Home "ধারাবাহিক গল্প প্রেম প্রেম পাগলামী প্রেম প্রেম পাগলামী পর্ব-১৩

প্রেম প্রেম পাগলামী পর্ব-১৩

0
244

#প্রেম_প্রেম_পাগলামী
#পর্ব_১৩
#রেবেকা_খাতুন

সকাল হতেই মাহা নিজেকে আবিষ্কার করে তার নিজস্ব রুমে। গায়ের উষ্ণতা এখন স্বাভাবিক পর্যায়ে। মাথা ব্যথাটাও আর নেই। মাহা আড়মোড়া ভেঙে জোরে শ্বাস ছাড়ে। শরীরটা কেমন চনমনে। তবে নিজের দিকে তাকাতেই আঁতকে ওঠে কিছু সময়ের জন্য। নিজের পরণে নতুন কামিজ জড়ানো। তবে মুহূর্তেই তার মনটা স্থির হয়। ভাবে রাতে হয়তো তার মা-ই এসেছিল, তিনিই হয়তো জামাটা বদলে দিয়েছেন। মাহা বেড থেকে নেমে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মুখের নির্জীব ভাবে অনেকটাই কমে এসেছে। আয়নায় নিজেকে দেখে কেমন পূর্ণ পূর্ণ অনুভব করে সে। এই অনুভূতি তার কাছে নতুন নয়। প্রথমবার এই অনুভূতি হয়েছিল সেদিন, যেদিন আহাদ তাকে কাছে টেনেছিল। আহাদের কথা স্মরণে আসতেই মাহা থমকে যায়। ভাবে, লোকটার কাছে তো কাল রাতে যাওয়ায় হয়নি। মানুষটা একটাবার তার খোঁজ নিলনা? কাল যখন আকসা বেগম চড় মেরেছিলেন তখনও আহাদ ওনাকে কিছু বলেনি, মাহাকে কোনো সান্ত্বনাও দেয়নি। এমনকি মুখের উপর দরজাটা বন্ধ পর্যন্ত করে দিয়েছিল। মাহাকে কি তাহলে আহাদ সত্যিই ভুলে গেছে? মাহার ব্যবহারেই কি সে দূরে সরে গেছে? মাহার বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। অজান্তেই নোনা পানি জমে ওঠে চোখের কোণে। কার্নিশ বেয়ে ঝরেও পড়ে কয়েকফোঁটা। সে আলগোছে চোখের পানি মোছে। ফ্রেশ হয়ে আসতেই নীচে চিৎকার, চেঁচামেচির স্বর শুনতে পাই। মাহা দ্রুত পায়ে সেদিকে এগিয়ে যায়।

“তুই বিয়ে করবি কি না? আমার এসব আর ভা
লো লাগছেনা, চলে যাব এখান থাকে। যে সংসার আমার আপন নয়, সেই সংসারে থেকে কি লাভ?”
আকসা বেগম ভাঙা ভাঙা কন্ঠে কথাটা বলেন। ড্রয়িংরুমে সকলে উপস্থিত। খাবার টেবিলেই আকসা বেগম আহাদ আর পৃথার বিয়ের কথাটা তোলেন, কিন্তু সকলেই এই বিয়ের বিরোধিতা করেন।

“তোমাকে কোথায় যেতে হবেনা মা। আমি এমনিতেও আবার ফিরে যাচ্ছি। আমার মনে হয় আমি জোর করে তোমাদের মাঝে চলে এসেছি। চলে গেলে দেখবে সব প্রবলেম সলভ।”

আহাদ খেতে খেতে কথাটা বলে, কিন্তু খাবার টেবিলে যেন ছোটখাটো একটা বজ্রপাত হয়। মাহা সিঁড়ি দিয়ে নামছিল, কিন্তু তার পা জোড়া সেখানেই ঠাঁই দাঁড়িয়ে যায়। নীচে আসার মত শক্তি আর সে কুলাতে পারেনা। মুহূর্তেই বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। মনের মাঝে হাহাকার দেখা দেয়। অবাধ্য অশ্রুরাও ঝরে পড়ে কয়েকফোঁটা। এত কষ্ট কেন হচ্ছে তার? দমটা আটকে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এখনই বুঝি জানটা বেরিয়ে আসবে।

“চলে যাবি মানেটা কি? কেন চলে যাবি?”
আকসা বেগম অবিশ্বাস্য কন্ঠে কথাটা বলে ওঠেন। তবে আহাদের গা ছাড়া ভাব,
“থাকতে ইচ্ছা করছেনা। তাই চলে যাবো।”

“ওই মেয়ের জন্য তুই… তুই..!”

“মা প্লিজ! আমি কারো জন্য যাচ্ছিনা। এমনিতেও আমি কয়েকদিনের জন্য এসেছিলাম। সময় ফুরিয়েছে, তাই যেতে হবে। সেখানে অনেক কাজ। তাই এসব কান্নাকাটি বন্ধ করো। ভালো লাগছেনা!”

“হ্যাঁ, মায়ের কান্না ভালো লাগবে কেন? ভালো লাগবে তো অন্যকাউকে। তাই তো চলে যাওয়ার জন্য এমনটা করছিস!”

“আমার নিজের মনের কাছে কারো জোর খাটেনা। আমার ইচ্ছা হয়েছে, তাই যাবো। অন্যকাউকে এর মাঝে টেনোনা।”

“তোমার যাওয়ার কি দরকার আহাদ? এখানে থেকেই তো ব্যবসার হাল ধরতে পারো। নিজের কথা না ভাবো, আমাদের কথাটা ভেবে অন্তত থেকে যাও। কেন চলে যাওয়ার জন্য এমনটা করছো? কতবছর পরে তোমাকে পেলাম। আগেরবার তো হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেলে, হঠাৎ করে ফিরে এসে বললে তোমার বিয়ে হয়ে গেছে। বিয়েটা তুমি মানো। এসব কি ছেলেখেলা? তোমার মন যেটা চাইবে, সেটাই তুমি বারবার করবে? কারো কথা একটাবার ভাববেনা?

আহাদ কিছু বলেনা। মোট কথা তার কিছু বলতে ইচ্ছা করেনা।

আরবাজ চৌধুরী বিরক্ত হন ছেলের প্রতি। মনে মনে কষ্টও পান বটে।

“কবে ফিরবে ভেবেছো?”

“ভাবছি ওখানেই সেটেল হয়ে যাবো।”
আহাদের এই কথায় আরবাজ চৌধুরী সহ বাকিরা বাকরুদ্ধ হন। আহাদের মামা এতক্ষণে মুখ খোলেন,
“তুই এভাবে যেতে পারিসনা আহাদ। তুই বাবা মায়ের একমাত্র পুত্র সন্তান। সবার পরে তোকেই সংসারের হাল ধরতে হবে। আর তুই-ই যদি এভাবে চলে যাস, ব্যাপারটা কি ভালো দেখায়?”

“যেতে হবে মামা।”
ব্যস ছোট্ট একটা কথা বলে আহাদ আবারও খাওয়ায় মন দেয়।

“ওই যে এসেছেন মহারানী, এবার শান্তি তোর? এভাবেই ছেলেটাকে কেড়ে নিতে চেয়েছিলিস তো? এভাবেই দূরে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলিস? এবার তো শান্তি পেয়েছিস?”
আকসা বেগমের ঝাঁঝালো কন্ঠে সবাই মাহার পানে চায়। তবে মাহার কানে হয়তো আকসা বেগমের কথাগুলো প্রবেশই করেনি। সে তো অপলক চেয়ে আহাদের পানে। দৃষ্টির কোনো নড়চড় নেই। সে খুঁটে খুঁটে আহাদকে দেখছে। তবে বুকের মাঝে সে ঝড় বয়ে চলেছে, তার খবর কি কেউ রাখে? রাখেনা।

আহাদ খাবার খেয়ে উঠে দাঁড়ায়। নিজের রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেই শুনতে পায় আরবাজ চৌধুরীর কণ্ঠ,
“মেয়েটাকে এভাবে রেখে চলে যাওয়ার মানে কি?”
আহাদ এতক্ষণে মাহার দিকে চায়। মেয়েটির চোখদুটো বেশ সময় নিয়ে পরখ করে। চোখের মাঝেই মনের কষ্টকে খুঁজে নেওয়ার তীব্র প্রয়াস চালায়, সফলও হয় বটে। আহাদ মাহার চোখে চোখ রেখে বলে,
“মাঝে মাঝে অন্যের সুখের জন্য নিজের জায়গাটা ত্যাগ করতে হয় আব্বু। কারো ত্যাগেই হয়তো অন্যের সুখ নিহিত থাকে। তাই তো অন্যের সুখে বাধা হলাম না। যদি অপরাধ হয়, তো আমি অপরাধী। তাও অন্যের সুখের মাঝে আর আসবোনা।”
কথাটা বলে সেখানে আর দাঁড়ায়না আহাদ। উঠে যায় সিঁড়ি বেয়ে। মাহা দাঁড়িয়ে রয় ঠাঁই। বোঝার চেষ্টা করে আহাদের কথার যথার্থতা। বুঝেও ফেলে। যার দরুণ অশ্রুরা বাধ্যহীন ভাবে ঝরে পড়ে। সে আর রুমের পানে যায়না, বেরিয়ে যায় বাড়ির বাইরে।

—————–

আকসা বেগম বসে বসে কাঁদছেন। ওনাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন আহাদের মামী চুমকি বেগম ও পৃথা।

“ফুপি তুমি কেঁদোনা। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।”

“কিচ্ছু ঠিক হবেনা। আমার আহাদ ওই মেয়ের বশে চলে যাচ্ছে। এবার কি হবে? আর তো ফিরবেনা সে।”
আকসা বেগম আহাজারি করতে লাগলেন। কিন্তু পৃথার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে রহস্যময় হাসি।

“আহাদ ভাইকে যাওয়ার অনুমতি দাও ফুপি।”
পৃথার কথায় আকসা বেগমের কান্না থামে। তিনি অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে পৃথার পানে চান। তবে ধমকে ওঠেন চুমকি বেগম,
“এসব কি ধরনের কথা পৃথা? আহাদকে যাওয়ার অনুমতি দেবে মানেটা কি? সে গেলে আর ফিরবে? বোকার মত কথা কেন বলিস তুই? বিয়েটা আদেও করতে চাস তো?”

“আরে পুরো কথাটা বলতে তো দাও!”

“কি কথা?”

“আহাদ ভাইকে বলো মাহাকে ডিভোর্স দিয়ে তবেই যেতে। তারপর আহাদ ভাই যখন চলে যাবে, আমরাও ভিসা বানিয়ে আহাদ ভাইয়ের কাছে চলে যাব। তখন ওখানে আমি ওনার মন জুগিয়ে চলার চেষ্টা করবো। একদিন না একদিন আহাদ ভাই আমার প্রেমে পড়বেই। তখন আমার জন্যই ওনাকে ফিরে আসতে হবে। ছেলেদের মন, আজকাল তো এমনই হয়। জানো না বউ থাকতেও সবাই পরকীয়া করে? সেখানে বউ না থাকলে সে আমার মাঝে মজবেই।”

পৃথার কথায় আকসা বেগম আর চুমকি বেগম বেশ খুশি হন। আকসা বেগমের মুখে এতক্ষণে হাসি ফুটে ওঠে।

“এই না হলে আমার ভাইঝি। তোর পেটে পেটে এত বুদ্ধি। তুইই এই বাড়ির যোগ্য বউ হবি।”
এহেন প্রশংসায় হাসে পৃথা।

“তাহলে সুযোগ কাজে লাগাও ফুপি। আহাদ ভাই বিয়েটা আর চাইছেনা, তাই তো চলে যেতে চাইছেনা। লোহা গরম থাকতে থাকতেই হাতুড়ি মেরে দাও। ডিভোর্সটা করিয়ে দাও ওদের!”

————

মধ্যরাত্রি। আহাদ নিজের রুমের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে। মন বলছে মাহা আবারও আজ আসবে। তবে এসে সে আসলে করবে টা কি! সেটাই আহাদ দেখতে চাইছে। তার ভাবনা মতোই তার রুমে কেউ প্রবেশ করে। আহাদ হাসে।

“এবার তোমাকে ধরা দিতেই হবে সুইটহার্ট। সেই সব ব্যবস্থা আমিই করবো।”
আহাদ দৃষ্টি বাইরেই তাক করে দাঁড়িয়ে রয়। কেউ এসে তাকে বেশ শক্ত করেই জড়িয়ে ধরে। খুব শক্ত সেই বাঁধন, তবে আহাদের এই স্পর্শ মোটেও ভালো লাগেনা। সে বাঁধন খুলে পিছনে তাকাতেই দেখতে পায় পৃথাকে। মেয়েটা কেমন হাস্যোজ্জ্বল মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু মেজাজ বিগড়ায় আহাদের।

“এটা কি ধরণের অসভ্যতামি পৃথা?”
আহাদের মেজাজি কন্ঠে ভড়কে যায় পৃথা। আমতা আমতা করে বলতে থাকে,
“আমি তো তোমাকে…..!”

“এক্ষুণি বেরিয়ে যাবি তুই। জাস্ট লিভ!”
আহাদের কন্ঠে পৃথার সমস্ত নারীসত্তা কেঁপে ওঠে। ছেলেটাকে সে এহেন ব্যবহার করতে কখনই দেখেনি। ভাইবোনদের সাথে সে বরাবরই শান্ত ভাবে কথা বলার চেষ্টা করে, যদিও সবাই তাকে খুব ভয় পায়, তবুও।

“আমি তো…!”

“লিভ।”
পৃথা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা। দৌঁড়ে বেরিয়ে যায় রুম থেকে। পথিমধ্যে দেখা হয় মাহার সাথে। তবে সে আপাতত পাত্তা দেয়না সেসবকে।

আহাদ তাকিয়ে আছে দূর আকাশে। মনে মনে অনেক কিছুই ভাবছে। নিজের করে পেতে চাইছে মাহাকে। মনটা যে বড্ড শূন্য হয়ে আছে। বড়ই তৃষ্ণাক্ত সে। একটু শান্তির বর্ষণ প্রয়োজন। নইলে মনটা যে বড্ড নাজেহাল হয়ে যাচ্ছে। শরীরে অন্য কোনো রমণীর স্পর্শ সারাশরীরকে কেমন জ্বালিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে। সে চোখ খিঁচে বন্ধ করে নেয়। আবারও শরীরের মাঝে কেউ স্পর্শের প্রলেপ আঁকে। তবে সেই প্রলেপকে দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয়না আহাদ। তার আগেই ঝটকা মেরে সরিয়ে দেয় হাতজোড়। পিছনে না তাকিয়েই বলে,
“কেন এসেছিস এখানে? বেরিয়ে যা। জাস্ট লিভ। আই সেইড জাস্ট লিভ।”
মাহা কেঁপে ওঠে আহাদের এই কন্ঠে। ভিত হয় মন। আহাদকে সে এমন ব্যবহার কখনই করতে দেখেনি। অন্তত তার সাথে তো নয়ই। কটু কথার ঘাতে বেদনায় অক্ষিকোঠর ভরে আসে। কয়েকফোঁটা ঝরেও পড়ে। তবে পা বাড়িয়ে পিছিয়ে যায়না। দাঁড়িয়ে রয় ঠাঁই।

পিছনে এখনও কারো উপস্থিতি বুঝে এবার পিছু ঘোরে আহাদ। পৃথা ভেবে কিছু বলতে যাবে তার আগেই দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে মাহার মুখখানি। অভিমানিনীর নেত্রজুড়ে অশ্রুজল টলটলে। আহাদ যেন বাকরুদ্ধ হয়। পৃথা ভেবে মাহাকে অনেককিছুই সে বলে ফেলেছে, নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এসব ভেবেই ভিতরটা অনুসূচনায় দগ্ধ হয়। মেয়েটা যে তাকে ভালোবাসে। এখন কি অভিমান করে দূরে সরে যাবে? আহাদ সইতে পারবে তো? মরে যাবে না!

“তু…তুই…!”

“অন্যকাউকে আশা করেছিলেন বুঝি?”
মাহার শীতল কন্ঠস্বর, যা আহাদের ভিতরের সত্ত্বাকে নাড়িয়ে দেয়। সে তো কোনো অন্যায় করেনি, তাও যেন অজানা কারণে ভয় পায়। তবুও নিজেকে স্বাভাবিক রেখে প্রশ্ন করে,
“তুই এখানে?”

“আসতে পারিনা বুঝি? অন্যকেউ আসতে পারে?”

আহাদ মনে মনে বলে,
“তুই ছাড়া এই ঘর কেন! এই মনেও অন্য কারো স্থায়িত্ব আমি বরদাস্ত করিনা মাহা।”

আহাদকে চুপ থাকতে দেখে মাহা জ্বলে ওঠে। প্রজ্বলিত হয় তার আঁখিদ্বয়। আহাদকে অবাকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে সে তার টি-শার্টের কলার চেপে ধরে। টেনে নিয়ে আসে নিজের সম্মুখে। ওদিকে মাহার এহেন কাণ্ডে হতভম্বের ন্যায় তাকিয়ে থাকে আহাদ। মাহার রক্তিমবর্ণ চোখজোড়া দিয়ে যেন আগুন ঝরছে।

“পৃথা আপনাকে জড়িয়ে ধরেছিল?”
আহাদ যেন মাহার প্রশ্নে অবাকের সপ্তম পর্যায়ে পৌঁছায়। এতটাই অবাক হয় যে মাহার প্রশ্নের উত্তর দিতে ভুলে যায়।

চলবে…..