Home "ধারাবাহিক গল্প ঝরা শিউলির দিনে ঝরা শিউলির দিনে পর্ব-৪৯

ঝরা শিউলির দিনে পর্ব-৪৯

0
490

#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ৪৯
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা

_______________________

সকলের মতো সুন্দর একটা পরিবার ছিল আভিয়ানেরও। ছোট থেকে সে শান্ত প্রকৃতির হলেও তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি ছিল তার পরিবার। অথচ অল্প বয়সেই সব হারাতে হয়েছে তাকে। তার বাবা মারা যায় যখন তার বয়স পাঁচ। তার বাবা আব্রাহাম এহসান ছিলেন একজন লেফটেন্যান্ট। ব্যবসার দিকে তার মন টানেনি বলেই সেখানে যোগ দেন। আর সেখানেই কোনো এক মিশনে গিয়ে তার মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে আভিয়ানের মা প্রহেলিকা শিকদার আর ইরফান আভিয়ান ও তার ছোট বোন আর্শিকে বড় করেন। তবে সুখ তার ভাগ্যে ছিল না একদমই। তার বয়স যখন সাত ঠিক তখনই ঘটে ক ভয়াবহ ঘটনা। রোজকার মত সাধারণ একটি রাতই ছিল। ইরফান এহসান সে রাতে ছিলেন কুমিল্লা। আর তারা ছিল সিলেট। আব্রাহাম এহসানের চাচাতো ভাইয়ের বহু বছর ধরেই নজর ছিল প্রহেলিকা শিকদারের উপর। আর সুযোগের ফয়দাটাই তিনি লুটলেন। আভিয়ান আর আর্শিকে সবেই ঘুমের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন প্রহেলিকা। মুহূর্তের মাঝেই ঘরে ঢুকে আসে একে এক চারজন মুখোশধারী লোক। ছোট্ট আভিয়ানের হাত পা বেঁধে ফেলে রাখে নিচে। আর তারই সামনে তার পাঁচ বছরের ছোট বোন ও মাকে চার চারজন মিলে বিভৎস ভাবে ধর্ষণ করে। সে রাতে আভিয়ানের চিৎকার কেউ শোনেনি। তার ছোট্ট বোনটা বারবার বাইয়া বাইয়া বলে ডাকছিল, সে কিচ্ছুটি করতে পারেনি। নিজের চোখের সামনেই সব নিঃশেষ হতে দেখেছিল ছোট্ট শিশুটি। তখনও সে জানত না কারা এরা। এক সময় পর আভিয়ান একদম চুপ হয়ে যায়। চুপ হয়ে যায় তার বোন, তার মা। পরপর গোটা রাত ভোগ করার পর পেট্রল ঢেলে জ্বালিয়ে দেয় ঘরটা। সেদিন প্রহেলিকা শিকদার নিজের পরোয়া না করে আভিয়ানকে রুম থেকে বের করে দিয়েছিলেন। কারণ সে জানে তার ছেলে তাকে ছেড়ে বের হবে না। ততক্ষণে ছোট্ট আর্শি যে আর নেই সেটাও বুঝে গিয়েছিলেন প্রহেলিকা। নিজেকে আর বাঁচিয়ে রাখার শক্তি হয়নি। সেদিন আভিয়ান বেঁচে গিয়েছিল ঠিকই তবে মরে গিয়েছিল তার ভেতরের শিশু সত্তা। তার সমস্ত শান্তি, সত্তা পুড়ে গিয়েছিল সেই আগুনে। সেই ট্রমা থেকে আভিয়ানের বের হতে সময় লেগেছিল বছর পাঁচেক। যদিও বা পরবর্তীতে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ইরফান এহসানের টাকা আর ক্ষমতা ছিল বলেই বিচারটাও হয়েছিল। ফাসি হয়েছিল চারজনেরই। তারপর কাটল আরো কয়েকটা বছর। আভিয়ানের বয়স যখন পনেরো তখন তার মাঝে হাইপার ডিজঅর্ডারের লক্ষ্মণ দেখা দেয়। যা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি পর্যায়ে। এর কারণে ছোট ছোট বিষয়েই সে উত্তেজিত হয়ে উঠত এবং নোসব্লিডিং শুরু হতো। সেই সময় ফুয়াদ, জাওভান, নিদ্রা ছিল বলেই রিকোভারি দ্রুত করতে পেরেছে। যদিও বা অপারেশন করতে বলা হয়েছিল যা আভিয়ান রাজি হয় নি। পরপর কেটে যায় কয়েকটা বছর। সময় আসে ২০১৪। আভিয়ান তখন উচ্চমাধ্যমিক দেবে। ঠিক সেই সময়েই টাঙাইল আসে সে আর ইরফান এহসান নতুন সেক্টর করার জন্য জমি দেখতে। তারা ফুয়াদদের গ্রামের বাড়িতেই উঠেছিল কয়েকদিনের জন্য। তারপর… তারপরই তো দেখা হয় তার অপ্সরার সাথে। দেখা হয়েছিল এক ঝরা শিউলির দিনে।

_____

মেঘমুক্ত, স্নিগ্ধ এক সকাল। গ্রামের মেঠোপথ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা মস্ত বড় শিউলি গাছটার নিচে সাদা আর কমলার চাদর বিছানো। ভোরের শিশিরে ভেজা সেই শিউলি ফুলগুলো পরম আহ্লাদে কুড়োচ্ছে এক অষ্টাদশী কন্যা।। তার সাথে গ্রামের আরও গুটিকয়েক ছোট ছোট বাচ্চা হুল্লোড় করে মেতে উঠেছে ফুল কুড়ানোর প্রতিযোগিতায়। অপরূপার পরনে সাধারণ একটা সুতির সালোয়ার-কামিজ, চুলগুলো খোঁপা করা। সে হাসছে, আর সেই হাসির শব্দে চারপাশের প্রকৃতি আরও সতেজ হয়ে উঠছে।

এমন সময় মেঠোপথ ধরে অলস পায়ে হেঁটে আসছে দু-জন তরুণ। আভিয়ান আর তার ফুয়াদ। শহরের কোলাহল ছেড়ে ফুয়াদের গ্রামের খামারবাড়িটা পরিদর্শনে এসেছিল আভিয়ান। পরনে তার সাধারণ টি-শার্ট আর জিন্স, কাঁধে ঝুলছে একটা ডিএসএলআর ক্যামেরা। হাঁটতে হাঁটতে হুট করেই আভিয়ানের চোখ আটকে গেল সেই শিউলি তলায়।

ঝরা শিউলির মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা চঞ্চলা তরুণীকে দেখে আভিয়ানের পায়ের গতি স্তব্ধ হয়ে গেল মুহূর্তেই। সকালের কাঁচা রোদ এসে পড়েছে মেয়েটির স্নিগ্ধ মুখে। কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোনো জাঁকজমক নেই। তবুও কী ভীষণ এক মায়া জড়িয়ে আছে তার সর্বাঙ্গে! আভিয়ান মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষন। পরপর কিছু না ভেবেই ক্যামেরা হাতে তুলে নিল সে। অনুমতি ছাড়াই তুলে নিল ছবি। যা তরুণী খেয়ালও করল না। তাদের মাঝে কোনো কথা হলো না, এমনকি অপরূপা খেয়ালও করল না যে দূর থেকে কেউ একজন তার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে। সে আপন মনে বাচ্চাদের সাথে হেসে কুটিপাটি হয়ে ফুল কুড়াচ্ছে। কাজ শেষ হতেই সে চলে গেল। মেয়েটি দৃষ্টিসীমানার বাইরে চলে যেতেই আভিয়ান ফুয়াদের কাঁধ ঝাঁকিয়ে ব্যাকুল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“ফুয়াদ! ওই মেয়েটা কে?”

ফুয়াদ সেদিকে তাকিয়ে মাথা চুলকে বলল,

“আরে, একে তো আগে কখনো দেখিনি এ গ্রামে। চেনার কথা না। হয়তো দূর কোনো আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে এসেছে।”

আভিয়ানের মনটা কেমন যেন দমে গেল। ফুয়াদ তার কাঁধে হাত রেখে পরিস্থিতি হালকা করতে বলল,

“বাদ দে তো। শোনো, আজ বিকেলে আমাদের স্কুল মাঠে একটা মেলা আছে। যাবি নাকি?”

আভিয়ান ক্যামেরার স্ক্রিনের দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“আচ্ছা, ঠিক আছে। যাওয়া যাবে।”

আভিয়ান শেষ বারের মতো রাস্তাটার দিকে তাকাল। পরপর হাঁটা ধরল সে নিজের পথে। ফুয়াদও অধির আগ্রহ নিয়ে তাকে ঘোরাতে লাগল তার খামার। জানাতে লাগল বড় হয়ে সে কী কী করতে চায়।

___

বিকেলের মেলা প্রাঙ্গণ তখন লোকারণ্য। চারদিকে মাটির পুতুল, কাঁচের চুড়ি আর পাঁপড় ভাজার সুবাস। কিছু সময় আগেই সে আর ফুয়াদ মেলায় এসেছে। আভিয়ান ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে মেলার নান্দনিক সব ছবি তুলছে আপনমনে। গ্রামীণ ঐতিহ্যের ফ্রেম বন্দি করার নেশায় সে যখন ক্লিক করছে, ঠিক তখনই অলক্ষ্যে, অজান্তেই তার ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হয়ে গেল এক অপার্থিব দৃশ্য। ল্যান্সের ওপারে সেই সকালের মেয়েটি! তবে এখন তার রূপ আরও শতগুণ বিকশিত হয়েছে। সেই তরণী সেজেছে বাঙালি নারীর চিরন্তন সাজে। পরনে তার শিউলি ফুলের ছাপার একটা সাদা-কমলা শাড়ি। খোঁপা করা চুলে আর ডান হাতের কব্জিতে জড়ানো তাজা শিউলি ফুলের মালা। মেলার ভিড়ে সে একাই এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে।হয়তো খুঁজছে কাউকে।

আভিয়ান ক্যামেরা নামিয়ে সরাসরি চোখের দেখায় তাকে দেখতে চাইল। আর ঠিক তখনই, ভিড়ের একটা ধাক্কায় তরণী এসে আছড়ে পড়ল আভিয়ানের চওড়া বক্ষপটে। হাতের কাঁচের চুড়িগুলো ঝনঝন করে শব্দ করে উঠল। মেয়েটি অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি করে দু-পা পিছিয়ে গেল। লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে বলল,

“আই অ্যাম সরি! আসলে ভিড়ের চাপে…”

কথাটা শেষ না করেই সে চোখ তুলে তাকাল। আর তাকানো মাত্রই সে থমকে গেল। তার চেনা চাক্ষুষ জগতের বাইরে এই প্রথম সে কোনো পুরুষের এমন মায়াবী, গভীর সবুজ চোখ দেখল। সেই সবুজ আঁখিজোড়ার অতলান্তে এক অদ্ভুত সম্মোহন ছিল, যা অপরূপাকে স্তব্ধ করে দিল কয়েক মুহূর্তের জন্য।
আভিয়ানও নিজের চেতনা হারিয়ে ফেলেছে। তবে সে সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইল না। হুট করেই, বড্ড অবাধ্যভাবে জিজ্ঞেস করে বসল,

“আপনার নাম?”

মেয়েটা স্পষ্টই কিছুটা থতমত খেয়ে গেল। অচেনা এক যুবকের এমন সরাসরি প্রশ্নে সে থমকাল। তারপর এক পলক তাকিয়ে স্পষ্ট স্বরে জবাব দিল,

“অপরূপা।”

এটুকু বলেই সে আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না, দ্রুত ভিড়ের মাঝে হারিয়ে গেল। আর সেদিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকে আভিয়ান নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে উঠল,

“অপ্সরা!”

____

আভিয়ানের গেমিং রুমে দাঁড়িয়ে আছে অপরূপা। একটি দেওয়ালে বড় করে অপরূপার দুটো ছবি টাঙানো। একটি মেলার সেই শাড়ি পরা ছবি। আরেকটি শিউলি ফুল গাছের তলায় ফুল কুড়ানোর ছবি। সে আশ্চর্য, হতভম্ব প্রায়। অতীত থেকে এক ঝটকায় বর্তমানে ফিরে এলো অপরূপা। তার চোখের কোণে বিস্ময়। একই সাথে মুগ্ধতার মিশ্রণ। সে তীব্র অবাক হয়ে আভিয়ানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“এটাই… এটাই তবে আমাদের প্রথম দেখা ছিল? আপনি এই… এই ছবি এত বছর ধরে আগলে রেখেছেন?”

আভিয়ান আলতো করে মাথা দুলাল। তার অভিব্যক্তি নির্লিপ্ত। সে অপরূপার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,

“হুম। আপনাকে আমি তারপর ওই গ্রামে, শহরের আনাচে-কানাচে বহু খুঁজেছি অপ্সরা, কিন্তু কোথাও পাইনি। হুট করে ওই একটা দিনের জন্য আমার জীবনে এলেন, আর এক নিমেষে মেঘের মতো মিলিয়ে গেলেন। মাঝে মাঝে রাতে একা একা যখন এই ছবিগুলো দেখতাম, আমার নিজেরই সন্দেহ হতো। ভাবতাম, আপনি বোধহয় আমার কোনো রঙিন ভ্রম ছিলেন। তবুও, এক অদ্ভুত কারণে আপনাকে ভুলতে পারিনি। চোখ বন্ধ করলেই শিউলি ফুলের সেই সুবাস আর আপনার ওই স্নিগ্ধ মুখটা ভেসে উঠত আমার চোখের সামনে।”

অপরূপা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এতক্ষণে তার স্মৃতির অবরুদ্ধ দুয়ার খুলে গেল। সব মনে পড়ছে তার। সে মৃদু হেসে বলল,

“আমি তো তখন আমার কলেজের বান্ধবীর সাথে ওদের নানুবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। মাত্র দুদিনের জন্য। তখন তো আমরাও এইচএসসি পরীক্ষার্থী। বলতে গেলে ওটা ওর সাথেও শেষ দেখা ছিল। কারণ আমরা ওই শহর ছেড়ে অন্য শহরে অর্থাৎ নিজেদের বাড়ি ফিরে গিয়েছিলাম। ভাইয়া তখন বিদেশ গেল, তাই নিজের বাড়িতেই নিরাপদ মনে হয়েছিল আমাদের। আর তারপর ওখানকার কারো সাথে তো যোগাযোগও ছিল না।”

আভিয়ান এবার অপরূপার একদম কাছে সরে এলো। পেছন থেকে তার দুই বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরল অপরূপার কোমর, মুখটা রাখল তার ঘাড়ের কাছে। ফিসফিসিয়ে বলল,

“সত্যি বলছি, আমি কতটা পাগলের মতো খুঁজেছি আপনাকে তা শুধু আমি আর ফুয়াদ জানি। মাঝে মাঝে যখন কোনো খোঁজ পেতাম না, ফুয়াদকে বলতাম মেয়েটা বোধহয় কোনো মানুষই না, বনের কোনো পরী হবে। শিউলি তলায় রূপ নিয়ে এসেছিল, কাজ শেষে আবার আকাশে উড়ে গেছে। তাই তো কোনো খোঁজ পাচ্ছি না।”

অপরূপা তার বাহুডোরের মাঝেই আলতো করে ঘুরে দাঁড়াল। এখন তারা মুখোমুখি। অপরূপা আভিয়ানের শার্টের কলারটা হাত দিয়ে ঠিক করতে করতে কৌতুকী সুরে শুধালো,

“আচ্ছা মশাই, একটা কথা বলুন তো? মাত্র ওই কয়েক মিনিটের প্রথম দেখায় কেউ এভাবে মন দিয়ে বসে থাকে? এতো বড্ড অবাস্তব!”

আভিয়ান অপরূপার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। দুজনের নিশ্বাস এক হয়ে যাচ্ছে। সে গভীর স্বরে বলল,

“বাকিদের কথা জানি না অপ্সরা, তবে এই আভিয়ান এহসান মন দিয়েই বসেছিল। কিছু কিছু মানুষের স্পর্শ বা উপস্থিতি আত্মার সাথে জড়িয়ে যায়। প্রথম দেখাতেই আমার আত্মা চিনে নিয়েছিল যে, এই নারীই আমার জীবনের পূর্ণতা।”

অপরূপা মুগ্ধ আঁখিতে তাকিয়ে রইল তার এই ব্যক্তিগত উন্মাদ পুরুষটির দিকে। তার চোখ দুটো মায়ার জলে চিকচিক করে উঠল। সে ধীর স্বরে বলল,

“আপনার আফসোস হয়না এই ভেবে যে আপনি আমাকে আগে কেন খুঁজে পেলেন না?”

“সত্যি বলব? আফসোস অবশ্যই হয়, তবে তা নিজের প্রতি। আমি ব্যর্থ বলেই তো খুঁজে পাইনি। বিশ্বাস করুন আমি যদি আপনাকে আগেই খুঁজে পেতাম আমি কখনোই কোনো বিপদ ধারে কাছে ঘেঁষতে দিতাম না আপনার। তবে ওপরওয়ালা এমনটাই চেয়েছিল বোধ-হয়। সব শেষে দেখা তো হলো। গন্তব্য নিজেই আমার আঙিনায় এসে দাঁড়াল।”

আভিয়ান নিজের ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে অপরূপার চোখের কোণে জড়ো হওয়া জলটুকু মুছে দিল। তারপর তার ওষ্ঠাধরে এক চিলতে পবিত্র চুমু এঁকে দিয়ে বলল,

“কষ্টের দিনগুলো তো অতীত, অপ্সরা। আজ আপনি আমার বাহুডোরে, আমার ঘরে, আমার অর্ধাঙ্গিনী হয়ে আছেন এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় জয়। অতীতের সেই ঝরা শিউলির দিনের অপ্সরা আজ সত্যি সত্যি আমার জীবনের রানী।”

অপরূপা আর কোনো কথা বলল না। সে নিজের মাথাটা আভিয়ানের চওড়া বক্ষপটে সঁপে দিল।

“আপনি সত্যিই এক আশ্চর্য পুরুষ, আভিয়ান! প্রায় বারোটি বছর! এত গুলো বছর ধরে কেউ একটা অচেনা মেয়ের ছবি এভাবে বুকে আগলে রাখে? তাও মাত্র কয়েক মিনিটের দেখার ওপর ভিত্তি করে?”

আভিয়ান অপরূপার কোমরে নিজের হাতের বাঁধনটা আর একটু শক্ত করল। তার ঠোঁটে জড়িয়ে রইল এক চিলতে হাসি।

“অচেনা কে বলল, অপ্সরা? চোখের দেখায় আপনি হয়তো অচেনা ছিলেন, কিন্তু আমার মনের ভেতর যে আলোড়ন আপনি ওই একটা দিনেই তুলে দিয়ে গিয়েছিলেন, তা তো আর অচেনা ছিল না। শিউলি ফুল কুড়ানোর সময় আপনার ওই নিখাদ, খিলখিলিয়ে ওঠা হাসি! ওখানেই তো এই আভিয়ান এহসান নিজের মনটা চিরতরে হারিয়ে ফেলেছিল।”

অপরূপা লজ্জায় একটু হেসে মাথা নিচু করে নিল। শাড়ির আঁচলটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে বলল,

“আর মেলা প্রাঙ্গণের ওই ধাক্কা লাগার মুহূর্তটা? আমি তো তখন ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম কোনো উশৃঙ্খল ছেলের গায়ে বুঝি ধাক্কা খেলাম। কিন্তু চোখ তুলে যখন আপনার ওই সবুজ চোখ দুটো দেখলাম…”

“তখন কী মনে হয়েছিল?”

আভিয়ান কৌতুকী সুরে চোখ টিপে শুধাল।

“মনে হয়েছিল, এই চোখে কোনো হিংস্রতা নেই, বরং আছে এক সমুদ্র শান্তি। তবে আপনি বড্ড অবাধ্য ছিলেন তখন! একটা অপরিচিত মেয়েকে কেউ হুট করে ওভাবে নাম জিজ্ঞেস করে?”

“উপায় ছিল না, মাই ডিয়ার প্রিটি ওয়াইফি। ওই মেলা থেকে একবার যদি আপনি হারিয়ে যান, তবে আপনাকে আর কোনোদিন খুঁজে পাব না এটা আমি জানতাম। তাই নামটা অন্তত জেনে রাখতে চেয়েছিলাম। যদিও লাভ খুব একটা হয়নি। ফুয়াদকে যখন বললাম যে মেয়ের নাম অপরূপা, ও তো হেসে উড়িয়ে দিল। বলল, এই নামে ওই গ্রামে বা আসেপাশের দশ গ্রামে কোনো মেয়েই নেই। তখন নিজেকে কতটা অসহায় লাগছিল, তা আপনি বুঝবেন না।”

অপরূপা আলতো করে আভিয়ানের বুকে আঘাত করল। বলল,

“থাক, আর অত আদিখ্যেতা করতে হবে না। যাইহোক, তাহলে ফুয়াদ আপনাকে পরীর গল্প শুনিয়ে সান্ত্বনা দিত?”

“হ্যাঁ! ও বলত আমি নির্ঘাত দিনের আলোয় কোনো অপ্সরা বা পরী দেখেছি। ওসব মন থেকে মুছে ফেলতে বলত। চেষ্টা তো করেছি বহুবার। কিন্তু আমি তো আর মুছতে পারিনি। প্রতি শরতে যখনই শিউলি ফুল ফুটত, আমার কেবল ওই সাদা-কমলা শাড়ি পরা শিউলির মালা জড়ানো মেয়েটার কথাই মনে পড়ত। মনে হতো, আপনি বুঝি আবার কোনো শিউলি তলায় এসে দাঁড়িয়েছেন। এই বুঝি আবার আমাদের দেখা হবে কোনো এক ঝরা শিউলির দিনে।”

অপরূপার চোখ দুটো ছলছল করছে। সে আভিয়ানের শার্টের কলারটা শক্ত করে চেপে ধরে তার বুকের আরও কাছে এগিয়ে এলো।

“আমি সত্যিই ভাগ্যবতী, আভিয়ান। অথচ শুরুতে আপনাকে কত ভুল বুঝেছি, কত এড়িয়ে চলেছি। কতবার আপনার এই নিখাদ ভালোবাসাটাকে আমি অহংকার বলে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছি। আপনি কি তখন আমার ওপর রেগে যেতেন না?”

আভিয়ান অপরূপার চিবুকটা নিজের আঙুলের ডগায় তুলে ধরল। তার চোখের গভীর সবুজ মণি দুটোতে কেবলই ভালোবাসার তীব্রতা।

“রাগ? আপনার ওপর রাগ করার অধিকার কি এই আভিয়ানের আছে, অপ্সরা? আমি শুধু ভয় পেতাম। ভয় পেতাম এই ভেবে যে, এত বছর পর যখন ভাগ্য আপনাকে আমার এত কাছে এনে দাঁড় করাল, তখন যদি আমি আবার আপনাকে হারিয়ে ফেলি! আপনাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য আমার ভেতরের ওই উন্মাদনা, ওই ছটফটানি সবই ছিল আপনাকে হারানোর ভয় থেকে।”

হঠাৎ করেই বুক ভারী হলো রমণীর। মলিন হলো মুখশ্রী। অশ্রুসিক্ত নয়নজোড়া চটজলদি মুছে নিয়ে আওড়াল,

“আপনি কেন আমার সূচনা হলেন না?”

আভিয়ানের বুকটাও ভারি হলো বোধহয়। তবে প্রকাশ করল না। বরং হাসল। অপরূপাকে জড়িয়ে নিল নিজের মাঝে। আওড়াল,

“আমি তো সূচনাতেই ছিলাম, কেবল অপ্রোয়জনীয় অধ্যায় হিসেবে।”

“আপনার আফসোস হয় না পিহু কেন আপনার সন্তান হলো না?”

আভিয়ান হাসল। জবাব দিল,

“ও তো আমারই।”

অপরূপার আজ নিজেকে খুব করে সুখী মনে হচ্ছে। সে খুব করে উপলব্ধি করতে পারল একটা বিষয়। আর তা হলো আভিয়ান যদি তার সূচনা হতো তবো উপসংহারে হয়তো তার অস্তিত্ব থাকত না। সৃষ্টিকর্তা যা করেন নিশ্চয় ভালোর জন্যই করেন। হুট করেই সে আভিয়ানের চোখে চোখ রাখল। শুধালো,

“ভালোবাসেন?”

“হ্যাঁ বললে খুশি হবেন?”

“সত্যি বললে।”

“আপনাকে হারানোর ভয় পাই আমি, আপনার মস্তিষ্ক অন্য কারো ভাবনাটাও মেনে নিতে পারিনা আমি। অন্য কারো দৃষ্টিও না। আপনার ভালো খারাপ, অতীত বর্তমান সবটা নিজের করে নিতে ইচ্ছে করে। এটা কি ভালোবাসা? যদি হয়ে থাকে তবে… তবে আভিয়ান এহসান আপনাকে ভালোবাসে।”

হেসে উঠল অপরূপা। আভিয়ানের কাঁধে নিজের মাথাটা সঁপে দিল। ঘরের মৃদু আলোয় দুজনের ছায়া দেওয়ালে একাকার হয়ে মিশে গেল। কিছুক্ষণ কোনো কথা হলো না। নীরবতাই তাদের এতগুলো বছরের সমস্ত অপেক্ষার, সমস্ত বিরহের গল্পটা এক নিমেষে চুকিয়ে দিচ্ছে। আভিয়ান অপরূপার ভেজা চুলে নিজের ওষ্ঠাধর ছোঁয়ালো। পরম এক তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিসফিসিয়ে বলল,

“আজ আমার সব অপেক্ষার অবসান হলো, অপ্সরা। ঝরা শিউলির দিনে দেখা সেই চঞ্চলা মেয়েটি আজ সত্যিই আমার অর্ধাঙ্গিনী।”

অপরূপা স্পষ্ট শুনছে আভিয়ানের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি। হাসলো সে। মনে মনে বিড়বিড় করে আওড়াল,

“আর এই পাগল লোকটাই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অনাকাঙ্ক্ষিত সুন্দর পূর্ণতা।”

_____

কেটেছে দীর্ঘ ছয়টি মাস। নতুন বছরের আজ ষোলোতম দিন। এই ছয় মাসে অনেক কিছুই বদলে গেছে। ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানোর সাথে সাথে তাদের জীবনটা এক নতুন, স্বস্তির সমীকরণে থিতু হয়েছে। পিহুকে ভর্তি করা হয়েছে শহরের এক নামী স্কুলে। প্রগতিশীল এই নতুন অধ্যায়ে তার পরিচয় এখন আর শুধুই ‘অর্নিশা পিহু’ নয়, বরং সে এখন আইনী খাতায় ‘অর্নিশা এহসান পিহু’। আর তার বাবার নামের পাশে স্পষ্ট অক্ষরে খোদাই করা আভিয়ান এহসান। হ্যাঁ, তার জন্মপরিচার পত্রে আজ কোনো কালির দাগ নেই, সেখানে এক চরম অধিকারবোধের সত্য লেখা।
আজ অপরূপা এবং আভিয়ান এসেছে জজ কোর্টে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, মা আর ভাইয়ের খুনিদের আজ চূড়ান্ত শাস্তি হয়েছে। আসামী তিনজনই ভারত পালিয়ে যাওয়ার মতলব করে ছিল। আর ধরাটাও এখানেই খায় তারা।

আদালত রায় ঘোষণা করেছে অনেকক্ষণ। কিন্তু কাঠগড়ার সেই রায় অপরূপার ভেতরের জ্বলতে থাকা আগুনটাকে পুরোপুরি নেভাতে পারেনি। সে তো নিজের চোখের সামনে ওদের মৃত্যুদণ্ড চেয়েছিল, অথচ আইনী মারপ্যাঁচে সৈকত আর তার সঙ্গিদের শাস্তি হয়েছে মাত্র চোদ্দ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। লুপা এসেছিল আজ তার দুই ছেলেকে নিয়ে। মান অভিমানের পালা শেষে স্বাভাবিকই ছিল সে।

বর্তমানে আভিয়ান আর অপরূপা দুজনেই কোর্ট চত্বরের খোলা প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশের উকিল আর সাধারণ মানুষের গুঞ্জন অপরূপার কানে পৌঁছাচ্ছে না। তার চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে জজ কোর্টের প্রধান ফটকের দিকে। সে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সৈকতের বের হওয়ার। চোদ্দ বছরের জেল হলেও, আজ সে এই নরপশুটোকে এক নজর সামনাসামনি দেখতে চায়। ঠিক এমন সময় ভারী বুটের শব্দ আর চাবির ঝনঝনাতিতে চারপাশটা সজাগ হয়ে উঠল। কড়া পুলিশি পাহারায় মাঝখানে হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় সৈকতকে নিয়ে বের হয়ে এলো পুলিশ দল। ছয় মাস আগের সেই দাম্ভিক, উদ্ধত সৈকতের সাথে এই লোকটার দূরদূরান্তেও কোনো মিল নেই। চোখের কোণে কালচে দাগ, গাল দুটো ভেতরের দিকে দেবে গেছে, গায়ের চামড়া শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। একসময়ের বিলাসী রূপটা ধুলোয় মিশে এখন কেবল এক অপরাধীর কঙ্কালসার অবয়ব অবশিষ্ট রয়েছে। সৈকতকে দেখামাত্রই অপরূপার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আভিয়ানের দিকে তাকাল। তার চোখের সেই জ্বলন্ত চাউনি দেখেই আভিয়ান বুঝে নিল তার ভেতরের উথাল-পাথাল ঝড়টা।
অপরূপা নিচু কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল,

“ওনার সাথে আমার কিছু কথা আছে, আভিয়ান।”

আভিয়ান এক পলক অপরূপার দিকে তাকিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। চোখের ইশারায় তাকে অনুমতি দিল এগিয়ে যাওয়ার। পুলিশরা সৈকতকে নিয়ে ঠিক এই পথটা ধরেই প্রিজন ভ্যানের দিকে এগোচ্ছিল। মুখোমুখি হতেই অপরূপা সোজা গিয়ে তাদের পথ আগলে দাঁড়াল। তার এই আকস্মিক পদক্ষেপে কনস্টেবলরা থমকে গেল। অপরূপা সামনে থাকা প্রধান পুলিশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল,

“আমার এই লোকটার সাথে একটা পুরনো হিসাব-নিকাশ বাকি আছে, অফিসার। একটু বুঝে নিতে পারি?”

অফিসার প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করলেন। তিনি পাশ ফিরে কোর্ট চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব আভিয়ান এহসানের দিকে তাকালেন। আভিয়ান দূর থেকেই পকেটে হাত রেখে অফিসারকে সামান্য ইশারায় সম্মতি জানাল। আভিয়ানের সেই এক ইশারার ওজন বুঝতে অফিসারের বাকি রইল না। তিনি কনস্টেবলদের একটু পিছু হটার নির্দেশ দিয়ে বললেন,

“ঠিক আছে, কথা বলুন। তবে দ্রুত।”

পুলিশের থমকে যাওয়ায় সৈকত এতক্ষণে ধীর পায়ে নিজের চোখ দুটো ওপরে তুলল। এত চেনা, অথচ আজ কত অচেনা এক নারী তার সামনে দাঁড়িয়ে! অপরূপার ঠোঁটের কোণে তখন এক অদ্ভুত, বিষাক্ত আর তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠেছে। সে সৈকতের সেই জীর্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে প্রায় ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“ভালো আছো, সৈকত?”

সৈকত চরম অবাক হলো। এই পরিস্থিতিতে অপরূপার মুখে এমন স্বাভাবিক প্রশ্ন সে আশা করেনি। সে আমতা আমতা করে, শুকনো জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে কোনোমতে বলল,

“হ্যাঁ… তুমি?”

‘তুমি’ শব্দটা সৈকতের মুখ থেকে পুরোপুরি বের হওয়ার সুযোগ পেল না। তার আগেই একটা তীব্র, সপাটে চড় এসে আছড়ে পড়ল সৈকতের বাম গালে। থাপ্পড়ের সেই সশব্দ আওয়াজে কোর্ট চত্বরের বাতাসও এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। সৈকতের মুখটা একপাশে ঘুরে গেল, আর পরমুহূর্তেই অপরূপা তীব্র ঘৃণায় সৈকতের মুখের ওপর থুথু ছুঁড়ে মারল। সৈকত গালে হাত দেওয়ার সুযোগটুকুও পেল না হাতকড়ার কারণে। সে এক ঝটকায় মাথা সোজা করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“অপরূপা! এই প্রকাশ্য আদালতে দাঁড়িয়ে তুমি আমার গায়ে হাত তুললে? এই তোমার শিক্ষা?”

“শিক্ষা?”

অপরূপা এক কদম এগিয়ে এসে তীব্র উপহাসের সুরে বলল,

“শিক্ষা তো তুই আমায় দিয়েছিস সৈকত! নিজের সাজানো সংসার ভেঙে, লোভের তাড়নায় আমার মা আর ভাইকে যারা খুন করতে পারে, তাদের আবার কিসের শিক্ষা? তুই ভেবেছিলি তুই পার পেয়ে যাবি? ভেবেছিলি অপরূপা চিরকাল তোর ওই পায়ের তলার দাসী হয়ে মুখ বুজে কাঁদবে?”

সৈকতের মুখশ্রী রক্তিম। সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,

“চোদ্দ বছরের জেল হয়েছে আমার, অপরূপা। চোদ্দ বছর পর যখন আমি এই কারাগার থেকে বের হবো, তখনো আমার বয়স শেষ হয়ে যাবে না। আমি ঠিকই আমার সাম্রাজ্য ফিরে পাবো।”

“সাম্রাজ্য?”

অপরূপা এবার খিলখিল করে হেসে উঠল, তবে সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, আছে তীব্র বিষ। সৈকতের আত্মবিশ্বাস দেখে তার হাসিই পেল। আওড়াল,

“তোর সেই নোংরা সাম্রাজ্যের ধুলোবালিও এখন আর অবশিষ্ট নেই। তুই আজ এক অন্ধকার নরকে যাচ্ছিস, আর আমি? আমি আজ মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখেছি। তুই আমার ভালো থাকা কেড়ে নিতে চেয়েছিলি না? চেয়েছিলি তো আমি পথে পথে ভিখারিণীর মতো ঘুরে বেড়াই? কিন্তু দেখ, আজ দিন শেষে পুড়ছে টা কে? কে আজ লোহার শিকের পেছনে কুকুরের মতো জীবন কাটাবে?”

সৈকত মাথা নিচু করে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু অপরূপা তাকে সেই সুযোগ দিল না। সে আচমকা নিজের শক্ত নখ দিয়ে সৈকতের থুতনি আর গাল চেপে ধরল। তার চোখ দুটো দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই আগুন ঝরছে। সৈকতের মুখের একদম কাছাকাছি নিজের মুখটা নিয়ে এসে হিসহিসিয়ে বলল,

“চোদ্দ বছরের জেল তাই না? তারপর? তুই ভেবেছিস চোদ্দ বছর পর তুই স্বাধীন বাতাসে শ্বাস নিবি? ভুল ভাবছিস। তুই মরবি, আমার হাতেই মরবি! এই অপরূপার ভেতরের আগুন তোকে ছাই বানাবে। তুই যেদিন এই কারাগারের ফটক পেরিয়ে বাইরে পা রাখবি, ঠিক সেদিনই তোর এই পাপিষ্ঠ লাশের ওপর আমার পা পড়বে। মনে রাখিস, এটা আমার প্রথম এবং শেষ অভিশাপ তোকে! তুই জেলের ভেতরেও প্রতিটা দিন মৃত্যুর ভয়ে কাঁপবি।”

সৈকত এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। অপমানে, ক্ষোভে আর এই চরম প্রকাশ্য লাঞ্ছনায় সে অগ্নিচোখে অপরূপার দিকে তাকাল। পশুর মতো চিৎকার করে গর্জে উঠে বলল,

“অপু! মুখ সামলে কথা বলো! এত বুলি? হবেই তো, নষ্টা মেয়ে যে তুই। বড়লোক বান্দার সাথে ফষ্টিনষ্টি…”

পুরো বাক্য শেষ হতে দিল না অপরূপা। আবারো চড় বসিয়ে দিল সৈকতের গালে।

“মুখ সামলে, নষ্টামি কাকে বলছিস হ্যাঁ?”

এতক্ষণ দূর থেকে লক্ষ্য করা আভিয়ান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সৈকতের একদম সামনে দাঁড়াল। তার গম্ভীর, বরফশীতল কণ্ঠস্বর শুনে সৈকতের ভেতরের সমস্ত আস্ফালন এক পলকে দমে গেল। আভিয়ান অপরূপার কাঁধে এক হাত রেখে সৈকতকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“অপরূপা হাওলাদার এখন আর আপনার দেওয়া ‘ডিভোর্সী’ পরিচয়ে বাঁচে না। তিনি আমার স্ত্রী, আভিয়ান এহসানের অর্ধাঙ্গিনী উনি। আর আমার স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার বা তার দিকে চোখ তুলে তাকানোর শাস্তি কী হতে পারে, সেটা হয়তো আপনার ওই চোদ্দ বছরের জেলের ভেতর খুব ভালো করেই টের পাবেন।”

পরিস্থিতি বেগতিক এবং পুরোপুরি হাতছাড়া হওয়ার আগেই পুলিশ অফিসার তৎপর হয়ে উঠলেন। তিনি কনস্টেবলদের কড়া গলায় নির্দেশ দিলেন,

“নিয়ে যাও একে! জলদি প্রিজন ভ্যানে তোলো!”

কনস্টেবলরা ক্ষ্যাপাটে, অসহায় সৈকতকে জোর করে টেনে-হিঁচড়ে সামনের দিকে নিয়ে চলে গেল। সৈকত যেতে যেতেও ঘাড় ঘুরিয়ে চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু সেই আওয়াজ মুহূর্তেই পুলিশের সাইরেনের শব্দে মিলিয়ে গেল। অপরূপা দীর্ঘ এক নিশ্বাস ফেলে নিজের হাতটা ঝেড়ে ফেলল, যেন কোনো এক নোংরা আবর্জনা স্পর্শ করেছিল সে। অতঃপর আভিয়ানের বুকের ওমে নিজেকে সঁপে দিল। আভিয়ান তাকে বুকের মাঝে টেনে নিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ধীর, শান্ত স্বরে বলল,

“শান্ত হোন, অপরূপা। শান্ত হোন। সব শেষ… সব অন্যায়ের হিসাব আজ চুকে গেছে।”

​অপরূপা আভিয়ানের শার্টের বুকটা খামচে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার কান্না থামতেই চাইছে না। বহু দিনের জমানো কষ্ট, মা আর ভাইকে হারানোর ক্ষত, আর এই নরপশুটার দেওয়া দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণা সব কিছু আজ চোখের জল হয়ে ধুয়ে মুছে যাচ্ছে।

​”ওদের মাত্র চোদ্দ বছরের জেল হলো কেন, আভিয়ান?”

অপরূপা কান্নায় ভেজা গলায়, বুকভাঙা আকুতি নিয়ে বলল। যোগ করল ,

“ওরা আমার এত বড় ক্ষতি করল, আমার সাজানো দুনিয়াটা ছারখার করে দিল, অথচ ওরা বেঁচে থাকবে? চোদ্দ বছর পর ও আবার আলো দেখবে? আমি এটা মানতে পারছি না, আভিয়ান। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে!”

​আভিয়ান অপরূপার কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ালো। সে অপরূপার চোখের জল পরম যত্নে নিজের হাত মুছে দিল। বলল,

​”চোদ্দ বছর সময়টা বড্ড দীর্ঘ, অপ্সরা। আর জেলের ভেতরের জীবনটা কেমন হয়, তা ওই বিলাসী সৈকত কল্পনাও করতে পারবে না। প্রতিটা দিন, প্রতিটা সেকেন্ড ও নরকযন্ত্রণা ভোগ করবে। আর তাছাড়া, ও বাইরে বের হওয়ার পর কী হবে, তা তো আপনি নিজেই ওকে বলে এসেছেন, তাই না? আমার বাঘিনী তো আজ নিজের মুখে ওর ডেথ ওয়ারেন্ট সাইন করে দিয়ে এসেছে। তাহলে আর ভয় কিসের, হুম? আজ থেকে ওই অধ্যায়টা আমাদের জীবনে চিরতরে বন্ধ। এখন শুধু আমাদের সামনে তাকানোর পালা।”

​অপরূপা আভিয়ানের চোখের দিকে তাকাল। সবুজ চোখ দুটোতে আজ কোনো সংশয় নেই, আছে এক আকাশ সমান নিরাপত্তা। সে নিজের চোখের জল মুছে এক গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,

“আপনি না থাকলে আমি আজ হয়তো ভেঙে চুড়ে গুঁড়িয়ে হয়ে যেতাম, আভিয়ান।”

​”আমি তো আপনার ছায়া, স্নো হোয়াইট।

আভিয়ান আলতো হেসে তার গালে হাত রাখল। বলল,

“ছায়া কি কখনো কায়াকে ছেড়ে দূরে যায়? এবার একটু হাসুন। আমাদের লিটেল কিটেনের স্কুল ছুটির সময় হয়ে গেছে। আনতে হবে না তাকে? কান্না থামান, আমার অপ্সরা।”

​আভিয়ানের কথায় অপরূপার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল ম্মিত গাসি। সে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। আভিয়ান অপরূপাকে নিয়ে গাড়িতে বসল। স্টার্ট দিল গাড়ি। ঠিক আধঘণ্টা পর, আভিয়ান আর অপরূপা এসে দাঁড়াল পিহুর স্কুলের গেটের সামনে। ঠিক তখনই ছুটির ঘণ্টা পড়ল। ঝাঁকে ঝাঁকে ছোট ছোট বাচ্চারা কিচিরমিচির করতে করতে স্কুল গেট দিয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল।
​তাদের মাঝেই পিঠে একটা মস্ত বড় গোলাপি রঙের কার্টুন ব্যাগ ঝুলিয়ে, দুই দিকে দুটো ঝুঁটি নেড়ে চঞ্চল পায়ে বেরিয়ে এলো পিহু। গেটের বাইরে পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আভিয়ানকে দেখামাত্রই তার চোখ দুটো চকচক করে উঠল।

​”পাপ্পাাা!”

এক মস্ত বড় চিৎকার দিয়ে পিহু সব বাচ্চাদের পাশ কাটিয়ে এক ছুটে চলে এলো আভিয়ানের কাছে। আভিয়ান হাসিমুখে নিচু হয়ে দুই হাত বাড়িয়ে দিল। পিহু এসে সরাসরি তার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আভিয়ান তাকে এক ঝটকায় শূন্যে তুলে নিজের শক্ত বুকে জড়িয়ে নিল।

​”আস্তে, সোনা।”

আভিয়ান হেসে কুটি কুটি হয়ে পিহুর গালে একটা জোর চুমু খেল। বলল,

“তা, ক্লাস কেমন কাটল আমার লিটেল কিটেনের?”

​পিহু আভিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে ঠোঁট উল্টে বলল,

“আজকে তো আমি ক্লাসে ফার্স্ট বেঞ্চে বসেছিলাম।”

“তারপর?”

পিহু থামল। তাকে ভাবুক দেখাল। একটু থেমে বলল,

“একটা দুষ্টু ছেল বারবার আমার পেন নিয়ে নেয়। আমি ওকে বলেছি তুমি এসে ওকে বকে দেবে।”

​ আভিয়ান পিহুর নাকটা টেনে দিল। হেসে বলল,

“হ্যাঁ, বকে দেব তো। আমিও দেখি কার এত সাহস যে আমার মেয়ের পেন নিয়ে নেয়।”

পিহু সন্তুষ্ট ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। বলল,

“কাল বকে দেবে, ঠিক আছে?”

“আমার মা যা বলবে তা-ই।”

আভিয়ানের জবাব ভ্রু কুঁচকে নিল পিহু। আভিয়ানের দু গালে হাত রেখে বলে উঠল,

“আমি পিহু।”

আভিয়ান চুমু খেল পিহুর গালে। জবাব দিল,

“আমার মা-ও।”

খিলখিল করে হেসে উঠল পিহু। দূর থেকে দাঁড়িয়ে এই বাবা মেয়ের খুনসুটি, আর তাদের ভেতরের এই নিখাদ, পবিত্র ভালোবাসার রসায়ন দেখে যাচ্ছে অপরূপা। অদ্ভুত মুগ্ধতায় ভরে উঠেছে তার হৃদয়। যে পিহু একদিন বাবার আদরের জন্য তৃষ্ণার্ত ছিল, আজ সে আভিয়ানের বুকে কতটা নিরাপদ, কতটা অহংকারী! আভিয়ান ওকে শুধু নিজের নাম দেয়নি, দিয়েছে একটা রাজকন্যার মতো জীবন। অপরূপা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার জীবনের এই শ্রেষ্ঠ উপহার দুটির দিকে। আভিয়ান পিহুকে একহাতে কোলে রেখে অন্য হাতটি বাড়িয়ে দিল অপরূপার দিকে। তার চোখে এক আকাশ সমান ভালোবাসা, যা সমস্ত অতীতকে এক পলকে মুছে দিতে সক্ষম। আভিয়ান নরম চোখে তাকাল।গভীর স্বরে বলল,

“যাওয়া যাক, ম্যাডাম?”

​অপরূপা এক মুহূর্তের জন্য থমকাল। তারপর তার নিজের ভেতরের সমস্ত বিষাদ, সমস্ত অন্ধকার অতীত এক ঝটকায় ঝেড়ে ফেলল নিজের থেকেই। আজ সে স্বাধীন, আজ সে সম্পূর্ণ। সে এক গাল মায়াবী হাসি ছড়িয়ে নিজের নরম হাতটি সঁপে দিল আভিয়ানের চওড়া, উষ্ণ হাতের তালুর ওপর। আভিয়ানের চোখে চোখ রেখে অপরূপা ফিসফিসিয়ে শুধাল,

“কতদূর?”

​আভিয়ান অপরূপার হাতটা পরম নির্ভরতায় নিজের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। অতঃপর ওষ্ঠের কোণে এক চিলতে মুগ্ধময় হাসি ফুটিয়ে জবাব দিল,

​”শেষ গন্তব্য পর্যন্ত, আমার অপ্সরা।”

“শেষ গন্তব্যটা কোথায়?”

অপরূপার সাধাসিধা প্রশ্ন বটে। তবে আভিয়ানের জবাবের অর্থটা গভীর। ছোট্ট অথচ ভারী,

“কবর।”

________

#চলবে