Home "ধারাবাহিক গল্প খাচায় বন্দি নীলকন্ঠী খাচায় বন্দি নীলকন্ঠী পর্ব-০১

খাচায় বন্দি নীলকন্ঠী পর্ব-০১

0
191

#খাচায়_বন্দি_নীলকন্ঠী
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#সূচনা_পর্ব

সূত্রাপুরের পোগোজ স্কুলের গা-ঘেঁষা সরু, স্যাঁতসেঁতে গলিটা পেরিয়ে আরও কিছুটা ভেতরে ঢুকলে হঠাৎ করেই চারপাশের জরাজীর্ণ আধুনিকতার চাদরটা খসে পড়ে। সেখানে প্রাচীন থমথমে নীরবতা বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘জমিনদার ভিলা’। চুন-সুরকির পলেস্তারা খসে পড়া এই বিশাল ত্রিতল অট্টালিকার বয়স প্রায় একশো বছর। নোনা ধরা লালচে দেয়ালগুলোর গা বেয়ে কোথাও কোথাও বুনো লতা আর পরজীবী অশ্বত্থের শিকড় সাপের মতো জেঁকে বসেছে। ছাদের কার্নিশে, যেখানে একসময় নকশাদার ভেন্টিলেটর ছিল, সেখানে এখন বাসা বেঁধেছে একঝাঁক বুনো পায়রার দল। তাদের অবিরাম গুটুর-গুটুর ডাক বাড়ির ভেতরের শূন্যতাকে আরও বেশি প্রকট করে তোলে। পুরান ঢাকার এই এক অদ্ভুত রসায়ন, বাইরে যতই বহুতল ভবনের কাঁচের দেয়াল উঠুক, এই গলিগুলোর গভীরে ঢুকলে মনে হয় সময় যেন গত শতাব্দীর কোনো এক তপ্ত দুপুরে এসে হাত-পা গুটিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে আছে।

আজ মে মাসের এক অসহ্য, গুমোট দুপুর। মাথার ওপর খাঁ খাঁ করা সূর্যটা যেন নীল আকাশ থেকে গলানো তামা ঢালছে। তপ্ত পিচের রাস্তা থেকে একটা ভ্যাপসা, তিতা গরম ভাপ উঠে এসে পুরো বাতাসকে ভারী আর শ্বাসরুদ্ধকর করে তুলেছে। দূর থেকে মাঝে মাঝে অলস বাতাসে ভেসে আসছে শ্যামবাজারের দিক থেকে আসা কোনো বাকরখানি বিক্রেতার চড়া গলার একঘেয়ে হাঁকডাক, আর গলির মোড়ে জটলা পাকানো রিকশার অবিরাম টুংটাং বেল আর মাঝেমধ্যে ঘোড়ার গাড়ির খুরের খটখট শব্দ তো আছেই।

এই বিশাল, অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রাসাদের দোতলার ঝুল বারান্দার মরচে ধরা লোহার গ্রিলটা দু-হাতে শক্ত করে ধরে নিস্পন্দ দাঁড়িয়ে আছে মেহরীন। তার পরনে একটা সুতি ঢাকাই শাড়ি। হালকা আকাশী রঙের জমিনে সাদা সুতোর মিহি পার, যা এই তপ্ত দুপুরে তাকে এক টুকরো মেঘের মতো আলগা করে রেখেছে। তার কপালে কোনো টিপ নেই, সিঁথির চুলে কোনো সুবাসিত তেলের স্পর্শ নেই। কোমর ছাপানো ঘন কৃষ্ণবর্ণের চুলগুলো অত্যন্ত অবহেলায়, আলগা করে একটা সাধারণ খোঁপা করা, যার কিছু অবাধ্য গোছা এসে লেপ্টে আছে তার ঘাড়ের কাছে। ভ্যাপসা গরমে তার ফর্সা, মসৃণ ঘাড় বেয়ে এক ফোঁটা লোনা ঘাম ধীরে ধীরে নেমে এসে শাড়ির পাড়ে গিয়ে মিশল, কিন্তু সেদিকে মেহরীনের বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই।

মেহরীনের চোখের দিকে তাকালে এক তীব্র হাহাকার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। ক্যানভাসে আঁকা কোনো বিষাদময় তৈলচিত্রের মতো তার চোখের মণি দুটো বড় অদ্ভুত। তারটানা টানা, ঘন পল্লবযুক্ত চোখ দুটোর নিচে এক চিলতে ক্লান্তির কালচে ছায়া। সে এই সচল, জীবন্ত, কোলাহলমুখর শহরটার দিকে তাকিয়ে থেকেও আসলে কিছুই দেখছে না। তার সেই গাঢ় চোখের মণি দুটো যেন কোনো এক অতল, অন্ধকার শূন্যতায় ডুব দিয়ে নিজের অস্তিত্বকে হাতড়াচ্ছে।

দীর্ঘ সাতটি বছর। একটি দুটি করে মেহরীন এই বাড়ির দেয়ালগুলোর চুন খসে পড়া গুনে চলেছে। এই চুন-সুরকির দেয়ালগুলো, এই ভ্যাপসা ঘরগুলো যেন মেহরীনের ভেতরের সমস্ত চঞ্চলতা, কৈশোরের সবটুকু উচ্ছল স্বপ্ন আর জীবনের জ্যান্ত রঙগুলো এক ফোঁটা এক ফোঁটা করে চুষে নিয়েছে। চুষে নিয়ে তাকে পরিণত করেছে এক মার্বেল পাথরের জীবন্ত, নির্বাক মূর্তিতে।

আজ থেকে ঠিক সাত বছর আগে, এক নিটোল শীতে যখন মেহরীনের বিয়ে হয়েছিল, তখন পুরো পুরান ঢাকা আলোড়িত হয়েছিল এক জাঁকজমকপূর্ণ রাজকীয় অনুষ্ঠানের দাপটে। পাত্র আকিল আহমেদ, চকবাজারের নামকরা সুগন্ধি ও পারফিউমের কাঁচামাল এবং বিদেশি প্রসাধন সামগ্রীর পাইকারি ব্যবসায়ী। পুরান ঢাকার বনেদি ও জাঁকজমকপূর্ণ ব্যবসায়ী পরিবার বলতে যা বোঝায়, আহমেদ পরিবার ঠিক তাই। তাদের ঘরে টাকা-পয়সার কোনো হিসাব নেই, ব্যাংকের ভল্ট উপচে পড়া প্রতিপত্তি আর সামাজিক অহংকার আকাশচুম্বী।

মেহরীন যখন এক সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের দেউড়ি পেরিয়ে প্রথম এই ‘জমিনদার ভিলা’র চৌকাঠে পা রেখেছিল, তখন তার চোখে ছিল এক আকাশ স্বপ্ন। সে ভেবেছিল, বিলাসের চেয়েও বড় যে জিনিস স্বামী-সংসারের একটুখানি ওম, একটুখানি নিটোল ভালোবাসা তা দিয়ে সে নিজের একটা ছোট সুখের নীড় গড়ে তুলবে। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম চাবুকটা পিঠে পড়তে মেহরীনের বেশিদিন সময় লাগেনি। সে খুব দ্রুতই, বিয়ের প্রথম কয়েকটা মাসের মধ্যেই আবিষ্কার করল, আকিল আহমেদের জীবনে ‘ভালোবাসা’, ‘মানসিক টান’ বা ‘স্ত্রীর মনস্তত্ত্ব’ বলে কোনো অলীক শব্দের অস্তিত্ব নেই। তার পুরো পৃথিবীটা আবর্তিত হয় কেবল দুবাই-সিঙ্গাপুর থেকে আসা আমদানি-রপ্তানির ইনভয়েস, কাস্টমসের শুল্কের ঝামেলা, চকবাজারের গদির লোহার সেফ আর ব্যাংকের বাৎসরিক মুনাফার জটিল অঙ্ককে কেন্দ্র করে।

আজ সকালেও নাস্তার টেবিলে ঠিক একই দৃশ্যের, একই যান্ত্রিকতার পুনরুল্লেখ ঘটেছে। সকাল সাড়ে আটটায় যখন মেহরীন ধোঁয়া ওঠা গরম ঘি-ছড়ানো পরাটা, কষা আলুর দম আর ডিম ভাজা নিয়ে রুপোর পার দেওয়া টেবিলে এসে বসল, আকিল তখন তার দামী আইফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে দুবাই থেকে আসা পারফিউম অয়েলের একটা চালানের হিসাব মেলাচ্ছিল। তার পরনে চড়া মাড় দেওয়া লিনেনের পাঞ্জাবি, শরীর থেকে উপচে পড়ছে এক উগ্র, দামী বিদেশি সেন্টের সুবাস, যা মেহরীনের কাছে ইদানীং এক ধরণের দমবন্ধ করা বিষের মতো লাগে।

মেহরীন কাঁচের চায়ের কাপটা আলতো করে আকিলের ডান হাতের পাশে এগিয়ে দিয়ে খুব মৃদু গলায় বলল, “আকিল, আজ কি ফেরার সময় ডালপট্টি থেকে একটু নসিবের বিরিয়ানি আনবে? অনেকদিন হলো দুজনে একসাথে বসে রাতের খাবার খাওয়া হয় না। একটু গল্প করতাম…নাকি বাইরেই যাবে?”

আকিল স্ক্রিন থেকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখ না তুলেই চায়ের কাপে একটা চুমুক দিল। ওনার ঠোঁটের কোণে চায়ের লিকার লেগে রইল। সে অত্যন্ত বিরক্ত সুরে, প্রায় ধমকের ভঙ্গিতে বলল, “বিরিয়ানি? এই মে মাসের কুৎসিত গরমে তোমার বিরিয়ানি খেতে ইচ্ছে করছে মেহরীন? ঘরে বসে বসে তো শরীর ভারী হচ্ছে, পেটে চর্বি জমছে খেয়াল আছে? আর আমার ফেরার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। আজ লক্ষ্মীবাজারের এক মারোয়াড়ি পার্টির সাথে বড় একটা পেমেন্টের ঝামেলা আছে। ওটা মিটিয়ে চকবাজারের গদিতে বসতে বসতে রাত এগারোটা বাজবে। তারপর নতুন চালানের আনলোডিং দেখতে হবে সদরঘাটে। রাতে ফিরতে ফিরতে একটা-দেড়টা। তুমি আম্মার সাথে খেয়ে শুয়ে পড়ো। অহেতুক আমার জন্য জেগে থাকার দরকার নেই।”

মেহরীন তার রুপোলি চামচটা দিয়ে নিজের প্লেটের ডিমের কুসুমটা আলতো করে নাড়তে নাড়তে ফিসফিস করে বলল, “টাকা আর ব্যবসা ছাড়া কি তোমার জীবনে আর কোনো কিছুর অধিকার নেই আকিল? এই বিশাল, ফাঁকা বাড়িতে সারাদিন আমি কার সাথে দুটো কথা বলব? আম্মা তো সকাল থেকে তসবি আর রাইয়ানের ঘরের ঝি-চাকরের বিচার নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। আমার এই একলা ঘরের চারদিকের দেয়ালগুলো ইদানীং আমাকে জ্যান্ত গিলে খেতে আসে। আমি শুধু একটু তোমার সময় চেয়েছিলাম।”

আকিল এবার ফোনটা ঠকাস করে কাঁচের টেবিলের ওপর রাখল। তার মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। যে হাসিটা মেহরীনের আত্মসম্মানের একদম গভীরে তীরের ফলার মতো বিঁধল। আকিল সোজা হয়ে বসে বলল, “দেখো মেহরীন, অকৃতজ্ঞের মতো ছোটলোকি কথা বলো না তো। এই পুরান ঢাকার কয়টা বড় ঘরের বউ তোমার মতো এত আরামে, আয়েশে থাকে? তোমার আলমারিটা একটু খুলে দেখো, ডজন ডজন ঢাকাই জামদানি, বেনারসি আর কাতান শাড়ি ঠাসা। লকারের দিকে তাকাও, অন্তত পঞ্চাশ ভরি নিরেট সোনা রাখা আছে তোমার জন্য। চাওয়ার আগেই তোমার ড্রেসিং টেবিল ফরাসি ব্র্যান্ডের দামী কসমেটিক্সে উপচে পড়ে। দুনিয়ার সব মেয়েরা যা পাওয়ার স্বপ্ন দেখে, তুমি তা কোনো খাটুনি ছাড়াই ঘরে বসে পাচ্ছ। আমি দিনরাত জান লড়িয়ে খাটছি কার জন্য? এই পরিবারের জন্যই তো। আমার সময় নেই কারণ আমি টাকা কামাচ্ছি। অহেতুক এই সস্তা ইমোশনাল ড্রামা আমার একদম পছন্দ না। গদির টেনশনে মাথাটা এমনিতেই জ্যাম হয়ে আছে।”

আকিল আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। তার চামড়ার ভারী ব্রিফকেসটা তুলে নিয়ে হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার ঠিক এক মিনিট পরেই নিচের সদর মহলের ভারী সেগুন কাঠের দরজাটা সজোরে বন্ধ হওয়ার একটা বিকট আওয়াজ পাওয়া গেল। সেই আওয়াজটা মেহরীনের মনের অলিন্দে গিয়ে এক দীর্ঘস্থায়ী, করুণ প্রতিধ্বনি তৈরি করল। মেহরীন নিথর, স্তব্ধ হয়ে টেবিলের পাশে বসে রইল। তার মনে হলো, সে আসলে কোনো স্বাধীন, রক্ত-মাংসের মানুষ নয়। সে হলো এই ‘জমিনদার ভিলা’র সোনার খাঁচায় বন্দি একটা ছটফটে নীলকণ্ঠী পাখি, যাকে প্রতিদিন দামী দানা-পানি আর রেশমি সুতো দেওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু ওড়ার জন্য যে বিশাল মুক্ত আকাশটার প্রয়োজন ছিল, তা অত্যন্ত নিপুণভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তার জাগতিক ও বাহ্যিক সব অভাব পূরণ করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার ভেতরের যে মন, যে নারীসুলভ আবেগ, যে তীব্র মানসিক ক্ষুধা তার প্রতি এই বাড়ির প্রতিটি চুন-সুরকির দেয়াল আর মানুষ সম্পূর্ণ অন্ধ এবং উদাসীন।

দুপুরের দিকে রান্নাঘরের গুমোট পরিবেশে যখন মেহরীন ডাল ঘুঁটছিল, তখন সেখানে শাশুড়ি দিলরুবা বেগম ঢুকলেন। ওনার পরনে সাদা থান, হাতে একটা চন্দন কাঠের তসবি, যা চব্বিশ ঘণ্টা ওনার বুড়ো আঙুলের চাপে খটখট শব্দে ঘোরে। কিন্তু সেই ধার্মিকতার আড়ালে ওনার চোখ দুটো সবসময় একটা তীক্ষ্ণ, কুৎসিত গোয়েন্দা ক্যামেরার মতো এদিক-ওদিক ঘোরে। বাড়ির কোন কোণায় কতটুকু তেল খরচ হলো, কার শাড়ির আঁচল অসাবধানতায় গ্রিলের বাইরে গেল, কে কাজের লোকের সাথে কতক্ষণ নিচু স্বরে কথা বলল সব ওনার নখদর্পণে।

মেহরীনকে আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত মুখে ডাল ঘুঁটতে দেখে তিনি তার চশমার ফাঁক দিয়ে একটা বিষাক্ত নজর হানলেন। ওনার তসবির গতি একটু বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “বউ, দুপুরের খাসির তরকারিতে লবণের তেজটা আজ একটু বেশি মনে হলো। আকিল তো আবার খাবার লবণে কড়া, ওর পাতে কম-বেশি হলে মেজাজ ঠিক থাকে না। এমনিতেই ছেলেটা ব্যবসার চিন্তায় শুকায়া যাইতাছে। আর বলি কি, সারাদিন ওই ঝুল বারান্দার গ্রিল ধইরা খাড়ায়া থাকার কী দরকার শুনি? মহল্লার ছোকরাগুলো ঘুড়ি ওড়ানোর নাম কইরা সামনের ছাদের ওপর আড়ি পাতে, চোখ ঘুরায়। তুমি হইলা এই জমিনদার বাড়ির বউ, একটু পর্দা আর পরিবারের ইজ্জত বুইঝা চলাটা তোমার দায়িত্ব। নিজের এই রূপটা এমনে গলির মোড়ের মানুষের দেখার জন্য ফাও বিলিয়াইয়া দিও না।”

মেহরীন কোনো প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেল না। এই সাত বছরের দীর্ঘ যাতনায় সে একটা জিনিস খুব ভালো করে শিখে গেছে এই পরিবারে নিজের আত্মসম্মান বাঁচাতে গিয়ে প্রতিবাদ করার মানে হলো নিজের ওপর আরও বড়, আরও কুৎসিত কোনো অশান্তি ডেকে আনা। সে কেবল মাথাটা আরও কিছুটা নিচু করে, কড়াইয়ের তপ্ত বাষ্পের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “জি আম্মা, ভুল হয়ে গেছে। আর বারান্দায় দাঁড়াব না।”

দিলরুবা বেগম ওনার চাটুকারিতার জয় দেখে সন্তুষ্ট চিত্তে তসবি গুনতে গুনতে চলে গেলেন। কিন্তু মেহরীনের ভেতরের কান্নাটা এবার গলার কাছে এসে একটা শক্ত পাথর খণ্ডের মতো দলা পাকিয়ে গেল। সে রান্নাঘরের উগ্র ধোঁয়ার আড়ালে নিজের চোখের কোণের তপ্ত জলটা শাড়ির আকাশী আঁচল দিয়ে মুছে নিল। এই বিশাল অট্টালিকায় তার কোনো নিজস্ব অস্তিত্ব নেই, কোনো সত্তা নেই। সে কেবল আকিল আহমেদের বৈধ স্ত্রী, দিলরুবা বেগমের বাধ্য পুত্রবধূ এবং এই বাড়ির তিন বেলার রান্নার তদারককারী এক বেতনহীন দাসী। তার নিজেরও যে একটা সুন্দর নাম আছে, একটা পরিচয় আছে, ‘মেহরীন’ সেই নাম ধরে ডাকার মতো, সেই নামের গভীরে লুকিয়ে থাকা মানুষটাকে ছোঁয়ার মতো কোনো ব্যক্তি এই জামিনদার বাড়িতে নেই।

সবচেয়ে ভয়াবহ আর যন্ত্রণাদায়ক সময়টা আসে মধ্যরাতের পর। যখন ঘড়ির কাঁটা একটা পেরিয়ে দুইয়ের ঘরে যায়, তখন আকিল শরীর ভর্তি ঘাম, সিগারেটের ধোঁয়া আর নোংরা টাকার গন্ধ নিয়ে ঘরে ফেরে। কোনো কথা নেই, কোনো সারাদিনের মানসিক খোঁজখবর নেওয়া নেই। বিছানায় এসেই সে কোনো ভূমিকা ছাড়াই মেহরীনের শাড়ির আঁচলটা টান মারে। তার ফর্সা, কোমল শরীরটাকে নিজের সারাদিনের ক্লান্তি আর কাম লালসা মেটানোর একটা নিষ্প্রাণ আধার হিসেবে ব্যবহার করে। কোনো প্রেম নেই, কোনো আদর নেই, তার কপালে কোনো আলতো চুমুর আশ্বাসও নেই। একটা যান্ত্রিক পশুর প্রক্রিয়ার মতো নিজের শারীরিক তৃপ্তি শেষে সে যখন পাশ ফিরে শুয়ে ভারী নাসিকাধ্বনি শুরু করে, মেহরীন তখন অন্ধকার ঘরে একলা, নিথর হয়ে সিলিং ফ্যানের অবিরাম ঘুরে চলার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনে হয়, তার শরীরটা হয়তো একটা সামাজিক চুক্তির অধীনে তৃপ্তির ভান করছে, কিন্তু ভেতরের আত্মাটা প্রতি রাতে এই বিছানায় একটু একটু করে মরে যাচ্ছে, ক্ষয়ে যাচ্ছে। সে যেন এক জ্যান্ত লাশ, যাকে প্রতিদিন অবহেলা আর একাকীত্বের আগুনে পুড়তে হচ্ছে।

চলবে?