#প্রেম_প্রেম_পাগলামী
#পর্ব_১৪
#রেবেকা_খাতুন
উত্তরের আশায় সিক্ত নজরে চেয়ে আছে মাহা। অনেকক্ষণ কেটে গেলেও আহাদের দিকে থেকে কোনো উত্তরই আসেনা। মাহা ক্ষিপ্ত হয়। আহাদের টি-শার্টে টান দেয় আরও একটু জোরে।
“কি বলেছি শুনতে পাননি? উত্তর কেন দিচ্ছেন না? বলুন, পৃথা আপনাকে জড়িয়ে ধরেছিল?”
“ধরেছিল!”
আহাদের সহজ স্বীকারোক্তি। আর সেই স্বীকারোক্তিতেই বুঝি জ্বলে ওঠে মাহা। কঠোর দৃষ্টিতে চেয়ে বলে,
“কেন ধরবে? বলুন! ও আপনাকে কেন জড়িয়ে ধরবে?”
“কেউ যদি যেচে নিজের জায়গা ছেড়ে দেয়, অন্যরা তো সুযোগ খুঁজবেই। তাই না মিস চৌধুরী?”
আহাদের কথায় মাহার হাত আলগা হয়ে আসে। ভাবে, সে জায়গা ছেড়ে দিতে চাইলেই সবাই ঢুকে পড়বে কেন? আহাদ কি অন্যের সম্পত্তি? সে তো মাহার বর। তার দিকে নজর কেন দেবে? মাহা সেই চোখ তুলে নেবে না!
“অন্যরা সুযোগ খুঁজলেই আপনি সেই সুযোগের সৎ ব্যবহার করবেন?”
“সুযোগ পেলে কে না তার সৎ ব্যবহার করতে চায়?”
মাহা এবার দাঁতে দাঁত চাপে।
“আপনি…. আপনি…আপনাকে আমি মেরে ফেলবো।”
আহাদ মাহার থেকে নিজের টি-শার্ট ছাড়িয়ে নেয়। টি-শার্ট টিকে সামান্য ঝেড়ে বলে,
“আদরে, সোহাগে মারলে, আমিও মরতে পারি। আমার আবার মেয়েদের আদর খুব পছন্দ।”
মাহা আহাদকে আবারও চেপে ধরে।
“মেয়েদের আদর পছন্দ মানে? কতজন আদর করেছে আপনাকে? আর আপনি… আপনি না বিবাহিত? বিদেশ গিয়ে এসব শিখে এসেছেন? তাহলে আমার সাথে যেটা করেছিলেন, সবার সাথে কি….?”
শেষ বাক্যে মাহার কন্ঠ ভেঙে আসে। আহাদ মনে মনে বেশ তৃপ্তি পায়।
“বিদেশ গিয়ে কিছু করিনি। তবে বউ কাছে আসতে না দিলে পুরুষ মানুষ তো অন্য জায়গায় ছুক ছুক করবেই।”
“আপনাকে আমি ভালো ভেবেছিলাম। এবার.. এবার..!”
“এবার এবার না করে এখান থেকে যা। কাজ আছে আমার। ব্যাগ প্যাক করতে হবে।”
শেষ কথাটায় মাহার কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে আসে। আহাদের যাওয়ার কথা শুনে মনটা আবারও হাহাকার করে ওঠে। অজস্র ব্যথারা এসে আবারও দানা বাঁধে।
“আপনি সত্যি চলে যাবেন?”
“যেতে তো হবে।”
“কেন যেতে হবে? থেকে যান না।”
“থাকার কোনো কারণ নেই। কোনো পিছুটান নেই। আর যেখানে পিছুটান থাকেনা, সেখানে থাকার প্রশ্নই আসেনা।”
কথাটা বলে আহাদ আলমারির কাছে চলে যায়। অপেক্ষা করে মাহার জবাবের। ছেলেটা খুব করে চায়, মাহা একবার তাকে নিজের কাছে টেনে নিক। নিজের ইচ্ছায়। বাকি আহাদ নিজে বুঝে নেবে। শুধু একটাবার বলুক সে ডিভোর্স চাইনা, আহাদের কাছেই থাকবে। যদিও ইতিমধ্যে আহাদ জেনে গেছে মেয়েটা তাকে খুব ভালোবাসে। হয়তো নিজের চেয়েও বেশি, কিন্তু সেই ভালোবাসার স্বীকারোক্তি যে তাকেই করতে হবে। আহাদ আর জোর করবেনা, তাকে কাছে ডাকবেনা। এতে যদি মেয়েটা সামান্য কষ্ট পায়, তাও।
মাহা আহাদকে একটু সরিয়ে তার সামনে দাঁড়ায়। পিঠ থেকে আলমারিতে।
“কি সমস্যা তোর?”
“আপনি যাবেন না।”
“তোর কথায়?”
মাহা উচ্চস্বরে বলে,
“হ্যাঁ আমার কথায়। আমি যা বলবো আপনি তাই শুনবেন। বুঝেছেন?”
মাহার তেজি কন্ঠে মনে মনে বেশ খুশি হয় আহাদ। মেয়েটাকে এভাবে দেখতেও ভালো লাগে। পুরো ধনীলঙ্কা। মনে করে টুপ করে গিলে ফেলে তার ঝাঁঝ শুষে নিতে।
“তুই কোন দেশের মহারানী, যে তোর কথা শুনতে হবে?”
এমতা অবস্থায় মাহার কন্ঠস্বর কিছুটা মিইয়ে আসে।
“আমি কারো হৃদয়ের রানী। শুধুই এখন মানতে চাইছেনা।”
“তাহলে তো ভালোই। সে কপাল পোড়ার হাত থেকে বেঁচেছে, নইলে দেখা যাবে বাসর শেষে মেয়ে বলবে আমি বিয়েটা মানিনা। তার থেকে আগেই মানতে না চাওয়া ভালো।”
“কথা শোনাচ্ছেন?”
“একদমই না। আমি তো উদাহরণ দিলাম। এবার কৃপা করে আসতে পারেন। আমার অনেক কাজ।”
“যাবনা। কি করবেন আপনি?”
আহাদ ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ে।
“যেখানে ইচ্ছা থাক, আমার সামনে থেকে করে। কাজ করতে দে।”
“দেবোনা, কি করবেন? মারবেন? মারুন দেখি।”
“মেয়েদের গায়ে হাত তুলিনা আমি।”
“উঃ, কত ভালো পুরুষ উনি। সেদিন যে কষিয়ে মারলেন। তার বেলা?”
“চাচাতো বোন অন্যায় করলে মারা যেতেই পারে।”
কথাটা বলে আহাদ মাহাকে সরিয়ে দিতে যায়। সেই সুযোগেই মাহা আহাদের কোমর জড়িয়ে তার বুকে মাথা রাখে। আহাদ তাকে সরায় না। তবে মুখ থেকে বার করে গা জ্বালানো বাক্য।
“বেগানা পুরুষকে ছোঁয়ার আগে লজ্জা পেতে হয়।”
“বর বুঝি বেগানা পুরুষ হয়?”
“রুমে যা মাহা। এসব ভালো লাগছেনা। আর হুটহাট এভাবে জড়িয়ে ধরবিনা।”
মাহা এবার আহাদের কোমরে চাপ প্রয়োগ করে, কিন্তু মাহার নরম হাতের চাপে আহাদ ব্যথা পাবে কি! উপরন্তু আরো আরাম পায়।
“তো কে জড়িয়ে ধরবে? ওই শাকচুন্নিটা?”
“আমাকে কে জড়িয়ে ধরবে না ধরবে, তাতে তোর কি?”
“আমার অনেক কিছু। অনেক কিছু আমার। বুঝেছেন?”
“নাহ, বোঝা। এসব কর্মকাণ্ড রেখে বোঝা আমাকে।”
মাহা এবার আহাদকে ছেড়ে দিতে চাই, কিন্তু আহাদ সেই হাত চেপে ধরে।
“এভাবে থেকেই উত্তর দে। ফার্স্ট। অনেক কাজ আমার।”
“আহাদ ভাই…!”
“বল। জলদি!”
“এত তাড়াহুড়ো করছেন কেন? আগে তো এমন করতেন না!”
আহাদ কোনো উত্তর দেয়না, বরং বুকের মাঝে লেপ্টে থাকা প্রেয়সীর বুকের ধুকপুকানি শব্দের প্রতিটা স্পন্দন পরিমাপ করতে থাকে। তার হৃদয় আহাদের নামেই স্পন্দিত হচ্ছে এটা ভেবেই যেন তার মনের সব ক্লান্তি, ব্যাধি দূর হয়। একরাশ ভালোলাগার দোলারা এসে দোলা দিতে থাকে ক্ষণে ক্ষণে।
“আহাদ ভাই….!”
“শুনছি।”
“আপনার পিছুটান হওয়ার অনুমতি দেবেন আমায়?”
এহেন নিদারুণ প্রস্তাবে কেঁপে ওঠে আহাদ। বুকের মাঝে অসহ্য ভালোলাগারা ডানা মেলে উড়তে থাকে। সর্বাঙ্গ কেমন কেঁপে ওঠে। এমন আকুল আকুতি কি আহাদ ফেরাতে পারে? উহু! কখনই না।
“হঠাৎ আমার পিছুটান হওয়ার ইচ্ছা জাগলো যে? আমাকে নতুন ভাবে কষ্ট দেওয়ার ফন্দি আটা হচ্ছে?”
আহাদের কথায় মাহা একটুও মন খারাপ করেনা। আরো শক্ত করে চেপে ধরে আহাদের কোমর। নিজের সাথে একেবারে মিশিয়ে ধীর কন্ঠে বলে,
“আমি আপনাকে ভালোবাসি আহাদ ভাই। আর একবার নিজের মাঝে আমাকে ঠাঁই দেবেন?”
আহাদ মনে মনে হাসে। মেয়েটির ওই সহজ স্বীকারোক্তি তার হৃদয়ে যে কতটা প্রশান্তির ঢেউ তুলে দেয়, সেটা কেবল সেই জানে। তবুও নিজেকে শান্ত রাখে। নইলে অশান্ত হয়ে গেলে এখন তাকে ঠেকানোই দায় হয়ে যাবে।
“দেবেন না?”
“যে মেয়ে বিয়েটা মানেনা, আমাকে মানেনা। তার কথা কতটা বিশ্বাসযোগ্য?”
“আমার ভালোবাসা অনুভবের প্রথম দিন থেকেই আপনাকে ভালোবাসি আমি। আমি জানি। আমার মধ্যে স্পন্দিত হওয়া আমার হৃদয় জানে, যে কতটা তার আহাদ ভাইকে ভালোবাসে। যদি প্রমাণ দেখানোর সুযোগ হতো, আমি আমার হৃদয়ের প্রতিটা প্রকোষ্ঠের থেকে উত্তর এনে দিতাম।”
“তাহলে সেসব কি ছিল? কি কারণে এমন বারণ? এত কথা? ডিভোর্স চাওয়া?”
“আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছিল, তাই অমন করেছিলাম। আর কখনও অমন করবোনা। প্রমিজ।”
মাহা সত্যিটা চেপে যায়। সে চাইনা মা ছেলের মাঝে ঝগড়া হোক। মনের মাঝে তিক্ততা সৃষ্টি হোক।
“তোকে বিশ্বাস করা যায়?”
“একটাবার বিশ্বাস করেই দেখুন না, এই মাহা আপনাকে কখনই ঠকাবেনা।”
“বেশ, আমার ঠোঁটে একটা চুমু খা তো। দেখি বিশ্বাস করা যায় কিনা তোকে!”
মাহা আহাদের পানে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকায়। ছেলেটা এক্ষুণি কেমন ভারী কন্ঠে কথা বলছিল, হঠাৎ করেই কণ্ঠস্বরের এহেন পরিবর্তনে সে কিছুটা ঘাবড়ে যায়।
“চু… চু…. চু…!”
“চুমু। চুমু দিতে বললাম। দিলে দে। নইলে যা এখান থেকে।”
বলেই আহাদ মাহাকে ছাড়িয়ে নিতে যায়। তবে মাহা ছাড়েনা।
“দি… দিচ্ছি… দিচ্ছি তো। অমন করছেন কেন?”
“ব্যস্ত মানুষের সময়ের অনেক দাম, জানিসনা?”
“বেশ, তাহলে কাজ করুন, আমি পরে আসবো।”
“ধার, বাকি পছন্দ না আমার। আর যদি নিজেকে আমার কাছে বিশ্বস্ত বানাতে চাস, তো এই ছোট্ট কাজটা করতেই হবে।”
মাহা মনে মনে বিড়বিড়ায়,
“এটা ছোট্ট কাজ? চুমুর মত একটা জিনিস, সেটা কিনা আবার ছোট্ট কাজ?”
“কি ভাবছিস? তাহলে কি ভেবে নেবো, তোর মুখেই সব?”
“না না, দিচ্ছি তো। আপনি আগে চোখ বন্ধ করুন।”
“নাহ, এভাবেই দে।”
“বন্ধ করুন না।”
আহাদ বাধ্য হয়। চোখ বন্ধ করে ফেলে। মাহা ধীরে ধীরে এগোয় তার ঠোঁটের দিকে। যতই এগোতে থাকে, ততই যেন তার হৃদপিণ্ডের গতি বাড়তে থাকে। শেষ মুহূর্তে থেমে মাহা চোখ বন্ধ করে আহাদের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট স্পর্শ করে। এক সেকেন্ডের ব্যবধানে সরে আসতে চেয়েও আর সরে আসতে পারেনা। এবার আহাদ নিজে তার ঠোঁটজোড়া দখল করে নেয়। মাহার কোমর জড়িয়ে তাকে একদম নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। মাহা এহেন স্পর্শে কেমন কেঁপে কেঁপে ওঠে, তবে একটা সময় সায় দিতে থাকে।
এহেন সময় দরজার কাছে আসে মিসা। নিজের আপন ভাই, ও প্রাণপ্রিয় বোনকে এহেন অবস্থায় দেখে সে হকচকিয়ে যায়। চোখে হাত দিয়ে আমি কিছু দেখিনি হলে চিৎকার করেই দরজা বন্ধ করে চলে যায়।
ওদিকে মিসার গলা শুনে লজ্জায় মাহার মরিমরি অবস্থা। লজ্জার তোপে ছাড়িয়ে নিতে চাইলে বাঁধ সারে আহাদ। আরও শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয় মাহাকে। বিচরণ করে অবাধ্য হাতের। ওদিকে আহাদের এহেন কাণ্ডে হতবাক মাহা। ভালোলাগার অসহ্য পীড়ায় তার টালমাটাল অবস্থা।
চলবে…….

