Home "ধারাবাহিক গল্প ঝরা শিউলির দিনে ঝরা শিউলির দিনে পর্ব-৪৪+৪৫

ঝরা শিউলির দিনে পর্ব-৪৪+৪৫

0
482

#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ৪৪
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা

_______________________

ফুলের সুবাসে ভারী হয়ে আছে সমগ্র কক্ষ। বাতাসে ভেসে বেড়ানো সেই গন্ধ একদিকে মাদকতাময়, অন্যদিকে অস্বাভাবিকরূপে তীব্র। ঠিক যেন কোনো অদৃশ্য হাত পুরো ঘরের শ্বাসপ্রশ্বাসকেই সুগন্ধে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। সাদা, গোলাপি ও হালকা বেগুনি বর্ণের পুষ্পরাজি দিয়ে চারপাশ এমনভাবে অলঙ্কৃত করা হয়েছে যে, দেয়াল, পর্দা, এমনকি নীরব কোণগুলোও যেন কোনো উদ্ভিদরাজ্যের নিঃশ্বাসে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

বিছানার চার কোণে ঝুলে আছে সূক্ষ্ম মাল্যবন্ধন। তাজা ফুলের পাপড়ি মৃদু বাতাসে কাঁপছে, দুলছে, আবার থেমে যাচ্ছে। কোনো অদৃশ্য সংগীতের তাল অনুসরণ করছে তারা। পর্দার প্রান্তদেশে গেঁথে দেওয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফুলগুলি আলো-ছায়ার খেলায় অনবরত ঝিলমিল করছে। আর সেই মৃদু আন্দোলনের ভেতর দিয়ে ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে এক ধরনের কোমল, প্রায় অবাস্তব সৌরভ।

ঘরের কেন্দ্রে রাখা প্রশস্ত বিছানাটিও ফুলে আচ্ছাদিত। কোনো উৎসর্গের মঞ্চের ন্যায়। আর সেই বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে অপরূপা। তার দুই হাত নিবিড়ভাবে পরস্পর আবদ্ধ। আঙুলগুলো অকারণেই একে অপরকে আঁকড়ে ধরে আছে। নিজের স্পর্শেই সে নিজের অস্তিত্বকে ধরে রাখতে চাইছে। মুখাবয়বে কোনো স্পষ্ট অভিব্যক্তি নেই, তবুও তার নিঃশব্দ দৃষ্টি ও স্থির ভঙ্গিমার অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক অনুচ্চারিত অস্বস্তি, এক অনিশ্চিত শঙ্কা, যা বারবার তার নিঃশ্বাসকে ভারী করে তুলছে।

এরিনা ও নিদ্রা কিছুক্ষণ আগেই তাকে এখানে রেখে গেছে। পিহু এরিনার ঘরেও। হয়তো প্রাইভেসি দিতেই তাকে রেখে দিয়েছে। অপরূপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঘড়ির কাঁটা অনেক আগেই বারোটা অতিক্রম করেছে। সময় আজ নিজের স্বাভাবিক গতিকেও অস্বীকার করে দীর্ঘায়িত হয়ে গেছে। দিনটি এত দীর্ঘ, এত ঘটনাবহুল যে শরীর ক্লান্তির কাছে আত্মসমর্পণ করতে চাইছে অপরূপার। আভিয়ান এখনো আসেনি। লোকটা কোথায়?
কী করছে? অপরূপা যখন এসব ভাবনায় মগ্ন ঠিক তখনই হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ হলো। অপরূপা চমকে উঠল। তার দেহ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সোজা হয়ে দাঁড়াল। দৃষ্টি স্থির হয়ে দরজার দিকে নিবদ্ধ হলো।

দরজার সামনে দাঁড়ানো আভিয়ান, তার কোলে ঘুমন্ত পিহু। ঘরে প্রবেশ করতেই আভিয়ানও এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। চোখজোড়া দ্রুত চারপাশ পর্যবেক্ষণ করল। ফুলে ঢাকা বিছানা, সুগন্ধে ভারী বাতাস, সাজানো পরিবেশ। এরপর তার দৃষ্টি স্থির হলো বিছানার দিকে, তারপর ফুলের অলঙ্কারে, আবার চারপাশে। পরক্ষণেই কপালে হাত ঠেকিয়ে বিরক্তির সুরে বিড়বিড় করল,

“আল্লাহ! এসব কী!”

অপরূপা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল, দৃষ্টি নিচু হয়ে গেল অনিচ্ছায়। আভিয়ান নিচু স্বরে পুনরায় বিড়বিড় করল,

“এরা আমার ঘরটাকে বাগান বানিয়ে ফেলেছে।”

পরমুহূর্তেই তার দৃষ্টি স্থির হলো অপরূপার দিকে। একই মুহূর্তে দুজনের চোখ একে অপরের সঙ্গে মিলিত হলো, কিন্তু সেই মিলন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারল না। দুইজনেই দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ঘরের ভেতর নেমে এলো এক ঘন, অস্বস্তিকর নীরবতা, যা শব্দের অনুপস্থিতিতেও ভারী হয়ে থাকে। শেষমেশ আভিয়ানই নীরবতা ভাঙল,

” লিটেল কিটেনটাকে একটু ধরবেন? আমি বিছানাটা ঠিক করি।”

অপরূপা সঙ্গে সঙ্গেই মাথা নাড়িয়ে বলল,

“আমি করছি।”

বলেই সে দ্রুত এগিয়ে গেল। পাশে রাখা ঝাড়ু হাতে তুলে নিল সে । কোমরের কাছে শাড়ির আঁচলটা গুঁজে নিয়ে বিছানার উপর ছড়িয়ে থাকা ফুলের পাপড়িগুলো এক পাশে সঞ্চিত করতে লাগল। আভিয়ান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো রমণীর ফর্সা উদরে। ধক করে উঠল হৃদয়টা। নিজের অবস্থান ও পরিস্থিতির ভার বুঝতে পেরে সে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ভেতরে ভেতরে নিজেকেই কঠোরভাবে ধমক দিল। অপরূপা সম্পূর্ণ অজ্ঞতার মধ্যেই নিজের কাজে নিমগ্ন। আর আভিয়ান আচমকাই অনুভব করল তার হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত হয়ে উঠছে। নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো অদৃশ্য প্রবাহ তাকে গ্রাস করছে। সে হালকা কাশল, নিজেকে সংযত করার ব্যর্থ প্রয়াস চালাল। ঠিক তখনই অপরূপা ঘুরে দাঁড়াল।

“হয়ে গেছে।”

আভিয়ান দ্রুত বাস্তবতায় ফিরে এল। চোখ সরিয়ে নিল সে। এগিয়ে যেতে গিয়েও সে থেমে গেল। দৃষ্টি জোড়া বড্ড নির্লজ্জ হয়ে উঠেছে তার। আভিয়ান জ্বিভ দ্বারা ঠোঁট ভেজাল। অপরূপা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

” আপনি ঠিক আছেন?”

“হ্যাঁ।”

খুব দ্রুত উত্তর দিল আভিয়ান। অপরূপা কিছুক্ষণ সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, তারপর আর কিছু বলল না। আভিয়ান এগিয়ে এসে পিহুকে বিছানার মাঝখানে শুইয়ে দিল। অত্যন্ত যত্ন ও সংযমের সঙ্গে তার গায়ে কাঁথা টেনে দিল । ঘুমের মধ্যেই পিহু সামান্য কুঁকড়ে গিয়ে বালিশ জড়িয়ে ধরল। আভিয়ান তাকাল অপরূপার দিকে।

“আপনি ফ্রেশ হবেন না?”

অপরূপা নিজের শাড়ির দিকে তাকাল, তারপর শান্ত অথচ ক্লান্ত স্বরে বলল,

“না, আমি ঠিক আছি।”

“নিশ্চিত?”

“হুম।”

আভিয়ান মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। তারপর জিজ্ঞেস করল,

“খেয়েছেন?”

“হ্যাঁ।”

অপরূপার সংক্ষিপ্ত জবাব। দু’জনের মাঝে আবার নেমে এলো নীরবতা। শব্দহীন সেই শূন্যতা। আভিয়ান মৃদু স্বরে বলল,

“তাহলে শুয়ে পড়ুন।”

অপরূপা কিছু বলতে চাইল। তবে সেই সুযোগ টা দিল না
আভিয়ান। সে হাঁটা ধরল ওয়াশরুমের দিকে। মিনিট বিশেক পর কমে এলো পানির শব্দ। খুলে গেল দরজা।
দরজাটি ধীরে খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল আভিয়ান। তার উপস্থিতি শুধুমাত্র একজন মানুষের আগমন নয় বরং এক ধরনের তীব্র, নিয়ন্ত্রিত পুরুষালি অভিঘাত, যা বাতাসকেও অল্প অল্প করে দমিয়ে দিতে সক্ষম। তার ফর্সা শরীরে কেবল কালো রঙের হাফ প্যান্ট।শরীরজুড়ে পানির আর্দ্রতা এখনও অটুট।প্রতিটি ফোঁটা আলোর নিচে ক্ষণিক ঝিলিক দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে কাঁধ বেয়ে বুকের রেখা ধরে। ভেজা চুলগুলো কপালের উপর এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে, কিছু গোছা ঘাড়ের সঙ্গে লেগে আছে অদ্ভুত অনায়াস ভঙ্গিতে। প্রতিটি পদক্ষেপে তার উপস্থিতি আরও ঘনীভূত হয়ে ওঠছে যেন। এমন সময় আভিয়ানের দৃষ্টি স্থির হলো সোফার একপাশে বসে থাকা অপরূপার উপর। নিঃশব্দ। অচঞ্চল। তার দৃষ্টি একেবারে সরাসরি আভিয়ানের দিকে নিবদ্ধ। এক মুহূর্তের জন্য ঘরের সময় যেন স্থগিত হয়ে গেল। ঘড়ির কাঁটা, নিঃশ্বাস, এমনকি আলোও যেন থেমে আছে।
অপরূপার বুকের ভেতর অজানা এক ধাক্কা বেজে উঠল। চোখ সামনে থাকা দৃশ্যকে অস্বীকার করতে চাইছে, তবুও ব্যর্থ হচ্ছে। ভেজা চুল, জলকণার অনায়াস স্রোত, আর অবলীল উপস্থিতি, সব মিলিয়ে তার শ্বাসপ্রশ্বাসও নিজের অধিকার হারাচ্ছে তার । অপরূপা দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল। আভিয়ান কোনো দ্বিধা না রেখে আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। এক টানে টি-শার্ট বের করে গায়ে চাপাল। তারপর শান্ত অথচ অনড় কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ল,

“ঘুমাননি কেন?”

অপরূপা উঠে দাঁড়াল। অস্বস্তি কাটিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়েছে বটে তবে বুকের ভেতর জমে আছে তান শব্দহীন এক দ্বন্দ্ব, বলা আর না-বলার মাঝখানে আটকে থাকা এক অনিশ্চিত উচ্চারণ। সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে, কণ্ঠকে সামান্য নিয়ন্ত্রণ করে খুব নিচু স্বরে বলল,

“আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে।”

আভিয়ান থেমে গেল। ধীরে ঘুরে দাঁড়াল সে। তার চোখে কোনো অস্থিরতা নেই। শুধু গভীর, নিবিড় স্থিরতা, সে অপরূপার অজানা বাক্য আগেই অনুমান করার চেষ্টা করছে। আভিয়ান ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল। দৃঢ় স্বরে উচ্চারণ করল,

“বলুন।”

অপরূপা কিছুক্ষণ নীরব রইল। শব্দগুলো তার ভেতরেই আটকে যাচ্ছে, বের হতে চাইছে না। আঙুলগুলো অজান্তেই শাড়ির আঁচল মুঠো করে ধরে ফেলেছে। মূলত সে চাকরড ছাড়তে চায় না, তবে আভিয়ান ডদি নিষেধ করে তখন? কথার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া তার সাহসকেই গিলে ফেলছে। আভিয়ান চুপচাপ তাকিয়ে রইল, কোনো তাড়া দিল না। অপেক্ষা করল জবাবের। তবে জবাব এলো না। রমণী অস্বস্তি কাটাতে পারছে না। হুট করেই আভিয়ানের মনে পড়ল কিছু একটা। সে চট করে বলে উঠল,

“এক মিনিট।”

কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সে আলমারির দিকে এগিয়ে গেল।
সেখানে থেকে একটি ছোট্ট বাক্স তুলে আনল। ধীর পায়ে ফিরে এসে সেটি এগিয়ে দিল অপরূপার দিকে। কণ্ঠস্বর শীতল রইল তার। উচ্চারণ করল,

“যতদূর জানি বাসর রাতে স্ত্রীকে উপহার দিতে হয়।”

চমকে উঠল অপরূপা! একপলক আভিয়ানের হাতের দিকে তাকিয়ে আবারো তাকাল তার মুখের দিকে। শুধালো,

“কী এটায়?”

আভিয়ান শান্ত স্বরে বলল,

“খুলে দেখুন।”

অপরূপা কাঁপা হাতে ঢাকনা তুলল। ভেতরে আলো পড়তেই দুটি বস্তু ঝলমল করে উঠল। একটি সূক্ষ্ম কারুকার্যখচিত হীরার নাকফুল, আর একটি আংটি।
মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল রমণী। শ্বাসপ্রশ্বাস এক মুহূর্তের জন্য ভারসাম্য হারাল। এই নাকফুল তার অতীতের এক নীরব অধ্যায়ের অংশ, যেটি সে বহু আগেই নিজের জীবন থেকে সরিয়ে রেখেছিল। সৈকতের সাথে ডিভোর্সের পর সে নাকফুল পরা ছেড়েছে। আভিয়ান দেখল অপরূপার প্রতিক্রিয়া। ক্ষীণ হাসিতে অধর বাঁকাল। কিছুটা ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলে উঠল,

“নাকফুলে আপনাকে দারুণ মানাবে, লাইক….লাইক মাইন।”

কেঁপে উঠল রমণীর চোখের পাতা। বারকয়েক পলক ফেলে তাকাল আভিয়ানের সবুজাভ চোখদুটোর পানে। আভিয়ানের চোখ দুটো অদ্ভুত ভাবে গাঢ় আকার ধারণ করছে। জ্বলজ্বল করছে চোখ জোড়া। আভিয়ান আংটিটি তুলে নিল। তারপর আলতোভাবে অপরূপার হাতটা নিজের হাতে উঠিয়ে আঙুলে পরিয়ে দিল স্বযত্নে। এই নাকফুল আর আংটিটা কোনো কারণ ছাড়াই ঈদের আগে কিনেছিল সে। মনে মনে কল্পনা করেছিল তার অপ্সরাকে। আভিয়ান হাসলো আনমনে। নাকফুলটি হাতে তুলে নিয়ে এগিয়ে দিল অপরূপার দিকে,

“পরে নিন।”

অপরূপা যেন কোনো অদৃশ্য মোহে পরিচালিত পুতুল। সে বিনাবাক্যে নাক ফুলটা হাতে নিয়ে এগিয়ে গেল আয়নার সামনে। নাকফুলটি পরে নিল পরপর। নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে স্তব্ধ হয়ে রইল রমণী। নিজেকে আজ নতুনভাবে আবিষ্কার করছে। আভিয়ান একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তারই দিকে। অপরূপা এগিয়ে এলো, থামল তার সামনে। রক্তিম হয়ে উঠেছে তার মুখটা। নাকের ডগাটা একটু বেশিই লালচে। আশ্চর্য! সে কি লজ্জা পাচ্ছে? কিন্তু কেন? লজ্জা পাওয়ার মত তো কিছু হয়নি। আভিয়ান চোখ ফেরাতে পারছে না। তার অপ্সরার লালিমা মুখশ্রী তাকে এলোমেলো করে তুলছে। তার মনের ভেতর সৃষ্টি করছে আকাঙ্খা। এই যেমন এই মুহূর্তে খুব করে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করছে তার স্নো হোয়াইটকে। ঠোঁট জোড়া ছুঁয়ে দিতে চাচ্ছে রমণীর নাকের ডগা, ললাট, কপোল আর অধর। এটা কি ঠিক? ছুঁইয়ে দেওয়ার এক অব্যক্ত, অস্থির আকাঙ্ক্ষায় হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে উঠল আভিয়ানের। নেশা ধরে গেল তার। অপরূপা তা টের পেয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। আরো খানিকটা এগিয়ে এসে দূরত্ব মেটাতে চাইল আভিয়ান। হুট করেই বলে বসল,

“ক্যান আই টাচ ইয়্যু, স্নো হোয়াইট?”

হকচকিয়ে উঠল রমণী। কোনো সতর্কবার্তা না দিয়েই এগিয়ে এলো আভিয়ান। বিষয়টা এতটা দ্রুত ঘটল যে অপরূপা পিছিয়ে যাওয়ার সময় পেল না। পরপর ভেসে এলো আভিয়ানের অস্থির কণ্ঠস্বর। মাদকের ন্যায় কাজ করল তা অপরূপার ক্ষেত্রে। শরীরের ভেতর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল আতঙ্কের স্রোত। আভিয়ান শুকনো ঢোক গিলে মিনতি করার ন্যায় আওড়াল,

“জাস্ট…জাস্ট একবার, প্লিজ?”

আভিয়ানের দৃষ্টি নেমে এলো অপরূপার চোখ থেকে নাক, নাক থেকে ঠোঁটে। যেখানে শিকারির সামনে শিকার দাঁড়িয়ে, সেখানে শিকারি কী করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে? আর তার অপ্সরা তো আস্ত একটা মরণব্যধি বিষ, যে বিষ আভিয়ান স্ব ইচ্ছায় হাজার কোটি বার গ্রহণ করতে প্রস্তুত। পরিস্থিতি ঠিক কোথায় এসে থেমেছে তা জানা নেই অপরূপার। সে কেবল বুঝতে পারছে তার হৃৎস্পন্দন ঠিক নেই, সে ঠিক নেই। বহু বছর পর সে অদ্ভুত এক অনুভূতির সম্মুখীন হচ্ছে। আর যেখানে তার সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তিটি তার অর্ধাঙ্গ। তার স্বামী। বিয়ে নামক পবিত্র বন্ধনে বাঁধা পড়ার পর থেকেই তার সমস্ত সম্ভ্রম হারিয়েছে সে। এক কবুলর কত জোর তাই না? অনুভূতি গুলো মুহূর্তের মাঝেই অর্থ বদলে ফেলে, অস্পষ্ট থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠে। এই যেমন এখন। অপরূপাও ঠিক তেমনই পরিস্থিতিতে আছে। মন মস্তিষ্কের দ্বন্দ্বে সে ঠিক মাঝ বরাবর। অধৈর্য্য হয়ে উঠল তার সামনে দাঁড়ানো পুরুষটি। উঠানামা করছে তার গলার উঁচু অংশটা। বারবার শুঁকনো ঢোক গিলছে কি-না। এ পর্যায়ে আবারো ভেসে এলো তার কণ্ঠস্বর,

“সে সামথিং, মাই ইউনিভার্স। ক্যান আই?”

এ পর্যায়ে এক পা পেছিয়ে গেল রমণী। কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারণ করল,

“ঠিক আছে কিন্তু….

কথা শেষ হওয়ার সুযোগ আর মিলল না অপরূপার। তার আগেই একজোড়া উষ্ণ হাতের স্পর্শ মিলল তার গালে। আভিয়ান নিজের দুহাতের বাঁধনে নিয়ে এলো অপরূপার লাজুকলতার ন্যায় মুখশ্রীখানা। মুহূর্তেই রক্তিম হয়ে উঠল লাজুকলতার গাল। গরম হয়ে উঠল কান দুটো। হৃৎপিন্ড বুঝি তার কার্যক্ষমতা হারাল। আভিয়ান ধীরে ঝুঁকে এলো খানিক। আরেকটু খানি টেনে আনল অপরূপাকে। পরপর কোনো সতর্কতা ছাড়ায় তার অর্ধাঙ্গিনীর লাল টুকটুকে নাকে জ্বলজ্বল করতে থাকা নাকফুলটা উপর ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল সে। অতি সূক্ষ্ম, অদৃশ্য স্পর্শের ভার বইতে গিয়েও অপরূপার মনে হলো তার শরীরটা অবশ হয়ে আসছে। আভিয়ান দ্বিতীয় বার আবারো ঠোঁট ছোঁয়াল, ঠিক একই স্থানে। তবে এবার স্পর্শটা হলো গভীর, গাঢ়, দীর্ঘ। অপরূপার হাত জোড়া অজান্তেই খামচে ধরল আভিয়ানের টি শার্ট। আভিয়ান থামল। মুখ উঠিয়ে চোখ রাখল রমণীর চোখে। যদিও বা রমণীর দৃষ্টিজোড়া নিচু। আভিয়ান নিজের সমস্ত সম্ভ্রম হারাতে বসেছে। মন্দ কিছু করে ফেলতে ইচ্ছে করছে। এই নারী একটা নেশা, নিকোটিনের চাইতেও হাজারগুণ বেশি নেশা এই নারীর মাঝে। আভিয়ানের দৃষ্টি জোড়া ঝাপসা হয়ে আসছে। শুকিয়ে আসছে ঠোঁট। এ পর্যায়ে জ্বিভ দ্বারা ঠোঁট ভেজাল সে। নেশালো স্বরে আওড়াল,

“আপনি আস্ত একটা নেশা, স্নো হোয়াইট। এই নেশা একদিন জান নেবে আমার।”

অপরূপার পুরো শরীর কেঁপে উঠল সহসাই। সে পেছাতে গিয়েও পাড়ল না। আভিয়ানের হাতটা নেমে গিয়ে আঁকড়ে ধরল তার ধনুকের ন্যায় বাঁকানো কোমর। বলিষ্ঠ শরীরের দিকে টেনে নিল নরম শরীরটা। নরম ত্বকে রুক্ষ হাতের বিচরণে কেপে উঠল নারী কায়া। রুদ্ধ হলো শ্বাস। চোখে চোখ রেখে আওড়াল,

“মিস্টার আভিয়ান!”

আভিয়ান নেশার ঘোরে আছে বোধ-হয়। নিগূঢ় চাহনিতে ভস্ম করে ফেলতে চাইল রমণীর গোটা অস্থিত্ব। আরেকটু ঝুঁকে এসে ঠোঁট ছোঁয়াল তার অপ্সরার গালে। পরপর ভেসে এলো তার মাদকতায় পূর্ণ হাস্কি কণ্ঠস্বর,

“বলুন, মিসেস আভিয়ান।”

এই একটি মাত্র শব্দ উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের ভেতরের বায়ুমণ্ডলে ঘটে গেল অদ্ভুত এক রূপান্তর। নিঃশব্দ বাতাসও ধারণ করল নতুন কোনো অর্থ, এই একটি সম্বোধনই বদলে দিল সম্পর্কের সংজ্ঞা। অপরূপা মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে গেল। থমকে গেল সময়। বুকের ভেতর অচেনা এক অস্থিরতা ঢেউয়ের মতো হানা দিয়ে উঠল মুহূর্তেই। সেই ঢেউয়ের কোনো ভাষা নেই, কোনো নাম নেই, শুধু আছে অনুভূতির ভারী চাপ। আভিয়ানের ঠোঁট জোড়া কান ছেড়ে চলে এসেছে অপরূপার গালে। ধীরে ধীরে এগোচ্ছে অধরের পানে। বিষয়টা মস্তিষ্কপ্রসূত হতেই হুশ ফিরল রমণীর। নিঃশব্দ টানাপোড়েনের মাঝেই সে হঠাৎ বলে উঠল,

“আমি…আমি চাকরি ছাড়তে চাই না!”

কথাটা প্রায় চেঁচিয়েই বলে উঠল সে। আচমকা এমন কোনো বাক্য শুনে আভিয়ানও থেমে গেল। কেটে গেল তার ঘোর। মুখটা উঠিয়ে অসহায় চাহনিতে তাকাল অপরূপার মুখপানে। সে ঠিক বুঝে উঠতেই পারছে না হলো টা কী এখানে! আশ্চর্য! কীসের মাঝে কী? সে বিরক্ত হবে নাকি হতভম্ব হবে? অপরূপা আভিয়ানের এহেন প্রতিক্রিয়া দেখে নিজেও বোকা বনে গেল। তারও মাথায় এলো সে ঠিক কী করেছে। পরমুহূর্তেই নিজের হাত নামিয়ে ফেলল রমণী। পিছিয়ে গেল একপা। অথচ আভিয়ানের দৃষ্টি সরল না। সে কিছুক্ষণ চুপচাপ একই ভাবে তাকিয়ে রইল। পরপর নিজের কপালে হাত দিয়ে আঘাত করে অন্যদিকে ঘিরে গিয়ে গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কণ্ঠনালি ভেদ করে আপনা-আপনি বেরিয়ে এলো একটি বাক্য,

“আহহহ, গড!”

অপরূপার বড্ড হাসি পেল। যদিও বা প্রকাশ করল না। আভিয়ান আবারো ঘুরে দাঁড়াল অপরূপার দিকে। পরপর এক পা পেছনে সরে এল। গম্ভীর কণ্ঠে আওড়াল,

“আমি আপনাকে চাকরি ছাড়তে বলেছি, এমন কোনো কথা আমি আপনাকে বলেছি বলে আমার মনে পড়ছে না। আমি কি বলেছি চাকরি ছাড়তে?

অপরূপা চট করে চোখ তুলে তাকাল। হাসিটা মিলিয়ে গেল তার। চটজলদি দু’দিকে মাথা দুলাল সে। আভিয়ান দ্বিতীয় দফায় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আর কিছু না বলে সে দিকে গেল আলমারির দিকে। কাঠের দরজার শব্দটা অতিরিক্ত ভারী শোনাল। সেখান থেকে সে একটি কার্ড বের করে ধীরে ধীরে ফিরে এলো। অপরূপার সামনে দাঁড়িয়ে সেটি এগিয়ে দিল তার দিকে,

“আপনার দেনমোহরের টাকা আপনার একাউন্টে জমা হয়ে গিয়েছে, স্নো হোয়াইট। আর এই কার্ডটা আপনার ডিসেন্ট হাসবেন্ডের তরফ থেকে তার ওয়াইফির জন্য। যখন যা প্রয়োজন পড়বে খরচা করবেন।”

অপরূপা তাকাল আভিয়ানের হাতের দিকে। পরপর চোখে চোখ রেখে বলে উঠল,

“আমি নিজের খরচা নিজেই চালিয়ে নিতে পারব। আপনার কার্ডের প্রয়োজন নেই আমার।”

বাঁকা হাসল আভিয়ান। কিছুটা ঝুকে এলো রমণীর পানে। উষ্ণ শ্বাস ছুলো রমণীর গাল। চোখ পড়ল চোখে। কণ্ঠস্বর নেমে গাঢ় হলো আভিয়ানের। পরবর্তী বাক্যটা আওড়াল,

“অবশ্যই প্রয়োজন আছে, মাই কুইন। আফটার অল, রাজার রানী আপনি। রাজা আর রাজত্ব দুটোর উপরেই রাজ আপনার।”

বাক্য হারাল অপরূপা। আভিয়ানের এহেন জবাবের সামনে আর কোনো কিছু বলতে পারল না সে। আভিয়ান কার্ডটা তার হাতে দিল। অতঃপর অর্ধাঙ্গিনীর পা থেকে মাথা অব্দি দেখে নিয়ে অবশেষে চোখ রাখল চোখে। ডান হাতটা নিজের চুলে চালিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠল,

“সময় থাকতে ঘুমিয়ে পড়ুন, আমি চাচ্ছি না কথার খেলাফ করতে।”

কপালে ভাজ পড়ল অপরূপার। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

“কোন কথা?”

আভিয়ান জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে হাস্কি স্বরে বলল,

“আপনার ডিসেন্ট স্বামী হওয়ার কথা।”

“মানে?”

আভিয়ান বাঁকা হাসল। হাসিটা গাঢ় হলো তার। কণ্ঠস্বর নেমে এলো আরো খানিক। আওড়াল,

“এত মানে না খুঁজে ঘুমান আমার অপ্সরা। নাহয় গোটা রাত জেগেই কাটাতে হবে আপনাকে। জানেন তো, ছেলে হিসেবে আমি আবার বড্ড বেপরোয়া। স্বামী হিসেবে ঠিক কতটা হতে পারি, সেটা নিশ্চয় আর বলে বোঝাতে হবে না আপনাকে।”

অপরূপার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। আভিয়ান তার সাথে এভাবে কথা বলছে? বলবেই বা না কেন? এখন তো সে তার স্বামী। বলতেই পারে। শুঁকনো ঢোক গিলল অপরূপা। আভিয়ান মাথা ঝুকিয়ে আবার ধীর স্বরে বলল,

“ছেলে হিসেবে আমি কিছুটা ভদ্রসভ্য হলেও হতে পারি, স্বামী হিসেবে একদমই নই। হওয়ার ইচ্ছেটাও নেই। স্বামী হিসেবে আমার মত অভদ্র ছেলে আপনি আর দুটো দেখবেন না, এটুকু কথা দিতে পারি। এমনিতেও আপনার ওই দুচোখ অন্য ছেলের উপর পড়তে দেব না আমি। আপনার হাসবেন্ড একটু পসেসিভ, সময় হোক বুঝে যাবেন। যান এবার, ভুলভাল কিছু করে ফেলি তার আগে ঘুমান।”

অপরূপা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। সে দ্রুত পায়ে গিয়ে পিহুর পাশে শুয়ে পড়ল। আভিয়ান এক পলক সেদিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল। তারপর বাতি নিভিয়ে সে নিজেও বিছানায় শুয়ে পড়ল। মাঝখানে ঘুমন্ত পিহু। দুই প্রান্তে দুইটি অস্থির হৃদয়, যারা একই নামের বন্ধনে আবদ্ধ হলেও এখনো অনুভূতির গভীর মানচিত্রে একে অপরকে নতুন করে আবিষ্কার করছে নিঃশব্দে, ধীরে, অনিবার্যভাবে। অতঃপর চোখ বুঁজে পড়ে রইল দুটি প্রাণ। ঘুম হলো না কারোরই। অথচ দুজনেই ঘুমানোর মিথ্যা অভিনয়টা ঠিক-ই করে গেল।

___________

#চলবে

#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ৪৫
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা

_______________________

সকালের আলো ফুটেছে চারিধারে। পূর্ব দিগন্তের সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়েছে এহসান মঞ্জিলেরবিস্তীর্ণ আঙিনাজুড়ে। জানালার পাতলা পর্দা ভেদ করে সূর্যের মৃদু কিরণ এসে পড়েছে ঘরের ভেতর। কোথাও কোনো কোলাহল নেই। চারপাশে বিরাজ করছে এক প্রশান্ত, নির্মল নীরবতা। ভোরের শেষ প্রহরে ঘুমিয়েছিল আভিয়ান। তাই সকালের আলো চোখে লাগতেই কপাল কুঁচকে ধীরে ধীরে চোখ মেলল সে। কিন্তু চোখ খোলার পরই তার সমস্ত তন্দ্রা উধাও হয়ে গেল। কারণ তার সামনে বসে আছে পিহু। একদম গম্ভীর মুখে। তার ছোট্ট হাতে একটি কলম। আর সেই কলম দিয়ে সে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে আভিয়ানের হাতে, কনুইতে আর আঙুলে নানা রকম আঁকিবুঁকি কেটে চলেছে। কোথাও গোল গোল সূর্য। কোথাও লাঠির মতো মানুষ। কোথাও আবার এমন কিছু, যার অর্থ পৃথিবীর আর কেউ বুঝবে না। আভিয়ান কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল পিহুর কার্যক্রমের দিকে। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল তার। পিহুর সম্পূর্ণ মনোযোগ নিজের কাজে হওয়ায় সে খেয়ালও করেনি আভিয়ান যে জেগে গিয়েছে। আভিয়ান এক টানে পিহুকে বুকে জড়িয়ে ধরল। এতে পিহু খানিকটা ভরকে গেল স্পষ্ট। দিে পরমুহূর্তেই ছোট্ট মেয়েটা খিলখিল করে হেসে উঠল। আভিয়ান তার কপালে আলতো চুমু দিয়ে বলল,

“গুড মর্নিং, লিটেল কিটেন।”

পিহু নিজেও তার ছোট্ট ছোট্ট হাত দুটো রাখল আভিয়ানের গালে। পরপর চুমু দিল আভিয়ানের গালে।একগাল হেসেউত্তর দিল,

“গুড মলনিং, ইয়ান।”

“কী করছিল তুমি?”

পিহু মিটিমিটি করে হাসলো। আভিয়ানের বুকে মাথা রেখে বলল,

“আঁকিবুঁকি।”

আভিয়ান পিহুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শুধালে,

“আর আমাকে ক্যানভাস বানিয়ে ফেললে?”

পিহু ভীষণ খুশি হয়ে বলল,

“হু। সুন্দল হয়েচে না?”

আভিয়ান নিজের হাতের দিকে তাকাল। তার হাতে ইতোমধ্যে বিশাল এক গোল মুখ, দুইটা ট্যারা চোখ আর অদ্ভুত এক প্রাণীর ছবি আঁকা হয়েছে। সে গম্ভীর মুখে বলল,

“পৃথিবীর সেরা।”

পিহু খুশিতে আবার হেসে উঠল। আবারো কলম তুলে আভিয়ানের হাত টেনে ধরল। বলে উঠল,

“পিহু একটা এলিয়েন আঁকা আঁকা করবে।”

আভিয়ান কিচ্ছুটি বলল না। বরং পিহু যা করতে চাচ্ছে তাই করতে দিল। পিহুও খুশি মনে দাগাদাগি করে চলেছে আভিয়ানের হাতে। ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো অপরূপা। দরজার সামনে দাঁড়িয়েই সে থমকে গেল। সামনে উপস্থিত দুটি মানুষ, দুজনের মুখেই একইরকম হাসি। যার একজন তার সন্তান, আরেকজন তারই স্বামী। স্বামী? থমকে গেল অপরূপা। দৃষ্টি স্থির হলো আভিয়ান ও পিহুর দিকে। একজন গল্প বলছে। আরেকজন মুগ্ধ হয়ে শুনছে। দৃশ্যটা স্বাভাবিক, আন্তরিক। অপরূপার হৃদয় ভার হলো উষ্ণতায়। সে কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইল তাদেরই দিকে। হঠাৎ করোই প্রশ্ন জাগল নিজ মনেই। এই মানুষটা কি সত্যিই সবসময় এভাবেই পিহুর পাশে থাকবে? আজ যেমন আছে। আগামীকালও? আরও অনেক বছর পরেও?
পিহুর প্রতিটি হাসি, প্রতিটি কান্না, প্রতিটি ভয় কি এভাবেই নিজের করে নেবে? ভাবনাগুলো তার মনকে অদ্ভুত কোমল করে তুলল। ভবিষ্যত তো তার জানা নেই। অপরূপা যখন প্রশ্ন উত্তরের ভাবনায় ঠিক তখনই তার কানে ভেসে এলো আভিয়ানের কণ্ঠস্বর।

“গুড মর্নিং, মাই বিলাভড ওয়াইফি।”

চমকে উঠল রমণী। মুহূর্তের মাঝেই ফিরে এলো সে বাস্তবতায়। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল,

“ফ্রেশ হবেন না? উঠুন। আমি বিছানা গুছিয়ে রাখছি।”

আভিয়ান উঠে বসল তৎক্ষনাৎ। স্ত্রীর বাধ্যগত স্বামী কি-না। অপরূপার চোখে চোখ রেখে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

“কাছে আসুন।”

অপরূপা ভ্রু কুঁচকাল। শুধালো,

“কেন?”

“আসুন তো।”

প্রথমে এগোল না অপরূপা। কিন্তু আভিয়ানের স্থির দৃষ্টি দেখে শেষ পর্যন্ত দ্বিধাভরে কয়েক পা এগিয়ে এলো। ঠিক তখনই আভিয়ান পিহুর দিকে তাকাল।

“লিটেল কিটেন, ক্লোজ ইয়্যুর আইস।”

পিহু অত্যন্ত বাধ্য মেয়ের মতো সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত দিয়ে চোখ ঢেকে ফেলল। দু’দিকে মাথা দুলিয়ে বলে উঠল,

“কলোজ।”

আভিয়ান মাথা নেড়ে সন্তুষ্ট হলো। তারপর উঠে দাঁড়াল এক লাফে। অপরূপার মুখোমুখি দাঁড়াল। কোনো সতর্কবার্তা ছাড়ায় রমণীর ধনুকের ন্যায় বাঁকানো কোমরটা জড়িয়ে ধরল আভিয়ান। বলিষ্ঠ হাতে বাঁধনে অপরূপার পাতলা কোমর, রমণীও তাল সামলাতে হিমশিম খেল। কাছে আসতে বাধ্য হলো সহসাই। আভিয়ান ঝুঁকল তার পানে। নিজের গালটা এগিয়ে দিয়ে
দুষ্টুমি স্বরে বলে উঠল,

“আই নিড মাই মর্নিং কিস, স্নো হোয়াইট।”

অপরূপা হতভম্ব হয়ে গেল। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সে আভিয়ানের দিকে। ঠিক শুনেছে কি না, সেটাই বুঝতে পারছে না। আভিয়ান নিচু স্বরে তাড়া লাগিয়ে বলল,

“দ্রুত করুন। মেয়ে চোখ খুলে ফেললে সমস্যা।”

অপরূপা আরও অপ্রস্তুত হয়ে গেল। সে কিছু বলতেও পারছে না, করতেও পারছে না। সেই অবস্থা দেখে আভিয়ান মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। ঘুরে তাকাল চটজলদি। সে নিজেই আলতো করে অপরূপার গালে একটি চুমু এঁকে দিল। পুরুষালি ছোঁয়া পেয়ে শরীরটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল অপরূপার। বিষয়টা টের পেল আভিয়ান। হাসির রেখা গাঢ় হলো তার। কোমর হতে হাত ছাড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,

“হিসেব তোলা রইল, আমার অপ্সরা।”

কথাটা বলেই সরে এলো সে। পরপর ওয়াশরুমের দিকে হাঁটল। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শোনা মাত্র পিহু চোখ থেকে হাত নামাল। অপরূপা এখনো আগের ন্যায় স্থবির। হাত উঠে এসেছে নিজের গালে। হৃদয়টা বড্ড অশান্ত। সে তাকাল মেয়ের দিকে। পিহু মুখ চেপে হাসছে। অপরূপা ভ্রু কুঁচকে তাকাল এ পর্যায়ে। শুধালো,

“হাসছো কেন?”

পিহু খিলখিল করে বলল,

“ইয়ান পাপা তোমাকে কিসি দিয়েচে তাই।”

অপরূপার চোখ বড় হয়ে গেল বিস্ময়ে। তার চোখ দুটো বুঝি বেরিয়ে আসবে অক্ষিকোটর হতে। এই মেয়ে বলে কী? সে পিহুর বলা শব্দ গুলোও আওড়াল।

“ইয়ান পাপা?”

“হুম, ইয়ান তো একন আমার পাপা। তাই না?”

অপরূপা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। তা দেখে পিহু আবারো হাসল। বলল,

“ইয়ান পাপা আমাকেও কিসি দেয়, আজ তোমাকেও দিয়েচে। আমি দেকেচি।”

অপরূপার চোয়াল ঝুলে পড়ার উপক্রম। মাথা ঘুরছে তার ভন ভন করে। কয়েক সেকেন্ড সে কোনো কথাই খুঁজে পেল না বলার মত। পরপর নিজেকে সামলে নিল রমণী। গম্ভীর হলো তার চোখ মুখ। গম্ভীর মুখে বলল,

“বিছানা থেকে নামো। বিছানা গোছাবো।”

পিহু হাসতে হাসতেই বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল। আর অপরূপা দ্রুত চাদর গুছাতে ব্যস্ত হয়ে গেল। কিন্তু হাত বিছানা গোছালেও মন বারবার অন্যদিকে ছুটে যাচ্ছে। চোখের সামনে বারবার ভেসে বেরাচ্ছে আভিয়ানের মুখটা। তার ওই দুষ্টু হাসি, দুষ্টু চাহনি। ইস কী হচ্ছে এসব! অপরূপার বুকের ধুকপুকুনি বাড়ছে যে। সে পুরোপুরি মনোযোগ দিল নিজের কাজে। পিহু ততক্ষণে বেরিয়ে গেছে রুম থেকে। মিনিট বিশেকের মাঝেই বেরিয়ে এলো আভিয়ান। ওয়াশরুমের দরজা খুলে বের হতেই আভিয়ান এক মুহূর্তের জন্য স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে রইল। সদ্যস্নাত শরীর থেকে এখনো জলকণার শীতল আর্দ্রতা ঝরে পড়ছে। ভেজা চুলগুলো এলোমেলোভাবে কপালের উপর নেমে এসেছে। অথচ তার সমস্ত মনোযোগ আটকে গেল অন্য এক দৃশ্যে। ঘরটার চেহারা অল্প সময়ের ব্যবধানে সম্পূর্ণ রূপান্তরিত হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল শুকিয়ে যাওয়া ফুলের পাপড়ি, কুঁচকে থাকা চাদর আর এদিক-ওদিক পড়ে থাকা প্রয়োজনীয় সামগ্রী, সেখানে এখন বিরাজ করছে এক অনুপম সুশৃঙ্খলতা।

বিছানার চাদর নিখুঁতভাবে টানটান করে বিছানো।বালিশগুলো সমান্তরালভাবে সাজানো। ড্রেসিং টেবিলের উপর ছড়িয়ে থাকা ছোটখাটো জিনিসপত্র পর্যন্ত নিজ নিজ স্থানে ফিরে গেছে। ঘরের প্রতিটি কোণ নতুন এক গৃহিণীর স্পর্শে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। আভিয়ানের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটি মৃদু হাসি ফুটে উঠল। এই দৃশ্যের মধ্যে রয়েছে ঘরোয়া উষ্ণতা, যা তার বহু বছরের একাকী জীবনের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে বেমানান, অথচ আশ্চর্যরকম কাঙ্ক্ষিত। ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি গিয়ে থামল খোলা ব্যালকনির দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে অপরূপা।সকালের কোমল রৌদ্র এসে পড়েছে তার কাঁধ জুড়ে। সোনালি আলোর পরত তাকে ঘিরে ধরেছে। তার এক হাতে ঝাড়ু। অন্য হাতে রেলিং আঁকড়ে ধুলো পরিষ্কার করছে সে। কপালের পাশে কয়েকটি এলোমেলো চুল বাতাসে উড়ে এসে গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে বারবার। মুখে বিরক্তি নেই, ক্লান্তিও নেই বরং আছে নিবিষ্ট মনোযোগ। সেই মনোযোগ নিয়েফ কাজ করছে সে। আভিয়ানের হৃদয় মাঝে ছড়াল অদ্ভুত প্রশান্তি।তার মনে হলো এই দৃশ্যটাই হয়তো সে অজান্তে বহু বছর ধরে কল্পনা করে এসেছে।

হুট করেই তার মস্তিষ্কে এসে হানা দিল কিছু দুষ্টু বুদ্ধি। মুহূর্তের মধ্যেই ঝলসে উঠল চোখ মুখ। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল বাঁকা হাসির রেখা। সে ধীর পায়ে আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এক টানে টি-শার্টটা খুলে পাশে ছুঁড়ে রাখল। তারপর মাথার ভেজা চুলে টাওয়াল ঘষতে লাগল। ভঙ্গিমা তার এমন যেন পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক কাজটিই করছে সে। বাস্তবে অবশ্য তার উদ্দেশ্য মোটেও এতটা নির্দোষ না। বরং নির্দিষ্ট একজন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই তার মূল পরিকল্পনা। অপরূপা তখনও নিজের কাজে নিমগ্ন। আভিয়ান এগিয়ে গেল সেদিকেই। দাঁড়াল ঠিক অপরূপার সামনে। উদম শরীরটা নাড়িয়ে চাড়িয়ে সে চুল মুছতে ব্যস্ত। বারান্দার মেঝে ঝাড়ু দিতে দিতে হঠাৎ সামনের আলোটা আড়াল হয়ে যেতে দেখে মুখ তুলল অপরূপা। পরমুহূর্তেই থমকে গেল সে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে আভিয়ান, যার মুখে নির্বিকার ভাব। সে মোটেও জানে না তার উপস্থিতি কতটা দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম। অপরূপার দৃষ্টি অনিচ্ছাসত্ত্বেও কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল তার পেশিবহুল বাহুতে। পরপর নেমে এলো বক্ষে, উদরে। তারপর হুঁশ ফিরতেই দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল সে। কিন্তু ততক্ষণে আভিয়ানের ঠোঁটের কোণে বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠেছে। তার পরিকল্পনা মন্দ না। সে টাওয়ালটা ভাব নিয়ে কাঁধে ফেলে আড়মোড়া ভাঙল। ইচ্ছে করেই আরও স্বাভাবিক হওয়ার অভিনয় করল। পরপর অপরূপার দিকে এমন ভাবে তাকাল যেন সে অপরূপাকে খেয়ালই করেনি। সে চটজলদি ভ্রু তুলে বলল,

“কী দেখছেন, স্নো হোয়াইট?”

অপরূপা বাস্তবে ফিরে এল। দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল,

“কই? কী দেখব? কিছু না।”

আভিয়ান খানিকটা ঝুঁকে এলো। দেখে নিল রমণীর পা থেকে মাথা অব্দি। পরপর বলল,

“রিয়্যেলি?”

অপরূপার অস্বস্তি বাড়ল। অদ্ভুত ভাবে শ্বাস টানল সে। শ্বাস প্রশ্বাস ভারি হচ্ছে ক্রমশ। গলা শুকিয়ে আসছে। লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠেছে তার শুভ্র মুখশ্রী। তা নজর এড়ালো না আভিয়ানের। অথচ অপরূপা অস্থির। সে সহসাই জবাব দিল,

“হ্যাঁ।”

“আপনি লজ্জা পেলে আপনাকে দেখতে আরো বেশি আকর্ষণীয় লাগে, স্নো হোয়াইট।”

অপরূপা চোখ উল্টে তাকাল তার দিকে। পরপর কৃত্রিম বিরক্তি দেখিয়ে বলে উঠল,

“সরুন। বের হব।”

সে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইতেই আভিয়ান এক পা এগিয়ে দাঁড়াল। হাত উঠিয়ে দেওয়ালে ঠেকাল, আঁটকে দডল যাওয়ার পথ। তার চোখে মুখে নির্লিপ্ত ভাব হলেও অধর জুড়ে বিরাজ করছে দুষ্টু হাসি। আরো খানিকটা ঝুঁকে এসে আওড়াল,

“এত তাড়া কিসের?”

অপরূপা পিছিয়ে গেল। জবাব দিল,

“আশ্চর্য, আম…আমার কাজ আছে।”

আভিয়ান গুরুত্বই দিল না। বরং টাওয়ালটা কাঁধ থেকে নামিয়ে হাতের আঙল তুলে নিজের শরীর ঝারতে লাগল কোনো কারণ ছাড়ায়। এক পলক নিজের দিকে তাকিয়ে পরপর তাকাল অপরূপার অস্থির মুখপানে। ঠোঁট কামড়ে হাসল আভিয়ান। আওড়াল,

“আমাকে দেখছিলেন, রাইট? তো দেখুন না, আপনারই তো স্বামী। আপনি বললে অবশিষ্ট অংশ টুকুও প্রদর্শন করেত রাজি আছি। আফটার অল, আপনার ডিসেন্ট স্বামী আমি। এটুকু তো করতেই পারি আপনার জন্য।”

মুহূর্তেই ধক করে উঠল অপরূপার হৃদয়খানা। অস্থির চিত্তে ঝড় তুলল মনের গহীনে। পরপর চোখ মুখ কুঁচকে নিল সে। চোখ ছোট করে তাকাল আভিয়ানের চোখের দিকে। উচ্চারণ করল,

“আপনার ধারণাশক্তি অতিরিক্ত উন্নত হয়ে গেছে।”

“তাহলে ভুল দেখেছি বলছেন?”

“অবশ্যই।”

আভিয়ান নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আওড়াল,

“দুঃখজনক।”

ভ্রু কুঁচকে নিল অপরূপা। শুধালো,

“কী দুঃখজনক?”

“আমি ভেবেছিলাম আমার স্ত্রী অন্তত মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকাবে। কিন্তু আপনি তো প্রতিজ্ঞা করে এসেছেন আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারবেন।”

অপরূপার কানদুটো মুহূর্তেই রক্তিম হয়ে উঠল। তবে মুখে যথাসম্ভব গম্ভীরতা বজায় রেখেই বলল,

“আপনি খুব বেশি কথা বলেন, আগে তো এমন ছিলেন না।”

আভিয়ান ফের বাঁকা হাসল। জবাব দিল,

“আগে তো আপনার হাসবেন্ড ছিলাম না। এখন হয়েছি, নতুন নতুন কত কী রূপ দেখবেন।”

“ফ্লার্ট করছেন?”

“ওয়াও, ইয়্যু আর রাইট মিসেস আভিয়ান। বুঝতেই যখন পেরেছেন তবে ফ্ল্যার্ট ব্যাক করে উপকৃত করুন।”

আভিয়ানের এহেন কথায় অজান্তেই হেসে উঠল অপরূপা। ক্ষীণ সেই হাসির রেখা। বুকে হাত বেঁধে জবাব দিল সে,

“আ’ম নট ইন্টারেস্টেড, মিস্টার আভিয়ান।”

“ওহ মাই প্রিটি ওয়াইফি, আপনার মুখে আমার নামটা মধুর মতো শোনায়। ওয়ান্স এগেইন, প্লিজ।”

এ পর্যায়ে নিজের হাসিটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না অপরূপা। হাত চেপে অন্যদিকে ফিরে তাকাল সে। হাসিটা আঁটকে ফের তাকাল আভিয়ানের দিকে। বলে উঠল,

“হয়েছে আপনার?”

“হতে আর দিলেন কই?”

আভিয়ানের গাঢ় দৃষ্টি। অপরূপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জবাব দিল,

“পিহুর খিদে পেয়েছে। খাওয়াতে হবে।”

আভিয়ান নিজেও অসহায় শ্বাস ফেলল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গলা পরিষ্কার করল সে। চোখেমুখের দুষ্টুমি কিছুটা সরিয়ে এনে কণ্ঠে গাম্ভীর্য মিশিয়ে বলল,

“কাল থেকে অফিস যাবেন। তাও আমার সাথে।”

অপরূপা কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীর স্বরে বলল,

“ঠিক আছে।”

আভিয়ানের চোখে সন্তুষ্টির আভা ফুটে উঠল। তবে পরক্ষণেই সে আবার বলল,

“আর শুনুন।”

“হুম?”

“অফিসে গিয়ে ওই অভ্র ফব্রর সাথে একদম কথা বলবেন না।”

আভিয়ানের কথায় প্রথমত চোখ মুখ কুঁচকে নিল অপরূপা। তবে পরক্ষণেই আভিয়ানকে অস্বস্তিতে ফেলতে ইচ্ছে জাগল তার। ঠোঁট টিপে হাসল সে। প্রশ্ন ছুড়ল,

“জেলাস আপনি?”

সে ভেবেছিল আভিয়ান হয়তো অস্বীকার করবে। কিন্তু তাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে দিয়ে আভিয়ান বিন্দুমাত্র সংকোচ না করে বলল,

“অবশ্যই।”

অপরূপা বিস্মিত। হতভম্ব প্রায়। সেসবে গুরুত্ব দিল না আভিয়ান। বরং ভ্রু উঁচিয়ে শুধালো,

“কী হলো? ওভাবে তাকাচ্ছেন কেন? ওভাবে তাকাবেন না, বুকের ভেতর দামামা বাজে।”

অপরূপার কানে সেসব গেল কিনা সন্দেহ। সে মূলত আভিয়ানের স্পষ্ট শিকারক্তিতেই আঁটকে আছে। দ্বিধা কাটাতে সে ফের শুধালো,

“আপনি জেলাস?

“হ্যাঁ অবশ্যই, আমি প্রচুর জেলাস।”

কথাগুলো সে এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, যেন এতে লুকানোর কিছু নেই। পরপর যোগ করল,

“আপনি বউ আমার। কথা তো দূর, অন্য কেউ আপনার দিকে তাকাবে এটা ভাবলেই বুকে ব্যথা হয় আমার।”

বলেই নিজের বুকের বাম পাশে আঙুল ছুঁইয়ে দেখাল আভিয়ান। উচ্চারণ করল,

“ঠিক এখানটায়।”

অপরূপা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ফিক করে হেসে উঠল সে। হাসতে হাসতেই প্রশ্ন ছুড়ল,

“নাটক করছেন?”

আভিয়ান তৎক্ষনাৎ জবাব দিল,

“একদম না। শুনুন স্নো হোয়াইট, অফিসে গিয়ে অভ্রর সঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলবেন না।”

আভিয়ানের চোখ মুখ গম্ভীর। বাচ্চা বাচ্চা ঠেকছে তার কথা বার্তা। অপরূপা বেশ আনন্দই পাচ্ছে। তাই তাকে জ্বালাতে বলে উঠল,

“আর যদি বলি?”

“আপনার মুখ যত বেশি চলবে, আমার ঠোঁটও তত বেশি চলবে। এখন সিদ্ধান্ত আপনার।”

“নির্লজ্জ।”

চোখ মুখ কুঁচকে আওড়াল অপরূপা। আভিয়ান হাসল। গভীর স্বরে বলে উঠল,

“শুধু আপনার জন্য।”

“সরুন, যেতে দিন এবার।”

আভিয়ান দু’দিকে মাথা দুলাল। বলে উঠল,

“আগে বলুন আমি যা বলেছি তা শুনবেন। অভ্রর সাথে কোনো কথা বলবেন না প্রয়োজন ছাড়া। মনে থাকবে?”

অপরূপা হাসল। জবাব দিল,

“ঠিক আছে।”

“দ্যাটস মাই কুইন।”

অপরূপা আবারও হেসে উঠল। সকালের রৌদ্র এসে তার হাসিমাখা মুখে পড়ছে। দৃশ্যটা দেখে আভিয়ানের বুকের ভেতর কেমন এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। সে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীর স্বরে বলল,

“এভাবেই হাসবেন, আপনার হাসিটা নেশার চাইতেও বেশি নেশালো।”

অপরূপার হাসিটা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এল। দুজনের চোখ কয়েক মুহূর্তের জন্য একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে আটকে রইল। মন গহীনে ভেসে বেরাল অদৃশ্য এক অনুভূতি । শেষমেশ আভিয়ান নিজেই নীরবতা ভাঙল। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দিল নিজের অর্ধাঙ্গিনীর পানে। বলল,

“চলুন, নিচে চলুন।”

অপরূপা আভিয়ানের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটার দিকে তাকিয়ে রইল বেশ খানিকক্ষণ। নিজের ভেতরের অকারণ দ্বিধাটাকে সরিয়ে রেখে সে নিজেও নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল আভিয়ানের হাতের দিকে। তার কোমল হাত এসে থামল আভিয়ানের মুঠোয়। আভিয়ানের চোখে সঙ্গে সঙ্গেই এক শান্ত, পরিতৃপ্ত হাসি ফুটে উঠল। আর কিছু বলা হলো না। কোনো প্রতিশ্রুতিও নয়। কেবল নিঃশব্দ পদচারণায়। প্রত্যেকটি সম্পর্কের গভীরতা তৈরি হয় সময়ের সাথে সাথে। কেবল প্রয়োজন পরে সূচনায় বিশ্বস্ত এক জোড়া হাত। যা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থেকে যাবে অপর পাশে থাকা ব্যক্তিটিকে জড়িয়ে। ভালোবাসার সূত্র তো এটাই।

______

#চলবে