#হামিদা(৫৮)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ
সফুরার ঠাঁই হলো ভূঁইয়া বাড়িতে, হামিদার সেই পুরোনো ঘরটায়। মহসীন কবির ভূঁইয়াকে রাজি করাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল জুবিনের। রবিন এসে ওর সমথর্ন না করলে সফুরার হয়ত এ বাড়িতে ঠাঁই হতো না। এই যে সমর্থন করেছে তা কিন্তু জুবিনের জন্য নয়। অসহায় সফুরাকে সরোয়ারের লালসার হাত থেকে বাঁচাতে।
জুবিনের বাইরেটা যা জটিল। ভেতরে অত প্যাঁচ নেই। তাই তো রবিনের মতো সত্য মিথ্যা মিশিয়ে বাবাকে মানিয়ে নিতে পারছিল না।
সফুরাকে এ বাড়িতে এনেছে জুবিন। বাঁচার আশা দেখিয়েছে। রবিন কী করেছে? শুধু বাবাকে রাজি করতে সাহায্য করেছে! তবুও জুবিন ওর চোখে সন্দেহের কাঁটা। সফুরা জুবিনের আশেপাশে থাকলে সতর্কে তাকিয়ে থাকে। কেন? কীসের শঙ্কা ওর মনে? জুবিন সফুরাকে স্পর্শ করবে? যেমনি করে হামিদাকে স্পর্শ করেছিল? জুবিনের সারা শরীরে কাঁটা দেয়। হামিদা! রবিনের ঘরের সেই শীৎকার! জুবিনের পেটের ভেতর মোচর দিয়ে ওঠে। হামিদাকে ও কোনোদিন ছুঁয়েছিল, এ কথা ভুলতে চায়। একদিন নিজের ভেতর চাপা উত্তেজনা রুখতে না পেরে অন্ধকারে ওত পেতে দেখতে চেয়েছিল হামিদার শরীর। ইচ্ছে করে নয়। ওকে ডাকতে গিয়েছিল। তারপর সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। জুবিন পাপ করে বসল। এখন এই চোখ দুটো তুলে ফেলা গেলে তাই করত। কিন্তু মনের পাপ কী করে মোচন করবে! হামিদা! ওকে কেন কোনোদিন চেয়েছিল জুবিন! এখন ওই চাওয়া দিন-রাত নরক যন্ত্রণা দেয়। অতীত মুছে ফেলা যায় না কেন?
সফুরা আশেপাশে থাকলে রবিনের শঙ্কিত চাহনি যেন ওকে সতর্ক করে,
“খবরদার, সফুরার দিকে পাপের দৃষ্টি দিবি না। খবরদার, ওর অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবি না। নয়ত…!”
জুবিন সফুরার দিকে তাকাতে পারে না। এই মেয়েটার প্রতি ওর মনে ভালো বৈ খারাপ চিন্তা নেই। তবুও নিজের অতীত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে ও সফুরার দিকে তাকায় না। তবুও যদি রবিনের মনের শঙ্কা যেত!
“জুবিন ভাই, চাচি আম্মা খেতে ডেকেছেন!” জুবিন জানালার কাছ বসেছিল। সচকিত হলো। কিন্তু চোখ ফেরালো না। সফুরা হুইলচেয়ারের পেছনে ধরতে গেলে জুবিন নিষেধ করে।
“আমি পারব, সফুরা।”
সফুরা নীরবে মাথা নাড়ায়। জুবিনের প্রতি ওর আকাশ সমান কৃতজ্ঞতা। এই কৃতজ্ঞতা কীভাবে যে প্রকাশ করবে ভেবে পায় না। সারাক্ষণ জুবিনের পঙ্গু জীবনটাকে সহজ করে দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করে যায়। বসার ঘরে এগোতে এগোতে জুবিন জিজ্ঞেস করে,
“তোর কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো এখানে?”
“না, চাচি আম্মা খুব ভালো। হামিদা আছে না? ও আমাকে নতুন কাপড় দিয়েছে। বলেছে কিছু লাগলে ওকে জানাতে। মেয়েটা খুব ভালো।”
সফুরা খেয়াল করল জুবিনের চোয়াল কঠিন হয়ে গেল। কারণ বুঝতে গিয়ে ওর হাসি মুখের কপাল কুঁচকে যায়। জুবিন তাড়াতাড়ি বসার ঘরে যেতে যেতে বলল,
“অলির খবর কী? বাড়ির খোঁজ খবর কিছু জানিস?”
সফুরার মুখ বদলে গেল। মাথা নুয়ে বলল,
“অলি ভাই কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। মা বোধহয় আর সুস্থ হবে না। আব্বা শোকে পাথরের মতো চলাফেরা করে। এই যে, এতদিন আমি বাড়ি ছাড়া। একবার ওরা আমার খোঁজ নিতে এলো না।”
সফুরার কণ্ঠ অশ্রুরুদ্ধ। ওড়নায় মুখ ঢাকল। জুবিনের বড়ো খারাপ লাগল। নিজের দুর্বলতা ঢাকতে মেয়েটার দুঃখ বাড়িয়ে দিয়ে ঠিক করেনি।
বসার ঘরে তখনও কেউ আসেনি। জেবুন্নেসা রান্নাঘরে। জুবিন বলল,
“আব্বার সঙ্গে অলির ব্যাপার নিয়ে কথা বলব আমি। তোদের বাড়িতে গিয়েও খোঁজ নিয়ে আসব দেখি। যাবি সঙ্গে?”
সফুরার সজল চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে গেল। হাসল। মাথা নাড়ায় ওপর নিচে। জুবিন এক হাত বাড়িয়ে পানির গ্লাস নিতে যাবে তার আগে সফুরা গ্লাসে পানি ভরে সামনে ধরল। জুবিন একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল গ্লাস ও সফুরার হাতের দিকে। চোখ তুলবে তখনই পায়ের আওয়াজ পেল। রবিন আসছে! জুবিন ছোঁ মেরে পানির গ্লাস নিয়ে বলল,
“রান্নাঘরে যা।”
সফুরা যেন প্রত্যাখ্যাত হলো। মলিন মুখে চলে গেল রান্না ঘরে। কিছুক্ষণ পর বেপরোয়া বাতাসের ন্যায় রবিনের প্রবেশ হলো এ ঘরে। শান্ত ও নীরব বসার ঘরে থালা, বাটি, গ্লাস টুংটাং বেজে ওঠে। চেয়ার শব্দ করে টেনে বসল রবিন। হাত না ধুয়ে বাটির ভেতর থেকে গোরুর কলিজার টুকরো মুখে পুরে নেয়। চিবোতে চিবোতে জুবিনের থম ধরা মুখে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে বলে,
“কী খবর, ব্রাদার?”
জুবিন জবাব নেয় না। প্লেট টেনে খাবার নিতে লাগল। রবিন আর মনোযোগ দেয় না। জুবিনের এই শীতল আচরণে অভ্যস্ত হয়ে গেছে ও।
কিছুক্ষণের মধ্যে খাবার টেবিলে এসে বসলেন মহসীন কবির। আজ তার পিছু পিছু জব্বার এলো। মহসীন কবির ভূঁইয়া জব্বারকে খেতে বসতে বললেন। জব্বার সবসময় জুবিনের পাশের চেয়ারে বসে। আজ রবিনের পাশে গিয়ে বসল। সকলের চোখে লাগল। বিশেষ করে মহসীন কবিরের। কিন্তু কিছু বললেন না। খাবার টেবিলে অন্য দিনের মতোই ঘরের কথা, বাইরের কথা নিয়ে টুকটাক আলাপ চলছিল। রবিন খেতে খেতে লক্ষ্য করল জব্বার খাচ্ছে না। প্লেটে শুধু ভাত নাড়াচাড়া করছে। তরকারি নেয়নি। জব্বার গোরুর গোশত পছন্দ করে। মজলিস বা যে কোনো অনুষ্ঠানে কেজি কেজি মাংস একা খেয়ে ফেলার রেকর্ড তার আছে। রবিন গোরুর গোশতের বাটিটা টেনে নিয়ে এলো৷ ভরে ভরে দু চামচ মাংস জব্বারের পাতে তুলে দিয়ে চাপা স্বরে বলল,
“কমই দিলাম। বয়স হইছে না? এখন মাংস কম কম খাওয়াই স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। বেশি খেয়ে পরে হার্ট ফেল করে মরে গেলে আমি জব্বার কাকা কই পাব? খাও!”
রবিন খেতে খেতে হাসল। জব্বার তাকিয়ে রইল প্লেটের মাংসের দিকে। কাঁপা হাতে মাংস তুলে মুখে দিলো৷ তারপর তাকালো রবিনের দিকে। জব্বারের চোখ টলমল। রবিন ভুরু কুঁচকে ফিসফিস করে বলল,
“কী হয়েছে?”
জব্বার ঠোঁট আলগা করলো। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে মহসীন কবিরকে দেখল। তারপর আবার রবিনকে। থমথমে মুখে হাসল। বলল,
“তেমন কিছু না, বাজান। পরে কমুনে। খাও, তুমি!”
মহসীন কবির তখনই চোখ তুলে তাকালেন। জব্বার অপ্রস্তুত হয়ে গেল। মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে গোগ্রাসে গিলতে লাগল।
দুপুর গড়িয়ে গেছে। বাড়িতে তখন সকলে খাওয়া-দাওয়া সেরে বিশ্রাম করছে। কলেজ থেকে ফিরে হামিদা গোসল করে নিলো। তারপর নিজের ও দাদিজানের ভেজা কাপড় নিয়ে বসার ঘর পেরিয়ে ছাঁদের দিকে এগিয়ে এলো। রান্নাঘরের সামনে সফুরার সঙ্গে দেখা। হামিদা এক বাক্যে ওর জন্য নিজের ঘর ছেড়ে দিয়েছে। পরনের কাপড় দিয়েছে। ভালো ব্যবহার করেছে। সফুরা কৃতজ্ঞ ওর কাছে। হামিদাকে ভারি বালতি টানতে দেখে বলল,
“আমাকে দে, আমি নেড়ে দিয়ে আসি। কত বেলা হলো খাসনি তো। তুই বরং খে নে গে।”
হামিদার সকল মানা উপেক্ষা করে বালতি টেনে ছাঁদে উঠে গেল। হামিদা চুপচাপ সেদিকে তাকিয়ে রইল। সফুরাকে দেখলে ওর মায়া হয় খুব।
শরীর ভেঙে গেছে, কিন্তু এক দন্ড স্থির নেই। বিরামহীন কাজ করে যাচ্ছে। হামিদার চেয়ে ভালো কাজের লোক। এজন্যই বোধহয় জেবুন্নেসা এত পছন্দ করেছেন সফুরাকে।
জীবন সফুরাকে দুঃখ ছাড়া কিছুই দেয়নি। তবুও ওই শুকনো, নির্জীব ঠোঁটে হাসির কমতি নেই। যেটুকু পেয়েছে ওইটুকু দু’হাতে আঁকড়ে ধরার সে কী আপ্রাণ চেষ্টা। আর হামিদা! ঠিক ওর উলটো। যেটুকু পেয়েছে সেটুকু গ্রহণ করতে পারছে না।
হামিদা হাঁপ ছেড়ে ধীর পায়ে ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। ওর জীবন বদলে যাচ্ছে। এই বদলের কারণ রবিন। ও যেন রূপকথার গল্পের সেই রাক্ষস। কিন্তু এই রাক্ষসের প্রাণ পাখি কোনো পিঞ্জরে বন্দি নেই। বরং হামিদার হৃদয়কে একটু একটু নিজের বশীভূত করতে চাইছে৷ পিঞ্জরে বন্দি করতে মরিয়া। শরীর তো আগেই দখল করে নিয়েছে। এখন হৃদয়ও ও চায়। হামিদা তা হতে দেবে না। রবিনকে হৃদয় সঁপে দিলে ওর থাকবে কী! বাঁচবে কী করে?
এই যে রবিন দূরে আছে, হামিদা বেশ আছে। নিজের মধ্যে আছে। রবিনকে ও চাইছে না। একদমই না। কিন্তু দাদিজানের ঘরের খোলা দরজার মুখে দাঁড়াতে হামিদার সেই চাওয়া থমকে গেল। রবিন দাঁড়িয়ে আছে ওর পড়ার টেবিলের কাছে। ওর উপস্থিতি টের পেয়ে তাকালো। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি। হামিদার বুকে কাঁপন ধরে। ওর সারা শরীরে ছড়িয়ে যায় সেই কাঁপন। বিবশ হাওয়া লাগে। দাদিজান হুইলচেয়ারে বসেছেন। ওকে দেখে হুইলচেয়ার ঠেলে এগিয়ে এলেন।
“বাইরের রোদে গিয়ে বসি। তুই খেয়ে নে!”
দাদিজান বেরিয়ে যাচ্ছিল। হামিদা হুইলচেয়ার টেনে ধরে,
“আমিও আসি!”
দাদিজান আড়চোখে রবিনকে দেখলেন। হামিদার এই কথা ও পছন্দ করেনি। হামিদাকে ও একান্তে চায়। কিন্তু তার নাতনি এসব বোঝেই না যেন। রবিনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে ওর। তাহলে স্ত্রীর হক আদায় করবে না? রবিনই যে এখন ওর একমাত্র উপায়! ওর ভবিষ্যৎ।
নাতনির হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললেন,
“পাগলামি করিস না। চুপচাপ ঘরে যা!”
দাদিজান চলে যাচ্ছেন। হামিদার বুক ভেঙে কান্না এলো। দাদিজান যেন গাঙে ভাসিয়ে দিয়ে গেল ওকে। রবিন অপেক্ষা করছে। ও মোটেও ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত নয়। কিন্তু হামিদা বারবারই ওর ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়। দাঁতে দাঁত কামড়ে দাঁড়িয়ে রইল। হামিদা আস্তে আস্তে ঘরে ঢোকে। দরজা বন্ধ করে। খিল আঁটতেই রবিন খপ করে ওর ঘাড় চেপে ধরে। ঠোঁটে ঠোঁট বসিয়ে ওর শ্বাস রোধ করল। হামিদা শ্বাস নিতে দু’হাতে খামচে ধরল রবিনের বাহু। রবিন সহজে ছাড়ল না। শ্বাস ওষ্ঠাগত হতে ছাড়ল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“এতকিছুর পরেও আমার কাছে আসতে এত দ্বিধা কেন তোর, হামিদা? কী চাস তুই? কীসের বিনিময়ে আমার হবি, পুরোপুরি। বল!”
“আমি আপনার হতে চাই না।” হামিদার সমস্ত মুখ লাল। রবিন আহত চোখে তাকালো। ওর কেন যে এই একটি কথা ভীষণভাবে আঘাত করল! এতটা যে হামিদাকে টেনে বিছানায় ফেললো। পরনের শার্ট ছুঁড়ে ফেললো মেঝেতে। হামিদাকে বিছানার ওপর চেপে ধরে। হামিদা ভাবল জোর করবে। অথচ, বাধা দেওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করল না। রবিন জোর করতে চেয়েছিল। রাগে মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল ওর। কিন্তু হামিদার আর্ত চোখ ওকে শান্ত করে দেয়। জড়িয়ে ধরে মুখ গুঁজল হামিদার কাঁধে। দুজনের কেউই আর কোনো কথা বলল না। হামিদা নিথর পড়ে রইল রবিনের নিচে। অনেকক্ষণ পর রবিন মুখ সরিয়ে আনল হামিদার গলার কাছে। চুমু খেল। তারপর চিবুকে৷
“হামিদা, এই হামিদা!” ডাকল রবিন।
হামিদা মুখ ফিরে রয়। সাড়া নেয় না। রবিন এক হাতে ওর মুখটা সরিয়ে নিয়ে এলো। হামিদা চোখ বুঁজে রইল। রবিন হাঁপ ছাড়ল। বলল,
“তুই চাস আমি তোকে মুক্তি দিই? অসম্ভব!”
হামিদার ঠোঁট কাঁপে। কিন্তু শব্দ বের হয় না। ভীষণ রাগ হয় রবিনের। এত জেদ! রবিন উঠে বসল। হামিদা সঙ্গে সঙ্গে উলটো পাশ ফিরে শোয়। রবিন নিজের চুলে অস্থিরভাবে আঙুল চালালো। বিয়ে করেছে, বাসরও করেছে তবুও হামিদা আর ওর মাঝের দুরত্ব শেষ হয় না কেন?
রবিন উঠে সিগারেট ধরালো। পায়চারি করে। হামিদা শুয়ে আছে একইভাবে। বাহুর আড়ালে মুখ লুকালো। দীঘল ভেজা চুল ছড়িয়ে আছে পিঠের কাছে। রবিন তাকিয়ে রইল ওর শরীরের দিকে। পা দুটো মৃদু নড়ছে। নিজেকে আর স্থির রাখতে পারে না রবিন। সিগারেট হাতে আবার গিয়ে বসল হামিদার শিওরে। সিগারেট ঠোঁটে গুঁজে হামিদার মুখের ওপর থেকে ভেজা চুল সরিয়ে দেয়। নড়ে ওঠে হামিদা। রবিন মুচকি হাসল। সিগারেট ঠোঁট থেকে সরিয়ে মেঝেতে ফেললো। মুখ নামিয়ে আনল। অন্য হাতে হামিদার চিবুক ধরে ঠোঁটে গাঢ় চুম্বন করল। নিকোটিনের ধোঁয়া মুখের ভেতর যেতে চকিতে তাকায় হামিদা। দু হাতে রবিনকে ঠেলে সরিয়ে উঠে বসে। অনবরত কাশতে লাগল। রাগে রবিনের গালে কষে দিলো এক চড়।
“ইতর!”
কী আশ্চর্য! রবিন হাসছে। মুহূর্তে ওর হাসি ক্রুর হলো। দৃষ্টি বুনো। হামিদার ঘাড় চেপে ধরে। কপালে কপাল, চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করল,
“এবার বল, কী চাস তুই?”
হামিদা নির্ভয়ে ওর চোখে চোখ রেখে বলল,
“সম্মান!”
চলবে…
#হামিদা(৫৯)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ
সোজা রাস্তার পাশ ধরে মোহনাদের বাড়ি থেকে ফিরছিল হামিদা। মাথায় ওড়না তোলা। একটা বাইক শো করে চলে গেল পাশ থেকে। কিন্তু কিছুদূর গিয়ে থেমে গেল। ঘুরিয়ে এসে সামনে দাঁড়াতে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে হামিদা। চোখ তুলে দেখে সরোয়ারকে। ওর ওমন হাসি দেখে গা শিউরে উঠল।
“তুই ভূঁইয়া বাড়ির ছেমরি না?” জিজ্ঞাসা করল সরোয়ার।
“জি, আসসালামু আলাইকুম!” হামিদা সংকুচিত হয়ে যায়।
সরোয়ার সালামের জবাব দেয় না। অকারণেই দাঁত বের করে হাসছে। বাংলা সিনেমার ডিপজলের মতো গোল গোল দুটো চোখ। ওর দৃষ্টি বড়ো অস্বস্তিকর। হামিদা পাশ কেটে একপ্রকার দৌড়ে বাড়ির দিকে ছুটে এলো। গেটের মুখোমুখি আসতে কোথা থেকে পথ আটকে দাঁড়ালো নয়না। চোখ লাল। কেঁদেছে বোধহয়। হামিদার হাত চেপে ধরে বলল,
“রবিন কোথায় রে, হামিদা? ওকে যে আমার খুব দরকার!”
হামিদা হাঁপাচ্ছে। ভুরু কুটি করল। আস্তে করে হাত ছাড়িয়ে বলল,
“কেন?”
“তোকে বললে বুঝবি না। ওকে দরকার আমার। ওর কাছে নিয়ে চল। নয়ত ওকে ডেকে নিয়ে আয়। দোহাই তোর হামিদা।”
বলতে বলতে কেঁদে ওঠে নয়না। হামিদা যতদূর জানে, রবিন এখন আর মেয়েবাজি করে বেড়ায় না। নয়নার সঙ্গে সেই কবেই না ওর সম্পর্ক শেষ! তাহলে এতদিন পর অশ্রু চোখে নয়না রবিনকে খোঁজে কেন? হামিদার চোখ-মুখ কঠিন হয়ে গেল। নয়নাকে বলল,
“বাড়ি আছে কি না জানি না। পুকুরপাড়ে দাঁড়াও বাড়ির ভেতর গিয়ে দেখে আসি!”
নয়না সজল চোখে হাসল। আনন্দে ও কৃতজ্ঞতায় হামিদাকে জড়িয়ে ধরতে গিয়েছিল। কিন্তু তার আগে হামিদা হনহনিয়ে বাড়ির পথে এগিয়ে গেল।
সফুরা বসার ঘরে এক ঝাকা ডাল নিয়ে বসেছে। পাথর বেছে পরিস্কার করছিল। হামিদাকে বাড়িতে ঢুকতে দেখে ডাকল,
“হামিদা শোন!”
“এখন না।”
সফুরা তাকিয়ে রইল। এই মেয়েটা কখনো তো ডাক উপেক্ষা করে না। ওর মুখ অত ভার কেন আজ? বান্ধবীর সঙ্গে ঝগড়া হলো না তো? সফুরা ডালে আঙুল নাড়িয়ে ভাবতে লাগল।
বাড়িতে তখন মর্জিনা আর জেবুন্নেসা ছিল না। সুতরাং হামিদা সোজা রবিনের ঘরে গিয়ে ঢুকলো। সফুরার খেয়াল নেই তাই টের পেল না। কিন্তু জুবিন বুঝতে পেল ও ঘর থেকে। আজকাল ও এসব সহ্য করে নেয়। আগের মতো আর খারাপ লাগে না।
রবিন বিছানায় শুয়ে মোবাইলে গেইম খেলতে খেলতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল। মোবাইলটা বুকের ওপর পড়ে আছে। হামিদা সেটা হাতে তুললো। তারপর শূন্যে তুলে ছেড়ে দিলো রবিনের বুকের ওপর। ঘুমের মধ্যে ব্যথায় ককিয়ে উঠল রবিন। কুঁকড়ে গেল বিছানার ওপর। বুকে হাত ডলতে ডলতে তপ্ত চোখে তাকালো। কিন্তু যেই না সামনে অগ্নিমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হামিদাকে দেখল, অমনি চোখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। উঠে বসে বুকে হাত রেখে বলল,
“মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। আমি কি স্বপ্ন দেখছি না কি রে, হামিদা? আয়, একখান চুমু দিয়ে ঘোর কাটিয়ে দিয়ে যা।”
রবিন হাত বাড়িয়ে হামিদার হাত ধরতে গেল। হামিদা ছিটকে সরে দাঁড়ায়। গোমড়া মুখে বলল,
“আপনার এক্স গার্লফ্রেন্ড খুঁজছে আপনাকে। যান, চাঁদ মুখখানা দেখিয়ে আসেন গিয়ে। আরও যদি কিছু করতে ইচ্ছে করে, সেটাও করে আসবেন!”
হামিদা দরজার দিকে যাচ্ছিল। ওর কেন যে এত খারাপ লাগছে। আঘাত করেছে রবিনের বুকে। কিন্তু ওর বুকের ভেতর পুড়ছে কেন! কয়েক পা এগিয়েছিল। রবিন পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় টেনে আনলো।
“ছাড়ুন বলছি!” হামিদা রবিনের বাহুডোরে ছটফট করছে ৷ রবিন ওর চুল সরিয়ে কাঁধে মুখ গুঁজল। আস্তে করে দাঁত বসালো। বলল,
“স্বেচ্ছায় এই প্রথম বউ হিসেবে আমার ঘরে ঢুকেছিস। আরে আজ তো আমার ইদের দিন। কোলাকুলি না করে ছাড়ব না কি, পাগলি!”
রবিনের সঙ্গে শক্তিতে পেরে ওঠে না হামিদা। ছটফট করে ক্লান্ত হয়ে গেল। চুপচাপ পড়ে রইল রবিনের নিচে। রবিন ওর শরীরটা খুব পছন্দ করে। সেই পছন্দের বহিঃপ্রকাশে বিন্দুমাত্র কার্পন্য করে না। হামিদা চুপ করে থাকে। কিন্তু আজ রবিন ওর বুকের ভাঁজে মুখ রাখতে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। জোর করে সরে বসল। চাদরে নিজেকে ঢেকে বলল,
“নয়না পুকুরপাড়ে অপেক্ষা করছে। যান!”
রবিন একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। ওর দৃষ্টি ক্রমশ বুনো হয়ে ওঠে। হামিদার চোয়াল চেপে ধরে বলে,
“নয়না পুকুরে ডুবে মরুক। খবরদার, যদি বলেছিস ওর কাছে আমাকে যেতে।”
“কেন বলব না? একশ বার বলব। প্রেমিকা ছিল না আপনার? কেঁদে কেঁদে এখনও খোঁজে কেন ও আপনাকে? আমিও কি পাগল? আমার তো বুঝা উচিত ছিল। আপনার মতো ছেলেরা এক নারীতে কখনো আটকে থাকতে পারে না। তাদের ঘরে-বাইরে দু জায়গায় নারীর দরকার পড়ে। বড়ো মন কি না!”
ঘৃণায় মুখ কুঁচকে গেল হামিদার। খোঁচাটা বড্ড লাগল রবিনের। হামিদার সুন্দর গালে ওর আঙুল বসে গেল। কিন্তু পর মুহূর্তে ক্রুর হাসল। ঝুঁকে কপালে কপাল রেখে বলল,
“কী রে বিল্লি, জেলাস?”
মুহূর্তে মুখ বদলে গেল হামিদার। রবিনকে দু হাতে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইল। রবিন ফের বাহু বন্ধনে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে।
“আমাকে ছেড়ে দিন। দোহাই লাগে আপনার। পায়ে পড়ি। ছাড়ুন!”
হামিদার চোখ গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। ও জানে না কেন রাগে কাঁপছে! কেন কাঁদছে! রবিন ওর মাথাটা বুকের ওপর জড়িয়ে ধরে। চুলে হাত বুলাতে লাগল৷ শুনল হামিদা নাক টানছে। রবিনের মুখ মলিন হয়ে ওঠে। সময় নিয়ে বলল,
“নয়নার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই রে, হামিদা। তুই ছাড়া সব নারী পরনারী আমার কাছে। নয়না কেন কাঁদছে আমি জানি। জানার ঠেকাও নেই। কিন্তু তুই কাঁদিস না। তোকে কাঁদতে দেখলে বড়ো ঠেকায় পড়ি আমি।”
“কেউ দেখে ফেলবে। আমি যাই!” রবিনের সব কথা উপেক্ষা করে বলল হামিদা। রবিনের মনে হলো হামিদা ওকে অবিশ্বাস করে এখনও। সত্য বলার পরেও! অভিমান হলো। বাহুডোর খুলে দিলো। হামিদা কাপড় পরে দরজার কাছে যেতে রবিন ওর হাত টেনে ধরে,
“তুই আমাকে বিশ্বাস কর, হামিদা!”
“বিশ্বাস করব আপনাকে? বিশ্বাস অর্জন করতে হয়, জানেন? কী করেছেন আপনি? প্রতারণা, ছলনা, মিথ্যা, জোর এই তো আমাদের সম্পর্কের ভিত। মোহনার বোন বিয়ের পর তার স্বামীর কাছ থেকে ডায়মন্ডের নাক ফুল আবদার করেছিল। আর আমি চেয়েছিলাম সম্মান। ওই আমি অলংকার ভেবে পরতে চেয়েছিলাম। আপনি তো দিতে পারেননি। জানেন, নিজের ওপর মাঝে মাঝে খুব রাগ হয়। আপনার কাছ থেকে নিজেকে কত যে দূরে রাখতে চাই আমি৷ পারি না। কেন পারি না বলতে পারেন? কেন ক্রমশ আপনার খেলার পুতুলে পরিণত হচ্ছি? আমি পুতুল না, মানুষ।”
হামিদা হাত ছাড়িয়ে নিলো। চোখ মুছে বলল,
“আমার বড়ো কষ্ট হয়। কিন্তু আপনি তা বুঝবেন না। আমি আজ আর বুঝাতেও যাব না। আমাকে সম্মান দিতে না পারেন কলঙ্ক দেবেন না। আমার মায়ের কলঙ্কের ভাগ এখনো আমি বয়ে বেড়াচ্ছি। আপনিও যদি ওই একই কলঙ্ক আমাকে দেন, আমার যে বাঁচা দায় হয়ে যাবে। দোহাই আপনার, করুণা করবেন!”
হামিদা ওড়নার ঘোমটায় চোখের পানি গোপন করে চলে গেল। রবিন শূন্য হাতে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টে। হামিদার এক একটা কথা ওর কানে শেলের মতো বিঁধল। আস্তে আস্তে বিছানায় এসে বসল। তারপর শুয়ে পড়ল সটান হয়ে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“তুই যদি বুঝতে পারতি আমাকে হামিদা!”
পরক্ষণেই ওর ছায়া হয়ে কেউ হেসে উঠল,
“তোকে বুঝবে হামিদা! তুই নিজেকে বুঝিস?”
দাবার বোর্ড সাজিয়ে অফিস ঘরে বসে আছেন মহসীন কবির ভূঁইয়া। তিনি ডান হাতে কালো গুটির পক্ষে খেলছেন। আর বা হাতে সাদার। সাদা নগন্য গুটিটাকে টপকে যেতে পারলে খুব সহজে রানিকে কব্জা করা যায়। কিন্তু ডান হাতের হাতিকে এগিয়ে দিতে ফাঁদে পড়লেন। এবার কালো গুটির রানি ঝুঁকিতে। রাজার অবস্থান বেশ দূরে। সেখান থেকে সাহায্য করা ঝুঁকিপূর্ণ। মহসীন কবির ভূঁইয়া দেখলেন রানিকে বাঁচাতে এবার তাকে বিসর্জন দিতে হবে হাতিকে৷ তিনি তা করবেন না। প্রতিপক্ষের নগন্য গুটিটা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে এগিয়ে আসছে। ওটাকে রুখতে গিয়ে বিশপ হারাল ডান হাত। এবার নড়েচড়ে বসলেন। রানির খুব কাছে ফাঁদ পাতলেন। ও পাশের ঘোড়াটি এগিয়ে আসছে এক ঘর তীর্যকভাবে। লাফিয়ে সামনের কালো নগন্য গুটিটাকে খেয়ে নিলো। তারপর কালো ঘোড়াটিকে। মহসীন কবির মুচকি হাসলেন। তার দৃষ্টি স্থির সাদা নগন্য গুটিটার দিকে। দেখতে সামান্য, কিন্তু বা হাতের চালে ক্রমশ ও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। না, ওকে রানির কাছাকাছি আসতে দেওয়া যাবে না। তার আগেই চেকমেট করবেন।
“ভূঁইয়া সাব, ডেকেছেন আমাকে?”
মহসীন কবিরের ধ্যান ভাঙল। জব্বারের নিচু ও খানিক আর্ত মুখে তাকালেন। তাকিয়ে রইলেন৷ তারপর দাবার গুটি সেভাবে রেখে অ্যাশট্রের আধপোড়া সিগারেট তুললেন দু আঙুলে। এক টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন শূন্যে। বড়ো মায়া গলায় ডাকলেন,
“জব্বু, অত দূরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? আয়, কাছে আয়!”
জব্বারের মনে কেবল আতঙ্ক নয় বরং অপরাধবোধও। তাতেই ওর ওমন লম্বা চওড়া শরীর কুঁজো হয়ে গেল। ধীরে পায়ে এগিয়ে গেল মহসীন কবিরের হাতের কাছে। চোখের পলকও বোধহয় ফেলেনি। মুহূর্তে শিকারির মতো দাঁড়িয়ে ক্ষিপ্র হাতে জব্বারের ঘাড় ধরে মাথা চেপে ধরলেন টেবিলের ওপর, ঠিক দাবার বোর্ডের সামনে। জব্বার আতঙ্কিত চোখ মেললো। দেখল সাদা সেই সামান্য গুটিটাকে।
“কুত্তার বাচ্চা, এতগুলো দিন পেরিয়ে গেল তবুও তোর খোঁজ শেষ হয় না। নাটক করিস! তুই কি ভেবেছিস, তোর মতো কুকুর পুষি কাঁচা মাথা নিয়ে? তোর মুখ দেখলে পড়ে নিতে পারি আমি! তুই নিজেও একথা ভালো করে জানিস। তবুও ভং ধরে আছিস কেন? কেন সত্যি বলছিস না! কেন?”
জব্বারের মনে হলো ওর মাথা মহসীন কবিরের রুক্ষ হাতের পেষণে চুরমার হয়ে যাবে। সে কী যন্ত্রণা। চোখ ছলছল করে। না, শরীরের ব্যথার চেয়েও বেশি মনের ব্যথা। এই হাতে কত অপরাধ করেছে। দয়া-মায়া সে ওর মাথার কাঁচা চুলের সঙ্গে সঙ্গে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। তবে কেন মনটা শঙ্কায় কেঁপে ওঠে! কেন মায়ার মোহে এত বছরের প্রভুভক্তি ভুলে গেল!
“কথা বলছিস না কেন রে, হারামির বাচ্চা! এই জন্য এত বছর তোকে নিরাপত্তা দিয়েছি, অন্ন দিয়েছি? কী করিনি তোর জন্য আমি জব্বার? নিজের আপনজনদের উপরে তোকে ভালোবেসেছি। আপন ভাইয়ের অধিক জেনেছি। আর তুই? এভাবে ধোঁকা দিলি? এভাবে!”
দুঃখ ভারাক্রান্ত মহসীন কবিরের গলার স্বর। জব্বারের মুখ বদলে গেল। ওর ভেতরের প্রভুভক্ত দাসটার চেতনা ফিরল যেন। মহসীন কবিরের সামনে আজ আর জব্বার কিছু লুকাতে পারবে না। ওকে আজ মুখ খুলতেই হবে। কিন্তু তারপর! জব্বার চোখ বন্ধ করে। তারপর আবার তাকালো। দাবার কালো হাতিটি পড়ে আছে। সাদা নগন্য গুটিটার পেছনে দাঁড়িয়ে জব্বারকেই যেন দেখছে রাজা ও রানি। মহসীন কবির অধৈর্য হয়ে উঠলেন। জব্বারের শ্বাস রোধ হয়ে এলো। শ্বাসরুদ্ধ গলায় বলল,
“ক্ষমা করে দিন আমাকে, ভূঁইয়া সাব। ভুল করেছি আমি। প্রায়শ্চিত্ত করব। সব সত্য বলব আমি। সব!”
চলবে….
#হামিদা(৬০)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ
স্থানীয় বিশিষ্ট এক ব্যক্তির মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে আন্ত: থানা ফুটবল ম্যাচ আয়োজিত হবে আগামী সপ্তাহে। রবিন ও ওর দল অংশগ্রহণ করবে এতে। সকাল-বিকাল প্রাকটিস করছে।
বিকেলের রোদ পড়ে গেছে। সূর্য ডুবে গোধূলি লালিমায় ছেয়ে গেছে পশ্চিমের আকাশ। গ্রামাঞ্চলে এই সময় দূরে কুয়াশায় ঢেকে যায়। আকাশে উড়ে যায় ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। ওরা নীড়ে ফিরবে। হাটুরে মেঠো রাস্তা ধরে আপন গৃহে ফিরে যাচ্ছে।
কোচ মাহবুব আলম বাঁশিতে ফু দিয়ে আজকের মতো প্রাকটিস মুলতবি করলেন। সকলে থেমে গেলেও রবিন থামল না। বলটাকে ও পায়ের আঘাতে মাঠের এ মাথা থেকে ও মাথা নিয়ে যায় দৌড়ে। এই শীত শীত আবহাওয়াতেও দরদর করে ঘামছে। মাহবুব আলম অর্থনীতি বিভাগের রাগী শিক্ষক নামে পরিচিত। রবিন অবশ্য তার পছন্দের ছাত্র। তাই বলে কি আদেশ অমান্য করবে!
“রবিন!”
আরমান কিছু আঁচ করল। রবিন নিজের মধ্যে নেই। ও যেন ঘোরের ভেতর খেলে যাচ্ছে। রুষ্ট মাহবুব আলমকে বলল,
“ফুটবল পেলে ব্যাটা বেহুঁশ হয়ে যায়। আপনি যে ডেকেছেন সে হুঁশ পর্যন্ত নেই ওর। একেবারে আপনার যোগ্য শিষ্য।”
মাহবুব আলম রবিনের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে ভুরু কুঁচকালেন। আসলেই ছেলেটা বেহুঁশের মতো খেলে যাচ্ছে। যেন ওর চতুর্দিকে কেউ নেই। কিন্তু এভাবে তো শিক্ষা দেননি।
হাত ঘড়ি দেখলেন। পৌনে ছয়টা বাজে। ছোটো মেয়েটার ঠান্ডা লেগেছে। বড্ড জ্বালায় মাকে। তিনি বাড়িতে ফিরলে স্ত্রীর সুবিধা হয়। রবিনের চিন্তা তাই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে বললেন,
“তোরা সব গুছিয়ে বাড়ি ফিরে যা। কাল আবার সময় মতো এখানে চলে আসিস। ওই উজবুকটাকেও বলে দিস। গেলাম আমি!”
মাহবুব আলম সাইকেলে প্যাডেল মেরে চলে গেলেন বাড়ির দিকে। একে একে সকলে তাকে অনুসরণ করতে তৈরি। কিন্তু রবিনকে ওরকম দেখে ওরা যেতে পারল না। ওর আজ হয়েছে কী!
আরমান এগিয়ে গেল। রবিন ওকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে বসল। বল সুকৌশলে পাশ কাটিয়ে ছুটে গেল। আরমানের হাঁপ ধরে যায়। এত যে ডাকছে,
“রবিন, এই রবিন, থাম!”
রবিনের চেতনা এলেও দৌড়াচ্ছে বল পায়ে ঠেলে। হাত নাড়িয়ে বলছে,
“তোরা যা!”
দলের বাকিরা নিজেদের মধ্যে এ নিয়ে কথা বলতে বলতে বাড়ির পথে রওয়ানা হলো। কিন্তু আরমান বন্ধুকে এভাবে রেখে যাবে না। রবিনের জার্সি টেনে ধরে মাঠের ঘাসের ওপর ফেলে দিলো। পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে বলল,
“তোর কী হয়েছে আজ?”
রবিন ঘন ঘন শ্বাস নিলো। ক্রোধিত চোখে তাকিয়ে উঠে বসল। বলল,
“আমার গুষ্টির ষষ্ঠী হয়েছে রে, শালা। খুশি?”
“রবিন!” বন্ধুর সে ডাক উপেক্ষা করে রবিন বলটা বগলদাবা করে রাস্তার দিকে চললো। ওর বড়ো হাসফাস লাগছে। সারা শরীর অবসন্ন। দুপুরে কিছু খায়নি। সেই সকালে মায়ের জোরে দু গাল খিচুড়ি খেয়েছিল। তারপর আর বাড়িমুখো হয়নি। বাড়ি গেলে হামিদার মুখোমুখি হতে হবে। ওর সেই কথা রবিন ভুলতে পারে না।
রবিন রাস্তায় উঠতে আরমান দৌড়ে এলো। পেছন থেকে জার্সিটা টেনে ধরে।
“সত্যি করে বল তোর কী হয়েছে? দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুণি মাথা ঘুরে পড়ে যাবি। রবিন, বল না!”
রবিন ছিটকে সরে গেল। ক্ষুধা পেটে ওর মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। বলে,
“সব সময় প্যানপ্যানানি না করলে হয় না তোর? কিছু হলেও তোকে বলতে যাব কেন? কী হোস রে শালা তুই? মর দূরে গিয়ে!”
রবিন হনহনিয়ে হাঁটতে লাগল। রবিনের রাগ হঠাৎ বৃষ্টির মতো। এই আছে আবার এই নেই। আরমান ওসব কথা গায়ে লাগায় না। একটু পরে এসেই গলা জড়িয়ে ধরে বলবে,
“চল শালা, সিগারেট ফুঁকে আসি।”
আরমানের ভয় জব্বার আর মহসীন কবির ভূঁইয়াকে নিয়ে। সেদিন রবিনদের বাড়ি থেকে ফেরার পথে জব্বারের সঙ্গে দেখা। কেমন নির্মম চোখে তাকিয়ে ছিল ওদের দিকে। রবিনের আত্মবিশ্বাস ক্রমশ অতীব হয়ে উঠেছে। যা ঠিক নয়৷ ও ভাবে জব্বারকে সহজে ঘোল খাইয়ে দিয়েছে। কিন্তু আরমানের মন তা মানে না। আজ রবিনকে ওমন বেখেয়াল হতে দেখে ওর ভেতরটা ছমছম করে। বন্ধুত্বের সম্পর্ক মাঝে মাঝে রক্তের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। আরমান রবিনের ক্ষতির চিন্তা করতে পারে না। ওর বিপদ আশঙ্কায় সর্বদা শঙ্কিত থাকে৷
একলা বাড়ির পথে ফিরছিল আরমান। সামনে বাজার। ওর ছোটো বোন চুল বাঁধার রঙিন ফিতা চেয়েছিল। আরমানের পকেটে কিছু টাকা আছে। তাই দিয়ে দুটো লাল রঙের ফিতা আর কিছু খোলা চানাচুর কিনে নিলো। ওর বোন দেখলে খুব খুশি হবে আজ।
ফিতা ও চানাচুরের প্যাকেট হাতে নিয়ে বোনের হাসি মুখ ভেবে বাজার থেকে বেরিয়ে এলো আরমান। সামনে ঘন অন্ধকার। আকাশে চাঁদটা ম্লান। হঠাৎ হঠাৎ ঝিঁঝি পোকা ডেকে উঠছে। আরমান হাঁটতে হাঁটতে দেখল পাশের ঘন ঝোপের মাঝের জারুলতলায় কে একজন দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকার পড়েছে মুখের ওপর। আরমানের একটু ভয় ভয় করল। হাঁটার গতি কমিয়ে দিলো।
“কে ওখানে?” বলল আরমান। চেষ্টা করেও ওর গলার স্বর স্থির রইল না। দু তিনবার ডাকার পরেও যখন সাড়াশব্দ এলো না তখন আরমান ভয় পেল। এগোবে না। বাজারের দিকে ফিরবে তখনই পরিচিত গলায় ওকে ডাকল,
“আরমান!”
আরমান জমে গেল। পরমুহূর্তে প্রাণপণে দৌড়াতে লাগল। বাজারের আলো দেখা যাচ্ছে। এদিকে কেউ আসছে।
“রবিন!”
আরমান বেশিদূর যেতে পারল না। কেউ সজোরে ওর মাথায় আঘাত করল। পড়ে গেল রাস্তার মাঝে। অচেতন হওয়ার পূর্বে টের পেল কেউ ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার ঝোপের আড়ালে। সেই অমাবস্যার ছমছমে রাতে মাঝ রাস্তায় পড়ে রইল রঙিন ফিতা আর চানাচুর।
রবিন উগ্র মেজাজে বাড়ি ফিরল। আরমানটা রাগ করেছে বোধহয়। নয়ত ফিরে গিয়ে কোথাও ওকে আর খুঁজে পেল না কেন!
“শালাকে কাল পাই। ওর পিন্ডি চটকাবো।”
রবিন বাইক নেয়নি। বাইকের ব্রেক ঠিকমতো কাজ করছে না। ফুটবল ম্যাচের পরে মেকানিকের কাছে নিয়ে যাবে। ততদিন পায়ে হাঁটবে নয়ত সাইকেল ভরসা। হাতের ময়লা বলটা বাড়ির সামনে ফেলে ভেতরে এলো রবিন। জেবুন্নেসা বসার ঘরে ছিলেন। তার মাথা কেমন করছে। সফুরা তরকারি নামিয়ে এসে তেলপানি নিয়ে দাঁড়ালো পাশে। রান্না ঘরে থালা বাসন পরিষ্কার করছে মর্জিনা। রবিন ঢুকতে উঁকি দিলো। বিড়বিড় করে বলল,
“আইছে নবাবের বাচ্চা!”
জেবুন্নেসা সারাদিন পর ছেলেকে দেখে বললেন,
“ওই দ্যাখ সফুরা, আমার সুপুত্র ফিরেছে। যা যা ধান দুর্বা সাজিয়ে নিয়ে আয়। আরে উলু দিয়ে বরণ করতে হবে যে!”
রবিন মায়ের কটাক্ষ গায়ে মাখল না। জার্সি খুলে বসার ঘরের সোফার উপর ফেললো। ফ্যান ফুল স্প্রিডে ছেড়ে সেখানে বসে মর্জিনাকে ডাকল,
“খালা, এক গ্লাস পানি দিয়ে যাও!”
ছেলে যে তাকে উপেক্ষা করল তা সহ্য হলো না জেবুন্নেসার। স্বামীর অবহেলা পেলেন, বড়ো ছেলের রূঢ় আচরণ। থাকার মধ্যে ছিল তার রবিন। সেও এখন মাকে উপেক্ষা করে। কথা শোনে না।
“সারাদিন কই ছিলি? মুখ পুড়িয়ে অমাবস্যার চাঁদ বানিয়ে এসেছিস। নাওয়া খাওয়া নেই। দিন দিন বড়ো হচ্ছিস না ছোটো? এই কি তোর আক্কেল! আর কত জ্বালাবি আমাকে তোরা!”
“পানির গুষ্টি কিলাই!”
রবিন উঠে দাঁড়ায়। এত অধঃপতন! জেবুন্নেসা তব্দা খেয়ে গেলেন। সফুরার হাত থেকে চুল ছাড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন,
“কী বললি তুই?”
“বলেছি আমি মরলে বোধহয় শান্তি হতো তোমার। জন্মের পর নুন মুখে দিয়ে মেরে ফেললেই তো এত জ্বালা পোহাতে হতো না!”
জেবুন্নেসা ঝড়ের গতিতে এসে ছেলের মুখে ও বুকে এলোপাতাড়ি চড় কিল দিলেন। রবিন টু শব্দ করল না। মাকে ওভাবে বলা উচিত হয়নি। আরও আঘাত করুক। রবিনের প্রাপ্য ওই। সফুরা দু হাতে জড়িয়ে ধরল রাগে কম্পিত জেবুন্নেসাকে। রবিনকে বলল,
“ঘরে যান রবিন ভাই!”
রবিন ঘরে যেতে যেতে শুনলো জেবুন্নেসা ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। দরজার মুখে জুবিনকে দেখল। ওর চাহনিতেও কটাক্ষ! রবিনের মাথা ঘুরে গেল। ঘরে গিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। কখন যে জ্ঞান হারালো জানে না।
চেতনা ফিরল কপালে কোমল হাতের স্পর্শে। ওর মা ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। রবিন পিটপিট করে চোখ মেললো। মাথার কাছে বসে পানি দিচ্ছে মর্জিনা৷ রবিন চোখ মেলে তাকাতে জেবুন্নেসা শব্দ করে কেঁদে উঠলেন,
“ওরে আমার আব্বারে!”
রবিন হাত বাড়াতে গিয়ে বুঝল কাঁপছে। সারা শরীর ব্যথায় টনটন করছে। গায়ে মোটা কম্বল জড়ানো। চোখ পুড়ছে খুব। মায়ের চোখ মুছে দিয়ে দুর্বল গলায় বলল,
“কাঁদবে না। চুপ করো!”
কিন্তু জেবুন্নেসা কান্না থামালেন না। রবিনের বুকের ভেতর বড়ো পীড়া হলো। উঠে বসতে গেলে জেবুন্নেসা বাধা দিলেন। বললেন,
“জ্বরে কাঁপছিস যে। উঠিস না সোনা আব্বার আমার। কী লাগবে বল, মা এনে দেবে!”
রবিন শুয়ে রইল। জ্বরের তাপে পোড়া চোখজোড়ায় বুলিয়ে নিলো বিদ্যুতের আলোক উজ্জ্বল ঘরের ভেতর। যাকে খুঁজল তার নাম নিশানা পেল না। জ্বরের আর কী তাপ! বুকের পোড়া যন্ত্রণা ওসব তাপ থেকে বহুগুণ বেশি।
জেবুন্নেসা ছেলের মাথা শরীর মুছে দিলেন। তারপর জোর করে দু মুঠো ভাত ও মাছের ডিম মেখে খাইয়ে দিলেন। ওষুধ খাইয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“এবার একটু ঘুমা, আব্বা। আল্লাহ আল্লাহ করি যেন সকালে জ্বরটা পড়ে যায়!”
জেবুন্নেসা উঠতে গেলে রবিন মায়ের হাতটা ধরে। বুকের কাছে নিয়ে ভাবে ক্ষমা চাইবে। কিন্তু সংকোচে সেটা আর পারে না।
ছেলেকে খেতে ডাকতে এসে জ্বরে কাঁপতে দেখেই জেবুন্নেসা সব ভুলে গিয়েছিলেন। অন্য হাতে ছেলের ভিজে চুলে হাত বুলিয়ে বললেন,
“আচ্ছা ঘুমা। আমি আছি বসে!”
রবিন বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু মাঝরাতে জ্বরটা এত বাড়ল! শরীর পুড়ে যাচ্ছিল। ঘুম ভেঙে গেল ওর। অন্ধকার ঘরে শিওরে কাউকে বসে থাকতে দেখল। জ্বরের ঘোরে ডাকল,
“মা, মা!”
একটা কোমল, পেলব হাত ওর কপাল ছুঁয়ে দিলো। এ ওর মায়ের স্পর্শ নয়!
“কে?”
“আমি, হামিদা!” নিচু গলায় জবাব দিলো। রবিন কাঁপা হাতে সরিয়ে দিলো কপাল থেকে হাতটা। বলল,
“কেন এসেছিস? মরছি কি না দেখতে?”
হামিদা চুপ করে রইল। তারপর বলল,
“গায়ে তো অনেক জ্বর। পানি এনে মাথা ধুয়ে দিই।”
হামিদা উঠতে গেলে রবিন ওর হাত চেপে ধরে,
“খবরদার হামিদা, খবরদার দয়া দেখাবি না আমাকে!”
হামিদা আনত হলো। বলল,
“আপনাকে দয়া দেখাব সে দুঃসাহস কি আমার আছে?”
“নাটক করিস না। তোর কথা শুনে মাথা ধরছে, বমি আসছে। দূর হ আমার চোখের সামনে থেকে!”
অথচ, হাতটা ধরে আছে ওর। খেয়াল হতে সাপ ধরেছে যেন এমনভাবে ছেড়ে দিলো। বলল,
“বেরিয়ে যা আমার ঘর থেকে। কোনোদিন আর আসবি না, যা!”
হামিদা গেল না। জ্বরে কাঁপছে রবিন। কথা বললে বমির উদ্রেক হয়। চুপচাপ রইল। কম্বল জড়িয়ে চোখ বন্ধ করল। একটু পর হামিদা বেরিয়ে গেল। রবিন নিঃশব্দে হাসল। ওর বুক পোড়ে, চোখ পোড়ে। পুড়ছে সারা শরীর। চোয়াল কঠিন হয়ে ওঠে। ওর ইচ্ছে হলো টলতে টলতে গিয়ে হামিদার চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে আসতে। কিন্তু তা ও করবে না। হামিদা ওকে চায় না। একটুও না। হয়ত ঘৃণা করে। কী আশ্চর্য! এতকাল এসবে রবিনের কিছু এসে যায়নি। আজ কেন ভাবতেই অসহ্য লাগছে।
হঠাৎ পায়ের আওয়াজ পেল। আলো পড়ল চোখের পাতায়। রবিন চোখ মেললো না। হামিদা পানির বালতি টেনে এনে রাখল মাথার কাছে। রবিনের মাথা একটু তুলে লম্বা পলিথিন ছড়িয়ে দেয় বালতি পর্যন্ত। তারপর শিওরে বসে পানি ঢালতে লাগল। একটু পর পর মাথায় হাত বুলালো। কপাল ধুয়ে দিলো। ওড়না ভিজিয়ে মুখ মুছে দেয়। রবিন শুকনো গলায় ঢোক গিললো। রাগ করার বৃথা চেষ্টা করে বলল,
“এলি কেন! বেরিয়ে…! ”
হামিদা মৃদুস্বরে ধমকে ওঠে,
“চুপ করুণ! সবসময়ই খবরদারি করতে থাকে। আমার যখন ইচ্ছে হবে এ ঘরে আসব। বের করে দেখান দেখি।”
অন্য সময় হলে হয়ত হামিদার বিনুনি নয় ঘাড় চেপে ধরে বলত,
“তোর এত স্পর্ধা, আমাকে ধমক দিয়ে কথা বলিস!”
কিন্তু এখন মুচকি হাসল রবিন। জ্বরের ঘোরে বোধহয় মাথা খারাপ হয়ে গেছে ওর। নয়ত কি ভাবে, জ্বরটা ওর কোনোদিন না সেরে যাক। মাথায় পানি দেওয়ার অজুহাতে হামিদা এমনি করে পাশে বসে থাকুক, সারাজীবন! ভেজা মাথাটা হামিদার কোলে রাখল। এত যন্ত্রণা ও কষ্টেও ওর শান্তি শান্তি লাগছে৷
চলবে…

