হৃদমাঝারে তুমি ছিলে পর্ব-৪৩+৪৪

0
886

#হৃদমাঝারে_তুমি_ছিলে❤
পর্ব ৪৩+৪৪ [বিশেষ পর্ব]
#কায়ানাত_আফরিন❤

পিটপিট করে চোখ খুলতেই মাইশার চোখে-মুখে আছড়ে পড়লো কারও উত্যপ্ত নিঃশ্বাস। ব্যাথায় শরীরে টানাপোড়া শুরু হয়েছে মেয়েটার। জায়গায় জায়গায় অনুভব হচ্ছে নিবিড় কষ্ট। ধীরে ধীরে চোখ মেললো তাই। আয়াতের বিবরণ মুখখানা দেখা যাচ্ছে একটু কাছে। কি শান্ত আর গহীন তার চোখের দৃষ্টি। হঠাৎ মাসুদের সেই হিংস্র আচরণগুলোর কথা মনে পড়তেই সম্ভিত জ্ঞান ফিরে পেলো মাইশা। সাথে সাথেই উঠে বসে দেখতে থাকে আশেপাশে মাসুদ রয়েছে কি-না। কিন্ত এখানে মাসুদ ছাড়া সবাই আছে। মাইশার বাবা-মা, নুহাশ, অর্পি, আনান, সামাদ , পৃথা এমনকি শাওনও। বাইরেও আরও কিছু মানুষের উপস্থিতি বোঝা যাচ্ছে। মাইশা এখনও একটা ট্রমাতে। একটি মেয়ের জন্য সম্মানহানি বিষয়টা যে ঠিক কতটা অপ্রীতিকর সেই জিনিসটা সেই মেয়ে ছাড়া আর কেউ কল্পনা করতে পারবে না। শারমিন বেগম ক্ষণে ক্ষণে হু হু করে কেদে ওঠছেন। মাসুদের ব্যাপারে উনি জানতেন। কিন্ত বিয়েতে এতটাই চাপ ছিলো যে মেয়েটার দিকে এতটা মনোযোগ দিতে পারেননি কেউ। তাছাড়া ওই ছেলেটা যে স্টোররুমের অল্পসময়ের মধ্যে এতবড় একটা দুর্ঘটনা রটিয়ে দিবে তা জানলে বিন্দুমাত্র মাইশাকে সেখানে পাঠাতেন না তিনি।

আনান খাটের এক কোণে বসে আছে বিধ্ধস্ত ভঙ্গিতে। মাইশার এত নিস্তব্ধতা দেখে ছেলেটার প্রাণ শুকিয়ে যাচ্ছে। তবুও কারও মনে যেন সাহস নেই যে মেয়েটাকে কি বলে শান্তনা দেবে।

–মাসুদ কোথায়?

মাইশার শীতল কন্ঠ। ছেলেটার কথা মনে করতেই আয়াতের চোয়াল যেন আরও শক্ত হয়ে উঠলো। কিছু বলতে যাবে তখনই নুহাশ চেচিয়ে বলে ওঠলো,

–ওই জানোয়ারের বাচ্চাটাকে মেরে বাইরে ফেলে রেখেছি।এক ফুটাও নড়াচড়া করতে পারবে না ওই হারামজাদাটা। পুলিশ আসুক এরপরই ওর ব্যবস্থা হবে ।

–আমায় ওর কাছে নিয়ে চলো।

মাইশার এরূপ কথায় হকচকিয়ে গেলো সবাই। আয়াত অদ্ভুত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।আয়াত ওর হাত আগলে কিছু একটা বলতে যাবে মাইশা তখনই হাত সরিয়ে বললো,

–খবরদার আমায় কেউ ছোবেনা।

আয়াত হাত সরিয়ে ফেললো নিজের। মেয়েটা এখনও ওই পরিস্থিতিতেই আছে। মাইশা কোনোমতে উঠে সবার সাথে তাই বাইরে প্রাঙ্গনের দিকে গেলো। রুমের তুলনায় বাইরে মানুষের পরিমাণ আরও দ্বিগুণ। যেন এখানে কোনো স্টার প্লাসের সিরিয়াল চলছে ঠিক এমনভাবে তাকিয়ে আছে মাইশার দিকে। একপাশে দেয়াল ঘেষে স্তব্ধ হয়ে বসা মাসুদ। রক্তের স্রোতে ছেলেটার মুখের আকার পাল্টে গিয়েছে। এর এমন অবস্থা যে কে কে করতে পারবে এটা ভালোমতই জানে মাইশা। মাসুদের পাশেই ওর মা ওরফে অর্পির চাচি বসে আছে মাথায় হাত দিয়ে। মাইশাকে দেখামাত্র একটা ক্রোধের ভাব ফুটে ওঠলো উনার মুখে।
প্রাঙ্গনে মিজান সাহেব, আরিয়া আর রাহেলা বেগমও অনিমেষ পানে তাকিয়ে আছে মাইশার দিকে।মাসুদের মা ক্ষোভ সুরে বললো,

–আসছে এই ঢঙ্গী মাইয়া। আমার ছেলেরে মাইর খাওয়াইয়া শান্তি হয়নি তোমার?

মাইশা নিশ্চুপ। ওপাশ থেকে অর্পির বোন অরি বলে ওঠললো,

–ভুলে যাবেন না চাচি যে মাসুদ ভাই কি করছিলো আপুর সাথে…………

এতক্ষণের পুষে থাকা রাগটা যেন আরও চাড়া দিয়ে উঠলো অরির কথায়। তাই চেচিয়ে বলে ওঠলেন…

–ছেলে মানুষ এমনি এমনি এসব করেনি বুঝেছো? এই মেয়ের চরিত্রে সমস্যা আছে। নাহলে আমার মাসুদ জানলো কেমনে যে এই মেয়ে স্টোররুমে আছে। আমি নিশ্চিত এই দুশ্চরিত্রা মেয়েটাই মাসুদরে ভুলায়া ভালায়া উল্টাপাল্টা করার চেষ্টা করসে।

অর্পির মা আমেনা বেগম বলে ওঠলো.

–মুখ সামলে কথা বলেন ভাবি।

–আমি এতক্ষণ মুখ সামলেই ছিলাম। কিন্ত এখন আর পারবো না। যখন থেকে আসছি তখন থেকেই দেখতাছি এই মাইয়া বড্ড চালবাজ। একবার আনান , একবার সামাদ , আবার ওর পিরিতের খালাতো ভাই , খালাতো ভাইয়ের বন্ধুর সাথে ঘুটঘুট করে। আমি কি কিছু বুঝি না মনে করসো? শোনো আমেনা………….খোসা ছাড়া কলার দিকে একবার হলেও সবাই চোখ তুইলা তাকাইবো। এখন এই মাইয়া যদি আমার পোলার সামনে বুকের আচল ফেইলা ঘুটঘুট করে তবে কি আমার পোলায় একটু হলেও মধু খাইতে যাইবো না। আগে এরে ঠিক হইতে কও। দুশ্চরিত্রা কোথাকার!

আয়াত হাসলো বিব্রত ভঙ্গিতে। মনে পাহাড় সমান ক্ষোভ পুষে রেখেছে। আজ এই মাসুদের মা যদি মরুব্বি মানুষ না হতো নির্ঘাত আয়াতের হাতে রক্তারক্তি হয়ে যেতে। আশেপাশের মানুষও রীতিমতো কানাঘুষা শুরু করে দিয়েছে। আয়াত দু’কদম এগিয়ে গেলো মাসুদের মার দিকে। ভদ্ররূপি এই মহিলাটি সরু চোখে তাকালেন। আয়াত ঠোঁটজোড়া হালকা নাড়িয়ে বললো,

–হয়েছে আপনার কথা? এতক্ষণ আপনি অনেক কিছু বলেছেন আমরা বোবা মানুষের মতো আপনার কথা শুনছিলাম। বাট আর না ! ফারদার আমি যদি আমার হবু বউয়ের ক্যারেক্টার নিয়ে আপনার কাছে আর একটা কথাও শুনি আমি তবে ভুলে যাবো আপনি নুহাশ ভাইয়ের চাচি শ্বাশুড়ি । গট ইট !

আয়াত কথাগুলো অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে বললেও মুখ ইতিমধ্যে ভয়ঙ্কর লাল হয়ে গিয়েছে। ওই ছেলেটাকে একটু মারতে পারলে শান্তি হত……..কিন্ত আনান আর নুহাশ এরে মেরে যা অবস্থা করেছে, আর একটু মারলে যে বাচাঁর নিশ্চয়তা শতভাগ অনিশ্চিত হয়ে যাবে এটা ভেবে আয়াতকে থামিয়ে দিলেন মিজান সাহেব। রহমান সাহেবের ব্লাড প্রেশার একেবারে হাই হয়ে গিয়েছে। তরতর করে কপাল থেকে তাই বেয়ে পড়ছে ঘাম। পরিবারের লোকজনের অবস্থা কাহিল হলেও অন্যেরা মাইশাকে নিয়ে নিজেদের ভীড়ে নানা রকম জলপ করতে শুরু করেছে। কেউ মেয়েটার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাহাকার করে, তো কেউ কুৎসা রটিয়ে।
তন্মধ্যে বাড়িতে আগমন ঘটলো দলবলসহ কিছু পুলিশের। তাদের সাথে আরও দুজন মহিলা পুলিশও আছে। এখানে কি হয়েছে এটা সম্পর্কে আগেই ধারনা আছে উনাদের। পুলিশের একজন বলে ওঠলো,

–মাসুদ সিকদার কে গ্রেফতার করার জন্য আমাদের ওয়ারেন্টি প্রদান করা হয়েছে ওপর মহল থেকে। কোথায় সে?

সামাদ সসম্মানে উনাকে মাসুদের কাছে নিয়ে গেলো। পুলিশরা সবাই মাসুদের এ অবস্থা দেখে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইলেন । যদিও একজন রেপিস্ট হাতেনাতে ধরা পড়লে যে তার এমন ভয়াবহ অবস্থাই হয় এ সম্পর্কে উনাদের সবার ভালো ধারনা আছে।পুলিশ ভদ্রলোক তাদের লোকদের দিয়ে সুন্দরভাবে হাতে হ্যান্ডকার্ফ পড়াতে বললে এগিয়ে আসলেন মাসুদের বাবা। উনি জানেন যে মাসুদ হয়ত অন্যায় করেছে , কিন্ত কোনো বাবাই চাইবে না তার ছেলে জেল খাটুক। পুলিশ ভদ্রলোককে তিনি বললেন,

–একটু থামুন স্যার। আপনার আগে ভিক্টিমের সাথে কথা বলা উচিত। আমাদের ভাষ্যমতে হি ইজ নট রেপিস্ট। ভেতরে ভেতরে কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে।

নুহাশ এবার দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

–ওই ভদ্রমুখোশধারী লোক আপনাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে স্যার। আমার জানামতে ”অ্যাটেম্পট টু রেপ” এর কারনেও আসামিকে গ্রেফতার করা যায়।

এদের দুজনের দু’কথায় পুলিশ লোকটি এবার বিরক্ত হলেন। তাই ক্ষেপে গিয়ে তিনি বললেন,

–সে হিসেবে চাইলে আপনাকেও গ্রেফতার করা যায় মিঃ নুহাশ। আইন ভঙ্গ করে তা নিজের হাতে নেওয়ার ক্ষমতাও তো আপনার নেই।

দমে গেলো নুহাশ। পুলিশ সরু চোখে এবার সবাইকে পর্যবেক্ষণ করলেন কিছুক্ষণ। তারপর বলে ওঠলেন,
–ভিক্টিম কোথায়? তাকেও আমাদের সাথে থানায় যেতে হবে। তদন্তের জন্য আমাদের তার রিপোর্ট প্রয়োজন।

–আপনার কি মনে হয় স্যার একটি মেয়ে অ্যাটেম্পট টু রেপ এর মতো জঘণ্য পরিস্থিতে পড়ে কোনো কথা বলার মতো অবস্থায় থাকবে?

আয়াতের কড়া কন্ঠ। ভদ্রলোক বিব্রত ভঙ্গিতে হাসলেন। তারপর পাশের মহিলা পুলিশটি বললেন,

–দেখুন…………………..ভিক্টিমের বয়ান ছাড়া কিছুতেই আমরা আসামিকে গ্রেফতার করতে পারবো না।

এতক্ষণ পরে মুখ খুললো মাইশা। কাপাকাপা গলায় বললো,
–এখানেই রিপোর্ট নেয়া যায় না?

মহিলা পুলিশটি এবার বললেন,”আপনিই ভিক্টিম?”

”হ-হ-হ্যাঁ !”

এই উত্তরটি দেয়ার সময় মাইশার যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিলো। পুলিশ ভদ্রলোকটি এবার বললেন,
–ঠিক আছে। উনার এখানেই বয়ান নেয়া হবে। কেউ একজন একটি খালি রুমের ব্যবস্থা করুন প্লিজ। ভিক্টিমের এ দৃশ্য যারা দেখেছেন তারাও আমাদের সাথে থাকবেন।

কথামতো তাই-ই হলো। মাইশা-আনান-পৃথা আর পুলিশের সেই চারজন লোক সবাই বসে আছে একটি খালি রুমে। আর কাউকেই ভেতরে আসার অনুমতি দেয়া হয়নি। পুলিশ ভদ্রলোকের ইশারামতো মহিলা পুলিশ এবার বললেন,

–আমি এবার যা যা প্রশ্ন করবো সবকিছুর সঠিক সঠিক উত্তর দিতে হবে।ঠিকাছে?

–জ্বি।

–আসামী ঠিক কখন আপনার সাথে এমন করে?

–বাবার কথামতো স্টোররুম থেকে আমি গিফট আনতে গিয়েছিলাম। তখন আমার বড় ভাইয়ের বিয়ের কাজ শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ হবে। আর স্টোররুম ভেন্যু থেকেও খুব একটা দূরে না। দু সেকেন্ডের কাজের জন্য গিয়ে যে এত বড় কিছু একটা হয়ে যাবে তা মূলত আমি ভাবতেই পারিনি।

–আপনার দুই বন্ধু কখন গিয়েছে ওখানে? আপনার ভাষ্যমতে তো সবাই বিষের কাজে মশগুল ছিলো। তাহলে ওরা আসলো কিভাবে?

পুলিশের এরূপ উদ্ভট প্রশ্নে বিরক্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দেখা গেলে পুলিশ নিজের জায়গাতে ঠিকই আছেন। সন্দেহ আর সন্দেহই তাদের মূলকর্ম। মাইশা মৃদু গলায় বললো,

–ওইযে বললাম, স্টোররুমটা বিয়ের ভেন্যু থেকে বেশি একটা দূরে না। তাই আমার আসতে এত দেরি হচ্ছে দেখেই ওরা ওখানে গিয়েছিলো।

–আচ্ছা আসামি কেন এই অল্পমুহূর্তের মধ্যেই আপনার সাথে জোরপূর্বক ফিজিক্যালি ইনভল্ভ হতে চাইবে? আমাদের রিপোর্ট অনুযায়ী তিনি সম্ভবত আপনার চরিত্রে দাগ লাগাতে চেয়েছিলেন । বিষয়টি কেন? এমন তো নয় যে আপনার সাথে উনার রিলেশন ছিলো?

সহ্যের সীমা অতিক্রম হয়ে যাচ্ছে আনানের। তাই নীরবতা কাটিয়ে বললো,

–দেখুন ম্যাডাম এরকম প্রশ্ন আপনি করতে পারবেননা।

–আপনি চুপ থাকলেই ভালো হবে মিঃ। আমাদেরকে আমাদের কাজ করতে দিন।

আনান এবার চুপ হয়ে গেলো। পুলিশ মহিলাটি এবার তীক্ষ্ন চোখে মাইশার গলার দিকে তাকালেন। মাইশা ওড়না দিয়ে নিজেকে আড়াল করে রাখা সত্বেও অল্পবিস্তর সেই দাগগুলি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মহিলাটি পুনরায় বললেন,

–লাস্ট প্রশ্ন করবো। আপনার অবস্থা দেখে যতটুকু বোঝা যায় আসামী তার কাজে অনেকটুকুই সফল হয়েছে। তবুও সেই ইনসিডেন্ট এর পরিপ্রেক্ষিতে আপনার ইন্টারনাল ব্লিডিং হয়েছে?

লজ্জায়, বিব্রত হয়ে টুপ করে একফোটা জল গড়িয়ে পড়লো মাইশার। আনান-পৃথাও পেছনে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে। মাইশার এই কথাটি শোনার আগে বোধহয় মরে যাওয়াও ভালো ছিলো। ঠোঁট চেপে তবুও কান্না আটকিয়ে বললো,

–না।

এর বেশি আর কিছু বলতে পারলো না মাইশা।পুলিশের লোকজন ধন্যবাদ জানিয়ে মাসুদকে গ্রেফতার করে চলে গেলো নিজ ক্ষেত্রে। পিছু পিছু মাসুদের বাবা-মা ও গিয়েছে। এখন পুরো বিয়ে মহল শান্ত। এইতো দু আড়াই ঘন্টা আগে যেখানে আনন্দ মজলিশে গমগম করছিলো সেখানেএখন আগের ন্যায় অনেক মানুষ থাকলেও ধ্ধংসস্তূপ ছাড়া কিছুই মনে হলো না। মাইশা বিধ্ধস্ত অবস্থায় বসে আছে প্রাঙ্গনে। সবার মধ্যে রীতিমতো কানাঘুষা চলছে এ ব্যাপারে যে সাত-আট মাস পর হয়তো এভাবেই ওর বিয়েটাও হতো কিন্ত এই মেয়েটা কলঙ্কিত হওয়ার পর আদৌ এমন কিছু হবে? দোষ তো আর মাইশার ছিলো না। তবে কেন ওই নরপশু মাসুদের কর্মফল সে ভোগ করবে। মিজান সাহেব হাটু গেড়ে বসে পড়লেন মাইশার পাশে। চশমার ভেতর দিয়ে উনার আদ্র চোখযুগল স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
মাইশা এবার শীতল ভঙ্গিতে বললো,

–খালু তুমিও কি অন্য ৪-৫ জনের মতো আমায় দুশ্চরিত্রা উপাধি দিবে?

মেয়েটাকে এভাবে দেখে বুকটা হু হু করে ওঠেছে মিজান সাহেবের। যত জঘণ্য পরিস্থিতিই হোক না কেন, এই মেয়েটাকে প্রচন্ড বিশ্বাস করেন তিনি। আদরের সহিত তিনি এবার বললেন,

–না রে মা!

মাইশা এবার ঝপ করে মিজান সাহেবের বুকে মাথা এলিয়ে পাগলের মতো কাদতে থাকলো। মিজান সাহেব এবার যেন পাথর হয়ে গিয়েছেন। এই মেয়েটাকে সান্তনা দেয়ার পরিভাষা আর নেই। মাইশা কাদতে কাদতে এবার বললো,

–ওই জানোয়ারটা আমার সব স্বপ্ন চুরমার করে দিলো খালুজান। আমার সুন্দর ভবিষ্যতটা নিমিষেই তছনছ করে দিলো। এই সমাজ…………..এই সমাজ আমায় বাঁচতে দিবে না খালুজান। আমার ভালোবাসা-বন্ধু-পরিবার সবকিছু আজ হারিয়ে গেলো শুধু ওই জানোয়ারটার নোংরা ছোয়ায়।

মিজান সাহেব পরম মমতায় মেয়েটাকে থামানোর চেষ্টা করছেন কিন্ত তিনি ব্যর্থ। এর মধ্যে একজন বৃদ্ধ মহিলা বললো,

–ওই পোলায় কাম খারাপ করলেও এই মাইয়া যে নির্দোষ ওমন কিন্ত না। তালি কি আর এক হাতে বাজে? এখন এই মাইয়ারে কে বিয়া করবো আল্লাহ মালুম।

আরেকজন বলে ওঠলো,

–এমন মাইয়ারে কেউ বিয়া করে না আম্মা। বাপ-ভাইয়ের ক্ষমতা আছে। সেই ঘরে বইসা বইসাই খাইবো।

এমন হাজারো কথা শোনা যাচ্ছে আশপাশ থেকে।মিজান সাহেব এবার চেচিয়ে বললেন,

–এখন এসব কথা না বললে হয় না?

আয়াতের চাচি এবার বললো,
–কথা তো আর খারাপ বলেনাই কেউ। আপনি যে এত আদর দেখাচ্ছেন………….আপনি কি এখনও চাইবেন এই মেয়ের সাথে আপনার ছেলের বিয়ে দিতে?

হঠাৎ থেমে গেলো সব পরিস্থিতি।আয়াত এতক্ষণ একটা কথাও বলেনি…………….কেননা নুহাশ ভাই কড়ায় গন্ডায় বলে দিয়েছে আয়াত যেন আর একটা কথাও না বলে। এখানে আয়াতের কথা বলাতে পরিবেশ আরও বিগড়ে যেতে পারে তাই নুহাশ আগেই নিজের পূর্ব বিচক্ষণতার সাহায্যে আয়াতকে চুপ থাকতে বললো। মিজান সাহেব গম্ভীর হয়ে বসে আছেন। মুখ দিয়ে একটা কথাও বের হচ্ছনা বোঝাই যাচ্ছে খুব গভীর কিছু ভাবতে মগ্ন তিনি।সবাই ভেবে নিলো যে মিজান সাহেব হয়তো সুযোগমতো আয়াত আর মাইশার বিয়ে ভেঙগে দিবে। আয়াত তখনও উদাসীনভাবে ওর বাবার দিকে তাকিয়ে থাকলো।

নীরবতা কাটলেন মিজান সাহেব। ঠোঁট নাড়িয়ে বলে ওঠলেন,

–হ্যাঁ আমি দেবো আমার ছেলের সাথে মাইশার বিয়ে। আমার ছেলে ওকে আগলে রাখবে। ওর নিমিষে চুরমার হয়ে যাওয়া জীবনটা আবার স্বাভাবিক করে দেবে। আয়াত আর মাইশার বিয়ে হবে। আজই হবে। এখানেই হবে।

বিস্ময়ের একেবার চরম ধাপে চড়ে গেলো সবাই। সবাই এমনভাবে মিজান সাহেবের দিকে তাকিয়ে আছে যেন এই বিষয়টাকে টিভির পাতায় ব্রেকিং নিউজ করা যাবে।আয়াতের চাচি গাটা মেরে বললো,

–ভাই ভেবে চিন্তে বলসেন তো?

–একশবার ভেবে চিন্তে বলেছি। মাইশা আর আয়াতকে প্রস্তুত থাকতে বলো। আজই ওদের বিয়ে হবে। আমার এই ফুলের মেয়েটাকে নিয়ে আর কোনো কথা আমি শুনতে পারবো না।

মিজান সাহেবের কথায় রাহেলা আর রহমান সাহেবের মুখে ফুটে ওঠেছে কৃতজ্ঞতার হাসি।মাইশাও নীরবে নিজের খালুজানের দিকে তাকিয়ে আছে। আর পরপর জীবনের বড় দুইটা ধাক্কা খেলো। এত কিছু সামলাতে পারবে তো?

——————————————–

সন্ধ্যে নেমে রাত হয়েছে ৫ কি ছয় ঘন্টা হলো। আর এই সময়ের ব্যবধানেই ওলট পালট হয়ে গিয়েছে সবকিছু। হ্যাঁ , তিন কবুলের মাধ্যমেই বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে আয়াত আর মাইশার। যেই বিয়েটা হয়তো আরও ৭-৮ মাস পর ধুমধাম করে করা যেত তা পরিস্থিতির দায়ে পড়ে সম্পন্ন হলো আজকে। পুরো বাড়িতেই তুখর নীরবতা। কারও মধ্যে কোনো কথা নেই। এই পুরোটা সময় মাইশা পাথর হয়ে বসে ছিলো। পরে আনান আর পৃথার জোড়াজুড়িতে মাইশাকে নিয়ে যাওয়া হয় ওর নিজের ঘরে। মেহমানরাও সবাই নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছে। প্রাঙ্গনে গম্ভীর ন্যয় বসে আছে শুধু পরিবারের লোকজন। নীরবতা কাটিয়ে আরিয়া মিজান সাহেবকে বললো,

–বাবা ! ওদের বিয়েটা আজ না হলে হতো না?

–না হতো না। অল্প সময়ে মাইশা একটা কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। বড্ড নাজুক ধরনের মেয়ে ও। সেই দুর্ঘটনার পর ওর মনে ভয় ঢুকে গিয়েছিলো যে আয়াতও হয়তো ওকে ছেড়ে চলে যাবে। তারপর আরও ভেঙে পড়বে মেয়েটা। তুমি কি চাও এই সময়ের গতি ওকে তিলে তিলে শেষ করে ফেলুক !

মিান সাহেবের উত্তর যুক্তিসংগত। তাই কেউ আর কোনো কথা বললো না। এখন এই সময়ে কেবলমাত্র আয়াতই পারবে ওকে সামলিয়ে তুলতে।
——————————————–

শাওয়ারের নিচে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে মাইশা। পরনে জামাটি ভিজে গায়ের সাথে আটসাট হয়ে আছে। তবুও সেদিকে মাইশার ধ্যান নেই। বারবার আজকের সেই বিভৎস মুহুর্তগুলোর কথা বাতাসের ন্যায় চোখের সামনে প্রতিফলিত হতে থাকলো। পানির স্পর্শে মাসুদের সেই হিংস্র আচড়ের ব্যাথায় টনটন করছে শরীর। মাইশা তো কত কল্পনা করেছিলো ওর এই শরীরে বিয়ের পর শুধুমাত্র আয়াতের স্পর্শগুলো থাকবে। তবে মাসুদ কেন সেই জিনিসটুকু কেড়ে নিলো ওর থেকে? আয়াত কি ওকে তাহলে মেনে নিবে?চিৎকার করতে ইচ্ছে হচ্ছে ওর। আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলো না মেয়েটা। নিজের শরীরের সেই নোংরা স্পর্শগুলো দূর করার জন্য কাদতে কাদতে পাগলের মতো ঘষা শুরু করেছে।

আয়াত রুমে এসেই দেখলো ঘরটিতে পুরো অন্ধকার। বাথরুমের দরজাটি হালকা ভিড়ানো আর শাওয়ারের শব্দে বুঝতে বাকি রইলো না যে কি হতে পারে। দ্রুতপায়ে সেখানে এগিয়ে গেলো আয়াত………

ভেতরের সেই করুণ দৃশ্য দেখে আয়াত ভেতরে গিয়ে হতভম্বের মতো হাটুভেঙে বসে পড়লো সেখানে। শাওয়ারের পানিতে আয়াতও ভিজছে আংশিকভাবে। মাইশা পাগলের মতো শরীরে ঘষামাজা করে চলছে। কাপছেও অল্পবিস্তর। আয়াত ঠোঁটজোড়া হালকা নাড়িয়ে বলে ওঠলো,

–শান্ত হও মাইশু !

আয়াতের সম্মোহনী কন্ঠে করুন চোখে সেদিকে তাকালো মাইশা। শাওয়ারের ঝপঝপ পানিতে চোখ মেলে আয়াতের লোভনীয় মুখটার দিকে সে তাকাতে পাচ্ছে না। আদৌ কি এখন সে আয়াতের যোগ্য। এই সমাজ যে ওকে কলঙ্কিত করে ফেলেছে।মাইশা শীতল কন্ঠে বললো,

–কেন এসেছো এখানে? আমি তো দুশ্চরিত্রা। আমি রেপ এর মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়েছি। কেন বিয়ে করলে এই কলঙ্কিত মেয়েকে?

–এভাবে বলো না।

কেদে দিলো মাইশা। হিচকি তুলতে তুলতে বললো,
–তো কিভাবে বলবো? জানো ওই ম্যাডাম আমায় কি প্রশ্ন করেছিলো?সেই ইনসিডেন্ট এর পরিপ্রেক্ষিতে কি আমার ইন্টারনাল ব্লিডিং হয়েছে?আনান-পৃথা সবাই ছিলো ওখানে। লজ্জায় আমি কথা বলতে পারিনি। এর থেকে আমার মরে যাওয়াও……………….

মাইশার কথা শেষ হওয়ার আগেই আয়াত ক্ষিপ্ত গতিতে বুকে জরিয়ে নিলো মাইশাকে। মাইশা তখনও পাগলের মতো কেদে চলছে।কিন্ত আয়াতের হঠাৎ এভাবে ঝাপিয়ে পড়াতে কান্নার গতিটা হালকা কমিয়ে দিলো।অস্থির লাগছে ছেলেটাকে। আয়াত নিজের বলিষ্ঠ হাত মাইশার চুলে মৃদুভাবে আগলে রাখলো। তাই উষ্ণ নিঃশ্বাস অবিরামভাবে আছড়ে পড়লো মাইশার গলা আর ঘাড় সংলগ্ন স্থানে। আয়াত ঠোঁট কাপিয়ে মৃদুভাবে বললো,

–তুমি যেমন তোমাকে আমি তেমনভাবেই ভালোবাসি মাইশু। এই হাত না ছাড়ার কথা যখন দিয়েছি, তবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই হাত ছাড়বো না। আমি এক নারীতেই আসক্ত হতে চাই। মনেপ্রাণে বলতে চাই , ‘যত কঠিক পরিস্থিতিই হোক না কেন?এই মাইশুপাখিটা শুধুমাত্র আরহাম আয়াতের❤!
.
.
.
.
.
#চলবে………..ইনশাআল্লাহ
————————————