#_এক_ফালি_রোদ্দুর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_১৪_
অন্তরঙ্গ সময়ে দরজায় টোকার আওয়াজ পড়তেই প্রচণ্ড বিরক্ত হয় অনন্যা আর জিসান। পাঁচতারা হোটেলের বিলাসবহুল সুইটের ভেতর তখন নরম আলো ছড়িয়ে আছে। ভারী পর্দাগুলো টেনে দেওয়া। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন এক গোপন জগৎ যেন। কিন্তু, সেই মুহূর্তেই দরজায় একের পর এক কড়া নাড়ার শব্দ তাদের বিরক্তির চূড়ান্ত কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জিসান বিরক্ত মুখে মাথা তুলে তাকায়।
” ধুর! এখন আবার কে এলো?”
অনন্যা ভ্রু কুঁচকে ফেলে। টোকা আবারও পড়লো।জিসান কয়েক সেকেন্ড থেমে রইলো। সে শব্দটাকে গুরুত্ব দিতে চাইছে না। তারপর অনন্যার দিকে ঝুঁকে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চাইলো। কিন্তু দরজার শব্দ থামে না। বরং, আগের চেয়ে আরও জোরে হতে লাগে। অনন্যা বিরক্ত হয়ে যায়।
” এখন কে নক করছে?”
জিসান দাঁত চেপে বললো,
” কোনো সার্ভিস বয় হবে হয়তো। বিরক্তিকর!”
অনন্যার মুখে বিরক্তির ছাপ আরও গাঢ় হয়ে উঠে।
” কড়া কথা বলে আসবে। এতো জোরে কেউ নক করে? আর যখন দেখছে খুলছি না দরজা, তখন বোঝা উচিত। অসভ্যের মতো নক করেই যাচ্ছে।”
জিসান এবার বিরক্তি নিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। পাশে থাকা সাদা তোয়ালেটা কোমরে জড়িয়ে নেয়। তারপর এগিয়ে যায় মেইন ডোরের দিকে। হাত বাড়িয়ে লক খুললো সে। পরের মুহূর্তেই দরজা খোলা মাত্র তার মুখের সমস্ত রক্ত যেন সরে যায়। চোখ বড় বড় হয়ে উঠে। শরীর জমে যায়। কারণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, মারফুয়া বেগম। তার ঠিক পাশে রনক রহমান, হোটেলের ম্যানেজার, কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা, একজন পুলিশ অফিসার। আর সবার শেষে দাঁড়িয়ে আছে রাজ। স্থির। নিঃশব্দ। অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা মুখে। জিসানের বুকের ভেতর ধপ করে উঠে কয়েক সেকেন্ড সে কোনো কথা বলতে পারে না। শুধু বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলো।
” আপনারা সবাই এখানে কেন?”
জিসানের কণ্ঠ কেঁপে উঠে। প্রশ্নটা করার সময়ও সে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না যে এই দৃশ্য সত্যি।কয়েক মুহূর্ত আগেও যে বিলাসবহুল সুইট তার কাছে নিরাপদ আশ্রয় মনে হচ্ছিলো, এখন সেটাই যেন অদৃশ্য কোনো আদালতে পরিণত হয়েছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মারফুয়া বেগম ঠোঁট বাঁকিয়ে একরকম নির্মম হাসি হাসলেন।
” তোমাদের গেম শেষ করতে এসেছি।”
কথাটা শুনে জিসানের বুকের ভেতর ধক করে উঠে।এসি নিয়ন্ত্রিত শীতল কক্ষের মধ্যেও তার কপালে ঘামের বিন্দু জমতে শুরু করেছে। হাতের তালু ভিজে উঠছে অস্বস্তিতে। সে একবার মারফুয়া বেগমের দিকে তাকায়, তারপর রাজের দিকে। রাজ কোনো কথা বললো না। সে শুধু গম্ভীর, স্থির দৃষ্টিতে জিসানের দিকে তাকিয়ে রইলো। সাদা তোয়ালে জড়ানো শরীর। এলোমেলো চুল। আর গলার কাছে স্পষ্ট কয়েকটি দাঁত বসানো দাগ। দৃশ্যটা দেখে রাজের চোখের ভেতর কঠোরতা জমে উঠে। তার মনে পড়ে যায় বাবা মায়ের বলা কথাগুলো। তাহলে কি তারা সত্যিই ঠিক ছিলো? তাহলে কি এতোদিন ধরে সে যা বিশ্বাস করে এসেছে, সবটাই ভুল? রাজের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে।অন্যদিকে, জিসান নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে।
” কিসব বলছেন আপনি? কিসের গেম?”
রাজ একবার মায়ের দিকে তাকায়। মারফুয়া বেগমও ছেলের দিকে তাকালেন। পরের মুহূর্তেই রাজ চোখ সরিয়ে সুইটের ভেতরের দিকে পা বাড়ায়। জিসান দ্রুত সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়ায়।
” তুমি ভেতরে কেন যাচ্ছ? এটা আমার পারসোনাল রুম।”
তারপর হোটেল ম্যানেজারের দিকে ঘুরে ক্ষুব্ধ স্বরে বললো জিসান,
” ম্যানেজার সামনে দাঁড়িয়ে এইসব কী তামাশা দেখছেন?”
ম্যানেজার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
” এখানে আমার কিছুই বলার নেই।”
কথাটা শুনে জিসানের মুখের রঙ আরও ফ্যাকাশে হয়ে যায়। সে আবার রাজকে থামানোর চেষ্টা করে।
” আমি বলছি দাঁড়াও।”
কিন্তু রাজ যেন তার কথা শুনতেই পেলো না। কোনো উত্তর না দিয়ে সে সরাসরি ভেতরের দিকে এগিয়ে যায়। তার পেছন পেছন অন্যরাও ভেতরে প্রবেশ করে। জিসান মরিয়া হয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে।কিন্তু কেউ তার বাধা মানল না। সবার চোখে তখন এক ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দৃঢ়তা। আর জিসানের বুকের ভেতর আতঙ্ক ক্রমশ বেড়েই চললো।
ভেসে আসা পায়ের শব্দ শুনেই অনন্যা ভাবে, জিসান হয়তো ফিরে এসেছে। তাই সে তাড়াহুড়ো করে বলে ওঠে,
” কাম অন, জিসান! বাসায় যেতে হবে।”
কিন্তু কথাটা শেষ হওয়ার আগেই অনন্যার দৃষ্টি গিয়ে আটকায় দরজার দিকে। আর তারপরই শরীরের সমস্ত রক্ত হিম হয়ে যায়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাজ। এক মুহূর্তের জন্য অনন্যা বিশ্বাসই করতে পারে না। চোখদুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠে। আতঙ্কে, লজ্জায়, অপমানে তার পুরো শরীর কেঁপে উঠে। সে দ্রুত বিছানার উপর পড়ে থাকা কম্বলটা টেনে নিয়ে নিজেকে শক্ত করে জড়িয়ে নেয়। শুধু মুখটুকু বাইরে রয়ে গেলো।
ঘরের ভেতর এক অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো। অনন্যার সেই অবস্থাটা চোখে পড়তেই মারফুয়া বেগমের মুখ ঘৃণায় কুঁচকে উঠে। ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরে তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রনক রহমানও অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। চোখ নামিয়ে নিয়ে এক মুহূর্তও আর ভেতরে দাঁড়ালেন না।
” আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।”
নিচু স্বরে বলে রনক রহমান দ্রুত রুমের বাইরে বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু রাজ নড়লো না। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার দৃষ্টি গিয়ে থামে অনন্যার উপর। সেই দৃষ্টিতে রাগ ছিল না, চিৎকার ছিল না, কোনো প্রশ্নও ছিল না। ছিল শুধু এক ভয়ংকর শূন্যতা। যেন দীর্ঘদিন ধরে বুকের ভেতর যতো অনুভূতি জমে ছিলো, সবকিছু এক মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে গেছে। তবু সেই শূন্যতার আড়ালে রাজ অনুভব করছে এক অসহনীয় যন্ত্রণা। মনে হচ্ছে, বুকের ভেতর হাজারো বিষাক্ত পোকা একসঙ্গে কিলবিল করছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। চোখের সামনেই আছে তার স্ত্রী।
যে মেয়েটাকে সে একসময় পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবেসেছে রাজ। যার হাসি দেখার জন্য সবকিছু করেছে। যার একটি ফোনকলের জন্য অস্থির হয়ে থেকেছে। যার জন্য নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তগুলো নিতে দ্বিধা করেনি। সেই মানুষটাকেই আজ এমন অবস্থায় দেখতে হচ্ছে তাকে।হঠাৎ অতীতের স্মৃতিগুলো ঝড়ের মতো ফিরে এলো। একসময় এই মেয়ের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য সে নিজের প্রথম সংসার ভেঙেছে। প্রথম স্ত্রীকে দুরে ঠেলেছে। নিজের অনাগত সন্তানকেও দূরে ঠেলে দিয়েছে। আজ পর্যন্ত নিজের ছেলের মুখ দেখা হয়নি তার। সবকিছুর বিনিময়ে সে বেছে নিয়েছিলো অনন্যাকে। আর আজ? আজ সেই ভালোবাসার শেষ পরিণতি দাঁড়িয়ে আছে তার চোখের সামনে।
রাজ ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে। একটা ভারী শ্বাস বুকের ভেতর জমে আছে। কষ্টে ঢোক গিলে সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। অন্যদিকে, অনন্যা স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে জিসানের দিকে। তার চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক। জিসানও অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। কেউ কোনো কথা বলতে পারছে না।অনন্যা উঠে দাঁড়াতে চাইলো। কিন্তু, সে সেই পরিস্থিতিতে নেই। তার হাত কাঁপছে। ঠোঁট শুকিয়ে যাচ্ছে। অবশেষে অনেক কষ্টে সে ফিসফিস করে ডাকে,
” রাজ!”
রাজ কোনো উত্তর দেয় না। এমনকি তার দিকে তাকায়ও না। কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থাকার পর সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তারপর কোনো কথা না বলে, কোনো অভিযোগ না করে, কোনো প্রশ্ন না ছুঁড়ে দিয়ে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করে। আর পরের মুহূর্তেই রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
…
সন্ধ্যা নেমেছে অনেকক্ষণ। বাইরে আকাশের শেষ আলোটুকুও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের ভেতর। রহমান ভিলার বিশাল ড্রইং রুমে আলো জ্বলছে। দামি ঝাড়বাতির আলোয় পুরো ঘরটা ঝকঝক করছে। নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে তিনজন মানুষ। একপাশের সোফায় বসে আছেন রনক রহমান। তার মুখ গম্ভীর, কপালে চিন্তার ভাঁজ। আরেক পাশে মারফুয়া বেগম। চোখে মুখে স্পষ্ট ক্লান্তি আর উদ্বেগের ছাপ। আর তাদের সামনেই সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে রাজ। চোখ দুটো বন্ধ। মাথাটা সামান্য পেছনে ঠেস দেওয়া। দেখে মনে হচ্ছে, সে যেন বাইরের পৃথিবী থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।
হোটেলের সেই দৃশ্যের পর কয়েক ঘণ্টা কেটে গেছে। কিন্তু, রাজের ভেতরে সময় যেন থমকে আছে সেই মুহূর্তেই। মারফুয়া বেগম একদৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই ছেলেটাই তার একমাত্র সন্তান। জন্মের পর থেকে যার হাসি দেখলে তার পৃথিবী উজ্জ্বল হয়ে উঠতো। যার সামান্য কষ্টও তাকে অস্থির করে তুলতো। আজ সেই ছেলেটাকে এতোটা ভেঙে পড়া অবস্থায় দেখে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে তার। একজন মা সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারে সন্তানের না বলা যন্ত্রণা। ঘরের নীরবতা ভেঙে অবশেষে তিনি আস্তে করে ডাকলেন,
” রাজ!”
কোনো উত্তর এলো না। কয়েক সেকেন্ড কেটে যায়। তারপর রাজ ধীরে ধীরে চোখ খুললো। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। ভেতরে জমে থাকা অগণিত কষ্ট সেখানে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। সে কিছুক্ষণ নীরব রইলো। তারপর নিচু স্বরে বললো,
” বিয়ের আগেই কি এসব কিছুই জানতে, আম্মু?”
প্রশ্নটা শুনে মারফুয়া বেগম কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বললেন,
” না! এতো কিছু জানতাম না।”
রাজ এবার সোজা হয়ে বসে। চোখ সরাসরি মায়ের মুখে স্থির।
” তাহলে কী জানতে? তুমি তো সবসময় আমাকে ওকে বিয়ে করতে নিষেধ করতে। বলেছিলে মেয়েটা আমার জন্য ভালো হবে না। তাহলে নিশ্চয়ই কিছু জানতে। কী জানতে, আম্মু?”
মারফুয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি বললেন,
” আমি জানতাম অনন্যা খুব লোভী মেয়ে। নিজের স্বার্থের বাইরে কিছু ভাবতে পারে না। আমি জানতাম ও নিয়মিত বারে যেতো। বিভিন্ন ক্লাব আর নাইট পার্টিতে যাওয়া আসা ছিলো ওর। এসব নিয়ে আমি তোকে অনেকবার বলতে চেয়েছি। কিন্তু তুই কখনো আমাকে সুযোগ দিসনি, রাজ!”
রাজের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। কথাটা মিথ্যা নয়। অনন্যার ব্যাপারে কেউ কিছু বললেই সে ক্ষেপে উঠতো। মায়ের কথাও শুনতে চাইতো না।মারফুয়া বেগম আবার বললেন,
” আমি শুধু এসবই জানতাম। কিন্তু ও যে জিসানের সঙ্গে মিলে এতো বড় পরিকল্পনা করেছে, সেটা আমি জানতে পেরেছি মাত্র কিছুদিন আগে।”
রাজ স্থির হয়ে বসে রইলো। তার চোখ মায়ের মুখে আটকে আছে। মনে হচ্ছে, প্রতিটা শব্দ তার বুকের গভীরে গিয়ে আঘাত করছে। তার মনে পড়ে যায়, গত কয়েক বছরের অসংখ্য ঘটনা। মায়ের সতর্ক করা।বাবার আপত্তি। সবকিছুকে উপেক্ষা করে সে শুধু অনন্যাকেই বিশ্বাস করেছিলো। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, আসলে সে নিজেই নিজের চোখ বন্ধ করে রেখেছিলো। রাজ মাথা নিচু করে ফেলে। মারফুয়া বেগম কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন,
” একদিন তুই আর তোর বাবা অফিসে ছিলি। আমি তোর রুমের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন হঠাৎ ভেতর থেকে কিছু কথা আমার কানে আসে।”
রাজ মুখ তুলে তাকায়। মারফুয়া বেগম কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন,
” কথাগুলো অনন্যা বলছিলো। প্রথমে আমি গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু, কয়েকটা কথা শোনার পর আমার সন্দেহ হয়। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আমি আরও কিছুক্ষণ শুনি। তখন বুঝতে পারি, ও ফোনে জিসানের সঙ্গে কথা বলছে। ওরা নিজেদের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছিলো। খুব স্পষ্টভাবেই। অনন্যা হয়তো ভেবেছিলো আমি নিচতলায় আছি, অথবা উপরে যাবো না। তাই নিশ্চিন্তে কথা বলছিলো। কিন্তু ও বুঝতেই পারেনি যে আমি প্রায় সবকিছু শুনে ফেলেছি। সেদিন রাতেই আমি তোর বাবাকে সব বলি। প্রথমে উনিও অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর বললেন, শুধু সন্দেহের উপর ভরসা করলে হবে না। সত্যিটা প্রমাণ করতে হবে। এরপর তোর বাবা আমাকে সবরকম সাহায্য করেন। আমরা টাকার মাধ্যমে একজন দক্ষ হ্যাকার নিয়োগ করি। সে অনন্যার ফোনের সমস্ত তথ্য আমাদের কাছে পৌঁছে দিতো। কল হিস্ট্রি, মেসেজ, বিভিন্ন চ্যাট, সবকিছু। শুধু তাই না। আমরা কয়েকজন লোকও নিয়োগ করি। তাদের কাজ ছিলো অনন্যা আর জিসানের উপর সবসময় নজর রাখা। কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে দেখা করছে, কী করছে, সব খবর আমাদের কাছে আসতো। ধীরে ধীরে পুরো সত্যিটা আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে যায়। তারপর আমরা অপেক্ষা করেছি। সঠিক সময়ের জন্য। আর সেই অপেক্ষার শেষ হলো আজ।”
রাজ কোনো কথা বললো না। তার মনে হচ্ছিল, প্রতিটা শব্দ যেন ধারালো ছুরির মতো এসে বুকের ভেতর আঘাত করছে। এতোদিন ধরে যাদের ভুল ভেবেছে, যাদের কথা শুনতে চায়নি, তারাই সত্য বলেছিল। আর যাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছে, সেই মানুষটাই তাকে সবচেয়ে বড় কষ্ট উপহার দিয়েছে। কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর রাজ ধীরে ধীরে মাথা তুললো। তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল।কণ্ঠে ভাঙা মানুষের অসহায়তা,
” এটা কি প্রভার সাথে করা আমার কর্মফল, আম্মু?”
প্রশ্নটা শুনে মারফুয়া বেগমের বুক কেঁপে উঠে। ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন, এই মুহূর্তে রাজ কোনো উত্তর খুঁজছে না। সে আসলে নিজের ভেতরে জমে থাকা অপরাধবোধের কাছে হেরে গেছে। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে তিনি মৃদু স্বরে বললেন,
” এর উত্তর তুই ভালো জানিস, বাবা!”
কথাটা শুনে রাজ আর কিছু বললো না। শুধু নিচু হয়ে বসে রইলো কয়েক মুহূর্ত। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। মনে হলো, হঠাৎ করেই সে অনেকটা বুড়িয়ে গেছে। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। কাঁধ দুটো নুয়ে আছে। ভেতরের সমস্ত শক্তি যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। একজন ভেঙে পড়া, অসহায় মানুষের মতো সে ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়। তারপর হেলতে দুলতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগে। রনক রহমান আর মারফুয়া বেগম নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলেন ছেলের দিকে। তাদের চোখের সামনে রাজ ধীরে ধীরে উপরে উঠছে। কিন্তু দুজনেরই মনে হচ্ছে, ছেলেটা যেন সিঁড়ি নয়, নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অনুশোচনার পথ বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
মারফুয়া বেগম স্থির হয়ে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে। কয়েক মুহূর্ত আগেও সেখানে রাজ ছিলো। এখন ছেলেটা চোখের আড়ালে চলে গেছে, কিন্তু একজন মায়ের মন কি আর সন্তানের কষ্ট থেকে দূরে থাকতে পারে? তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। তিনি মুখ ঘুরিয়ে স্বামী রনক রহমানের দিকে তাকালেন।চোখ দুটো ভেজা। মুখে অসহায়ত্বের ছাপ। কাঁপা কণ্ঠে তিনি বললেন,
” জিসান আর অনন্যা যেন সারাজীবন জেলের ভাত খেতে থাকে, আমি সেই ব্যবস্থাই চাই।”
রনক রহমান কিছুক্ষণ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি ধীর স্বরে বললেন,
” চিন্তা করো না। আমি সব সামলে নিবো। ওরা আর জেল থেকে ছাড়া পাবে না। সব রকম কাগজপত্র আগেই প্রস্তুত করা আছে। ওদের বিরুদ্ধে এমনভাবে মামলা সাজানো হয়েছে যে সহজে বের হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না।”
কথাগুলো শুনেও মারফুয়া বেগমের মনে কোনো শান্তি এলো না। বরং বুকের ভেতরে জমে থাকা কষ্ট গুলো বিস্ফোরিত হয়ে বেরিয়ে এলো। তিনি হুহু করে কেঁদে উঠলেন।
” এইটা কি হয়ে গেলো আমার ছেলের সাথে? সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেলো। আমার ছেলেটার জীবনটা এভাবে ভেঙে যাবে, কখনো ভাবিনি।”
কথাগুলো বলতে বলতেই তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। রনক রহমান দ্রুত স্ত্রীকে নিজের বুকে টেনে নিলেন। এক হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে অন্য হাতটা আলতো করে তার মাথার উপর বুলিয়ে দিতে লাগলেন। মারফুয়া বেগম স্বামীর বুকে মুখ গুঁজে শিশুর মতো কাঁদতে লাগলেন। রনক রহমান গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার চোখের সামনেও ভেসে উঠছে ছেলের বিধ্বস্ত মুখটা। কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
” এইটা তো হওয়ারই ছিল, মারফুয়া। কান্না করছো কেন? অনন্যা আর জিসান যদি তাদের অপরাধের শাস্তি পায়, তাহলে প্রভা আর ইফতির সঙ্গে করা অন্যায়ের জন্য রাজেরও তো শাস্তি প্রাপ্য।”
মারফুয়া বেগম কান্নার মাঝেই মাথা তুলে তাকালেন। রনক রহমানের কণ্ঠে তখন এক ভারী বিষণ্নতা,
” আমরা বাবা মা! নিজের সন্তানকে শাস্তি দিতে চাইনি, পারিওনি। সবসময় ওকে আগলে রাখতে চেয়েছি। কিন্তু প্রকৃতি কি সেই কথা শুনে? মানুষের বিচার এড়িয়ে যাওয়া যায়। নিজের বিবেককেও হয়তো অনেক সময় চুপ করিয়ে রাখা যায়। কিন্তু, কর্মফলকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। প্রকৃতি তার নিজের নিয়মেই বিচার করে। আর আজ রাজ সেই বিচারই পাচ্ছে। এটা কর্মফল, মারফুয়া! সবই কর্মফল।”
মারফুয়া বেগম আবারও স্বামীর বুকে মুখ লুকিয়ে ফেললেন। ঘরের ভেতর আর কোনো শব্দ রইলো না। শুধু একজন মায়ের চাপা কান্না আর একজন বাবার দীর্ঘশ্বাস মিলেমিশে অদৃশ্য এক বেদনার আবহ তৈরি করে রইলো। আর উপরে নিজের ঘরে, হয়তো রাজও জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। কিছু ভুলের ক্ষমা পাওয়া যায়, কিন্তু কিছু ভুলের ফল মানুষকে একদিন না একদিন ভোগ করতেই হয়।
…
বিয়ের পরের দিনগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের ছন্দ খুঁজে নিতে শুরু করেছে। নতুন সংসার, নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, সবকিছুই একসময় অচেনা ছিল প্রভার কাছে। কিন্তু, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অচেনা অনুভূতিগুলো মিলিয়ে যেতে শুরু করে।প্রথমদিকে যে সংকোচ তাকে ঘিরে রেখেছিলো, তা ধীরে ধীরে জায়গা ছেড়ে দেয় স্বস্তিকে। অবশ্য এর পুরো কৃতিত্ব যদি কাউকে দিতে হয়, তবে সে মানুষটি নিঃসন্দেহে ফারহান। প্রভা কখনোই নিজেকে একা অনুভব করেনি। নতুন সংসারের প্রতিটি ধাপে ফারহান তাকে এমনভাবে আগলে রেখেছে, যেন কোনো অনিশ্চয়তা তার কাছে পৌঁছাতে না পারে।ছোটখাটো বিষয় থেকে শুরু করে বড় সিদ্ধান্ত পর্যন্ত, সবকিছুতেই সে প্রভার পাশে থেকেছে। কোথাও কোনো অস্বস্তি হলে বুঝিয়ে বলেছে, কোথাও দ্বিধা এলে সাহস দিয়েছে। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বাড়িটা আর প্রভার কাছে আপন হয়ে উঠেছে।
ফারিহা পারভিনও ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করেছে। প্রথমদিকে তিনি যতোটা দূরত্ব বজায় রাখতেন, এখন আর ততোটা পারেন না। প্রভার শান্ত স্বভাব, ভদ্র ব্যবহার আর সকলকে আপন করে নেওয়ার সহজাত ক্ষমতা অজান্তেই তার মন ছুঁয়ে ফেলেছে। মেয়েটা কখনো নিজের জায়গা আদায় করার চেষ্টা করেনি, বরং ভালোবাসা দিয়ে জায়গা করে নিয়েছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘরে গেলে প্রায়ই দেখা যায়, প্রভা আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত। কখনো নাশতা তৈরিতে সাহায্য করছে, কখনো চুপচাপ ফারিহা পারভিনের পাশে দাঁড়িয়ে গল্প শুনছে। খুব সাধারণ কিছু মুহূর্ত, কিন্তু সেখানেই তৈরি হচ্ছিলো এক নতুন সম্পর্কের ভিত্তি। একসময় যে নারী তাকে ছেলের জীবনের ভুল সিদ্ধান্ত বলে ভেবেছিলেন, সেই তিনিই এখন দিনের মধ্যে কয়েকবার প্রভাকে খুঁজে বেড়ান।
অন্যদিকে, ইফতি যেন এই বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে, প্রতিটি কোণে নিজের অস্তিত্ব ছড়িয়ে দিয়েছে। দিন যতো গড়াচ্ছে, তার দুষ্টুমি আর মায়া ততোই বাড়ছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সে বাড়ির প্রাণভোমরায় পরিণত হয়েছে। সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই তার ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। কখনো ড্রয়িংরুমে ছুটে বেড়াচ্ছে, কখনো ফারিহা পারভিনের পেছনে পেছনে ঘুরছে, কখনো আবার নিজের খেলনাগুলো ছড়িয়ে রেখে সেগুলোর মাঝখানে বসে অদ্ভুত সব গল্প বানিয়ে যাচ্ছে।
তবে দিনের সবচেয়ে নাটকীয় সময় হলো সকালবেলা অফিসের আগে। ফারহানের অফিসে যাওয়ার সময়টা যেন প্রতিদিনের এক ছোটখাটো যুদ্ধ। আগে প্রভার সঙ্গে প্রতিদিন বাইরে যাওয়ার অভ্যাস ছিল ইফতির। তাই এখন যখন সে দেখে ফারহান তৈরি হয়ে কোথাও যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনই তার মুখ ভার হয়ে যায়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেই মুখ ভার হওয়া কান্নায় রূপ নেয়। পুরো বাড়ি তখন তার অভিমানী কণ্ঠে মুখর হয়ে উঠে। ফারহান শুরুতে ভেবেছিলো বিষয়টা কয়েকদিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু, বাস্তবে দেখা গেল, দিন যতো যাচ্ছে, ইফতির তার প্রতি নির্ভরতা ততোই বাড়ছে। ফলে প্রতিদিন নতুন নতুন কৌশল আবিষ্কার করতে হচ্ছে তাকে। কখনো ইফতিকে অন্য ঘরে ব্যস্ত রেখে বের হতে হয়, কখনো ফাহিমকে দায়িত্ব দিয়ে যেতে হয়, আবার কখনো ছেলেটার মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে চুপিচুপি দরজা পেরিয়ে যেতে হয়। তবুও অনেক সময় সব পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনেই ইফতি বুঝে ফেলে। তারপর ছোট্ট পায়ে দৌড়ে এসে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে। সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে সেই অভিমান ভাঙানোর দায়িত্বও আবার ফারহানেরই থাকে। তবে, দিনের শেষে ছেলেটাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরতে পারলে সমস্ত ক্লান্তি যেন কোথায় মিলিয়ে যায়।
ফাহিমের অবস্থাও খুব একটা আলাদা না। প্রথম দিন থেকেই ইফতির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিলো। বয়সের পার্থক্য থাকলেও দুজনের বোঝাপড়ায় কোনো ঘাটতি নেই। ইফতির কাছে ফাহিম হলো খেলার সঙ্গী, দুষ্টুমির সঙ্গী, গোপন সহযোগী আর সবচেয়ে বড় বন্ধু। ভার্সিটিতে যাওয়ার সময় প্রায়ই তাকে গোপনে বের হতে হয়। কারণ, একবার যদি ইফতির চোখে পড়ে যায়, তাহলে আর রক্ষা নেই। ছোট্ট ছেলেটা ছুটে এসে গলা জড়িয়ে ধরবে, তারপর এমনভাবে আঁকড়ে থাকবে যেন পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাকে ছাড়াতে পারবে না। ফাহিম অবশ্য এই ঝামেলা উপভোগই করে। বরং, বাইরে কোথাও গেলে ফেরার সময় তার প্রথম চিন্তা থাকে ইফতির জন্য কিছু নিয়ে আসা।কখনো চিপস, কখনো চকলেট, কখনো ছোট্ট কোনো খেলনা। দরজায় ঢুকেই যখন ইফতির উচ্ছ্বসিত মুখটা দেখতে পায়, তখন তার মনে হয় পুরো দিনের ক্লান্তি সার্থক হয়ে গেছে। ছুটির দিনগুলোতে তো কথাই নেই। ফাহিম প্রায়ই ইফতিকে নিয়ে আশপাশে ঘুরতে বের হয়। পার্কে নিয়ে যায়, আইসক্রিম খাওয়ায়, খেলনা দেখায়। আর পুরো সময়জুড়ে ইফতির অসংখ্য প্রশ্ন আর গল্প শুনে।সবচেয়ে মজার বিষয়, ইফতির যেকোনো দুষ্টুমিতে ফাহিমের নিঃশর্ত সমর্থন। বাড়ির কেউ বকাবকি করতে এলে সে সবার আগে ছেলেটার পক্ষ নেয়। ফলে ইফতির দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে, পৃথিবীর সব মানুষ একদিকে আর ফাহিম আরেকদিকে। নিজের ছোট্ট পৃথিবীতে সে যেন নিশ্চিত, যাই ঘটুক না কেন, ফাহিম সবসময় তার দলে থাকবে। আর সত্যি বলতে, বিশ্বাসটা ভুলও না। কারণ রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও, ভালোবাসার সম্পর্কগুলো কখনো কখনো এতোটাই গভীর হয়ে ওঠে যে সেখানে কোনো পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না।
ফারিহা পারভিনের দিনগুলোর বড় একটি অংশ এখন ইফতিকে ঘিরেই কাটে। বয়সের ভারে জীবনের অনেক ব্যস্ততা কমে এলেও এই ছোট্ট ছেলেটার উপস্থিতি যেন তার প্রতিটি দিনকে নতুন করে রঙিন করে তুলেছে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে শুরু করে রাতের ঘুম পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে ইফতি তার আশপাশেই থাকে। কখনো খেলনা হাতে নিয়ে গল্প করছে, কখনো নিজের মতো করে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে, আবার কখনো অকারণেই এসে তার কোলে উঠে বসছে। ইফতির দিকে তাকালে অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করে ফারিহা পারভিনের মনে। ছেলেটার ফর্সা মুখ, নিষ্পাপ হাসি আর ছোট ছোট অভিব্যক্তির মাঝে তিনি বারবার যেন ফারহানের শৈশবকে খুঁজে পান। অনেক সময় ইফতির দুষ্টুমিগুলো দেখে তার মনে পড়ে যায় নিজের ছেলের ছোটবেলার কথা। তখন অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে ইফতির আধো আধো কথা। স্পষ্ট করে সব শব্দ বলতে না পারলেও নিজের মতো করে পৃথিবীর সব কথা বলতে চায় সে। আর সেই কথাগুলো মন দিয়ে শোনেন ফারিহা পারভিন। কখনো বুঝতে পারেন, কখনো পারেন না। তবুও আগ্রহের কোনো কমতি থাকে না। ইফতির গোলুমোলু শরীরটাকে বুকে জড়িয়ে ধরলে তার মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তির জায়গাটা যেন এই ছোট্ট শিশুটার কাছেই।
ফারিনের অবস্থাও খুব একটা ভিন্ন নয়। প্রথমদিকে দূর থেকে দেখলেও এখন ইফতির প্রতি তার আলাদা এক মায়া জন্মে গেছে। সুযোগ পেলেই ছেলেটার সঙ্গে সময় কাটায় সে। কখনো গল্প করে, কখনো খেলায় মেতে ওঠে, আবার কখনো শুধুই তার দুষ্টুমিগুলো দেখে মুগ্ধ হয়ে হাসে। প্রভার সঙ্গে ফারিনের সম্পর্কও দিন দিন গভীর ও আন্তরিক হয়ে উঠেছে। শুরুতে যে আনুষ্ঠানিকতা ছিল, তা অনেকটাই দূর হয়ে গেছে।এখন তারা শুধু ননদ ভাবির সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং একে অপরের ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছে। নানা বিষয় নিয়ে গল্প হয়, হাসি ঠাট্টা হয়, কখনো আবার ব্যক্তিগত অনুভূতিও ভাগাভাগি করে নেয় তারা। এই সহজ সম্পর্কটা প্রভার জন্য নতুন পরিবারে মানিয়ে নেওয়ার পথকে আরও সহজ করে দিয়েছে।
ফারিনের ছয় বছরের মেয়ে ফিহাও খুব দ্রুতই প্রভা আর ইফতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ছোট্ট মেয়েটার কাছে ইফতি যেন জীবন্ত একটা পুতুল। সুযোগ পেলেই তাকে আদর করে, কোলে নিতে চায়, খেলনা ভাগ করে দেয়। বাইরে কোথাও গেলে নিজের জন্য কিছু কেনার পাশাপাশি ইফতির জন্যও কিছু না কিছু নিয়ে আসতে ভোলে না। কখনো চকলেট, কখনো চিপস, কখনো ছোট্ট কোনো খেলনা। সেগুলো হাতে পেয়ে ইফতির উচ্ছ্বাস দেখে ফিহা নিজেও ভীষণ খুশি হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে দুই শিশুর মাঝেও সুন্দর এক বন্ধন তৈরি হয়ে গেছে। বয়সের ব্যবধান থাকলেও ভালোবাসার সম্পর্কে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। ফিহা বড় বোনের মতো আগলে রাখে ইফতিকে, আর ইফতি নিজের সরল ভরসা নিয়ে তার পেছন পেছন ঘুরে বেড়ায়।
এই সুন্দর সম্পর্কগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে ফারহান আর প্রভা। তাদের দুজনকে ঘিরেই যেন পুরো পরিবারটা নতুন করে এক সুতোয় বাঁধা পড়েছে। প্রভা স্বভাবগতভাবেই সবার সঙ্গে সহজে মিশে যেতে পারে। তাই পরিবারের প্রতিটি সদস্যের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্বাভাবিক এবং আন্তরিক হয়ে উঠেছে। সবার প্রতি তার শ্রদ্ধা, যত্ন আর আন্তরিকতা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সবার মন জয় করে নিয়েছে। তবে একটি জায়গায় এখনও তার কিছুটা সংকোচ রয়ে গেছে। ফারহানের সামনে দাঁড়ালে অনেক সময় অকারণেই লজ্জা পেয়ে যায় সে। কথাবার্তা স্বাভাবিক হলেও মনের গভীরে জমে থাকা সংকোচ পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি এখনও। নতুন সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর দীর্ঘদিনের মানসিক অভ্যাসের কারণে মাঝে মাঝে নিজেকে গুটিয়ে ফেলে সে।ফারহান অবশ্য বিষয়টা খুব ভালোভাবেই বোঝে। তাই কখনো তাকে কোনো বিষয়ে চাপ দেয় না। কোনো পরিবর্তন জোর করে আনার চেষ্টা করে না। বরং, ধৈর্য ধরে সময় দেয়। সে জানে, কিছু সম্পর্কের সৌন্দর্যই হলো ধীরে ধীরে গভীর হওয়া। তাই প্রভার স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য অপেক্ষা করতে তার কোনো আপত্তি নেই।
অন্যদিকে, প্রভাও চেষ্টা করছে। সে জানে, অতীতের ছায়া পেরিয়ে নতুন জীবনকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে হলে নিজেকেও সময় দিতে হবে। তাই ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের সংকোচগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে সে। প্রতিদিন একটু একটু করে দূরত্ব কমছে, অস্বস্তিগুলো মুছে যাচ্ছে।
সময়ের নিজস্ব এক জাদু আছে। সে ধীরে ধীরে ক্ষত সারিয়ে তোলে, অস্বস্তিকে স্বাভাবিকতায় বদলে দেয়, আর মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়। প্রভা আর ফারহানের জীবনও ঠিক সেই পথেই এগিয়ে চলেছে। আর তাদের চারপাশে ভালোবাসা, বিশ্বাস আর আপনজনদের স্নেহ মিলেমিশে এমন এক সুন্দর আবহ তৈরি করেছে, যেখানে সুখ ধীরে ধীরে নিজের স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে নিচ্ছে।
…
রাত বেশ গভীর হয়ে এসেছে। সারা বাড়ি নিস্তব্ধ। দিনের ব্যস্ততা, হাসি আড্ডা, ছোটাছুটি সব থেমে গিয়ে চারপাশে নেমে এসেছে এক প্রশান্ত নীরবতা।জানালার ফাঁক গলে চাঁদের ম্লান আলো এসে পড়েছে ঘরের এক কোণে। প্রভা রুমে ঢুকতেই তার চোখ গিয়ে আটকে যায় বিছানার দিকে। ইফতি ফারহানের বুকের উপর মুখ গুঁজে ঠোঁট ফুলিয়ে ঘুমিয়ে আছে। ছোট্ট দুটো হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রেখেছে তাকে। ফারহানের চোখও বন্ধ। দেখে মনে হচ্ছে সেও ঘুমিয়ে পড়েছে।
প্রভা কিছুক্ষণ দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রইলো।
দৃশ্যটা তার কাছে নতুন নয়। বিয়ের পর প্রায় প্রতিদিনই এমন কিছু না কিছু মুহূর্ত সে দেখে এসেছে। তবুও কেন জানি প্রতিবারই বুকের ভেতর এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে। মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত শান্তি যেন এই একটি ছবির মাঝেই বন্দী হয়ে আছে। তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠে। এগিয়ে গিয়ে সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ালো। চিরুনি, ক্রিমের কৌটা, ছোটখাটো প্রসাধনী, সবকিছু যথারীতি এলোমেলো অবস্থায় পড়ে আছে। ইফতির হাত থেকে এসব কিছুই নিরাপদ নয়। সুযোগ পেলেই সে সবকিছু নাড়াচাড়া করে রেখে যায়। প্রভা অভ্যাসমতো সেগুলো গুছিয়ে রাখতে শুরু করে।
খুটখাট শব্দ হতেই ফারহান আস্তে করে চোখ খুললো। সে ঘুমিয়ে ছিলো না। শুধু চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলো। চোখ খুলেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামে প্রভার উপর। মেয়েটা যেন কখনো থামে না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কোনো না কোনো কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেই রাখে। কতোবার বলেছে একটু বিশ্রাম নিতে, নিজের জন্য সময় রাখতে। কিন্তু, প্রভা যেন কথাগুলো শুনেও শোনে না। ফারহান আস্তে করে ইফতিকে নিজের বুক থেকে সরিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়। ছেলেটার গায়ে কম্বলটা টেনে দিয়ে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর নিঃশব্দে গিয়ে দাঁড়ায় প্রভার পেছনে।
হঠাৎ কোমরে দুটো শক্ত হাতের স্পর্শ পেয়ে প্রভা চমকে উঠে। পরের মুহূর্তেই বুঝতে পারে কে। ফারহান পেছন থেকে তাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরেছে। প্রভার শরীর কেঁপে উঠে। ফারহান ঝুঁকে এসে তার কাঁধে খুব হালকা একটা চুমু দেয়। প্রভা লজ্জা পেয়ে যায়। ফারহানের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠে।
” সব সময় কাজ করা লাগে তোর?”
প্রভা আয়নার দিকে তাকিয়েই হাসে।
” কাজ করতে আমার ভালো লাগে। সরো তো।”
” দেখেছিস, তুই খুব সুন্দর করে তুমি সম্বোধনটা রপ্ত করে নিয়েছিস। অথচ আমাকে দেখ। আজও ঠিক করতে পারলাম না।”
প্রভা মৃদু হেসে বললো,
” জোর করে করার প্রয়োজনও নেই।”
” আছে।”
” কেন?”
” ছেলেটা বড় হচ্ছে। দুইদিন পর তার প্রেস্টিজে লাগবে।”
প্রভা ভ্রু তুলে তাকায়।
” কীভাবে?”
” যখন দেখবে তার বাবা তার মাম্মাকে তুই করে বলে, তখন কি সমস্যা হবে না?”
কথাটা বলেই ফারহান এমন একটা মুখ করলো যে প্রভা আর নিজেকে সামলাতে পারে না। হেসে উঠলো শব্দ করে। ফারহান সঙ্গে সঙ্গে আঙুল ঠোঁটে চেপে ধরলো।
” হুসসস! আস্তে হাস। আমার বাচ্চা উঠে যাবে।”
প্রভা হাসি থামানোর চেষ্টা করতে করতে বললো,
” সরি!”
তারপর কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে প্রভা নরম গলায় বলে ওঠে,
” থ্যাংকস!”
ফারহান অবাক হয়ে তাকায়।
” কেন?”
প্রভা ধীরে ধীরে ঘুরে তার দিকে মুখোমুখি দাঁড়ায়।
” আমাকে আর ইফতিকে এতো সুন্দর একটা জীবন উপহার দেওয়ার জন্য।”
কথাটা বলেই সে চোখ নামিয়ে ফেলে।
ফারহানের বুকের ভেতর কেমন যেন নরম হয়ে যায়। সে আর কিছু না বলে প্রভাকে নিজের বুকে টেনে নেয়। প্রভাও নিঃশব্দে মাথা রেখে দেয় তার বুকে।কয়েক মুহূর্ত তারা দুজনই চুপ করে রইলো। শুধু একে অপরের হৃদস্পন্দন শুনতে থাকে। তারপর ফারহান মৃদু হেসে বলে,
” আমি তোদের সুন্দর জীবন দেইনি।”
প্রভা মুখ তুলে তাকায়। ফারহান তার কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বললো,
” আমি শুধু নিজের জন্য একটা সুন্দর জীবন বেছে নিয়েছি।”
তারপর বিছানার দিকে তাকিয়ে ইফতির দিকে ইশারা করলো। ঘুমের ঘোরে ছেলেটা তখনও নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে। ফারহানের চোখে একরাশ মায়া নেমে এলো।
” আর ঐ যে বিছানায় ছোট্ট কোমল দেহটা শুয়ে আছে, সে আমারই ছানা। মাইন্ড ইট!”
#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹

