Home "ধারাবাহিক গল্প ঝরা শিউলির দিনে ঝরা শিউলির দিনে পর্ব-৪৮

ঝরা শিউলির দিনে পর্ব-৪৮

0
645

#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ৪৮
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা

_______________________

হাসপাতালের কেবিনজুড়ে ছড়িয়ে আছে জীবাণুনাশকের তীক্ষ্ণ ঝাঁঝালো গন্ধ। হাসপাতাল যেন অস্বস্তিকর তেমন একই সঙ্গে জীবনের প্রতি মানুষের অসহায় নির্ভরতা এবং মৃত্যুভয়ের শীতল উপস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। চারপাশ জুড়ে নিরাবেগ শুভ্রতা, শুভ্র প্রাচীর। শুভ্র আলোকরশ্মি। শুভ্র চাদরে মোড়া এক অনুচ্চারিত বিষণ্ন রাত। সমস্ত রঙ, সমস্ত উষ্ণতা, সমস্ত প্রাণচাঞ্চল্য এই কক্ষের বাইরে কোথাও নির্বাসিত হয়েছে। বিছানার উপর নিথর হয়ে শুয়ে আছে অপরূপা। তার ডান হাতে স্থাপিত ক্যানোলার সঙ্গে সংযুক্ত স্বচ্ছ নল বেয়ে ধীরে ধীরে শরীরে প্রবেশ করছে জীবনরক্ষাকারী তরল। মুখমণ্ডল বিবর্ণ।ঠোঁটের রক্তিম আভা বিলীন। চোখের পাতাদুটি নিবিড়ভাবে বন্ধ। দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে পরাজিত কোনো সৈনিক সাময়িক আশ্রয় নিয়েছে নিদ্রার গভীর গহ্বরে। তবে তার শিয়রের কাছে বসে থাকা মানুষটির অবস্থাও খুব বেশি সুস্থির নয়। চেয়ারের উপর বসে আছে আভিয়ান।
এক হাতে শক্ত করে আঁকড়ে রেখেছে অপরূপার শীতল হাতখানি। অপর হাতটি নিস্তেজ হয়ে ঝুলে আছে। মাথা নত। কপাল ঠেকানো সেই মুঠোবন্দী হাতের গায়ে। চোখের নিচে স্পষ্ট অনিদ্রার কালচে ছাপ। এলোমেলো চুল। অবসন্ন মুখাবয়ব। তবুও তার আঙুলের চাপটুকু এক মুহূর্তের জন্যও শিথিল হয়নি। মনে হচ্ছে, হাতটি ছেড়ে দিলেই বুঝি মানুষটিও তার জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে। এমন সময় অপরূপার চোখের পাতা কাঁপল। অতি সূক্ষ্ম এক কম্পন। ধীরে ধীরে ফিরে আসতে লাগল চেতনা। প্রথমে সবকিছু অস্পষ্ট। কয়েক মুহূর্ত পর ঝাপসা আবরণ সরতে শুরু করল। দৃষ্টি ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হয়ে উঠল তার। মাথা সামান্য ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই সে থমকে গেল আভিয়ান দেখে। নতমুখে বসে আছে ছেলেটা। এক হাতে তার হাত ধরে রেখেছে এমনভাবে, যেন সেটিই তার বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। অপরূপা দীর্ঘক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার বক্ষগহ্বরের গভীরে ধীরে ধীরে জন্ম নিতে লাগল এক অজ্ঞাত অনুভূতি। এমন এক অনুভূতি, যার ভাষা নেই, সংজ্ঞা নেই;কেবল আছে স্পন্দন। সে নিজের মুক্ত হাতটি তুলল।
অত্যন্ত স্নিগ্ধ স্পর্শে রেখে দিল আভিয়ানের মাথার উপর।
স্পর্শমাত্রই আভিয়ান চমকে উঠল। প্রায় তড়িঘড়ি করে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসল। তার চোখে প্রথমে অবিশ্বাসের ঝলক, তারপর দেখা মিলল স্বস্তি। সে দ্রুত ঝুঁকে এলো।

“অপ্সরা?”

অপরূপা মৃদু চোখ মেলে তাকাল। জবাব দিল,

“হুম।”

“আপনি ঠিক আছেন? মাথা ঘুরছে? খারাপ লাগছে?ডাক্তার ডাকব?”

প্রশ্নগুলো একের পর এক ছুটে এলো তার কণ্ঠ থেকে।
প্রতিটি শব্দে উৎকণ্ঠা। প্রতিটি উচ্চারণে অস্থিরতা।
অপরূপার ঠোঁটের কোণে মৃদু এক হাসি ফুটে উঠল।
সে ধীরে মাথা নাড়ল।

“আমি ঠিক আছি।”

কিন্তু আভিয়ান সহজে বিশ্বাস করতে পারল না। কয়েক মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। অপরূপা ধীরে ধীরে উঠে বসার চেষ্টা করল। আভিয়ান সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এলো।

“ধীরে।”

সে উঠে বসল ঠিকই। কিন্তু পরক্ষণেই ক্যানোলার দিকে হাত বাড়াতেই আভিয়ানের ভ্রু কুঁচকে গেল।

“আপনি কী করছেন?”

অপরূপা কোনো উত্তর দিল না। নির্বিকার ভঙ্গিতে ক্যানোলাটা খুলে ফেলল।

“অপরূপা!”

এবার আভিয়ানের কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি। দুশ্চিন্তার মিশ্র প্রতিধ্বনি বেরিয়ে এলে তার কণ্ঠনালি চিড়ে,

“এসব কী করছেন?”

অপরূপা কোনো উত্তর দিল না। কেবল এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার পানে। তার চাউনিতে দীর্ঘ, অবিচল স্তব্ধতা। অতঃপর আচমকাই সমস্ত দূরত্ব ঘুচিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে এলো রমণী। আভিয়ান কিছু বুঝে ওঠার, কিংবা নিজের মনকে প্রস্তুত করার বিন্দুমাত্র অবকাশ পাওয়ার আগেই অপরূপা তাকে জড়িয়ে ধরল নিঃশব্দে। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া, কোনো বাক্য ছাড়া। কেবল দুটি বাহুর নিবিড় বন্ধনেই লেখা হলো অলিখিত, মৌন স্বীকারোক্তি। স্তব্ধ হয়ে গেল আভিয়ান। মনে হলো, মহাকালের চাকা বুঝি হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়েছে এই ঘরের চৌকাঠে। বুকের ভেতর শ্বাস আটকে এলো তার, হৃদস্পন্দন ভারী থেকে ভারী হয়ে আছড়ে পড়তে লাগল পাঁজরে। কয়েক দীর্ঘ মুহূর্ত সে সম্পূর্ণ স্থির হয়েই রইল। পরক্ষণেই বুঁজে এলো তার চোখের পাতা। নিজের বলিষ্ঠ বাহুদ্বয় তুলে সে সঁপে দিল অপরূপার পৃষ্ঠদেশে, পরম এক আশ্বাসে মেলালো আলিঙ্গন। কণ্ঠস্বর অদ্ভুতভাবে ভেঙে এলো তার।

​”খুব ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন আমাকে।”

অপরূপার চোখ ভিজে উঠল। সে কিছু বলল না। মাথাটা আরও একটু নামিয়ে পরম নিশ্চিন্তে সঁপে দিল আভিয়ানের চওড়া কাঁধের ভাঁজে। দীর্ঘক্ষণ সেই নিরাপদ আশ্রয়ে নিরুত্তর, শান্ত হয়ে রইল রমণী। পরমুহূর্তেই মাথা তুলে সে তাকাল তার উন্মাদ পুরুষটির পানে। কী ভীষণ এলোমেলো, পরিশ্রান্ত তার অবয়ব! শরীরের ঊর্ধ্বাংশের শার্ট ব্যতীত বার্তি পোশাক গুলো এখন আর শরীরে নেই। সেই শার্টেরও উপরিভাগের তিনটি বোতাম উন্মুক্ত। যার ভেতর থেকে স্পষ্ট দৃশ্যমান তার পুরুষালী বক্ষপট। অপরূপা তার সুকোমল হাতটি আলতো করে স্থাপন করল আভিয়ানের বুকের বাম পাশে। চোখে চোখ রেখে অধর কাঁপিয়ে ধীর স্বরে আওড়াল,

​”আপনি জিতে গিয়েছেন, আভিয়ান।”

আভিয়ান বুঝল না অপরূপার কথার মানে। অবুঝ নয়নে তাকিয়ে রইল সে। মলিন মুখে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল অপরূপার। বিড়বিড় করে আওড়াল,

“বলেছিলেন না বাস্তবতার কাছে জিতে দেখাবেন? জিতে গেছেন আপনি, জিতে গেছেন।”

আভিয়ান তবুও বুঝল না। হঠাৎ তার স্নো হোয়াইট এসব কেন বলছে? আভিয়ান উতলা হলো। অস্থির হয়ে শুধালো,

“কী হয়েছে স্নো হোয়াইট? খারাপ লাগছে আপনার?”

“সম্পূর্ণ ঠিক আছে আপনার অপ্সরা।”

আভিয়ান শান্ত হলো। কিছুসময় চুপ থেকে জবাব দিল,

“যেদিন আপনাকে কবুল করে নিজের সাথে বেঁধেছি ,জিত তো আমার সেদিনই লেখা হয়ে গিয়েছিল।”

অপরূপা জবাব দিল না। নিজের নরম কোমল হাত দুটোর বাঁধনে ফেলল আভিয়ানের গাল। টেনে আনল নিজের কাছে। অতঃপর উতলা উন্মাদ পুরুষটিকে বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে পৌঁছে দিল রমণী। আঁকড়ে ধরল তার অধর জোড়া। একহাত নিয়ে রাখল আভিয়ানের চুলের ভাজে। অপর হাত আপনা আপনি চলে এলো আভিয়ানের শার্টের বোতামে। আভিয়ান আশ্চর্য! তার মনে হচ্ছে সে ঘোরে আছে। কিন্তু না, কিচ্ছুটি তার ঘোর নয়। বরং সত্যি। অপরূপার নরম, কোমল হাতের অবাধ্য স্পর্শে আভিয়ানের সমস্ত চেতনা এক লহমায় অবশ হয়ে গেল। এই আকস্মিক আত্মসমর্পণ, এই তীব্র সম্মোহন তার চেনা জগতের কোনো ব্যাকরণের সঙ্গেই মিলছে না। তার সুপ্ত পৌরুষের সমস্ত উত্তাল তাকে এক নিমেষে গ্রাস করে নিল এক অনাস্বাদিত স্পর্শ। ওষ্ঠাধরের নিবিড় সংযোগে কোনো শব্দ নেই, আছে কেবল দুটি তৃষ্ণার্ত আত্মার অলিখিত এক চুক্তি। অধরজোড়ার সেই উষ্ণ, আর্দ্র আলিঙ্গন অবাধ্য এক তৃষ্ণার মতো ক্রমশ গাঢ় থেকে গাঢ়তর হতে লাগল, যেখানে প্রতিটি চুম্বনেই মিশে আছে এক তীব্র আকুলতা। আভিয়ানের আঙুলগুলো অপরূপার রেশমি কেশের অরণ্যে পথ হারাল, তার মনে হলো সময়ের চাকা থমকে দাঁড়িয়েছে তার কাছে। প্রতিটি শ্বাসে, প্রতি পলকে জড়িয়ে যাচ্ছে এক অদ্ভুত আরষ্টতা আর আকাঙ্ক্ষার মিশ্রণ। শার্টের বোতামের শিথিলতায় কেবল সুতোর বাঁধন আলগা হচ্ছে না, বরং আলগা হয়ে যাচ্ছে এতদিনের পুষে রাখা সমস্ত দ্বিধা, জড়তার দেয়াল। আভিয়ানের শক্তপোক্ত হাত দুটোও আর স্থির থাকতে পারল না। পরম এক অধিকারে তা জড়িয়ে নিল অপরূপার কটিদেশ, টেনে নিল নিজের বুকের একদম কাছাকাছি। দুটি হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি একই সুরে, একই তালে তাল মেলাচ্ছে। আভিয়ান থামল। উত্তাল শ্বাস-প্রশ্বাসের অবাধ্য অস্থিরতা বুকে নিয়েই ফিসফিসিয়ে আওড়াল,

“আমরা হসপিটালে আছি, স্নো হোয়াইট।”

“জানি আমি।”

অপরূপার স্পষ্ট জবাব। আভিয়ান শুকানো ঢোকে গলা ভেজাল। বুকটা কাঁপছে ক্রমাগত। পরপর উচ্চারণ করল,

“ভেবে বলছেন তো?”

“হ্যাঁ।”

“মিথ্যা আশ্বাস দিতে চাই না আপনাকে, আর না আমি আপনাকে আঘাত করতে চাই । কিন্তু সেটাই করে ফেলছি।”

অপরূপার বুকের ভেতরটাও তীব্র এক আলোড়নে চঞ্চল। নিজের ঠোঁটের রক্তকণা মুছে নিল সে। শুষ্ক কণ্ঠনালীতে কোনোমতে একবিন্দু ঢোক গিলে সে তৃষ্ণার্ত ব্যাকুলতায় আবারও টেনে নিল তার একান্ত, ব্যক্তিগত পুরুষটিকে। আভিয়ান কম্পিত হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করল দেয়ালের সুইচবোর্ড। অবরুদ্ধ কণ্ঠে উচ্চারণ করল এক অমোঘ ঘোষণা,

“আজ আমি বড্ড উন্মাদ হবো, অপ্সরা।”

অনুমতি মেলার আগেই অপরূপা আঁধার নামিয়ে আনার ব্যাকুলতায় নিজেই নিভিয়ে দিল ঘরের আলোটুকু। অন্ধকারের গাঢ় চাদরটা চারপাশ আঁকড়ে ধরতেই সে নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে নিল আভিয়ানের বলিষ্ঠ, চেনা শরীরটা। নিবিড় আলিঙ্গনে ঠোঁটদুটো কাঁপিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“ভালোবেসে মৃত্যু দিন, সেটাও কবুল।”

আকাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি পেয়ে গেল আভিয়ান। সমস্ত সংশয় আর দ্বিধার অবসান ঘটিয়ে আর কোনো বাক্য বিনিময় করল না সে। নিজের মনের ভেতর পুষে রাখা সুপ্ত অস্থিরতা আর অনিয়ন্ত্রিত উন্মাদনার দাবানলে পুড়িয়ে দিল রমণীর প্রতিটি অনুভূতির পরত। স্পর্শে, অনুরাগে এতটুকুও কৃপণতা রইল না তার। স্থান, কাল আর জাগতিক সমস্ত নিয়মের দেয়াল ভেঙে তারা দুজন হারিয়ে গেল একে অপরের অতলান্ত মায়ায়।

​আভিয়ান তার বলিষ্ঠ বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিল তার আজন্ম কাঙ্ক্ষিত অপ্সরাকে। এতদিনের সঞ্চিত সমস্ত সংযম, সমস্ত দ্বিধা এক লহমায় কর্পূরের মতো উড়ে গেল। তার হাতের স্পর্শে আদিম চপলতা, গভীর অনুরাগে অপরূপার প্রতিটি শিরা-উপশিরায় এক তীব্র বিদ্যুতিন তরঙ্গের সৃষ্টি করছে। স্থান-কাল-পাত্রের সীমানা পেরিয়ে তারা এখন এক অন্য ভুবনের বাসিন্দা, যেখানে কেবলই অনুভূতির রাজত্ব। অপরূপার মরিয়া আকুলতা আভিয়ানের উন্মাদনাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। তার ওষ্ঠাধরের উষ্ণতা অপরূপার গ্রীবা আর কপোল ছুঁয়ে গেল। মুহঋর্তেই চারপাশের বাতাসও সেই উত্তাপে ভারী হয়ে উঠল বুঝি। অন্ধকার রাতে একে অপরের নিশ্বাসের শব্দটুকু সাক্ষী রেখে, সমস্ত অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতাকে দূরে ঠেলে, তারা লীন হয়ে গেল এক অনন্ত, অবিভাজ্য মায়াজালে।

উষ্ণ নিশ্বাসের স্তব্ধতায় রক্তিম হয়ে ওঠা এই রাত, ধমনীতে ধমনীতে বয়ে চলা বিদ্যুৎপ্রবাহ কোনো এক প্রলয়ঙ্করের ইঙ্গিত দিল আজ। চন্দ্রালোকিত আকাশও এই যুগলবন্দীর ব্যাকুলতার সামনে নিজের দীপ্তি গুটিয়ে নিতে বাধ্য হলো। নিবিড় থেকে নিবিড়তর হওয়া সেই স্পর্শের গভীরতায়, আঁধারের চাদরে ঢাকা পড়ে গেল জাগতিক সমস্ত নিয়মকানুন। ওষ্ঠের ছোঁয়া গাল বেয়ে নেমে এলো কন্ঠনালীতে, পুরো শরীর জুড়ে। কাঁপন ধরিয়ে দিল সুপ্ত কামনায়। দুটি দেহ আর দুটি ভিন্ন অস্তিত্ব তখন লীন হয়ে গেছে এক অখণ্ড, অবিভাজ্য উন্মাদনায়। এই আঁধারেই একে অপরের ভালবাসায়, উন্মাদনায় মত্ত হলো দুটো দেহ, দুটো আত্মা। অথচ সবটাই কেমন অনাকাঙ্ক্ষিত!

_____

এক গুচ্ছ তীক্ষ্ণ আলোকরশ্মি জানালার পর্দা ভেদ করে সরাসরি চোখে-মুখে এসে লাগতেই পিটপিট করে চোখ খুলল অপরূপা। ঘুম থেকে উঠেই সে চারপাশটা ভালো করে দেখার চেষ্টা করল। মাথাটা ভীষণ ভার হয়ে আছে, এক মস্ত বড় পাথরের বোঝা চেপে বসেছে সেখানে। সে কোনোমতে ভর দিয়ে বিছানায় উঠে বসল। চারদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, সে বর্তমানে নিজের বাড়িতে, নিজের চেনা ঘরেই শুয়ে আছে। ভোরের দিকেই হসপিটাল থেকে আভিয়ান তাকে বাড়িতে নিয়ে এসেছে। এখানে এসে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ার পর যে গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল সে, এতক্ষণে সেই ঘুম ভাঙল।

বিছানার পাশে থাকা দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অপরূপার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। দুপুর প্রায় বারোটা বাজে! অলসতা ভেঙে নড়েচড়ে বসতেই টের পেল, তার পুরো শরীরটায় এক অদ্ভুত ব্যথায় জড়িয়ে আছে। নিজের দিকে তাকাতেই তার খেয়াল হলো, পরনে তার নিজের কোনো পোশাক নেই, বরং সে গলিয়ে রেখেছে আভিয়ানের একটা ঢোলা কালো টি-শার্ট আর ট্রাউজার। কাপড়ের সুবাসে আভিয়ানের সেই চেনা পুরুষালী ঘ্রাণ মিশে আছে। সে আশেপাশে তাকিয়ে ব্যাকুল চোখে পিহুকে খোঁজার চেষ্টা করল। কিন্তু পুরো ঘর ফাঁকা, পিহু নেই।

ঠিক তখনই দরজার লক খোলার মৃদু শব্দ হলো। দেখা মিলল আভিয়ানের। আভিয়ান ধীর পায়ে ঘরে প্রবেশ করল। দরজার দিকে তাকাতেই আভিয়ানের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল অপরূপার। সাথে সাথেই গত রাতের সমস্ত উম্মাদনা আর স্পর্শের স্মৃতি তড়িৎ বেগে মনের কোণে ভেসে উঠল। তীব্র এক লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে চট করে নিজের মাথাটা নত করে নিল রমণী। অপরূপার এই আকস্মিক লজ্জাবনত রূপ দেখে আভিয়ানের ওষ্ঠাধরে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে অপরূপার একদম মুখোমুখি বিছানার প্রান্তে বসল। তার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“শরীর কি বেশি খারাপ লাগছে, স্নো হোয়াইট?”

অপরূপা মুখে কোনো কথা না ফুটিয়েই দুদিকে মাথা দুলিয়ে আলতো করে ‘না’ সূচক ইশারা করল। আভিয়ান এবার আরও প্রগাঢ় দৃষ্টিতে তাকাল অপরূপার মুখাবয়বের দিকে। তার রক্তিম হয়ে থাকা ওষ্ঠপুট, গালের নরম ত্বক আর গলার লতিতে জেগে থাকা গাঢ় দাগগুলো স্পষ্ট দৃশ্যমান। যার প্রতিটিই গত রাতে আভিয়ানের অবাধ্য ভালোবাসার সাক্ষ্য দিচ্ছে। নিজের এই উন্মাদনার চিহ্নগুলো দেখে আভিয়ানের কণ্ঠে এক রাশ অপরাধবোধ দানা বাঁধল। সে ধীর স্বরে বলল,

“আই অ্যাম সরি।”

অপরূপা তার এই আকস্মিক ক্ষমা প্রার্থনার মানে বুঝতে না পেরে বিভ্রান্ত চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কেন?”

আভিয়ান তার কান ঘেঁষে ফিসফিস করে বলল,

“আসলে কাল রাতে একটু বেশি বেশিই হয়ে গিয়েছিল আরকি। অনুভূতির রাশ টানতে পারিনি। সরি, আর কখনো ওমন জোর খাটাব না আপনার ওপর।”

আভিয়ানের মুখে এমন খোলামেলা স্বীকারোক্তি শুনে অপরূপা লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে হলো। সে নিজের আড়ষ্টতা লুকাতে ধড়ফড় করে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল। বলে উঠল,

“আমি… আমি ফ্রেশ হবো।”

বলেই অপরূপা কোনোদিকে না তাকিয়ে এক প্রকার দৌড়ে গিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। ভেতর থেকে দরজা আটকে দিল শব্দ করে। ওয়াশরুমের ঠাণ্ডা জলের ধারায় এক লম্বা শাওয়ার নিয়ে যখন সে বের হলো, ততক্ষণে তার ভেতরের জড়তা কিছুটা কেটেছে। ঘরে পা রাখতেই সে দেখল আভিয়ান ইতোমধ্যে ট্রে ভর্তি করে তার পছন্দের সব দুপুরের খাবার নিয়ে ঘরের টেবিলে সাজিয়ে রেখেছে। অপরূপা এখন নিজেকে জড়িয়েছে এক জমকালো হলুদ রঙের সুতি শাড়িতে। ভেজা চুলের অবাধ্য গোছা পিঠে লেপ্টে আছে। হলদে আভায় তাকে মারাত্মক, অপার্থিব সুন্দর লাগছে। অপরূপাকে ঘরে প্রবেশ করতে দেখেই আভিয়ান গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

“আসুন, চুপচাপ বসে খেয়ে নিন।”

অপরূপা কোনো অবাধ্যতা করল না। একদম লক্ষ্মী ও বাধ্য মেয়ের মতো সোফায় গিয়ে বসল। তবে তার মনের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে পিহুর কথা। সে কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,

“পিহু কোথায় বলুন তো? ওকে তো দেখছি না।”

আভিয়ান নিজ হাতে অপরূপাকে ভাতের লোকমা মুখে তুলে দিতে দিতে শান্ত গলায় জবাব দিল,

“পিহু এরিনার সাথে বাইরে বেরিয়েছে। ওকে নিয়ে আপনার ভাবতে হবে না।”

বলেই সে পরম যত্নে নিজের খাবার তুলে অপরূপার ঠোঁটের কাছে ধরল। আভিয়ানের আকস্মিক যত্ন আর ভালোবাসার প্রকাশ দেখে অপরূপার ঠোঁটের কোণে দেখা মিলল এক চিলতে তৃপ্তির হাসি। সে মুখ বাড়িয়ে খাবারটা গ্রহণ করল। খাওয়া শেষ হতেই আভিয়ান আচমকা অপরূপার কপালে নিজের হাতের উল্টো পিঠ ছোঁয়াল। হাতের স্পর্শে টের পেল রমণীর শরীরটা বেশ গরম, মৃদু জ্বর এসেছে। সে তড়িঘড়ি করে উঠে গিয়ে ডেস্কের ড্রয়ার থেকে ওষুধের পাতা আর জলের গ্লাস এনে অপরূপার সামনে রাখল। আদেশের স্বরে আওড়াল,

“মেডিসিনটা নিয়ে এবার চুপচাপ বিছানায় গিয়ে রেস্ট নিন।”

বাক্য শেষ করেই অপরূপার ললাটে অধর ছোঁয়াল আভিয়ান। অপরূপা ওষুধটা হাতে নিয়ে মুখ কুঁচকে বলল,

“আমি একদম ঠিক আছি। সামান্য ক্লান্ত, কোনো ওষুধ লাগবে না।”

আভিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল,

“আপনি ঠিক আছেন কি-না তা আমি ভালো করেই দেখছি। ওষুধটা খান।”

অপরূপা ওষুধ না খেয়ে উল্টো সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল,

“আপনি বড্ড বেশি চিন্তা করছেন আমাকে নিয়ে। আচ্ছা, ওষুধ আমি পরে খাব। তার আগে আমার কিছু বিশেষ কথা জানার আছে।”

আভিয়ান নিজের হাত দুটো বুকের ওপর ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কী জানার আছে শুনি?”

অপরূপা এক পা এগিয়ে এসে সরাসরি আভিয়ানের চোখে চোখ রেখে ধীর অথচ কৌতূহলী স্বরে শুধালো,

“আমাদের প্রথম দেখা কবে, কখন আর ঠিক কোথায় হয়েছিল?”

অপরূপার এই আকস্মিক প্রশ্নে আভিয়ানের ঠোঁটে ফুটে উঠল হাসির রেখা। সে আর এক মুহূর্তের দূরত্ব না রেখে এক পদক্ষেপে এগিয়ে এসে অপরূপার কোমর জড়িয়ে ধরল নিজের বলিষ্ঠ বাহুতে। অপর হাতটি বাড়িয়ে তার মুখের ওপর লেপ্টে থাকা ভেজা চুলের গোছাগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিতে দিতে অত্যন্ত মৃদু ও গভীর কণ্ঠে আউড়ালো,

“এক ঝরা শিউলির দিনে।”

আভিয়ানের মাদকতাভরা কণ্ঠস্বর আর চোখের প্রগাঢ় চাউনিতে অপরূপা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সে। তবে পরক্ষণেই নিজের কৌতূহল সামলে নিয়ে বলল,

“সে তো না-হয় বুঝলাম। এবার পুরোটা খুলে বলুন। আমি তো নিজের স্মৃতি ঘেঁটেও সেই দিনের কথা মনে করতে পারছি না।”

আভিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে মৃদু হেসে বলল,

“অতীত ঘেটে আর কী লাভ হবে অপ্সরা? বর্তমানটাই তো সুন্দর।”

অপরূপা নাছোড়বান্দা। সে আভিয়ানের শার্টের কলারটা চেপে ধরে বলল,

“জানলে ক্ষতিও তো নেই। বলুন না।”

আভিয়ান অপরূপার ব্যাকুলতা দেখে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও চওড়া হলো তার। সে এক গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,

“চলুন আমার সাথে।”

অপরূপা ভীষণ কৌতূহল ও বিস্ময় নিয়ে শুধালো,

“কোথায় যাব?”

আভিয়ান কোনো উত্তর দিল না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে এক ঝটকায় অপরূপাকে নিজের দুই বাহুর ওপর পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। অপরূপা ভয়ে জড়িয়ে ধরল তার গ্রীবাদেশ। আভিয়ান অপরূপার নরম ঠোঁটে আলতো, নিবিড় চুমু খেল। অতঃপর হাঁটা ধরল গেমিং রুমের দিকে। যেতে যেতে রমণীর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল,

“অতীতের সেই ঝরা শিউলির দিনে।”

________

#চলবে