২৭.
স্পিকারে বাজছে অজিত কুমারের ভিলেন মুভির একটি তেলেগু গান – “হ্যালো হ্যালো…”
আর সেই গানের তালে তালে কোমর দুলিয়ে বাথরুমের আয়নার সামনে নেচে দাড়ি কামাচ্ছে রাহাত। পরনে সাদা গেঞ্জি। মুখভর্তি ফেনা। নাচের ফাঁকে ফাঁকে সহজ ভঙ্গিতে গালে ব্লেড চালিয়ে নিচ্ছে সে। ঠোঁটে লেগে আছে গানের গুনগুন শব্দ। মাঝে মাঝে হাসছে। রাহাত হাসলে, তার চোখদুটিও যেন হাসে!
রাহাত দাড়ি কামানো একেবারেই পছন্দ করে না। তার মতে দাড়ি ব্যক্তিত্ব এবং আত্মসম্মানের বিস্তৃত একটি অংশ বহন করে। এছাড়া তার গার্লফ্রেন্ডরা সবাই দাড়ির প্রেমেই পড়েছে বারবার। কাজেই, চেহারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যই যখন কামিয়ে ফেলছে সে, অবশ্যই বিশেষ কোনো কারণ আছে। সে কারণটিও অতি গুরুতর।
কাধ ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে নাচার মুহুর্তে দরজায় টোকা পড়ল।
– হায়দার নাস্তা খেতে আয়।
সকলে তাকে ‘রাহাত’ বলে সম্বোধন করলেও তার মা হোসনে আরা শেফালী ডাকেন হায়দার বলে। এ নামে ডাকলে তার মনে অজানা দৃপ্তি জন্ম নেয় প্রতিবার। ‘হায়দার’ নামটির অর্থ – সিংহ।
ইতিহাসে বর্নিত, ‘হায়দার’ ছিল ইমাম আলী (রাঃ) এর উপাধি। যিনি অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে ভয় পাননি কখনো। যিনি ন্যায়ের দীপ্তিতে মানুষকে মুগ্ধ করেছেন। কাজেই এই নামটি বীরত্বের অন্যতম প্রতিক। এই নাম বহন করে অদম্য সাহস।
শেফালী ঘরে ঢুকে হতবিহ্বল হয়ে পড়লেন ছেলের দাড়ি কামানো দেখে। অবাক স্বরে শুধালেন,
– কিরে, তুই দাড়ি কামাচ্ছিস কেন?
রাহাত হেসে বলল,
– এখন তো শুধুমাত্র কামাচ্ছি। একটু পর ক্লিন শেভ করব। তখন আমায় দেখতে চামড়া ছাড়া মুরগীর মত দেখাবে।
শেফালী বললেন,
– সেটা লাগুক। কিন্তু হঠাৎ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হবার কারণ?
– আর বইল না মা। ওই শালা রাশেদ স্যার..
এটুকু বলে রাহাত থেমে গেল। জিভ কামড়ে আড়চোখে মায়ের দিকে তাকাল। শেফালী ইতোমধ্যে রাগে ফোঁস করে উঠেছেন।
– এসব কি মুখের ভাষা, হায়দার?
– সরি মা। মিশন আছে সামনে। অন্যদের মুরগী বানাইতে হবে। তাই নিজে আগে মুরগী হইতেছি।
শেফালীর মুখখানা মলিন হয়ে গেল। “মিশন” শব্দটা যেন বুকের কোথাও তীব্রভাবে আঘাত হানল। কয়েক মুহুর্তের জন্য মস্তিষ্ক নিস্তেজ হয়ে এলো। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,
– দাড়ি কামানো হলে খেতে আয়। আমার হার্টের ওষুধ খেতে হবে। দেরি হয়ে যাবে।
রাহাত মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে রেখে বলল,
– আসছি মা। আর দশটা মিনিট সময় দাও আমাকে।
শেফালী চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।
মায়ের কাছে দশ মিনিট চাইলেও রাহাত শেষ স্ট্রোকটা দিয়ে দিল পরবর্তী পাঁচ মিনিটের মাঝেই। মুখ ধোয়ার পর আবিষ্কার করল তাকে একদম অন্য মানুষ লাগছে। আশ্চর্য হলেও সত্যি, তাকে সুন্দর দেখাচ্ছে। মানুষ বলে তার চেহারায় বাবার আদল রয়েছে। এতদিন সে বিশ্বাস করত না। তবে আজ মনে হচ্ছে মানুষেরা মিথ্যে বলে নি।
রাহাত নিজেই নিজেকে দেখে হাসল। এরপর ক্যাজুয়াল গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাহাত ডাইনিং এ এসে দেখল মা নেই। টেবিলে পরোটা, ডিমভাজি এবং সবজি রাখা।
রাহাত নিঃশব্দে মায়ের রুমের দিকে এগিয়ে গেল। অতি সন্তপর্ণে দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল, শেফালী দাঁড়িয়ে আছে। তার ছলছল চোখ দুটি তাকিয়ে আছে দেয়ালে ঝুলে থাকা একটি ছবির দিকে।
যে ছবিতে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন এক মানুষ।
রাহাতের বাবা। সিআইডির একজন যশস্বী অফিসার শহীদুল আলম। মানুষটার হদিস আর পাওয়া গেল না!
দিনটি ছিল বৃষ্টিভেজা। মালিবাগের পুলিশ কোয়াটারে স্বামীর বুকে শুয়ে বৃষ্টির ঝিরঝির শব্দ উপভোগ করছিলেন শেফালী। রাহাত তখন তার গর্ভে।
আচমকা কালো ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠল।
কয়েক সেকেন্ড কানে ফোন চেপে ধরে রাখলেন। এরপর শহীদুল আলম চুপচাপ উঠে দাঁড়ালেন। গায়ে জ্যাকেট চাপালেন।
হ্যারিকেনের ম্লান আলোয় শেফালী দেখছিল স্বামীর মুখের দৃঢ়তা। অজানা ভয় আঁকড়ে ধরে তাকে। স্ত্রীর কপালে প্রগাঢ় চুম্বনে ভয় খানিকটা শিথিল করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন শহীদুল। লাভ হয় নি।
সদর দরজা খুলে বাইরে পা রাখলেন তিনি। এক ঝলক বাতাস ঘরে প্রবেশ করল। পর্দাগুলোও নৃত্য করতে লাগল। শহীদুল বেরিয়ে গেলেন। ঘরে থেকে গেল কেবল বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ আর একজন স্ত্রীর নিঃশব্দ প্রতীক্ষা। যে প্রতীক্ষা কোনোদিন ফুরালো না।
রাহাত নীরবে এগিয়ে গেল মায়ের কাছে। পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল তাকে।
– মন খারাপ কেন, মা?
শেফালী প্রত্যুত্তরে কিছু বললেন না। ছেলের হাতের ওপর নিজের হাত আলগোছে রেখে বললেন,
– মন খারাপ না। আজ তোকে সুন্দর লাগছে। খুব সুন্দর।
রাহাত হেসে শুধালো,
– বাবার মত সুন্দর?
শেফালী হেসে বললেন,
– না। আমার স্বামীর মত সুন্দর হতে পারিস নি।
– অন্তত মন রাখার জন্য হলেও মিথ্যে বলতে পারতে, মা।
রাহাত তার হাতের বাঁধন আরোও শক্ত করে বলল,
– মা, শোনো। একদম চিন্তা করো না। আমি ফিরে আসব। সবসময় যেভাবে আসি। এই তোমায় ছুঁয়ে কথা দিলাম। মন খারাপ করো না, প্লিজ।
শেফালী মাথা নাড়লেন। বললেন,
– আমি মন খারাপ করি না রে, বাবা। বরং গর্ববোধ করি। সবাই জানে আমি একজন দেশরক্ষকের মা। তোর ওপর আমার যতটা অধিকার, তার চেয়েও বেশি অধিকার এই দেশের। আমি চিন্তা করি না, বাবা। শুধু প্রার্থনা করি যেন তুই ফিরে আসিস। আর বার বার নিজেকে সঁপে দিতে পারিস একজন সত্য-যোদ্ধা হিসেবে। তোর উদঘাটিত সত্যি যেন ন্যায়ের স্রোত বয়ে আনে দেশের বুকে।
রাহাত মাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে কপালে আলতো করে চুমু খেল। বলল,
– তোমার ছেলে কোনোদিন এই দেশকে এবং তোমাকে নিরাশ করবে না, মা। এবার খেতে চলো। হার্টের ওষুধ নিয়মমাফিক খেতে হয়। তুমি প্রচুর অবহেলা করো।
দুজন একসাথে ডাইনিংয়ে ফিরে খেতে শুরু করল। সহসা কলিংবেলের শব্দ শোনা গেল।
‘এমন সময় কে এল?’ – একথা বলতে বলতে রাহাত দরজা খুলে দেখল সারথি দাঁড়িয়ে আছে।
হাতে একটা ফাইল। চোখেমুখে দুষ্টু হাসি।
সারথির বাবা এবং রাহাতের বাবা কাছের বন্ধু ছিলেন। এছাড়া সারথি এবং রাহাত একই স্কুলে পড়ত। যদিও সারথি জুনিয়র। কাজের স্থানে প্রফেশনালিজম বজায় রাখলেও বাড়িতে যেন ঠিক উল্টোরথ!
– সকাল সকাল ঘর থেকে বের করে দিয়েছে নাকি তোকে?
রাহাত হেসে শুধালো।
সারথিও হেসে জবাব দিল,
– হ্যাঁ দাদা। খেতেও দেয় নি। তাই ভাবলাম আরেক মায়ের বাসায় এসে আয়েশ করে খেয়ে নেই।
শেফালী সারথিকে দেখে হেসে বললেন,
– আয় মা, ভেতরে আয়। নাস্তা তৈরি আছে। পেট ভরে খা।
সারথি টেবিলে গিয়ে বসল। একটি পরোটা প্লেটে নিয়ে বলল,
– দাদা, তোমার মিশনের প্রস্তুতি কত দূর?
রাহাত গম্ভীর গলায় বলল,
– দাড়ি কামায় ফেলেছি। এখন চিন্তা করে বল কতদূর।
সারথি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। এরপর হঠাৎ হাসি থামিয়ে বলল,
– তুমি রাশেদ স্যারের সাথে কেন এমন কর সবসময়? বেচারা একটু তোমার ওপর নির্ভরশীল বলে এমন করবে? শুধু শুধু তামিল সিনেমার এই সেই বলে মজা নাও।
শেফালী ভ্রু কুঁচকে তাকালেন সারথির দিকে।
– কী বলেছে হায়দার?
সারথি আঁড়চোখে রাহাতের দিকে তাকাল। রাহাত ইশারায় মানা করল তাকে। মনে মনে বলল, কিছু বলবি না, সারথি। খবরদার! বললে একেবারে মেরে ফেলব।
সারথি সবটা বুঝে ফেলল। এরপর প্রসঙ্গ পালটে বলল,
– মাসি, দাদার মিশন সম্পর্কে জানো তুমি? একটা ভয়ংকর চক্র ধরতে যাবে। নারী পাচার চক্র।
শেফালীর মাঝে এ বিষয়ে কোনো আগ্রহ নেই। মুখে যতই বলুক মায়ের মন বলে কথা। খচখচানিটা দূর হবে কিভাবে?
রাহাত বিষয়টই বুঝতে পারল। কথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে বলল,
– আমার একটা গার্লফ্রেন্ডও দাড়ি কামানো অবস্থায় দেখতে পেল না। আফসোস।
– তোমার যেন কতজন গার্লফ্রেন্ড ছিল?
জিজ্ঞেস করল সারথি।
– সাড়ে তিনজন।
– সাড়ে তিনজন আবার হয় কিভাবে?
– একজন সম্পর্ক নিয়ে কনফিউজড ছিল। তাই তাকে সম্পূর্ণ গার্লফ্রেন্ডের খেতাব দেওয়া হয়নি।
রাহাতের কথা শুনে শেফালী এবং সারথি দুজনেই উচ্চ শব্দে হেসে ফেলল।
খাওয়া শেষে রাহাত এবং সারথি চা নিয়ে বসলো ড্রইংরুমে।
সারথি বলল,
– এবার শুনো এত সকালে তোমার বাসায় হানা দেবার আসল কারন। চক্রটিকে ধরার সাথে সাথে তোমার আরেকটা কাজ করতে হবে দাদা।
রাহাত সবে মাত্রই বিড়ি ধরিয়েছে। সিলিং এর দিকে তাকিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে জিজ্ঞেস করল,
– কী কাজ?
– একটা মেয়েকে ওই নরক থেকে উদ্ধার করতে হবে।
– মেয়ে? কে সে?
– তালুকদার বাড়ির বড় ছেলে তুর্জয় তালুকদারের দ্বিতীয় স্ত্রী, চারুলতা। বাল্যবিবাহের শিকার। অল্প কয়দিনের ব্যবধানে তার বোন আর বাবা দুজনেই মারা যায়। এও এক অমিংমাসিত রহস্য। বোনের লা/শ এখনো পাওয়া যায় নি। আমার মনে হয় পুরো বিষয়টি একটি রাজনৈতিক চাল। তালুকদার মশাই তেঘরিয়াতে তার প্রভাব বিস্তার করতে, সুনাম কামাতে এতিম মেয়েটাকে তার ছেলের বউ করে ঘরে তুলেছিল।
রাহাত ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি টেনে বলল,
– তুই আমাকে অন্যের স্ত্রী নিয়ে ভাগতে বলছিস? পাগল আমি?
সারথি চোখ নামিয়ে বলল,
– দাদা, তুই জানিস না মেয়েটার সাথে কি কি ঘটেছে। সে কেবল নামেই স্ত্রী। তুর্জয় তালুকদার বাসর রাতে তাকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে একজন প্রস্টি/টিউ/ট এর সাথে রাত কাটিয়েছে। এখন মেয়েটা কেমন অবস্থায় আছে কে জানে!
রাহাতের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করল,
– মেয়েটার বয়স কত?
– পনেরো।
রাহাতের দাঁতের ফাঁক দিয়ে একটা অশ্রাব্য গালি বেরিয়ে এল।
– এরা মানুষ না পশু!
সারথি মন খারাপ করে বলল,
– বাচ্চা একটা মেয়ে। ওই নরকে থাকলে ধুঁকে ধুঁকে মরবে। গ্রামের লোকেরা বলে বেশ চঞ্চল ছিল সে। পড়াশোনার প্রতিও আগ্রহ ছিল। মেয়েটা একটা সুন্দর জীবন ডিজার্ভ করে।
রাহাত ধোঁয়ার কুণ্ডলী পুনরায় ছেড়ে বলল,
– হুঁ, মাথায় রাখলাম। মেয়েটার নাম কি?
– চারুলতা।
চা শেষ করে সারথি উঠে দাঁড়াল।
– দাদা, আমি যাই। অফিসে একটু কাজ আছে। আর অল দ্যা ভেরি বেস্ট। নিজের যত্ন নিও। মিশন সাকসেস হোক।
রাহাত হেসে বলল,
– থ্যাংক ইউ রে। তুইও ভালো থাকিস।
সারথি চলে যাবার পর রাহাত পুনরায় আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজেই নিজেকে বলল,
– তোকে পারতেই হবে রাহাত। দেশের জন্য। মায়ের জন্য। মৃত বাবার জন্য।
রাহাত নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগল সত্য উদঘাটনের জন্য। অবচেতন মনে ‘চারুলতা’ এর বিষয়টিও উঁকি দিতে লাগল বার বার।
(চলবে…)
২৮.
তেঘরিয়ার নিস্তব্ধ রাত আজ থমকে আছে অতি নিজস্ব নিঃশব্দতায়। তবে গ্রামীণ শোরগোল থেকে মুক্তি মিললেও প্রকৃতি মেতে উঠেছে আপন সুরচিত সংগীতে। হেমন্তের মাতাল হাওয়ায় ঝিরিঝিরি কাঁপছে আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা শিউলির পাতা। ফুল বিহীন গাছটিকে আজ কেমন যেন অন্যরকম লাগছে।
বহু দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে। এরকম নিস্তব্ধ রাতেই তাদের আনাগোনা বেশি। সেই ভয়ংকর ডাক এসে মিশে যাচ্ছে পবনে। বহন করছে অচেনা কোনো বার্তা কিংবা সতর্কবাণী।
চাঁদহীন আকাশে আজ তারাগুলোও অনুপস্থিত। এই ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে তালুকদার মশাই দাঁড়িয়ে আছেন বারান্দায়। চোখে মুখে কুটিলতা। আরোও একটি চক্রান্তের বিজ বুনতে চলেছেন তিনি আজ।
ঢাকা থেকে তুর্জয় ফিরে আসার পর প্রথমবার আজ বড় ছেলে তুর্জয়ের কক্ষে যাবেন তিনি। ছেলেকে কোনো মূল্যেই হাতছাড়া করা যাবে না।
তালুকদার মশাই তুর্জয়ের ঘরে ঢুকলেন।
তুর্জয় তখন বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় শুয়ে বিড়ি টানছে। চোখে অন্যমনস্কতা।
বাবাকে দেখে সে ভালোভাবে উঠে বসল।
তালুকদার মশাই হালকা গলায় বললেন,
– কেমন আছিস?
– ভালোই আছি।
একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে তালুকদার আবার শুধালেন।
– ব্যথা কমছে?
তুর্জয় শুধু হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।
তালুকদার মশাই ধীরেসুস্থে বসলেন বিছানার কিনারায়। একটু থেমে মৃদু স্বরে বললেন,
– চারুলতা কেমন খেদমত করতেছে?
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর এলো না। তুর্জয়ের বিড়ির টান গভীর হল।
– চুপ করে আছিস কেন? বউ কি সেবাযত্ন করতেছে না?
তালুকদার মশাইয়ের কণ্ঠটা এবার কঠোর শোনালো।
তুর্জয় গলা খাঁকারি দিয়ে সহজ গলায় বলল,
– নাহিদা ফিরা আসার পর থেকে চারুলতা আমার কাছে আসে না, আব্বা। ওয় পাল্টাইয়া গেছে।
তালুকদার মশাইয়ের কপাল কুঁচকে গেল। চোখের কোণে ক্ষীণ রাগের আঁচ।
– তাই নাকি? নাহিদা ফিরা আসার সাথে ওর তোরে খেদমত করার সম্পর্ক কই?
– জানি না। মাইয়া মাইনষের যত আঁতলামি।
তুর্জয়ের স্বরে বিদ্রূপ স্পষ্ট।
– একজন স্বামী চারজন পর্যন্ত স্ত্রী রাখতে পারে। ধর্মে আছে। সেইখানে এই মেয়ে এক সতীনের সংসারও করব না? স্বামীর আদেশের বাইরে যাব?
ওর কি ধর্মকর্মের শিক্ষা নাই?
– বাপ মরা মাইয়াডারে গলায় ঝুলাইয়া দিলা। নাহিদাও ক্যামনে ফিরা আসল বুঝলাম না। মরা মানুষ জ্যন্ত হইয়া গেল।
তালুকদার মশাই উদাস গলায় বললেন,
– হয়ত বাঁইচা ছিল। আলী মাঝিরে তো কইছিলাম, লা/শটা হাওরে ভাসাইয়া দিতে। আল্লাহ মালুম, কি করছে!
তুর্জয়ের চোখে চিন্তার রেখে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠল। প্রসঙ্গ পাল্টাতে তালুকদার মশাই বললেন,
– শোন তুর্জয়, তুই ভাবতে পারস তোর এই বুড়া বাপ তোরে ভালোবাসে না। তুই ভুইলা যাইস না আমার বুকে মাথা রাইখা তুই বড় হইছস। আর সেই বুকের প্রতিই তোর কত অনীহা। বউরে পাইয়া বাপের প্রতি তোর কত উদাসীনতা। তোর জন্য আমার যতটা কলিজা পুড়ে, তোর মায়েরও ততটা পুড়ে না। তোর মা তো তোরে নিজের কাছেই রাখত না। তার সব সোহাগ, সব মায়া তো ছোট পোলার জন্য। যারে ছোটবেলা থিকা নিজের মত কইরা গড়লাম, সেই কিনা আমার মূল্য দেয় না। এই বয়সে আইসা আমার জীবনে অভাব হইল একজন আদর্শ পোলার?
কথাগুলো বলতে বলতে তালুকদার মশাইয়ের চোখ ভিজে উঠল। কুমিরের কান্না! এদিকে তালুকদারের মুখে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ বিষাক্ত সাপের মত দংশন করতে লাগল তুর্জয়ের নড়বড়ে মনে।
মাথা নিচু করে থরথরিয়ে কাঁপতে লাগল সে।
আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে বাবার পায়ে লুটিয়ে পড়ল তুর্জয়।
– আব্বা, মাফ কইরা দেন আমারে। আমি বুঝতে পারি নাই। আপনি ঠিকই কইছিলেন। মেয়েছেলের জাত ছলনার জাত। ওগো পায়ের নিচে রাখলেই শান্তি আর মাথায় তুললেই বিপদ। আমিই বিপথে চইলা গেছিলাম। আমারে মাফ করেন।
তালুকদার মশাইয়ের গালে তৃপ্তির হাসি ঝুলল। যদিও সে হাসি মুহুর্তেই লুকিয়ে ফেললেন তিনি।
বুকে আনন্দ ঢেউ নিয়ে খুক খুক করে কাশতে কাশতে বললেন,
– আমি তো তোরে সেই কবেই মাফ কইরা দিছি রে, বাপ। বাপের কি পোলার ওপর রাগ থাকে? আক্ষেপ থাকে? আমার যত কারবার, সম্পত্তি সব তো তোর জন্যই। শোন বাপ, এ জগতে সবচেয়ে বড় সত্য হইল ‘টাকা’। ভালো খারাপ ধই/ঞ্চাগো বানানো ভ্রম। যারা সারাজীবন ভালো খারাপের গান গায়, তারা দুই পয়সা কামাইতে কামলা দেয়। এমন ভবিষ্যৎ আমি তোদের জন্য চাই নাই।
তুই তাড়াতাড়ি সুস্থ হ, বাপ। তুই না থাকলে আমার সব পরিকল্পনাই বৃথা।
তুর্জয় মাথা তুলে চাইল। বিস্ময়ের সহিত শুধালো,
– কী পরিকল্পনা, আব্বা? আপনি কিন্তু এখনো আমারে পুরাডা বলেন নাই।
তালুকদার মশাই ক্ষণিককাল চুপ করে রইলেন। এরপর ধীরে ধীরে বললেন,
– যে মেয়েগুলারে কলির কাছে রাইখা আসছিলি। ওদের ভারতে পাঠাইয়া দেওয়া হইছে।
তুর্জয় চমকে উঠল। কিছু একটা বলতে চাইল।
তালুকদার মশাই তাকে থামিয়ে দিলেন। বললেন,
– সব নিয়ম মাইনা পাঠানো হইতাছে। কোটি কোটি টাকার ব্যাপার।
তুর্জয়ের ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
– তদারকির জন্য কারে রাখছেন?
তালুকদার মশাই বললেন,
– আপাতত ফাহিমরে দিয়া কাজ চালাইতেছি। তবে, সাইফুর সাহেব কাল ঢাকা থিকা তার একজন বিশ্বস্ত লোক পাঠাইতেছে। তুই সুস্থ হইয়া গেলে, তুই আর সাইফুরের পাঠানো ওই পোলারে দিয়াই সব ব্যবস্থা করা লাগব।
তুর্জয় সব বুঝে ফেলেছে এমনভাবে মাথা নাড়ল।
ঘরের হারিকেন বাতিটা মৃদু কাঁপছে। সেদিকে ক্ষণিককাল তাকিয়ে থেকে তালুকদার মশাই একবার ভাবলেন চারুলতার অন্তঃসত্ত্বা হবার বিষয়টি নিয়ে কথা বলবেন। পরক্ষণেই মত পাল্টালেন। হাওয়া যেভাবে বইছে, বইতে থাকুক। চারুলতার পেটে যদি পুত্র সন্তান এসে থাকে তবে তাদেরই লাভ। আর যদি কন্যা সন্তান জন্মায় তবে এবার আর নাহিদার মত চারুলতার নিস্তার নেই।
রাত আরো গভীর হল। তালুকদার মশাই উঠে দাঁড়ালেন। ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,
– চারুলতার মত মেয়েরা পোলা মানুষের মাথায় আবেগের জঞ্জাল ভইরা বিবেক চাবাইয়া খায়। বিবেক বিসর্জন দিস না, তুর্জয়। দিনশেষে টাকাই সত্য।
তুর্জয় নত মাথায় বলল,
– মনে থাকবে, আব্বা। মা/গী মানুষের ছলনায় আর পড়তাছি না। চিন্তা কইরেন না।
তালুকদার মশাই অতি আনন্দের সহিত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তার ষড়যন্ত্রের বিজ বপন সফল হয়েছে৷
****************************
পরের দিন সকাল।
দীর্ঘ নদীপথ পেরিয়ে অবশেষে রাহাত তেঘরিয়া গ্রামে এসে পৌঁছাল। নৌকা থেকে নেমে বাজারের পথে হাঁটতে শুরু করল। গ্রামে নতুন মুখের সন্ধান মিলেছে বলে সকলেই দুই তিনবার করে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে রাহাতের আপাদমস্তক।
রাহাতও মাথা চুলকে মনে মনে বলল,
– শালার আমি কি চিড়িয়াখানার সিংহ নাকি? সবাই এইভাবে কেন দেখছে?
পরক্ষণেই তার মনে হল তামিল সিনেমাতে যখন হিরোর প্রবেশ ঘটে তখন সকলে এভাবেই তাকিয়ে দেখে। সময় থমকে যায়। ধূলো উড়ে। গাছের পাতাও হন্যে হয়ে ভেসে বেড়ায়। এখানে অবশ্য ধূলো আর গাছের পাতা উড়াউড়ির বিষয়টি হচ্ছে না। তবুও রাহাতের ঠোঁটের কোণে হাসি। যেন তেন হাসি নয়। তৃপ্তির হাসি।
রাহাত এবার বুক ফুলিয়ে হাঁটতে শুরু করল। কিছুদূর যাবার পর সে একজন বয়স্ক লোককে জিজ্ঞেস করল,
– ও ভাই! তালুকদার মশাইয়ের বাড়ি কোনদিকে?
লোকটি কপাল কুঁচকে শুধালো,
– আপনি হের কি লাগেন?
– আমি উনার অতিথি। ঢাকা থেকে আসছি।
– ওওও… তার বাসাতো গ্রামের মধ্যেখানে। ভ্যানে কইরা যাইতে হব।
একথা বলে লোকটি এক ভ্যানচালককে ডাক দিল।
‘ ওই হ্যাডা! এদিকে আয়।’
বয়স্ক লোকটির মুখে ‘হ্যাডা’ নাম শুনে রাহাত গেল ভড়কে। এতদিন সে একটা বিশেষ গালিকে খানিকটা পরিমিত করে ‘হ্যাডা’ হিসেবে ব্যবহার করেছে। এরা এটিকে মানুষের নাম হিসেবে ব্যবহার করছে? কোনো মানুষের নাম ‘হ্যাডা’ হতে পারে তা রাহাতের জানা ছিল না।
ভ্যানচালক এগিয়ে এলে বয়স্ক লোকটি বললেন,
– ইনি তালুকদার মশাইয়ের অতিথি। শহর থিকা আইছে। ঠিকমত পৌঁছাইয়া দাও হের বাড়িতে।
রাহাত বয়স্ক লোকটিতে ধন্যবাদ জানাল। এরপর ভ্যানগাড়িতে চড়ার সময় মনে খানিকটা সংকোচ নিয়ে শুধালো,
– একটা কথা জিজ্ঞেস করব ভাই?
– করেন।
– আপনার নামকি সত্যিই শ্যা* থুক্কু হ্যা/ডা?
– হ, ক্যান?
– এমনিই। এমন অমায়িক নাম আমি এজন্মে শুনিনি তো! নাম শুনেই চোখ ভিজে যাচ্ছে। চলেন যাত্রা শুরু করা যাক।
গ্রামের সরু আঁকাবাঁকা রাস্তা আর সবুজ গাছপালা পেরিয়ে রাহাত পৌঁছে গেল তালুকদার বাড়ির মূল ফটকে।
তালুকদার মশাই তখন বারান্দায় বসে আছেন। আঙিনায় জটলা বেঁধে গল্প করছে গ্রামের লোকজন। চা- নাস্তা খাচ্ছে। সকলের চোখে তালুকদারের প্রতি কৃতজ্ঞতা আর তালুকদারের চোখে চিরচেনা কর্তৃত্বের ছায়া।
রাহাত চারিদিকে চোখ বুলিয়ে আঙিনা পেরিয়ে তালুকদার মশাইয়ের সামনে এসে দাঁড়াল। সালাম জানাল নিচু স্বরে।
– আসসালামু আলাইকুম, তালুকদার মশাই। আমি রাহাত। ঢাকা থেকে এসেছি।
তালুকদার মশাই মাথা তুলে রাহাতের দিকে তাকালেন।
– ওয়ালাইকুমুসসালাম। ও তুমিই রাহাত!
– জ্বি।
তালুকদার মশাই ঠোঁটে হালকা হাসি আনেন। কণ্ঠে বিনয় মিশিয়ে শুধান,
– আমি ভাবছিলাম তোমার পৌঁছাইতে আরো ঘন্টাদুয়েক লাগব। নিয়া আসার জন্য ঘাটে লোক পাঠাইতাম এখনি। তা যাইহোক, ভালো হইছে জলদি পৌঁছাইয়া গেছ। যাতায়াতে কোনো সমস্যা হয় নাই তো?
রাহাত অতি উৎসাহ নিয়ে বলল,
– না, না। কোনো সমস্যা হয় নি। বরং আমার একদিনেই বাস, নৌকা সবকিছুর অভিজ্ঞতা হয়ে গেল। এরপর ঘাটে নেমে আবার হ্যা/ডার ভ্যানে চড়ে তবেই না আপনার বাড়িতে পৌঁছালাম!
তালুকদার মশাই রাহাতের কথা শুনে কাশতে শুরু করলেন। কি বলে এই ছেলে।
তাকে এভাবে কাশতে দেখে রাহাতও বোকা বনে গেল। দ্রুত তালুকদারের পিঠে ধুম ধুম করে কিল বসাতে লাগল। কিলগুলো সব ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকেই সজোরে মারল রাহাত। এমন সুবর্ণ সুযোগ সে হাতছাড়া করতে চায় নি।
সে ভণিতা করে বলল,
– পানি খাবেন মশাই?
তালুকদার মশাই কাশতে কাশতেই নিজেকে রাহাতের হাত থেকে ছুটিয়ে নেবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন। বললেন,
– এই ছেলে আমি ঠিক আছি। এভাবে ধুমধাম কিলাইতাছো ক্যান? ছাড়! ছাড় কইতাছি।
ঘটনার আকস্মিকতায় গ্রামের লোকজনও হতবুদ্ধি।
রাহাত তাকে ছেড়ে দিল। রান্নাঘর থেকে মাজেদা পুরো ঘটনা দেখে পানির গ্লাস নিয়ে দৌঁড়ে আসল।
তালুকদার মশাই সবটুকু পানি এক নিঃশ্বাসে শেষ করলেন। কাশি পুরোপুরি থেমে গেলে রাহাতের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালেন। বললেন,
– এই ছেলে এভাবে পিঠে কিলাইতাছিলা ক্যান?
রাহাত মুখে দুঃখ দুঃখ ভাব এনে বলল,
– যদি আপনার কিছু হয়ে যেত? আমার মা বলেন এরকম কু/ত্তা/ম/রা কাশি উঠলে পিঠে ধুপধাপ কিলাইতে হয়। তাহলে কাশি নিচে নেমে যায়। ভুল কিছু করে থাকলে দুঃখিত। আমাকে মাফ করে দেন।
রাহাত প্রায় তালুকদারের পায়ে লুটিয়ে পড়তে যাচ্ছিলো, তিনি থামিয়ে বললেন,
– আরে কি করতাছো! এসবের দরকার নাই। শোনো ছেলে, তোমার মা ভুল জানেন। মেয়েছেলেদের জ্ঞান-বুদ্ধি কমই থাকে।
রাহাত কোনো উত্তর দিল না। মাথা চুলকালো। ঘাড় সামান্য কাত করে সহমত পোষণ করল।
তালুকদার মশাই কণ্ঠে বিরক্তি নিয়ে বললেন,
– অনেক দূর থিকা আসছ। হাত-মুখ ধুইয়া নাস্তা কইরা নাও। বিশ্রাম নাও। পরে কাজের বিষয়ে কথা হবে।
– জ্বি আচ্ছা।
তালুকদার মশাই মাজেদাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
– চারুলতারে বল অতিথির খেদমত করতে। কোনো ত্রুটি যেন না হয়।
মাজেদা কোনো উত্তর দিল না। রাহাতের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বলল,
– আসেন আমার সাথে।
রাহাত মাজেদাকে অনুসরণ করতে লাগল। মাজেদা রান্নাঘরের বাহিরে রাহাতকে দাঁড়া করিয়ে ভেতরে ঢুকল। ক্ষণিককাল পর সেখান থেকে বেরিয়ে এল চারুলতা।
প্রথম দর্শনে রাহাতের পুরো শরীরে শীতল স্রোত বয়ে গেল। অল্পবয়স্ক একটি মেয়ে। যার কপালে জমে আছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। চোখজোড়া গল্প বলছে কত নির্ঘুম রাতের! তবুও এই ক্লান্তি, গ্লানি তার রূপের একাংশও কেড়ে নিতে পারে নি!
চারুলতা ঘোমটা একটু টেনে ঠিক করে নিল। নিঃশব্দে রাহাতের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ইশারায় তাকে অনুসরণ করতে বলল।
চারুলতা যে অতিথি ঘরে থাকে তার ঠিক পাশের ঘরের কাঠের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সে। তার সঙ্গে রাহাতও প্রবেশ করল। সকালটা তখন পুরোপুরি জেগে উঠেছে। জানালার ফাঁক গলে হেমন্তের সূর্য ঢুকে পড়ছে ঘরের ভেতর। ধুলোর কণাগুলো স্পষ্ট নেচে বেড়াচ্ছে সেই তীর্যক আলোকপাতে। ঘরের একপাশে কাঠের খাট, তার ওপরে ম্যাটম্যাটে রঙের চাদর বিছানো। দেওয়ালে ঝুলছে লন্ঠন।
চারুলতা নিস্তেজ গলায় বলল,
– আমি তাইলে যাই।
রাহাত ব্যাগটা মাটিতে রেখে খানিকটা ইতস্তত করে বলল,
– হাতমুখ ধুতে কই যেতে হবে?
চারুলতা মেঝের দিকে তাকিয়ে বলল,
– কল পাড়েও ধুইতে পারেন। চাইলে বাড়ির পিছে পুকুর আছে সেখানেও ধুইতে পারেন।
– ইন্টারেস্টিং। আজকে না হয় কলপাড়েই ধুই?
চারুলতা কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। আঙুল দিয়ে ইশারা করে বলল,
– ওইদিকে কলপাড়। কোনোকিছু লাগলে ডাক দিয়েন।
নাম জানা সত্যেও রাহাত পুনরায় জানতে চাইল,
– আপনার নাম?
– চারুলতা।
একথা বলেই চারুলতা হনহন করে চলে গেল।
রাহাত কলপাড়ে গিয়ে ধীরেসুস্থে হাতমুখ ধুয়ে নেয়। কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া ঠান্ডা জলে শরীরের ক্লান্তি বেশ ফিঁকে হয়ে যায়। এখান থেকে রান্নাঘরের পেছনের দিকটা দেখা যায়। বড় জানালার ফাঁক দিয়ে সে দেখল, চারুলতার ব্যস্ততম দিনের একটি অংশ। কি চটপটে মেয়েটি! এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। গায়ে মেখে নিচ্ছে মশলার ঘ্রাণ।
রাহাতের মনটা ভারী হয়ে উঠল। সে অনুভব করল, তার অভ্যন্তরে হালকা কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ছে। সারথির কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হয় তার কানে বার বার।
‘ তুমি জানো না দাদা, মেয়েটার সাথে কি ঘটেছে!’
রাহাত ফিসফিস করে বলে উঠল,
– স্বর্গকন্যা, তোমায় কে করল এই নরকরাজ্যে বন্দী?
কে হটালো সুখ তোমার আর দুঃখের সাথে সন্ধি?
রাহাত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে খুব করে অনুভব করল এই গোপন মিশনের বাইরেও এই বন্দী স্বর্গকন্যাকে ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে। ফিরিয়ে দিতে হবে তার আপন স্বর্গরাজ্যে।
( চলবে…)
#অবাঞ্ছিতা
#আতিয়া_আদিবা

