হিয়ার টানে পর্ব-১৩ এবং শেষ পর্ব

0
773

#হিয়ার_টানে
#১৩ম_পর্ব_শেষ_পর্ব
#স্নিগ্ধতা_প্রিয়তা

আমরা বাস থেকে নেমে একটা রিকশায় উঠলাম। তারপর আবির আমাকে একটা কাজী অফিসের সামনে নিয়ে গেলো। সেখানে আগে থেকেই নিশি আপু আর আবিরের আরেকটা ফ্রেন্ড ছিলো। আমরা যাওয়ার পর আবির আমার সাথে ওই ছেলেটার পরিচয় করিয়ে দিলো। তারপর আমরা কাজী অফিসের ভেতরে ঢুকলাম।

সবকিছু হয়তো আগে থেকেই ঠিক করা ছিলো৷ তাই আমাদের বিয়ের সবকিছু শেষ করতে বেশি দেরি হলো না। এরমধ্যে আমাদের বাড়ি থেকে কয়েকবার ফোন এসেছে। আবির রিসিভ করেনি।

কাজী অফিস থেকে বের হতে প্রায় দুপুর হয়ে গেলো৷ আমরা সবাই একটা রেস্টুরেন্টে বসে লাঞ্চ শেষ করলাম। আমরা সেখানেই বসে আছি এমন সময় হিমার ফোন দেখে আবির রিসিভ করলো। তখন হিমা বলে উঠলো,

–“ভাইয়া তোমরা এখন বাড়ি চলে আসতে পারো! সবাই তোমাদের মেনে নিবে বলেছে!”

আবির অবাক হয়ে বলল,

–“তুইতো বলেছিলি যে, এসব নাটক! এখন মেনে নেওয়ার অভিনয় করছে!”

–“হ্যাঁ, বলেছিলাম! তবে এইবার সত্যিই মেনে নিবে বলেছে। বড় কাকা নিজে বলেছে যে, আজকেই সব আত্মীয়দের দাওয়াত করবে তোদের বিয়ে উপলক্ষে! যদি তোরা আজ ফিরে আসিসতো!”

–“কি বলছিস তুই এসব? আজকেই সবাইকে বলবে? এত তাড়াতাড়ি এত ব্যবস্থা কি করে করবে? আর এত তাড়াতাড়ি রঙ পাল্টানোর মানুষতো কাকা নয়! সত্যি করে বল কি হয়েছে?”

এইবার আবিরের থেকে আমি ফোনটা নিয়ে হিমাকে বললাম,

–“মা-বাবা কি বড় কাকাকে কিছু বলেছে? বাবার রাগ কমেছে?”

–“হ্যাঁ, সবাই রাজি হয়েছে। তোর বাবাকে বড় কাকার কাছে যেতে হয়নি! বড় কাকা নিজেই ছোট কাকা আর বাবার কাছে এসে বলেছে তোদের বিয়ের ব্যাপারটা তাড়াতাড়িই সবাইকে জানাতে!”

–“রিয়্যালি???”

–“হ্যাঁ, আর মজার ব্যাপার কি জানিস?”

–“না বললে জানবো কি করে!”

–“অভীক ভাইয়া এসেছে।”

–“তারমানে অভীক ভাইয়াই কি বড় কাকাকে রাজি করিয়েছে?”

–“জানিনা! তবে অভীক ভাইয়া উনার এক বান্ধবীকে নিয়ে এসেছে। আমারতো মনে হয় গার্লফ্রেন্ড! গ্রামের বাড়ি দেখাতে নিয়ে এসেছে!”

–“ওহ! তাহলে এই কাহিনী!”

–“কি কাহিনী? ”

–“অভীক ভাইয়া বাড়িতে একটা মেয়ে নিয়ে এসেছে! ব্যাপারটা বুঝতে পারছিস?”

–“এতে বুঝার কি আছে! সেতো আবির ভাইয়াও এনেছিলো!”

–“দুইটা ব্যাপার এক নয়! তুই বললি না অভীক ভাইয়া যাকে এনেছে সে উনার গার্লফ্রেন্ড হতে পারে! এই কারণেই বড়কাকা হয়তো আমাদের মেনে নিতে রাজি হয়েছে! নইলে নিজের ছেলের পছন্দের মেয়েকে কি মেনে নিতে পারবে!”

–“মানে? তুই কি বলতে চাইছিস হিয়া? বড়কাকা নিজের ছেলের জন্য তোদের মেনে নিচ্ছে?”

–“সিওর না! তবে আমার যা মনে হলো তাই বললাম!”

–“আর শোন আমি মাকে সত্যিটা বলে দিয়েছি।”

–“কোন সত্যি?”

–“চিঠির ব্যাপারটা! ”

–“আর কেউ জানে?”

–“না। আর সবাইকে অভীক ভাইয়া বলে দিয়েছে যে, চিঠির লেখাটা তোর থাকলেও ওটা অন্য একটা মেয়ে দিয়েছিলো। আমার মনে হয় এইজন্যই বড়কাকা কিছুটা শান্ত হয়েছে!”

–“সে যাইহোক! চাচি তোকে কিছু বলেছে?”

–“বকাঝকা করলো অনেক! তারপর তোর কথা বলে অনুশোচনা করলো! নিজের মেয়ের দোষের জন্য তোকে কত কথা শুনালো!”

আমাকে হিমার সাথে এতক্ষণ কথা বলা দেখে আবির বলল,

–“আবার পরে কথা বলিস! এখনি মনে হচ্ছে সব কথা বলে শেষ করে দিবি!”

আমি হিমাকে বিদায় জানিয়ে কলটা কেটে দিলাম। ওখান থেকে বের হওয়ার পর নিশি আপু আবিরকে উদ্দেশ্য করে বলল,

–“এখনতো তোরা লিগ্যালি হাজব্যান্ড-ওয়াইফ! আর কেউ তোদের আলাদা করতে পারবে না! তোর বাড়ি থেকে যখন ডাকছে তখন তোদের বাড়ি চলে যাওয়াই উচিৎ! এখানে হিয়া কোথায় থাকবে! আমিওতো বাসায় থাকি তোর ভাইয়ের সাথে। মেসে থাকলে না হয় আমার কাছে রাখতাম! আর তুইতো হোস্টেলে থাকিস! ওকে যার-তার কাছে রাখাটা ঠিক হবে না!”

আবির কিছুটা ভেবে বলল,

–“বাড়ি গেলে যদি আবার ঝামেলা হয়? আমার ভীষণ ভয় লাগছে! আমি হিয়াকে হারাতে চাইনা!”

–“ধুর পাগল! একবার পারিবারিকভাবে তোদের বিয়ের খবরটা জানাজানি হয়ে গেলে আর কে কাকে বিয়ে দেবে? আজতো যা! কোনো সমস্যা হলে না হয় আবার দুজন পালিয়ে আসিস! বিয়ের পরেইতো আর সহজে ডিভোর্স দেওয়া যায়না! সময়ের ব্যাপার আছে না! আর নেক্সট টাইম তুই ফেরার সময় বাসা ঠিক করে তারপর হিয়াকে নিয়ে আসবি! ওকে একা ওখানে না রেখে আসলেই হবে!”

–“কিন্তু আমারতো পড়াশোনা আছে! হিয়াকে আমার সাথে কি পাঠাবে?”

–“আরে পাগল আমিওতো পড়াশোনা করি! তোর ভাইওতো পড়াশোনা অবস্থাতেই বিয়ে করেছিলো! এখন না হয় জব করে! কই আমরাতো একসাথেই থাকি! তুই বুঝাবি সবাইকে!”

–“আলাদা থাকতে সমস্যা নেই! কিন্তু যদি হিয়ার আবার বিয়ে দেওয়ার চিন্তা করে!!”

–“তুই এক কাজ কর, তোর বাবার সাথে কথা বলে তারপর বাড়ি যা! তাহলেইতো হয়!”

–“গুড আইডিয়া! আমার বাবা একবার কথা দিলে তা কখনো ফেলবে না!”

নিশি আপুর কথামতো আবির ওর বাবার সাথে কথা বলল। তারপর খুশিতে প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল,

–“বাবা রাজি হয়েছে! আমরা আজ ফিরলে সবাইকে আমাদের বিয়ের ব্যাপারটা জানিয়ে দেবে! আর এখানে বাসা দেখে হিয়াকে নিয়েও আসতে দেবে! আমিতো ভাবতেই পারিনি বাবা… ”

আমি আবিরকে থামিয়ে দিয়ে বললাম,

–“সব বড়কাকার ভয়ে আমাদের সাথে এমন ব্যাবহার শুরু করেছিলো! এখন বড়কাকাই যখন রাজি তখন আর ভয় কি!”

তারপর আমরা নিশি আপু আর আবিরের আরেক বন্ধুকে বিদায় জানিয়ে বাড়ির পথে রওয়ানা হলাম। সারারাস্তা আমার ভীষণ চিন্তা হচ্ছে! বাড়ি গেলে কি হবে না হবে! আমি আবিরের কাঁধে মাথা রেখে চোখদুটো বন্ধ করে রাখলাম! ঘুম আর আসলো না! কাল থেকে জার্নি করতে-করতে আজকের জার্নিটা আর কিছু মনেই হচ্ছে না! আর আবির পাশে থাকায় আরো খারাপ লাগছে না!

অনেক চিন্তাভাবনা নিয়েই বাড়িতে ঢুকলাম আমি আর আবির। আজ সন্ধ্যে না হলেও সন্ধ্যের কাছাকাছি! আমাকে দেখেই আমার খালাতো বোন ছুটে আসলো৷ ওকে দেখে আমি কিছুটা অবাক হয়ে গেলাম। আরো অবাক হলাম যখন দেখলাম যে, আমাদের বাড়ি আর আবিরদের বাড়ি ভর্তি মানুষ! বাইরের কেউ না! আমার নানাবাড়ি,আবিরের নানাবাড়ি আর আমার ফুপুর বাড়ির সবাই এসেছে৷ আমাদের পরিবারটা আসলে অনেক বড়। তাই মনে হচ্ছে যে, পুরো একটা অনুষ্ঠান বাড়ি। আমি আর আবির আস্তে-আস্তে চারপাশে দেখে অবাক হয়ে গেলাম।

–“কিরে হিয়া, কোন কোচিং-এ ভর্তি হলি?”

আমার খালাতো বোন সুমির মুখে এমন প্রশ্ন শুনে আমি কি উত্তর দিবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। এমন সময় হিমা এসে বলল,

–“কোথায় আবার! উদ্ভাস কোচিং সেন্টারে!… হিয়া ভেতরে চল।…. ও কেবল বাইরে থেকে আসলো আর তুই প্রশ্ন শুরু করে দিলি!”

তারপর আমাকে টেনেটুনে আমার রুমে নিয়ে গিয়েই দরজা লাগিয়ে দিলো হিমা। তারপর বলল,

–“তোকেতো তখন আরেকটা কথাই বলা হয়নি!”

–“আবার কি কথা? আর সুমি কোচিং এর কথা কেন জিজ্ঞেস করলো?”

–“কারণ সবাই জানে যে, তুই কোচিং সেন্টারে ভর্তি হওয়ার জন্যই শহরে গিয়েছিস আবির ভাইয়ার সাথে।”

–“ওহ, এই কথা!”

–“শুধু তাই নয়! সবাইকে এটা বলেছে যে, তোর আর আবির ভাইয়ার বিয়েটা পরিবার থেকেই ঠিক করেছে!”

আমি খুশিতে যেন লাফিয়ে উঠলাম।

–“সত্যি? আমরা যে বিয়ে করে নিয়েছি এটা কাউকে বলেনি? ”

–“না। বড়কাকা বলেছে যে, বাড়ির মান-সম্মান নষ্ট করে কি লাভ! তাই এই বুদ্ধি!”

–“আর কোচিং?”

–” কোচিং বলবে নাতো কি এটা বলবে যে, ছেলে-মেয়ে দুইটা পালিয়ে গেছে!”

–“আমাকে জোর করে বিয়ে দিতে না চাইলেইতো আর এসব হয়না! ”

–“হুম। আর সবাই জানে যে, তুই যেহেতু কোচিং করবি! ওখানে একা থাকা ভালো না! তাই এখনি আবির ভাইয়ার সাথে তোর বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে!”

–“আজকেই? ”

–“পাগল হয়ে গেছিস মনে হচ্ছে! আজ-কাল জার্নি করেও ক্লান্ত হোসনি মনে হচ্ছে!”

আমি কিছুটা লজ্জা পেয়ে বললাম,

–“তুই-ইতো বললি!”

–“আজ সবাই এসেছে। কালকেই তোর আর আবির ভাইয়ার বিয়েটা সেরে ফেলবে।”

–“আমাদেরতো অলরেডি বিয়ে হয়ে গেছে! আবার কি বিয়ে পড়াবে?”

–“তা আমি কি জানি! ”

এমন সময় মা এসে দরজা ধাক্কাচ্ছিলো। আমি গিয়ে দরজা খুলে দিতেই মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে-করতে বলল,

–“তুই ঠিক আছিসতো? আমাকে চা বানাতে বলেই ফুড়ুৎ! আমার কত চিন্তা হচ্ছিলো জানিস! যখন মা হবি তখন বুঝবি! রাতে নাকি জ্বর হয়েছিলো? এখন ঠিক আছিসতো?”

মাকে এমন অস্থির হতে দেখে আমি তাকে শান্ত করে বললাম,

–“মা দেখো আমি পুরোপুরি ঠিক আছি এখন! তুমি শুধু-শুধু চিন্তা করছো!”

তারপর মায়ের সাথে আরো কিছুক্ষণ গল্প করে ফ্রেস হলাম।

রাতে আবিরের সাথে আর দেখা হলো না। পুরো বাড়ি লোকজনে ভর্তি! সারারাত আমার যেন ঘুম হচ্ছে না কালকের কথা ভেবে! কাল সত্যিই আমাদের পারিবারিকভাবে বিয়ে হবে! মানে সবাই মেনে নিবে আর কি! আমিতো খুশিতে আটখানা! ভাবলাম আবিরকে একটা মেসেজ করি! তখনি মনে পড়লো যে, আমার ফোনতো কালকেই ওই বুড়ী দাদী নিয়ে গেছে! তবে আমার সব কষ্ট সার্থক যে, আবির এখন আমার স্বামী। আচ্ছা আবিরও কি এখন আমার কথাই ভাবছে! এসব ভাবতে-ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নেই!

চারপাশে অনেক লোকজন! বেশি বড় না হলেও ভালই আয়োজন করেছে আমাদের বিয়ের! অনেকেই কানাঘুষা করছে যে, আমরা একে অপরকে পছন্দ করে বিয়ে করছি! তারাতো ভুল কিছু বলছে না! ভাবতেই লজ্জা লাগছে আমার!

আমার বিয়ে পড়ানোর সময় সবাইকে বের করে দিয়ে শুধু বাবা ছিলো। কারণ আমার বিয়েতো অলরেডি হয়ে গেছে! তাই শুধু ইমাম সাহেবকে গোপনে বিষয়টি জানিয়ে লোক দেখানো বিয়েটা সম্পন্ন হলো!

হিমা আর আমার অন্যন্য কাজিনরা আমাকে নিয়ে আবিরের ঘরে বসে আছে৷ আর একেকজন মজা করে একেক কথা বলছে৷ আর তা শুনে লজ্জায় নুইয়ে পড়ছি আমি! আবির রুমে ঢুকতেই সবাই বের হয়ে গেলো৷ আর আমি চুপটি করে একপাশে বসে আছি মাথা নিচু করে।

–“কিরে বরকে সালাম দিবি না! এতবড় হয়েছিস ভদ্রতা কিছু শিখিস নি!”

আমি মাথা তুলে বললাম,

–“আপনিওতো ভদ্রতা জানেন না! নতুন বউকে কেউ তুই করে বলে!”

আবির আমার পাশে বসতেই আমি সরে বসতে চাইলে আবির আমার কাঁধে হাত রেখে বলল,

–“তুই বলব না তাহলে? তুমি করে বললে তুই মানিয়ে নিতে পারবিতো! আর পালাচ্ছিস কেন? পালানোর জন্য বুঝি বিয়ে করেছিস!”

–“তুমি করে না বললে আমি কিন্তু…”

আবির আমার থুতনিটা ধরে মুখটা উপরের দিকে তুলে বলল,

–“আচ্ছা ঠিক আছে, আজ থেকে আমার মিষ্টি বউটাকে তুমি করেই বলব! খুশি!”

–“হুম”

আমিতো শুধু খুশি না! মহাখুশি! ভালবাসার মানুষটিকে পেয়েছি! আর কি চাই। আজ থেকেই যে শুরু হবে আমাদের দুই টুনাটুনির সংসার! সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন!!!

সমাপ্ত