#স্নিগ্ধ_প্রেমাবেশ (০৪)
#জেরিন_আক্তার
[কার্টেসি ব্যাতিত কপি করা নিষিদ্ধ]
হিয়া থাপ্পড় খেয়ে আরও জোরে জোরে কাদতে শুরু করলো। শ্রাবণ দাঁত চেপে কামালকে বলল,
-“এই যাও তো একটা লাঠি নিয়ে এসো!”
কামাল ইতস্তত গলায় বলল,
-“স্যার লাঠি দিয়ে মারবেন… ”
শ্রাবণ তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,
-“দরকার হলে তাই মারবো। নিয়ে এসো।”
কামাল চলে গেলো। হিয়া কান্না থামিয়ে বলল,
-“আপনি মারলেও আমি বিয়ে করবো না।”
কাব্য শ্রাবণকে বলল,
-“ভাইয়া উনি তো বিয়ে করবে না বলছে শুধু শুধু জোর করো না। ছেড়ে দাও।”
হিয়া তালে তাল মিলিয়ে বলল,
-“হ্যাঁ ভাইয়া ঠিকই বলেছেন। আমি বিয়ে করবো না। বাড়ি যাবো আমি।”
শ্রাবণ কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না। ও যা চায় পেয়েই ছাড়ে। হয় ছিনিয়ে নেয়, নয়তো নিজেই আদায় করে। কাব্য আবারও বলল,
-“ভাইয়া উনি ভয় পাচ্ছে ছেড়ে দাও।”
শ্রাবণ কিছু বলার আগেই কামাল সত্যি সত্যিই একটা লাঠি নিয়ে এলো। শ্রাবণের হাতে দিতেই হিয়া জোর গলায় বলল,
-“আমার বাবাকে চিনেন? আমার বাবা জানলে না আপনাদের সবাইকে জেলে ঢুকিয়ে দিবে।”
শ্রাবণ বলল,
-“আগে বিয়েটা করো তারপর জেলে দিও।”
হিয়া হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বলল,
-“আমি মরে গেলেও কবুল বলবো না।”
শ্রাবণ সে কথায় পাত্তা না দিয়ে কাজী সাহেবকে বিয়ের পড়াতে বলল।
…….
কাজী সাহেব হিয়াকে কবুল বলতে বললে হিয়া চেতে উঠে বলল,
-“আমি এই বিয়ে করবো না শুনতে পাচ্ছেন না আপনারা? কেনো জোর করছেন?”
শ্রাবণ কিছু একটা ভেবে বলল,
-“যাও তোমাকে বিয়ে করতে হবে না। এখানেই থাকো। ওদিকে তোমাকে না পেয়ে তোমার বাবার কি অবস্থা হবে ভাবতে পেরেছো? শুনলাম তো অনেক খুঁজছে।”
হিয়া বলল,
-“যেতে দিন আমায়।”
শ্রাবণ চোয়ালে শক্ত করে বলল,
-“কবুল বলে তারপর যাবে।”
হিয়া চুপচাপ বসে রইলো। কেউ এর বাহিরে কথা বলার সুযোগ পেলো না। শ্রাবণও আয়েসি ভঙ্গিতে বসে রইলো। হিয়ার থেকে কবুল শুনেই উঠবে।
একঘন্টা পেরিয়ে গেলো। হিয়ার খুব খিদে পেয়েছে। সেই সকালে খেয়েছে কি না। এখন প্রায় সন্ধ্যা। খুব পানি পিপাসাও লেগেছে। হিয়া উঠে দাঁড়িয়ে পানির গ্লাস হাতে নিতে নিলে শ্রাবণ তা সরিয়ে নেয়। হিয়া দাঁত চেপে বলল,
-“পানিটা তো খেতে দিন!”
-“উহু। কবুল বলেই পানি খাও।”
কাজী সাহেব তাড়া দিয়ে বললেন,
-“মা এতো না করে লাভ হবে না। তুমি কবুল বলে ফেলো।”
হিয়া কাঁদতে কাঁদতে কাব্যকে বলল,
-“ভাইয়া আপনি আপনার ভাইকে বোঝান না। আমি বিয়ে করবো না।”
শ্রাবণ হিয়ার হাত ধরে সোফায় বসিয়ে বলল,
-“ফালতু ফালতু সময় নষ্ট করা বাদ দিয়ে কবুল বলে চলে যাও। এরপরে প্রমিস তোমাকে কিচ্ছু বলবো না।”
-“আপনি মিথ্যে বলছেন। আপনি মেরেছেন আমাকে। আমি চিনি না আপনাকে? আমি কেনো বিয়ে করতে যাবো আপনাকে?”
শ্রাবণ গর্জে উঠে কামালকে বলল,
-“এই ওর বাবা-মাকে তুলে নিয়ে এসো তো। এ যখন বিয়ে করবেই না তাহলে একে সহ এর বাবা-মাকেও..”
হিয়া কান বন্ধ করে জোরে বলল,
-“চুপ করুন।”
শ্রাবণ কামালকে আদেশ করে বলল,
-“তোমাকে যেতে বলেছি না! ওর বাড়ির ঠিকানা তো জানোই।”
কামাল যাবে ঠিক তখন হিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-“প্লিজ যাবেন না। আমি আব্বু-আম্মুর কষ্ট সহ্য করতে পারবো না। আমি কবুল বলবো। বলবো। প্লিজ আপনারা যাবেন না।”
শ্রাবণ বাকা হাসলো। ও জানে কোথায় কোন কথা বলতে হয়। এটলিস্ট হিয়াকে ওর বাবা-মাকে তুলে আনার ভয় দেখিয়ে বিয়েতে রাজি করাতে তো পারলো।
কাজী বিয়ে পড়ানো শুরু করলো। হিয়া কাঁদতে কাঁদতে কবুল বলল তিনবার। শ্রাবণও দেরি করলো না। কাজীর বলার সাথে সাথে কবুল বলে দিলো। কামাল কাজীকে বিদায় দিয়ে এলো। হিয়া কাঁদতে শুরু করলো। শ্রাবণ পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল,
-“কেঁদো না। নাও পানি খাও!”
হিয়া কান্না যেনো থামাতেই পারছে না। কাব্য বাড়ির কাজের লোককে বলল,
-“আন্টি আপুর জন্য খাবার নিয়ে আসেন।”
শ্রাবণ ঘাড় ঘুরিয়ে কাব্যকে বলল,
-“আপু না, ভাবি বল।”
কাব্য পুরো অবাক। হিয়া উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
-“আমি বাড়ি যাবো।”
শ্রাবণ বাকা হেসে কাব্যকে বলল,
-“এই তোর ভাবিকে বাসায় ছেড়ে দিয়ে আয়।”
কাব্য উঠে দাঁড়িয়ে হিয়াকে বলল,
-“আসুন ভাবি।”
হিয়া কাব্যর আগেই বেরিয়ে গেলো। কাব্য এসে ওর গাড়িতে হিয়াকে বসতে বলল। হিয়া ব্যাক সিটে উঠে বসে সেই কাঁদছে। কাব্য যেতে যেতে টিস্যু এগিয়ে দিলো, পানির বোতলও এগিয়ে দিলো। কিছুক্ষন পরে হিয়া শান্ত হয়ে গেলো। সারাদিন না খেয়ে আছে, কথা বলার শক্তিটাও আসছে না। আবার থেকে থেকে বিড়বিড় করে শ্রাবণকে বকছে। কাব্য সব শুনে হজম করলো। হিয়া একটু এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলো,
-“আপনার ভাইকে বকলে কি আপনি আমায় বকবেন?”
কাব্য মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো। হিয়া সাথে সাথে বলল,
-“আপনার ভাই একটা শয়তান। না শয়তানও তার থেকে ভালো আছে। বজ্জাত লোক। এই লোকের বউ থাকবে না। আমাকে ভয় দেখিয়ে বিয়ে করা না। আমি যে কি করবো উনাকে। আব্বুকে বলে দিবো। আব্বু উনাকে জেলে ঢুকিয়ে দিবে।”
কাব্য মুখটিপে হাসলো।
কাব্য হিয়াকে ওর বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে নিজেও নেমে দাড়ালো। হিয়া বলল,
-“আপনি ভালো। আপনার ভাই এতো বজ্জাত কেনো আল্লাহ জানে।”
ভিতরে থেকে মাহিমা বেগম ছুটে এলেন। হিয়া ওর মাকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলো। মাহিমা বেগম কাব্যকে দেখে বললেন,
-“কে তুমি?”
কাব্য একটু হেসে বলল,
-“আসলে উনাকে দিতে এসেছিলাম।”
এরপরেই কাব্য গাড়িতে উঠে চলে গেলো। এর বাহিরে কথা বলতে নিষেধ করে দিয়েছে শ্রাবণ।
শ্রাবণ এমনে কাব্যকে যথেষ্ট ভালোবাসে, আদর করে, দেখেশুনে রাখে। কাব্য কোনো কিছুর আবদার করলে শ্রাবণ সেটা কোথায় থেকে এনে দিবে উতলা হয়ে উঠে। কিন্তু রাগের সময় শ্রাবণ না ভাইয়ের কথা শোনে, না ওর বাবার কথা। সাবিহা চৌধুরী বোঝানোর পরে শান্ত হয়।
তবে আজ কাব্য বাড়িতে ফিরে বড় ভাইকে খুব ভালো মতোই খেপাতে পারবে আজকে।
এদিকে হিয়া মাহিমা বেগমকে ধরে কাঁদতে কাঁদতে ভিতরে এলো। তিনি মেয়েকে কয়েকবার জিজ্ঞাসা করলেন কি হয়েছে, কোথায় ছিলি, ওই ছেলেটা কে, কোথায় থেকে এলি—হিয়া কোনোটারই উত্তর দিলো না। বাড়ির ভিতরে ঢুকে সোফায় এসে বসে বলল,
-“আব্বুকে কল দাও!”
মাহিমা বেগম হামিদ শিকদারকে কল দিয়ে বললেন হিয়া এসেছে। আর তাকে আসতে বললেন। হামিদ শিকদার পাশেই একটা থানায় ছিলেন। তার আসতে ১৫ মিনিট লাগলো। তিনি এসে হিয়ার কাছে বসলেন। হিয়া নাক টেনে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-“আব্বু ওই লোকটা আমাকে নিয়ে আটকে রেখে বিয়ে করেছে।”
হামিদ শিকদার মেয়ের এই কথায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। মেয়েকে ধরে বললেন,
-“কি বললে বুঝতে পারিনি। সব ভেঙে বলো তো মা।”
-“আব্বু আমি এক লোককে কল দিয়েছিলাম ভুলে। লোকটা তারপর থেকেই আমার পেছনে পড়েছে। বলে যে পছন্দ হয়েছে। তাই আজকে আমাকে তুলে নিয়ে গিয়ে বিকেল পর্যন্ত আটকে রেখেছিলো। কিচ্ছু খেতে দেয়নি। আর তারপর কাজী ডেকে বিয়ে পড়িয়ে রেখেছে। আমি না করেছিলাম বলে ওই লোক আমাকে থাপ্পড় মেরেছে আবার লাঠিও এনেছিল মারার জন্য। আবার জানো তোমাদের তুলে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছিলো তাই আমি ভয়ে কবুল বলে দিয়েছি।”
হামিদ শিকদার চোয়ালে শক্ত করে বলল,
-“লোকটা কে নাম জানো?”
হিয়া নাক টেনে বলল,
-“কাজী বলছিলো ওই লোকের নাম তাহসীর চৌধুরী শ্রাবণ। ওই লোকের বাবার নাম তৌকির চৌধুরী।”
হামিদ শিকদার উঠে মাহিমা বেগম বললেন,
-“দাঁড়িয়ে আছো কেনো মেয়েকে খেতে দাও। দেখছোনা সারাদিন না খেয়ে আছে।”
মাহিমা বেগম কিচেনে গেলেন। হামিদ শিকদার মেয়ের চোখের পানি মুছে দিয়ে বললেন,
-“কান্না করো না। আমি আছি তো। ওই লোকের কত বড় সাহস আমার মেয়েকে তুলে নিয়ে বিয়ে করে আমিও দেখে ছাড়বো। তুমি খেয়ে রেস্ট নাও। এসব নিয়ে চিন্তার প্রয়োজন নেই।”
মাহিমা বেগম খাবার নিয়ে আসতে আসতে বললেন,
-“হিয়ার আব্বু তোমার কি ওদের সাথে কোনো মামলা নিয়ে ঝামেলা ছিলো?”
হামিদ শিকদার বললেন,
-“এই নামের বাপ-ছেলের সাথে তো কোনো ঝামেলাই নেই।”
হামিদ শিকদার কোথায় যেনো কল করতে করতে বেরিয়ে গেলেন।
কাব্য গাড়ি নিয়ে বাড়িতে ফিরে দেখলো শ্রাবণের গাড়ি গ্যারেজে রাখা। ও গাড়িটা ওইখানে রেখে দারোয়ানকে চাবি দিয়ে বলল,
-“গাড়িটা গ্যারেজে উঠিয়ে রাখুন।”
-“আচ্ছা।”
কাব্য ভিতরে ঢুকে ড্রইং রুমে সাবিহা চৌধুরীকে দেখেই উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল,
-“আম্মু একটা গুড্ নিউজ শুনেছো?”
সাবিহা চৌধুরী টিভি অফ করে বললেন,
-“কই নাতো। কি গুড্ নিউজ বলো?”
-“ভাইয়া বলেনি সে বিয়ে করেছে।”
সাবিহা চৌধুরী একটু জোরেই বললেন,
-“কিহ? বিয়ে? তাও তোমার ভাই?”
-“হুমম। জানি তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না। আমারও হয়নি। কিন্তু আমি বিয়ের সাক্ষী হয়েছি।”
শ্রাবণ সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো, পরনে কালো শার্ট, কালো প্যান্ট। ও এসে সোফায় বসলো।
সাবিহা চৌধুরী ছোট ছেলের দিকে ঘুরে বসে বললেন,
-“কি হয়েছে বলোতো।”
কাব্য সবই বলে দিলো। এর মধ্যে তৌকির চৌধুরীও এসে শুনলেন। সাবিহা চৌধুরী ভাবুক গলায় বললেন,
-“এখন ওই মেয়ের কি হবে।”
তৌকির চৌধুরী বললেন,
-“আমাদের ছেলে যখন জোর করে বিয়ে করেছে, এখন তার বউ আমাদেরই গিয়ে আনতে হবে। উনাদের কাছে তো মেয়ে বেশি হয়নি যে উনারা মেয়ে দিয়ে যাবে।”
সাবিহা চৌধুরী বললেন,
-“ঠিকই বলেছো আমাদেরই কথা বলতে হবে।”
তৌকির চৌধুরী মাথা নাড়ালেন। সাবিহা চৌধুরী হেসে হেসে শ্রাবণকে বললেন,
-“শ্রাবণ তুমি তো বিয়েই করবে না বললে আর আর এখন ছক্কা মেরে দিয়েছো।”
শ্রাবণ মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“তাহলে বউমাকে আনার ব্যবস্থা করো।”
উনাদের কথার মাঝেই তৌকির চৌধুরীর ফোনে কল আসে। আননোন নাম্বার। তৌকির চৌধুরী কল ধরতেই ওপাশে থেকে বলল,
-“আপনি তৌকির চৌধুরী? আপনার ছেলে তাহসীর চৌধুরী শ্রাবণ?”
-“হ্যা। আপনি কে?”
-“আমি থানায় থেকে কল করেছি।”
-“হ্যা বলুন!”
-“স্যার আপনার আর আপনার ছেলের নামে একজন সরাসরি এসে অভিযোগ করছে।”
তৌকির চৌধুরী গম্ভীর গলায় বললেন,
-“কে সে?”
-“একজন লয়ার, নাম হামিদ শিকদার। উনি বলছেন আপনার ছেলে উনার মেয়েকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে।”
তৌকির চৌধুরী লুকানোর প্রয়োজন মনে করলেন না। বলে দিলেন,
-“হ্যা, করেছে।”
-“ওহ আপনি জানেন দেখছি। তাহলে যে একবার থানা দিয়ে ঘুরে যেতে হয় স্যার। দেখুন আপনাদের দুজনেরই ভালো নামডাক আছে। তাই চাইছি না এটা আইনের আওতায় আসুক। হামিদ ভাই আমার কাছের লোক তাই এটা বললাম। এখন আপনি একটু আসুন থানায়। হামিদ ভাইও আছে।”
-“ঠিক আছে আসছি।”
ওসি কল কেটে দিতেই হামিদ শিকদার চোয়ালে শক্ত করে বললেন,
-“উনি আসবেন?”
-“হ্যা। আসছে।”
হামিদ শিকদার মাহিমা বেগমকে কল দিয়ে বললেন,
-“হ্যালো, হিয়া খেয়েছে?”
-“হুমম খেয়েছে।”
-“ঘুমিয়ে পড়তে বলো। আমি থানায় আছি। ওই ছেলের বাবা আসছে। আমার ফিরতে রাত হবে।”
-“আচ্ছা।”
চলবে….

