#স্নিগ্ধ_প্রেমাবেশ (০৩)
#জেরিন_আক্তার
[কার্টেসি ব্যাতিত কপি করা নিষিদ্ধ]
হিয়ার ভার্সিটি ছুটির পরে ওকে নিতে ওদের গাড়ি আসে। হিয়া রনির চোখ ফাকি দিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ে। বাড়িতে আসতে আসতে মনস্থির করে এই সপ্তাহে আর ভার্সিটিতেই পা রাখবে না। আর ওই লোকটা ওকে না দেখতে পেয়ে এমনেই ভুলে যাবে। এরপরে হিয়াও মুক্ত।
হিয়াকে কিছু একটা ভাবতে দেখে ওদের ড্রাইভার, নাম রাহাত, বয়স ২৭। সে লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে হিয়াকে বলল,
-“কিছু নিয়ে চিন্তায় মনে হচ্ছে?”
হিয়া মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“ওই আসলে কিছুনা।”
রাহাত আর প্রশ্ন করলো না। হিয়াকে নিয়ে এসে ওদের বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে গাড়ি পার্ক করে রাখলো।
এদিকে রনিরা ভার্সিটির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু হিয়ার দেখা পেলো না। রনি হিয়ার বান্ধবী নেহা, সাথী, রাসেল ওদের দেখে এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলো,
-“তোমাদের বান্ধবী কোথায়?”
নেহা বলল,
-“বান্ধবীকে দিয়ে কি করবেন? আর আপনারা ওর পেছনে আঠার মতোন পড়ে আছেন কেনো? ও নাহয় ভুল করেই ফেলেছে তাই নিয়ে ওকে নজরবন্দি করে রাখছেন কেনো?”
রনি বলল,
-“ভুল হলেও আপনাদের বান্ধবীকে আমার স্যারের অনেক পছন্দ হয়েছে। আর কথা সেটা না। আপনাদের বান্ধবী কোথায় সেটা বলুন? বাড়িতে চলে গিয়েছে নাকি?”
নেহা ঝাড়ি মেরে বলল,
-“জানিনা, খুঁজে নিন।”
রনি ওর ঝাড়ি শুনে নিজেও ঝাড়ি মেরে বলল,
-“বলতে হবে না! খুঁজেই নিচ্ছি।”
বিকেলের দিকে, হিয়া বাড়ি থেকে বের হলো কোচিংয়ে যাওয়ার জন্য। রাহাত গাড়ি বের করে দাঁড়িয়ে আছে। হিয়া গাড়িতে উঠে বলল,
-“শুনুন, কেউ জন্য আপনাকে আমার ব্যাপারে খোঁজ করে বলবেন না। এমনকি বলবেনও না আপনি আমাদের ড্রাইভার। আর গাড়ির সামনে কোনো গাড়ি এসে দাঁড়ালে আপনি সেটা পাত্তা দিবেন না।”
-“কি হয়েছে বলা যাবে কি?”
-“ওই একটা ভুল নাম্বারে কল দিয়েছিলাম সেই লোক আমাকে খুঁজছে।”
-“ওহ। চিন্তা করো না, সব ঠিক হবে, ইনশাআল্লাহ।”
হিয়া কোচিং শেষ করে বাসায় চলে এলো। এর মাঝে শ্রাবণ বা রনি কাউকেই দেখেনি। ও একটু খুশিই হলো। যাক ওকে হয়তো আর ডিসটার্ব করবে না।
শ্রাবণ সন্ধ্যার পরে বাড়িতে ফিরে আসে। রুমে ফিরে ড্রেস চেঞ্জ করে শাওয়ার নেয়। এরপরে কালো শার্ট আর কালো শর্ট প্যান্ট পড়ে রুম থেকে বেরিয়ে ড্রইং রুমে আসে। সেখানে সাবিহা চৌধুরী বসে অফিস সংক্রান্ত কিছু কাজ করছিলেন। শ্রাবণ এসে সোফায় বসলো। বাড়ির কাজের লোক ফাহিমা বেগমকে বলল কফি আনতে। তিনি ঝটপট কফি বানিয়ে নিয়ে এলেন। শ্রাবণ কফিতে প্রথম চুমুক দিয়ে সাবিহা চৌধুরীকে জিজ্ঞাসা করলো,
-“কাব্য কোথায়?”
-“সকালে ভার্সিটিতে গিয়েছে। তারপর তো আর ফিরেনি।”
শ্রাবণ ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখলো রাত ৮ টা বাজে। এখনও না আসার কারণ কি? শ্রাবণ কল দিলো কাব্যকে,
-“হ্যা ভাইয়া, বলো?”
শ্রাবণ তির্যক কণ্ঠে বলল,
-“তোর আসতে কতক্ষন লাগবে?”
-“এ এই এক্ষুনি আসছি।”
শ্রাবণ আর কিছু শোনার অপেক্ষা করলো না। কল কেটে দিলো।
কাব্য বন্ধুদের থেকে বিদায় নিয়ে বলল,
-“আমাকে যেতে হবে তোরা আড্ডা দে।”
-“আর কিছুক্ষন থেকে যা!”
-“ভাইয়া কল দিয়েছিলো দেরি হলে বাড়িতে ঢুকতে দিবে না, আসি।”
শ্রাবণ কফি খেয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে বাড়ির সদর দরজার দিকে যেতে নিলে সবিব চৌধুরী বলেন,
-“কোথাও বেরোচ্ছ নাকি?”
-“হ্যা, আম্মু। একটু আসছি, চিন্তা করো না।”
-“ঠিক আছে। সাবধানে যেও।”
শ্রাবণ বাহিরে চলে এলো। ওর ড্রাইভার কামালকে গাড়ি বের করতে বলল। কামাল গাড়ি বের করে সামনে এলো। শ্রাবণ গাড়িতে উঠে বসতেই কামাল চলে গেলো।
পরদিন সকালে,,
হিয়া ভার্সিটি যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে। যেতে চায়নি, কিন্তু কালকে শ্রাবণরা আর ডিসটার্ব করেনি বলে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে। রেডি হয়ে বাড়িতে থেকে বের হলো। মাহিমা বেগম হিয়াকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ভিতরে চলে গেলেন। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে রওনা হলো।
কিছুদূর যাওয়ার পরে হিয়াদের গাড়ির সামনে এসে দাড়ালো দুটো গাড়ি। একটা কালো মার্সিডিজ। আরেকটা সাদা রঙের প্রাইভেট কার। রাহাত গাড়ির হর্ন বাজালো কয়েকবার। কিন্তু কোনো সারাশব্দ না পেয়ে রাহাত নামলো। সাথে সাথে রনি ও তার লোক নামলো। হিয়া শুকনো ঢোক গিলে বসে রইলো।
শ্রাবণ গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে এলো। হিয়ার গাড়ির দরজা খুলে বাকা হেসে বলল,
-“হ্যালো বউজান! তো কি অবস্থা?”
এই বলে শ্রাবণ হিয়ার হাত ধরে টান দিয়ে গাড়ির থেকে নামালো। রাহাত এগিয়ে এলো। হিয়াকে টানতে টানতে নিয়ে গেলে হিয়ার আরেকটা হাত ধরে শ্রাবণকে বলল,
-“আপনি উনাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
শ্রাবণ চোখ বন্ধ করে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে রাহাতকে বলল,
-“ওর হাতটা ছাড়ো!”
রাহাত বলল,
-“না হাত ছাড়বো না। উনাকে কোথাও নিয়ে যেতে দিবো না।”
শ্রাবণ হিয়ার হাত ছেড়ে দিয়ে রাহাতের কলার চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল,
-“তোর সাহস হয় কি করে ওর হাত ধরার। আবার হাত ধরার দুঃসাহস দেখালে একদম হাত কেটে আরেক হাতে ধরিয়ে দিবো। এন্ড ওকে আমি নিয়ে যাবো মানে নিয়ে যাবো। তু্ই আটকাতে পারলে আটকা।”
শ্রাবণ রাহাতকে ছেড়ে দিয়ে হিয়ার হাত ধরে জোরপূর্বক টানতে টানতে নিজের গাড়িতে এনে বসালো। এরপরে নিজেও বসে কামালকে বলল,
-“অফিসে যাওয়ার পথে ফার্মেহাউস হয়ে যেও।”
-“ওকে স্যার।”
রাহাত সাথে সাথে কল দিলো হামিদ শিকদারকে। সব খুলে বলল তাকে।
…..
এদিকে হিয়া চলন্ত গাড়ির দরজা খুলতে নিলে শ্রাবণ ওর দুটো হাত ধরে বলল,
-“পালানোর চেষ্টা করবে না। নাহলে গাড়ির নিচে ফেলে দিয়ে চলে যাবো।”
হিয়া চেতে উঠে বলল,
-“ছাড়ুন হাত! আমি যাবো না। আমি বাড়িতে যাবো। আব্বুকে বলে দিবো। আপনার সাহস হয় কি করে আমাকে নিয়ে যাওয়ার?”
শ্রাবণ ধমক দিয়ে বলল,
-“চুপ। আরেকটা কথা বললে গাড়ি থেকে সত্যি ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবো। এতে আমার হাত একটুর জন্যও কাঁপবে না।”
হিয়া চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে ইচ্ছে করেই জোরে কাঁদতে লাগলো। যা শুনে শ্রাবণ আবারও ধমক দিয়ে বলল,
-“এই চুপ করবে? তোমাকে মেরেছি আমি? আর মেয়ে মানুষ জোরে জোরে কাঁদো কেনো বাচ্চা নাকি? চুপ করো!”
হিয়া ভয় পেয়ে এবার সত্যি সত্যি ঠোঁট চেপে কাঁদতে লাগলো। শ্রাবণের ফোনে কল এলো। ও হিয়ার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“ইম্পরট্যান্ট কল। আমার কানে যেনো কোনো সাউন্ড না আসে।”
হিয়া ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। আধঘন্টা পরে ওদের গাড়ি এসে থামলো নিরিবিলি একটা জায়গায়। শ্রাবণ হিয়াকে সাথে নিয়ে নেমে নিজের ফার্মহাউজের ভিতরে ঢুকলো। বাড়িটা দোতলা। বাহিরে থেকে অসম্ভব সুন্দর, এবং ভিতরেও আরও সুন্দর। শ্রাবণ হিয়াকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে ড্রইং রুমের পাশে একটা রুমে নিয়ে গেলো। আর উচ্চস্বরে বাড়ির কেয়ারটেকার ও কাজের মহিলাকে ডাক দিলো। ওদের দুজনকে বলল একটা দড়ি আনতে। নিয়েও এলো তাঁরা।
শ্রাবণ হিয়াকে জোরপূর্বক চেয়ারে বসিয়ে ওর হাত-পা চেয়ারের সাথে বেধে ফেললো। হিয়া কেঁদে কেঁদে বলল,
-“আমাকে ছেড়ে দিন। আমি জীবনেও আপনাকে কল দিবো না। আমি বাড়ি যাবো, যেতে দিন।”
শ্রাবণ হিয়ার গালে হাত ছুঁইয়ে বলল,
-“তুমি কল দিয়েছিলে সেটা নিয়ে আমার কোনো মাথা-ব্যাথা নেই। তোমাকে ছেড়ে দিতাম। কিন্তু তোমাকে দেখার পরে যে ভালো লেগে গিয়েছে। আর তাহসীর চৌধুরী শ্রাবণের পছন্দের জিনিস সে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। এমনকি কোনো প্রশ্নই উঠে না। এখানেই থাকো হ্যা বউজান। আমি বিকেলে এসে তোমাকে বিয়ে করে তোমায় বাড়িতে পাঠিয়ে দিবো। এইটুকু সময় একটু এডজাস্ট করে নাও।”
হিয়া মুখ খোলার আগেই শ্রাবণ টেপ দিয়ে টুস করে ওর মুখে লাগিয়ে দিলো। হিয়া অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাথা নাড়াতে থাকে। শ্রাবণ চোখে সানগ্লাস পড়ে বাহিরে চলে গিয়ে রুমের দরজা লক করলো। কিন্তু এভাবে রেখে গেলে ওকে যদি কেউ পালিয়ে যেতে সাহায্য করে, তাই চাবিটা নিজেই নিয়ে চলে গেলো। ওর লোকদের বলে গেলো যত যাই হোক হিয়াকে যেনো এখানে থেকে কেউ নিয়ে যেতে না পারে।
শ্রাবণ অফিসে চলে গেলো।
এদিকে হামিদ শিকদার পাগলের মতো মেয়েকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
বিকেলের দিকে শ্রাবণ বেরিয়ে গেলো ফার্মহাউসের উদ্দেশ্যে। যাওয়ার পথে কাব্যকে কল দিয়ে কাজী সাহেবকে সাথে নিয়ে আসতে বলল। কাব্য উত্তরে বলল নিয়ে আসবে।
শ্রাবণ ফার্মহাউসে এলো। এর পরপরই কাব্য এলো। কাব্য নিজের সাথে কাজীকেও সাথে নিয়ে এসেছে।
শ্রাবণ ওদের ড্রইং রুমে বসিয়ে হিয়ার কাছে গেলো। হিয়া কাঁদতে কাঁদতে চোখ-মুখ ফুলিয়ে রেখেছে। শ্রাবণ কাছে গিয়ে দড়ি খুলে দিলো। এরপরে টেপ। হিয়া উঠে দৌড় দিতে নিলে শ্রাবণ ওর হাত ধরে বাহিরে নিয়ে এলো।
কাব্য বড় ভাইয়ের সাথে একটা মেয়েকে দেখে অবাক হলো বৈকি। যেই ভাইকে কোনো মেয়ের আশেপাশে দেখা যায়না সে কোনো একটা মেয়ের হাত ধরে আনছে। বড়ই অবাক করা বিষয়। শ্রাবণ এগিয়ে এসে সোফায় হিয়াকে বসিয়ে নিজেও ওর পাশে বসে শক্ত করে ধরে রইলো। আর কাজীকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-“কাজী সাহেব বিয়ে পড়ান।”
যা শুনে কাব্য অবাক হয়ে উঠে দাড়ালো। আবার বসে পড়লো। হিয়া হাত ছাড়াতে মুচড়া-মুচড়ি করছে। কাজী গলা খাকারি দিয়ে বলল,
-“বাবা মেয়ের তো মনে হয় মত নেই।”
শ্রাবণ সোজা গলায় বলল,
-“মেয়ের মাথা ঠিক নেই। তাই এমন করছে। মেয়ের সম্পূর্ণ মত আছে। আপনি বিয়ের সব কাগজ-পত্র রেডি করুন তাড়াতাড়ি।”
হিয়া চেতে গিয়ে বলল,
-“কোনো মাথা খারাপ নেই আমার। উনি আমায় জোর করে তুলে এনেছে। আমি বাড়িতে যাবো। আপনারা সাহায্য করুন।”
কাজী ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। শ্রাবণ চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল,
-“আপনাকে তাড়াতাড়ি করতে বলেছি।”
-“কিন্তু বাবা…..”
শ্রাবণ কামালের দিকে তাকালো। কামাল তৎক্ষণাৎ পকেট থেকে এক বান্ডিল টাকা বের করে কাজীর সামনে রাখলো। কাজী বলল,
-“বাবা মেয়ের তো মত নেই। সেখানে টাকা দিয়ে আমি এই বিয়ে পড়াতে পারবো না।”
শ্রাবণ কোমরের পেছনে গুজে রাখা রিভলবার বের করে কাজীর সামনে রাখলো। কাজী শুকনো ঢোক গিলে হিয়াকে বলল,
-“মা, তোমার বাবার নাম কি?”
হিয়া নাক-মুখ কুঁচকে নিয়ে বলল,
-“বলবো না। আমি এই বিয়ে করবো না। চলে যাবো। আমাকে যেতে দিন।”
শ্রাবণের মেজাজ খুব চড়া হলো। তৎক্ষণাৎ হিয়ার ফর্সা গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে ধমকসুরে বলল,
-“চুপ, বেশি কথা বলো! তুমি যদি এখানে থেকে যাও তাহলে কবুল বলেই যেতে হবে। আমাকেই বিয়ে করতে হবে।”
চলবে….

