Home "ধারাবাহিক গল্প প্রেম প্রেম পাগলামী প্রেম প্রেম পাগলামী পর্ব-১৬

প্রেম প্রেম পাগলামী পর্ব-১৬

0
271

#প্রেম_প্রেম_পাগলামী
#পর্ব_১৬
#রেবেকা_খাতুন

বর্তমানে খাওয়ার টেবিলে পিনপতন নীরবতা। আহাদের সম্পূর্ণ মনোযোগ খাওয়াতে। তবে বাকিদের হোস উড়ে যাওয়ার মত অবস্থা। বিশেষত আকসা বেগম ও ওনার ভাই, ভাবীর। বাকিরা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আহাদ যে হঠাৎ করেই এমন পাল্টি খাবে, সেটা কেউ বুঝে উঠতে পারেননি। মাহার দৃষ্টিতে আজ মুগ্ধতা। অবশেষে আহাদকে সে পেয়ে গেছে এটা ভেবেই মনের মাঝে অজস্র প্রজাপতিরা ডানা ঝাপটাচ্ছে। ভালোবাসার দোলা দুলিয়ে দিচ্ছে তার সমস্ত নারী সত্তাকে। তবে বড় মা নামক একটা ভয় এখনও তার মনে বর্তমান।

“এসব তুই কি বলছিস? এই না বললি বিদেশ চলে যাবি, এখানে থাকবিনা!”
আকসা বেগমের কন্ঠে অবিশ্বাস। ছেলে যে হঠাৎ করেই এমন উল্টো চাল চেলে দেবেন, সেটা তিনি একটুও বুঝতে পারেননি।

“বলেছিলাম, কিন্তু এখন যেতে ইচ্ছা করছেনা। থেকে যায়, বলো? তোমার তো ভালোই হলো, ছেলে দেশে থাকবে, এর থেকে খুশির কি হতে পারে! নাকি বিদেশ চলে যেতে বলছো? যাবো? তাহলে মাহাকে নিয়ে যায় কেমন?”

“নাহ!”
আকসা বেগম একরকম চেঁচিয়ে উঠলেন। সেই চেঁচানোতে সবাই অবাক হলো খুব।

“এমন কেন করছো মা?”

“তুই মাহাকে নিয়ে গেলে পৃথার কি হবে?”

“আমার সাথে ওর কি খোঁজ? তাছাড়া আমি বিবাহিত। বিবাহিত ছেলের প্রতি অনুরাগ থাকা পাপ। তুমি কি এখন আমাকে পরকীয়া করতে বলছো? ভালো লাগবে সেটা? ঘরে একজন, বাইরে একজন, ব্যাপারটা একটু দৃষ্টিকটু দেখায় না!”

আহাদের এই সুপ্ত অপমান গোগ্রাসে গিলে নিল পৃথা। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো নোনাজল। অপমানে শরীর কেমন শিহরিত।

পৃথার বাবা উঠে দাঁড়ালেন। চুমকি বেগম আর পৃথাকে টেনে নিয়ে চলে গেলেন বাড়ির বাইরে। উদ্দেশ্যে নিজের বাড়িতে যাওয়া। এত অপমান তিনি নিতে পারবেন না। পিছন থেকে আকসা বেগম কত ডাকলেন কিন্তু ওনারা ফিরলেন না। এবার আকসা বেগমের রাগ গিয়ে বর্তায় আরবাজ চৌধুরীর উপর।

“আমার ভাই, ভাবী এভাবে চলে গেলেন, আর তুমি তাদের আটকালেনা?”

“তোমার লজ্জা নাই বা থাকতে পারে, কিন্তু ওনাদের আছে। তাই তো ওনারা সন্মানের সাথে বেরিয়ে গেলেন। এখন আমি ওনাদের আটকানো মানেই ওনাদের আবারও অসম্মানিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। সেটা কি উচিত?”

আকসা বেগম আর কিছু বললেন না। রাগে গজগজ করতে করতে নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন। উনি যেতেই আসাদ চৌধুরী এবার মুখ খুললেন,
“তুই কি সত্যিই আমার মেয়েটার সাথে থাকতে চাস?”

“জ্বি ছোট আব্বু।”
আহাদের ছোট্ট উত্তর। তাতেই বুঝি হেনা বেগম ও আসাদ চৌধুরীর হৃদয় শান্ত হয়ে গেল।

“তাহলে কি মাহাকে আমার এবার থেকে ভাবী বলা লাগবে?”
মিসা কথাটা বলে মাহার দিকে ভ্রু উঁচায়।

“তোর যেমনটা ইচ্ছা তেমন ভাবেই ডাকিস!”

“ঠিক আছে ভাইয়া, আমি মাহাকে আজকে ভাবীজান বলে ডাকবো।”
মিসা একটু সুর করে কথাটা বলে। মাহা চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকায়। সকলে খাওয়া শেষ করে যে যায় কাজে বেড়িয়ে পড়ে। মিসা আর মাহা ইউনিভার্সিটির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। আহাদ নিজে তাদের ড্রপ করে দেয়।

ইউনিভার্সিটি প্রবেশ করতেই মাহার দেখা হয় অয়নের সাথে। সে মাহার সাথে দেখা করতে চাইলে মাহা তৎক্ষণাৎ মানা করে, কিন্তু অয়নের জোড়াজুড়িতে বাধ্য হয়ে কথা বলতে রাজি হয়।

বর্তমানে ইউনিভার্সিটির পাশের একটা ক্যাফেতে বসে আছে মাহা ও অয়ন।

“তুমি তাহলে কি সিদ্ধান্ত নিলে মাহা?”

“আমি আহাদ ভাইয়ের সাথেই থাকতে চাই স্যার। তাই আপনি আমার থেকে আর কোনো আশা রাখবেন না।”

“তুমি কি আমার সাথে এটা ঠিক করলে?”

“আমি খুবই দুঃখিত। আমি জানি, আমি আপনার সাথে যেটা করেছি সেটা ক্ষমার অযোগ্য। তাও যদি পারেন, আমাকে মাফ করে দেবেন। আসি।”
বলে মাহা আর সেখানে দাঁড়ায়না। অয়ন সিক্ত নয়নে তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকে অপলক।

———

রাত বেড়ে যায় নিজ নিয়মে, কিন্তু আহাদের ফেরার কোনো নাম নেই। মাহা আজ আহাদের রুমেই আছে। আকসা বেগমের সাথে সন্ধ্যার পর বেশ একরকম ঠাণ্ডা লড়াই চলেছে তার, তবে সে দমে যায়নি। বীরবিক্রমে নিজের অধিকারের জন্য লড়েছে। নিজের জায়গা বারবার আকসা বেগমকে বুঝিয়ে দিয়েছে। তবেই না আকসা বেগম দমেছেন, তবে রাগ এখনও কমেনি ওনার।

আহাদ বাড়ি ফেরে রাত তখন দুটো। রুমের দরজা খুলতেই মাহার ঘুম পাতলা হয়ে আসে। পুরোপুরি ঘুম ভাঙার আগেই আহাদ ওয়াশরুমে চলে যায়। বেরিয়ে এসে দেখে মাহা বিছানায় বসে আছে। সে মাহাকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে বেডের একটা পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর পায়তারা করে। মাহা বেশ অবাক হয় আহাদের এহেন কাণ্ডে। তার এহেন খামখেয়ালীপনায় চোখ ফেটে পানি আসার জোগাড় হয়।

“শুনছেন… শুনছেন…!”
মাহা দুবার ডাক দেয়, কিন্তু আহাদের কোনো সাড়া নেই। মাহা এবার আহাদের কাঁধে হাত রাখতেই আহাদ সেই হাত সরিয়ে দেয়। মাহা বোঝে আহাদ কোনো কারণে রেগে আছে তার উপর।

“আপনি এমন করছেন কেন? কি করেছি আমি?”

“ঘুম পাচ্ছে, ঘুমাতে দে। ডিস্টার্ব করিসনা।”
মাহার চোখ ফেটে অশ্রু নামে। সে ডির্স্টাব করেছে? কই! সে কি জিজ্ঞাসা করতে পারেনা? তার কি অধিকার নেই?

“আমার সাথে কথা তো বলুন। কোথায় ছিলেন এতক্ষণ?”

“সেটা তোর না জানলেও চলবে। তুই বরং অয়নের খোঁজ নে। কাজে দেবে।”
মাহা এতক্ষণে বোঝে আহাদের অভিমানের কারণ। অশ্রুসিক্ত নয়ন মুছে সে মিটিমিটি হাসে।

“আমি তো ওনাকে বলেছি আমার সম্পর্কে মনের মাঝে কোনো ভালোবাসা না রাখতে। আমি আপনার সাথে থাকতে চাই, সেটাও বলেছি। এবার আপনি যদি ওনার সাথে কথা বলতে বলেন, তো ঠিক আছে। আমি বরং যায়, একটাবার কল করে আসি ওনাকে।”
কথাটা বলে মাহা মিছিমিছি বেড থেকে নামতে যায়, কিন্তু তার আগেই আহাদ তাকে বেডের সাথে চেপে ধরে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“তোকে ভালোবাসি বলে বারবার আমাকে কষ্ট দেওয়া কাজ করবি? অয়নের সাথে কথা বলবি?”

“কেন বলেছি সেটা তো বললাম। রেগে কেন যাচ্ছেন? আমাকে কি বিশ্বাস হয়না?”

আহাদ ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে ঘুরে শুয়ে পড়ে। মাহার অভিমান জমে। সে আহাদকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“এভাবে মুখ ঘুরিয়ে থাকলে কিন্তু আমি নিজের রুমে চলে যাবো!”

“যা দেখি, ঠ্যাং ভেঙে রেখে দেবো।”

“তাহলে একটু ভালোবাসুন না, এমন কেন করছেন?”

“চুপ করে আছি বলে ভালো লাগছেনা? মুড এসে গেলে কিন্তু সারা রাতেও ছাড় পাবিনা। সামলাতে পারবি তখন?”
মাহা কিছু বলেনা, তবে আরো শক্ত হাতে আহাদকে জড়িয়ে ধরে।
“আপনার সব অভিমান আজ ভেঙে দিন, আপনাকে ভালোবাসি সেটার বিশ্বাস করাতে, নিজে হাতে আপনার কাছে নিজেকে সপে দেবো। আপনার সব অভিমান আজ ভালোবেসে ভেঙে দেবো। আপনি… আপনি মুখ ঘুরিয়ে থাকবেন না।”

আহাদ ঘুরে মাহাকে শুইয়ে দেয়। নিজে তার উপর আধশোয়া হয়ে বলে,
“পরে ছেড়ে দিন ছেড়ে দিন করবিনা তো? তুই নিজে থেকে ধরা দিচ্ছিস, আমি কিন্তু মোটেও ভদ্র হবোনা। অভদ্রামির চরম পর্যায়ে পৌঁছে যাবো আজ। সইতে পারবি তো?”

“সয়ে নেবো।”
ব্যস মাহার বলতে দেরি, অথচ আহাদের তাকে ভালোবাসো সিক্ত করতে দেরি হয়না। আহাদ যেন নিজের মাঝে নেই আজ। বদ্ধ উন্মাদ সে। আর সেই উন্মাদের প্রতিটা গাঢ় স্পর্শ, প্রতিটা ভালোবাসার আদর মাহা চুপচাপ সয়ে নিচ্ছে। আনন্দের অশ্রুতে সিক্ত হচ্ছে তার চোখ জোড়া। তবুও আহাদ তাকে মোটেও ছাড় দিচ্ছেনা। এতদিনের জমে থাকা কষ্ট, দুঃখ, যন্ত্রণা সব ভালোবেসে উগরে দিচ্ছে। রচিত হচ্ছে ভালোবাসার এক গভীর উপাখ্যান।

“ইউ আর মাইন সুইটহার্ট। আমার ভালোবাসার আদরে তোকে এমনভাবে বেঁধে রাখবো, কখনও ছাড়া পাওয়ার কথা মাথাতেও আনতে পারবিনা।”

“আমি ছাড়াতে চাইও না।
লাভ মি আহাদ, লাভ অ্যাজ মাচ অ্যাজ, আই ক্যান ফরগেট মাইসেলফ।”

চলবে…….