#হামিদা(৬৪)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ
আরমান বাড়ি ফিরেছে। তবে ওর বা’হাতটার শক্তি আগের মতো নেই। ডাক্তার নিষেধ করেছেন এ হাতে ভারি কিছু তুলতে। আরমান তবুও চেষ্টা করে। কিন্তু চেষ্টা সফল হয় না। বরং ব্যথা বাড়ে। ওই ব্যথাতুর হাতটা নাড়িয়ে রবিনকে ও ডাকে,
“এই রবিন, রবিন শোন!”
রবিন শুনেও শোনে না। পালিয়ে বেড়ায় ওর কাছ থেকে। লোকের কাছে বলে,
“আরমান এখন আর আমার বন্ধু না। ওর কথা আমার সামনে কেউ বলবে না, খবরদার!”
আরমান জানে এ রবিনের মনের কথা নয়। কেন এসব বলে সেটাও জানে। জব্বার ও মহসিন কবির ভূঁইয়ার কারণে৷ পাছে জব্বার আবার রবিনকে শিক্ষা দিতে আরমানকে অপহরণ করে, আঘাত করে! আরমান রবিনের জীবনের অন্যতম দুর্বলতা। রবিনকে বশ করতে, নত করতে খুব সহজে ওর বিপক্ষ শক্তি এই দুর্বলতা কাজে লাগাবে। তাই তো রবিন আরমানের বন্ধুত্বকে ত্যাগ করতে চায়। যেমন করে হামিদাকে ত্যাগ করার ভাঁড়ামি করে।
আরমান কলেজে এসেছে। সেশন জটে আঁটকে থেকে অবশেষে পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা হয়েছে। রোজার ইদের পরে থার্ড ইয়ার ফাইনাল পরিক্ষা। কিন্তু রবিনকে এই কদিনে কলেজের চৌহদ্দির মধ্যেও দেখেনি। ও কী পড়াশোনাও ত্যাগ করার কথা ভাবছে না কি! কী চলছে ওর মগজে!
রবিনের বন্ধুমহল পরিবর্তন হয়েছে। আজকাল সরোয়ার সঙ্গে দেখা যাচ্ছে বেশি। বাকি সময় পিতার রাজনৈতিক কাজে ব্যস্ত থাকে। জব্বারের সঙ্গে শীতল সম্পর্ক ওর। বাড়িতে কারো সঙ্গে তেমন কথাবার্তা বলে না। হাসে না, ঠাট্টাতে মাতে না। ক্রমশ ওর মুখের ভাব বড্ড দুর্বোধ্য হয়ে যাচ্ছে। সেই সকালে বের হয় আর বাড়ি ফেরে রাতে রবিন। কোনো কোনোদিন ফেরে না। কোথায় যায়, কোথায় থাকে কেউ বলতে পারে না।
হামিদা পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে এলো। ওদের কলেজ ভবনে মেরামতের কাজ চলছে। তাই দুর্ভাগ্যবশত এবার ওর পরীক্ষা হচ্ছে রবিনদের কলেজে। আর সৌভাগ্যের কথা, এখানে কোথাও ওই মানুষটাকে দেখেনি। পরক্ষণেই অনুভব হয় রবিনকে দেখতে না পাওয়া এখন আর সৌভাগ্য নয়।
হামিদার মনটা ভার হয়ে ছিল। সব উত্তর লিখে আসতে পারেনি বলে এখন চোখ ছলছল করছে৷ কী যে খারাপ লাগছে। অথচ, ওই উত্তরগুলো ও পারত। শুধুমাত্র হাতের লেখার গতি কম বলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সবগুলো উত্তর করে আসতে পারেনি। হামিদার সহপাঠীরা ওর মন খারাপের কারণ শুনে সান্ত্বনা দিলো। তারপর যে যার পথে চলে গেল। হামিদা কলেজের মাঠ পেরিয়ে সড়কের পাশে দাঁড়ালো। অপেক্ষা করছে গাড়ির জন্য।
“হামিদা!” পেছন থেকে খাতা হাতে দৌড়ে এলো আরমান। বলল,
“খবর কী তোমার? কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনার খবর কী?” বলল হামিদা। আরমান মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আছি এক রকম। পরীক্ষা কেমন হলো?”
“মোটামুটি।”
“মন খারাপ না কি? সব লিখতে পারোনি?”
হামিদা আনত হয়ে দুদিকে মাথা নাড়ায়। আরমান সান্ত্বনা দিলো,
“আরে, এসব নিয়ে মন খারাপ কোরো না। প্রথম পরীক্ষা সবারই ওমন খারাপ হয়। পরের গুলো ভালো হবে।”
হামিদা চুপ করে বলল,
“আরমান ভাই, আপনার হাতের অবস্থা এখন কেমন?”
আরমান ম্লান হাসল,
“আছে কোনোরকম। আমার হাতের খবর কে বলল তোমাকে? রবিন?”
তেতে উঠল হামিদা,
“দুনিয়াতে আর কেউ নেই? ওর নাম নেবেন না আমার সামনে।”
আরমান হাঁপ ছাড়ল। হামিদা লজ্জায় পড়ল ওভাবে বলে। আরমান বলল,
“তোমার সঙ্গে কিছু কথা ছিল আমার। খিদে পেয়েছে না? চলো ওই হোটেলে গিয়ে বসি!”
“না, না, খিদে পায়নি আমার!” তড়িঘড়ি বলল হামিদা। আরমান শুনলো না। বলল,
“ধুর, লজ্জা পেলে চলবে! বন্ধুর বউ বলে কথা। আপ্যায়ন না করে যেতে দিলে বন্ধু আমার বারোটা বাজিয়ে দেবে না! এসো তো!”
” আরমান ভাই!” হামিদার কোনো বাধা শুনলো না আরমান। অগত্যা ওর পিছু পিছু যেতে হলো হামিদাকে।
আরমান ওকে নিয়ে বসল একটি নিরিবিলি খাবার হোটেলে। দুজন টেবিলের দুপাশে বসেছে। হামিদার ভারী লজ্জা লাগছে। আরমান ডাইরিটা টেবিলের একপাশে রেখে বলল,
“কী খাবে?” সরাসরি তাকালো না আরমান। হামিদা সলজ্জে বলল,
“খাব না কিছু। কী বলতে চাচ্ছিলেন যেন?”
“আগে খাবার অর্ডার করি।”
আরমান ওয়েটারকে ডেকে ভাত, মাছ অর্ডার করতে হামিদা বলল,
“ভাত খাব না, আরমান ভাই। প্লিজ!”
আরমান বুঝল ওর লজ্জা। ওয়েটারকে বলল,
“জুস থাকলে দুটো বোতল দিয়ে যাবেন। পরোটা, ডিম আর ওরকম হালকা খাবার কিছু থাকলে সঙ্গে দিন। সিঙ্গারা খাবে হামিদা? এই হোটেলের সিঙ্গারা খুব পছন্দ করে রবিন!”
“না, না। সিঙ্গারা আমি মোটেও পছন্দ করি না!” হামিদা মুখ কালো করে বলতে আরমান হাসল। ওয়েটারকে বলল,
“সিঙ্গারা প্যাঁক করে দেবেন।”
হামিদা মনে মনে পণ করল,
“ওই সিঙ্গারা আমি নেবোই না!”
জুস দিয়ে গেল। আরমান এক চুমুক খেয়ে অপেক্ষা করল। হামিদা সংকোচে এক চুমুক দেয়। আরমান সময় নিলো। হামিদা একদৃষ্টে জুসের বোতলের দিকে তাকিয়ে আছে। কপাল পর্যন্ত ওড়না ঢাকা৷ আরমান আড়চোখে এক পলক দেখে বলল,
“রবিন কী বলেছে তোমাকে?”
“সে আর কী বলবে! তার মন ভরে গেছে এখন। মুক্তি চেয়েছিলাম তাই দিয়েছে। এখন তালা..!”
“থামো হামিদা!”
হামিদা থামল আরমানের কথায়। ওর বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে। আরমান বলল,
“দুজনে এক রকম জেদ করলে তো সম্পর্ক টিকবে না। ও না হয় রাম ছাগল। রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত নেয়। তুমি তো শান্ত মেয়ে হামিদা। একটু ধৈর্য ধরে, শান্তভাবে ভাবতে পারো না? ”
হামিদা এই অভিযোগে যারপরনাই ক্ষুন্ন হলো। বাইরে লজ্জায় আনত মুখে বলল,
“ধৈর্য ধরে, শান্ত মেয়ে হয়ে ভাবলে কী হবে, আরমান ভাই? আমাদের বালির সংসার টিকে যাবে? অসম্ভব! আপনার তো কোনো কিছুই অজানা নয়। আপনার বন্ধুর স্বভাব, ওর ছেলেমানুষী, ওর পরিবার সম্পর্কে সবই জানেন। তারপরে আর কী বলার থাকে!”
হামিদার কণ্ঠস্বর কাঁপছে। ওয়েটার খাবার পরিবেশন করে দিয়ে গেল। আরমান পরোটা ছিঁড়ে মুখে দিয়ে বলল,
“খেয়ে নাও, হামিদা!”
হামিদা শুকনো পরোটা মুখে দিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে। দু হাতে মুখ ঢেকে রইল কিছুক্ষণ। আরমান গম্ভীর হয়ে আছে। সামনের খাবার তেমনি পড়ে থাকল। হামিদা ওড়নায় চোখ মুছে বলল,
“ও আমার সঙ্গে কীরূপ আচরণ করত আপনি তো জানেন, আরমান ভাই। ওর ভাবি হওয়ার যোগ্য ছিলাম না। কিছুতেই ভাইয়ের বউ বলে স্বীকার করবে না। আমিও কী চাচ্ছিলাম তার ভাইয়ের বউ হতে? সে আমাকে একপ্রকার ঘৃণা করত। অথচ, এর কারণ খুঁজে পেতাম না আমি। তবুও ওই ঘৃণা নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু সে করল কী! প্রতারণা করে বিয়েতে জোর করে রাজি করালো। কারণ কী ছিল? ভাইকে মুক্ত করা? মিথ্যা মুক্তির আশ্বাস দিয়ে আমাকে ঢাকা যেতে সাহায্য করল। আমার সেজন্য কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত? হ্যাঁ, তাই ছিলাম। বাড়িতে এসে যা ঘটল তারপর থেকে তার আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। যার চোখে আগে ঘৃণা আর অপছন্দ ছাড়া কিছু দেখতাম না তার চোখে ভিন্ন কিছু দেখতে পেলাম। বড়ো ভয় এলো মনে। আমি তো দুর্বল, আরমান ভাই। সর্বদা তটস্থ থাকতাম এই ভেবে যে, রবিনের মতো বেপরোয়া বাতাসের দাপটে নিজেকেই হারিয়ে না ফেলি। রবিনের জেদ সম্পর্কে আপনার চেয়ে ভালো কে জানে বলুন। ওর জেদ হয়ে উঠলাম আমি। আমাকে ও হাসিল করতে চাইল। কত চেষ্টা করলাম নিজের চারপাশে সুরক্ষা দেওয়াল গড়ার। ব্যর্থ হলাম।”
হামিদা শ্বাস নিলো। কাঁপা হাতে পানি পান করে অপ্রস্তুত হেসে বলল,
“আপনার কী যেন বলার ছিল। কিন্তু আমিই তখন থেকে বলে যাচ্ছি! বলুন!”
আরমান বলল,
“মিথ্যা বলেছিলাম আমি, হামিদা। তোমার কথা শুনতে চেয়েছিলাম আমি। বলো হামিদা, ব্যর্থতার পরের অনুভূতি শুনতে চাই আমি!”
হামিদা থম ধরে চেয়ে রইল হাতের গ্লাসটার দিকে। আস্তে আস্তে বলল,
“ব্যর্থতা ঠিক নয়, আরমান ভাই। আমার সর্বনাশ ছিল। আমি বোকার মতো ভেবেছি শরীর পেলে বুঝি রবিন আমাকে আর চাইবে না। মুক্তি দেবে। শরীরই তো। মন পর্যন্ত মজবুত দেওয়াল তোলা আমার। ও পর্যন্ত রবিন কিছুতেই পৌঁছাতে পারবে না। অথচ, সুরক্ষা বেষ্টনীর ভেতর থাকা মনটা আমারই সঙ্গে বেইমানি করল। মুখে মুক্তি চাইতাম। এই মুক্তি চাওয়াই কাল হলো আমার। এক সময় আমার মন ভাবতে লাগল,”মুক্তি চাইলে রবিন তোকে হারানোর ভয়ে সম্মান দেবে। সাহস করে এই বালির সংসারটার ভিত শক্ত করতে চাইবে। দাদিজান জেনেছেন, সোনা মা জেনেছে। সকলকে একইভাবে জানাবে। এই সম্পর্ক শুদ্ধ হবে, সুন্দর হবে।” কী বোকা আমি। এত বোকা কেন আমি, আরমান ভাই?”
আরমান প্রতিবাদ করল,
“স্ত্রীর মর্যাদা চাওয়াতে কেউ বোকা হয় না। তুমি বোকা নও, হামিদা।”
হামিদা শ্লেষ হাসল।
“অবশ্যই আমি বোকা, আরমান ভাই। বোকা না হলে কেউ হাসনাইন কবির রবিন ভূঁইয়াকে বিশ্বাস করে? স্বামী মেনে সর্বস্ব দিয়ে দেয়? ওর অবশ্য দোষ নেই। সবই আমার দোষ। আমি ওর ডাকে সাড়া কেন দিলাম! কেন ও ডাকলে নিজেকে আটকে রাখতে পারিনি! কেন শক্ত মনের হতে পারিনি? কেন চাইনা চাইনা বলে মুখে ফেনা তুলেছি, মুক্তি চেয়েছি আবার এখন অন্তরজ্বালায় পুড়ছি! নিজের সম্মান আমি ওর পায়ে সঁপেছি। এখন ও আমাকে পায়ে ঠেলবে না? উচিত হয়েছে। যোগ্য শাস্তি পেয়েছি আমি।”
হামিদা আবার পানি পান করল। আরমান মাথা হেঁট করে বসে আছে। একটু পর মাথা তুলে বলল,
“তুমি কী চাও, হামিদা? খবরদার মিথ্যা বলো না।”
হামিদা গ্লাসটা রাখল টেবিলের ওপর। হ্যান্ড ব্যাগটা তুলে দাঁড়িয়ে বলল,
“কী চাইব আমি? কিছুই আর চাই না। শুধু একটু শান্তি আর সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই। আসি, আরমান ভাই।”
আরমান পেছন থেকে ডাকল। খাবার তো খেলোই না মেয়েটা। হামিদা অনেক দূর হেঁটে এলো। ভ্যানে চড়ে বসতে আরমান হাঁপাতে হাঁপাতে ওর সামনে এলো। সিঙ্গারার ঠোঙ্গাটা ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“চাই না বলতে নেই, হামিদা। বরং চাও। কে জানে তোমার এই চাওয়ার সাহস অন্য কারো মনে সাহস যোগাবে। স্বপ্ন পূরণ করতে হলে আগে স্বপ্ন দেখতে হয়। স্বপ্ন ভাঙার ভয় করলে হয়? নিরাপদ হোক যাত্রা। আবার দেখা হবে আমাদের! ততদিন ভালো থেকো, আমার বন্ধুরই থেকো।”
ভ্যান চলতে লাগল। হামিদা দুহাতে ঠোঙ্গাটা ধরে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল আরমানের দিকে। ভ্যান অনেকদূর এলো। আরমানকে এখন আর দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু ওর কথা হামিদা সারা পথ ভাবতে লাগল।
ঠোঙ্গাটা হাতে করে বাড়িতে ঢুকলো। বসার ঘরে তখন সফুরা একা। সোফার কুশন সাজাচ্ছে। হামিদাকে দেখে মুচকি হাসল।
“পরীক্ষা কেমন হলো রে, হামিদা?”
“হয়েছে মোটামুটি। আর সকলে কোথায়, বুবু?” জানতে চাইল হামিদা। ওর দৃষ্টি বারে বারে স্থির হয় রবিনের ভেজানো দরজায়। পুরোনো অভ্যাস। এত সহজে ছাড়ে! সফুরা বুঝল। ঠোঁট টিপে বলল,
“তোর শাশুড়ী তার পছন্দের মর্জিনার সঙ্গে ও পাড়ায় গিয়েছে। অফিস ঘরে কেউ নেই। বোধহয় জেলা সদরে গেছে তোর শ্বশুর আর ডাকু জব্বার। বাকি থাকে তোর ভাসুর। তার খবর আর কী বলব! আছে ঘরের ভেতর। আর..আর..আর কার কথা যেন বাকি?”
“তুমিও না, বুবু। খুব পাঁজি। ধরো এটা!”
সফুরা ঠোঙ্গা হাতে নিয়ে বলল,
“কী এতে? ওমা, সিঙ্গারা! খুব খেতে ইচ্ছে করছিল রে! তুই খাবি না?”
“না, খেতে ইচ্ছে করছে না। তুমি খাও!”
হামিদা ঘরের দিকে যাচ্ছিল। থামল। আরমানের কথা মনে পড়ল। ফিরে বলল,
“তার জন্য দুটো রেখো, বুবু।”
সফুরার চোখে-মুখে দুষ্টুমি ফুটে উঠল। ও কিছু বলবে তার আগে দৌড়ে ঘরে গেল হামিদা।
দাদিজান আধশোয়া হয়ে তসবিহ পড়ছিলেন। হামিদা ঘরে ঢুকতে পরীক্ষা কেমন হলো জানতে চাইলেন। হামিদা দাদিজানকেও একই উত্তর দিলো। তারপর জিজ্ঞেস করল,
“সারাদিনে সমস্যা হয়নি তোমার?”
দাদিজান বললেন,
“না, সফুরা আমাকে গোসল করিয়ে চুল আঁচড় দিসে। খাবার নিয়ে ও এসেছিল। মেয়েটা ভারি সেবা করে আমার। দুপুরে খাসির মাংস রান্না করেছিল। বলেছিলাম কষা মাংস খেতে ইচ্ছে করছে। গোপনে একবাটি তুলে এনেছে। খুব স্বাদ হয়েছে। তোর জন্য বাটিতে খানিক রেখে দিসি। যা তাড়াতাড়ি গোসল করে এসে খেয়ে নে।”
কষা মাংস দাদিজানের পছন্দ নয়, হামিদার। শেষ কবে খেতে পেরেছিল মনে পড়ে না। ও নিজেও ভুলে গিয়েছিল পছন্দের খাবারের কথা। কিন্তু দাদিজান ভুলে যাননি। হামিদা তাড়াতাড়ি গেল না। আলনা থেকে কাপড় তুলে ধীরে ধীরে কলপাড়ে এলো। এখানে দাঁড়িয়ে কত কী মনে এলো। সেসব পাত্তা না দেওয়ার জোরদার প্রয়াস চালিয়ে স্নান শেষ করল। ঘরে এসে অল্প কিছু খেয়ে বসতে ক্লান্তিতে চোখের পাতা নেমে আসে। দাদিজানের কোলে মাথা রেখে শুয়ে বলল,
“চুলে বিলি কেটে দাও, দাদিজান।”
দাদিজান চুলে বিলি কাটতে কাটতে রবিনের কথা জিজ্ঞাসা করেন৷ হামিদা জবাব দেয় আবার দেয় না। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে নেয়। কিন্তু দাদিজান কিছু বুঝতে দেয় না।
হামিদা ঘুমিয়ে পড়েছিল। দাদিজান ডাকছেন,
“ও বুবু, ওঠ। ওই শোন, রবিন ডাকছে।”
হামিদা যেন স্বপ্ন দেখছে। নয়ত গত সপ্তাহ খানেক যে লোক ওর ছায়া ঘেঁষেনি সে আজ কেন ডাকবে! দাদিজান ঠেলা দিলো,
“ওঠ না। শুনে আয়!”
হামিদা বিরক্ত মুখে উঠে বসল। ভেজা চুল আলুথালু ছড়িয়ে আছে পিঠে ওপর। হামিদা ওড়না বুকে তুলে দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,
“বলুন!”
“বাইরে আয়!” গম্ভীর গলায় বলল রবিন। হামিদা বাইরে এলো। ঘুম ঘুম চোখে তাকালো। রবিন কেমন বদলে গেছে! চোখের নিচে কালি পড়েছে। চোয়ালের তীক্ষ্ণতা বেড়েছে। ধূসর চোখদুটো কঠোর। মুখ দেখে ভেতরের খবর আন্দাজ করা মুশকিল।
রবিন আঙুল তুলে ধমকাতে যাচ্ছিল। হামিদার এলোমেলো বেশ, ঘুম জড়ানো চোখ মুখ দেখে থমকে গেল। ওর অন্য হাতে সিঙ্গারা। হামিদা সেদিকে ভুরু কুঁচকে তাকাতে রবিন মৃদু ধমকের স্বরে বলল,
“সফুরাকে বলেছিস এই সিঙ্গারা আমাকে দিতে?”
হামিদা লজ্জায় পড়ল। সফুরার ওপর মান করলো। নামটা না নিলে চলত না? রবিন ওর নীরবতা সহ্য করতে না পেরে ধমকে ওঠে,
“কথা বলছিস না কেন?”
“হ্যাঁ, বলেছি। তাতে কি পাপ হয়ে গেছে?” সমান রাগ দেখিয়ে বলল হামিদা। ওর সারা মুখ জুড়ে বিরক্তি। এই সিঙ্গারা দেখানোর জন্য ঘুম ভাঙাতে হবে! রবিন সিঙ্গারা সামনে ধরে বলল,
“পাপ হবে না? যাকে চাস না বলিস, যার কাছ থেকে মুক্তি চাস। তাকে কেন তার পছন্দের সিঙ্গারা দিতে যাবি? মতলবটা কী তোর?”
“একটা সিঙ্গারাই তো। এমন করছেন কেন? না খেলে ফেলে দেন!” রবিনের কটাক্ষ হজম করে বলল হামিদা। রবিন বলল,
“একটা নয় দুটো। ফেলব না খাব তুই বলবি কেন? কে তুই? শোন, বিল্লি…!”
রবিন কথা শেষ করতে পারল না। হামিদা ছো মেরে ওর হাত থেকে সিঙ্গারাটা তুলে মুখে ঠুসে নিলো। ভরা মুখে অস্ফুটে বলল,
“না থাকল সিঙ্গারা, না থাকল আপনার ঝামেলা। খুশি?”
হামিদা রাগে ফুঁসতে লাগল। ঘরের দিকে যেতে রবিন ওর ঘাড় চেপে ধরে,
“তোর এত সাহস! হা কর বলছি!”
রবিন ওর চোয়াল চেপে ধরে। হামিদা মুখ খুলবে না। সিঙ্গারাটা আসলেই খুব মজা। এই মজার খাবার কি না নিজে না খেয়ে এই বিশ্ব খারাপটাকে দিতে এসেছিল। ভালো কাজের একরত্তি দাম নেই। সব দোষ ওই আরমানের।
“কী করছিস তোরা!”
জেবুন্নেসা চেঁচিয়ে উঠতে হামিদা ও রবিন জমে গেল। হামিদা কনুই মেরে সরে যেতে রবিন সিনার ব্যথা গিলে বলল,
“হামিদা আমার সিঙ্গারা খেয়ে ফেলছে, মা। ওকে বলো আমার সিঙ্গারা দিতে!”
জেবুন্নেসা চোখ রাঙাতে হামিদা তাড়াতাড়ি গিলে বলল,
“আমার সিঙ্গারা। মিথ্যা বলেন কেন? সফুরা বুবুকে জিজ্ঞাসা করুণ বড়ো মা!”
রবিন খপ করে ওর খোলা চুল মুঠ করে ধরল।
“আমাকে মিথ্যাবাদী বলিস রে, বিল্লি!”
হামিদা সভয়ে তাকালো। রবিন মায়ের সামনে হামিদার সঙ্গে এমন আচরণ করছে কোন সাহসে। ওর কী ভয় করছে না?
জেবুন্নেসা ছুটে এসে ছেলের হাত টেনে ধরলেন,
“কী ছেলেমানুষী হচ্ছে, রবিন! ছাড় ওর চুল!”
“না, ছাড়ব না!” রবিন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে হামিদার ভীরু চোখে। সদর দরজায় মহসিনের গলা শোনা গেল। জেবুন্নেসা সতর্ক করলেন,
“তোর আব্বা আসছে, রবিন। বাচ্চামো জেদ করিস না, ছাড় বলছি!”
রবিন তখনই ছাড়ল না হামিদার চুল। জেবুন্নেসা ছেলের হাত টানছেন। হামিদা দেখছে বিপদ এদিকে আসছে। ও গোপনে রবিনের পেটের নিচে সজোরে চিমটি কাটল। রবিন সরে দাঁড়ায়। আঙুল তুলে শাসানোর ভঙ্গিতে বলল,
“এর শোধ আমি নেবো।”
রবিন ফিরে গেল। জেবুন্নেসার কপালে ভাঁজ পড়েছে। শ্যামলা মুখে আঁধার নামল। হামিদার দিকে আগুন চোখে চেয়ে বললেন,
“আমার ছেলেদের ছায়া থেকেও দূরে থাকবি তুই, হামিদা। নয়ত গলা টিপে মেরে ফেলব তোকে।”
জেবুন্নেসা বসার ঘরের দিকে গেলেন। হামিদা সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে দেওয়ালে মিশে বসলো। সিঙ্গারাটা বড্ড বিস্বাদ লাগল জিহ্বায়। ঘুম উড়ে যাওয়া চোখদুটো সামনের অন্ধকারে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। রবিন আগের মতো আচরণ করছে। সত্যি ওর মন থেকে উঠে গেছে হামিদা। আরমানের প্ররোচনায় কেন যে পড়তে গেল! কিছু চাইবে না, আর স্বপ্ন দেখবে না। স্বপ্ন ভাঙার যন্ত্রণা কতখানি হামিদা খুব জানে। মনে মনে পণ করল আর কোনোদিন রবিনের জন্য কিছু রাখবে না। ওর পছন্দের সিঙ্গারাও না। বিড়বিড় করে বলল,
“অকৃতজ্ঞ কোথাকার!”
চলবে….
#হামিদা(৬৫)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ
রবিন ক্যারম ক্লাবের সামনে গিয়ে ফিরে এলো৷ কারণ সেখানে আরমান বসে আছে। হয়ত রবিনের জন্য অপেক্ষা করছে। অনুমান ভুল হতেও পারে। এত উপেক্ষার পর কোন মানুষটা বন্ধুত্ব ধরে রাখতে চাইবে! আরমান আত্মসম্মানহীন নয়। বার বার উপেক্ষা, বন্ধু নয় বলে জাহির করার পর ও হয়ত রবিনকে আর বন্ধু ভাবে না। এই তো চেয়েছিল রবিন। আরমান দূরে থাকুক, নিরাপদে থাকুক। কিন্তু রবিনের বুকের ভেতর ভার হয়ে আসে। আরমানের সঙ্গে ওর এক দু বছরের বন্ধুত্ব নয়। বহুদিনের, বহু বছরের। কাওকে চোখ বন্ধ করে যদি বিশ্বাস করে তবে সে এই আরমান। ওর বন্ধু, ওর ভালো-মন্দের সাথী।
রবিনের চোখ পোড়ে, বুকের ভেতর হাসফাস করে। ইচ্ছে করল ছুটে গিয়ে আরমানকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“শালা, তোর সঙ্গে কথা না বলতে পেরে দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছিল আমার। আরমান, আমার পরম মিত্র, জানের দোস্ত!”
কিন্তু ছুটে যাওয়ার বদলে ঘুরে দাঁড়ায়। আরমান ওকে দেখার আগে দ্রুত সে স্থান ত্যাগ করে।
গত এক মাসে আরমানের সঙ্গে যতবার ওর দেখা হয়েছে রবিন উপেক্ষা করেছে। আরমান কথা বলতে এলে সরে গেছে। রূঢ়ভাবে এড়িয়ে গেছে। আরমান ওর আচরণে আহত হয়েছিল। তবুও রবিনের ভাঁড়ামির মুখোশ খোলার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিল। লাভ হয়নি। রবিনের মন বড়ো শক্ত। বাপের মতোই যেন বড্ড পাষাণ। এখন তো মনের খবর গোপন করার কায়দায় পাকা হচ্ছে।
আরমানের আহত মুখখানায় ক্রমশ মান ও ক্ষোভ দেখা দিলো। একদিন মুখোমুখি দেখা হতে কলার চেপে ধরে বলল,
“শালা, তোর বাপ ভূঁইয়া সাজার নাটক বন্ধ কর। আমি হামিদা নই রবিন। সব বুঝি। এসব ভাঁড়ামি করে আমাকে দূরে ঠেলতে পারবি না। আমি পরকাল পর্যন্ত তোকে অনুসরণ করব।”
রবিন তবুও ঠেলে দূরে সরিয়ে বলেছিল,
“আমি তো ঘোর জাহান্নামি। তুইও জাহান্নামে যাবি আমাকে অনুসরণ করে?”
আরমান ওর কাঁধ চেপে বলেছিল,
“জাহান্নাম থেকে টেনে নিয়ে আসব তোকে। দেখে নিস!”
রবিন পাশ কেটে সামনে এগিয়ে মাছি তাড়ানোর মতো হাত নাড়িয়ে বলেছিল,
“দেখা যাবে।”
আরমান বরাবরই ভালো ছেলে। সুপুত্র, সুপুরুষ। কিন্তু রবিন ওর বিপরীত। তবুও কীভাবে যেন ওদের বন্ধুত্ব হয়ে গেল। কথায় আছে সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে৷ আরমানের বাবা-মা রবিনের সঙ্গে ছেলের বন্ধুত্ব খুব একটা পছন্দ করতেন না। এর মানে এই নয় রবিনকে তারা ঘৃণা করত।
কিন্তু তাদের সোনার ছেলে রবিনের মতো কয়লার সংস্পর্শে গিয়ে মদ ছুঁয়েছিল, প্রেমে পড়ে পড়াশোনা সিঁকেয় তুলেছিল। সেই প্রেমে ব্যর্থ হয়ে মজনুর মতো ঘুরেফিরে বেড়াত। যেন জগতে ওর কেউ নেই, কিছু নেই। অথচ, ওর মধ্যবিত্ত বাবা-মা রয়েছে। যারা ছেলেকে আঁকড়ে ধরে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছে। সেই স্বপ্ন এত সহজে ভাঙবে! তারা জোর না দিলে আরমানের পড়াশোনা আর হতো না। রবিনকে তারা মনে মনে তিরস্কার করেছে। ছেলেকে নিষেধ করে যখন ব্যর্থ হয়েছিলেন, তখন দোয়া করেছেন যেন ওদের বন্ধুত্ব ভেঙে যায়। এখন কী যে শান্তি বিরাজ করে তাদের মনে।
রবিন হাঁটতে হাঁটতে আপনমনে শ্লেষাত্মক হাসল। আরমান ওকে টেনে জান্নাতে নিতে চাইছে। কিন্তু ওর কী খবর আছে যে, এতদিন রবিনের সঙ্গে থেকে থেকে কত পাপ করে ফেলেছে। তার চেয়ে এই ভালো হয়েছে। এখন আরমান সৎ সঙ্গে মিশে যাক, পুণ্য করুক। রবিনের পথ একটাই। যে পথে ঘোর অন্ধকার।
এদিক-সেদিক ঘুরে রবিন বাজারে এলো। তখন বেলা পড়ে গেছে। রবিনের গায়ে তখনো কালো রঙের শাল চাদরটা জড়ানো। এতদূর হেঁটে গা ঘেমে গেছে। চাদরটা জড়ো করে গলায় ঝুলিয়ে নিলো।
সেই সকালে এক কাপ চা খেয়ে বেরিয়েছিল। কাজ ছিল ইউনিয়ন অফিসে৷ সেখান থেকে সোজা ক্যারম ক্লাবে গিয়েছিল। ভেবেছিল দুপুরে ওখানেই খাবে। হঠাৎ আরমানকে দেখে সিদ্ধান্ত পালটে ফেললো। খিদে মরে গিয়েছিল। এখন খিদেটা দ্বিগুণ হয়ে ফিরে এলো।
সামনে একটা খাবার হোটেল। রবিন ঢুকে বসল। অর্ডার দিলো ভাত, ডাল আর গোরুর গোশত ভুনা। সবে কয়েক লোকমা মুখে দিয়েছিল, এমন সময় হোটেলের সামনে বাইক থামল। ওকে দেখতে পেয়ে বাইক থামিয়েছে সরোয়ার।
“রবিন না? এই অবেলায় হোটেলে ভাত খাও কেন রে ছ্যামড়া! বাপে কি বাইর কইরা দিলো না কি?”
সরোয়ার রসিকতা করতে করতে নেমে এলো। চাবিটা বাইকে গোঁজা। এই অঞ্চলে কারো বুকের পাটা নেই সরোয়ারের জিনিস স্পর্শ করে। বড়ো দাপট ও প্রতাপের সঙ্গে হোটেলে ঢুকলো সরোয়ার। যার সামনে পড়ল সেই সালাম ঠুকে সভয়ে পাশ কেটে গেল। রবিন তেমনই বসে খাচ্ছে। সরোয়ার বসল ওর সামনের চেয়ারে। চোখ থেকে কালো চশমা খুলে পাঞ্জাবির গলায় ঝুলিয়ে রাখল। পরনে সাদা খাদি পাঞ্জাবি, পায়জামা। চুলে তেল। চুল টেনে পেছন দিকে আঁচড়ানো। মুখে বোধহয় স্নো টোনো কিছু দিয়েছে। বসন্তের দাগে বসে বিশ্রী দেখাচ্ছে। মোটা মানুষ। এই শীতেও ঘেমে উঠেছে। গায়ে ফগের পারফিউমের গন্ধ। সে বসতে রবিন তরকারির স্বাদ গন্ধ ভুলে গেল। সরোয়ার মার্বেলের মতো গোল গোল চোখে চেয়ে বলল,
“কী রে ছ্যামড়া, তোরে যে খুঁজতাছি শুনিস নাই?”
রবিন মেকি দীর্ঘশ্বাস ফেললো,
“অনেক কাজ সরোয়ার ভাই। দম ফেলানোর টাইম পাই না। এই দ্যাখো, দুপুরের খাবার কোন অবেলায় খাচ্ছি। তা কেন খুঁজছিলে?”
এঁটো ভাত কটা মুখে দিলো রবিন। বাটিতে দু পিস গোরুর গোশত অবশিষ্ট ছিল। সরোয়ারের নজর পড়ল সেদিকে। লাল মসলার ঝোলে গড়াগড়ি খাচ্ছে চর্বিযুক্ত মাংসের টুকরো। ডাক্তার ওকে মাংস কম খেতে বলেছে। এই নিষেধাজ্ঞা এসেছে সরোয়ার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার পর। সরোয়ারের ভাবি সেই ভয়ে এক সপ্তাহ মাংস খেতে দেয়নি। মাথার দিব্যি দিয়েছে যেন মাংস সে আপাতত পাতে না তোলে। এই নারীর প্রভাব সরোয়ারের জীবনে খুব। সুতরাং তার কথা রাখতে হয়েছে বড়ো কষ্টে। এই মুহূর্তে সেটা ধরে রাখা মুশকিল হলো। সরোয়ার লোভ সংবরণ করে বলল,
“খুঁজছিলাম ওই অলির নামে সুনাম করতে। তোরে আমি বহুত স্নেহ করি রবিন। তোর কথা গুরুত্ব দিই। সেই জন্যে অলিরে বার বার সুযোগ দিয়েছি। তাতে কাজ না হলে হালকা পাতলা ভয় দেখিয়েছি। কিন্তু এতেও ওই ছ্যামড়া শুধরাচ্ছে না। সেদিন পথে একলা পাইয়া আমার গলা চেপে ধরছে। হাতের টর্চটা দিয়ে ওর কপালে বাড়ি না মারলে আমার কাম তামাম করে ফেলতো। এমন আর কতদিন চলব? বলছিলি ওরে বুঝাবি। এই কি তার নমুনা? তোর কথা শুনলে আমার তো পথে-ঘাটে মরতে হইব, রবিন।”
রবিন ভাত গিলে এক ঢোক পানি খেয়ে বলল,
“ওর মাথা ঠিক নেই সরোয়ার ভাই। শুনেছি নেশা টেশা করে এখন। আপনি চিন্তা করবেন না। আর যেন আপনাকে আঘাত করার চেষ্টা না করতে পারে সে ব্যবস্থা করব আমি।”
“পারবি তো?” সরোয়ার সন্দিহান। রবিন সোজা হয়ে বসল,
“আরে, সরোয়ার ভাই। এই রবিন পারে না এমন কিছু আছে না কি? টেনশন নট!”
সরোয়ার জোর করে হাসল,
“ঠিক আছে। তোর কথাতে তবে টেনশন নট!”
তারপর হাত না ধুয়ে ঝোলে হাত ডুবিয়ে মাংস তুলে মুখে পুড়ে বলল,
“গোরুর মাংসের ওপর মাংস আছে! কী স্বাদ! ডাক্তার হালায় কয়, বয়স হইতাছে সরোয়ার ভাই। এসব রেড মিট খাওন ছাড়েন। শরীর স্বাস্থ্যের যে অবস্থা! হার্ট ফেল টেল হয়ে যাবে। হালায় কিছু জানে? আরে এই সরোয়ারের হার্ট ইস্পাতের। এইডা ফেল করার সাধ্য কার বা কীসের! না কইয়া মাংস খাইলাম কিছু মনে করলি না কি?” বলল রবিনকে। কিছু মনে করল! রবিন ভেতরে ভেতরে রাগে ফেটে পড়ল। ওর মন চাইল গিয়ে সরোয়ারকে গলা টিপে মারতে। কিন্তু মুখে হাসল,
“কী যে বলেন না, সরোয়ার ভাই। নেন না এটাও নেন। আমার পেট ভরে গেছে। ভাত দিতে বলব? আরেক বাটি গোরুর গোশত? এখানকার মাছ চচ্চড়ি খুব স্বাদের।”
সরোয়ার হ্যাঁ বলার আগেই রবিন খাবার অর্ডার করে উঠল,
“আপনি খান আমি হাত ধুয়ে আসি। আর শোনেন, খবরদার বিল টিল দিতে যাবেন না। বড়ো ভাইদের খাওয়ানোর সৌভাগ্য সবসময় তো পাই না। আজ পেয়েছি ছাড়ছি না!”
সরোয়ার নিষেধ করতে যাবে তখনই উঠতে গিয়ে চেয়ারের কোণা লাগল রবিনের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে। ব্যথায় হিসহিসিয়ে বলল,
“শালা..!”
সরোয়ার ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে শ্লোকের মতো আওড়ালো,
“শালা কইলে মালা দিমু
তোর বইনরে বিয়ে করমু
হাতে নাই ঘড়ি,
তোর মা আমার শাশুড়ী।”
কোদালের মতো দাঁতগুলো বের করে হাসতে লাগল সরোয়ার৷ তারপর হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আরে ছ্যামড়া, ঘড়ি তো আছে। তাইলে তোর মা আমার কাকি শাশুড়ী! হে, হে, হে!”
রবিনের ইচ্ছে হলো চেয়ার তুলে সরোয়ারের মাথায় এক বাড়ি দিতে। দাঁত কামড়ে রাগ নিয়ন্ত্রণ করে হাত ধুতে ধুতে ঘাড়ের ওপর থেকে বুনো চোখে তাকালো সরোয়ারের দিকে। গোগ্রাসে খাবার খাচ্ছে সে। রবিন বিড়বিড় করে গাল দিলো,
“শু*য়োরের বাচ্চা, ফের ওই কথা বললে তোর হার্ট আমি টেনে ছিঁড়ে ফেলব। আমার বউকে বিয়ে করার শ্লোক বলে। দু টুকরো মাংসে ছেড়েছি কি ওর লোভ বেড়ে গেছে!”
হাত মুছে রবিন লম্বা শ্বাস নিলো। তারপর মুখ বদলে হাসিমুখে বলল,
“আপনি তাহলে খান, সরোয়ার ভাই। আমি গেলাম।”
“আরে ছ্যামড়া এত দৌড়ের ওপর থাকিস কেন? বাড়ি যাবি? আমারও বিশেষ কাজ আছে তোর বাপের সঙ্গে। একসঙ্গে যাব। বয়, বয়!”
কিন্তু রবিন বসবে না। বলল,
“এখানে বসে কী করব। আপনি আসেন আমি বাজারের নুরু কাকার চায়ের দোকানে আছি। ওহ, বিলটা পরিশোধ করে আসি!”
“খবরদার, রবিন। বিল আমি দেবো। তুই যা!” সরোয়ার ঝোলে ভাতে বড়ো লোকমা করল। রবিন বলল,
“কিন্তু!”
“ছ্যামড়া বড়ো ভাই মানিস কি না!” বিরক্ত হয়ে বলল সরোয়ার। রবিন বলল,
“খুব মানি!”
“তাহলে বিল আজ আমিই দেবো।” ভাত মুখে বলল, “বিলের বদলে অন্য কিছু দিস!”
রবিন ভুরু কুঞ্চিত করতে সরোয়ার কুটিল হাসল। রবিনের অসহ্য লাগল৷ জোড়াজুড়ি করল না আর। ওর টাকা এতটাও সস্তা হয়নি যে ওই কথা বলার পর সরোয়ারের পেছনে খরচ করবে। রবিন বিদায় নিয়ে মনে মনে গালি দিতে দিতে বেরিয়ে এলো।
রবিনের দিন কাটত আরমানের সঙ্গে ঘুরে, ফুটবল খেলে। তারপর হামিদার সান্নিধ্যে। এখন ওর দিন কাটে থানা, উপজেলা ও জেলা অফিসে বা স্থানীয় গুন্ডা পান্ডাদের সঙ্গে খোশগল্প করে৷ যদিও এই দিনগুলো বড়ো মন্দ লাগায় কেটে যায়। তবুও কাটে তো।
সামনে পরীক্ষা। রবিন বইয়ের দিকে তাকাতে পারে না। পড়তে ইচ্ছা করে না। ওর ভালো লাগে নেশার বোতলে চুমুক দিতে। বন্দুক, পিস্তলের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে। রাজনৈতিক জটিল কথাবার্তা শুনতে৷ একদিন ভেবেছিল ফুটবল খেলা বুঝি ওর জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য। এখন তা কেবল অতীত। রবিন ফুটবলকে ভুলে থাকে বক্সিং ও কুস্তি লড়াই করে। যে ওর জীবনের উদ্দেশ্য বদল করতে বাধ্য করেছে সেই বাবার নিষেধ অমান্য করার তীব্র ইচ্ছে হয়। জব্বারের ছায়া ওর পিছু পিছু সর্বত্র ঘোরে৷ রবিনের বিদ্রোহী মনটা শৃঙ্খলে বেঁধে শেকল টেনে ধরে আছে যেন সে।
জব্বার ভাবে রবিন বশে এসেছে। কী শান্ত আর বাধ্য। ওর বিদ্রোহী স্বত্তাকে দমন করতে সফল হয়েছে। এবার আর ভয় নেই। মহসিন কবির ভূঁইয়া কোনোদিন জানবে না হামিদার পেছনে শক্তি হয়ে রবিন তাকে ধোঁকা দিয়েছিল। পিতা-পুত্রের বিবাদ হবে না। রবিন মর্তুজা হবে না। জব্বার কৌশলে ফাঁকি দিয়েছে মনিবকে। এ নিয়ে অনুশোচনা কম নয়। সব দোষ আরমানের ঘাড়ে দিয়েছে। আরমানকে কঠিন শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন মহসিন। জব্বার সে শাস্তি আধা করেছে। তাতে সন্তুষ্ট নন মহসিন। শুধুমাত্র রবিনের বশ্যতা ও অনুনয় বিনয়ে ক্ষমা পেয়েছে আরমান। কিন্তু তা সাময়িক। মহসিন কবির ভূঁইয়া প্রতিশোধপরায়ণ। আরমানের দুঃসাহসের শাস্তি তিনি কঠিনভাবে দেবেন। কিন্তু তার আগে যার কারণে এসব ঘটেছে তার ব্যবস্থা করতে হবে।
হামিদা! মহসিন কবিরের জীবনের সবচেয়ে বড়ো অভিশাপ। এই অভিশাপকে এতদিন জিইয়ে রেখেছিলেন কেন? মহসিন কবির ভূঁইয়া একবার ভাবেন, মৃত পিতার কাছে দেওয়া ওয়াদা রক্ষা করতে। কিন্তু আরেক মন ভিন্ন কথা বলে। তার ক্ষোভ বাড়ে, ভেতরটা প্রতিশোধের আগুনে লাভার সৃষ্টি করে।
অফিস ঘরের দরজায় কড়া নাড়ে কেউ। মহসিন কবির চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজেছিলেন। কয়েক বার শব্দ হয়ে থেমে গেল। দরজার ওপাশের ছায়া সরতে দরাজ গলায় বললেন,
“ভেতরে আয়, হামিদা!” সংকোচে ও সভয়ে অফিস ঘরে প্রবেশ করল হামিদা। হাতে চায়ের কাপ ও বিস্কুটের পিরিচসমেত ট্রে। দূরে দাঁড়িয়ে রইল। মহসিন কবির ভূঁইয়া চোখ মেলে তাকালেন। হামিদা ওড়না কপাল পর্যন্ত টেনেছে। ওর চিবুক ঠিক শিউলির মতো৷ কিন্তু ওতে শিউলির রূপের ধার নেই। না, আছে ওই চোখে সেই ছল, আগুন। তবুও মায়ের ছায়া হামিদা এড়াতে পারে না। মহসিন সংযত হলেন। নিজেকে সতর্ক করলেন,
“ও শিউলি নয় বরং হামিদা।”
“চা রাখ টেবিলের ওপর!” হামিদা কলের পুতুলের মতো ট্রে নামিয়ে রাখল। তারপর চায়ের কাপ ও পিরিচ সামনে দিয়ে আগের জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়। মহসিন কবির চায়ের কাপ তখনই স্পর্শ করেন না৷ সিগারেট ঠোঁটে গুঁজে আগুন জ্বালান। ধোঁয়া টেনে ভাতিজির দিকে তাকিয়ে বলেন,
“পড়াশোনা কেমন চলছে তোর?”
“জি, মোটামুটি!” হামিদা আনত। মহসিন চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন,
“মর্তুজার সঙ্গে কথা হয়?”
হামিদা মাথা নাড়ায় দুদিকে। মহসিন কবির সিগারেট অ্যাশট্রেতে রাখলেন,
“আর সুরাইয়ার সঙ্গে?”
হামিদা সংকোচে ও সভয়ে বলল,
“মাঝে মাঝে হয়!”
“কী বলে? আমাদের বদনাম? একেবারে ঢাকা গিয়ে ওর ঘরে উঠতে?”
মহসিন কবিরের গলার স্বরে বিদ্রুপ। হামিদার চিবুক বুকে নেমে গেল। মহসিন কবির বললেন,
“ওর কথা শুনিস না, হামিদা৷ তোর মায়ের কারণে তোর বাপ বে-ঘরে হয়েছিল। আর ওর কারণে হয়েছে পরিবার বিচ্ছিন্ন। মর্তুজাকে তো জানিস। বউয়ের গোলাম। ওই গোলামির কারণে বউয়ের সঙ্গে হ্যাঁ মিলিয়ে শহরে নিতে রাজি হবে। কিন্তু তারপরে যা হবে তা আর বিস্তারিত না বলি। তুই গেলে মর্তুজা শান্তি পাবে না। ওর অশান্তি সংসারে ছড়াবে। শেষে তুই এ কূল ও কূল সব হারাবি। আমি মারি কাটি আমিই তোর অভিভাবক হামিদা। মানিস এ কথা?”
হামিদা নীরব রইল। সোনা মায়ের বিরুদ্ধে বলা কথাগুলো একদম পছন্দ করল না। প্রতিবাদের কণ্ঠ ওই দেওয়ালে ঝুলানো চাবুকটা স্তব্ধ করে দিলো। মহসিন বললেন,
“মানিস না?”
হামিদা নিচু গলায় বলল,
“মানি!”
মহসিন কবির সন্তুষ্ট হলেন। কাছে এসে মাথায় হাত রেখে বললেন,
“তবে আমি যা বলব তাই শুনবি। শুনবি তো?”
হামিদার গলা শুকিয়ে আসে। কথা বেরোতে চায় না। বড়ো অসহায় লাগল। কোনোরকমে বলল,
“জি!”
মহসিন কবির খুশি হলেন। তিনি হাসেন না খুব একটা। হামিদা ভীরু চোখে তাকিয়ে রইল। বড়ো বিস্ময় ওর চোখে। মহসিন বিদায় দিতে হামিদা দরজার দিকে গেল। হঠাৎ মহসিন কবির বললেন,
“হামিদা, অনেক দিন আমাকে বড়ো আব্বা বলে ডাকিস না। কেন ডাকিস না? ডাক একবার!”
হামিদা আবার ঘুরে দাঁড়ায়। মহসিন কবির চেয়ারে বসে আছেন। দৃষ্টি টেবিলের কাগজে নিবদ্ধ। হামিদা তার ক্রুরতা ভোলেনি। বড়ো আব্বা না ডাকলে মহসিন কবির রুষ্ট হবেন। হামিদা অনিচ্ছায় মৃদু হাসির সঙ্গে বলল,
“আমি আসি, বড়ো আব্বা!”
মহসিন কবির চোখ তুলে তাকালেন। মুচকি হাসলেন। তারপর আবার কাগজে মনোযোগ দিলেন। কিন্তু দরজা বন্ধ হতে তার মুচকি হাসি দুর্বোধ্য হতে লাগল।
হামিদা অফিস ঘর থেকে বেরিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। ওর মনের মধ্যে খচখচ করছে। বড়ো অস্বস্তি হলো মহসিন কবিরের স্নেহময় আচরণে। আনমনে ঘরের দিকে যাচ্ছিল। হঠাৎ যেন দেওয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খেল। চোখ তুলে দেখল দেওয়াল নয়, রবিন। হামিদা তাকিয়ে রইল। রবিনের মুখ বোঝা দায়। অফিস ঘরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কোথায় গিয়েছিলি?”
হামিদা জবাব দিলো না। পাশ কেটে যেতে রবিন ওর হাত ধরে বসে,
“জবাব দে!”
“আমি যেখানে ইচ্ছে যাই তাতে আপনার কী? হাত ছাড়ুন!”
“আস্তে কথা বল।”
“বলব না আস্তে। এখনই হাত না ছাড়লে চেঁচিয়ে উঠব!”
“এত সাহস তোর?” রবিন ওর চোয়াল চেপে ধরে,
“চেঁচিয়ে দেখা এবার।”
হামিদা আগুন চোখে তাকায়। ওর ঠোঁটজোড়া বড্ড প্রলুব্ধ করে রবিনকে। কতদিন ছুঁয়ে দেখে না। কতদিন বাহুর মাঝে জড়িয়ে ধরে না হামিদাকে।
“বড়োমা!”
রবিনের হাত ঢিলে হতে ছিটকে সরে গেল হামিদা। রবিন পেছন ফিরে তাকাতে ও অনেক দূরে যায়। দু গালে হাত বুলাতে লাগল। ফের ধোঁকা! রবিনের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে ঝাঁঝ গলায় হামিদা বলল,
“আমাকে একদিন বলেছিলেন, হামিদা আমি তোর মেরুদণ্ড হব। কীভাবে হবেন? আপনি নিজে কেঁচোর মতো বেঁচে আছেন। আগে নিজের মেরুদণ্ড শক্ত করেন। দিনের পর দিন উপেক্ষা হঠাৎ এসে অধিকার খাটাবেন আর বলে দেবো? আপনি কী করেন তার খোঁজ আমাকে দেন? তাহলে আমারটা জানতে চাইবেন কেন? কোন অধিকারে? দলিল আছে সেই অধিকারের? লোক জানে? ওহ! আপনার তো আবার জানানোর সাহস একেবারেই নেই!”
“হামিদা!”
রবিনের বড়ো লাগল কথাগুলো। কথাগুলো বলে খুব যে শান্তি পেল হামিদা তা নয়। কিন্তু রবিনের থমথমে মুখ দেখে ওর বুকের জ্বালা জুড়ালো। মুখ ঘুরিয়ে ঘরে ফিরে গেল। রবিন পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল সেখানে। ওর কানে সীসার মতো গলে পড়ল কথাগুলো।
চলবে..
#হামিদা(৬৬)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ
রাতে খাবার খেতে বসেছেন মহসিন কবির ভূঁইয়া। পাশে জব্বার, জুবিন, জেবুন্নেসা ছিলেন। রবিনের চেয়ার ফাঁকা। সে এখনও বাড়িতে ফেরেনি। জেবুন্নেসা জানেন না ছেলে কোথায় গেছে। কখনো বলে না কি! আজকাল ওর কী যেন হয়েছে। বড্ড অন্য রকম দেখায়। তিনি ছেলেকে পিতার রোষানল থেকে বাঁচাতে মিথ্যা বললেন,
“পরীক্ষা চলছে ওর। সামনের তারিখের বিষয়টা কঠিন। তাই স্যারের কাছে পড়তে গিয়েছে। আমাকে বলে গেছে ওর ফিরতে রাত হবে।”
মহসিন কবির ভূঁইয়া কিছুই বললেন না। বরং আরও গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখখানা। ক্রোধের স্ফুরণ চোয়ালে। জব্বারের মুখ চিন্তিত। জুবিনের এসব কথায় কিছু এসে গেল না। এমন তো নয় আজই মা রবিনের দেরিতে ফেরা নিয়ে মিথ্যা বললেন। জুবিন চুপচাপ খেতে লাগল।
স্বামীর নীরবতায় জেবুন্নেসা গোপনে হাঁপ ছেড়ে সাংসারিক আলাপ আলোচনা তুলতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু সফল হলেন না। মহসিন খুব একটা আগ্রহ দেখালো না আজ। জব্বার ইশারায় যেন থামতে বলল। জেবুন্নেসা এই জব্বারকে মোটেও পছন্দ করেন না। তার স্বামীর জীবনে তার চেয়েও যেন জব্বারের মূল্য ও গুরুত্ব বেশি। তাই তো চোখের ইশারা করার সাহস করে!
জেবুন্নেসা বড়ো ছেলেকে খাবার তুলে দিলেন। ছেলেটা দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে সে কী চিন্তা জেবুন্নেসার। এখন পর্যন্ত উপযুক্ত পুত্রবধূর সন্ধান করতে পারলেন না এবার কি সত্যি গরিব ঘরের কাওকে ছেলের বউ করে ঘরে আনতে হবে? জেবুন্নেসার মন সায় দেয় না। কত স্বপ্ন ছিল তার দুই রাজপুত্রের জন্য বিরাট ধনী ঘরের রাজকন্যা আনবেন। ভাগ্য এমনি করে পরিহাস করল!
জেবুন্নেসা খেতে খেতে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার স্বামী শুনেও শুনলো না। জব্বার তাকালো না। কিন্তু তার সন্তান! ও উপেক্ষা করতে পারল না। মুখে তোলা লোকমা প্লেটে ফেলে তাকিয়ে রইল মায়ের মলিন মুখে জুবিন। জেবুন্নেসা ছেলেকে আর নতুন করে চিন্তায় ফেলতে চান না। জোরপূর্বক মুচকি হাসলেন। গোরুর গোশত দিয়ে বুটের ডাল রান্না করেছিলেন। জুবিনের পাতে আজ শুধু ওটাই। ওর বুঝি ভালো লেগেছে। জেবুন্নেসা বাটির চামচে হাত রেখে বললেন,
“আরেকটু দিই, আব্বা?”
জুবিনের আর খেতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু মা’কে আজ ও না করে না। মাথা দুলাতে কী খুশি হলো ওর মা। জুবিনের অথর্ব জীবনটা কিছু সময়ের জন্য অর্থবহ হয়ে উঠল। কী শান্তি! কিন্তু শান্তি ওর জীবনে ক্ষণস্থায়ী। জুবিনকে অশান্তির ভয় পেয়ে বসে।
খাবার খেয়ে সকলের আগে জুবিন বলল,
“আমি আসি!”
মহসিন কবিরের দরাজ গলার স্বর ওকে থামিয়ে দিলো,
“তোমার জীবন কি এভাবেই কাটবে জুবিন?”
জুবিন কী জবাব দেবে ভেবে পেল না। বড্ড অস্বস্তিতে পড়ল। জেবুন্নেসা ছেলের পক্ষে ঢাল হয়ে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত। মহসিন কবির দেখলেন এক পলক।
“কথা বলছিস না কেন?” হঠাৎ যেন গলা চড়ে গেল তার। মেজাজ ভীষণ তপ্ত। জব্বার খাওয়া বন্ধ করে সোজা হয়ে বসল। জুবিন হুইলচেয়ার শক্ত করে ধরে আছে। পিতার চোখে চোখ না রেখে নিচু গলায় বলল,
“কী বলব আমি!”
“চলতে পারিস না, বলতে পারিস না। পারিস কী তুই? শুধু না করতে! বিয়ের কথা বললে মুখের ওপর না করে দিতে তো খুব পারিস। শোন জুবিন, এভাবে আমার বাড়িতে থাকা চলবে না। মন যা চায় তা করতে চাইলে কিছু করে দেখাতে হবে তোকে। পারবি?”
জুবিনের দৃষ্টি স্থির সামনের মেঝের ওপর। ছেলের অসহায়ত্ব দেখে জেবুন্নেসা এগিয়ে এলে মহসিন আগুন চোখে তাকালেন,
“খবরদার আজ যদি কেউ আমার আর আমার ছেলের মাঝে এসেছে!”
জেবুন্নেসা চুপ করে গেলেন। মহসিন কবির ভূঁইয়া ছেলের দিকে আবার তাকালেন,
“তোকে এই আমি বলে রাখলাম জুবিন, এই বছরে তোর বিয়ে দেবো। সে আমি যার সঙ্গে দিই। আর এই যে থেরাপি নিবি না, হতাশ, অকেজো হয়ে ঘরের কোণে পড়ে থাকা এসব আর চলবে না। জব্বার আগামীকালই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলবে। ডাক্তার যা বলবে তুই তাই শুনবি। দুনিয়াতে তুই প্রথম নস যে পঙ্গু হয়েছিস। তোর মতো বহু মানুষ কর্ম করে খাচ্ছে। কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা হয়েছে আমার। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে প্রতিবন্ধী কোঠায় একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেন।”
প্রতিবন্ধী! পিতার মুখ থেকে শোনা ওই শব্দ তিরের মতো লাগল জুবিনের গায়ে। ও কাঠ হয়ে বসে রইল। জেবুন্নেসা প্রতিবাদ করে উঠলেন,
“এসব কী বলছেন আপনি! আমার জুবিন প্রতিবন্ধী নয়!”
“চুপ!” গর্জে উঠলেন মহসিন কবির। জুবিন চায় না ওর কারণে এ বাড়িতে আর অশান্তি হোক। শান্ত গলায় বলল,
“আপনি যা বলবেন তাই করব আমি। এখন কি ঘরে যাওয়ার অনুমতি পাব?”
মহসিন কবির বললেন,
“এমনভাবে কথা বলছিস যেন তুই আসামি আর আমি জেলার।”
“ক্ষমা করবেন আমাকে। আমার কথার তেমন অর্থ ছিল না!” জুবিন আজ অস্বাভাবিক রকমের শান্ত। মহসিন কবিরের মোটেও ভালো লাগল না। মেজাজ আরও খারাপ হলো। হাত নাড়িয়ে বললেন,
“মানুষের ছেলেরা বাপের মুখ উজ্জ্বল করে, সম্মান বাড়ায়। আর আমার দুটোর একটা অথর্ব তো আরেকটা অপদার্থ!
ঠিক তখনই রবিন ঘরে ঢুকলো। সফুরা ও মর্জিনা আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখল। ওদের আর্ত মুখ থেকে থেমে যায় রবিন। ওর চোখজোড়া লাল। নেশা করে ফিরেছে! সফুরা সতর্ক করার আগে শিষ বাজিয়ে বলল,
“কী রে সফুরা, জ্বিন দেখলি না কি রে! ওমন ভয় ভয় কেন চোখে মুখে!”
সফুরা সতর্ক করার আগেই রবিনকে দেখে ফেললেন মহসিন কবির। বজ্রকণ্ঠে বললেন,
“ওই যে আমার বংশের প্রদীপ, আমার অপদার্থ ছেলে! এসো মানিক, তোমাকে বরণ করতে দাঁড়িয়ে আছি আমরা!”
রবিন ভেবেছিল এতক্ষণে খেয়ে দেয়ে মহসিন কবির অফিস ঘরে গিয়েছেন। তাই নেশায় হেলেদুলে ঘরে ঢুকেছিল। কিন্তু এখন ওর নেশা আধা উড়ে গেল। সুবোধ ছেলের ন্যায় গিয়ে দাঁড়ালো পিতার সামনে। আড়চোখে উপস্থিত সকলকে দেখে নেয়। ওর মায়ের চোখে পানি। জুবিনের মুখ নির্বিকার। বকা খেয়েছে নিশ্চয়! জব্বারকে দেখতে দাঁতে দাঁত পিষল। কিন্তু যেই না পিতার আগুন চোখে তাকালো অমনি দৃষ্টি লুকিয়ে ফেললো। ততক্ষণে ওর আরক্ত চোখ দেখে ফেলেছেন মহসিন কবির। রাগে লাল হয়ে গেল তার মুখ। পুরো বাড়ি থমথমে। হামিদা ঘর থেকে বেরিয়ে দাঁড়িয়েছে আড়ালে। রবিন সেদিকে তাকালো না। মহসিন কবির এগিয়ে এলেন,
“কোথায় ছিলি সারাদিন?”
“পরীক্ষা ছিল!” রবিনের কথা শেষ হতে না হতে সপাটে চড় বসিয়ে দিলেন মহসিন। টাল সামলাতে হিমশিম খেলো।
“এত বড়ো সাহস আমার সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যা বলিস তুই! জানোয়ার, গাণ্ডেপিণ্ডে গিলিস আর মুখের ওপর মিথ্যা বলিস। এই শিক্ষা দিয়েছি তোকে? বল কেন পরীক্ষা দিতে যাসনি!”
রবিন মুখ তুলে জব্বারকে দেখল। ওর মিথ্যা গোপন করার আগেই এবার জব্বার জানিয়ে দিয়েছে। রবিন উঠে দাঁড়ায়। ওর মাথা ভনভন করছে। জব্বারের দিকে ক্রোধিত চোখে তাকিয়ে বলল,
“পরীক্ষা দিতে যাইনি সেটা যখন আপনার কুকুর বলেছে, কেন দিইনি সেটা ঘেউ ঘেউ করেনি?”
মহসিন কবির ভূঁইয়া ছেলের স্পর্ধা দেখে খানিকক্ষণ নির্বাক হয়ে গেলেন। জব্বার লজ্জিত যত না তারচেয়ে আতঙ্কিত বেশি। বাকিরা বিস্ময়ে বিমূঢ়। রবিন নিজেও জিহ্বা কামড়ে ধরে। মহসিন কবির গর্জে উঠলেন,
“কী বলেছিস তুই?”
মহসিন কবির ছেলেকে প্রহার করতে হাত উঠাতে জেবুন্নেসা বাবা ও ছেলের মাঝে গিয়ে দাঁড়ালো। চড়টা পড়ল জেবুন্নেসার গালে। রবিন স্তব্ধ হয়ে দেখল। মহসিন কবিরের বিন্দুমাত্র অনুতাপ হলো না। বরং স্ত্রী বাধা হয়ে দাঁড়ালো বলে তার ওপর রাগ ঝাড়লেন। চুলের মুঠি চেপে ধরে বললেন,
“আরেকবার যদি আমার কোনো ব্যাপারে বাধা হয়েছিস তবে এখানে দাঁড়িয়ে তোকে তালাক দেবো, মা..!”
“খবরদার, আব্বা!”
মাকে পিতার কাছে থেকে টেনে সরিয়ে নিয়ে এলো রবিন। জেবুন্নেসার বাধা উপেক্ষা করে নিজের পেছনে আড়াল করে পিতার মুখোমুখি দাঁড়ালো। রবিনের পা টলছে। চোখের সামনে ঝাপসা ঠেকছে। পিতার নরকের মতো দু চোখে তাকিয়ে গলা শুকিয়ে এলো। কিন্তু একচুল সরে গেল না রবিন। কোন সন্তান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মায়ের অসম্মান বরদাস্ত করবে!
“তুই আমাকে খবরদার করলি রবিন?” অবিশ্বাস্য গলায় বললেন মহসিন কবির। রবিন ঢোক গিললো। জেবুন্নেসা ছেলেকে টানছেন। বেয়াদবি করতে নিষেধ করছেন। রবিন শুনলো না। দৃঢ়তার সঙ্গে বলল,
“আপনি আমাকে যা ইচ্ছে করুন মেনে নেবো। কিন্তু আমার মায়ের গায়ে হাত তুলবেন না, অসম্মান করবেন না। আমি বরদাস্ত করব না!”
“কী করবি তুই? কী করবি!” মহসিন কবির ফেটে পড়লেন। জব্বার শান্ত করতে গেলে ধাক্কা খেলো। জুবিন হুইলচেয়ারে ঠাঁই বসে ভাইয়ের দুঃসাহসিকতা দেখছে আর মুগ্ধ হচ্ছে। হামিদার বুক কাঁপছে। দাদিজানকে ডাকতে দৌড়ে গেল। সফুরা ও মর্জিনা বেরিয়ে এলো। আতঙ্ক ওদের মধ্যে।
“রবিন, সরে যা সামনে থেকে। উনি আমার স্বামী। আমাকে মারার হক উনার আছে!” জেবুন্নেসা অশ্রুরুদ্ধ গলায় বলতে ক্ষেপে গেল রবিন,
“স্বামী বলে মারার হক আছে তার? কে দিয়েছে তাকে এই হক?”
রবিন ঘুরে মায়ের মুখটা আঁজলা ভরে তুললো। চোখ মুছে দিয়ে বলল,
“এমন কথা বলতে নেই, মা। তুমি আমার মা। তোমাকে অসম্মান করে সাধ্য কার! আর বলবে না ওই নীচ কথা। আর বলবে না তার হক আছে তোমাকে মারার। তার কোনো হক নেই।”
জেবুন্নেসা কেঁদে উঠলেন। রবিন জড়িয়ে ধরল মাকে। মহসিন কবির ভূঁইয়া নীরবে দেখলেন। তারপর শীতল গলায় জব্বারকে আদেশ করলেন,
“আমার লাঠিটা নিয়ে আয় জব্বার!”
জেবুন্নেসা আঁতকে কেঁদে ওঠেন। স্বামীকে আকুতি জানালেন,
“ওকে মারবেন না। ও বোঝেনি। ওর মাথা ঠিক নেই। এই রবিন, আব্বার কাছে ক্ষমা চা। আমাকে ছেড়ে দে। ছাড়!”
রবিন মাকে ছাড়ে না। জব্বার সংকোচে লাঠি নিয়ে এলো। দুই মিনিটের পথ আসতে সাত মিনিট লাগল। ইতস্তত করে বলল,
“রবিনকে আমি বুঝাব ভূঁইয়া সাব। ছেলেটা অসৎ সঙ্গে পড়ে ছাই পাশ খেয়ে এসেছে। ওর মাথা ঠিক নেই। মাফ করে দিন এবারের মতো!”
“কুত্তার বাচ্চা, তোর কাছে লাঠি চেয়েছি না? দে লাঠি!”
জব্বার লাঠি দিতে বাধ্য হলো। জেবুন্নেসা চিৎকার করে উঠলেন। জুবিন হুইলচেয়ার ঠেলে এগিয়ে এলো। কিন্তু মহসিন কবিরকে আজ কোনো বাধা আটকে রাখতে পারল না। বসার ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো লাঠির আওয়াজ। রবিন মাকে দূরে ঠেলে চুপচাপ আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হলো। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল শেষে। মহসিন কবির ভূঁইয়া তবুও থামলেন না। যে সাহস আজ রবিনের মধ্যে জেগেছে তা এখনই ভাঙবেন তিনি।
“মহসিন, থাম বলছি! আমার কসম দিলাম তোকে!”
হনুফা বেগমের হুইল চেয়ার ঠেলে নিয়ে এলো হামিদা। মহসিন তবুও কী শোনেন! ছেলের হাত টেনে ধরেন হনুফা বেগম।
“ছেলেটাকে আর মারিস না রে। ও যে মরে যাবে!”
“মরুক! ওর এত সাহস আমার খায়, আমার পরে আবার আমার ওপর কথা বলে! গায়ে গতরে একটু বড়ো কী হয়েছে ও ভেবেছে যা ইচ্ছে বলবে! এত সাহস! বলাচ্ছি!”
লাঠি ফের তুলতে জেবুন্নেসা পায়ে পড়লেন, হনুফা বেগম ছেলের লাঠি চেপে ধরলেন। জুবিন হুইলচেয়ার ঠেলে ভাইকে আড়াল করল। তাকালো হামিদার দিকে। হামিদা খামচে ধরে আছে পরনের কাপড়। ওর দৃষ্টি স্থির রবিনের দিকে। রবিন কেন এভাবে মার খেল! ওর পিঠের রক্তে ভেজা সাদা শার্ট দেখে কেন পোড়ে হামিদার চোখজোড়া! জুবিন সফুরা ও হামিদাকে ডাকল,
“ওকে তুলে ঘরে দিয়ে আয়!”
” আমার অনুমতি ছাড়া কেউ কোথাও নেবে না ওকে। জব্বার, যা বাইরে ফেলে দিয়ে আয় রবিনকে। সারাদিন বাইরেই তো ছিল। রাতটুকুও বাইরে কাটিয়ে আসুক। ওর মতো অকৃতজ্ঞ, কুলাঙ্গার ছেলের কোনো প্রয়োজন নেই আমার।”
বাড়ির কেউই কোনোভাবে মহসিন কবিরের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারল না। জব্বার তুলে নিয়ে এলো বাড়ির বাইরে।
বাইরে প্রচন্ড শীতল বাতাস। রবিনের শরীর কাঁপছে। মারের চোটে জ্বর এসে গেল যেন! মহসিন কবির পিছু পিছু এলেন। আঙুল তুলে বললেন,
“গেটের বাইরের রাস্তায় ফেলে আয় ওকে। সকালে আসতে যেতে দেখুক মানুষ। জানুক এই মহসিন কবির ভূঁইয়ার অসম্মান করলে, বিরুদ্ধাচরণ করলে কেউ ছাড় পায় না। তার আপন সন্তানও না!”
জব্বার রবিনকে বসিয়ে দিলো গেটের কাছে। রবিনের মনে হলো ও বুঝি আজ মরেই যাবে। সারা শরীর ব্যথায় টনটন করছে। ওর চোখ ভেজা। বোধহয় অশ্রু পড়েছে। আবছা আলোয় জব্বারের মুখটা দেখল। কাঁদছে সে। রবিন হাসতে গিয়ে কেশে উঠল।
“তোমাকে আমি সাবধান করেছিলাম, বাজান!” বলল জব্বার। ওর চোখে মুখে অনুতাপ। রবিন হাসল। ব্যথায় কুঁচকে গেল মুখ। ঝুঁকে বলল,
“কষ্ট হচ্ছে তোমার? কিন্তু মার তো আমি খেয়েছি। একা আমি!”
রবিন আবার শব্দ করে হাসতে গিয়ে ব্যথায় ককিয়ে উঠল। জব্বার আর সহ্য করতে পারে না। উঠে বলল,
“নেশা করে মাথা ঠিক নেই তোমার। সকালে নেশা কাটলে বুঝবে কী ভুল করেছ।”
“তুমি আমার নেশা দেখলে জব্বার কাকা, ব্যথা দেখলে না।”
জব্বার রবিনের পিঠে তাকাতে রবিন মাথা দুলালো,
“ও ব্যথা নয়।” বুকের বা’পাশে আঘাত করে বলল,
“এই ব্যথার কাছে পিঠের ওই ব্যথা কিছু নয়, জব্বার কাকা৷ পিঠের ব্যথা দুদিন পরে সেরে উঠবে। কিন্তু আমার এখানে যে ব্যথা তুমি দিয়েছ জব্বার কাকা, তা যে সারবে না। কী ভেবেছে, ওই মহসিন কবির ভূঁইয়ার লাঠি ধরার সাহস ছিল না আজ আমার? ছিল জব্বার কাকা, ছিল। কিন্তু ওই লাঠি ধরলে যে তোমার কষ্ট দেখতে পারতাম না। কাঁদছ তুমি জব্বার কাকা? খবরদার সব চোখের পানি ফেলে দিয়ো না। তোমায় যে আরও কাঁদতে হবে। জমিয়ে রাখো ওই চোখের পানি!”
রবিনের ছমছমে হাসি। জব্বার পিছিয়ে গেল। বলল,
“পাগল হয়ে গেছ তুমি, বাজান।”
রবিন শব্দ করে হাসল। মাছি তাড়ানোর মতো হাত নাড়িয়ে জব্বারকে যেতে বলে বিড়বিড় করে বলল,
“আলবত হয়েছি। আলবত হয়েছি!”
জব্বার ফিরে গেল। একাকি ব্যথাহত রবিন বসে রইল সেখানে। হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো পেছনে। দেখল দাদিজানের ঘরের জানালার কাছ থেকে কেউ যেন চট করে সরে দাঁড়ালো। রবিন তবুও দৃষ্টি সরালো না। ওর ঘাড় লেগে এলো। পিঠে ব্যথা বাড়ল! অবশেষে হামিদা আবার উঁকি দিতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল। রবিন দাঁত কামড়ে জোরে জোরে বলল,
“সর্বনাশিনী, সর্বনাশিনী!”
হামিদা ভয় পেয়ে লুকিয়ে গেল। রবিন হাসল। বড়ো পাগল পাগল হাসি!
চলবে….

