Home "ধারাবাহিক গল্প অবাঞ্চিতা অবাঞ্চিতা পর্ব-২৯+৩০

অবাঞ্চিতা পর্ব-২৯+৩০

0
263

#অবাঞ্ছিতা
#পর্ব_২৯
#আতিয়া_আদিবা

গ্রামবাসীদের মাঝে আজ এক অদ্ভুত উত্তেজনা।
ভোরের আলো স্পষ্ট হয়ে উঠতেই অনেক গুলো ইঞ্জিন চালিত নৌকা এসে ভিড়ল ঘাটে।

বাজারে দোকানদাররা নিজেদের স্থান ছেড়ে ঘিরে ধরল নৌকাগুলোকে। তীরে নিয়ে আসা হল লোহার খুঁটি, মোটা তার, কাঠের বাঁধা রিল । তেঘরিয়ার অন্ধকার ঘুঁচাতে যেন আলোর একেকটি স্তম্ভ হাওরের বুক চিরে ঢুকছে।

মধ্যবয়স্ক একজন লোক হাঁক ছাড়ল,

– কিরে, গ্রামে সত্যিই বিদ্যুৎ আইবো নাকি?

অপরজন বলল,

– হ, চাচা।

উক্ত কথপোকথনে আরেকজন যুক্ত হল।

– সবই তালুকদার মশাইয়ের কৃপা। হের হাতে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গেছে মানে উন্নতির কমতি হইব না।

– তা ঠিক কইছেন। আমি ভাই, বাড়ি ফিরা যাই। বউরে কইয়া আসি।

– বউরে কইয়া কি করবেন মিয়া?

– বাপের বাড়ি থিকা যদি কানাকড়ি কিছু আইনা দিবার পারে? পাখা কিনা লাগব না?

একথা শুনে উপস্থিত বাকি দুজন হেসে ফেলল৷

গ্রামের মানুষজনের মুখে তৃপ্তির হাসি ঝুলেই রইল।
অনেকের চোখে অবশ্য অবিশ্বাস জেঁকে বসেছে।
যে গ্রাম বিংশ শতাব্দীতে এসেও সভ্যতার অনেকটাই আড়ালে, মোবাইল টাওয়ার নেই, ভালো একখানা হাই স্কুল নেই। বর্ষায় আশেপাশের গ্রামগুলোও ডুবে যায়। শহরের সাথে যোগাযোগ করতেও পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ নদীপথ। রজনীর ঘুটঘুটে অন্ধকারকে মিটিয়ে দিতে রাতভর জেগে থাকতে হয় লক্ষ তারকারাজির। চাঁদের আলো পথ দেখায় টিমটিমে আলো জালিয়ে ঘুরে বেড়ানো নৌকাগুলোকে। সেই আঁধারে ঘেরা তেঘরিয়ায় আলো আসবে? গ্রামের অতি সাধারণ মানুষেরা সন্ধ্যাবাতি জ্বালাবে? একথা অবিশ্বাস করা মোটেও অযৌক্তিক নয়।

কাজেই তারা সন্দেহ মেশানো কণ্ঠে বলে বেড়াচ্ছে,

– এইসব খাম্বা খুঁটি বসাইয়া কী লাভ? বর্ষায় মাটি তলানিতে গেলে খুঁটিতে কেমনে বিদ্যুৎ আসব?

তবুও উচ্ছ্বাসে ভেসে যাচ্ছে চারদিক। মাটিতে ক্রমশ কোদাল পড়ছে। ঠক ঠক। গর্ত খোঁড়া হচ্ছে। খুঁটি টানতে গিয়ে কপালের ঘাম আঙুলে টেনে ছুঁড়ে ফেলছেন শ্রমিকরা। আগ্রহ ভরে সেসব দেখছে বহু বছর অভ্যন্তরে আকাঙ্ক্ষা পুষে রাখা নিরীহ খেটে খাওয়া একেকটি জীর্ণ দেহ।

আরেকটু বেলা পড়লে তালুকদার মশাই ফাহিমকে নিয়ে এলেন কাচা বাজারে। কাজ পর্যবেক্ষণ করতে। এখান থেকেই বিদ্যুতের খুঁটি গাঁথার কাজ শুরু হয়েছে।

ফাহিম হাসিমুখে বলল,

– চাচাজান, এক মারাত্মক কাম করলেন আপনে। গ্রামের মানুষেরা আপনার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকব।

তালুকদার ভাঙ্গা গলায় বললেন,

– আমিও এই গ্রামের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ রে, ফাহিম।

তালুকদারের কণ্ঠস্বর কেমন অন্যরকম শোনালো।
অবশ্য কেনই বা শোনাবে না? সেই কবের থেকে গ্রামের প্রতিটি নিরীহ মানুষকে পরজীবীর মত কুঁড়ে কুঁড়ে গলাধঃকরণ করছে তালুকদার পরিবার। স্বার্থে আঘাত লাগলে তা খু / ন কিংবা ধ / র্ষ / ণ এর মত অপরাধে গিয়ে ঠেকেছে। আর এখন তো ‘নারী পা/ চা/ রের মত জঘন্যতম অপরাধও তাদের নিকট অতি স্বাভাবিক ক্রিয়াকর্ম। তালুকদার মশাইয়ের মত লম্পট এবং দুঃশ্চরিত্র লোকের নিকট এ গ্রামের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জন্মাবে না?

গ্রামবাসীরা তাকে দেখা মাত্র দৌড়ে আসল। ভালো একটি ছায়াঘেরা স্থানে তাকে বসার ব্যবস্থা করে দেওয়া হল। কেউ পানি সাদছে। কেউ বা পানের বাটা মাথা নত করে এগিয়ে দিচ্ছে। কেউবা টাটকা ফল কেটে নিয়ে তার সামনে রাখছে।

সকলের মুখে তালুকদার মশাইয়ের জয়জয়কার! স্লোগান!

তালুকদার সাহেব কণ্ঠস্বর আরোও গম্ভীর করে বললেন,

– আমি তালুকদার আপনাদের কথা দিছিলাম। তেঘরিয়াতে একদিন বিদ্যুৎ আসবে। কি দিছিলাম না?

উপস্থিত সকলে চিৎকার করে বলল,

– হ। কথা দিছিলেন।

– আমি কি আমার কথা রাখছি?
তালুকদার মশাই পুনরায় আত্মবিশ্বাসের সহিত শুধালেন।

গ্রামবাসীরা আনন্দে চিৎকার করে সম্মতি জানাল।

– আমি তালুকদার কখনো মিথ্যা বলি না। আমার কাছে আমার তেঘরিয়ার মানুষজন সবার আগে। তাদের ভালো মন্দ সবার আগে। প্রয়োজনে আমি নিজের সুখ বিসর্জন দিমু। তবুও তেঘরিয়ারে আমি আধুনিক কইরাই ছাড়ুম ইনশা আল্লাহ!

আরোও একবার উল্লাসে মেতে উঠল সবাই। তালুকদার এবার ফাহিমকে বলল,

– চল, বাড়ি ফিরা যাই। ওই নতুন ছেলেটার সাথে একটু কথা বলা দরকার। গতকাল তো আর সময় দিতে পারলাম না। এই বয়সে আইসা কি গ্রামের মাতাব্বরের কাজ করতে ইচ্ছা করে? কে কার গরু চুরি করল। কার মুরগীর ডিম কে মাইরা দিল। এসব আজগুবি কাহিনী আর শুনতে ইচ্ছা করে না রে, ফাহিম। বয়স হইছে।

– কথা ভুল বলেন নাই, চাচাজান। মূর্খ গুলা আজীবন মূর্খই থাইকা যাব।

তালুকদার মশাই সন্তপর্ণে এক দলা থুথু ফেললেন মাটিতে। এ যেন তাচ্ছিল্য প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম।

————————–

দুপুরের রোদটা তখন ঠিক মাথার ওপর। উঠোনে মাঝে মধ্যে দু একটি কাক এসে বসছে। আবার ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে যাচ্ছে। বিচলিত কণ্ঠে ডাকছে, আবার হাঁপাচ্ছে।

দুপুরের খাবার পর্ব মিটিয়ে অতিথি ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিল রাহাত। ঘরের জানালার ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকছে হেমন্তের ঝলমলে আলো, আর দূর থেকে ভেসে আসছে রান্নাঘরের টুং টাং শব্দ। আঙিনাতেও গ্রামবাসীদের সমাগম লেগেই থাকে। চেয়ারম্যান বাড়ি বলে কথা।

সহসা রাহাতের ভীষণ গরম লাগতে শুরু করল। হাতপাখার বাতাসে এ উত্তাপ থেকে রেহাই মিলছে না। গায়ের গেঞ্জিটা খুলে ফেললে কিছুটা আরাম লাগত। পরক্ষণেই আবার ভাবল,
কেউ যদি এসে পড়ে?

রাহাতের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ফুরোবার আগেই মাজেদা ঘরে প্রবেশ করলেন। মাথা নিচু করে বললেন,

– আপনারে তালুকদার মশাই তলব করছেন।

রাহাত অলস ভঙ্গিতে উঠে বসল। হাই তুলে বলল,

– এখন?

মাজেদা কোনো কথা না বলে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। রাহাত বুঝল এ মহিলা উত্তর দিবে না। তার স্বামীর ঘরে পদধূলি পড়বার আগ পর্যন্ত রাহাতের নিস্তার নেই।

রাহাত আলগোছে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এরপর মাজেদাকে বলল,
– চলেন, যাই।

মাজেদা রাহাতের সাথে তালুকদারের ঘরের দিকে এগোল। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করল না।

রাহাত ঘরে ঢুকে দেখল তালুকদার মশাই তার বড় চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন। খুক খুক করে কাশছেন আর মুখ মুছছেন।

চোখ তুলে রাহাতকে দেখতে পেয়েই বললেন,

– গতকাল তো তোমার সাথে ঠিকমত কথা বলতে পারি নাই। নানা ঝামেলায় থাকি। গ্রামের মানুষদের বিবাদ মিটানোর বিশাল বড় দায়িত্ব আমার কাঁধে। চেয়ারম্যান এর পদ পাইলেও এরা আমারে মাতাব্বরি ছাড়তে দিল না। হা হা হা।

রাহাত বেশ সম্মান দেখিয়ে বলল,

– কোন সমস্যা নাই। আমি জানি, আপনার কাধে অনেক দায়িত্ব। আর আপনি সেগুলো সুষ্ঠুভাবে পালন করেন।

তালুকদার মশাই গালে মৃদু হাসি রেখে বললেন,

– দাঁড়ায়া আছো কেন? বসো।

রাহাত সামনের একটি চেয়ারে বসল।

– বাসা ঘুইরা দেখছো? কেমন লাগল আমার বাড়ি?

রাহাত হেসে উত্তর দিল,

– খুব সুন্দর। সবখানে আপনার গরিমা ছড়িয়ে আছে। আপনার নিয়ম ছাড়া বোধহয় গাছের পাতাও ঝরে না।

তালুকদার মশাই মুচকি হাসলেন, চোখে চিরচেনা চাতুর্যের রেখা।

– ভুল বলো নাই। যাজ্ঞে শোনো, সাইফুর সাহেবের পক্ষ থিকা তুমি আসছো ‘প্রজেক্ট রজনীগন্ধা’ নিয়া কাজ করতে। যদিও শুনছি তুমি নাকি খুব বিশ্বস্ত মানুষ। কিন্তু আমি বাপু লোকের মুখের কথা বিশ্বাস করি না! এই গোটা কাজে আমার সম্মানের একটা ব্যাপার আছে। লাভ ক্ষতির ব্যাপার আছে

রাহাত মনে মনে বলল, ওরে চালাক বুইড়া!
তবে মুখে আনল,

– হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই।

– মেয়ে মানুষ হইল বিনোদনের জিনিস। সুশীল সমাজ তা বুঝলেও স্বীকার করব না কোনোদিন বুঝছো না?

কথাগুলো রাহাতের মেজাজ বিগড়ে দিলেও সে চুপ করে সম্মতি জানাল। তার ইচ্ছে করছে তালুকদারের টুঁটি ছিঁড়ে ফেলতে। মায়ের জাতিকে নিয়ে একজন পুরুষ কিভাবে এজাতীয় মন্তব্য করে!

রাহাত মনে মনে বলল,

– শালার বুইড়া বেটা। এক পা কবরে দিয়ে কি অপরাধ গুলোই না করে বেড়াচ্ছে! বিনোদন যদি তোমার পে/ছ/ন দিয়ে না ভরি তবে আমার নামও হায়দার নয়। মেয়েদের নিয়ে সর্বক্ষণ বাজে বকা বের করব আমি তোমার!

তালুকদার এবার বললেন,

– সাইফুর এর কথার সত্যতা আমি নিজেও চাই, বুঝলা?

– কিভাবে?

– প্রমাণ দিবা আমারে যে তুমি আসলেই আমার কিসিমের লোক। আমার মত হা/রা/মজাদা।

রাহাত হেসে ফেলল। বলল,

– আমি আপনার চাইতেও বড় হারাম/জাদা তালুকদার মশাই।

– কিভাবে?

– বাদ দেন সেসব কথা।

– আরে একটু প্রমাণ দিয়াই দাও, ছেলে। আমিও দেখি, সাইফুরের পক্ষ থিকা তোমারেই কেন পাঠানো হইল।

রাহাত গলায় লাজুক ভাব এনে বলল,

– বাড়িতে ঢোকা মাত্রই আপনার বড় পোলার বউয়ের প্রতি আমার নজর পরছে তালুকদার মশাই। শুধুমাত্র আপনার পোলার বউ বইলা বাঁইচা গেল সে। নইলে আমার কাছেও কিন্তু নারী বিনোদনের খোরাক। আর সে তো এখনো কচি।

একথা বলে রাহাত তামিল সিনেমার ভিলেনদের মত ‘ সসসসসসসসস’ জাতীয় শব্দ বের করল। জিভ দিয়ে উপরের ওষ্ঠ আলগোছে ছোঁয়ালো।

তালুকদার মশাই মুচকি হাসলেন। বললেন,

– প্রমাণ আমি সময়মত চামু। আগামীকাল আরো কিছু মাল আসতাছে। রাতে যাওয়া লাগবে। আজকের রাতটাও বিশ্রাম করো। কাল থেইকা আর দম ফালানোর সময় নাই।

রাহাত মাথা নেড়ে বলল,

– মেয়ে মানুষের কেসে আমি সবসময় তৈরি।

সেই মুহুর্তে তালুকদার মশাইয়ের বুকের ভেতর থেকে উঠে এলো খুসখুসে কাশি। প্রথমে হালকা, পরে একদম তীব্র। চেয়ারও দুলতে শুরু করল তার কাশির ঝাঁকুনিতে।

রাহাতের মন চাইছিলো আবারও পিঠে ধুপধাপ কিল বসাতে, সেই অজুহাতে একটু নোংরা কথাগুলোর হিসাব মিটিয়ে নেওয়া যেত।
কিন্তু আজ সে নিজেকে সংযত রাখল।

দ্রুত এগিয়ে গিয়ে কলসির পানি ঢেলে গ্লাস ভরল
তালুকদারের দিকে বাড়িয়ে বলল,

– পানি খান।

তালুকদার মশাই গ্লাসটা হাতে নিলেন। ধীরে ধীরে চুমুক দিলেন। গলায় খানিকটা ক্লান্তি মিশিয়ে বললেন,

– ঠিক আছে। এখন তুমি যাও। কাল রাতের আগে আর সাক্ষাৎ হবে না।

রাহাত হালকা মাথা নেড়ে দরজা ঠেলে বেরিয়ে এল। মুখটা মলিন হয়ে আছে তার। এই চক্রটিকে ধরতে কতগুলো মেয়ের জীবন ধ্বংস হচ্ছে একথা ভেবেই তার হৃদয় কেঁপে উঠতে লাগল বারবার।

————————–

রাত গভীর হলেও রাহাতের চোখ নির্ঘুম। এখন যদিও গরমের তীব্রতা নেই বললেই চলে। হাওরের শীতল বাতাসের সংস্পর্শে দেহ মন জুড়িয়ে যাচ্ছে।
দেয়ালে ঝুলে থাকা লন্ঠনের আলোও দপদপ করছে পবনের বিপরীতে।

রাহাত সেদিকেই তাকিয়ে ছিল। আচমকা চাপা কান্নার শব্দ শ্রবণগোচর হল তার। মৃদু, কিন্তু স্পষ্ট।
সে চমকে উঠল। শব্দটা আসছে পাশের ঘর থেকে। রাহাত উঠে দেয়ালের কাছে গেল, কান পেতে শোনার চেষ্টা করল।

নারীকণ্ঠ। হুঁ হুঁ করে কাঁদছে। এত রাতে কে কাঁদছে? আপনমনে বলে উঠল রাহাত।

বিছানায় ফিরে এলেও সেই চিন্তায় তার অস্বস্তি লাগছিল। হঠাৎ বাহিরে হইচই শুরু হল। আতঙ্ক মিশ্রিত পুরুষকণ্ঠের চিৎকার শোনা যাচ্ছে।

রাহাত দ্রুত দরজা খুলে বেরিয়ে এল।

আঙিনায় তুর্জয় দাঁড়িয়ে উন্মাদের মতো চেঁচাচ্ছে,

– আমি দেখছি! আমি ওরে দেখছি!

নাহিদা উদ্বিগ্ন গলায় বলছে,

– শান্ত হন। কি দেখছেন আপনে? হ্যাঁ? কি দেখছেন?

– সোনালতা। আমি সোনালতারে দেখছি। ও আমারে মাইরা ফেলতে চায়।

তুর্জয়ের কণ্ঠ কাঁপছে। সে একনাগাড়ে বলতেই থাকল,

– ও আমার খাটের পাশে দাঁড়ায়া ছিল। আমারে বলছে, তোরে ছাড়ুম না, তুর্জয়। তোরে ছাড়ুম না। সোনালতাও তোর মত ফিরা আসছে, নাহিদা। আমারে মাইরা ফেলবে।

লণ্ঠন হাতে চারুলতাও ততক্ষণে বেরিয়ে এসেছে অতিথিঘর থেকে। তার চোখেমুখে অজস্র প্রশ্ন। তুর্জয়ের প্রতিটি কথা সন্দেহের দানা বাঁধাতে শুরু করল। মনের ভুলেও সোনালতাকে তুর্জয় কেন দেখবে?

নাহিদা তুর্জয়কে ধরে টানতে লাগল,

-চলেন, ভেতরে চলেন। এমন কইরেন না। মাইনষে কি বলব?

তালুকদার মশাইও ততক্ষণে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তুর্জয়ের এহেন ব্যবহারে তিনি বিরক্ত। তবুও তার কর্তৃত্ব টলল না। সে গম্ভীর গলায় বললেন,

– তুর্জয় ঘরে যা।

– আব্বা, আমি…

– চুপ। একদম চুপ। ঘরে যা তুই। এক্ষুনি ঘরে যা।

এরপর তিনি নাহিদার দিকে তাকিয়ে ইশারা করলেন। নাহিদা নিজের সবটুকু শক্তি ক্ষয় করে তুর্জয়কে ঘরে নিয়ে গেল।

রাহাত চুপচাপ দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটি পর্যবেক্ষণ করছিল।
চারুলতার অতিথিঘর থেকে বের হওয়া। নাহিদা আর তুর্জয়ের ঘনিষ্ঠ ভঙ্গি, তালুকদারের উদাসিনতা আবার কণ্ঠে চাপা ভয়। সব মিলিয়ে তার মনে সন্দেহের ছায়া ঘনীভূত হলো।

সে মাথা চুলকে বিড়বিড় করে বলল,
– শালার চলতেছে কি এখানে?

অবশ্য যে বাড়িতে হ্যাডা ভাইয়ের ভ্যানে চড়ে আসতে হয়, সেই বাড়িতে হ্যাডার কাহিনী না হয়ে যাবে কই?

চারুলতা ঘরে ফিরে যাচ্ছিল। এমন সময় তার চোখ রাহাতের চোখে আটকালো। চারুলতার সে দৃষ্টিতে রাহাতের বুকের ভেতর কেমন যেন কাঁপন ধরল। সে মুচকি হাসল। চারুলতা মাঝে কোনো পরিবর্তন নেই। মাথা নিচু করে নিঃশব্দে তার ঘরে ঢুকে গেল।

[ চলবে…]

৩০.
তুর্জয়ের ঘরের সামনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে চারুলতা। তার হাতের ট্রেতে নানাবিধ নাস্তা সাজিয়ে রাখা আছে। রুটি, মাংসের ঝোল, সবজি, ডিম। চায়ের বদলে শুধুমাত্র এক গ্লাস গরুর দুধ। নাহিদাকে উপেক্ষা করে স্বেচ্ছায় আজ সে সকালের নাস্তা নিয়ে এসেছে। রান্নাঘর থেকে এপর্যন্ত আসার মাঝে প্রতিটি পদক্ষেপে জন্মেছে জড়তা। তবুও মাথায় অবিশ্রাম ঘুরপাক খেতে থাকা প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পাবার তীব্র আকাঙ্খা তাকে পৌঁছে দিয়েছে এই স্থানে।

গত রাতের ঘটনার পর থেকে তার বুকের ভেতর গেঁথে আছে কৌতূহল। তুর্জয় কেন উন্মাদের মত একই বুলি বার বার আওড়াচ্ছিল?

‘সোনালতা ফিরে আসছে। সে তাকে মেরে ফেলবে।’

তুর্জয়ের চোখে স্পষ্ট ভয় দেখেছে সে। ঢাকায় যখন তুর্জয়ের চিকিৎসা চলছিল তখন ডাক্তার বলেছিল, মাথায় আঘাত লাগার ফলে তার বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। তার মাঝে একটি ছিল অলীক কোনো কিছু দেখতে পাওয়া অথবা শোনা। অর্থাৎ হ্যালুসিনেশন।

কিন্তু তুর্জয় সোনালতাকেই কেন দেখবে? তার সাথে নেই কোনো রক্তের বন্ধন। আত্মীয়ও নয়! তবে সোনালতাই কেন?

গ্রামের অন্যতম চঞ্চল এবং ডানপিটে মেয়ে সোনালতা সহসা হারিয়ে গেল। এমন ভাবে হারিয়ে গেল যেন তার অস্তিত্ব এই ভুবনে কোনোদিন ছিল না। কেউ জানল না কোথায় গেল সে? খুঁজে পেল না তার টিকিটা অব্দি! এর পরপরই মারা গেল চারুলতার বাবা।

এতদিন পর তুর্জয় তার বড় বোনের নাম নিচ্ছে। বলে বেড়াচ্ছে যেন সে এখনো তার আশপাশে আছে। কেন?
সকল প্রশ্নের উত্তর চাই তার।

চারুলতা বুক ভরে শ্বাস নিল। সাহস জোগালো নিজের মাঝে। এরপর দরজায় কড়া নাড়ল।
ভেতরে প্রবেশ করতেই চারুলতা টের পেল ঘরের অভ্যন্তরীণ আবহাওয়া একদম অন্যরকম। বাতাসের মাঝে কেমন রহস্যময় গন্ধ। জানালার পর্দা অর্ধেক টানা। ঘরে আলো ছায়ার খেলা চলছে।

তুর্জয় বিছানার কিনারায় বসে আছে। চোখজোড়া লালচে, চুল এলোমেলো। সারা রাত এক ফোটা ঘুম হয় নি, তা দৃশ্যমান। ঠোঁটজোড়াও কাঁপছে তার।

দু আঙুলের চাপে লেপ্টে আছে বিড়ি। একটি টানও পড়ে নি তাতে। পুড়ে অর্ধেকটা ছাই হয়ে গেছে। সে ছাইও লেগে আছে।

চারুলতা খাটের পাশের ছোট্ট টেবিলে ট্রে টা আলগোছে রাখল। এরপর নরম গলায় বলল,

– সারারাত ঘুমান নাই?

তুর্জয় মাথা তুলে চারুলতার দিকে তাঁকাল। ভয়ার্ত গলায় বলল,

– তোর বোন বাঁইচা আছে চারু। ও মরে নাই।

চারুলতা চমকে উঠল। সোনালতা বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে এ সম্পর্কে কেউই জ্ঞাত নয়। সকলে শুধু জানে সে নিখোঁজ। তুর্জয় কেন বলল, ‘সে মরে নাই?’ সন্দেহের আস্তরণ মোটা হতে শুরু করল চারুলতার। তুর্জয়ের প্রতিটি কথা তার সন্দেহের ওপর প্রলেপ লাগিয়ে দিচ্ছে।

চারুলতা দেয়ালে ঝুলানো আয়নার নিচের তক্তা থেকে চিরুনি নিল। এরপর তুর্জয়ের পাশে গিয়ে বসল। তার চুল আঁচড়ে দিতে দিতে বলল,

– কাল রাতে কি আপনি সত্যিই সোনালতারে দেখছেন?

তুর্জয়ের মুখে ভর করল একরাশ অস্বস্তি। সে বলল,

– হ। ও আমার বিছানার পাশে দাঁড়াইয়া ছিল। কানের কাছে মুখ নিয়া ফিসফিস কইরা বলছে আমারে মাইরা ফেলবে।

চারুলতা এবার কম্পিত গলায় বলল,

– সোনালতা তাইলে মরে নাই।

তুর্জয় সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,

– না। মরে নাই। বাঁইচা আছে। নাহিদার মত ও ফিরা আসছে।

চারুলতা এবার বিছানা ছেঁড়ে উঠে দাঁড়াল। তার অশ্রুসিক্ত চোখে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল ক্রোধ।
আঁচল মুষ্টিবদ্ধ করে সে তুর্জয়ের দিকে তাঁকিয়ে শীতল গলায় বলল,

– সোনালতা, হঠাৎ কইরা গ্রাম থিকা গায়েব হইয়া গেছিল। কেউ কইতে পারে নাই সে জীবিত আছে নাকি মইরা গেছে। আপনি কেন বললেন সে মরে নাই। সে বাঁইচা আছে? নাহিদা আপার মত সেও ফিরা আইছে?

চারুলতার প্রশ্নে গায়ের রক্ত হীম হবার উপক্রম তুর্জয়ের। সে চুপ করে মেঝের দিকে তাঁকিয়ে রইল একদৃষ্টিতে।

– আমার বইনের লাশ কোথায় তুর্জয় তালুকদার?

চারুলতার অধরে জাগ্রত হল হুংকার। যেন থরথর করে কেঁপে উঠল ঘরের প্রতিটি দেয়াল। গোটা তালুকদার বাড়ি। পঞ্চাদশী কণ্যার এই রূপ হিন্দু পৌরাণিক দেবী দূর্গার সাথে যেন অনেকাংশেই মিলে যায়। চারুলতার সামনে আজ তার স্বামী নয়। অসুর বসে আছে। আর সেই অসুরকে বিনাশ করার পথেই ধীরে ধীরে ধাবিত হচ্ছে চারুলতা।

তুর্জয় কর্কশ গলায় বলল,

– আমি জানি না। ওই মা/গী বাঁইচা আছে নাকি মইরা গেছে তাও আমি জানি না। আমি ওরে দেখছি সচক্ষে তাই কইছি।

– তাইলে বললেন ক্যান? ও মরে নাই?

– একটা মা/গীরে এতদিন ধইরা খুঁইজা পাওয়া যাইতেছে না। তোর কি মনে হয় এখনো বাঁইচা আছে? মূর্খ নাকি তুই? অবশ্য মূর্খই তো! পড়াশোনা তো কিছু করস নাই। এসব জ্ঞান আসব কই থিকা? ঘর থিকা বাইর হ। নাহিদারে পাঠাইয়া দে। আমার ঘরের ধারের কাছেও যেন তোরে না দেখি। বাইর হ। যাহ! যাহ!

রাস্তার কুকুরকে যেভাবে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, তুর্জয় ঠিক সেরকম আচরণ করতে লাগল চারুলতার সাথে। তবুও সে থামল না।

– আমার বইনের হারায়া যাওয়ার সাথে যদি আমি আপনার কিঞ্চিৎ পরিমাণ সূত্র খুঁইজা পাই, আমি ভুইলা আপনি আমার স্বামী। আমার হাতে খু/ন হবেন আপনি।

চারুলতার প্রতিটি শব্দ যেন একেকটি মেঘগর্জন হয়ে ধরা দিল তুর্জয়ের কানে। অক্ষিজোড়া থেকে ক্রমাগত ঝরে পড়তে লাগল অগ্নিশিখা। অতি ক্ষোভে বেড়ে গেল তুর্জয়ের হৃদস্পন্দন। এক ছুটে গিয়ে দাঁড়াল চারুলতার সামনে। আজ বোধহয় চারুলতাকে মেরেই ফেলবে সে। এত বড় স্পর্ধা! তার সামনে দাঁড়িয়ে তাকেই খুন করার হুমকি দিচ্ছে এই এক রত্তি মেয়েছেলে?

কিন্তু বিধিবাম! তুর্জয়ের হাত তড়িৎ বেগে উঠলেও তা চারুলতার গাল স্পর্শ করতে পারল না। সে দেখল মেয়েটি চোখজোড়া বুজে অতি আবেগে নিজের পেটের ওপর হাত দুটি রেখেছে। তার ভেতর বেড়ে ওঠা ওই
র/ক্তের দলাটিকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা হয়ত!

তুর্জয় এক পা পিছিয়ে আসল। সহসা, প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছে তার। চারুলতা তার জীবনের এমন একজন নারী যে তার একগুঁয়ে বিবেককেও নাড়িয়ে দিয়েছিল। হোম তার স্থায়িত্ব ক্ষণকালে। সক্ষম তো হয়েছিল!

এ নারীর প্রতি শুধুমাত্র শারীরিক আক/র্ষণ ছাড়া অন্য কোনো অনুভূতি তো জন্মেছে। বিষয়টি বোধগম্য হলেও প্রশ্রয় দেওয়াতে বিশ্বাসী নয় তুর্জয়।

চারুলতাকে তার কাছে শুধুমাত্র ভোগের বস্তু নয় – এ কথাটি যেমন সত্যি,
অনুরূপভাবে,
ভিন্ন নারী দেহের লোভও সে কোনোদিন ছাড়তে পারবে এও মিথ্যে নয়।
চারুলতাকে সে অত্যন্ত শারীরিকভাবে আঘাত করতে পারবে না।

তুর্জয় তালুকদার চারুলতার জীবনে এমন একজন খলনায়ক, যার অস্তিত্ব পরজীবীর মত কুড়ে কুড়ে খাবে মেয়েটির সর্বাঙ্গ। আর বিচ্ছেদ ছড়িয়ে দিবে বিষ সর্বস্ব। ব্যাথায় কুঁকড়ে যাবে চারুলতা।

– চারু, ঘর থিকা চইলা যা। নইলে তোর পেটের বাচ্চা আর থাকব না।

তুর্জয় শীতল গলায় কথাটি বলল।

নিজের পরোয়া চারুলতা করে না। কিন্তু তার অনাগত সন্তানকে সে কিভাবে এত বড় ঝুঁকিতে ফেলবে?

চারুলতা কাঁদতে কাঁদতে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,

– হে আল্লাহ! না পাইলাম সম্মান, না পাইলাম স্বামীর ভালোবাসা। তাইলে কেন আমার পেটে তুমি তার সন্তান দিলা? আমি এই নিকৃষ্ট পাপীর সন্তান পেটে নিয়া বাঁচমু ক্যামনে?

চারুলতার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলা প্রতিটি শব্দ তুর্জয়ের দুনিয়া উলোটপালোট করে দিল। কিন্তু চেহারায় এর বিন্দুমাত্র ছাপ সে পড়তে দিল না। চারুলতাকে অতি সন্তপর্ণে সে গলাধাক্কা দিয়ে ঘরের বাহিরে বের করে দিল। বলল,

– খবরদার! আমার ঘরের আশেপাশে আর তুই আসবি না। নইলে তুই আর তোর পেটের বাচ্চাকে আমি কুটিকুটি কইরা মাইরা মাটির নিচে পুইতা দিব। খাং/কি/মা/গী!

চারুলতা রান্নাঘরের দুয়ারে এসে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল। হাঁক ছেড়ে বলল,

– ও বুবু, তুমি কি সত্যি বাঁইচা আছো? ও বুবু, কও না? তুমি কি সত্যিই বাঁইচা আছো?

মাজেদা দুপুরের রান্নার আয়োজন করছিলেন। তিনি কাজ ফেলে ছুটে এসে চারুলতাকে বুকে জাপ্টে ধরলেন। চিন্তিত স্বরে শুধালেন,

– কাঁদতাছস ক্যান চারু? কি হইছে তর?

চারুলতা কোনো উত্তর দিতে পারল না। কাঁদতেই থাকল।

– কান্দিস না রে চারু। শরীর খারাপ করব। কান্দিস না।

চারুর এহেন হাল দেখে তালুকদার বাড়ির আঙিনায় বসে থাকা গ্রামের লোকজনদের মাঝে ফিসফিস শুরু হল।

জোহরা বিষয়টি আঁচ করতে পেরে উদ্বিগ্ন স্বরে বলল,

– ও চাচী, ভাবীরে ভেতরে নিয়া আসেন। লোকজন সব চাইয়া রইছে। সব দেখতাছে। বাড়ির বউরে কান্দতে দেখলে চাচাজানের সম্মান যাবে না?

মাজেদা থমথমে গলায় বললেন,

– চাচাজানরে নিয়া তোর এত চিন্তা না করলেও চলব জোহরা। এমনেই তুই যা করতাছোস মুখে আনতেও ঘিন লাগে আমার।

জোহরা ভ্রুঁ কুচকে বলল,

– কি করতাছি আমি, চাচী?

মাজেদা গলার স্বর নামিয়ে বললেন,

– জোহরা, আমি এখনো চুপ আছি দেইখা তোর সংসারটা টিকা আছে। আমার মুখ খুলাইস না কইয়া দিলাম। বেডা মানুষের বহুবিবাহে কোনো নিষেধাজ্ঞা নাই কইলাম!

জোহরা এবার কিছুটা চুপসে গেল। মাজেদা চারুলতাকে নিয়ে রান্নাঘরের ভেতরে এসে দুয়ার ভিড়িয়ে দিল।

***************************

তেঘরিয়ার বিকেল আজ নরম রোদের আলোয় স্নান করেছে। তালুকদার বাড়ির পেছনের পুকুরপাড়টা এতদিন পর পুনরায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। কেননা, বহুদিন পর চারুলতা এসেছে পুকুরপাড়ে।

সকালের বিষন্নতা দূর করতে গৃহস্থালির সমস্ত কাজ একপাশে ফেলে ছুটে এসেছে এখানে। সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আজ সে প্রকৃতির সাথে নিভৃতে কিছুটা সময় কাটাবে।

ক্রমশ পশ্চিমে হেলে যাওয়া অংশুমালীর আলোকরেখায় ঝলমল করছে জল। হেমন্তের বাতাসে কম্পমান তরঙ্গ।

চারুলতা ধীর গতিতে তার পা নামিয়ে দিল পানিতে। ঠান্ডা জলের স্পর্শে যেন প্রশান্তি ছড়িয়ে গেল বুকের সর্বাংশে। তার হাতের মুঠোয় আচারের বয়াম। খুব টক খেতে ইচ্ছে করছে তার।

চারুলতা একদম শিশুদের মতো পা নাড়িয়ে নাড়িয়ে জলকেলি করতে লাগল। আচার খেতে লাগল। সে যেন ভুলে যেতে চাইছে তার অস্তিত্বকে। তার চারপাশের পরিচিত প্রতিটি বস্তুকে। প্রতিটি প্রাণকে।

যদিও সোনালতার স্মৃতিগুলো এখনো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মনের আনাচে কানাচে। তবুও, চারুলতা সামলে নিচ্ছে নিজেকে।

আচমকা দূর থেকে ভেসে আসা পদধ্বনিতে হালকা কেঁপে উঠল তার নাজুক শরীর। ধড়ফড়িয়ে পেছনে তাকাল সে।

হাসিমুখে রাহাত দাঁড়িয়ে আছে।

তালুকদার বাড়ির এই মেহমানটিকে চারুলতার প্রচন্ড রহস্যময় বলে মনে হয়। সে কেন এসেছে? ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে তার। সাহসে কুলোয় না।

চারুলতা তাড়াতাড়ি আচারের বয়ামটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। ফিরে যেতে চাইল।

রাহাত তাকে আটকালো। আশ্বস্ত করে বলল,

– আরে আরে! কোথায় যাচ্ছেন? আপনি বসুন। আমি এমনেই এদিকটা ঘুরে দেখছিলাম। আপনি বসে আছেন দেখে ভাবলাম একটু গল্প করি।

চারুলতা পুনরায় বসল ঠিকই কিন্তু এবার আর তার মাঝে সেই চঞ্চল ভাব নেই।

– আমি এখানে একটু বসি?

চারুলতা ঘাড় কাত করে সম্মতি জানাল।

– জায়গাটা খুব সুন্দর। আপনার বুঝি প্রায়ই আসা হয় এখানটায়?

চারুলতা হালকা কাঁপা গলায় বলল,
– আগে আসতাম। এহন আর আসা হয় না।

রাহাত বেশ বুঝতে পারছে চারুলতা অস্বস্তিতে ভুগছে। তার এই অস্বস্তিকে খানিকটা লাঘব করতে একেবারে ভিন্ন ধাঁচের প্রশ্ন করল সে।

– আপনি ভয় পান না?

চারুলতা অবাক হয়ে বলল,

– ভয়? ভয় পামু ক্যান?

রাহাত একটু ঝুঁকে বলল,

– গ্রামের মানুষজন বলাবলি করছিল এই পুকুরে নাকি রাত্রে মাঝে মাঝে কার ছায়া দেখা যায়!

চারুলতা এবার খিলখিল করে হেসে ফেলল। বলল,

– ছায়া? কার ছায়া?

– ভূতের ছায়া আবার কার?

রাহাত বেশ কাচুমাচু হয়ে ভয়ার্ত স্বরে বলল।

চারুলতা হাসতে হাসতেই উত্তর দিল,

– মিথ্যা কইছে। এইখানে এমন কিছু নাই।

রাহাত স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।

– যাক তাহলে ভয় পাবার কিছু নেই।

চারুলতা পুনরায় জলে পা ডোবাল। তা দেখে রাহাত মুচকি হাসল। যাক মেয়েটা স্বাভাবিক হচ্ছে তাহলে।

এবার চারুলতা নিজের থেকেই প্রশ্ন করল,

– আপনি ঢাকা শহর থিকা আইছেন না?

– হুঁ

– শহরের মানুষেরা ভূতে ভয় পায়?

– আমি পাই। বাকিদের কথা জানি না।

– ওঁ।

চারুলতা এবার পা দোলাতে শুরু করেছে। আচারের বয়াম থেকে এক টুকরো নিয়ে নিজের মুখে পুরে সে বলল,

– আমিও ঢাকা গেছিলাম। বেশিদিন হয় নাই। কত বড় বড় বিল্ডিং, গাড়ি, রিক্সা দেখছি।

– তাই নাকি? তা কেমন লেগেছে আপনার?

– ভালোই। কিন্তু আমাগো তেঘরিয়া গ্রাম বেশি সুন্দর।

রাহাত হাসল।

এরপর ক্ষণিককাল চুপচাপ বসে রইল দুজন।
দূরে নাম না জানা এক পাখি অবিরাম ডেকে চলেছে। সূর্যও একদম পশ্চিমে হেলে পড়েছে। গোটা আকাশে লালচে আস্তরণ।
চারুলতার মুখেও সেই আলো এসে পড়েছে। একটুখানি বিষণ্ণতা আর কোমলতা মিশে আছে তার চেহারায়।

রাহাত চারুলতার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

– আপনার পরিবারে কে কে আছে?

– কেউ নাই।

রাহাতের বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল।

– কেউ নাই?

– না। বাপে মরছে। বড় বোন নিখোঁজ। মায়ে শহরের কোন আশ্রমে গেছে! কিন্তু এরপর আর যোগাযোগ করে নাই।

চারুলতা সহজ গলায় জবাব দিল।

রাহাত গালে মৃদু হাসি ঝুলিয়ে বলল,

– এজন্যই আপনি এত সাহসী। মানুষ যখন সব হারিয়ে ফেলে, পিছুটান থাকে না, তখন তারা সবচেয়ে সাহসী হয়ে ওঠে। ভয়ের নামগন্ধ থাকে না।

চারুলতাও মৃদু হেসে শুধাল,

– আপনিও কি সাহসী?

রাহাত মাটি থেকে একটি ছোট পাথর নিয়ে পুকুরে ছুড়ে মারল। ‘ছপাস’ জাতীয় শব্দ হল। হালকা ঢেউ উঠে ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। সেদিকে তাকিয়ে রাহাত বলল,

– বাবার ছায়ায় বেড়ে না উঠতে পারা সন্তানেরা একটু আধটু সাহসী হয়।

– আপনার বাবাও কি মইরা গেছে?

রাহাত হেসে বলল,

– হ্যাঁ। আমি জন্মানোর আগেই। মায়ের কাছে বড় হয়েছি।

চারুলতা ক্ষণিককাল চুপ থেকে শুধালো,

– আচ্ছা আপনি কি সত্যিই শুধুমাত্র ব্যবসার জন্য এ বাড়িতে আইছেন?

রাহাত ভ্রুঁ কুঁচকে শুধালো,

– হ্যাঁ। কেনো?

– এমনেই।
চারুলতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

ততক্ষণে বিকেল ফুরিয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে প্রায়।
সূর্য অর্ধেকের বেশি ডুবে গেছে। গোধূলির আলো যেন পুনরায় ফিরিয়ে দিল চারুলতার সমস্ত ক্লেশ।
সে উঠে দাঁড়াল। বলল,

– সন্ধ্যা হইয়া যাইতাছে। আমি যাই।

রাহাতের উত্তরের অপেক্ষা করল না সে। হনহন করে হাঁটতে লাগল চারুলতা।

রাহাত চারুলতার চলে যাওয়া দেখতে লাগল। এই ছোট্ট মেয়েটার ভেতরে কতটা নিঃসঙ্গতা, কতটা দুঃখ লুকিয়ে আছে! রাহাতের করুনা জন্মালো তার প্রতি। এত অল্প বয়সে কিভাবে এতকিছু সহ্য করছে মেয়েটা? ভেবেও শিউরে উঠে রাহাত।

এরপর ডুবন্ত সূর্যের দিকে তাকিয়ে রাহাত পরিকল্পনা করতে থাকে কিভাবে ‘প্রজেক্ট রজনীগন্ধা’ এর মূল চক্রটিকে দ্রুততার সঙ্গে ধরে ফেলা যায়। সে চায়না এভাবে মেয়েগুলোর জীবন নষ্ট হোক।

চলবে….

#অবাঞ্ছিতা
লেখিকাঃ #আতিয়া_আদিবা