#খাঁচায়_বন্দি_নীলকন্ঠী
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব_২
পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জ। বুড়িগঙ্গার লোনা বাতাস আর ইতিহাসের গন্ধ মাখা এই জনপদে রূপলাল হাউজ আজও দাঁড়িয়ে আছে তার ক্ষয়িষ্ণু রাজকীয়তা নিয়ে। কিন্তু সেদিন রূপলাল হাউজের সেই জীর্ণতা ঢাকা পড়ে গিয়েছিল আধুনিক আলোকসজ্জার নিচে। মহল্লার প্রভাবশালী চিনি ব্যবসায়ী হাজী গনি মিয়ার একমাত্র মেয়ের বিয়ে। গেটের সামনে বিশাল তোরণ, তাতে কয়েক হাজার মরিচ বাতির লাল-নীল খেলা। বড় বড় সাউন্ড বক্সে হিন্দি চটুল গানের তালে ড্রামসের ধুমধাড়াক্কা আওয়াজ চারপাশকে অন্যরকম করে তুলেছে। প্রবেশপথে সাদা জোব্বা পরা কয়েকজন তরুণ আগত অতিথিদের গায়ে রূপার আতরদানি থেকে গোলাপজল আর কড়া সুগন্ধি আতর ছিটিয়ে দিচ্ছে। বাতাসে ভাঁসা খাঁটি ঘিয়ে রান্না করা কাচ্চি বিরিয়ানি আর বোরহানির সেই জিভে জল আনা সুবাস জানান দিচ্ছে আয়োজন আজ সত্যিই ‘এলাহী’।
আকিল সাহেব তার সামাজিক প্রতিপত্তি আর ব্যবসায়িক আভিজাত্যের প্রদর্শনী হিসেবে মেহরীনকে অনেকটা হুকুমের সুরেই সাথে নিয়ে এসেছেন। মেহরীন পরেছে এক গাঢ় নীল রঙের বেনারসি শাড়ি। শাড়ির জমিন জুড়ে সোনালী সুতোর নিখুঁত কাজ, যেন শরতের মেঘমুক্ত নীল আকাশে তারার মেলা। কপালে একটি বড় সিঁদুরে লাল টিপ, কানে সাবেকি আমলের ভারি ঝুমকো আর গলায় সাতনরি হার। আয়নার সামনে যখন সে তৈরি হচ্ছিল, নিজের প্রতিবিম্ব দেখে তার মনে হয়েছিল, সে যেন কোনো প্রাচীন গল্পের অভিশপ্ত রাজকুমারী, যাকে সোনার খাঁচায় বন্দি করে রাখা হয়েছে। এই তীব্র কোলাহল আর আলোকচ্ছটার মাঝেও মেহরীনের মুখাবয়বে ছিল এক জমাটবদ্ধ বিষণ্ণতা।
আকিল তাকে লেডিস কর্নারের একটি গদিওয়ালা চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করল। তার চোখেমুখে এখন কেবল ব্যবসার নেশা। তিনি এক কোণায় কয়েকজন ইমপোর্টার আর রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে কথা বলছে। মেহরীনের কান পর্যন্ত মাঝে মাঝে আকিলের অট্টহাসি আর ‘পারফিউম ইমপোর্ট ডিউটি’ ও ‘ডলার রেট’ নিয়ে করা মন্তব্যগুলো আসছিল। মেহরীন চুপচাপ বসে তার হাতের কাঁচের গ্লাসের পেস্তার শরবতটার দিকে তাকিয়ে রইল। বরফকুচিগুলো গলে যাচ্ছে, কিন্তু তার তৃষ্ণা মিটছে না। তার মনে হচ্ছে, এই হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে সে যেন এক নিঃসঙ্গ দ্বীপ।
এই দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে মেহরীন যখন একটু পেছনের লনের দিকে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল, ঠিক তখনই ঘটে গেল এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি।
পেছন থেকে এক যুবক দ্রুত পায়ে আসছিল, বোধহয় কারও সাথে দেখা করার তাড়ায়। মেহরীন হুট করে ঘুরতেই দুজনের মাঝে মৃদু এক ধাক্কা লাগল। সামলাতে না পেরে মেহরীনের হাত থেকে কাঁচের গ্লাসটা মার্বেল পাথরের মেঝেতে পড়ে ঝনঝন শব্দে চুরমার হয়ে গেল। ঘন সবুজ পেস্তার শরবতটা ছিটকে গিয়ে লাগল মেহরীনের বেনারসির সোনালী আঁচলে আর সেই যুবকের ধবধবে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবির ওপর।
“ওহ গড! আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি! আমি সত্যিই খুব দুঃখিত, আমি আসলে খেয়াল করিনি।”
মেহরীন ভীষণ লজ্জিত আর অপ্রস্তুত হয়ে দুপা পিছিয়ে গেল। সে নিজের আঁচলটা আড়াল করার চেষ্টা করতে করতে সামনে দাঁড়ানো মানুষটির দিকে তাকাল। যুবকটির বয়স বড়জোর ত্রিশ-বত্রিশ। সুঠাম দীর্ঘ দেহ, চোখে সোনালী ফ্রেমের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক চশমা। পরনে তার অত্যন্ত মার্জিত সাদা লিনেনের পাঞ্জাবি, যার বোতামগুলো নিখুঁত হাতির দাঁতের কারুকাজ করা। সবচেয়ে অদ্ভুত তার শান্ত গভীর চোখ দুটো, যা যেন মানুষের মনের গভীর পর্যন্ত পড়ে নিতে পারে।
“না না, একদম ঠিক আছে। দোষটা আসলে আমারই, আমিই হুট করে আপনার পথে চলে এসেছিলাম,” মেহরীন ঘোমটাটা একটু টেনে নিচু স্বরে অপরাধবোধ নিয়ে বলল।
যুবকটি পকেট থেকে একটি ধবধবে সাদা ও সুগন্ধি রুমাল বের করে মেহরীনের দিকে বাড়িয়ে দিতে গিয়েও থেমে গেল। চারপাশের রক্ষণশীল পরিবেশের কথা মাথায় রেখে সে রুমালটা বাড়িয়ে না দিয়ে মৃদু হাসল। “আসলে সুন্দর জিনিসের ওপর একটু দাগ না পড়লে নাকি নজর লেগে যায়। আপনার এই নীল শাড়িতে পেস্তার সবুজ রঙটা কিন্তু অদ্ভুত একটা শেড তৈরি করেছে। ভালো কথা, আমি হলাম আরিশ।”
মেহরীন আর কোনো কথা না বাড়িয়ে দ্রুত সেখান থেকে সরে গেল। তার বুকের ভেতরটা তখনো ঢিপ ঢিপ করছিল। সে সোজা চলে এল পুরুষদের সেই প্রধান মজলিসের কাছে, যেখানে আকিল ও মহল্লার মুরুব্বিরা বসে পান চিবোচ্ছেন। মেহরীন ভেবেছিল তার স্বামীর পাশে দাঁড়ালে এই অপ্রস্তুত ভাবটা কাটবে, কিন্তু সেখানে যা আলোচনা চলছিল, তা তার ভেতরের আত্মসম্মানে সপাটে এক চড় বসিয়ে দিল।
চকবাজারের নামী বস্ত্র ব্যবসায়ী আলহাজ্ব জহির সাহেব পানের পিক ফেলে বললেন, “বুঝলেন আকিল ভাই, সংসার হইলো একটা আর্ট। আর বউ হইল সেই আর্টের ফ্রেম। ফ্রেম যত টাইট থাকব, আর্ট তত সুন্দর হইব। বউদের শখ-আহ্লাদ হইল ঘোড়ার রোগ। ওগো দামী শাড়ি-গয়না দিয়া খো খো করে হাসতে দিবেন, এর বাইরে বেশি আশকারা দিলেই কিন্তু সমস্যা। ঘরের লক্ষ্মী ঘরেই মানায়।”
আকিল সাহেব তার গ্লাসটা টেবিলে রেখে সায় দিয়ে হো হো করে হাসলেন। “একদম ঠিক বলেছেন জহির ভাই। এই যে দেখেন আমার মেহরীনকে। আমি কি ওর কোনো কমতি রেখেছি? আলমারি ভর্তি জামদানি, লকার ভর্তি সোনা। ও রাজরাণীর মতো থাকে। দুনিয়ার সব সুখ তো ওর পায়ের কাছে এনে দিয়েছি। এখন এর বাইরে যদি ও আবার ‘ব্যক্তিত্ব’ বা ‘স্পেস’ খুঁজতে যায়, তবে তো সেটা বাড়াবাড়ি, তাই না?”
পুরুষদের এই নগ্ন মানসিকতা আর নিজের স্ত্রীকে ‘পণ্য’ হিসেবে বিবেচনা করার এই দৃষ্টিভঙ্গি শুনে মেহরীনের চোখে জল চলে আসার উপক্রম হলো। ঠিক তখনই সেই ভিড়ের পেছন থেকে এক মেঘগম্ভীর ও শান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“আপনারা যা বলছেন আকিল সাহেব, ওটা আসলে কোনো সুখী সংসারের সংজ্ঞা নয়। ওটা হলো একটা সুসজ্জিত কারাগার আর বৈধ দাসত্ব।”
মুহূর্তে পুরো জটলা স্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল, সেই যুবক আরিশ সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে। তার পাঞ্জাবিতে তখনো সেই সবুজ দাগটা স্পষ্ট, কিন্তু তার শিরদাঁড়া সোজা।
আকিল সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন, “আপনি কে ভাই? আমাদের ব্যক্তিগত আলোচনায় এভাবে নাক গলাচ্ছেন কেন?”
আরিশ এক কদম এগিয়ে এসে সরাসরি আকিল সাহেবের চোখের দিকে তাকাল। “আমি আরিশ। আপনাদের এই সূত্রাপুরেই নতুন স্থপতি হিসেবে কাজ শুরু করেছি। আপনার কথায় মনে হলো, নারী কোনো অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ নয়, বরং আপনাদের কেনা এক দামী আসবাব। আপনি বললেন আপনি ওকে সব সুখ দিয়েছেন। কিন্তু আপনি কি জানেন আকিল সাহেব, দামী গয়না দিয়ে শরীর ঢাকা যায়, কিন্তু মনের ক্ষুধা মেটানো যায় না?”
আরিশের কণ্ঠের দৃঢ়তায় আশেপাশের সবাই থমকে গেল। সে বলতে লাগল, “একটা মেয়ে যখন নিজের চেনা জগত ছেড়ে আপনার ঘরে আসে, সে কিন্তু একটা সোনার লকারের চাবির জন্য আসে না। সে আসে একজন সহযাত্রীর জন্য, যে তার নীরবতাটা পড়তে পারবে। আপনারা সারাদিন ব্যবসার গদিতে বসে টাকার পাহাড় বানান, আর ভাবেন রাতে দামী উপহার দিলেই দায়িত্ব শেষ। কিন্তু আপনার বউয়েরও একটা স্বপ্ন আছে, নিজস্ব একটা আকাশ আছে। ওনাকে ঘরের ভেতর বন্দি রেখে দামী দানা-পানি দেওয়া আর খাঁচার পাখিকে বন্দি রাখা একই কথা। আপনি আপনার জাগতিক চাহিদা পূরণ করছেন ঠিকই, কিন্তু ওনার যে মানসিক একাকীত্ব ওটাকে আপনারা প্রতিদিন তিলে তিলে খুন করছেন। সত্যিকারের সংসার মানে টাকার দাপট নয়, সত্যিকারের সংসার মানে হলো একে অপরের পরিপূরক হওয়া।”
আরিশের প্রতিটি শব্দ যেন চাবুকের মতো আকিল সাহেবের অহংকারে গিয়ে লাগছিল। সে বলল, “আমি আমার সংসার সম্পর্কে জানেন? আমার বউ কি চায় আপনি বলে দিবেন? আপনি জানেন?”
“আমি তো কেবল উদাহরণ দিলাম।”
মেহরীন আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনছে আর তার দুচোখ বেয়ে অবিরল ধারায় জল পড়ছে। সাত বছরের বিবাহিত জীবনে সে যে কথাগুলো কোনোদিন তার স্বামীকে বোঝাতে পারেনি, এই অচেনা মানুষটি মাত্র কয়েক পলকে তা সমাজের এই লৌহকঠিন দেয়ালগুলোর সামনে তুলে ধরল।
আরিশ কথাগুলো শেষ করে এক মুহূর্তের জন্য মেহরীনের চোখের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ছিল গভীর সমবেদনা আর শ্রদ্ধা। তারপর সে ভিড়ের মাঝে মিশে গেল। আকিল সাহেব অপমানে আর রাগে থমথমে মুখে বসে রইল, কিন্তু মেহরীনের মনের জগতে তখন এক প্রলয়ংকারী বিপ্লব ঘটে গেছে। সে আজ প্রথমবার অনুভব করল তার অন্ধকার জীবনে আরিশ নামের এই মানুষটি যেন এক মশাল নিয়ে এসেছিল, যে তাকে জানিয়ে গেল যে সে শুধু আকিল সাহেবের স্ত্রী নয়, সে একজন ‘মানুষ’ যার নিজস্ব একটা পৃথিবী পাওয়ার অধিকার আছে।
–
গতরাতের সেই বৃষ্টির পর পুরান ঢাকার আকাশটা আজ একদম পরিষ্কার। রোদের তেজ থাকলেও বাতাসে বুড়িগঙ্গা নদী থেকে ভেসে আসা একটা মৃদু ঠান্ডা আমেজ আছে। জমিনদার ভিলার বিশাল ছাদে মেহরীন এসেছে ধোয়া শাড়িগুলো শুকাতে দিতে। চুন-সুরকির পুরনো ছাদ, কোণায় একফালি তুলসী গাছ আর কার্নিশ জুড়ে পায়রাদের ওড়াউড়ি। মেহরীন যখন নীল রঙের শাড়িটা মেলছে, তখন তার চোখ গেল তাদের বাড়ির নিচতলার ভাড়াটিয়া মকবুল সাহেবের ছোট ছেলে পিন্টুর দিকে। সে ছাদের এক কোণায় দাঁড়িয়ে সামনের ছাদটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। পিন্টুর হাতে লাটাই, কিন্তু সুতোটা ঢিলে হয়ে নিচে পড়ে আছে। মেহরীন দেখল পিন্টুর মুখটা থমথমে, চোখের কোণে জল চিকচিক করছে।
মেহরীন কাছে গিয়ে আলতো করে পিন্টুর মাথায় হাত রাখল। “কী হয়েছে রে পিন্টু? মুখ এমন ভার করে আছিস কেন?”
পিন্টু ফুঁপিয়ে উঠে সামনের ছাদটার দিকে আঙুল দেখাল। “বড় খালামণি, আমার শঙ্খচিল ঘুড়িটা কেটে ওই সামনের ছাদে পড়ে গেছে। ওটা আমার সবচেয়ে প্রিয় ঘুড়ি ছিল।”
মেহরীন তাকিয়ে দেখল, সামনের দোতলা বাড়িটার ছাদে একটা লাল-হলুদ ঘুড়ি আটকে আছে। ওটা একটা ব্যাচেলর মেস বাড়ি। পিন্টুর কান্না দেখে মেহরীনের বুকের ভেতরটা মায়ায় মুচড়ে উঠল। এই মায়াটা বড় কষ্টের। মেহরীনের কোনো সন্তান নেই। বিয়ের শুরুর তিন বছর এই নিয়ে তাকে অনেক কটু কথা সইতে হয়েছে। শাশুড়ি থেকে শুরু করে মহল্লার মহিলারাও তাকে ‘আঁটকুড়ি’ বলতে ছাড়েনি। পরে অবশ্য ভেলোরে গিয়ে পরীক্ষা করানোর পর জানা যায় সমস্যা আসলে আকিলের। সেই থেকে ওনারা চুপ হয়ে গেলেও মেহরীনের কোলটা তো শূন্যই রয়ে গেল। তাই বাচ্চাদের কোনো কষ্ট দেখলে সে স্থির থাকতে পারে না। মেহরীন পিন্টুকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, “কেঁদিস না বাবা, আমি দেখছি ওখান থেকে কাউকে বলা যায় কি না।”
মেহরীন ছাদের কিনারায় গিয়ে আলিসার ওপর ভর দিয়ে সামনের ছাদটার দিকে উঁকি দিল। দেখল, একটি ছেলে উল্টো পাশে ফিরে বসে আছে। তার পরনে একটা ঢিলেঢালা কালো গেঞ্জি। ছেলেটি খুব তন্ময় হয়ে গিটার বাজাচ্ছে। মেহরীন একটু দ্বিধা নিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “শুনুন… এই যে ভাইয়া, শুনছেন?” গিটারের সুরটা হঠাৎ থেমে গেল। ছেলেটি ধীরপায়ে গিটারটা একপাশে রেখে ঘুরে দাঁড়াল। মেহরীন দেখামাত্রই চিনে ফেলল! এ তো সেই আরিশ! গতরাতের সেই বিয়েবাড়ির যুবক। আরিশের চোখে এক মুহূর্তের বিস্ময় খেলে গেল, যা পরক্ষণেই এক ঝকঝকে হাসিতে রূপ নিল। আরিশ রেলিংয়ের কাছে এগিয়ে এসে হালকা বিস্ময় নিয়ে বলল, “আরে! আপনি? কাল বিয়েবাড়িতে তো আপনার সাথে বেশ একটা লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেল। শাড়িটা কি ঠিক হয়েছে?”
মেহরীন আরিশের এই সরাসরি সম্বোধনে কিছুটা কুঁকড়ে গেল। সে মাথায় কাপড়টা আর একটু টেনে দিয়ে নিছু স্বরে শুধু বলল, “জি।”
আরিশ মেহরীনের জড়তা লক্ষ্য করে একটু হাসল। তারপর আলগোছে জিজ্ঞেস করল, “কাল তো ভিড়ের মধ্যে অনেক কথা হলো অনেকের সাথে। আচ্ছা, আপনার স্বামী কে? ওই যে যিনি টাকার হিসাব করছিলেন, উনি?”
মেহরীন এবারও ছোট উত্তর দিল, “জি, উনিই।”
“ও আচ্ছা। তাহলে তো আমরা প্রায় প্রতিবেশী। এই গত সপ্তাহে আমি এই বাড়িতে শিফট করেছি।” আরিশ ঘুড়িটার দিকে তাকিয়ে সেটা হাতে তুলে নিল। “আর এই ঘুড়িটা নিশ্চয়ই এই পিচ্চিটার? বেশ দামী ঘুড়ি তো!”
মেহরীন এবারও মিতবাক। সে শুধু মাথা নাড়াল, “হু।”
আরিশ ঘুড়িটা হাতে নিয়ে বাতাসে একটু দোলাতে দোলাতে মেহরীনের দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো হঠাৎ কেমন যেন গম্ভীর আর গভীর হয়ে উঠল। সে ছাদের কোণায় বসা একটা একলা পাখির দিকে ইশারা করে খুব ধীর গলায় বলল, “জানেন মেহরীন ভাবী, এই পুরান ঢাকার খাঁচায় বন্দী দামী পাখিদের দেখলে আমার খুব মায়া হয়। বিশেষ করে নীলকণ্ঠী পাখিদের। তারা নিজের ভেতরের সব বিষ, সব একাকীত্ব চেপে রেখে বাইরে নীল রঙের সৌন্দর্য দেখায়। লোকে তাদের সুন্দর রূপ দেখে তালি দেয়, কিন্তু কেউ তাদের ভেতরের সেই নীল বিষটার খোঁজ নেয় না। আপনিও কি একাকীত্বের সেই নীল বিষটা প্রতিদিন গিলে চলেছেন?”
“মানে?”
“চেহারা দেখে বললাম। আমার আন্দাজ শক্তি দারুণ। দুঃখিত আপনি আবার কিছু মনে করবেন না।”
আরিশের এই রূপক কথাগুলো মেহরীনের বুকের একদম মাঝখানে গিয়ে তীরের মতো বিঁধল। তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। এ কেমন জাদুকর পুরুষ! সে কি মেহরীনের মনের দেয়াল ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়েছে? মেহরীন স্তব্ধ হয়ে গেল, তার ঠোঁট দুটো কাঁপতে লাগল। সে কিছু একটা জবাব দেওয়ার জন্য মুখ খুলতে যাবে, ঠিক তখনই,
“ও মেহরীন! ছাদেই কি পাটি বিছায়া ঘুমাইলা নাকি? নিচে রান্ধনের লোক আইসা বইসা আছে, আর উনি নবাবজাদীর মতো ছাদে বাতাস খাইতেছেন!”
পেছন থেকে শাশুড়ি দিলরুবা বেগমের সেই চিল-চিৎকার আর কর্কশ হাঁক চুন-সুরকির পুরনো ছাদটাকে কাঁপিয়ে দিল। মেহরীন যেন এক ঘোর থেকে বাস্তবে আছাড় খেল। তার মুখটা ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। লোকলজ্জা আর শাশুড়ির ভয়ে সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ানোর সাহস পেল না।
আরিশের দিকে তাকিয়ে একটা বিদায়সূচক কথা বলার বা সৌজন্য দেখানোর ন্যূনতম সময়ও সে পেল না। মেহরীন আধ-শুকনো কাপড়গুলো হড়বড় করে টেনে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরল। আরিশ তখনো ওপাশের ছাদে দাঁড়িয়ে গভীর চোখে মেহরীনের এই ছটফটানি আর অসহায়ত্ব দেখছিল।
মেহরীন আরিশের দিকে শেষবারের মতো না তাকিয়ে, কোনো উত্তর না দিয়েই প্রায় দৌড়ে সিঁড়ির দিকে চলে গেল। তার পেছনে পড়ে রইল পিন্টু আর আরিশের সেই অসমাপ্ত, ধারালো কথাগুলো। নিচে নামার সময় মেহরীনের মনে হচ্ছিল, তার বুকের ভেতরটা এক অজানা ঝড়ে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে, আর তার কানে অনবরত বাজছে, “আপনিও কি একাকীত্বের সেই নীল বিষটা প্রতিদিন গিলে চলেছেন?”
চলবে?

