ে নিজের নাম বলতেই ইন্টারকমে একজন নার্সকে ডেকে দিলো রিসেপশনিস্ট, পথ দেখিয়ে উনি নিয়ে গেলেন তিন্নির কেবিনে। কাল রাতের মধ্যেই নার্সিংহোমে কথা বলে তিন্নিকে একটা প্রাইভেট কেবিনে শিফট করিয়ে দিয়েছে অভিমন্যু। ডাক্তারের সাথেও ফোনে সবিস্তারে কথা হয়ে গেছে ওর, এখন শুধু চোখে দেখার অপেক্ষা।

প্রায় একমাস পর আবার দেখা। বাগডোগরা এয়ারপোর্টে বিদায় নেওয়া পাহাড়ী ঝর্ণার মতো উচ্ছল কলকল ভালোবাসায় পাগল মেয়েটির আজ নাকে অক্সিজেন নল, পাশে হার্ট মনিটর। আরো নানা মেডিক্যাল যন্ত্রে ঘর ভরে আছে নরম কোমল শরীরটার প্রতিটি গতিবিধি মনিটর করার জন্য। ধীর পদক্ষেপে কোনো অভিব্যক্তি ছাড়া নিশ্চল পাথরের মতো মুখে অভিমন্যু গিয়ে বসলো তিন্নির বেডের পাশে, তিন্নির ঠান্ডা নিস্পন্দ হাত নিজের শক্ত মুঠিতে ধরে রেখে নার্সের দিকে না তাকিয়েই একরকম আদেশের সুরে বললো
— ওর বাড়ির লোক এলেই আমাকে খবর দেবেন।
তারপর একটু থেমে বললো
— আর একটা কথা! …. আমাকে না জানিয়ে কেবিনে কাউকে আ্যলাও করবেন না।

.

**************************__****************************

.
***************মিরাকেল কি?
আক্ষরিক অর্থ ~ an extraordinary and welcome event that is not explicable by natural or scientific laws and is therefore attributed to a divine agency.
মিরাকেল এক বিস্ময়কর এবং অনন্যসাধারণ ঘটনা যাকে কোনো সাধারন এবং/অথবা কোনো বৈজ্ঞানিক যুক্তি তর্ক দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না, যে ঘটনার কোনো কৈফিয়ত দাবি করা যায় না, কোনো প্রশ্ন করা যায় না! কেবল দৈবকে দায়ী করা যায়।

.
.
.

নিকষ কালো অন্ধকার ঝাপসা কুয়াশা আর বৃষ্টি মাখা সেই টানেলের ভিতর দিয়ে আবার হেঁটে চলছে তিন্নি। চলছে তো চলছেই, শেষ আর হচ্ছে না। খুব শীত করছে ওর। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না, শোনা যাচ্ছে না শুধু অনুভব করছে কড়াপড়া শক্ত একটা হাত নরম ছোঁয়ায় জড়িয়ে আছে ওকে, খুব চেনা এই স্পর্শটা অথচ খুব অচেনা। সাদা কালো ক্যালাইডোস্কোপে মুখটা বদলে যাচ্ছে বার বার – কখনো বাবা, কখনো শুভ, কখনো অভিমন্যু।

না! না !
অভিমন্যু কি করে আসবে এখানে! সে তো স্বার্থপরের মতো আগেই চলে গেছে তিন্নিকে ছেড়ে। তবে যে তিন্নি ভেবেছিলো অভিমন্যুর কিছু হয়ে গেলে ও’ ও বাঁচবে না আর? হেরে গেলো তিন্নির ভালোবাসা?

না!
অভিমন্যু ছাড়া এই পৃথিবীতে বাঁচতে চায় না তিন্নি। জোর করে আবার ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলো ও!
.
.
.
জোর ঝাঁকুনি একটা।
কে যেন হ্যাঁচকা টানে ঘুম থেকে টেনে আনছে ওকে! আহহ্, কেন বিরক্ত করছে ওকে? তিন্নি এখন শুধু ঘুমোতে চায়। খুব খুব ক্লান্ত ও! হাঁটার আর শক্তি নেই, টানেলের স্যাঁতসেঁতে সোঁদা মাটিতেই মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়তে চায় তিন্নি।

অন্ধকার টানেলের শেষপ্রান্ত থেকে একটু আলোর রেখার সাথে ক্ষীন ডাক ভেসে আসছে
“সীমন্তিনী? সোনা? একবার তাকাও প্লিজ? এই তো আমি এসেছি?”

মিলিয়ে মিশিয়ে যাচ্ছে অনেকদিন আগে মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা আরেকটা ডাকের সাথে
“শুনতে পাচ্ছেন? এই যে ম্যাডাম। চোখ খুলুন।”

উফফ! সেই স্বর! সেই পাগল করে দেওয়া ডাক! সে কি এসছে? পাশ থেকে একটি নারীকণ্ঠ বলে উঠছে
— আপনি ডিসটার্ব করবেন না এখানে, বাইরে ওয়েট করুন!

তিন্নির মাথার সবকটি নিউরোন একযোগে প্রতিবাদ করে উঠলো।

নাআ! না!
বলতে দাও ওকে, বাধা দিও না। ও যে তিন্নির মৃতসঞ্জীবনী সুধা, তিন্নির লাইফলাইন।

ঘুম ভেঙে গেলো তিন্নির।

**************************__****************************

জোরালো সাদা আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে গেলো, চারপাশের সব কেমন যেন সাদা, আবছা। ঝাপসাটে।
ভারী হয়ে আছে চোখের পাতাগুলো, খুব কষ্ট চোখ খুলতে!….. এইটাই কি আফটার লাইফ? অভিমন্যু কি এসেছে?
হাতে আর নাকে লাগানো হাজারটি চ্যানেল, মেশিনের বিপ বিপ আওয়াজ আর চিন্তিত মুখে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা পোষাকের নার্সকে দেখে তিন্নি বুঝতে পারলো ও আছে কোনো হসপিটালে। ভীরু ভীরু আবছা চোখে খোঁজার চেষ্টা করলো ওর হাতটি কে ধরে আছে?

স্বপ্ন না সত্যি? এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না তিন্নির।
ওর বামহাত যে বন্দী সেই সুপরিচিত হাতের শক্ত মুঠোয়। চোখের সামনে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেই গাঢ় বাদামি চোখজোড়া। সেই দৃষ্টিতে কোনো উত্তাপ নেই, আছে শুধু ভালোবাসা, নিজের পরম কাঙ্খিত বস্তুকে কাছে টেনে নেওয়ার গভীরতা। সেই অন্তর্ভেদী দৃষ্টির সামনে তিন্নির দুর্বল হৃৎপিন্ডের ধাবমান স্পন্দন আজ আর লোকানো গেল না, শরীরের সাথে সংযুক্ত মেশিন সশব্দে জানান দিচ্ছে তেজী ঘোড়ার লাবডুব। অবশ হয়ে থাকা শুকনো ঠোঁটদুটো বলার চেষ্টা করলো
— সত্যি তুমি এসেছো?

কি বুঝলো সে’ই জানে! চিরপরিচিত, চির পাগলকরা, বুকের ভেতর অবধি দুলিয়ে দেওয়া সেই মাতাল ঘন হাস্কি স্বর আবছা হয়ে আসা গলায় বললো
—তোমার হাতটা যে আমাকে ধরে রাখতেই হবে সীমন্তিনী, সেই শিয়ালদা স্টেশনের প্লাটফর্ম থেকে সিকিমের পাহাড়ি ঝুপড়িতে, ইন্দো -চীন বর্ডারের মিলিটারি তাঁবুতে অথবা কি কলকাতার হসপিটাল বেডের পাশে।

হসপিটালের বেডে মিশে যাওয়া তিন্নির ক্লান্ত অবশ শরীরে জোর নেই উঠে বসার, হাতটা নড়ানোরও শক্তি নেই। অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকতে থাকতে কৃষ্ণকালো গভীর দুই চোখ বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় নেমে এলো নিঃশব্দ নোনতা জলের ধারা।
একটি একটি করে সবকটি অশ্রুবিন্দু মুছে নিলেন মেজর অভিমন্যু সেন, তারপর হার না মানা দৃঢ় গলায় বললেন
— যতবার তুমি একটা করে পা বাড়াবে মৃত্যুর দিকে, তোমার হাত ধরে আমি টেনে আনবো তোমাকে জীবনের দিকে। তোমাকে ছাড়া আমিও যে ইনকমপ্লিট সীমন্তিনী। তুমি যখন বলতে, বিশ্বাস করি নি, কিন্তু কাল রাতে বুঝতে পারলাম যে তুমিও আমার নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে, শরীরে মনে জড়িয়ে গেছো মাকড়সার জালের মতো। এ জাল আমি ছাড়াতে পারবো না, এ জাল আমি ছাড়াতে চাই না।
ডেস্টিনি বলো, কোইন্সিডেন্স বলো …. আমি তোমার, সেই প্রথম দেখার দিন থেকে। আই লাভ ইউ, আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ সীমন্তিনী। তুমি না থাকলে আমিও যে বেঁচে থাকতে পারবো না।

.
.
চলবে