Home "ধারাবাহিক গল্প আমার হয়ে থেকো আমার হয়ে থেকো পর্ব-৭+৮

আমার হয়ে থেকো পর্ব-৭+৮

0
803

#পর্ব_৭
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan

“গাড়ি থামান!”

​আয়াতের তীক্ষ্ণ চিৎকার আরভানের কানে পৌঁছালেও সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। সে অত্যন্ত নিপুণভাবে এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতে ফোনে কথা বলছে। আয়াতের দিকে ভ্রু কুঁচকে একবার তাকিয়ে আবারও সামনের রাস্তার দিকে নজর দিল। ফোনে কাউকে অত্যন্ত শীতল গলায় নির্দেশ দিচ্ছে সে,
“তোর আসার প্রয়োজন নেই। শুধু টাইমলি গাড়ি পাঠিয়ে দিস। বাকিটা আমি ম্যানেজ করে নেব।”

​”বলছি না গাড়ি থামান! কথা কি কানে যাচ্ছে না আপনার?”

আয়াত এবার আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠল। তার কণ্ঠস্বরে এক ধরণের জেদ আর তীব্র ঘৃণা মিশ্রিত। আরভান ফোনটা রেখে প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে আয়াতের দিকে তাকাল।

​”মাঝরাস্তায় তোমার ড্রামা দেখার ইচ্ছা আমার নেই। সকাল থেকে অনেক নাটক সয়েছি । জাস্ট শাট আপ অ্যান্ড সিট কোয়াইটলি।”

​আয়াত দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আর যাতে আপনাকে আমার ড্রামা না দেখতে হয়, সেই জন্যই বলছি গাড়িটা থামান। আপনার মতো একজন জঘন্য আর নিষ্ঠুর মানুষের সাথে এক মুহূর্ত থাকা আমার জন্য দমবন্ধ করা যন্ত্রণার। নিজের আভিজাত্য জাহির করার জন্য দাদাজানের সামনে আমার চরিত্র নিয়ে যে নোংরা খেলা আপনি খেলেছেন, তারপর আপনার পাশে বসে থাকা মানে নিজের আত্মসম্মানকে বিসর্জন দেওয়া। আমার ওপর আপনার কোনো অধিকার নেই। আমি এখনই নেমে যাব!”

​আরভান নিস্পৃহ গলায় জবাব দিল,
“ভুল জানো আয়াত। আইনি এবং ধর্মীয়—সব দিক থেকেই তোমার ওপর আমার পূর্ণ অধিকার আছে। আর নেমে কোথায় যাবে? এই জনমানবহীন রাস্তায় একা দাঁড়িয়ে থাকা আর নিজের বিপদ ডেকে আনা একই কথা। দাদাজান তোমাকে আমার সাথে পাঠিয়েছেন মানে তুমি এখন আমার রেসপন্সিবিলিটি। সো, চুপচাপ বসে থাকো।”

​আয়াত এবার আরও তেতে উঠল।
“একজন চরিত্রহীন সুযোগসন্ধানী মেয়ে, যে আপনার টাইপেরও না – তার পাশে বসে থাকাটা তো আপনার জন্য চরম লজ্জাজনক হওয়ার কথা। এই লজ্জায় তো আপনার মরে যাওয়া উচিত!”

​আরভান ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল। স্টিয়ারিংয়ে আঙুল ঠুকতে ঠুকতে বলল,

“মরার শখ আমার বহুদিনের আয়াত, কিন্তু আফসোস—মৃত্যুও হয়তো তোমার মতোই আমাকে ঘৃণা করে, তাই খুব একটা কাছে ঘেঁষে না। তবে আপাতত আমার মরা বা না মরা নিয়ে তোমাকে খুব একটা বিচলিত হতে হবে না। মৃত্যুর জন্য আমি সবসময়ই প্রস্তুত, কিন্তু তোমাকে সেই বিলাসিতা বা মুক্তি দেওয়ার ইচ্ছা আপাতত আমার নেই। মেলবোর্ন পৌঁছানো পর্যন্ত আমার এই বিষাক্ত সাহচর্যটুকু তোমাকে মুখ বুজে সহ্য করতেই হবে,কারণ মাঝপথে কাউকে হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া আমার স্বভাবে নেই।”

​আরভানের এমন নির্লিপ্ত আর অপ্রত্যাশিত উত্তর আয়াত মোটেও আশা করেনি। সে ভেবেছিল আরভান হয়তো রেগে গিয়ে কিছু একটা বলবে, কিন্তু এই শীতলতা তাকে আরও বেশি অস্বস্তিতে ফেলে দিল। আরভান পুনরায় প্রশ্ন করল,
“গাড়ি থামিয়ে কার কাছে যাবে তুমি? তোমার ওই সো-কলড বয়ফ্রেন্ড শাহরিয়ারের কাছে?”

​বারবার নিজের চরিত্রের ওপর এমন কুরুচিপূর্ণ অপবাদ আসাতে আয়াতের মনে হলো কেউ তার গায়ে ফুটন্ত গরম জল ঢেলে দিল। অপমানে তার শরীর রি রি করে উঠল। সে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“আপনার চিন্তাভাবনা এতই নোংরা যে আপনার সাথে তর্ক করাও রুচির পরিপন্থী। আপনার আভিজাত্যের আড়ালে যে এত কুৎসিত একটা মন লুকিয়ে আছে, সেটা জানলে আমি কাল আপনাকে মরতে দেখলেও এগিয়ে যেতাম না। পানিতে ডুবে কিংবা জ্বরে মরে গেলেও না! হ্যাঁ, শাহরিয়ার ভাইয়ার কাছেই যাচ্ছি, সে আর যাই হোক আপনার মতো দু-মুখো সাপ নয়!”

​আয়াতের মুখে শাহরিয়ারের প্রশংসা শুনে আরভান এবার সজোরে ব্রেক কষল। টায়ারের তীব্র ঘর্ষণে রাস্তা কেঁপে উঠল। আকস্মিক গাড়িটা থেমে যাওয়ায় আয়াত নিজেকে সামলাতে না পেরে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং ড্যাশবোর্ডের কোণায় সজোরে মাথা ঠোকায়। যন্ত্রণায় তার কপাল কুঁচকে যায়, হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরে সে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল।

​আরভান অত্যন্ত রুক্ষ গলায় তার দিকে তাকিয়ে বলল, “হোয়াট! কী বললে তুমি? জাস্ট আর একবার বলো তো!

​আয়াত কপালের যন্ত্রণা আর আরভানের কথা কোনটাই পাত্তাই দিল না। সে কোনো কথা না বাড়িয়ে গাড়ি থেকে নেমে পেছনের ট্রাঙ্ক থেকে নিজের ট্রলিটা নামিয়ে টেনে রাস্তায় রাখা শুরু করল।

​আরভানের পৌরুষে এবার বেশ আঘাত লাগল। এই প্রথম কোনো মেয়ে তার অবাধ্য হলো এবং তাকে এভাবে তুচ্ছজ্ঞান করল। সে তো চায়নি আয়াতকে নিজের অন্ধকার জীবনের সাথে জড়াতে, কিন্তু পরিস্থিতির ফেরে তারা এখন একসূত্রে বাঁধা। এত প্রচেষ্টাতেও যখন সব ব্যর্থ হলো, তবে এখন আর কিছু করার নেই। তার এই ক্ষণিকের দুনিয়ায় আয়াতকে তার সঙ্গী হতেই হবে—হোক তা বাধ্য হয়ে।

​আরভান গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত পায়ে গিয়ে আয়াতের হাতটা সজোরে ধরে ফেলল।

“গাড়িতে ওঠো আয়াত! কোনো সিন ক্রিয়েট করবে না এখানে।”

​আয়াত হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে চিৎকার করে উঠল, “আপনার সাহস হয় কীভাবে আমার হাত ধরার? হাত ছাড়ুন!”

​”হাত যখন ধরেছি, তখন ছাড়ার জন্য ধরিনি।”

আরভানের গলার স্বর এখন বরফের মতো শীতল।

​”আপনি তো একটা গিরিটির চেয়েও খারাপ! ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলান। তবে আপনার এই মায়াবী রূপে অন্তত আয়াত মোর্শেদ গলছে না।”

​”আয়াত, জেদ ছাড়ো। গাড়িতে চলো, যা কথা পরে হবে। এখানে রাস্তার মাঝখানে থাকাটা মোটেও সেফ না।”

​আয়াত দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “আপনার পাশে থাকার চেয়ে নরকও আমার জন্য সেফ জায়গা। হাত ছাড়ুন বলছি!”

​আয়াত আর আরভানের মাঝে একপ্রকার ধস্তাধস্তি শুরু হলে আকস্মিক হাত ছুটাতে গিয়ে আয়াত সজোরে আরভানের গালে একটি চড় বসিয়ে দিল। চড়ের শব্দে পুরো নিস্তব্ধ রাস্তাটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। আয়াত হাঁপাচ্ছে, তার চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে। সে কম্পিত গলায় বলল,
“আমার ব্যক্তিগত জীবন আর আমার সত্তা—দুটো থেকেই শত হাত দূরে থাকুন। আপনার ওই নোংরা আভিজাত্যের স্পর্শ দিয়ে আমাকে আর অপবিত্র করার চেষ্টা করবেন না। নেক্সট টাইম আমাকে ছোঁয়ার আগে নিজের পরিণতির কথা দশবার ভেবে নেবেন!”

​পুরো পরিবেশটা নিথর হয়ে গেল। আয়াত নিজেও কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল নিজের কাজের জন্য, যদিও তাতে তার বিন্দু মাত্র অনুশোচনা নেই। আরভান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার গালে আয়াতের আঙুলের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আরভান যন্ত্রণাকাতর এক টুকরো হাসি হাসল। তবে সেই হাসিতে বিদ্রূপের চেয়ে বিষাদ ছিল প্রখর। সে বিড়বিড় করে বলল,
“তুমি তো এলিনা চৌধুরীকে দেখোনি আয়াত, তাহলে তার মতো এমন নিষ্ঠুরতা কোথায় পেলে? তুমিও ঠিক তাই করলে—যে হাত দিয়ে কাল রাতে আমার ব্যথিত বুকে সেবা দিয়েছিলে, সেই হাত দিয়েই আজ গালে চড় মারলে!”

​​আয়াত কোনো কথা বলল না। তার মনে এলিনা চৌধুরীর পরিচয় নিয়ে ক্ষণিকের কৌতূহল জাগলেও সে তা নিজের ভেতর চেপে রাখল। ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে সে সামনের রাস্তার দিকে পা বাড়াল। আরভান আর ঝুঁকি নিতে চাইল না। সে ড্যাশবোর্ড থেকে একটি ছোট্ট ক্লোরোফর্ম স্প্রে বের করে শান্ত গলায় ডাকল,

“আয়াত!”

​আয়াত চরম বিরক্তি নিয়ে পেছনে ফিরল। সে চেঁচিয়ে বলল,
“সমস্যা কী আপনার? কী চান আপনি? সকাল পর্যন্ত যে আপনার চোখে চরিত্রহীন, সুযোগসন্ধানী মেয়ে ছিল, যাকে ডিভোর্স দিতে আপনি মরিয়া ছিলেন— এখন তাকে সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য এত তোরজোড় কেন? শুধু দাদাজানের কথায়, নাকি অস্ট্রেলিয়া নিয়ে আমাকে পাচার করে দেওয়ার কোনো ফন্দি এঁটেছেন?”

​আয়াতের জ্বলন্ত প্রশ্নের কোনো উত্তর আরভান দিল না। সে শুধু এক মুহূর্তের জন্য আয়াতের চোখের দিকে গভীর এক দৃষ্টিতে তাকাল, তারপর সরাসরি ওর নাকে-মুখে স্প্রে করে দিল। আয়াত কিছু বোঝার আগেই চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে এল। সে জ্ঞান হারিয়ে আরভানের প্রশস্ত বুকে ঢলে পড়ল। আরভান তাকে পরম মমতায় নিজের শক্ত বাহুডোরে আগলে নিল। আয়াতের এলোমেলো লম্বা চুলগুলো কানের পিছে গুঁজে দিল। আয়াতের চোখের কোণে জমে থাকা এক ফোঁটা তপ্ত জল নিজের আঙুলের ডগা দিয়ে মুছে দিতে দিতে সে ক্লান্ত স্বরে বলল,

​”তোমার চোখের ওই পানি আমার চিরন্তন দুর্বলতা আয়াত। ঘৃণা করো আমায়, প্রাণভরে করো; তবে আপাতত আমার সাথেই থেকো।”

​আরভান আয়াতকে পাজাকোলে তুলে নিয়ে গাড়ির ফ্রন্ট সিটে বসাল। নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে আয়াতের সিট বেল্ট বাঁধতে গিয়ে আরভানের হাতটা হঠাৎ থমকে গেল। তার চোখ হঠাৎ আটকে গেল আয়াতের ঠোঁটের নিচে থাকা সেই ছোট্ট তিলটার দিকে। আরভান কিছুক্ষণ নির্নিমেষ চেয়ে রইল। এক নিষিদ্ধ আকর্ষণে অবচেতন মনেই একটা আঙুল সেই তিলটার ওপর ছুঁয়ে দিল। পরক্ষণেই যেন তার হুঁশ ফিরল। সে চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিজেকে শাসাল, “ড্যাম ইট! এসব কী করছি আমি?”

​সে স্টিয়ারিংয়ে জোরে একটা থাপ্পড় মারল। প্রচণ্ড মানসিক চাপে তার শ্বাসকষ্ট শুরু হলো, কথা বলতে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটছিল। সে সামনে থেকে এক বোতল পানির আর বিশেষ এক ধরণের ট্যাবলেট বের করে গিলে ফেলল। সিটে মাথা হেলিয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে সে আয়াতের অচেতন মুখের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,

​”আমি মোটেও এসব করতে চাইনি, কিন্তু তুমি আমাকে বাধ্য করলে আয়াত। আমি এখানে তোমাকে কোনো নোংরা অপবাদ দিতে আসিনি, বরং তোমাকে মুক্ত করতে এসেছিলাম।কিন্তু এসেই বউ বেশে তোমাকে অন্য কারো পাশে বসে থাকতে দেখে আমি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উন্মাদের মতো কথা বলেছি। তোমার ওই ছোট্ট মুখটা একপলক দেখার জন্য দিনের পর দিন আমি তিলে তিলে দগ্ধ হয়েছি, তারপরও তোমার ভালো চেয়ে তোমার আশেপাশে আসিনি। তুমি যখন জানতে পারবে আমি কেন তোমাকে ছাড়তে চেয়েছিলাম, যখন তুমি আমার বিষাক্ত জীবন সম্পর্কে সবটুকু জানবে।তখন তুমি আমায় অপরাধী বানাতে পারবে না।কারণ দোষী আসলে তুমি নিজেই!। তুমিই এসে আমার জ্বলন্ত বুকে হাত রেখে আমার সুন্দর রূপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিষাক্ত অতীতকে মায়া দিয়ে জাগিয়ে তুলেছ। আমার বুকের আগুন তুমি এক নিমেষে থামিয়ে দিয়েছ, এর জন্য শুধু তুমিই দায়ী আয়াত। তুমি আবারও আমার ‘অবসেশন’ হতে শুরু করেছ—ভয়ংকর রকমের!”

আরভান কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলাল। তারপর আবার বলতে শুরু করল,
“সত্যি বলছি, শেষবারের মতো তোমাকে শুধু একপলক দেখে চিরতরে চলে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এলিনা চৌধুরীর পর তুমিই প্রথম যে আমার বুকের স্পন্দন অনুভব করেছ, আমার অসুস্থতায় সেবা করেছ। আমার জীবনে প্রথমবার কারও চোখে নিজের জন্য মায়া আর দয়া দেখেছি। তোমাকে একটা সুন্দর জীবন দিতে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, কিন্তু ভাগ্য যখন তোমাকে আমি নামক এই জীবন্ত নরকের সাথে বেঁধে দিয়েছে, তবে আমি মরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত তুমি আমার সাথেই থাকতে বাধ্য।”

​আরভান কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। তারপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে ঝড়ের গতিতে ছুটল। তার মনের ভেতর এখন হাজারো ঝড়, কিন্তু বাইরে সে বরফের মতো শীতল।

****

​অন্যদিকে চৌধুরী বাড়িতে তখন রণক্ষেত্র। জেসিকা সারা বাড়ি মাথায় তুলছে। অতিরিক্ত স্লিপিং পিল খাওয়ার কারণে সকালে ঘটে যাওয়া নাটকীয় ঘটনাগুলো তার আয়ত্তের বাইরে ছিল। জ্ঞান ফেরার পর যখন সে শুনল আরভান তাকে না জানিয়েই চলে গেছে, তাও আবার ওই ‘গ্রাম্য’ মেয়েটাকে সাথে নিয়ে—তখন জেসিকা এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারল না। নাজমা বেগম জেসিকার পাশে এসে বসলেন। মুখে মায়া দেখালেও তার চোখে ছিল ধূর্ত শিকারির চাউনি। তিনি ফিসফিস করে বললেন,
“আহা সোনা, কেঁদো না। পুরুষ মানুষ তো একটু আধটু পথ হারায়। ওর দাদাজান জোর করে ওই মেয়েকে ওর কাঁধে ঝুলিয়ে দিয়েছেন। রূপ দেখিয়ে হলেও ওই মেয়ের ওপর আরভানের মন বেশিদিন টিকবে না। দুদিন পরে ঠিকই ছুড়ে ফেলে দেবে। কোথায় তোমার এই ঝলমলে রূপ আর আধুনিকতা, আর কোথায় ওই আপদ! ও তো স্রেফ দাদাজানের জেদ।”

​​জেসিকা রাগে গজগজ করে ফিসফিসিয়ে বলল, “নো! আই উইল নট লেট দিস হ্যাপেন! ওই মেয়েটা একটা গোল্ড ডিগার। বাট আরভান ডিড আ বিগ মিস্টেক। হি ইজ নট মাই লাভ, হি ইজ মাই ফিক্সেশন। আরভান, তুমি এটা ঠিক করলে না। আমি তোমাকে এত সহজে ছেড়ে দেব না।”

​সে দ্রুত তার বাবা মিস্টার স্মিথকে ফোন করল। ওপাশ থেকে মিস্টার স্মিথ ফোন ধরতেই জেসিকা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
“ড্যাড! আরভান আমার সাথে চিট করেছে। শুধু আমাকে নয়, ও তোমাদেরও ধোঁকা দিয়েছে। ও আমাকে এখানে একা ফেলে ওই মেয়েটাকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে। ও আমাকে অপমান করেছে ড্যাড! ও আমাকে এখানে আসার জন্য একটা গুটি হিসেবে ব্যবহার করেছে। ও আমার সাথে এমন অভিনয় করেছে যে আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। যে ছেলে মেলবোর্নে আমাকে তার ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দিত না, সে এখানে এসে আমার হাত ধরে ঘুরেছে! আমি ভেবেছিলাম গ্রাম্য বউকে দেখে হয়তো তার মন গলেছে, কিন্তু হি ইউজড মি। ওদিন পার্টিতে একটা হাগ-এর জন্য যে আমাকে সবার সামনে চড় মেরে অপমান করেছিল, আজ সে আমাকে এক অপরিচিত দেশে সবার সামনে লজ্জিত করে চলে গেল। আমি ওকে ছাড়ব না, প্রয়োজনে ওকে শেষ করে ফেলব!এমন কি আরশাদ আঙ্কেলকেও ও ধোঁকা দিয়েছে, ও আয়াতকে ডিভোর্স দেয়নি ড্যাড!”

​মিস্টার স্মিথ রাগে ফোনটা কেটে দিলেন। তার সামনেই সোফায় গম্ভীর মুখে বসে আছেন আরভানের বাবা আরশাদ চৌধুরী। মিস্টার স্মিথ ক্রুর হাসিতে বললেন,

“এখন কী বলবে আরশাদ? তুমি বলেছিলে এবার নাকি তোমার ছেলে তোমার কথা রাখবে। সে তো এবারও তোমার অবাধ্য হলো। সে আমার মেয়েকে একা ফেলে ওই মেয়েটাকে নিয়ে ফিরছে। তোমার ছেলে আমার মেয়ের সাথে যা করছে, তাতে কিন্তু ওর জীবনের ওপর আমি চরম প্রেসার ক্রিয়েট করতে পারি। আমার ক্ষমতার কথা তো তুমি জানো! এর ফলে আমাদের কয়েক মিলিয়ন ডলারের বিজনেস ডিলটাও ক্যানসেল হতে পারে।”

​আরশাদ চৌধুরী শক্ত হয়ে বসে রইলেন। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
“আমি এটা হতে দেব না স্মিথ। ওই মেয়েকে ডিভোর্স ওকে দিতেই হবে। আপনি চিন্তা করবেন না, আমার ছেলের বউ একমাত্র জেসিকাই হবে। আমাদের বিজনেস পার্টনারশিপ টিকিয়ে রাখতে হলে এই সম্পর্ক মজবুত করা আমার প্রয়োজন। আমি আরভানের সাথে কথা বলছি। ওকে আমি বাধ্য করব।”

​স্মিথ কুটিল হাসিতে বললেন,
“একটা শরীরে একই বিষ বারবার প্রয়োগ করলে তা সহনীয় হয়ে যায়। তাই বিষের ডোজ বাড়াও আরশাদ। একই ব্ল্যাকমেইল আর কত করবে? এবার গুটি পাল্টাও।”

*****

​চৌধুরী বাড়িতে শাহরিয়ার তখন নিজের ঘর লন্ডভন্ড করছে। সে উন্মাদ হয়ে চিৎকার করছে। তার বাবা আনোয়ার চৌধুরী তাকে আগলে রাখার চেষ্টা করছেন। তাদের সামনে একজন মধ্যবয়স্ক পাসপোর্ট অফিসের কর্মচারী ভয়ে কাঁপছে। শাহরিয়ার চিৎকার করে বলল,

“তুমি জানো ওর জন্য আজ আমি আরভানের কাছে কতটা ছোট হয়েছি? যে আয়াতকে আমি ছোটবেলা থেকে আগলে রেখেছি, নিজের জানের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছি।সব করলাম আমি আর শেষমেশ লাভের গুড় খেয়ে গেল ওই আরভান? এটা হতে পারে না বাবা!”

​লোকটি কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“আমি কিছু জানি না শাহরিয়ার সাহেব। কিছুদিন আগে আফজাল চৌধুরী সাহেব নিজে এসে আয়াতের পাসপোর্ট-ভিসা সব রেডি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমি শুধু দায়িত্ব পালন করেছি।”

​আনোয়ার চৌধুরী ছেলেকে শান্ত করতে চাইলেন,
“শান্ত হ শাহরিয়ার। যা হওয়ার হয়ে গেছে।”

​কিন্তু শাহরিয়ারের চোখ দিয়ে তখন উন্মাদনার আগুন বেরোচ্ছে।
“কিছুই শেষ হয়নি বাবা। আমার রানিকে আমার সামনে থেকে কেউ নিয়ে যাবে আর আমি চেয়ে চেয়ে দেখব? অসম্ভব! আমি ওকে ফিরিয়ে আনবই। তুমি আমার অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার সব ব্যবস্থা করো। কেউ না থাকলেও বড় চাচাজান ঠিকই আমার পাশে থাকবেন। তিনি নিজের হাতে আয়াতকে আমার কাছে তুলে দেবেন। আমার রানি শুধু আমার, এর ভাগ আমি কাউকে দেব না।সে ওর স্বামী হলেও না। যেকোনো মূল্যে আমি ওকে ফেরত আনবই!”

চলবে.

#পর্ব_৮
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan

আয়াতের আচ্ছন্ন ঘুমটা যখন ভাঙল, তখন মাথার ভেতরটা প্রচণ্ড ঝিমঝিম করছিল। ক্লোরোফর্মের প্রভাবে দীর্ঘ সময় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকার পর সে যখন পিটপিট করে চোখ মেলল, তখন চারপাশের দৃশ্য দেখে তার শরীর পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। এই ঘরটা তো তার চেনা নড়বড়ে চৌধুরী বাড়ির সেই সেকেলে ঘর নয়। তবে কি সে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে?সে এখন কোথায়? কার ঘরে শুয়ে আছে?

​রুমটা অত্যন্ত আলিশান এবং আধুনিক। শুয়ে আছে মেঘের মতো নরম এক বিশাল বিছানায়। সিলিং থেকে ঝুলছে কারুকার্যময় ঝাড়লণ্ঠন, যার আলোয় ঘরের আভিজাত্য ঠিকরে পড়ছে। মেঝের ওপর বিছানো দামী পার্সিয়ান কার্পেট ঘরটিকে এক অদ্ভুত রাজকীয় রূপ দিয়েছে। ভয়ে আয়াতের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।

​মস্তিষ্কের কোষে চাপ দিতেই তার মনে পড়ল সেই নির্জন রাস্তার কথা। আরভানের সেই নিষ্ঠুর শীতল চোখজোড়া আর নাকে চেপে ধরা সেই উগ্র গন্ধওয়ালা স্প্রে। আতঙ্কে আয়াতের বুক ধকধক করতে শুরু করল। এই লোক তাকে কোথায় নিয়ে এসেছে? সে আরভানকে যতটা খারাপ ভেবেছিল, এই লোক তার চেয়েও শতগুণে বেশি ভয়ংকর।

পরক্ষণেই এক বীভৎস আশঙ্কায় শিউরে উঠল সে—তার সাথে কোনো খারাপ কিছু হয়নি তো? সে কি তাকে কোনো পাচারকারী দলের হাতে তুলে দিল? ছোটবেলায় শুনেছিল বাঙালি মেয়েদের অপহরণ করে বিদেশে পাচার করা হয়, তাকেও কি তবে বিক্রি করে দেওয়া হলো? আয়াত তড়িঘড়ি করে নিজের পোশাক পরীক্ষা করল। না, সব ঠিক আছে। সে টলতে টলতে বিছানা থেকে নামল। শরীরটা বড্ড দুর্বল লাগছে, যেন প্রতিটা অঙ্গ অবশ হয়ে আসতে চাইছে।

​ভয়ে ভয়ে রুম থেকে বের হয়ে সে করিডোরে আসলো। বাড়িটা ডুপ্লেক্স এবং অত্যন্ত আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি। চারধারে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে, যা ঘরের আভিজাত্যকে আরও রহস্যময় করে তুলছে। আয়াত ধীর পায়ে সামনে এগোতে থাকল। করিডোরে এসে সে লক্ষ্য করল দোতলার এই বিশাল জায়গায় মাত্র দুটো রুম—একদম দুই প্রান্তে। মাঝখানে একটা চওড়া সিঁড়ি। সে দুরুদুরু বুকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল। ড্রয়িংরুমের দৃশ্য দেখে আয়াতের চোখ যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো।

​সামনে বিশাল এক এলইডি স্ক্রিন জুড়ে চলছে তীব্র গতির কোনো এক ফাইটিং গেম। ঠিক তার সামনে আরামদায়ক সোফায় আয়েশ করে বসে আছে আরভান। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের কৃত্রিম বাতাসে তার সিল্কি চুলগুলো কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে নাচছে। পরনে সাধারণ সাদা টি-শার্ট, যার নিচ দিয়ে তার সুগঠিত পেশীবহুল বুক আর বাহুর গঠন স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। কোয়ার্টার প্যান্টে আবৃত দীর্ঘ লোমশ পা দুটো সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সামনের টেবিলের ওপর তুলে রেখেছে। স্ক্রিন থেকে ছড়িয়ে পড়া নীলচে আলো তার তীক্ষ্ণ মুখাবয়বে এক অদ্ভুত মায়া তৈরি করেছে। কানে হেডফোন, হাতে শক্ত করে ধরা রিমোট কন্ট্রোল—পুরো মনোযোগটাই গেমের ভেতর ডুবে আছে তার।

আরভানের ঠিক পাশেই বসে আছে আরেকজন যুবক। যে পুরোপুরি ফরমাল পোশাকে সজ্জিত। তার গড়ন আর মুখাবয়বে খাঁটি বাঙালির ছাপ স্পষ্ট। গেমের উত্তেজনায় সে ডুবে থাকলেও। ​হঠাৎ আগন্তুক যুবকটির চোখ উপরে সিঁড়ির দিকে পড়ল।

আয়াতকে দেখামাত্র সে সম্মোহিত হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল। খেলায় পাল্টা রেসপন্স না পেয়ে আরভান বিরক্ত হয়ে পাশে বসা ফারহানের দিকে তাকাল। ফারহান তখন হাঁ করে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা শুভ্রবসনা আয়াতের দিকে তাকিয়ে আছে। আরভান ফারহানের দৃষ্টি অনুসরণ করে পেছন ফিরে তাকাল। আয়াতকে দেখামাত্র আরভানের চোখের মণি এক মুহূর্তের জন্য প্রসারিত হলো, পরক্ষণেই তা এক গম্ভীর আক্রোশে কুঁচকে গেল।

ফারহান বিস্ময় সামলাতে না পেরে আরভানের হাত ধরে নাড়া দিয়ে বলল,
“এভি! তোর বাড়িতে একটা মেয়ে? আমি কি সত্যি দেখছি নাকি চোখের ভুল? এটা কে? আগে তো কখনো দেখিনি! তোর বোন? কিন্তু এলিনা আন্টির তো তুই একাই সন্তান! তাহলে তোর বাবা কি গোপনে বাংলাদেশে বিয়ে-টিয়ে করেছে নাকি? তুই তো জানাসনি ব্রো!”

​আরভান রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাতেই ফারহান তক্ষুনি চুপসে গেল। কিন্তু বিস্ময় সামলাতে না পেরে সে একলাফে উঠে আয়াতের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“হে কৃষ্ণনয়নী! তোমাকে তো আগে কখনো দেখিনি। এমন ভয়ংকর সুন্দর দুটো কাজলা রাঙা চোখ নিয়ে তুমি কোন স্বপ্নলোক থেকে এলে হে রমণী?”

​ফারহানের এমন কাব্যিক ঢং দেখে আয়াত মুহূর্তে বাক্যহারা হয়ে গেল। সে শুধু অস্ফুট স্বরে কাপা গলায় বলল, “বাংলাদেশ…”

​ফারহান বিস্ময় কাটিয়ে মৃদু হেসে বলল, “আমি আগেই আন্দাজ করেছিলাম। তোমার ওই টানা টানা মায়াবী চোখের চাহনি বলে দিচ্ছিল তুমি আমাদের দেশেরই মেয়ে। প্রবাসে নিজের দেশের কাউকে দেখার আনন্দই আলাদা!আরভানের এই রোবট ডেরায় তোমার মতো জ্যান্ত মানুষকে দেখে তো আমার নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছে না।”

ফারহান গদগদ হয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। “হাই, আমি ফারহান। এই খিটখিটে মেজাজের মিস্টার আরভানের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ওরফে একমাত্র দুর্ভাগা বেস্ট ফ্রেন্ড। ”

​আয়াত হতভম্ব হয়ে ফারহানের হাতের দিকে তাকিয়ে রইল, আর দূর থেকে আরভানের শীতল দৃষ্টি তাদের ওপর স্থির হয়ে রইল।

আয়াত হতভম্ব হয়ে ফারহানের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে তাকিয়ে রইল ঠিকই, কিন্তু হাত মেলানোর সুযোগ আর পেল না। তার আগেই আরভান বিদ্যুৎগতিতে এসে ফারহানের হাতটা খপ করে ধরে ফেলল। আরভান এত জোরে ফারহানের হাত চেপে ধরল যে বেচারা যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল। মনে হচ্ছে হাতের হাড়গুলো বুঝি এখনই গুঁড়ো হয়ে যাবে। ফারহান আরভানের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল, কিন্তু আরভান তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করল না।

​আয়াত তাদের এই পুরুষালি শক্তির প্রদর্শনীতে বেশি নজর দিল না। তার মাথায় তখন অন্য চিন্তা। সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
“আমি এখন কোথায়? আমাকে কোথায় নিয়ে এসেছেন আপনি?”

​আরভান ফারহানের হাতটা তাচ্ছিল্যের সাথে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে নির্লিপ্তভাবে আবার গেমের দিকে ফিরল। অত্যন্ত নির্বিকার গলায় জবাব দিল, “অস্ট্রেলিয়ায়। মেলবোর্ন সিটিতে।”

​আয়াতের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। সে রণমূর্তি ধারণ করে চেঁচিয়ে উঠল,
“কিহ্? আপনি কি আমার সাথে ইয়ারকি করছেন? আপনার সাহস হয় কীভাবে একটা মেয়ের অনুমতি ছাড়া তাকে এভাবে অন্য দেশে তুলে নিয়ে আসার? আমি আপনার নামে ইন্টারপোলে অপহরণের মামলা করব! আপনাকে আমি জেলে পাঠাবো!”

​আয়াতের তীব্র চিৎকারে ফারহান একদম কুঁকড়ে গেল। এভাবে আরভানের সাথে উচ্চস্বরে কথা বলার সাহস স্বয়ং আরশাদ চৌধুরীরও নেই, অথচ এই মেয়েটি একেবারে হুঙ্কার দিচ্ছে! ফারহান মনে মনে ভাবল,
“মেয়ের কপালে আজ নির্ঘাত দুঃখ আছে। আরভান রেগে গিয়ে না আবার চড়-থাপ্পড় মেরে বসে!”

ঠিক সেই সময় ফারহানের ফোনে একটা কল আসায় সে নিজের হাত ডলতে ডলতে একটু আড়ালে চলে গেল কথা বলতে।

​আরভান স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই শান্ত স্বরে বলল,
“তোমার কি মনে হয় আমাকে আটকে রাখার মতো কোনো জেল এই দেশে আছে?”

আয়াত বিমূঢ় হলো।সে একজন আইনের ছাত্রী, সে জানে বিচারব্যবস্থা সব দেশেই আছে। কিন্তু আরভানের আত্মবিশ্বাস দেখে সে কিছুটা বিভ্রান্ত। বিদেশের জেলখানা কেমন হয় বা আদৌ সেখানে আইনের শাসন কতটা কড়া, তা তার জানা নেই। সে খবরের কাগজে মাঝে মাঝে পড়েছে বিদেশের স্কুলগুলোতে বাচ্চারা পিস্তল হাতে সহপাঠীদের গুলি করে—আইন কি তবে সেখানে এতটাই শিথিল? আয়াত ভাবল, বাংলাদেশেও তো রাঘববোয়াল অপরাধীদের কোনো শাস্তি হয় না। তারা টাকা আর ক্ষমতার জোরে আইনের হাত থেকে ফসকে যায়; তবে কি এই উন্নত দেশেও আরভানের মতো বিত্তবানদের জন্য আইন অন্ধ? আয়াত অনেক চিন্তা করেও উত্তর না পেয়ে বোকার মতো প্রশ্ন করে ফেলল,
“এ দেশে কি সত্যিই কোনো জেল নেই? আপনি কি যা খুশি তাই করতে পারেন?”

আয়াতের এমন অসংলগ্ন প্রশ্ন শুনে আরভান নিজেও কিছুটা থমকে গেল। সে এই মেয়েকে নিজের ক্ষমতা আর প্রতিপত্তি বোঝাতে চেয়েছিল, আর এই মেয়ে আক্ষরিক অর্থেই জেলখানার অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলল! তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি দেখা দিল।

​আয়াত নিজের প্রশ্নের বোকামি বুঝতে পেরে অপ্রস্তুত হলো। মুখ ফসকে উল্টাপাল্টা কী সব বের হয়ে যাচ্ছে! কথা সামলাতে সে তড়িঘড়ি করে বলল,
“আপনাকে যদি সাধারণ জেলে না নেয়, তবে ফ্রান্সের ‘ডেভিলস আইল্যান্ড’-এর মতো কোনো না কোনো দ্বীপে তো ঠিকই বন্দি করে রাখবে। কারণ আপনার মতো অপরাধীরা লোকালয়ে থাকার যোগ্য না।”

​আরভান গেমের রিমোটটা পাশে রেখে সোজা হয়ে বসল। পূর্ণ দৃষ্টিতে আয়াতের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“ওকে, নো প্রবলেম। আমাকে যদি তেমন কোনো দ্বীপে পাঠায়, তবে তুমিও আমার সাথে যাবে। সেখানে গিয়ে আমরা দুজনে মিলে নিরিবিলি সংসার করব।”

​আয়াত থতমত খেয়ে বলল,
“আমি কেন আপনার সাথে যাব? আর আপনার মতো একজন পাষণ্ডের সাথে আমার কিসের সংসার!”

​আরভান এবার দাঁড়িয়ে আয়াতের দিকে দুই পা এগিয়ে এল।
“কেন যাবে না? তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী। আমি যদি দ্বীপের ওই জেলে যাই, তবে আমার অর্ধেক অংশ কার জন্য এখানে ফেলে যাব? সাথে করেই নিয়ে যাব। বাকি জীবনটা ওই নির্জন দ্বীপেই কাটিয়ে দেব।”

​আয়াত ক্ষেপে পাল্টা উত্তর দিতে মুখ খুলতেই হাউসকিপার ডেইজি ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করল। মধ্যবয়সী ডেইজির পরনে ট্রাউজার আর একটা সাদা টি-শার্ট। বয়স যেন তার ব্যক্তিত্বের কাছে হার মেনেছে। সে আয়াতকে দেখে মিষ্টি হেসে বলল, “হ্যালো ম্যাম, ডু ইউ ওয়ান্ট সামথিং টু ইট?”

​ফারহান ফোন কথা শেষ করে এসে সেখানে দাঁড়ালো। আরভান ঝট করে ডেইজির দিকে ফিরে চোখ ছোট করে বলল,
“ডেইজি, শি ইজ নট ইওর ম্যাম। হার নেম ইজ আয়াত। আজ থেকে ও তোমার অ্যাসিস্ট্যান্ট। ওকে নিয়ে যাও এবং বাড়ির কাজগুলো বুঝিয়ে দাও।”

​আয়াতের আত্মসম্মানে এবার সজোরে আঘাত লাগল।
সে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলল,
“আপনার বাড়ির কাজ করব মানে? আপনি কি আমাকে দাদাজানের বাড়ি থেকে তুলে এনেছেন আপনার বাড়ির দাসী বানানোর জন্য? আমি কোনো কাজের মেয়ে নই যে আপনার এই বিলাসবহুল খাঁচা পরিষ্কার করব! আমি আপনার এখানে এক মুহূর্ত থাকব না। আমি এখনই চলে যাচ্ছি।”

​আয়াত ঝড়ের বেগে প্রধান দরজার কাছে ছুটে গিয়ে হ্যান্ডেল ধরে প্রবল টানাটানি করেও তা খুলতে পারল না। সে উন্মাদের মতো ধাক্কা দিচ্ছে আর চিৎকার করছে,
“দরজা খুলছে না কেন? দরজা খুলুন বলছি!”

​পাসওয়ার্ড লকের ওপর আয়াতের এলোমেলো চাপাচাপি দেখে ফারহান আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করে উঠল,
“আরে আরে, করছ কী! তিনবার ভুল পাসওয়ার্ড দিলেই স্মার্ট ডোর সিকিউরিটি লকে চলে যাবে। তখন আর সঙ্গে সঙ্গে খুলবে না—এলার্ম বাজবে, সিস্টেম হ্যাং হবে। বাইরে থেকে ম্যানুয়াল রিসেট না করা পর্যন্ত আমরা এখানেই আটকে থাকব!”

আয়াত নিজের সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হলো, তখন সে অসহায় চোখে আরভানের দিকে তাকাল। আরভান তখন তার ব্যর্থতা উপভোগ করছে। সে গেমের রিমোটটা পাশে রেখে আয়েশি ভঙ্গিতে সোফায় গা এলিয়ে দিল। এক হাত মাথার নিচে ভাঁজ করে আয়াতের দিকে তাকিয়ে বিদ্রূপের সুরে বলল,

“বারো বছর ধরে স্বামী সেবার নামে শুধু প্রহরই গুনেছ আয়াত, কোনো কাজ তো করোনি। আমার উপার্জিত টাকায় বিনা পরিশ্রমে আয়েশ করা যাবে না। নিজের খরচ নিজেকেই চালাতে হবে। তাই আপাতত বাড়ির কাজ দিয়ে শুরু করো, এরপর যোগ্যতা অনুযায়ী অফিসিয়াল কাজও আসতে পারে। পড়াশোনার খরচ থেকে শুরু করে নিজের হাতখরচ—সবই তোমাকে কষ্ট করে উপার্জন করে নিতে হবে।”

​আয়াত অপমানে লাল হয়ে বলল,
“আপনার এক পয়সাও আমার চাই না। আমি আপনার বাড়িতে বন্দি হয়ে থাকতে আসিনি। আমাকে আমার দেশে পাঠিয়ে দিন, আমি সেখানে পড়াশোনা করে নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নিতে পারব। আপনার এই দয়ার দান বা কাজের অফার কোনোটাই আমার প্রয়োজন নেই!”

​আরভান শান্ত গলায় বলল,
“তুমি একটু বেশিই কথা বলো আয়াত। তবে অবাধ্যদের মুখ কীভাবে বন্ধ করতে হয়, আই নো দ্যাট ভেরি ওয়েল।”

আরভানের এমন সূক্ষ্ম হুমকিতে কেন যেন আয়াতের বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে উঠল। তবে সে সেটা বুঝতে না দিয়ে নিজের জেদ বজায় রাখার চেষ্টা করল। শক্ত গলায় বলল,
“কী করবেন আপনি? দেখি, পারলে করুন! আমাকে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই।”

​আরভান হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর রাখা সেই ক্লোরোফর্ম স্প্রে-টা হাতে নিতেই আয়াতের মুখ শুকিয়ে গেল। এই পাগলাটে লোকের কোনো বিশ্বাস নেই, আবার যদি নাকে স্প্রে করে ঘুম পাড়িয়ে দেয়! আবার যদি নাকে স্প্রে করে ঘুম পাড়িয়ে দেয়! এমনিতেই খিদেয় তার পেট চোঁচোঁ করছে।

সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত দুপা পিছিয়ে হাউসকিপার ডেইজির পিছু পিছু রান্নাঘরের দিকে ছুটল। শুধু ছুটলই না, ডেইজির পাশে গিয়ে আবারো নিচু স্বরে প্রশ্ন করল,
“ডেইজি, এই দেশে কি সত্যিই ‘ডেভিলস আইল্যান্ড’-এর মতো কোনো দ্বীপ আছে? যদি থাকে তবে আমায় একটু সাহায্য করো, আমি ওই পিশাচটাকে চিরতলে ওখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে চাই!”

​আরভানের ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। ফারহান হা করে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। এমন দৃশ্য তার জন্য একদম নতুন। এই প্রথম সে দেখল কোনো মেয়ের সাথে আরভান এভাবে পাল্লা দিয়ে তর্ক করছে, অথচ তাকে চড়-থাপ্পড় মেরে বের করে দিচ্ছে না। ফারহান নিজের ব্যথা পাওয়া হাতটা ডলতে ডলতে বলল,
“ব্রো, এই মেয়ে আসলে কে? তুই তো কোনো মেয়েকে তোর এবং তোর বাড়ির ত্রিসীমানায় আসতে দিস না, আর একে দেখছি সোজা তোর বেডরুম থেকে নেমে আসছে! ঘটনা কী?”

​আরভান কোনো জবাব দিল না। ফারহান জানে এই ছেলে নিজ থেকে মুখ না খুললে তাকে পারমাণবিক বোমা মেরেও কথা বলানো যাবে না। আরভান প্রসঙ্গ পাল্টে নির্লিপ্ত গলায় প্রশ্ন করল, “আজকের মিটিং কয়টায়?”

​ফারহান উত্তর দিল,
“নয়টায়। এভি, তোর বাবা আরশাদ চৌধুরী আজ তোর সাথে দেখা করতে চান। খবর পাঠিয়েছেন খুব জরুরি কোনো আলাপ আছে।”

আরভান খুব ভালো করেই জানে সেই ‘জরুরি’ আলাপের বিষয়বস্তু কী। সপাট জবাব দিল,
“ক্যানসেল করে দে। আমার সময় হবে না বলে দিস।”

ফারহান এবার আর চুপ থাকতে পারল না। সে আরভানের দিকে এক পা এগিয়ে এসে কিছুটা ব্যথিত গলায় বলল,
“মাঝে মাঝে ভাবি, রক্তের সম্পর্ক কি সত্যিই এতটা ফিকে হতে পারে? তোকে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না যে, কোনো বাবা নিজের স্বার্থের জন্য সন্তানের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে এভাবে বিষিয়ে দিতে পারে! পৃথিবীতে তুই বোধহয় সেই বিরল সন্তান—যে নিজের শিকড়কে ঘৃণা করে টিকে থাকার শক্তি পায়। যেখানে মানুষ বাবা-মায়ের ছায়া খুঁজে বেড়ায়, সেখানে তুই তাদের উপস্থিতিটাকেই বিষ মনে করিস।”

​আরভান কোনো উত্তর দিল না। সে জানালার বাইরে দিগন্তের বিষণ্ণ আলোর দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখজোড়া যেন এক অতলান্ত শূন্যতা বহন করছে। খানিক বাদে সে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে গম্ভীর স্বরে বলল,

​”শিকড় যদি বিষাক্ত হয় ফারহান, তবে সেই গাছ বেশিদিন বাঁচে না।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো’ এলিনা চৌধুরীকে কাল একবার এখানে নিয়ে আসিস। নিজে গিয়ে নিয়ে আসবি, তবে খেয়াল রাখবি—আমি আসতে বলেছি সেটা যেন সে ভুলেও জানতে না পারে।”

​ফারহান বিষণ্ণ গলায় বলল,
“তোদের সম্পর্কের সমীকরণগুলো আমি সত্যিই বুঝি না আরভান। আমি নিজের অভাবী পরিবারের কাছে যাওয়ার জন্য প্রতিটা মুহূর্ত গুনছি, শুধু তোর কথা ভেবে আর এই টাকার প্রয়োজনে বিদেশে পড়ে আছি। আর তোরা একই পরিবারের হয়েও যোজন যোজন দূরে থাকিস।”

​আরভান একটা বিষাক্ত হাসি হাসল। জানালার কাঁচে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে সে ধীরস্থিরভাবে বলল,
“সংসার বা পরিবার বলে আমাদের এখানে কিছু অবশিষ্ট নেই ফারহান।পরিবার বলতে তুই যা বুঝিস, তা এই বাড়ির চৌকাঠ মাড়ানোর অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে । এখানে সম্পর্ক মানে স্রেফ লেনদেন। যেখানে একজন স্বামী তার স্ত্রীর সম্পত্তি গ্রাস করার নেশায় মত্ত, আর সেই স্ত্রী নিজের হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধারের আশায় পরম শ্রদ্ধেয় স্ত্রী সেজে দিনের পর দিন অভিনয়ের জাল বুনে যাচ্ছে।সেখানে ‘সন্তান’ বলে কোন শব্দ নেই। তাদের এই স্বার্থের লড়াইয়ে আমার ‘অস্তিত্ব’ বা ‘সময়’ কেবল একটা বিনিয়োগ মাত্র। আর এই বিনিয়োগের মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে, সেটা ওরা বুঝতে পারছে না।”

​কথাটা বলেই আরভান অত্যন্ত ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এক ক্লান্তির ভার বহন করছে। ফারহান অপলক দৃষ্টিতে ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানে, আরভানের শরীরের ভেতরে এক অদৃশ্য ঘাতক ধীরে ধীরে জাল বুনছে, যা যেকোনো মুহূর্তে সব শেষ করে দিতে পারে। অথচ এই মানুষটা বাঁচতে চাওয়ার বদলে মৃত্যুর প্রহর গুনতেই যেন বেশি আগ্রহী।

ফারহান বিড়বিড় করল,
“যদি এই পাথরটার জীবনে একবার সত্যিকারের এক পশলা ভালোবাসার বৃষ্টি নামত, তবে হয়তো তার ভেতরের এই বিষাক্ত দহনটুকু অন্তত শান্ত হতো। এই ক্ষতবিক্ষত ছেলেটা যদি জীবনে কোনোদিন নিখাদ একবিন্দু ভালোবাসা পেত, তবে হয়তো এই অকাল মৃত্যুর মিছিলে ও শামিল হতে চাইত না। হয়তো সেই ভালোবাসার মায়ায় ও আরও একবার নতুন করে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করত। কেউ কি আসবে না, যে আরভানের এই ভগ্ন হৃদয়ে নতুন করে বাঁচার তৃষ্ণা জাগিয়ে দেবে?”

#তাসনিম_রিয়া_খান
চলবে….