#অবাঞ্ছিতা
#পর্ব – ৩৭
#আতিয়া_আদিবা
মাঝরাতে তুর্জয়ের মনে হল তার বুকের ওপরে কেউ বসে আছে। সে হকচকিয়ে উঠল ঘুম থেকে। শ্বাস প্রশ্বাস ভারী হয়ে এলো। পিটপিট করে চোখ মেলল। দেখল, তার বুকের ওপর বসে আছে সোনালতা এবং মায়া। কি আশ্চর্য! মৃত মানুষ কিভাবে বসে আছে তার বুকের ওপর। তুর্জয় ভড়কে গেল। শরীর নাড়ানোর চেষ্টা করল বারবার। কিন্তু কোনোভাবেই নাড়াতে পারল না। সে ডানে বামে ফেরার চেষ্টা করল। তাও সম্ভব হল না। মুখ দিয়ে শব্দ বের করার প্রচেষ্টায় বিন্দুমাত্র ছাড় দিল না। কিন্তু হায়! গোঁ গোঁ জাতীয় শব্দ ছাড়া অন্য কোনো আওয়াজ পরিলক্ষিত হল না।
তুর্জয় দেখল সোনালতা এবং মায়া দুজনেই তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। তাদের হাসির শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে গোটা ঘরে। তুর্জয় বহু কষ্টে অস্ফুট স্বরে বলল,
– আমায় ছেড়ে দে। ছেড়ে দে বলছি!
সোনালতার মুখের বক্র হাসি আরোও প্রশ্বস্ত হল। সে বলল,
– ছাইড়া দিমু? ক্যান? ক্যান ছাড়ুম? সেদিন কি তোরা আমারে ছাড়ছিলি?
তুর্জয় একইভাবে নিমজ্জিত গলায় জবাব দিল,
– আমি তোরে কিছু করি নাই সোনালতা। যা করছে আমার হা/রা/মি বাপ তালুকদার করছে।
পাশের থেকে মায়া উত্তর দিল,
– আমার লগেও কিছু করেন নাই?
– করছি। তোর সাথে অন্যায় করছি আমি। পাপ করছি।
– তাইলে আমি ক্যান ছাড়ুম আপনারে? আপনারে আমরা আমাগো সাথে নিয়া যামু।
তুর্জয় চিৎকার করার ব্যর্থ চেষ্টা করল। বলল,
– না! আমি কোথাও যামু না। ছাইড়া দে আমারে।
সোনালতা কপাল কুঁচকে বলল,
– ছাইড়া যদি দেই তাইলে আমাগো মৃত্যুর বদলা কে নিব? আমার লাশটা যে বাড়ির পেছনের আঙিনায় কাউরে না জানাইয়া দাফন করা হইছিল? সেই লাশের হদিস বাকিরা ক্যামনে পাব?
তুর্জয় ভয়ার্ত স্বরে বলল,
– আমি… আমি মাটি খুইড়া তোর লাশ বাইর করুম। চারুলতার কাছে সব সত্যি খুইলা বলুম। আমারে ছাইড়া দে। আমারে তোরা মারিস না।
মায়া পাশের থেকে বলে উঠল,
– না, আপনারে ছাড়া যাব না। আপনার জন্য আমার সব স্বপ্ন বিসর্জন দিয়া গলায় দড়ি দিছি। আমার বাপরে আপনে খু/ন করছেন। আমার ক্ষতিপূরণ ক্যামনে দিবেন আপনে?
– তোর ক্ষতিপূরণ ক্যামনে দিমু আমি জানি না রে, মায়া। আমারে মাফ কইরা দে!
মায়া বলল,
– আপনি বাড়ির পেছনের আঙিনায় যাইয়া সোনালতার কবর খুঁড়েন। তার লাশ সবার সামনে বাইর কইরা নিয়া আসেন। গ্রামের সবার সামনে স্বীকার করেন আপনে আমার বাপেরে খু/ন করছেন। আপনারে আমরা মাফ কইরা দিমু।
তুর্জয় সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
– তোরা যা বলবি আমি তাই করমু। তাও আমারে মারিস না। আমারে ছাইড়া দে।
তুর্জয় বিছানায় চোখ বুঁজে দাপড়াতে লাগল। মুখে একই বুলি আওড়াতে লাগল বারবার,
– আমারে ছাইড়া দে সোনালতা! আমারে মারিস না। আমারে মাফ কইরা দে, মায়া। আমারে ক্ষমা কর।
এক পর্যায়ে তুর্জয় বুঝতে পারল তার বুকের ওপর থেকে ভার সরে গেছে। সে আলগোছে চোখ মেলল। সোনালতা কিংবা মায়া কাউকেই সে দেখতে পেল না। ধরফরিয়ে বিছানায় উঠে বসল সে। হৃদপিণ্ড যেন গলার কাছে এসে ধকধক করছে।
তুর্জয় এতক্ষণ ভ্রম দেখছিল। পাপের বিচার যখন দুনিয়ার মানুষজন করতে ব্যর্থ হয়, ক্ষমতার যাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকে, তখন প্রকৃতি বিচারের দায়িত্ব নিজের কাধে তুলে নেয়। এমনটাই হচ্ছে তুর্জয়ের সাথে। চারুলতার প্রতি তার ভালোবাসা দিন দিন অনুশোচনার হাজতে বন্দি করে ফেলছিল তাকে। অতীতে করে আসা পাপের বাটখারা পাহাড়ের উচ্চতা ছাড়িয়ে গিয়েছিল বলে শয়নে স্বপনে তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাকে।
তুর্জয় আর অপেক্ষা করল না। লুঙ্গি উঁচিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। মাঝরাতের ক্ষীণ চাঁদের আলোয় উঠোনে বের হয়ে এলো। টিমটমে আলোয় লন্ঠন ঝুলছে বাড়ির ছোট ঘরের দুয়ারের ওপর। সে ঘরে দা – কোদাল জাতীয় সরঞ্জাম রাখা হয়। সেই ছোটঘরে ঢুকে সেখান থেকে কোদাল নিয়ে বাড়ির পেছনের আঙিনার দিকে ছুটল তুর্জয়।
মাঝ বরাবর খুঁড়তে লাগল মাটি।
রাতের আঁধারে শুধুমাত্র গগণের চাঁদকে সাক্ষী রেখে তালুকদার বাড়ির বড় পুত্র মাটি খুঁড়ছে। কোনোদিকে তাকাচ্ছে না সে। মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে তুর্জয়ের মনে হতে লাগল তার চারিদিকে মায়া এবং সোনালতা হন্যে হয়ে ঘুরছে। অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে তারা বারংবার। তাদের সাথে তাল মিলিয়ে প্রকৃতিও যেন জেগে উঠেছে। মৃদুমন্দ বাতাসে শন শন শব্দে কাঁপছে গাছের পাতা। মেঘদল দ্রুত সরে যাচ্ছে। চাঁদ লুকোচুরি খেলছে সে মেঘের আড়ালে। প্রকৃতি যেন উৎসাহ জোগাচ্ছে তুর্জয়কে। বলছে,
– খুঁড়তে থাক। বেশি করে খুঁড়। এই মাটির নিচে লুকিয়ে আছে সোনালতার মৃত্যুরহস্য। দ্রুত খুঁড়তে থাক তুর্জয় তালুকদার! দ্রুত খুঁড়তে থাক।
*******************************
আজ তালুকদার বাড়ির পরিবেশ বেজায় থমথমে। পাখিদের কুহুরব যেন হারিয়ে গেছে চতুর্দিক থেকে। বাড়ির উঁচু প্রাচীর ভেদ করে কেবলমাত্র অংশুমালীর আলো ধরনী স্পর্শ করে নি। বরং চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে অসহ্য এবং গা গুলিয়ে ওঠা জাতীয় দুর্গন্ধ। পেছনের আঙিনায় মূর্তির মত বসে আসে তুর্জয়। তার পাশে কবর খুঁড়ে রাখা। সেখানে সন্ধান মিলেছে একটি অর্ধগলিত লাশের। লাশটি পচে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তার পরিচয় জানা দুরূহ। কিন্তু তুর্জয় ঠিক জানে লাশটি কার।
সোনালতার নিথর দেহের পচনের তীব্র গন্ধ যেন গ্রাস করেছে গোটা তেঘরিয়াকে। তালুকদার মশাই ছেলের এহেন কাণ্ডে ভয়ে সিঁটিয়ে আছেন। মাজেদার মুখ শুকিয়ে কাঠ। তাজমহল বেগম বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন। জোহরা এবং রূপা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির বারান্দায়।
তালুকদার বাড়িতে লাশের সন্ধান মিলেছে এ খবর বাতাসের আগে ছুটে চলল। নিমিষেই তেঘরিয়ার ঘরে ঘরে রটে গেল এই অন্যায়ের কাহিনী।
গ্রামের সকলে দলে দলে ভিড় জমাতে শুরু করল বাড়ির মূল ফটকের সামনে। উৎসুক গ্রামবাসীদের চোখে ধরা পড়ল ভয় আর ঘৃণার সংমিশ্রণ।
চারুলতা নিজের মাঝে সমস্ত সাহস একজোট করল। দ্বিধাদ্বন্দের নিকট হার মানল না। কম্পিত শরীর নিয়ে লাশের কাছে গেল সে। মনে মনে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইছিল।
– আমারে শক্তি দাও আল্লাহ! এই লাশ যদি আমার বইনের হয়, তা সহ্য করার শক্তি দাও আমারে।
মনের মাঝে এক গভীর অস্বস্তি নিয়ে দ্রুত পায়ে লাশের নিকট গেল সে। সত্য জানার আকাঙ্ক্ষা চেপে ধরেছে তাকে।
তুর্জয় একবার মাথা উঁচু করে চারুলতার পানে তাকাল। এরপর মাথা নিচু করে ফেলল। তার শরীর কাঁপছে।
দুর্গন্ধে চারুলতার নিশ্বাস নিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। তবুও সে তার তার দৃষ্টি লাশের থেকে সরাল না। লাশটির প্রায় সর্বাঙ্গ পচে গেছে। ভীষণ বিকৃত লাগছে দেখতে। সহসা চারুলতার চোখ চুম্বকের মতো আটকে গেল লাশটির বাম পায়ের গোড়ালিতে। সূর্যের আলোয় চকচক করছে অতি পরিচিত একটি অলংকার। রূপার নুপুর।
এই নুপুরটি চারুলতার চেনা। এমন নুপুর সেও পরে ছিল। যা তুর্জয়ের অমানবিক প্রহারের ফলে ভেঙ্গে গিয়েছিল।
এই নুপুরটিই যে তাদের শৈশবের এক গভীর ভালোবাসার গল্প বহন করছে!
অতীতের স্মৃতি আরোও একবার জল-ছবির মতো ভেসে উঠল চারুলতার চোখের সামনে। তাদের দরিদ্র বাবা না জানি কত কষ্ট করে, নিজের পেটের ভাত বাঁচিয়ে সোনালতাকে জন্মদিনে একজোড়া রূপার নুপুর বানিয়ে দিয়েছিলেন। সোনালতার সে কী আনন্দ! নুপুর পায়ে দিয়ে সোনালতা যখন সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছিল ঠিক তখন ছোট্ট চারুলতার মনে বেজে উঠেছিল বিষাদের সুর।
হাউমাউ করে কান্না করতে করতে শুধিয়েছিল,
- বাপজান, আমার নুপুর কই?
ছোট বোনের সেই কান্না সোনালতার বুকে এসে আঘাত হানল। নুপুর পায়ে পরে নবপ্রাপ্ত আনন্দের অনুভূতি ধূলিসাৎ হয়ে গেল মুহুর্তেই। সোনালতা আর সময় নষ্ট করে না। তৎক্ষণাৎ হাঁটু গেড়ে বসে তার ডান পায়ে পরা ঝকঝকে নতুন নুপুরটি যত্নের সহিত খুলে ফেলে এরপর ভালোবাসা মাখিয়ে পরিয়ে দেয় চারুলতাকে। দুই বোনের দুই পা সাক্ষী হয়ে থাকে ভালোবাসার নতুন সংজ্ঞার।
এই নুপুর চারুলতার সমস্ত সন্দেহ ঘুঁচিয়ে দিল।
এ লাশের মালিক তো আর কেউ নয়, তারই বড় বোন – সোনালতা!
গোটা শরীর হিম হয়ে গেল চারুলতার। তার মাথা ঘুরতে শুরু করল। বিকৃত, দুর্গন্ধময় দেহটির দিকে আর তাকিয়ে থাকতে পারল না। হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে পড়ল।
‘ওয়াক.. ওয়াক’ করে বমি করতে শুরু করল। মাজেদা ছুটে গেল চারুলতার কাছে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
– ও চারু কি হইল তোর! এমন করতাছস ক্যান?
চারুলতার বমি থামল না।
মাজেদা কপাল চাপরাতে লাগল,
– আল্লাহ! মাইয়াডার শরীর এমনে খারাপ হইলে কেমন হইব। এমনেই পেটে বাচ্চা। তার ওপর এইভাবে বমি করলে শরীরে শক্তি থাকব? সকাল থিকা না খাওয়া। এই জোহরা কই গেলি এদিকে আয় তো! ওরে ধর, ঘরে নিয়া যাই!
চারুলতার মুখের দিকে তাকিয়ে গ্রামের লোকজন বুঝল এই লাশের সাথে অবশ্যই চারুলতার কোনো সম্পর্ক রয়েছে।
************************
অতিথিঘরের বারান্দার শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে ছিল হায়দার আলম রাহাত। জীবনে প্রথমবার সরকারি দপ্তরের গোপন গোয়েন্দা হিসেবে খারাপ লাগা কাজ করছে তার মাঝে। যেখানে তার সামনে একটি অর্ধগলিত লাশ পড়ে আছে এবং শোকে কাতরাচ্ছে ছোট বোন চারুলতা – সেখানে সে সরাসরি কোনো একশনে যেতে পারছে না। পুরো বিষয়টি রাহাতকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে।
এই জনমানব বিচ্ছিন্ন হাওরগ্রামে তালুকদারের মত প্রভাবশালী লোক প্রশাসন পৌঁঁছানোর পূর্বেই বহু মূল্যবান প্রমাণ নষ্ট করে দেবার সক্ষমতা রাখেন। নিজের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রাহাতকে এক গভীর হীনমন্যতায় ভোগাতে শুরু করল।
রাহায় যেন আজ কোনো অদৃশ্য লোহার শেকলে বাঁধা।
সে নিজের মনেই আওড়াতে লাগল,
– কিসের গোয়েন্দা আমি? আমি কি ব্যর্থ নই?
সহসা রাহাতের চোখ গেল গ্রামবাসীদের ভীড়ের মাঝে। প্রায় সবার শেষে দাঁড়িয়ে আছে একটি পরিচিত মুখ। সারথি এসেছে। ছদ্মবেশে এসে উপস্থিত হয়েছে সে। রাহাত স্বস্তির শ্বাস ফেলল।
সে তীক্ষ্ণ চোখ নজর রাখল সারথির হাতের দিকে। সাধারণ গ্রামের মানুষের মতো বেশভূষা হলেও সারথির হাতে ধরা ছিল একটি লুকানো ডিজিটাল ক্যামেরা। একটি রেকর্ডারও এনেছে সাথে।
সারথি অতি সন্তর্পণে ভিড়ের আড়াল থেকে লাশের স্থান এবং উক্ত পরিবেশের বেশ কয়েকটি ছবি তোলার চেষ্টা করল।
ছবি তোলার ফাঁকে সারথি যেন অবচেতন মনেই একবার অতিথিঘরের বারান্দার দিকে তাকাল।
রাহাতের সাথে চোখাচোখি হল তার। মুখে কোনো শব্দ উচ্চারণ না করলেও, দূর থেকেই যেন তারা ইশারায় কথা বলল।
রাহাত হাতের দুটো আঙুল সামান্য নাড়াল। যেন সে বলতে চাইছে,
– সাবধান সারথি! যা করছিস বুঝে শুনে কর।
সারথিও প্রত্যুত্তরে সামান্য মাথা ঝাঁকাল।
– চিন্তা করো না, ভাই। আমি ঠিক প্রমাণ সংগ্রহ করে নিয়ে যাব।
রাহাত যেন অন্ধকারের মাঝে জ্বলজ্বলে লণ্ঠন খুঁজে পেতে সক্ষম হল।
সহসা একটি অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটল। আকাশের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ তুর্জয় চিৎকার করে উঠল।
-আমি! আমি খুন করছি! মায়ার বাপরে আমি রাতের অন্ধকারে খুন করছি।
উপস্থিত গ্রামবাসীদের গুঞ্জন মুহূর্তের মাঝে স্তব্ধ হয়ে গেল। তালুকদার বাড়ির বড় পুত্রের এহেন আচরণ যেন অবিশ্বাস্য!
তুর্জয় নিজের ঘোর কাটানোর জন্য কথাটি বারবার বলতে লাগল-
– আমি খুন করছি… মায়ার বাপেরে আমি খুন করছি…
এই সুযোগ হাতছাড়া করল না সারথি। সে দ্রুত ভীড় ঠেলে সামনে এগিয়ে গেল। তার লুকানো রেকর্ডারটি তুর্জয়ের দিকে তাক করে ধরে গোটা কথাটি পরিষ্কারভাবে রেকর্ড করার চেষ্টা করতে লাগল। তুর্জয়ের স্বীকারোক্তি দেখে রাহাতের হীনমন্যতা কেটে গেল, তার মুখে ফুটল এক চিলতে জয়ের হাসি।
( চলবে….)

