Home "ধারাবাহিক গল্প বাউন্ডুলে ঘুড়ি বাউন্ডুলে ঘুড়ি পর্ব-০৩

বাউন্ডুলে ঘুড়ি পর্ব-০৩

0
190

#বাউন্ডুলে_ঘুড়ি❤️‍🩹 [পর্ব-০৩]
~ আফিয়া আফরিন

ইয়াজিদ ঘর থেকে বের হওয়ার পরপরই কলিংবেল বেজে উঠল। নাজমা বেগম দরজা খুলতেই চওড়া এক চিলতে হাসি মুখে নিয়ে ভেতরে ঢুকল ইসরাত। ইসরাত ইয়াজিদের একমাত্র ছোট বোন। নিজের শ্বশুরবাড়ি, স্বামী আর পুরো সংসার সামলে ইদানীং নিজের দম ফেলারই ফুসরত থাকে না। তার ওপর বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষা দিচ্ছে। একটার পর একটা রিটেন আর ভাইভার চক্করে পড়ে বাপের বাড়ি আসার একটুখানি সময়ও ও বের করতে পারছিল না। আজ কতদিন পর সময় মেলাতেই এক ছুটে চলে এসেছে মায়ের কাছে, হিয়ার কাছে। ভেতরে ঢুকেই ড্রয়িংরুমে হিয়াকে দেখেই ইসরাত ব্যাগটা সোফায় ছুড়ে ফেলে দুই হাত বাড়িয়ে দিল। এক গাল হেসে হিয়াকে প্রায় ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করে কোলে তুলে নিল। ওর নরম গালে নিজের গাল ঘষে আদুরে গলায় বলে উঠল, “আমার জান পাখিটা কেমন আছে? এই ক’দিনে ফুপিকে ভুলে গিয়েছ নাকি, সোনা?”

হিয়া ফুপিকে দেখেই খিলখিল করে হেসে উঠল। ফুপির গলা জড়িয়ে ধরে আধো-আদো গলায় বলল, “নাহ্! ভুলি নাই তো। তুমাল সাথে খেলব ফুপি।”

নাজমা বেগম মেয়ের দিকে তাকিয়ে কৃত্রিম রাগের দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তোরা সব বড় বড় অফিসার হয়ে গেছিস মনে হয়? বলি, মায়ের কথা কি আর মনে পড়ে? কতদিন পর এলি!”

ইসরাত হিয়াকে কোলে নিয়েই মায়ের দিকে তাকিয়ে আহ্লাদী সুরে বলল, “আহা মা, শুরু করে দিলে? বললাম না পরীক্ষার ধকল যাচ্ছিল। এই দেখো, আজকে কিন্তু সারাদিন তোমাদের সাথে কাটাব বলেই সময় বের করে চলে এসেছি।”

নাজমা বেগম মেয়ের কথা শুনে সোফায় এসে বসলেন। ওনার চোখেমুখে আবার সেই চিন্তার ভাঁজ ফিরে এলো। ইসরাত হিয়াকে কোল থেকে নামিয়ে সোফার একপাশে বসিয়ে দিয়ে মায়ের দিকে তাকাল। বেশ কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা মা, ভাইয়ার কী হয়েছে বলো তো? এইভাবে মুড অফ করে চলে গেল কেন? আমার সাথে মাত্রই নিচে দেখা হয়েছিল, ভালো করে একটু কথাও বলল না।”

নাজমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আর বলিস না! তোর ভাইয়ার তো ওই এক দশা। সকাল সকাল আমি একটু বিয়ের কথা তুলেছিলাম, তাতেই নবাবপুত্তুরের মেজাজ সপ্তম আকাশে চড়ে গেল। তুই-ই বল ইসরাত, এই ছোট্ট বাচ্চাটাকে নিয়ে ও আর কতদিন একা থাকবে? তানিয়া চলে যাওয়ার পর থেকে তো ছেলেটা নিজের জীবনটাকেই থামিয়ে দিয়েছে।”

ইসরাত মায়ের কথা শুনে চুপ হয়ে গেল। হিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নরম গলায় বলল, “আমি ভাইয়াকে বুঝি মা। ভাবিকে ও কতটা ভালোবাসত তা তো আমরা সবাই জানি। হুট করে কাউকে ওই জায়গায় মেনে নেওয়া ভাইয়ার জন্য আসলেই কঠিন।”

“আরে আমি কি তানিয়াকে ভুলতে বলছি?” নাজমা চড়া সুরে বললেন, “তানিয়া তো আমারও মেয়ের মতই ছিল। কিন্তু এই যে হিয়াটা মা ছাড়া বড় হচ্ছে, সারাদিন একলা একলা, তোর ভাইয়াও কাজে ডুবে থাকে; এভাবে কি একটা সংসার চলে? আমি আর কতদিন বাঁচব বল? আমার পরেও তো এই বাচ্চাটার একটা আশ্রয় দরকার, তোর ভাইয়ার একজন মানুষ দরকার।”

ইসরাত মায়ের হাতটা চেপে ধরে বলল, “আসলে ও নিজের ভেতরের কষ্টটা লুকাতে চায়। আমাদেরই ভাইয়াকে বুঝিয়ে-শুঝিয়ে রাজি করাতে হবে। তবে জোর করে নয় মা, একটু সময় দিয়ে।”

নাজমা মেয়ের দিকে তাকিয়ে গুমোট হেসে বললেন, “সময় তো অনেক দিলাম রে মা, এবার একটু বুদ্ধিশুদ্ধি খাটিয়েই এগোতে হবে।”

মায়ের কথা শুনে ইসরাত গম্ভীর হয়ে গেল। হিয়াকে একটা খেলনা গাড়ি দিয়ে খেলার সুযোগ করে দিয়ে মায়ের দিকে ঘুরে বসল। ও বেশ গুছিয়ে শান্ত গলায় বলল, “মা, তুমি যেভাবে ভাবছ বিষয়টা কিন্তু এত সহজ না। শুধু হিয়ার জন্য একজন মা দরকার বলে হুট করে একটা মেয়েকে ধরে এনে ভাইয়ার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। যে মেয়েটা এই সংসারে আসবে, সে তো শুধু একটা বাচ্চা পালার জন্য আসবে না! তার নিজেরও কিছু আশা-আকাঙ্ক্ষা থাকবে। তাকে ভাইয়ারও সময় দিতে হবে, ভাইয়াকেও তার দায়িত্ব নিতে হবে। ভাইয়া যদি মন থেকে কাউকে মেনে নিতে না পারে, তবে নতুন যে মেয়েটা আসবে তার জীবনটাও তো নষ্ট হবে। তাই যা-ই করো না কেন, একটু বুঝেশুনেই আগাও।”

মেয়ের কথা শুনে নাজমা বেগমের চোখের কোণটা কেমন যেন ভিজে উঠল। পেছনের দিনগুলোর কথা মনে করে তিনি অত্যন্ত আফসোস জড়ানো গলায় বললেন, “কী সুন্দর গোছানো একটা সংসার ছিল রে আমার! তানিয়া থাকতে ঘরটা সবসময় আলোতে পরিপূর্ণ থাকত। হাসিখুশি, আনন্দে ভরপুর একটা পরিবার ছিল আমাদের। আর আজ দেখ…” ওনার গলাটা বুজে এলো। জানালার বাইরে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছেলের কথা ভাবতে ভাবতে বললেন, “ছেলেটার দিকে তাকালে আমার বুকটা ফেটে যায় রে ইসরাত। বাইরে কি করে তা তো জানিনা। কিন্তু ঘরের ভেতর ছেলেটা আমার কেমন যেন ছন্নছাড়া, বাঁধনহারা হয়ে গেছে। নিজের কোনো খেয়াল নেই, খাওয়া-দাওয়ার ঠিক নেই, দিনরাত শুধু একাকীত্ব নিয়ে ঘোরে। কোনো বাঁধনেই ওকে আর বেঁধে রাখা যাচ্ছে না। তানিয়া যাওয়ার পর থেকে শুধু লোকদেখানো বেঁচে আছে। এই ছন্নছাড়া ছেলেটাকে আমি কীভাবে আগের মতো সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনব, বল তো?”

দাদুর উদাস আর কান্নোভেজা গলা শুনে সোফায় বসে খেলতে থাকা হিয়া খেলা থামিয়ে দিল। খেলনা গাড়িটা পাশে রেখে টুকটুক করে এগিয়ে এলো নাজমা বেগমের কাছে। দাদুর কোলে নিজের ছোট্ট হাত দুটো রেখে, মুখটা সামান্য বাঁকিয়ে মিষ্টি আধো-আদো গলায় বলল, “দাদুমণি… ফুপি… তোমাদের কী হয়েছে? তোমরা মন খারাপ কোলো না।”

নাজমা তৎক্ষণাৎ হিয়াকে নিজের কোলে তুলে নিলেন। ওর কপালে একটা চুমু খেয়ে চোখের জলটুকু আড়াল করে বললেন, “এই বুড়ি! তোকে সকালবেলা আমি কী শিখিয়ে দিয়েছিলাম? বলেছিলাম না, তোর বাবাকে বলবি যে তোর একটা নতুন মাম্মাম লাগবে?”

হিয়া দুই দিকে মাথা নেড়ে চতুর ভঙ্গিতে বলল, “বলেছি তো দাদুমণি! পাপা বলল… পাপা বলল যে মা লাগবে না।”

“তোর পাপা তো পচা, ও কিচ্ছু বোঝে না! তুই আজকে পাপা অফিস থেকে ফিরলে আবার বলবি। জানিস হিয়া বুড়ি, একটা নতুন মাম্মাম এলে তোকে কত কত আদর করবে! সুন্দর সুন্দর জামা পরিয়ে দেবে, তোর পছন্দের মজার খাবার নিজ হাতে খাইয়ে দেবে, রাতে কোল ঘেঁষে গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াবে। তখন তোর আর একা একা খেলতে হবে না। তুই চাস না তোর একটা সুন্দর মাম্মাম আসুক?”

দাদুর মুখে এতসব লোভনীয় অফারের কথা শুনে হিয়ার বড় বড় চোখ দুটো লোভে আর আনন্দে চকচক করে উঠল। ও সোৎসাহে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ দাদুমণি! আমি পাপাকে আজকেই আবাল বলব যে আমাল মাম্মাম লাগবেই লাগবে!”

ইসরাত দুজনের দিকে তাকিয়ে কৃত্রিম ধমকের সুরে বলল, “আমি এতদিন পর এলাম, আর তোমরা এসব গম্ভীর আলোচনা শুরু করে দিলে! এখন বাদ দাও তো। আমি আমার হিয়া পাখির সাথে খেলব।” বলেই ইসরাত হিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে ওর পেটে মুখ গুঁজে সুরসুরি দিতে লাগল। হিয়া খিলখিল করে হেসে কুটিপাটি। তারপর ইসরাত ওকে কোলে নিয়ে ভেতরের ঘরের দিকে চলে গেল। ওরা চোখের আড়াল হতেই নাজমা বেগম সোফায় হেলান দিয়ে হিয়ার ফেলে যাওয়া খেলনাটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনার চোখের কোণটা আবার ভিজে উঠল। বুকচেরা আফসোস নিয়ে মনে মনে বললেন, “মেয়েটা জন্মের সাথে সাথেই মাকে হারাল! দুনিয়াটা কী, মায়ের আদর কেমন; বোঝার আগেই তানিয়া ওকে একা ফেলে চলে গেল।” তিনি আঁচল দিয়ে চোখটা মুছে শূন্য ঘরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। একদিকে মাতৃহীন নাতনির জন্য বুক ফাটা কান্না, অন্যদিকে ছন্নছাড়া ছেলের ভবিষ্যৎ; দুই চিন্তায় মনটা আবার ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল।

প্রতিদিনই অফিসের কাজ শেষ করে ইয়াজিদকে তড়িঘড়ি করে বাড়ির দিকে ছুটতে হয়। শুধু যে মেয়ের টানে, তা কিন্তু নয়! সময়মতো বাড়ি না ফিরলে মায়ের বকুনি আর খুন্তির ছ্যাঁকা খাওয়ার ভয়টাও তো কম না! এই বয়সেও মা রেহাই দেয় না। তাই সব দিক সামলে সন্ধ্যার আগেই সে বাইক ছুটিয়ে বাসায় পৌঁছায়। আজকে কলিগদের সাথে একটু বাড়তি ঝামেলা থাকায় ফিরতে ফিরতে মাগরিবের আজান পেরিয়ে গেল। ইয়াজিদ বাইক নিয়ে বাড়ির মেইন গেটের সামনে আসতেই দেখল, শওকত চৌধুরী মূল ফটকের একপাশে চেয়ার পেতে মলিন মুখে বসে আছেন। ইয়াজিদের পরিবারের সাথে যেহেতু ওনার পূর্বপরিচিত এবং বেশ ভালো সম্পর্ক, সেই চেনা খাতিরেই ইয়াজিদ বাইক থেকে নেমে ওনার দিকে এগিয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল, “চাচা, সন্ধ্যার সময় এখানে একা একা বসে আছেন যে? শরীর ঠিক আছে আপনার?”

শওকত চৌধুরী শূন্য রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন বহু দূর থেকে কেউ একজন হেঁটে আসছে, তিনি তারই অবয়ব খুঁজছেন। ইয়াজিদের কথার জবাব দিলেন হাহাকার জড়ানো গলায়, “আমার মেয়েটার অপেক্ষা করছি বাবা! যদি আবার ভুল করেও ও এই পথটায় আসে? গতকাল যে কী ভেবে এই বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল, তা আমার এই অভাগা মাথাটা কিছুতেই বুঝতে পারছে না বাবা!”

“চাচা, নিজেকে এভাবে কষ্ট দিয়ে কী লাভ বলুন? আপনি একটু ধৈর্য ধরুন, দেখবেন উনি নিজেই একদিন সব অভিমান ভুলে ফিরে আসবে।”

শওকত চৌধুরী শুকনো হাসি হাসলেন, যে হাসিতে কেবলই যন্ত্রণা লুকিয়ে ছিল। ইয়াজিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ধৈর্য আর কত ধরব রে বাবা? আমার বয়স হয়েছে, কখন চোখ বুজি তার কোনো ঠিক নেই। আমার ভয় হয়, রুপুর অভিমান ভাঙার আগেই যদি আমার সময় ফুরিয়ে যায়, তবে ও কাকে গিয়ে বলবে, ‘বাবা, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি’? আমি ওর কাছে কিচ্ছু চাই না, শুধু মরার আগে আমার মামণিটাকে একটা বার জড়িয়ে ধরে বলতে চাই, ‘তোর অপরাধী বাবাটাকে তুই ক্ষমা করে দে মা’। সেই সুযোগটাও বোধহয় আর আসলো না।”

“সন্ধ্যা নেমে গেছে চাচা, বাইরে বাতাসে ঠান্ডা বাড়ছে। চলুন, আজ আমাদের ঘরে চলুন। ইসরাত এসেছে, সবাই মিলে একসাথে চা খাব। মনটাও একটু হালকা হবে।”

শওকত চৌধুরী মাথা নেড়ে বললেন, “না বাবা, তুমি যাও। আমি আর একটুখানি বসি। যদি ভুল করেও মেয়েটা এই পথ দিয়ে যায়, অন্তত দূর থেকে হলেও যেন একবার চোখ ভরে দেখে নিতে পারি!”

অগত্যা ইয়াজিদকে একলাই বাড়ির দিকে চলে আসতে হয়। কিন্তু কলিংবেল টিপে ভেতরে পা রাখতেই দেখল পুরো ঘরের পরিবেশ থমথমে! সাড়াশব্দ নেই, চঞ্চল হিয়া বুড়িও ঘরের মধ্যে ঘুরঘুর করছে না। উল্টো সোফায় গম্ভীর মুখে গালে হাত দিয়ে বসে আছে, যেন বড় কোনো চিন্তায় মগ্ন! ইয়াজিদ মেয়ের দিকে এগিয়ে ওর গালে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী খবর মা? এমন গম্ভীর হয়ে বসে আছ কেন?”

হিয়া তৎক্ষণাৎ নিজের ঠোঁটে ছোট্ট আঙুলটা চেপে ধরে বাবাকে চুপ করতে ইশারা করল, “উঁহু! কথা বলবে না পাপা!”

ইয়াজিদ অবাক হলো। পরিবেশের সাথে তাল মিলিয়ে গলার স্বর নামিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “কেন মা? কী হয়েছে?”

“চুপ! আস্তে কথা বলো। দাদুমণি মারবে তোমাকে!”

ইয়াজিদ চোখ কপালে তুলে বলল, “তাই? দাদুমণি আমাকে মারবে কেন? কী করেছি আমি?”

হিয়া বাবার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, “তুমি নাকি অনেক পচা? দাদুমণির কোনো কথা শোনো না। তোমার ওপর দাদুমণির অনেক… অনেক রাগ হয়ে গেছে!”

মেয়ের মুখে জাঁদরেল অভিযোগ শুনে ইয়াজিদ মনে মনে হেসে ফেলল। সকালের টপিকটা নিয়ে মা এখনো রাগ করে বসে আছে, আর ঘরের মিনি সিপাহিকে ওনার পাহারাদার বানিয়ে রেখেছে! সে হিয়ার নাকটা আলতো করে টেনে বলল, “ও আচ্ছা! দাদুমণি বুঝি আমার নামে বিচার দিয়েছে তোমার কাছে? তা আমার লক্ষ্মী মা-টা কি তার পাপাকে দাদুমণির মার থেকে বাঁচাবে না?”

হিয়া গালে হাত দিয়ে একটু ভেবে বলল, “বাঁচাব। তবে তোমাকে কিন্তু দাদুমণির কথা শুনতে হবে পাপা!”

“তা তোমার দাদুমণির কী কথা শুনতে হবে, শুনি?”

হিয়া বাবার শার্টের কলারটা দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে খুব গম্ভীর মুখে বলল, “আমার জন্য একটা সুন্দর মাম্মাম এনে দাও!”

মেয়ের মুখ থেকে আবারও একই আবদার শুনে ইয়াজিদের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। সে হাসতে পারল না। হিয়াকে কোলে তুলে নিল। পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলতে লাগল, “মা, তুমি একটু এদিকে তাকাও তো পাপার দিকে।” হিয়া বাবার চোখের দিকে তাকাল। ইয়াজিদ ওর কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল, “তুমি কি জানো মা, একটা নতুন মাম্মাম এলে কী হবে? নতুন কেউ এলে সে আমাদের দুজনকে এভাবে ভালোবাসবে না। তখন দাদুমণিও অনেক কষ্ট পাবে। নতুন মাম্মাম এসে যদি আমার হিয়া বুড়িকে আদর না করে, সারাদিন বকাঝকা করে, তখন কেমন লাগবে তোমার? শুধু কী তাই? নতুন মাম্মাম এসে তোমাকে আমার কাছ থেকে দূরে নিয়ে যাবে। তখন পাপা আর তোমাকে কোলে নিতে পারবে না, রাতে বুকে জড়িয়ে ধরে গল্প শুনিয়ে ঘুমাতেও পারবে না। তুমি কি এরপরেও নতুন মা চাও, সোনা?”

বাবার মুখে এতসব ভীতিজনক কথা শুনে হিয়ার মনটা দমে গেল। পাপাকে ছাড়া ও একমুহূর্তও ভাবতে পারে না, আর সেই পাপা নাকি দূরে চলে যাবে! ওর মুখটা ছোট হয়ে এলো। খুব মন খারাপ করে, প্রায় কেঁদো কেঁদো গলায় মাথা নেড়ে বলল, “না পাপা… চাই না। আমি নতুন মাম্মাম চাই না। আমি শুধু আমার পাপাকে চাই।”
মেয়ের মন খারাপ করা মলিন মুখটা দেখে ইয়াজিদের নিজের বুকের ভেতরটাও মোচড় দিয়ে উঠল। তানিয়া চলে যাওয়ার পর ছোট্ট মেয়েটাকে আগলে রাখাই যে তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য, তা সে হিয়াকে জড়িয়ে ধরে আরও একবার তীব্রভাবে অনুভব করল।
.
ওদিকে রূপাঞ্জনা নিজের মনটাকে কোনোভাবেই শান্ত করতে পারছে না। ঘরের ভেতর কেমন দমবন্ধ করা পরিবেশ, সবকিছু বড্ড অস্থির লাগছে। বুকের ভেতরটা তীব্র হাহাকারে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। অস্থিরতা কাটাতে ভাবল, আরেকবার রূপচারু ভিলায় যাবে। ওই বাড়ির প্রতিটা ইঁটে, বাতাসে, কোথাও না কোথাও রূপাঞ্জনার পুরো অস্তিত্বটা জড়িয়ে আছে! সে ফোনটা তুলে নিল। ডায়াল করল চাচাতো ভাই সোহাগের নম্বরে। ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ হতেই সাধারণ কুশলাদি বিনিময় হলো। কিন্তু রূপুর মন তো অস্থির, সে আর ভূমিকা না বাড়িয়ে সরাসরি আসল কথায় চলে এলো। জিজ্ঞেস করল, “আমার মেয়ের কবরটা বাড়ির ঠিক কোন জায়গায়, তুই জানিস সোহাগ?”

ওপাশ থেকে সোহাগ স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর বেশ অবাক হয়ে বলল, “হঠাৎ এত বছর পর এই কথা জিজ্ঞেস করছিস রূপা?”

“আমি একবার রূপচারু ভিলায় যাব।” রূপুর সংক্ষিপ্ত উত্তর।

সোহাগ ইতস্তত করে বলল, “বাড়িতে যাবি? চাচার সাথে দেখা করবি রূপা?”

“না, আমি আমার মেয়ের টানে যাব। ওকে বড্ড দেখতে ইচ্ছে করছে। সেদিন দিয়ে কবরটা খুঁজেছি, পাইনি…” বলতে বলতে রূপুর গলাটা ধরে এলো।

“বাড়ির দক্ষিণ পাশে। তুই গেলেই বুঝতে পারবি, চাচা জায়গাটা আলাদাভাবে আগলে রেখে দিয়েছে। কেউ ওদিকে ভুলেও যায় না।”

“আচ্ছা। রাখছি তাহলে।” রূপু ফোনটা কেটে দিতে চাইল।

“শোন রূপা!” সোহাগ ওপাশ থেকে ওকে থামাল, “চাচার সাথে কি তুই আর কোনোদিনও দেখা করবি না? ওনার ওপর অভিমান কি আজীবন থাকবে?”

রূপু জানালার বাইরে শূন্য দৃষ্টি মেলে শক্ত গলায় বলল, “করব। যেদিন আমি সায়েমকে খুঁজে পাব, সেদিন।”

সোহাগ হতাশ হয়ে বলল, “ওর আশা এখনো তোর আছে রূপা? তুই এখনো অপেক্ষা করিস?”

“সারাজীবন করব।”

“তুই ওকে এখনো খুঁজিস?” সোহাগের গলায় স্পষ্ট বিস্ময়।

“সময় পেলেই খুঁজি।”

সোহাগ নিজের রাগ ধরে রাখতে পারল না। চড়া সুরে বলে উঠল, “আমি তোকে বারবার বলছি রূপা, তুই ভুল! তুই সম্পূর্ণ ভুলের স্বর্গে বাস করছিস। ও তোকে ছেড়ে চলে গেছে, ব্যস! একটা জলজ্যান্ত মানুষ হুট করে হারিয়ে যাবে কীভাবে, তুই আমাকে বল? কোনো খোঁজ থাকবে না, এটা সম্ভব? ও ইচ্ছে করেই তোকে আর তোর সন্তানকে নরকে ফেলে চলে গিয়েছিল। তুই এখনো মস্ত বড় ধোঁকার মধ্যে আছিস রূপা! যে মানুষটা তোকে একটা বারও খোঁজার প্রয়োজন মনে করেনি, তুই তার জন্য নিজের জীবনটা এভাবে শেষ করে দিচ্ছিস? তুই আসলে বাস্তবটাকে মেনে নিতে ভয় পাচ্ছিস। অন্ধের মতো পলাতক কাপুরুষটাকে খুঁজে বেড়ানো এবার বন্ধ কর!”

সোহাগের শেষ কথাগুলো রূপুর কানে তীরের মতো বিঁধল। সে আর একটা শব্দও মুখ থেকে বের করল না। চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া তপ্ত অশ্রুটুকু মুছে নিয়ে ফোনটা কেটে দিল। ঘরের দেয়ালঘড়ির টিকটিক আওয়াজটা ভেতরের ক্ষতগুলোকে আরও বাড়িয়ে দিল। কিন্তু সোহাগের এতসব কথার পরও সায়েমের প্রতি রূপুর বিশ্বাস বা জেদ; এক চুলও নড়ল না।
.
.
.
চলবে…
[কার্টেসি ছাড়া কপি করা নিষেধ]
শব্দ সংখ্যা— ২২৫৭