#পর্ব_৫
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
বিকেলের দিকে তারা গ্রামের আঁকাবাঁকা কাঁচা রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল। সামনে আরভান আর জেসিকা, আর বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে পেছনে আয়াত এবং ছোট আরিয়ান। আরভান প্রতি কয়েক কদম পরপরই ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাচ্ছিল। তার দৃষ্টি বারবার গিয়ে থমকাচ্ছিল আয়াতের ওপর। আয়াত আরিয়ানের সাথে খুনসুটি করছে,হাসছে। বাচ্চাটার সাথে তার এই সহজ ব্যবহার দেখে আরভানের ভেতরে কেন জানি এক ধরণের অসহ্য জ্বালা শুরু হলো। তার মনে হলো, যে মেয়েটির মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে বিচ্ছেদ হয়েছে, সে এত তাড়াতাড়ি হাসছে কী করে? নিশ্চয়ই এই মুক্তি তাকে নতুন কোনো স্বপ্নের স্বাদ দিচ্ছে। আরভান তো এই বিচ্ছেদই চেয়েছিল, কিন্তু এখন নিজের চোখের সামনে আয়াতের এই নির্ভার হয়ে ওঠা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। এক অদ্ভুত অস্থিরতা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
জেসিকা একটা বিস্তীর্ণ সরিষা ক্ষেত দেখে আহ্লাদে চিৎকার করে উঠল।
“ওহ মাই গড! সো বিউটিফুল! আরভান, আই ওয়ান্ট আ পিকচার হিয়ার।”
আরভান বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে গেল। জেসিকার মতো এমন ন্যাকা আর মেকি মেয়ে কোনোদিন তার পছন্দ না । আজ যদি এক বিশেষ গোপন বাধ্যবাধকতা আর পায়ের অদৃশ্য শিকল তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে না রাখত, তবে সে এই মেয়ের সাথে এক কদমও সে হাঁটত না। আর তো মাত্র কয়েক ঘণ্টা শুধু সহ্য করার, অস্ট্রেলিয়ায় পা রাখা পর্যন্তই এই মেয়ের সাথে তার সম্পর্কের দৌড়—সেখানে পৌঁছানো মাত্রই সে পুনরায় হয়ে উঠবে এমন এক অধরা ধ্রুবতারা, যার কক্ষপথের সীমানায় পৌঁছানোর সাধ্য জেসিকার মতো মেকি তরুণীর কোনোকালেই ছিল না আর হবেও না।
জেসিকা আয়াতকে ইশারা করল কয়েকটা ফুল তুলে দেওয়ার জন্য। আয়াত অনিচ্ছা সত্ত্বেও আইলের ওপর দিয়ে ফুল তুলতে গিয়ে হঠাৎ পা পিছলে গেল। সে পড়ে যাওয়ার আগেই আরভান বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে এসে তাকে পাঁজাকোলা করে ধরল। এক মুহূর্তের জন্য তাদের চার চোখ এক হলো। আয়াতের টলটলে চোখের গভীরতা যেন আরভানকে কোনো এক অজানা অতীতে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। আরভানের হাতের শক্ত বাঁধনে আয়াত কেঁপে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই আরভান তাকে এক প্রকার ঝটকা দিয়ে একপাশে ফেলে দিল। আয়াত ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে গিয়ে কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা পেল।
আয়াত যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠে চেঁচিয়ে বলল,
“জঘন্য লোক একটা! আপনাকে ধরতে কে বলেছিলো?আমার থেকে একশ হাত দূরে থাকবেন আপনি।আপনার এই মেকি দয়া দেখানোর কোনো প্রয়োজন নেই।”
আয়াত বসে বসে কথাগুলো বললেও আরভান নির্লিপ্তভাবে তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। আয়াত হতভম্ব হয়ে গেল। এই মানুষটার চামড়া কি গণ্ডারের? এতগুলো কটু কথা শোনার পরেও সে একটুও বিচলিত হলো না, যেন আয়াতের অস্তিত্বই তার কাছে নগণ্য।
তারা হাঁটতে হাঁটতে যখন আরও কিছুটা নির্জনে চলে এল, জেসিকা আর আরভান কিছুটা সামনে এগিয়ে গেছে। রাস্তার মোড় ঘুরতেই হঠাৎ আয়াতের হাতে এক হ্যাঁচকা টান পড়ল। শাহরিয়ার কোথা থেকে যেন উদয় হয়ে পেছন থেকে আয়াতের কোমর জাপটে ধরল। আয়াত প্রাণপণে বাঁচার চেষ্টা করে চিৎকার করে উঠল,
“আপনি আবার ও!আপনার সাহস হয় কীভাবে আমাকে বারবার ছোঁয়ার? হাত ছাড়ুন আমার! ছাড়ুন বলছি! নইলে চিৎকার করব কিন্তু!”
শাহরিয়ার আয়াতের দুহাত পেছনের দিকে মুচড়ে ধরে তার ঘাড়ের কাছে মুখ নিয়ে হিসহিস করে বলল,
“হাত তো তোর ছাড়ব না জানপাখি। রাতে তোর ওই চড়টা আমি হজম করেছি, কিন্তু রাস্তাঘাটে এসব করিস না, আমারও তো প্রস্টিজ আছে। তোর তো ডিভোর্স হয়ে গেল, এখন তো আর কোনো বাধা নেই। এত নাটক করার কী আছে? একটু আগে ওই আরভান যখন তোকে জড়িয়ে ধরল, তখন তো তুই পরম শান্তিতে তার বুকে মিশে ছিলি। ওই দৃশ্যটা দেখার পর আমার কলিজায় বিষের মতো লেগেছে। অন্য পুরুষ তোকে ছুঁলে তোর ভালো লাগে, আর আমার বেলায় এত তেজ? এখন এই বিষের জ্বালা মেটাতে তোকে আমি কী করি বল তো?”
আয়াত হাত ছিটকানোর জন্য আপ্রাণ মোচড়ামুচড়ি করছিল, কিন্তু শাহরিয়ারের নখ যেন তার চামড়ায় বসে যাচ্ছে।পা দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু কোনো কিছুতেই লাভ হচ্ছিল না। শাহরিয়ার তার কৌশল আর শক্তি দিয়ে আয়াতের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিচ্ছিল। ঠিক সেই সময় আরভান পেছনে ফিরে দেখল আয়াত আরিয়ানের সাথে নেই। সে চিন্তিত হয়ে পিছিয়ে আসতেই দেখল শাহরিয়ার আয়াতকে ওভাবে জাপটে ধরে আছে। আরভান থমকে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে এক ধরণের চরম বিতৃষ্ণা ফুটে উঠল।
সে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ধীর গলায় বলল,
“এখন গ্রামের রাস্তাঘাটেও কি তোমাদের এই সস্তা লিভ-ইন চলে নাকি? দ্যাটস ডিসগাস্টিং! ড্রামা করার জন্য তোমরা অন্তত লোকচক্ষুর অন্তরালে যেতে পারতে।”
আরভানের উপস্থিতিতে শাহরিয়ার চমকে উঠে তড়িঘড়ি করে আয়াতকে ছেড়ে দিল। নিজের অপ্রস্তুত ভাব কাটিয়ে সে কিছুটা বিরক্ত গলায় বলল,
“ডিভোর্স তো হয়েই গেছে আরভান ভাই। এখন নিজের চরকায় তেল দিন। ফিউন্সেকে নিয়ে ঘুরুন-ফিরুন, তারপর সুন্দরমতো নিজের দেশে চলে যান। এক্স-ওয়াইফের বিষয়ে এত নাক কেন গলাচ্ছেন?”
আরভান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আয়াতের দিকে এক ঝলক অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করল। তারপর শাহরিয়ারের চোখের দিকে তাকিয়ে হিমশীতল গলায় বলল,
“হয়নি এখনো। সবে পেপারে সই হয়েছে। দিল্লি এখনো বহুত দূর, ব্রো!”
আয়াত তাদের এই তিক্ত তর্কের মাঝে নিজেকে আর জড়িয়ে রাখতে চাইল না। শাহরিয়ারের হাতের সেই পৈশাচিক স্পর্শের ঘিনঘিনে অনুভূতি মুছতে সে দ্রুত পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। শাহরিয়ার উচ্চস্বরে বলল,
“সই হোক আর না হোক, আয়াতকে আমার পাওয়া থেকে কেউ আটকাতে পারবে না। আয়াতও আমাকে ভালোবাসে, আপনি মাঝখানে শুধু শুধুই কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। কোথায় ফিউন্সেকে নিয়ে রোমান্স করবেন, তা না করে এই অপরিচিত জায়গায় তাকে একা ফেলে আপনি আয়াতকে খুঁজতে এসেছেন—ব্যাপারটা ঠিক হজম হলো না।”
আরভান শান্ত পায়ে শাহরিয়ারের একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শাহরিয়ার ভ্রূ কুঁচকে উত্তরের অপেক্ষায় ছিল, কিন্তু আরভান তাকে হতবাক করে দিয়ে তার গলার মাফলারটা সজোরে হ্যাঁচকা টান দিল। শাহরিয়ার ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে নিজের গলা চেপে ধরল এবং রক্তচক্ষু নিয়ে আরভানের দিকে তাকাল। আরভান অত্যন্ত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে শাহরিয়ারের গলার সেই কালচে ক্ষতের ওপর আঙুল বুলিয়ে দিল। তারপর বাঁকা হেসে ফিসফিস করে বলল—
”যে গত রাতে তোমার গলায় যে এই ফাঁসটা দিয়েছিল, সে অনেক বড় একটা মিস্টেক করে ফেলেছে। তার আসলে আর একটু জোরে চেপে ধরা উচিত ছিল। তবে সিওর নেক্সট টাইম সে এই ভুলটা করবে না।”
কথাটা শেষ করেই আরভান শাহরিয়ারের কলার চেপে ধরে নিজের মুখের কাছে টেনে আনল। এক জোড়া পাথুরে চোখ শাহরিয়ারের চোখের ওপর স্থির করে বলল,
“একটা সিক্রেট বলি? ডিভোর্স পেপারে আমার সই কিন্তু এখনো পড়েনি। সেই মোতাবেক তোমার ‘জানপাখি’ এখনো আমার স্ত্রী। বড় ভাইয়ের বউয়ের দিকে নজর দিতে নেই। তবে মানতে হচ্ছে তোমার চয়েজ বড্ড খারাপ; চোখের সামনে বিদেশি রাজহাঁস রেখে দেশি পোল্ট্রি মুরগি কে চায়? ইয়োর চয়েজ ইজ ভেরি ব্যাড ব্রো।”
আরভান একটা তুচ্ছতাচ্ছিল্য সূচক শব্দ করে শাহরিয়ারকে ছেড়ে দিয়ে গটগট করে সামনে এগিয়ে গেল। শাহরিয়ার স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল। সে আরভানকে যতটা সরল আর আধুনিক ভেবেছিল, লোকটা তার চেয়েও সহস্র গুণ বেশি রহস্যময়। আরশাদ চৌধুরী যতটা ধুরন্ধর ছিলেন, তার রক্ত যে আরও বেশি ভয়াবহ হবে, সেটা এখন শাহরিয়ার হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। তাকে দ্রুত কিছু একটা করতে হবে, নইলে সব পরিকল্পনা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
আরভান বড় বড় পা ফেলে দ্রুত আয়াতের সামনে দারালো নিজের লাল হয়ে থাকা চোখ জোড়া দিয়ে আয়াতের দিকে তাকাল।
“তুমি কি সবসময় রাস্তাঘাটেও এমন নির্লজ্জের মতো আচরণ করো?”
আয়াতের ভেতরের অবদমিত আত্মাভিমান এবার আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। যে মানুষটা সত্য না জেনেই বারবার তার দিকে আঙুল তুলছে, তার প্রতি একরাশ ঘৃণা নিয়ে সে সরাসরি আরভানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
”নির্লজ্জ আমি নই মিস্টার আরভান, নির্লজ্জ আপনি! অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজের আয়নাটা দেখুন। বিয়ে করে বউ ফেলে রেখে বারো বছর পর অন্য দেশের ফিউন্সেকে সাথে নিয়ে ডিভোর্স দিতে এসেছেন। আপনি তো নির্লজ্জতার সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন। তাই নেক্সট টাইম আমাকে জাজ করার আগে নিজের চরিত্রটা একবার দেখে নেবেন। আপনি আপনার ফিউন্সেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকুন, আমার জীবন নিয়ে ভাবার কোনো অধিকার আমি আপনাকে দিইনি।”
আয়াতের এমন উচ্চস্বরের প্রতিবাদে আরভান রাগল না; বরং তার চোখের চাউনি আরও শীতল হয়ে গেল। কণ্ঠস্বর গভীর করে সে বলল,
“সত্যি বলছি আয়াত, হয়তো তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়েই আমি এসেছিলাম। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে, তুমি ছিলে আমার জীবনের তার চেয়েও বড় এক অভিশাপ।”
আয়াত এক টুকরো ম্লান হাসলো, “সেই অভিশাপ থেকে তো আজ পুরোপুরি মুক্তি পেয়েই গেলেন।”
আরভানের চোখে এক অদ্ভুত আভা ফুটে উঠল। ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসি টেনে সে বলল,
“মুক্তি আমি পাইনি, বরং কাউকে মুক্তি দিয়েছি। তবে মনে রেখো আয়াত, অভিশাপ অভিশাপের পিছু এত সহজে ছাড়ে না!”
কথাটার অন্তর্নিহিত অর্থ বোঝার শক্তি তখন আয়াতের ছিল না। সে আর কথা না বাড়িয়ে সামনের দিকে পা বাড়াতেই পেছন থেকে বিকট এক শব্দে পুকুরের পানি ছিটকে উঠল।
আয়াত পেছনে ফিরতেই স্তব্ধ হয়ে গেল। আরভান পুকুরের অতল গহ্বরে ডুবছে দেখে আয়াতের মাথার ভেতরটা মুহূর্তেই শূন্য হয়ে গেল। লোকটা একটু আগেও তার সামনে দাঁড়িয়ে দাম্ভিকতা দেখাচ্ছিল, অথচ সে তো পাড় থেকে বেশ খানিকটা দূরে ছিল! তাহলে সে এভাবে হুট করে পানিতে পড়ে গেল কীভাবে? লোকটা কি সাঁতার জানে না? আরভানের মতো একজন সুঠামদেহী পুরুষকে এভাবে অসহায়ভাবে পানিতে তলিয়ে যেতে দেখে আয়াত দিশেহারা হয়ে পড়ল।
সে আশেপাশে চিৎকার করে কাউকে ডাকার চেষ্টা করল, কিন্তু নির্জন এই পথে তখন কেউ ছিল না। এত বড় দানবীয় শরীরের একজন মানুষকে টেনে তোলা তার মতো ক্ষুদ্র প্রাণীর পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু আরভানের অবস্থা বেগতিক দেখে সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের জীবনের পরোয়া না করেই পুকুরে ঝাঁপ দিল।
আরভানের মতো বিশালাকার একজন পুরুষকে টেনে পাড়ে আনা ছিল আয়াতের মতো এক ছিপছিপে মেয়ের জন্য প্রায় অসম্ভব। পানির নিচে বস্তুর ওজন হ্রাসের বৈজ্ঞানিক সূত্র হয়তো তাকে কিছুটা সাহায্য করছিল, তবুও আরভানের মতো দুর্ধর্ষ শরীরের ভার বহন করা আয়াতের একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু আয়াত ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারছিল না যে, পানির নিচে কেউ একজন তাকে অলক্ষ্যে সাহায্য করছে। আয়াত যখন তাকে টানছে, আরভান নিজেও গোপনে হাত-পা চালিয়ে তাকে সাহায্য করছিল। কোনোমতে আরভানের শার্টের কলার শক্ত করে মুঠোয় পুরে সে তাকে টেনে পুকুরের সিঁড়িতে আনল।
আরভান পাড়ে শুয়ে জোরে জোরে কাশতে লাগল। সে চোখ খুলে দেখল সামনেই আয়াত হাঁপাচ্ছে। ভিজে জবজবে হয়ে থাকা আয়াতের সাদা থ্রি-পিসটি তার শরীরের সাথে লেপ্টে আছে, যা তার দেহের সুডৌল অবয়বকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। আরভানের সেই চিরচেনা পাথুরে দৃষ্টি এবার তৃষ্ণার্তের মতো আয়াতের ভিজে শরীরের দিকে আটকে গেল। এক গভীর নেশালো স্বরে নিজের বুকের বাঁ দিকে ইশারা করে সে বিড়বিড় করে বলল,
”আমার ঠিক এই জায়গাটাতে স্পর্শ করা তোমার মোটেও উচিত হয়নি আয়াত। দিস ইজ আ বিগ মিসটেক!”
আয়াত নিজের হিতাহিত জ্ঞান ফিরে পেয়ে ঝট করে আরভানের দিকে তাকাল। সে দেখল, তার একটি হাত এখনো আরভানের বুকের বাঁ পাশের ভিজে যাওয়া শার্টের অংশ মুষ্টিবদ্ধ করে ধরে আছে।ঠিক যেখানে হৃদপিণ্ডের স্পন্দন অনুভূত হয়। সে দ্রুত হাত সরিয়ে নিল। কিন্তু আরভানের চোখের সেই স্থির চাউনি যেন আয়াতকে বিদ্ধ করছে।
আয়াত নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠল। সাঁতার কাটার সময় তার ওড়নাটা পুকুরের অতলে হারিয়ে গেছে, তা সে খেয়ালই করেনি। তীব্র অস্বস্তি আর লজ্জায় সে দ্রুত তার কোমর সমান লম্বা ভেজা চুলগুলো সামনে এনে দুহাত দিয়ে বুক আড়াল করে নিল। তীব্র ঘৃণায় আয়াতের চোখমুখ লাল হয়ে উঠল। সে আরভানের দিকে তাকিয়ে সরাসরি বলল,
”আপনার দৃষ্টি সংযত করুন মিস্টার আরভান। আপনার মতো নিচু মনমানসিকতার লোক আমি আমার জীবনে দ্বিতীয়টি দেখিনি। নিজের চরিত্রটা অন্তত ঠিক করুন!”
আয়াত আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। ভেজা শরীরে গটগট করে বাড়ির দিকে রওনা দিল। আরভান ঘাটে বসে নিজের ভেজা পোশাক আর আয়াতের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
বোকা মেয়েটা হয়তো বুঝতেও পারল না, এই পুরো নাটকটা ছিল আরভানের এক সূক্ষ্ম পরিকল্পনা। সে শুধু দেখতে চেয়েছিল, ডিভোর্স দেওয়ার পরেও আয়াত তার জন্য কতটা ব্যাকুল হয়। অস্ট্রেলিয়া ফিরে যাওয়ার আগে আয়াতের এই আকুলতা আর তার শরীরের শেষবারের মতো একটু ছোঁয়া নিয়ে সে নিজের শূন্যতাকে পূর্ণ করতে চেয়েছিল। তবে পরিকল্পনাকারী আরভান নিজেও জানত না যে ভাগ্য তাকে ঠিক কোন গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছে।
********
বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক আর ঘরের ভেতরে দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া পুরো চৌধুরী বাড়ি এখন নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। ঘড়ির কাঁটা রাত দুটোর ঘর ছুঁইছুঁই। জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের জমাটবদ্ধ অন্ধকার বাগানের দিকে তাকিয়ে আছে আয়াত। আজ তাকে পালাতেই হবে, এই দমবন্ধ করা খাঁচা থেকে মুক্তি তার আজ বড্ড প্রয়োজন। বিছানার ওপর ছোট একটা ট্রাভেল ব্যাগ গোছানো, তার পাশেই পড়ে আছে কয়েক পাতা ঘুমের ট্যাবলেট। আয়াতের ঠোঁটে এক বিষাদমাখা হাসি ফুটে উঠল। সে জানে, আফজাল চৌধুরী তাকে প্রাণ থাকতে এই বাড়ি থেকে যেতে দেবেন না। তার দাদা মনসুর আলীকে দেওয়া সেই বহু বছরের পুরনো প্রতিশ্রুতি দাদাজানের কাছে নিজের জীবনের চেয়েও দামী। আরভান তাকে গ্রহণ করেনি বলে দাদাজান হয়তো আবারও তাকে শাহরিয়ারের মতো এক বিকৃত মস্তিস্কের মানুষের হাতে তুলে দেবেন, শুধু নাতবউ করে রাখার জন্য।
কাল বিয়ের সাজে বসার আরও একটা বড় কারণ ছিল—পুরো বাড়ি তখন কড়া পাহারায় ঢাকা ছিল। মেঝো চাচা আনোয়ার চৌধুরী লোক লাগিয়ে রেখেছিলেন যাতে আয়াত কোনোভাবেই পালিয়ে যেতে না পারে। তখন কোনো উপায় না পেয়ে এই ঘুমের ওষুধগুলোই ছিল তার শেষ ভরসা। ভেবেছিল, কবুল বলার আগেই এই বিষ নিজের শরীরে নিয়ে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেবে। কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। আরভান আর জেসিকার আগমনে বাড়িতে এক ধরণের বিশৃঙ্খলা আর সবার মনোযোগ বিক্ষিপ্ত। এটাই তার পালানোর মোক্ষম সুযোগ।
আয়াত বিছানায় রাখা একটি পুরনো ছবির ফ্রেম হাতে নিল। ধুলোবালি পড়া কাঁচের নিচে আবছা দেখা যাচ্ছে তার বাবা-মা এবং মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট নয় বছরের চঞ্চল এক আয়াত।আয়াতের চোখের কার্নিশ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু ছবির ওপর পড়ল। সে বিড়বিড় করে বলল,
“বাবা, মা… তোমাদের আয়াত আজ বড় একা। এই স্বার্থপর দুনিয়াতে আমাকে কার ভরসায় ফেলে চলে গেলে? যদি যেতেই হতো, তবে আমাকে সাথে নিয়ে গেলে না কেন? যাকে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে স্বামী মেনেছিলাম, যার জন্য ১২টা বছর একটা পবিত্র প্রদীপের মতো নিজেকে আগলে রেখেছিলাম—সে আজ আমাকে আবর্জনার মতো ছুড়ে ফেলে দিল। তার কাছে আমি কেবল একটা বাধা, একটা গ্রাম্য বোঝা। আর সহ্য হচ্ছে না মা, আমি এই মিথ্যে সম্পর্কগুলোর বোঝা আর বইতে পারছি না।”
সে চোখের পানি মুছে শক্ত হয়ে দাঁড়াল। আবেগ দিয়ে নয়, আজ তাকে বিবেক দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সে একবার সারা বাড়িটা চেক করার জন্য পা টিপে টিপে ঘর থেকে বের হলো। আফজাল চৌধুরীর ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল। বৃদ্ধ দাদাজান গভীর ঘুমে মগ্ন। আয়াত নিঃশব্দে তার পায়ের কাছে গিয়ে বসে অস্ফুট স্বরে বলল,
“আমাকে মাফ করে দেবেন দাদাজান। আমি আপনার বিশ্বাস আর ভালোবাসা কোনটারই মর্যাদা রাখতে পারলাম না। আপনার নাতি আমার অস্তিত্বকেও স্বীকার করে না। এভাবে রোজ রোজ তিলতিল করে মরে যাওয়ার চেয়ে একবার মরে যাওয়া ভালো। আপনি ভালো থাকবেন।”
আয়াত বেরিয়ে এল। শাহরিয়ারের ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সে দেখল দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। শাহরিয়ারও নিশ্চয়ই ঘুমে। সব যখন ঠিক মনে হলো, তখনই পেছন থেকে এক ভারী পুরুষালি কণ্ঠস্বরে আয়াতের হৃৎপিণ্ড যেন গলার কাছে চলে এল।
”সো… দ্য বার্ড ইজ রেডি টু ফ্লাই?”
আয়াত ঝট করে ঘুরে তাকাল। করিডোরের আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে আরভানকে। সে দেয়াল ধরে কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে, এক হাতে নিজের কপাল চেপে ধরা,ঠোঁটে বাঁকা হাসি।আরভানের পরনে এখনো সেই টি-শার্ট, যা বিকেলের পুকুরে ডোবার পর শুকিয়ে কুঁচকে গেছে। আয়াতের ভয়ের মেঘ মুহূর্তেই বিস্ময়ে বদলে গেল। কারণ আরভানকে দেখে মনে হচ্ছে সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। তার মুখ ফ্যাকাশে, চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল হয়ে আছে।
”পরে বয়ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করো, এখন আমাকে একটু দেখো। তোমার কাছে কি… কি আমার মেডিসিন আছে? প্লিজ গিভ মি… আই ফিল লাইক ডাইং।”
আরভান জড়িয়ে আসা কণ্ঠে বলল।
আয়াত বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল। আরভান আবার বিরক্তি নিয়ে বিরক্তি চেচিয়ে বলল
“কী হলো? বললাম না কোনো পেইনকিলার আছে কি না? জাস্ট হেল্প মি!”
আয়াত হকচকিয়ে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, “আস্তে কথা বলুন মিস্টার আরভান! সবাই ঘুমাচ্ছে, জেগে যাবে। আর আমি আপনার ওষুধ কোথায় পাব? আপনার ব্যাগ কি আমি চুরি করে এনেছি নাকি?”
আরভান মাথায় দুহাত চেপে ধরে যন্ত্রণাকাতর মুখে আয়াতের মতো করেই ফিসফিস করে বলল,
“শাট আপ আয়াত! ডোন্ট স্টার্ট আ ডিবেট নাউ। মাই হেড ইজ এক্সপ্লোডিং। দাদাজান বলছিল এই বাড়ির সব ফার্স্ট এইড তোমার কাছে থাকে। আই নিড আ পেইন কিলার। কুইক!”
আয়াত রাগে ফোঁস করে উঠল। “দাদাজান এই বয়সেও মিথ্যে কথা বলেন কেন কে জানে ? আপনার মতো বিলেতি বাবুদের জন্য আমার কাছে কোনো ওষুধ নেই।”
আরভান টলতে টলতে আয়াতের দিকে এক পা এগিয়ে এল।
“ইউ আর সো ইরিটেটিং! গ্রামে কি মানুষ শুধু ঝগড়া করতেই জন্মায়? জাস্ট গিভ মি দ্য পিলস, আদারওয়াইজ আই উইল ফেইন্ট হেয়ার।”
আরভান সত্যি সত্যিই ঢলে পড়ে যেতে নিলে আয়াত দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাকে জাপটে ধরল। আরভানের শরীরের স্পর্শ লাগতেই আয়াত শিউরে উঠল। আরভানের গায়ের চামড়া যেন আগুনের মতো জ্বলছে। আয়াতের বুঝতে আর বাকি রইল না, বিকেলের পুকুরের ঠান্ডা পানিতে হাবুডুবু খেয়ে বিলেতি বাবুর কড়া জ্বর এসে গেছে।আয়াত বিরক্তি ঝেড়ে ফেলে বলল,
“আমার সাথে চলুন। এখানে ড্রামা করলে সবাই জেগে যাবে।এত রাতে আপনার সাথে আমাকে এভাবে দেখলে বাড়ির কেউ ভালো কিছু ভাববে না।”
আয়াত আরভানকে প্রায় টেনে নিজের ঘরে নিয়ে এল। বিছানায় বসিয়ে দিতেই আরভান ধপাস করে শুয়ে পড়ল। আয়াত ড্রয়ার থেকে প্যারাসিটামল আর এক গ্লাস পানি নিয়ে এল। “এই নিন, খেয়ে নিন।”
আরভান চোখ অর্ধেক বুজে তিতকুটে মুখ করে বলল, “ওয়াট ইজ দিস? লোকাল মেডিসিন? আই অনলি টেক ব্র্যান্ডস। এই ওষুধ খেয়ে মরব নাকি?”
আয়াতের ধৈর্য এবার বাঁধ ভাঙল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “এটাও ব্র্যান্ডেরই ওষুধ। আর মরলে মরে যাবেন, তাতেও পৃথিবীর মঙ্গল। আপনার মতো জঘন্য মানুষের বেঁচে থেকে লাভ নেই। এই মুহূর্তে এই ওষুধ না খেলে জ্বরে আপনার মাথার ঘিলু সব সেদ্ধ হয়ে যাবে। খান বলছি!”
আরভান বাচ্চা ছেলের মতো মাথা নাড়াতে লাগল। “নো! আই ওন্ট। ইট লুকস বিটার। জাস্ট কল …”
আয়াত আর সহ্য করতে পারল না। সে এক হাতে আরভানের মুখ সজোরে চেপে ধরল আর অন্য হাতে ট্যাবলেট দুটো তার গলার ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে পানি ঢেলে দিল। আরভান বিষম খেয়ে কাশতে শুরু করল। তিতকুটে স্বাদে তার মুখটা কুঁচকে এমন ছোট হয়ে গেল যে দেখতে অনেকটা কার্টুনের মতো লাগছে।
”ইউ… ইউ মনস্টার! হাউ ডেয়ার ইউ?” আরভান হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
আয়াত ভ্রু কুঁচকে বলল, “অসুস্থ হয়ে অন্তত তেজ দেখাতে আসবেন না। আপনাকে যে বিষ না দিয়ে ওষুধ দিয়েছি, এই জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করুন। এখন চুপচাপ শুয়ে থাকুন।”
আয়াত একটা ভেজা তোয়ালে নিয়ে এল জলপট্টি দেওয়ার জন্য। সে এক মুহূর্ত দ্বিধায় পড়ল। এই লোকটাকে সে চরম ঘৃণা করে, অথচ এখন তার সেবাই করতে হচ্ছে। তার তো উচিত ছিল এখনই এই সুযোগে পালিয়ে যাওয়া। আরভান তো তার কেউ না। ডিভোর্স পেপার কাল সকালেই আইনি প্রক্রিয়ায় চলে যাবে, তারপর এই সম্পর্কের ইতি। তবে কেন সে একজন অপরিচিত লোকের মতো তাকে ফেলে যেতে পারছে না? সম্ভবত তার মানবিকতা তাকে বাধা দিচ্ছে।
আয়াত জলপট্টি দিতে শুরু করতেই জ্বরের ঘোরে আরভান বকবক শুরু করল।
আয়াত যখন কপাল থেকে জলপট্টি সরাতে চাইল, আরভান হঠাৎ আয়াতের হাতটা সজোরে ধরে ফেলল। সে আয়াতের কোমল হাতটাকে নিজের গালের সাথে চেপে ধরে পাশ ফিরে শুয়ে বিড়বিড় করতে লাগল। আরভানের এমন আকস্মিক কাজে আয়াত চমকে উঠল। সে হাত সরিয়ে নিতে চাইলে আরভান আরও শক্ত করে ধরল।
আয়াত রাগে আর অস্বস্তিতে বলল,
“মিস্টার আরভান, আমার হাত ছাড়ুন। কথা কানে যাচ্ছে না আপনার? আপনার প্রতি মানবতাবোধ দেখানোই আমার ভুল হয়েছে। হাত ছাড়ুন বলছি!”
আয়াতের ধমক থামিয়ে দিল হাতের ওপর পড়া এক ফোঁটা উষ্ণ জলের ছোঁয়া। আয়াতের বুকের ভেতরটা কেন জানি মোচড় দিয়ে উঠল। লোকটা কি কাঁদছে? নাকি জ্বরের ঘোরে চোখের জল পড়ছে? সে নিজের কানটা আরভানের মুখের কাছে নিয়ে গেল কিছু শোনার জন্য।
আরভান চোখ বন্ধ রেখেই ভাঙা গলায় বিড়বিড় করে বলল, “শোনো মেয়ে… আমার এই বুক থেকে দূরে থাকো। এই বুকে শুধু আগুন জ্বলে, এখানে কারোর জায়গা নেই। আমি মানুষটা খুব একটা ভালো না, আই অ্যাম আ ব্যাড পারসন।”
আয়াত নিচু স্বরে প্রশ্ন করল, “তা তো আসার পর থেকে আপনার ব্যবহার দেখেই ভালো করে বুঝতে পারছি। তবুও মনে কৌতূহল জাগে, আপনি কেমন মানুষ তাহলে? এত নিষ্ঠুর কেন আপনি?”
আরভান জ্বরের ঘোরেই মুচকি হাসল, তবে সেই হাসিতে বিদ্রূপের চেয়ে যন্ত্রণার ছাপই বেশি ছিল। সে বিড়বিড় করে বলল,
“যখন তোমার শাহরিয়ারকে বিয়ে করার এতই ইচ্ছা ছিল, তখন আমাকে আগেই ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দেওয়া উচিত ছিল তোমার। তাহলে এতটা পথ কষ্ট করে আমি এখানে আসতাম না… আর এমন ভয়ঙ্কর কোনো অনুভূতির জালে আমাকে ফাঁসতে হতো না।”
আরভান আবারও অস্থির হয়ে উঠল। আয়াতের হাতটা গালের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “এমন কেন হচ্ছে বলতো? আই ডোন্ট ওয়ান্ট দিস ফিলিং। আমি প্রতি মুহূর্তে চাইছি তোমার থেকে দূরে থাকতে, নিজেকে আড়াল করতে। কিন্তু কেন পারছি না বলতে পারো? আমার কোনো পিছুটান নেই, থাকার কথা ছিল না।তবুও আজ তুমিই আমার যন্ত্রণা বাড়ানোর একমাত্র কারণ হয়ে দাঁড়ালে। বড্ড ভুল করে ফেলেছি আমি! এখানে আসাটা আমার একদম উচিত হয়নি।
সে একটু থামল, যেন নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে তার। তারপর আবার বলতে শুরু করল,
“বুঝতে পারিনি, যে অস্পষ্ট অবয়ব হাজার মাইল দূরে থেকেও আমাকে অস্থির করে রাখতে পারে, তাকে চাক্ষুষ দেখার পর আমার হিতাহিত জ্ঞান বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। আমি বড্ড ভুল করেছি, ভীষণ বড় ভুল! আমি এই ভুলের পথে আর একবিন্দুও এগোতে চাই না। তবুও এই ক্ষতবিক্ষত হৃদয় হাহাকার করে বলতে চায়, ‘তুমি শুধু #আমার_হয়ে_থেকো’। অথচ পরক্ষণেই বিবেক বাধা দেয়, আমি চাই না তুমি আমার মায়ায় আটকে থাকো। কারণ আমি জানি, এই চাওয়ার শেষটা কেবল গভীর অনুশোচনা আর হাহাকার।”
আরভানের গলার স্বর ক্রমশ ভারী হয়ে এল। “তবুও অন্য কারও বাহুবন্ধনে তোমায় দেখার কল্পনা করলেই আমার এই দগ্ধ কলিজাটা যেন আরও বিষিয়ে ওঠে। আমি চাই তুমি আমায় প্রাণভরে ঘৃণা করো, যদিও জানি তোমার ঘৃণা সহ্য করার শক্তিটুকুও আমার নেই। তবুও তুমি আমায় ঘৃণাই করো, কারণ আমাদের এই অসমাপ্ত গল্পের জন্য ঘৃণা ছাড়া আর কোনো গন্তব্য অন্তত আমার জানা নেই।”
আয়াত কোনো উত্তর দিল না। আসলে সে এই লোকটার কোনো কথা বুঝতে পারছিল না। তার ভীষণ অবাক লাগছিল এটা ভেবে যে, আরভানের কি সত্যিই জ্বর হয়েছে নাকি সে অন্য কিছু খেয়েছে? এমন উল্টোপাল্টা বকবক মানুষ কেবল মাতাল হলে বা ঘোরগ্রস্ত হলে করে।
সে কোনোমতে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে আরভানের কপালে জলপট্টি দিতে লাগল। আরভান বকবক করতে করতে একসময় ক্লান্ত হয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
আয়াত নিষ্পলক তাকিয়ে রইল আরভানের শান্ত মুখের দিকে। সেই মুহূর্তে আয়াতের মাথা থেকে পালিয়ে যাওয়ার চিন্তাটা পুরোপুরি মুছে গেল।ঘুমের ঘোরে আরভানকে কেন জানি সেই জঘন্য মানুষটা মনে হচ্ছে না। এই সেই মানুষ, যার জন্য সে দীর্ঘ ১২ বছর প্রতিটি মোনাজাতে চোখের জল ফেলেছে। মানুষটার প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা থাকলেও এক অদৃশ্য মায়ার টান যেন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল। আয়াত আরভানের শিয়রে বসে হাঁটুর ওপর মাথা ঠেকিয়ে ঝিমাতে লাগল। সারা দিনের ধকল আর রাতের জাগরণে সে এতটাই ক্লান্ত ছিল যে, কখন নিজের অজান্তেই আরভানের বুকের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে, তা সে নিজেও জানে না।
আরভান ঘুমের ঘোরেই এক ধরণের অদ্ভুত প্রশান্তি আর উষ্ণতা অনুভব করল। সে অবচেতন মনেই আয়াতকে একদম নিজের সাথে জড়িয়ে ধরল—যেন আয়াত কোনো অতি দামী আমানত, যা হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে সে বুকের পাঁজরে আগলে রাখতে চায়।
বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাখির কিচিরমিচির শব্দে দুজনেরই ঘুমটা হালকা হয়ে আসছিল। ঠিক সেই সময় ঘরের দরজা সশব্দে খুলে গেল এবং এক আকাশচুম্বী চিৎকারে ভোরের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল।
”আয়াতততত!”
#তাসনিম_রিয়া_খান
চলবে….
#পর্ব_৬
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
”আয়াতততত!”
এক আকাশচুম্বী আক্রোশের চিৎকারে দুজনেরই কাঁচা ঘুমটা এক নিমেষে ভেঙে গেল। আয়াত ধড়ফড় করে চোখ মেলতেই তার শরীর হিম হয়ে এল। চারপাশের পরিস্থিতি বোঝার আগেই সে আবিষ্কার করল, সে আরভানের প্রশস্ত বুকের সাথে প্রায় লেপ্টে আছে। আরভানের একটি শক্তিশালী হাত এখনো আয়াতের কোমরের ওপর অবচেতনে আগলে রাখা। ভোরের আবছা আলোয় দৃশ্যটা যেকোনো দম্পতির জন্য মধুর হতে পারত, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আয়াতের কাছে তা কালবৈশাখী ঝড়ের পূর্বাভাস। দরজার সামনে শাহরিয়ার দাঁড়িয়ে আছে; তার চোখ দুটো রাগে টকটকে লাল হয়ে ফেটে পড়ছে।
আয়াত বিদ্যুৎবেগে আরভানের থেকে দূরে সরে গেল। আরভানের চোখেমুখেও এক ধরণের অস্বস্তি আর বিরক্তি ফুটে উঠল। শাহরিয়ার যেন এক ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো গর্জে উঠল। সে ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে আরভানের কলার চেপে ধরল এবং কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরভানের গালে পর পর দুটো শক্তিশালী ঘুষি বসিয়ে দিল। আরভান জ্বরের ঘোরে শরীর ছেড়ে দিয়েছিল, তাই আকস্মিক এই পাশবিক আক্রমণে নিজেকে সামলাতে পারেনি; সে বিছানায় ছিটকে পড়ল।
”ওই ***, তুই আমার জানপাখিকে ছোঁয়ার সাহস পেলি কই? আজ তোকে আমি জ্যান্ত পুঁতে ফেলব!” শাহরিয়ারের চিৎকার পুরো বাড়িতে প্রতিধ্বনিত হলো। সে এবার খুনি দৃষ্টিতে আয়াতের দিকে ফিরল। এক লাফে এগিয়ে গিয়ে সে আয়াতের গলা টিপে ধরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল এবং উন্মাদের মতো বলতে শুরু করল,
”এই জানপাখি! তোর ঘরে এই লোকটা কী করছে, হ্যাঁ? কথা বল! তোর ঘরে আমি ছাড়া অন্য কেউ কীভাবে ঢুকতে পারে? তুই কি বিদেশি সাদা চামড়া দেখে গলে গিয়ে কাল রাতেই সব বিলিয়ে দিলি? আমি তোকে ভালোবাসলাম আর তুই এই লম্পটটার শয্যাশায়ী হলি?”
শাহরিয়ার উন্মাদের মতো হাতের কাছে পাওয়া ড্রেসিং টেবিলের ফুলদানি আর কোণায় থাকা আয়না সজোরে আছাড় দিয়ে ভাঙতে শুরু করল। তার পৈশাচিক চিৎকারে পুরো ঘর যেন এক রণক্ষেত্রে পরিণত হলো।
শাহরিয়ার পুনরায় আয়াতের দিকে হাত বাড়াতেই আরভান তার হাতটা সজোরে ধরে মুচড়ে দিল। নিজের শারীরিক অসুস্থতা ছাপিয়ে এক অদ্ভুত জিদ আরভানের চোখে ফুটে উঠল। সে শাহরিয়ারের গলা টিপে ধরে সজোরে দেয়ালে আটকে দিল এবং তার ডান হাতটি পিঠমোড়া করে এমনভাবে চাপ দিল যে শাহরিয়ার যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল। আরভানের রক্তবর্ণ চোখের শীতল চাহনি দেখে শাহরিয়ারের উগ্রতা মুহূর্তেই দমে গেল।
আয়াতের দুচোখ ভরা আতঙ্ক; সে স্তম্ভিত হয়ে দুই পুরুষের এই ভয়াবহ তাণ্ডবলীলা দেখে যাচ্ছে। সে তো শুধু মানবিকতার খাতিরে এই অসুস্থ লোকটাকে সেবা করতে চেয়েছিল, কিন্তু পরিস্থিতি যে এমন নোংরা রূপ নেবে সে ভাবতেও পারেনি।
এমন শব্দ আর চিৎকার-চেঁচামেচিতে বাড়ির সবাই সেখানে ছুটে এল। আফজাল চৌধুরী লাঠি হাতে দরজায় এসে দাঁড়ালেন। সবার চোখেমুখে চরম বিস্ময়। শাহরিয়ার দাদাজানকে দেখে আরও বেশি নাটুকে আর্তনাদ শুরু করল।
“দাদাজান! দেখুন আপনার আদরের বিদেশি নাতির কাণ্ড! এই লোকটা কাল ডিভোর্স পেপারে সই নিয়েছে, আর আজ রাতে আয়াতের সাথে একই বিছানায় রাত কাটিয়েছে। ও এটাকে অস্ট্রেলিয়া মনে করেছে! এই মুহূর্তে এই লম্পটটাকে বাড়ি থেকে বের করে দিন।”
আফজাল চৌধুরী পাথরের মতো শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার তীক্ষ্ণ নজর আরভানের ওপর। আয়াত মাথা নিচু করে থরথর করে কাঁপছে। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে। লজ্জায়, অপমানে তার ইচ্ছে করছে মাটির ভেতরে ঢুকে যেতে। এরই মাঝে ঘটে গেল এক বীভৎস কাণ্ড। আরভান মেঝেতে পড়ে থাকা ভাঙা কাঁচের এক খণ্ড কুড়িয়ে নিয়ে শাহরিয়ারের হাতের তালুতে সজোরে ঢুকিয়ে দিল।
শাহরিয়ার বীভৎস চিৎকার দিয়ে মেঝের ওপর বসে পড়ল। বাড়ির সকলে ভিরমি খেলো; নাজমা বেগম তার ছেলের অবস্থা দেখে আর্তনাদ করে ছুটে এলেন। আরভানের চোখে তখন কোনো অনুশোচনা নেই, আছে শুধু আদিম এক হিংস্রতা।
আরভানের এমন আচরণে আফজাল চৌধুরী একটুও বিচলিত হলেন না। তিনি শান্ত কিন্তু কঠিন গলায় শাহরিয়ারের উদ্দেশ্যে বললেন,
“তোমার বাবা তোমাকে একটা জানোয়ার বানিয়েছে সেটা অনেক আগেই আমার ভালো করেই বোঝা হয়ে গেছে। তবে তোমার এই জানোয়ার সত্তাটা বশ করার জন্য আপাতত এমন একজনেরই প্রয়োজন ছিল যে দয়া-মায়া চেনে না।”
আফজাল চৌধুরী এবার আয়াতের দিকে ফিরলেন। আয়াত ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে দাদাজানের দিকে তাকাল। আফজাল চৌধুরী কঠিন স্বরে প্রশ্ন করলেন,
“আয়াত, কাল তুমি ডিভোর্স পেপারে সই করলে। যে মানুষটা তোমাকে স্ত্রী বলে মানল না, তোমাদের বিয়েটাকে ‘পুতুল খেলা’ বলল, তাকে তুমি নিজের ঘরে নিয়ে আসলে কীভাবে?”
আয়াত কাঁপা গলায় বলল, “দাদাজান… বিশ্বাস করুন, উনি কাল রাতে করিডোরে অসুস্থ হয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন। ওনার প্রচণ্ড জ্বর ছিল। ওনার অবস্থা দেখে আমি কোনো কিছু না ভেবেই ওনাকে এখানে নিয়ে এসেছিলাম ওষুধ দিতে।
বিশ্বাস করুন দাদাজান—”
আয়াতের কথা শেষ হওয়ার আগেই আফজাল চৌধুরী হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিলেন। তার চোখেমুখে এক কঠোর কাঠিন্য। তিনি গম্ভীর গলায় ধমক দিয়ে বললেন,
“চুপ করো আয়াত! অনেক হয়েছে। আর একটা শব্দও তোমার মুখ থেকে আমি শুনতে চাই না।”
দাদাজানের এমন শাসনে আয়াতের কান দিয়ে যেন গরম ভাপ বের হতে লাগল। এই বাড়িতে আফজাল চৌধুরীর সামনে কেউ আয়াতের দিকে আঙুল তুলে কথা বলার সাহস পেত না, এমনকি তিনি নিজেও কখনো তাকে কড়া কথা বলেননি। অথচ আজ সবার সামনে দাদাজানের এই বজ্রকঠিন শাসন আয়াতকে বিদীর্ণ করে দিচ্ছে।
আরভান এতক্ষণ শান্ত হয়ে এই পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দেখছিল। তার চোখে এখন চরম অবজ্ঞা আর বিতৃষ্ণা। সে নিজের ঠোঁটের কোণ কেটে বেরিয়ে আসা রক্তটুকু হাত দিয়ে মুছে নিল। এক ঝটকায় নিজের ধুলোবালি মাখা পোশাক ঠিক করে সে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো।
আফজাল চৌধুরী তীক্ষ্ণ গলায় গর্জে উঠলেন,
“তুমি কোথায় যাচ্ছো আরভান?”
আরভান একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় বলল,
“দাদাজান, আপনাদের এই থার্ড ক্লাস ফ্যামিলি ড্রামা দেখার মতো রুচি বা সময় কোনোটাই আমার নেই। আই হ্যাভ আ ফ্লাইট টু ক্যাচ। আজ রাতেই আমাকে মেলবোর্নে ফিরতে হবে।”
আফজাল চৌধুরী আরও এক ধাপ এগিয়ে এসে বললেন, “একটা মেয়ের সাথে এক ঘরে রাত্রিযাপন করে তাকে অপবাদের মুখে দাঁড় করিয়ে তুমি দায় ঝেড়ে চলে যাবে? এত সহজ?”
দাদাজানের মুখে এমন কথা শুনে আয়াতের মনে হলো পৃথিবীটা যদি এখনই দুভাগ হয়ে যেত, তবে সে তার লজ্জার পাহাড় নিয়ে মাটির নিচে তলিয়ে যেতে পারত। আরভান তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
”রাত কাটিয়েছি মানে? দাদাজান, এই মেয়ে আমার অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে আমাকে তার রুমে নিজে থেকে নিয়ে এসেছে। আমি এখানে স্বেচ্ছায় আসিনি। আর রাত কাটানোর কথা বলছেন? ওর মতো একটা সুযোগসন্ধানী মেয়ের সাথে আরভান চৌধুরী রাত কাটায় না। শি ইজ নট ইভেন মাই টাইপ।”
আয়াত জলভরা চোখে আরভানের দিকে তাকাল। এই লোকটা দেখতে মানুষের মতো হলেও এর ভেতরটা যে এতটা বিষাক্ত হতে পারে, তা সে কল্পনাও করেনি। যে মানুষটির জন্য সে কাল সারা রাত নির্ঘুম থেকে জলপট্টি দিয়েছে, সেবা করেছে, অথচ সে আজ সবার সামনে তার চরিত্র নিয়ে এমন কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত করছে।
আরভানের দৃষ্টি মুহূর্তের জন্য আয়াতের ওপর পড়তেই সে থমকাল। আয়াতের ওই বিষাদমাখা চোখের মায়া তাকে বিদ্ধ করলেও সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। সে জানে, এই মায়ায় যদি একবার সে দগ্ধ হয়, তবে এই মেয়েকে সে নিজের থেকে আলাদা করতে পারবে না। জোর করে হলেও নিজের কাছে আটকে রাখবে, যার ফলে তার অন্ধকার জীবনের সাথে জড়িয়ে এই মেয়েটির জীবনকেও সে ধ্বংস করে ফেলবে। তাই নিজেকে নিষ্ঠুর প্রমাণ করাই এখন তার একমাত্র অস্ত্র।
ঠিক তখনই ছোট চাচা আমজাদ চৌধুরী রেগে আরভানের দিকে এগিয়ে গেলেন।
“মুখ সামলে কথা বলো আরভান! বিদেশে বড় হয়েছ বলে কি সব নীতি-নৈতিকতা ধুয়েমুছে গেছে? বাড়ির বড়দের সামনে একটা মেয়ে সম্পর্কে এ কেমন কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করছ?”
আরভান চোখ বন্ধ করে একটু সময় নিল, যেন নিজের ভেতর উথলে ওঠা কোনো এক প্রবল ঝড়কে সামলানোর চেষ্টা করছে।
“বাহ! এই মেয়েটা অন্যায় করতে পারবে আর আমি সত্যিটা বললে দোষ? আপনারা তো নিজেরাই শুনলেন, শাহরিয়ার একটু আগেও বলল সে নাকি এই রুমে যখন-তখন আসে। দিস ইজ হার প্রফেশন মেবি—ছেলেদের ঘরে ডেকে আনা। তা না হলে পারমিশন ছাড়া এই ইডিয়টটা ওর রুমে ঢোকার সাহস পায় কীভাবে? এখানে চরিত্র বলে কিছু অবশিষ্ট আছে কি?”
আয়াত এবার দেয়াল ঘেঁষে মেঝেতে বসে পড়ল। তার চোখের পানি পড়া বন্ধ হয়ে গেছে। সে শুধু অপলক দৃষ্টিতে লোকটার বিষাক্ত ঠোঁট দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষের প্রতি ঘৃণা যে এতটা গভীর হতে পারে, তা সে আজ প্রথম অনুভব করল।
আফজাল চৌধুরী লাঠি ঠুকে চিৎকার করে উঠলেন,
“আর একটা কথাও না আরভান! তুমি কী করলে আর ও কী করল সেসব এখন গৌণ। যেহেতু তুমি এই বাড়িতে থাকা অবস্থায় তোমার স্ত্রীর সাথে এক ঘরে রাত কাটিয়েছ, তাই তোমাকে আয়াতকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে হবে এবং তাকে তোমার সাথে করে নিয়ে যেতে হবে। যদি তোমার শরীরে আমার রক্ত থাকে, তবে আমার এই সিদ্ধান্ত থেকে নড়চড় হবে না।”
আরভান তিক্ত হাসল। “আপনিও তবে আপনার সুযোগসন্ধানী ছেলের রূপ ধরছেন বেশ! এই অভিশপ্ত রক্তের ধারাটাই বোধহয় এমন।”
শাহরিয়ার তখন এক হাত দিয়ে নিজের রক্তাক্ত তালু চেপে ধরে আর্তনাদ করে উঠল,
“দাদাজান! এসব কী বলছেন? আয়াত কেন ওর সাথে যাবে? ও রাতে আরভানের সাথে থাকলেও আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি এখনো আয়াতকে বিয়ে করতে রাজি আছি!”
আফজাল চৌধুরী শাহরিয়ারের দিকে ফিরে অবজ্ঞার সাথে বললেন, “আয়াতের জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না শাহরিয়ার। ওর স্বামী এখনো জীবিত।”
তিনি শেহজাদীকে ডেকে বললেন, “শেহজাদী, আরভানের ঘর থেকে ডিভোর্স পেপারটা নিয়ে আসো।”
আরভান বাধা দিতে চাইল কিন্তু দাদাজানের চোখের আগুনের সামনে সে দমে গেল। শেহজাদী কাগজটা নিয়ে এলে আফজাল চৌধুরী সবার সামনেই সেই ডিভোর্স পেপারটা কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেললেন। তিনি গম্ভীর গলায় ঘোষণা করলেন,
”আয়াতের পাসপোর্ট আর মালপত্র গোছাও। আরভান, নতুন করে টিকিট কাটো। আজ রাতেই তোমরা দুজন একসাথে রওনা হবে। এটাই আমার শেষ কথা।”
আরভান একবার আয়াতের দিকে শীতল দৃষ্টি ফেলে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে গেছে; সে চেয়েছিল আয়াতকে এই বাড়ি থেকে মুক্ত করে দিতে, কিন্তু পরিস্থিতির ফেরে সে নিজেই এখন তার জালে আটকা পড়ে গেল।
শাহরিয়ার রাগে পাগলের মতো চিৎকার করতে করতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। নাজমা বেগম মুখ কুঁচকে বিড়বিড় করলেন, “নির্লজ্জ মেয়ে! বড়লোক ছেলে দেখে সোজা ঘরে তুলে নিল!”
সবাই চলে গেলে ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আয়াত মেঝের দিকে তাকিয়ে পাথর হয়ে বসে আছে। পারভীন সুলতানা এসে আয়াতের মাথায় হাত রাখলেন। তিনি দেখলেন আয়াতের চোখে কোনো পানি নেই। মানুষ বারবার আঘাত পেতে পেতে যেমন পাথরের মতো হয়ে যায়, আয়াত যেন ঠিক তেমন হয়ে গেছে। তার চোখে এখন শুধু আকাশচুম্বী ঘৃণা।
আয়াত অত্যন্ত দৃঢ় গলায় বলল,
“আমি এই নোংরা সম্পর্কটা থেকে মুক্তি চাই ছোট মা! ওই লোক একটা দু-মুখো সাপ। ওর চোখ এক কথা বলে, মুখ অন্য কথা। আমি ওই জঘন্য নোংরা লোকটার সাথে কিছুতেই যাব না। যে আমাকে সবার সামনে চরিত্রহীন বলে অপমান করতে পারে, তাকে আমি স্বামী মানি না। আমি তাকে ঘৃণা করি। চরম ঘৃণা করি!”
*****
আফজাল চৌধুরী নিজের ঘরের দরজার কাছে এসে থমকালেন। আরভান বিছানায় বসে একমনে হাতে ব্যান্ডেজ পেঁচাচ্ছে; শাহরিয়ারকে আঘাত করার সময় কাঁচের ঘর্ষণে তার নিজের হাতও বেশ কেটে গিয়েছিল আফজাল চৌধুরী বোধহয় জানতেন আরভান এখানেই আসবে। তিনি নিশ্চুপে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
“মানতেই হচ্ছে আরভান, তুমি একজন দারুণ অভিনেতা। মেয়েটার চরিত্রের ওপর কলঙ্ক লেপন করে অবশেষে নিজের আসল নাটকটা বন্ধ করে সামনে আসলে তাহলে?”
আরভান ব্যান্ডেজটা দাঁত দিয়ে টেনে টাইট করে বাঁধল। তার চোখে সেই চিরচেনা ঔদাসীন্য। সে স্থির কণ্ঠে জবাব দিল,
“বাধ্য হলাম দাদাজান। ভেবেছিলাম ওকে একটা সুন্দর আর মুক্ত জীবন দিয়ে যাব, কিন্তু আপনি আমার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছেন। আজ প্রমাণ করে দিলেন আপনি সত্যিই আরশাদ চৌধুরীর পিতা। এত বছর ধরে যে মেয়েটাকে নিজের আমানত বলে আগলে রাখলেন, আজ তার জীবনটাই নষ্ট করতে কেন উঠেপড়ে লেগেছেন? কেন জেনে-শুনে তাকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন? এমন একজন মানুষের সাথে তাকে জড়াতে চাচ্ছেন যার না আছে ভবিষ্যৎ, না আছে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা? যে নিজের জীবনের শেষ দিনগুলো গুনতে ব্যস্ত, তার গলায় এই মেয়েটাকে ঝুলিয়ে দিয়ে আপনি কী সুখ পাবেন?কী চান আপনি?”
আফজাল চৌধুরী সোফায় বসে ধীরস্থিরভাবে বললেন,
“আমি তো অনেক কিছুই চাই আরভান। যেমন আমি তোমার বেঁচে থাকার একটা কারণ দিতে চাই, ঠিক তেমনই আয়াতকে দিতে চাই লড়াই করার মতো শক্ত এক টুকরো জমিন। আর তার জন্য ওর তোমাকে প্রয়োজন। আমি জানতে চাইব না ওই বিদেশি মেয়েটা কে, কিংবা কেন তুমি দীর্ঘ বারো বছরে একবারও আসোনি। কারণ তোমার জন্য এ দেশে আসাটা যে খুব একটা সহজ ছিল না, তা তোমাকে দেখার পরে এখন আমি বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছি। কিন্তু আমি মনে করি, তুমি নিজের একতরফা সিদ্ধান্ত কারো ওপর চাপিয়ে দিতে পারো না। আয়াতেরও জানার অধিকার আছে কেন তুমি তাকে ডিভোর্স দিতে এত মরিয়া। যদি তোমার সবটুকু সত্য জানার পরে ও নিজে তোমাকে ডিভোর্স দেয়, তবেই সেটা ন্যায় হবে; অন্যথায় তা হবে ঘোরতর অন্যায়।”
আরভান তাচ্ছিল্যের সুরে বলল।
“কে বলছে ন্যায়-অন্যায়ের কথা? যে ব্যক্তি আমানত-আমানত বলে জপ করে একটা মেয়েকে তারই স্বামীর লম্পট কাজিনের সাথে বিয়ে দিতে চায়, সেই মানুষটাই কিনা আজ ন্যায়ের জ্ঞান দিচ্ছেন? আমি সেই রাতে না আসলে তো তারা এখন সো-কলড ম্যারেড কাপল হতো। ”
আফজাল চৌধুরী অপরাধী স্বরে বললেন।
”আমি মানছি আমি ভুল করেছি।কিন্তু গ্রামের একটা মেয়ে যখন আঠারো পার হয়, আর তার স্বামী যদি নিরুদ্দেশ থাকে, তখন সেই মেয়েটার ওপর দিয়ে কী সামাজিক বিপর্যয় যায় তা বোঝার ক্ষমতা তোমার নেই আরভান।আমি চেয়েছিলাম অন্তত চোখের সামনে ও নিরাপদ থাকুক।”
আরভান দাদাজানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“উহুঁ দাদাজান, সত্যিটা স্বীকার করুন, এটা ভুল না। আপনি আপনার ক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন মাত্র। বিয়ে দেওয়ার হলে কোনো যোগ্য ছেলেকে দেখে দিতে পারতেন, আপনার ওই লম্পট নাতির সাথে নয়;, যার চোখের মণিতে সবসময় পৈশাচিক লালসা চিকচিক করে।”
আফজাল চৌধুরী বিষণ্ণ গলায় বললেন, “তুমি ভুল বুঝছো আরভান।”
আফজাল চৌধুরী তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে আরভানের দিকে তাকালেন। আরভান বলে চলল,
“আপনার কি মনে হয় যে মেয়ে প্রথম যেদিন আমার জীবনে এসেছিল, তখনই আমি আমার জীবনের শেষ অবশিষ্ট ভালোবাসাটুকু হারিয়ে ফেলেছি? যাকে আমি এক বিন্দু হলেও ঘৃণা করি, তাকে আমি ভালোবেসে আগলে নেব এটা ভাবলেন কী করে?”
আফজাল চৌধুরী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন।
“ঘৃণা করো নাকি জোর করে ঘৃণা করতে গিয়েও বারবার ব্যর্থ হচ্ছ? তুমি যদি ঘৃণা ই করো, তবে সেদিন রাতে শাহরিয়ারের ওপর অতর্কিত আক্রমণ কেন করলে? আজই বা কেন ওকে রক্তাক্ত করলে? আমি জানি না তোমার গত বারো বছরের জীবন কেমন কেটেছে, তবে তোমার চোখ দেখেই বুঝতে পারছি তোমার অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। আমি তোমাকে আয়াতকে ভালোবাসতে বলব না, সেটা তোমাদের জীবনের ব্যাপার কিনৃতু আমি মনে করি একটা সত্য তোমার জানা উচিত।”
তিনি থামলেন।
“আয়াতের বাবা-মা দুর্ঘটনায় মারা যাননি। তাদের অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি সেই ঘটনার একমাত্র সাক্ষীকেও খাবারে বিষ মিশিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আয়াতের জীবনও তোমার জীবনের চেয়ে খুব একটা নিরাপদ নয় আরভান। আমার আয়ু ফুরিয়ে এসেছে; আমি মরলে এই নেকড়েদের হাত থেকে আয়াতকে কে বাঁচাবে? আয়াত এখনো জানে না ওর জীবনের ওপর কত বড় ঝুঁকি ঝুলছে। আমি চাই ও সত্যের মোকাবেলা করুক, নিজেকে কঠোর করুক। আয়াত একজন ল-এর স্টুডেন্ট, ওকে নিজের হয়ে লড়তে হবে। আর তার জন্য আমার তোমাকে লাগবে।”
আরভান কিছুক্ষণ গভীর চিন্তায় ডুবে রইল। তারপর বিদ্রূপের সুরে বলল,
“যে মানুষটা ভালোবাসার সংজ্ঞাই ভুলে গেছে, তাকে আপনি ভালোবাসার লোভ দেখাচ্ছেন দাদাজান? যদি সে একবার আমার জীবনে প্রবেশ করে এবং তার এই মায়াজালের কারণে আমি তাকে নিজের কাছে বন্দি করে ফেলি, তবে কিন্তু আমার থেকে তার মুক্তি পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। তখন আমার পা ধরে কেঁদেও সে মুক্তি পাবে না, এমনকি আপনার মিনতিতেও না। ওর মুক্তি হবে একমাত্র আমার মৃত্যুতে!”
আফজাল চৌধুরী আরভানের কাঁধে হাত রাখলেন,
“আমি জানি জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতায় তোমার বাঁচার ইচ্ছা নেই আরভান। তাই তোমার বাঁচার ইচ্ছাকে তোমার ওপর চাপিয়ে দিতে আমি বাধ্য হচ্ছি। যদি ওই নিরীহ মেয়েটার নিষ্পাপ মুখটা দেখে তোমার মনে বেঁচে থাকার ন্যূনতম তৃষ্ণা জাগে, তবেই আমার সার্থকতা। আমার বিশ্বাস, আয়াতই তোমার অন্ধকার জীবনের শেষ প্রদীপ হতে পারে।”
আরভান তার হাতটা সরিয়ে নিয়ে হিমশীতল গলায় বলল,
“আপনি ভুল জানেন দাদাজান। যার জন্মদাত্রী মা আর জন্মদাতা বাবা তাকে কোনোদিন ভালোবাসতে পারেনি, তাকে আপনার আদরের নাতবউ কখনই ভালোবাসবে না। সে আমার বাঁচার কারণ হবে কি না জানি না, তবে হয়তো সেই আমার মরার কারণ হবে।”
কথাটি শেষ করেই আরভান বড় বড় পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আফজাল চৌধুরী শূন্য চোখে ঘরের দেয়ালে টাঙানো স্ত্রীর ছবিটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে আওড়ালেন,
“এ কেমন দোটানায় রেখে গেলে আমাকে? তোমাকে কথা দিয়েছিলাম ওদের সম্পর্কটাকে টিকিয়ে রাখব। তোমারও কি এখন মনে হচ্ছে আমি ভুল করছি? এই দুটো ক্ষতবিক্ষত প্রাণকে টিকিয়ে রাখতে যে এদের একে অপরকে প্রয়োজন। আয়াত যেদিন আরভানের জীবনের চরম সত্যটা জানবে, আমার বিশ্বাস সেদিন সে এক মুহূর্তের জন্যও আরভানকে নিজের চোখের আড়াল হতে দিবে না,কিন্তু সেদিন হয়তো ও পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। কিন্তু আমার কিছুই করার নেই। আমি চাই ওরা নিজেদের জীবন নিজেরাই খুঁজে নিক। একদিন ওরা ঠিকই বুঝতে পারবে ওরা একে অপরের জন্য আল্লাহর দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার। আর সেদিন তারা বুঝবে কেন আজ আমি এতটা নিষ্ঠুর আর স্বার্থপর হয়েছিলাম।
#তাসনিম_রিয়া_খান
চলবে…

